"স্পেশাল নেভি টিম টহল দিচ্ছে, মালামালের সাথে এই মালটাকেও নৌকাতে ওঠা।"
ভিনদেশী ভাষায় বলা কথাগুলোর অর্থ তৃষা না বুঝলেও বুঝেছিল উপস্থিত সকলে। জাহাজ হাইজ্যাক হয়েছে। জলদস্যুদের নৌকা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে জাহাজটাকে। চাইছে মুক্তিপণ। চলছে দুইদলের মধ্যে দর কষাকষি। সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে রায়েফ কায়রেল, জলদস্যুদের সর্দার। সমুদ্রতটে যার একটাই ডাকনাম, সমুদ্রের হাঙর। যার উপস্থিতিই সকলকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট।
এরিদের কথা শুনে রায়েফ কায়রেল চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। সাথে সাথেই এরিদ টেনে বের করে আনলো লোহার কন্টেনারের পাশে লুকিয়ে থাকা তৃষাকে। পরনে লাল বেনারসী, ভয়ে জড়সড় হয়ে কেঁদে দেওয়ার অবস্থা চোখমুখের। রায়েফ ইশারায় তার হাত ছেড়ে দিতে বলল। ছাড়া পেয়েই ভয়ে ভয়ে তৃষা চোখ তুলে তাকালো সামনে রাজকীয় ভঙ্গিমায় বসে থাকা লোকটার দিকে। তীক্ষ্ম সবুজাভ চোখের মণি, এলোমেলো চুলগুলো বাতাসের তালে কপাল ছাপিয়ে, পরনে ঢিলেঢালা খাকি পোশাক, পায়ে কালো রঙের বুট আর ডান হাতে ঠেক দেওয়া বিশাল এক তলোয়ার। তাদের দলের বাকি লোকগুলোর মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা হলেও এই লোকটার চেহেরা খোলা। পায়ের উপর পা তুলে এক ঠাঁয় লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তৃষা ঘাবড়ে যায়। সহজ সরল মেয়েটা যেখানে আজ অব্দি শহরের বাইরে পা রাখেনি, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আর এখন এমন এক অজানা শঙ্কা। ভয়ে তার শরীর এতটাই ক্লান্ত, যে কোনো মুহূর্তে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে। পা দুইটা কাঁপছে অসম্ভবরকম। রায়েফ আঙ্গুল উঁচিয়ে তাকে কাছে ডাকলো। কাঁপা কাঁপা পা নিয়ে সে এগিয়ে গেল। মাথা নামিয়ে দুইহাতে শক্ত করে আকড়ে ধরলো শরীরে প্যাঁচানো শাড়ীর আঁচল। ভীষন শীত করছে তার।
"বিয়ে?"
তৃষা চমকে তাকালো লোকটার দিকে। এতক্ষণে সে এটুকু বুঝেছিল যে এই লোকগুলোর ভাষা আলাদা। তারা বাংলা কিংবা হিন্দি ভাষায় কথা বলে না। এমনকি ইংলিশও না। কিন্তু সামনের মানুষটার মুখে খাঁটি বাংলা ভাষা শুনে অবাক হলো সে। কিন্তু তাই বলে কী ভয় কেটে যায়? নাহ। তাইতো সাথে সাথেই মাথাটা আবারও নামিয়ে নিলো। এরপর দুইপাশে মাথা নেড়ে নসূচক ভঙ্গিমায় বলল,
"বিয়ে ছেড়ে পালাচ্ছি।"
"ডেস্টিনেশন?"
"দু দু দুবাই"
ভয়ে তুতকে উঠলো তৃষা। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই রায়েফের। তার জানামতে এই ক্রুশ শিপটা ওমান যাত্রীগামী। কিন্তু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ট্রাক হারিয়ে ঢুকে পড়েছে ওমান উপকূলের পশ্চিমে gulf of aden এ। আর এখানে এসেই পড়েছে তাদের হামলার কবলে।
"পাসপোর্ট? ভিসা?"
কথাটুকু বলেই রায়েফ হাত বাড়ালো তৃষার দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে তৃষা তার হাতে ধরে থাকা কাগজগুলো একে একে সব তুলে দিলো তার হাতে, যেগুলো এই জাহাজে ওঠার আগে দেওয়া হয়েছিল তাকে। কাগজগুলো হাতে নিয়ে তার যা বোঝার বুঝে গেল। সাথে সাথেই একজনকে কাছে ডেকে তৃষার দিকে ইশারা করে বলল,
"জিনিসপত্রগুলো আমার নৌকায় ওঠা।"
প্রেমিককে বিয়ের আসরে ফেলে অন্য এক ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে তৃষা। মুহূর্তেই এই খবর ছড়িয়ে যায় বাড়ি ভর্তি মানুষের কাছে। কানাঘুষা আর ছিঃ ছিঃকার পড়ে যায় চারিদিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গ্রামের মানুষ হামলে পড়ে আজমল সাহেবের বাড়িতে। কিছু মানুষ সান্ত্বনা দিলেও বেশিরভাগ মানুষই মুখ টিপে হাসছে আর কানাঘুষা করে বলছে,
"বেশ হইছে। মাইয়া মানুষরে পাখা দিলি উড়বিনি তো কী করবি? আমগো ঘরে কি মাইয়া নেই নি? কই ওইসব পড়ালেখার ভূত ওগো মাথায় তো নাই?"
