#নিকাহ্(১২)
#ফিজা_সিদ্দিকী
দুপুরের শেষভাগ। দুপুরের আগে থেকেই মাঠে কী যেন কাজ চলছে রায়েফের। কিছু লোকজন এসেছে, তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলাপ চলছে তার। এত গুরুত্বপূর্ণ যে দুপুরের খাবারটুকু অব্দি খায়নি এখনো। তৃষা তাকে ডাক দিতে চেয়েছিল খাবারের জন্য, কিন্তু মাঠে প্রবেশের আগেই কেয়ারটেকার বৃদ্ধা লোকটা আটকে দেয় তাকে। এই মুহূর্তে ভেতরে প্রবেশ করা নিষেধ। তার জরুরী আলাপের মাঝে কারোর আগমন পছন্দ করে না রায়েফ। তাই কেয়ারটেকার লোকটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন পাহারায়। তৃষা অপমানিত বোধ করল। থমথমে মুখে অন্দরমহলে ফিরে এসে আর অপেক্ষা করল না রায়েফের। নিজের জন্য খাবার বেড়ে খেয়ে নিলো সাথে সাথে।
বাড়িতে শুধু তৃষা, নূর আর ইরিনা। নূরের সঙ্গে তৃষার বেশ ভাবসাব জমলেও ইরিনার সাথে সম্পর্কটা এখনও স্বাভাবিক হয়নি তার। বিষয়টা এমন নয় যে ইরিনা তাকে সেই সুযোগ দেননি, কিংবা তৃষা চেষ্টা করেনি। কিন্তু তারপরও দুজনের মাঝে সম্পর্কের সেই সুশ্রী বন্ধনটা গড়ে ওঠেনি এখনও। তৃষা বহু কষ্টে এই সম্পর্ক, এই বিয়েটাকে মান্যতা দিয়েছে। ইরিনাকেও সম্মান করে সে। কিন্তু মাতৃস্নেহে ভালোবাসে না। সেই গভীর বন্ধন হয়নি তাদের এখনও। ইরিনা এবং তৃষা দুজনেই স্বল্পভাষি, তাই হয়তো!
নূরের লম্বা চুলগুলো দুইদিকে বেণী করে দিয়ে তার মাথার কাছে বসে গল্প শোনাতে শোনাতে কখনও যে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি তৃষা। কোমর বাঁকিয়ে অতর্কিতে শুয়ে থাকার ফলে কোমরে বেশ ভালো রকম ব্যথা করছে এখন। কিছুদিন আগে এমনিতেও কোমরে ব্যথা পেয়েছিল সে, সেই ব্যাথাটাই আজকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে বেশ বেগ পোহাতে হলো তাকে। কোমরে হাত চেপে ধরে ধীরে পায়ে কলঘরের দিকে গেল সে। চোখে, মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিলো। গরমটাও আজ পড়েছে বেশ। তাই হাতের টাকি ভিজিয়ে উন্মুক্ত গলা, পিঠ মুছলো সেই ভেজা হাত দিয়ে। যার ফলে কালো ব্লাউজের গলার আর পিঠের দিকের অনেকটা অংশ ভিজে গেল সাথে সাথে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকতে গিয়ে তার কানে ভেসে এলো ইরিনার ঘর থেকে উচ্চস্বরে খিলখিল করে হাসির শব্দ। কৌতূহল দমাতে না পেরে তৃষা উঁকি দিলো তার ঘরে।
ইরিনার সামনে মুখোমুখি বসে কালো রঙের গোল জামা পরা একটা মেয়ে। গায়ের রং কালো হলেও ত্বকে উজ্জ্বলতা বেশ। সুডৌল দেহের অবয়ব। পরণের পোশাক এতটাই টাইট ফিটিং, শরীরের সাথে খাপটে ধরেছে যেন। কোমরের মসৃণ বাঁকটুকু জামার উপর থেকেই পুরোদস্তুর পরিমাপ করা যায়।
ইরিনার হাত নিজের দুইহাতের মুঠোয় ভরে কী যেন বলে যাচ্ছে সে। এরপর নিজেও হেসে উঠছে হো হো করে। সাথে ইরিনাও হাসছে তার সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে। শাশুড়িকে এর আগে এভাবে হাসতে দেখেনি তৃষা। এই দৃশ্য দেখে তার যেমন ভালো লাগছে, তেমন কৌতূহল হচ্ছে মেয়েটাকে জানার। এই বাড়ির সঙ্গে তার বেশ গভীর সম্পর্ক বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু কেমন সম্পর্ক? কিসের ভিত্তিতে?
