ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিকাহ

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: ফিজা সিদ্দিকী

#নিকাহ(৬)

#ফিজা_সিদ্দিকী

চোখের পাতা ভারী হয়ে লেপ্টে আছে একে অন্যের সাথে। মাথার মধ্যে বিশাল এক ভার ছাপানো হয়েছে যেন। তৃষা বড়ো কষ্টে মাথা এদিক সেদিক নাড়িয়ে পিটপিট করে চোখ খুলল। গত রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে এরপর কী যে হলো তার! কেমন যেন ঘোর লেগে গেল। তন্দ্রায় ঢলে পড়ল। এরপর আর কিছু মনে নেই। অবচেতন মনে হাত পা নাড়াতে গিয়ে টের পেল সে নাড়াতে পারছে না শরীর। চোখ দুইটা ভালো করে খুলে ভালো করে নিজের দিকে খেয়াল করতেই আঁতকে উঠল। শরীরে চাদর পেঁচানো তার। উন্মুক্ত কাঁধদ্বয় শুধু উঁকি দিয়ে বেরিয়ে আছে চাদরের থেকে। কাঁধে ব্লাউজ নেই। নেই কেন? তবে কি শরীরেও কিছু নেই? এজন্যই চাদর.....

নাহ। আর ভাবতে পারল না সে। রাগে কান্না পেয়ে গেল তার। লোকটা তবে তার ঘুমের ঘোরে থাকার সুযোগ নিয়ে স্বামীর অধিকার ফলিয়েছে, তাও কিনা তার অজান্তে। তৃষা মূর্ছা পড়ল মুহূর্তেই। কী যেন এক কষ্ট একদলা ভেজা কাগজের তালের মতো হয়ে আটকে রইলো তার গলার কাছটায়। বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করলো না সে আর। বালিশে মাথা এলিয়ে নীরবে চোখের কোল বেয়ে জল গড়াতে লাগলো তার।

কালো পাঞ্জাবির হাতা ফোল্ড করতে করতে ঘরে প্রবেশ করলো রায়েফ। লম্বা চুলগুলো মুখের উপর ছড়িয়ে। টপ টপ করে পানি ঝরছে সেখান থেকে। পরণের পাঞ্জাবিতেও ছোপ ছোপ পানির ছাপ স্পষ্ট। সদ্য গোসল সেরেছে সম্ভবত। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আড়চোখে একবার তৃষার দিকে তাকালো সে। মলিন মুখ, অন্যপাশে ফিরে শুয়ে থাকায় চোখের জলটুকু আড়াল হলো তার চোখ থেকে। তবে সে বিষয়ে বিশেষ পাত্তা দিল না সে। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আড়চোখে আরও একবার তাকালো তার দিকে। এখনও আগের মতোই চুপচাপ শুয়ে আছে দেখে খানিকটা শব্দ করে কাশি দিলো। এরপর গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,

"যদি জেগে গিয়ে থাকেন তবে গোসলটাও সেরে ফেলুন। একটু পর কিছু পরের ঘরে নাক গলানো টাইপ মহিলা আসবে আপনাকে দেখতে।"

তৃষা প্রত্যুত্তর করল না। আগের মতোই শুয়ে থাকলো সে। রায়েফ বিরক্ত হলো তার নির্লিপ্ততায়। রাগটা তার বরাবরই একটু বেশি। তবে সেটা অহেতুক অপরিচিত কোনো মানুষের উপর দেখায় না সে। তাই এই মুহূর্তেও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে নরম সুরে বলল,

"আপনি ঠিক আছেন? কাঁধে কি ব্যথা করেছে বেশি?"

পাশে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তৃষা। তৎক্ষনাৎ তার চোখের পাপড়িতে লেপ্টে থাকা অশ্রুকণা দৃষ্টিগোচর হলো রায়েফের। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। আগ বাড়িয়ে হাত এগিয়ে কপাল ছুঁয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরখ পড়ল। তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও মৃদু কম্পন টের পেল সে মেয়েটার শরীরে। রাতে এমন নেশালো পানীয় পান করার পর সকাল সকাল মেয়েটার তো অবসাধগ্রস্থ অবস্থায় থাকার কথা, অথচ সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একঠায় তাকিয়ে তার দিকে। যেন সে কোনো অন্যায় করেছে, যে অন্যায়ের মাশুল বুঝে নিতে, তার মাঝে অপরাধবোধ জাগ্রত করতে এমন প্রশ্নবিদ্ধ, নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে সে। রায়েফ বেশি কথা না বাড়িয়ে শান্ত অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

"সমস্যা কী? এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেন অপরাধ করে বসেছি কোনো!"