"আরে বোঝো না কাকি, পড়ালেখা তো সব বাহানা। শহরে নাং চরাতি যাইতো এগো মাইয়া।"
আজমল সাহেব বুকে হাত চেপে ধপাস করে বসে পড়লেন মেঝেতে। নূরনেহার এসে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হুশিয়ারী কন্ঠে সবাইকে বললেন,
"কেউ আর একটা কথাও বলবেন না আমার তৃষার নামে। দেখছেন না আমার স্বামীর কী অবস্থা? আপনাদের কী বিবেক নেই? মানুষটার এমন অবস্থা দেখেও যা নয় তাই বলে যাচ্ছেন। এখনই বের হয়ে যান সবাই আমার বাড়ি থেকে।"
এই গ্রামের বেশ শিক্ষিত বাড়ি আজমল সাহেবের পরিবার। তার স্ত্রী নূরনেহার শহরের মেয়ে। কলেজে গিয়েছে দুই বছর। আজমল সাহেব সেকালের ম্যাট্রিক মাস। মেয়েকে তারা ছোটো থেকেই পড়াশোনা করার জন্য দারুনভাবে উদ্ভূত করতেন। যার ফলস্বরূপ গ্রামে এইচ.এস.সি পাশ করার পর তাকে ভর্তি করে দেন শহরের একটা কলেজে।
শিক্ষিত মহিলা বরাবরই নাক উঁচু ধরনের। বেশ মিশুকে স্বভাবের হলেও কথার প্যাঁচে কথার জবাব তিনি এমনভাবে দেন, সামনের মানুষটার মুখ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তার মেয়ে তৃষা একেবারে সরল, মুখচোরা স্বভাবের। মুখ থেকে তার কথা সরে না যেন। কিন্তু এই মেয়ে যে এতগুলো ছেলেকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারে, কে জানতো?
নূরনেহারের কথা শুনে গ্রামের মানুষজন এক এক করে সব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করলো। কেউ কেউ আবার মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে পাশেরজনের কানে কিসব বলে আর নাক সিটকায়।
"কতজনের মুখ বন্ধ করবেন আপনারা? আপনাদের মেয়ে তো আমাদের মান সম্মানও ধূলোয় মিশিয়ে দিলো। এতো ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিতে এসে এভাবে খালি হাতে ফিরে গেলে লোকজন কী বলবে? আপনারা আবার ওই মেয়ের হয়ে কথা বলেন? ভোলাভালা সেজে থাকা মেয়ে তো আপনার পুরো ছেলে চরানি ঘুঘু। মুখে একেবারে চুন কালী মাখিয়ে দিয়ে গেছে আপনাদের। এমন মেয়ে জন্ম দেওয়ার থেকে মরে যাওয়া উচিৎ আপনাদের।"
পাত্রের ফুফু আনতারা বেগমের কথা শুনে আজমল সাহেব যেন আরও বেশি ভেঙে পড়লেন। বুকে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো তার। বুকে চেপে রাখা হাতটা আরও শক্ত করে আকড়ে ধরে মুখ উপরে তুলে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তাড়াহুড়ো করে আনতারা বেগমকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেল রায়হান। বিয়ে করতে এসে আবার না এই লোকের কিছু হয়ে গেলে ফেঁসে যায় তারা!
দুরন্ত ট্রেনে বসে আছে তৃষা। ট্রেনের গতির সাথে সাথে দোল খাচ্ছে তার শরীর। পরনে বিয়ের বেনারসী, গায়ে বেশ কিছু গয়না, চোখের কোল ঘেঁষে নোনাজলের ধারা আপনমনে বয়ে চলছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল সে, এমন সময় সামনের সিটে বসা মধ্যবয়সী লোকটার ডাকে হুশ ফিরল।
"তোমার গয়নাগুলো খুলে এই পুটলিতে ভরে দাও। অনেক মানুষের মধ্যে কখন কোনটা আবার হারিয়ে যাবে!"
সামনে বসে থাকা লোকটাকে তৃষা চেনে না। চাচাতো ভাই ফারাজের দূর সম্পর্কের মামা হয়। বাড়ি থেকে পালানোর ব্যবস্থা ফারাজই করে দিয়েছে তাকে। এই লোকের অনেক যোগাযোগ। এখান থেকে ট্রেনে করে তারা মুম্বাই যাবে। এরপর সেখান থেকে জাহাজে করে দুবাই। গত বছর ফারাজের এক খালাতো বোন দুবাইতে গিয়েছে। সেখানে নাকি ভালো চাকরি পাওয়া যায়। বেতনও ভালো। তৃষা আপাতত চাকরি বাকরির কথা ভাবছে না। সে কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকবে ওখানে, ফারাজের খালাতো বোনের কাছে। এরপর মাস দুয়েক পর আবার ফিরে আসবে। সেসব ব্যবস্থা ফারাজ করে দেবে বলেছে।
গা থেকে একে একে সব গয়নাগুলো খুলে লোকটার বাড়ানো লাল পুটলিতে রাখলো তৃষা। লোকটা ততক্ষণে তার সুটকেস নামিয়ে দিলো উপর থেকে। এরপর পুটলিটা সেই সুটকেসে রেখে বন্ধ করে আবারও তুলে দিলো ওপরে।
"আমার তো পাসপোর্ট নেই। ওই দেশের লোক ঢুকতে দেবে?"