"রায়েফ কোথায়, মামনি?"
"মাঠে আছে। কী যেন জরুরী কাজ করবার চলছে ওখানে ওর।"
চঞ্চলা মেয়েটা সাথে সাথে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ইরিনার হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেয়ে হাসিমুখে বের হতে গেল ঘর থেকে সাথে সাথে। অমনি পিছন থেকে ডাক ছাড়লেন ইরিনা।
"ওয়াজিফা, শোন, সুলায়ইমান আছে কিন্তু ওদের সাথে!"
ওয়াজিফা সাথে সাথে মুখ ভেংচি কাটলো। গলার স্বরে তেজ ঢেলে বলল,
"তোমার ছেলের একটা লয়াল চামচা ওটা। লেজ দোলাতে দোলাতে সব জায়গায় উপস্থিত থাকে সে।"
মেয়েটা ঘর থেকে বের হচ্ছে বুঝে দরজার আড়াল থেকে সরে এলো তৃষা। কিন্তু খুব বেশিদূর যেতে পারেনি, আচমকা মুখোমুখি হলো তার। ওয়াজিফা কেমন যেন দৃষ্টিতে আগাগোড়া দেখলো তাকে। এরপর মিহি কন্ঠে বলল,
"তুমিই রায়েফের সেই শো পিস?"
মেয়েটার বাচনভঙ্গি বড্ডো উগ্র ছিল নাকি কিজানি! তৃষার কেমন যেন লাগলো তাকে। বেপরোয়া, উগ্র, আগ্রাসী এক নারী চরিত্র। প্রথম দেখায় মোটেও ভালো লাগলো তাকে তৃষার। তবুও ব্যাপারখানা অগ্রাহ্য করে নরম হাসলো সে। আন্তরিকতার সুরে বলল,
"কখন এসেছেন? আসুন ভেতরে, মুরগীর ঝোল দিয়ে অল্প কিছু ভাত দিই!"
ওয়াজিফা আপাদমস্তক তাকাল তার দিকে। যেন খুঁটিতে খুঁটিয়ে দেখছে তাকে। এরপর ঠোঁট এলিয়ে মৃদু হেসে বড্ড ব্যঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল,
"এই বাড়ির ভাত খেতে তোমার পারমিশন লাগবে না আমার। আমার অধিকার এখানে যতটা, ততটা তোমারও না।"
এরপর হনহন করে বেরিয়ে গেল সে অন্দরমহল থেকে। তৃষা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। মানে লেগেছে তার। মুখটা থমথমে, চোখদুটো ভেজা। শাশুড়িকে এগিয়ে আসতে দেখে অতি সন্তর্পণে চোখের পানি লুকালো সে।
তৃষাকে এইসময় বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইরিনা ব্যস্ত হলেন। এগিয়ে এসে নরম কন্ঠে বললেন,
"কিছু লাগবে তোমার, মা?"
এই বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই প্রতি কথায় মা বলেই সম্বোধন করেন ইরিনা তাকে। ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে তৃষার। আন্তরিকতার সুর পায়। মৃদু হেসে মাথা নেড়ে কিছু হয়নি বোঝালো। এরপর ইরিনা চলে যেতেই সে পা বাড়ালো বাড়ির বামপাশে অবস্থিত মাঠের দিকে। যেখানে বিয়ের পর তার প্রথম মুখ দেখার অনুষ্ঠান হয়েছিল।
ছোটখাটো জায়গার মাঝে অবস্থিত এই মাঠের চারপাশে উঁচু পাঁচিল তোলা। পাঁচিলের গা ঘেঁষে কিছু সবজি গাছ লাগানো। মাচা করে লাউ, কুমড়ো আর শসার গাছ। একপাশে বেশ বড় একটা পেয়ারা গাছও আছে। যার বেশ কয়েকটা ডাল পাঁচিলের ওপাশে বিস্তৃত। পুরো মাঠ জুড়ে ছাঁটাই করা মাঝারি আকারের নরম ঘাসের পরদ। রোজ যেন কেউ যত্ন করে এগুলো পরিচর্যা করে। ছাঁটাই করে সমান করে রাখে। মাঠের মাঝবরাবর একটা বিশাল টেবিল পেতে রাখা। লোহার পাটাতনের উপর মোটা কাঁচ দিয়ে রাখা টেবিলটার উপর। তার চারপাশ ঘিরে রাখা বেশ কয়েকটা চেয়ার। ডানপাশের মাঠটা যেমন খোলামেলা, এদিকটা আবার অন্যরকম। সুন্দর, মনোরম। এটা বোধহয় রায়েফের কাজের জায়গা।
তৃষা দ্বিতীয়বারের মতো পা বাড়ালো ওদিকে। প্রবেশদ্বার থেকে দাঁড়িয়ে দেখল একটা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে রায়েফ। তার সামনের চারটা চেয়ারে বসে আরও চারজন যুবক। হাতে তার কী একটা কাগজ। যেটাতে নজর বুলাচ্ছে সে ক্ষণে ক্ষণে আর কী যেন বলছে তাদের। কথার তালে তালে হাত নাড়াচ্ছে, তো কখনও ভ্রু কুঁচকে ফেলছে। আর বাকিরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে সেইসব। মাঝে মাঝে কিছু বলছেও তারা।
এরপরের দৃশ্যটা দেখতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল তৃষা। কি অবলীলায় অজ্ঞাত মেয়েটা গিয়ে বসেছে রায়েফের পাশের চেয়ারটায়। এরপর কী যেন বলছে বাকিদের সাথে। মুখ থেকে হাসি যেন সরছে না তার। বাকিরাও হাসছে তার সাথে সমানতালে। তবে রায়েফের হাবভাব বরাবরের মতোই গম্ভীর। কী বলছে শোনা যাচ্ছে না। তৃষা আরও বেশি অবাক হলো ভেতরে ঢুকতে গিয়ে। প্রথমবারের মতো এবারও কেয়ারটেকার চাচা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিলো না। বরং মাথা নীচু করে হাত এগিয়ে ধরলো তার সামনে। অপরাধী কন্ঠে বলল,
"আমাকে মাফ করবেন বিবি। আপনাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়ার অনুমতি নেই আমার।"
তৃষা আহত, হতবিহ্বল চোখে একপলক তাকালো সামনে। এরপর তাকালো চাচার দিকে। কান্নাটা গিলে থেমে থেমে বলল,
"আমি ভেতরে যেতে পারব না, কিন্তু ওই মেয়েটা পারবে?"
চাচা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। দৃষ্টি এখনও আগের মতো নত তার। আগের মতো করে বললেন,
"বেটি তো সাহেবের খাস আছে। এ বাড়ির খাস উনি। ওনাকে আটকানোর ক্ষমতা নেই আমাদের।"
তৃষার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল সাথে সাথে। মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগে মেয়েটার বলা কথাগুলো।
"আমার অধিকার এখানে যতটা, ততটা তোমারও না।"
কথাগুলো তবে একেবারে সত্য! কোনো মিথ্যা, কোনো বানোয়াট নেই এর মাঝে। রায়েফের স্ত্রী হয়েও তার যে অধিকার নেই, যে ক্ষমতা নেই, মেয়েটার আছে সেটা। তার স্বামী, তার সংসারে একজন বহিরাগতর অধিকার বেশি! এই সত্য হজম করতে বেশ বেগ পোহাতে হয় তাকে।
আসলে কে সে? কী তার অধিকার? রায়েফের জীবনে তার একতিয়ার কতটুকু? এসব জানতে হবে তাকে। জানতে হবে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে। জানতে হবে মেয়েটা কে? কী সম্পর্ক তার এই বাড়ির সাথে। কী এমন সম্পর্ক তাদের, যে এখানে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ,অথচ সেই মেয়েটা অবলীলায় বিচরণ করতে পারে।
চোখের কোল ঘেঁষে গড়িয়ে পড়া পানিটুকু সন্তর্পণে মুছে ফেলল তৃষা। এরপর শাড়ির আঁচলটা ভালো করে কাঁধে টেনে আবারও পা বাড়ালো ভেতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এইবার চাচার কোনো বারন, কোনো কথা মানলো না সে। আর রায়েফ কায়রেলের বউয়ের গায়ে হাত দেবে, তার শরীর স্পর্শ করবে, এমন স্পর্ধা এ তল্লাটে কারোর নেই। তাই না চাইতেও চাচা তাকে বাধা দিতে পারলেন না। হনহন করে ভেতরে প্রবেশ করলো তৃষা।
"সাহেব, সাহেব... বিবি কথা শোনেনা..."
অশান্ত কদমে এগিয়ে আসা তৃষার পিছনে দৌড়ে আসছেন কেয়ারটেকার চাচা। তার কণ্ঠে ধ্যানভঙ্গ হলো সকলের। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো রায়েফ। আঙুলের ইশারায় চাচাকে বিদায় জানালো। এরপর নিজে এগিয়ে এলো তৃষার কাছে।
শক্তপোক্ত সুঠামদেহী পুরুষটাকে নিজ সত্তার একদম কাছে দেখে চোখ তুলে তাকালো তৃষা। চোখ দুটোতে জল টলমল করছে তার তখনও। রায়েফ তার দুই বাহু পিছনে বেঁধে খানিকটা ঝুঁকলো তার দিকে। মৃদু কন্ঠে আওড়ালো,
"নিষেধ করা হয়েছিল। এখানে আসা উচিৎ হয়নি আপনার।"
তৃষা চোখ নামিয়ে ফেলল। সাথে সাথে টলটল করা চোখের জলগুলো নরম গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। মনে মনে কত প্রশ্ন সাজিয়ে এখানে এসেছিল সে। অথচ তার একটাও মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে না তার এখন। শুধু কান্না পাচ্ছে। মানুষটার বুকের মাঝে ঝাঁপিয়ে দাপিয়ে কান্না করতে করতে অভিযোগ করতে ইচ্ছে করছে। অথচ এ যে অসম্ভব ব্যাপার!
"সব শাসন, বারণ আমাকেই?"
কান্না গিলে কোনোক্রমে প্রশ্নটা করল তৃষা। রায়েফ সাথে সাথে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। মুখ দিয়ে মৃদু স্বরে উচ্চারিত হলো,
"হুম"
"এতো অপ্রয়োজনীয় আমি?"
ঘাড়টা সামান্য বামপাশে হেলিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ করতে করতে তৃষার ঠোঁট মৃদু কাঁপলো। কথাখানা শেষ করে দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে। কান্না তার আবেগঘন কান্না আটকানোর তীব্র চেষ্টা চালালো সে। মনে মনে পন করলো, এই লোকটার সামনে কোনোমতে চোখের পানি ফেলবে না সে। ঠিক তখনই রায়েফ আরও খানিকটা ঝুঁকলো। লম্বা চওড়া তাগড়া যুবককে তৃষার কাছাকাছি আসতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। মাঝের দূরত্বগুলো পেরিয়ে রায়েফ তৃষার কানের একদম কাছে ঝুঁকলো। এরপর ধীর স্বরে বলল,
"জহুরী জানে, সোনা দেখানো যায়; হীরা আগলে রাখতে হয়।"
রায়েফের প্রতিটা কথার সাথে নিঃসৃত উষ্ণ বাতাস তৃষার উন্মুক্ত ঘাড়ে এসে বাড়ি খেল। শিরশির করে উঠল তার সর্বাঙ্গ। আবেশে ঘাড় বেঁকে গেল সহসাই। ছুঁয়ে না দিয়েও যেন কীভাবে ছুঁয়ে দিলো তাকে লোকটা। লজ্জায় মিইয়ে চোখ বুঁজে ফেলল সে।
খানিকটা সময় অতিবাহিত হলো। রায়েফ মাথা তুলে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। এরপর ইশারায় বোঝালো তাকে ভেতরে যেতে।
তৃষা তার ওই ভারিক্কি কথার অর্থ বুঝল কিনা কে জানে! ফিরে যেতে গিয়েও পুনরায় প্রশ্ন করে বসল সে।
"আমাকে সবার সামনে আসতে বাধা দেন কেন?"
রায়েফ শান্ত ভঙ্গিতে তার চোখে চোখ রাখলো। এরপর বলল,
"এলাকার সব পুরুষের চোখ উপড়ে ফেলতে আমার ভীষণ মায়া হয়।"
তার কণ্ঠ শীতল। দৃষ্টি স্থির। তৃষা পা বাড়ালো সেখান থেকে বিদায় নিতে। বুকের মাঝে অদ্ভুত এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তার। মানুষটার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সবেমাত্র কয়েকপা বাড়িয়েছে সে। আচমকা তার পাশে অপর একজনের উপস্থিতি টের পেল সে। মৃদু হাসি লেপ্টে তার ঠোঁটের কোণে। যেন তাকে এখান থেকে ফিরে যেতে দেখে ভীষণ মজা পাচ্ছে সে। অতঃপর তৃষার গা ঘেঁষে টহল দিতে দিতে বলল,
"রায়েফের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া যোদ্ধা আমি, আমার সাথে তোমার তুলনা হয় না।"
অজ্ঞাত মেয়েটির ঔদ্ধত্য দেখে চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকালো তৃষা। এতক্ষণ তার চওড়া পিঠ দিয়ে ঢাল হয়ে তাকে ঘিরে রেখেছিল রায়েফ। এখন আঙুল উঁচিয়ে দৃষ্টি নত রাখার নির্দেশ দিলো বাকিদের। মুহূর্তের মধ্যেই মাথা নামিয়ে ফেলল চারজন যুবক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটার ভীষণ অনুগত তারা।
তৃষাকে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো রায়েফ। চোখাচোখি হতেই তৃষার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। ধীর ভঙ্গিতে হাত তুলে স্বামীর বুকের বামপাশে রাখল সে। অতঃপর অজ্ঞাত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ ধারালো স্বরে বলল,
"যার উপস্থিতিতে সকলে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে, তাকে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে হয় না।"
রায়েফ চমকালো। থমকালো। তৃষার কণ্ঠের সুর অচেনা লাগলো তার। মুহূর্তেই তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে হাসলো সে। হাসলো! রায়েফ কায়রেলের মতো অনুভূতিহীন মানুষ হাসলো তার স্ত্রীর অধিকারবোধ ছিনিয়ে নেওয়া দেখে। নারী চরিত্র এমনই বোধহয়। স্বামীর অধিকারে ন্যূনতম আঁচ আসলে তৃষার মতো বিড়ালও বাঘিনীর মতো গর্জে উঠতে পারে। ভাবনার মাঝে দ্বিতীয় কিছু ভাবলো সে। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো সূক্ষ্ম হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটজুড়ে।
"এরিদের অবস্থা খুব একটা ভালো না। হাতের হাড়গোড় ভেঙেছে। শরীরের ক্ষতগুলো মাংস ভেদ করে হাড় অব্দি গিয়ে ঠেকেছে। আয়দারুস আলী বেজায় ক্ষেপে আছে তোমার উপর, রায়েফ।"
ওয়াজিফার কথায় ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ না করে রায়েফ নিজের মতো করে আওড়ালো,
"বেঁচে আছে এই অনেক। ওর বাপকে বলবি নিজের জন্ম দেওয়া কুত্তাকে বেল্ট পরিয়ে বেঁধে রাখতে। আর একবার আমার সামনে পড়লে দুই পা ধরে চিরে দেব একদম।"
রায়েফের দানবীয় রূপ সম্পর্কে অভ্যস্ত হলেও এমন ঠান্ডা আচরণের হুমকি দিতে তাকে এর আগে কখনও দেখেনি ওয়াজিফা। হতবাক হয়ে তার দিকে তাকালো সে। এরপর রায়েফের কাঁধে আলতো স্পর্শ করে প্রশ্ন করল,
"কী করেছিল এরিদ?"
রায়েফ তৎক্ষনাৎ তার কাঁধে রাখা হাতের দিকে তাকালো। চোখদুটো ঠান্ডা, নিস্তেজ। কী যেন ছিল সেই চোখে ওয়াজিফা দ্রুত দুই কদম পিছিয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ ভেসে এলো তার মৃদু কণ্ঠস্বর।
"এটাই যেন শেষবার হয়।"
রায়েফ চলে গেছে। মাঠে বিছিয়ে থাকা ঘাসের উপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে সুলায়মান। ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে বেসুরে গলায় গেয়ে উঠলো সে,
"বন্ধু যখন বউ লইয়া আমার বাড়ীর সামনে দিয়া
রঙ কইরা হাইট্টা যায়, ফাইট্টা যায়
বুকটা ফাইট্টা যায়
ফাইট্টা যায় বুকটা ফাইট্টা যায়।"
রজার তৎক্ষনাৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। ছেলেটা আফ্রিকান। কুচকুচে কালো, সুঠাম বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী সে। একটা যে কোনো শক্তপোক্ত ছেলেকে এক হাতে তুলে আছাড় দিতে পারে সে। এদিকে সুলায়মান বাংলাদেশী। রায়েফের মতো সেও বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত। কিন্তু রজার পুরোপুরি বাংলা বোঝে না। আর এসব আঞ্চলিক ভাষা বোঝা তো তার জন্য আরও অসাধ্য ব্যাপার। তাই ফ্যালফ্যাল করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সে বাকিদের দিকে। এদিকে সুলায়মানের অবস্থা দেখে হেঁসে কুটিকুটি বাকিরা।
তাদের দিকে একপলক তাকিয়ে আচমকা রজার সামনের দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
"সর্দার!"
সাথে সাথে গান থেকে যায় সুলায়মানের। শোয়া থেকে তড়িৎ গতিতে উঠে ভয়ার্ত চোখে সামনের দিকে তাকাতেই দেখে কেউ নেই সেখানে। আর সাথে সাথে আর একদফা হাসির রোল পড়ে যায় তাদের।
#চলবে....
২০০০+ শব্দের পর্ব দিলাম আজ কিন্তু! সবাই রেসপন্স করবেন। ফলো করুন আমার দ্বিতীয় পেজ ফিজা সিদ্দিকী- Fiza Siddique
আপনাদের উপর অনেক অভিযোগ আছে আমার। আপনারা গল্প পড়ে চলে যান। না করেন রিয়েক্ট না কমেন্ট। এভাবে আমার পেজে সমস্যা হচ্ছে উল্টো। ফেসবুক ভেবে নিচ্ছে আমার গল্প কেউ পছন্দ করছে না। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি বাকিদের গল্প নিয়ে আলাপ, আলোচনা হয়, কিন্তু আমার গল্প নিয়ে কেউ কোথাও কথা বলে না। এভাবে লেখার আগ্রহ আসে আর?
যাইহোক, নেক্সট পর্ব পরশু পাবেন। তার আগে 800 রিয়েক্ট আর 1000 কমেন্ট চাই আমার এই পর্বে।