"করেননি? আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম।" ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে করতে কোনোক্রমে বলল তৃষা।

"আপনি নেশার ঘোরে ছিলেন।"

চটপট তার কথা সংশোধন করে দিলো রায়েফ। এরপর ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলো তৃষার পরবর্তী উত্তরের।

"তবুও!"

"আপনি এমন ভান করছেন যেন আপনার শরীরের পূর্ণ দখল নিয়ে আপনাকে বিছানা থেকে ওঠার অবস্থায় রাখিনি আমি।"

"করেননি আপনি?"

তৃষার কন্ঠে কোথা থেকে এত তেজ এলো কিজানি। বিছানা ছেড়ে তড়িৎ গতিতে উঠে বসে তেজালো কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো সে। রায়েফ ভ্রু কুঁচকে খানিকটা ঝুঁকলো। একহাত বিছানায় ভর দিয়ে অনেকখানি ঝুঁকে নিজেদের মাঝে এতখানি দূরত্ব রাখলো যেন একে অন্যের নিঃশ্বাসের শব্দ টের পাওয়া যায়। এরপর কণ্ঠের গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রেখে আবারও বলল,

"করেছি বলছেন?"

তৃষা আমতা আমতা করে নিজের শরীরের দিকে তাকালো। এরপর পিছু সরতে গেলে আচমকা তার চাদর ধরে একটান দেয় রায়েফ। আঁতকে উঠে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে দুইহাতে নিজের শরীর ঢাকার বৃথা চেষ্টা করতে গিয়ে আচমকা তৃষার খেয়াল হয় তার শরীরে পোশাক আছে। চোখ খুলে নিজের দিকে তাকাতেই খেয়াল করল শাড়িটা ঠিকঠাক থাকলেও ব্লাউজটা শুধু কাঁধ থেকে নেমে গেছে ঢিলেঢালা হওয়ার জন্য। নিজের বোকামিতে নিজেই লজ্জা পড়ে গেল সে। পাশে দাঁড়ানো রায়েফের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও লজ্জা লাগছে তার। লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে নীচু স্বরে তাকে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ভেসে এলো রায়েফের গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর।

"ওয়াল্লাহি, মনটা চাইছে এক চড়ে দাঁত ফেলে দিই সবকয়টা। ইমরাআতুন কালিলাতুল আদাব(বেয়াদব মহিলা)।"

তৃষা যতক্ষণে কিছু বলবে তার আগেই রায়েফ বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। রায়েফের পুরো কথা না শুনলেও শেষোক্ত কথাটুকু তৃষা শুনেছে। তবে তার ভাবার্থ উদ্ধার করতে পারেনি। তাই ভ্রু কুঁচকে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো ঠাঁয়।

সবেমাত্র গোসল সেরে ঘরে প্রবেশ করতেই বিছানার উপর রাখা তিনজোড়া প্যাকেটের উপর নজর পড়ে তৃষার। কৌতূহলবশত প্যাকেটগুলো খুলতেই সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ে তিনটে শাড়ি, সাথে ম্যাচিং করে ব্লাউজ আর অন্যান্য জিনিসপত্র। যেগুলো দেখে গাল লাল হয়ে ওঠে তৃষার। তাড়াহুড়ো করে সেগুলো আগের মতো প্যাকেটে রেখে বিছানার একপাশে সরিয়ে রাখতেই একদল মহিলা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েন ঘরে। সম্পর্কে তারা এই বাড়ির প্রতিবেশী। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে আগামাথা পরখ করেন তারা। নিজ ভাষায় আলাপ আলোচনা করেন। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসেন তো কেউ চোখে মুখে প্রশংসা নিয়ে তাকান। এতগুলো অচেনা মানুষের মাঝে অস্বস্তি হচ্ছে তৃষ্ণার। এদিকে ওদিক চোখ ফিরিয়ে খুব করে খুঁজতে লাগলো সে রায়েফকে। ঠিক তখনই হন্তদন্ত পায়ে ঘরে ঢুকলেন ইরিনা। কী যেন বললেন তাদের। এরপর একে একে সকলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। এতক্ষণে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো তৃষা। ইরিনা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন পরম মমতাময় ভঙ্গিতে। এরপর তার মুখোমুখি বসে বললেন,