তৃষার কথায় লোকটা খানিকটা চমকে উঠলেন যেন। সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
"আমি আছি না? তুমি এত চিন্তা করো কেন, মেয়ে? আমি হলাম গিয়ে দালাল। এইসব দেশের বর্ডারের ফাঁক দিয়ে মানুষ ঢোকানো আমার কাছে কোনো ব্যাপার না।"
"পুলিশ ধরে না আপনাকে? এগুলো তো আইনের বিরুদ্ধে।"
তৃষার কৌতূহলী প্রশ্ন শুনে খানিকটা হাসলেন লোকটা। বললেন,
"পুলিশ আমাকে অনেক সমীহ করে চলে। ধরবে কেন?"
কথাটা বলেই হো হো করে হাসতে লাগলেন তিনি। তৃষার ভালো লাগলো না তার সেই হাসি। অল্প কথা বলা মেয়ে তৃষা, এই দুটো কথা বলেই যেন হাঁপিয়ে গেল। ট্রেনে ওঠার পর থেকেই অনেক কান্নাকাটি করেছে সে, হয়তো সেজন্যই আরও হাঁপিয়ে পড়েছে। তার মতো দূর্বল মেয়ের ক্ষেত্রে এতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়াও তো সহজ ছিল না। কিজানি বাবা মা কেমন আছ? কী করছে এখন?
ভাবনাগুলো যেন ভেতর থেকে আরও বেশি দূর্বল করে তুলল তাকে। বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠলো একদলা কান্না। সিটে মাথা এলিয়ে দিতেই চোখের গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
নিজের নাম ধরে ডাকাডাকির শব্দ শুনে ঘুম ভাঙ্গলো তৃষার। ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে আছে মুম্বাই স্টেশনে। লোকটা ডাকে ঘুম ভাঙ্গে তার। স্টেশন এসে গেছে, নামবে বলে ডাকছে তাকে। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তৃষা খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙতেই তড়িঘড়ি করে লোকটার সাথে নেমে গেল। স্টেশনে নামতেই চারিদিকে খাবারের দোকান দেখে পেটের মাঝের ক্ষুধাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। কিন্তু সাথে করে টাকা পয়সা কিছু না আনায় সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। অচেনা একটা লোককে খাবারের কথা তো আর বলা যায়না!
চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে কয়েকঢোক পানি খেল তৃষা। এরপর লোকটার সাথে পা বাড়ালো সামনের দিকে।
Mumbai International Cruise Terminal এর সামনে এসে দাঁড়ালো তারা। এমন জায়গায় এর আগে কখনও আসেনি তৃষা। একদিকে নতুন কিছু অভিজ্ঞতার সুযোগ অন্যদিকে পেছনে ফেলে আসা পরিবার, মনটা ভার হবে নাকি খুশি বুঝে উঠতে পারছে না। তবে তার সেই চাঞ্চল্যকর অনুভূতিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে লোকটা তার হাত ধরে এগিয়ে গেল ভেতরের দিকে। তৃষাকে এক সাইডে দাঁড় করিয়ে কাকে যেন ফোন লাগালো তার ছোট মত বাটন ফোন দিয়ে। তাদের গ্রামে হাতে গুনে কয়েকজনের কাছে আছে এই বাটন ফোন। তবে কলেজে অনেকের কাছেই দেখেছে এই ফোন। তাদের ফোনগুলোতে আবার গেমও খেলা যায়। সাপ গেম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন বয়স্ক লোক এসে দাঁড়ালো তাদের সামনে। পরনে তার কেমন যেন পোশাক। মনে হয় এখানেই কাজ করে সে। বয়স্ক লোকটা হাসিমুখে তৃষার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এরপর চলে গেল অন্যদিকে। ফারাজের মামাও গেল তার পিছু পিছু। দুজনে মিলে কী নিয়ে যেন বেশ কথা কাটাকাটি হলো। এরপর একপর্যায়ে বয়স্ক লোকটা ফারাজের মামার হাতে একটা সাদা খাম ধরিয়ে দিতেই সাথে সাথে হাসিমুখে সেটা নিয়ে নিজের পকেটে ভরলেন তিনি। এরপর একগাল হেসে তৃষার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
"এবার আমি আসি। ওইযে, ওই চাচা তোমাকে জাহাজে তুলে দেবে।"
#নিকাহ্
#সূচনা_পর্ব
#ফিজা_সিদ্দিকী