"ওনারা সব আমাদের প্রতিবেশী। তোমাকে দেখবে বলে মুখিয়ে ছিল কাল থেকে। আমাদের এদিকে এমন সুন্দরী, ফর্সা ত্বকের মেয়ে তো নেই, তাই সবাই দেখার জন্য একপ্রকার উঁকিঝুঁকি মারছিল। রায়েফকে ভীষণ ভয় পায় এলাকার সবাই। তাই ও বাড়ি থেকে বের হতেই একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে সব তোমার উপর। তুমি কিছু মনে কোরো না। আর রায়েফকে এসব বিষয়ে কিছু বোলো না।"

তৃষা মাথা নাড়লো। পরপরই বলল,

"কিন্তু উনি বোধহয় জানতেন সবার আসার কথা।"

"ও সবই জানে। ওর চোখ ফাঁকি দেওয়া মুশকিল। শুধু ধরা দেয়না।"

সকালের পর থেকে একা একা সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে তৃষা। কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই ঘরে তেমন একটা কেউ আসতে চায়না। শুধু সময়মতো খবরটা পৌঁছে দিয়েছে, এরপর আসেনি আর কেউ। দুপুরের খাবারে মাছের কেমন যেন একটা পাতলা ঝোল আর ভাত ছিল। ভাতটা অনেকটা ক্ষীরের মতো। সাথে দুধের পায়েশ। পায়েশটুকু ছাড়া আর কিছু খেতে পারেনি তৃষা। এমন খাবার কোনোভাবেই মুখে রুচছে না তার। কাল রাতের খাবারটাও ভালোমতো খেতে পারেনি সে। ভিন্ন জায়গায় এসে নিজের মতো খাবার দাবার পাবে না, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখনকার খাবারগুলো যেন একেবারেই মুখে দেওয়ার মতো না। মুখে দিলেও পেটে চালান হওয়ার বদলে উঠে আসে উল্টে গলা দিয়ে বাইরে।

টানা একটা দিন ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো না হওয়ায় শরীর খানিকটা নেতিয়ে পড়েছে তৃষার। বাবা মায়ের কথা খুব করে মনে পড়ছে। তার এভাবে চলে আসাতে কেমন আছে তারা কিজানি? আলো আঁধারি বদ্ধ ঘরে ভাবনাগুলো তাকে ক্রমে বেদনার্ত করে তুলল আরও। ঘরের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসছে তার। একটু মুক্ত বাতাস, মুক্ত পরিবেশের খোঁজে আলতো করে পা ফেলে বের হলো ঘর থেকে।

সময়টা তখন বেশ রাত। ঘন কালো আঁধারি পরিবেশে বাড়ির মূল ফটক ছেড়ে বের হলো তৃষা। তাদের ঘরের পিছনের দিকে বেশ কিছু গাছ রয়েছে। আর তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা নদীও রয়েছে। জানালা থেকে ওই দূরের নদীটাকে দেখেছে সে। তবে এতদূর যাওয়ার সাহস হলো না তার একা একা। বাড়ির পিছনের দিকে এসে বসলো সে। জায়গাটা অন্ধকার। বেশ কিছু ফুলের গাছ আছে এখানে। চাঁদের আলো গাছের ডাল, পাতা ভেদ করে আছড়ে পড়েছে মাটিতে। সেখানে বাঁধাই করা একটা বাঁশের মাচা আছে। সেই মাচার উপর বসলো সে। এখন বেশ ভালো লাগছে। চাঁদের আলো, নাম না জানা ফুলের মিষ্টি সুবাস শীতল বাতাসের সাথে মিশে অল্প স্বল্প করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শরীর জুড়ে। শরীর, মন দুটোই বেশ ফুরফুরে।

আচমকা আশেপাশে কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে আঁতকে উঠল তৃষা। মনে মনে ভেবে নিলো রায়েফ এসেছে হয়তো তার সঙ্গীদের নিয়ে। তাই তাড়াহুড়ো করে মাচা থেকে নেমে দাঁড়াতেই আচমকা মাথায় ভারী কিছুর আঘাত পায়। আর সাথে সাথেই জ্ঞ্যান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। শেষ মুহূর্তে কানের কাছে ভেসে এলো ফিসফিসানি এক কণ্ঠস্বর,

"এই মাল ভাগাভাগি করে খাওয়ার।"

To be continued.....

বিঃ দ্রঃ ওয়াল্লাহি একটি আরবি শব্দ। যার অর্থ আল্লাহর কসম। এটা সোমালিয়ার মানুষজন কথায় কথায় ব্যবহার করে বেশি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন