#নিকাহ্(১৭)
#ফিজা_সিদ্দিকী
ভোর রাতের দিকে জ্ঞান ফিরেছে ইরিনার। পুরো রাত চিন্তায় ছটফট করেছে রায়েফ। কখনও হাত, পা, গলা, ঘাড় মুছিয়ে দিচ্ছে ভেজা তোয়ালে দিয়ে, তো কখনও মাথায় পানি ঢালছে। গোটা রাতটা এভাবেই কেটেছে তার। চোখ মুখের অবস্থা থমথমে।
তৃষা মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে আড়াল থেকে তাদের দেখেছে। কেন যেন তাদের মাঝে যেতে মন সায় দেয়নি তার। মা ছেলের এই সুন্দর, যত্নশীল মুহুর্তগুলো নষ্ট করতে চায়নি সে কোনোভাবেই। তাই আড়ালেই ছিল। আর সবশেষে এটুকু বুঝতে পারল যে, রায়েফের কাছে তার মায়ের ভূমিকা কতটুকু। মাকে সে কতটুকু ভালোবাসে। হয়তো দুনিয়ার সবকিছু একদিকে রেখে আর একদিকে তার মাকে রাখা হয়, তবে সে মাকেই বেছে নেবে নির্দিধায়। দুজনের মাঝের এই অদ্ভুত সুন্দর ভালোবাসা দেখে তার নিজের বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে ভীষণ। দরজার আড়াল থেকে সরে এলো সে তৎক্ষণাৎ। চোখ ভিজে উঠেছে তার।
______________
বিগত দুইদিনে ইরিনা বিছানা ছেড়ে ওঠার অবস্থায় ছিল না। রায়েফ প্রায় সর্বক্ষণ তার পাশে থেকেছে। বাচ্চাদের মতো যত্ন নিয়েছে। শাশুড়ির এমন অসুস্থতা দেখা না দিলে স্বামীর এই যত্নশীল রূপটা তৃষার কাছে অজানাই থেকে যেত বোধহয়।
লোকটাকে বরাবরই গম্ভীর, স্বল্পভাষী আর শান্ত স্বভাবের। তবে তার যত্নশীল স্বভাবের নির্দশন আগে খানিকটা পেলেও এতটা গভীরভাবে টের পায়নি। সেই সাথে এও টের পেল যে, নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে লোকটা মস্ত পারদর্শী। এতদিনে মায়ের সাথে তার কতিপয় কথাবার্তা আর অনুগত সন্তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখেছিল শুধু। এই ভিন্ন রূপে তাকে নতুন করে জানার আগ্রহ বাড়ল তার। অদ্ভুত এক অনুভূতির জোয়ারে ভাসলো সে। মনের মণিকোঠা থেকে কেউ বলে উঠল,
"ভালোবাসতে জানে সে। তার ভালোবাসা পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।"
অসুস্থতার দিনগুলোতে শাশুড়িকে যত্ন আত্তি তৃষাও কম করেনি। সেই সাথে ছোটো ননদকে সামলানো, তাকে ব্যস্ত রাখা, হাসিখুশি রাখা। মোট কথা দুদিনে এ সংসারের পুরোদস্তুর গৃহিণী হয়ে উঠেছে সে। সেইসাথে শাশুড়ির সাথে তার সম্পর্কের উন্নতিও হয়েছে খানিকটা।
খয়েরি শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে রান্নাঘরে সবজি কাটাকুটি করছে তৃষা। একদিকে চুলায় বসানো শাশুড়ির জন্য গরম গরম চিকেন স্যুপ। অন্যদিকে দুপুরের রান্নার জন্য সবজি কাটছে সে। একহাতে দুদিকে সামলাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা। তার উপর খোঁপা করা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠে ছড়িয়ে অনেকখানি। মুখের উপর এসে পড়েছেও ছোটো ছোটো একগাছি চুল। হাত দুটো নোংরা হওয়ায় চুলগুলো গুছিয়ে নিতে পারছে না সে কোনোভাবেই। অতঃপর সেভাবেই তাড়াহুড়ো করে কাজে ব্যস্ত হলো।
কিছুক্ষণের জন্য বাহিরে গিয়েছিল রায়েফ। ফিরে এসে অজানা কারণেই এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে কাউকে খুঁজলো যেন। অতঃপর দিশা না পেয়ে ঘর ছেড়ে বের হতে যাবে এমন সময় রান্নাঘর থেকে খুটখাট কিছু একটার শব্দ ভেসে এলো তার কানে। সেদিকে পা বাড়াতে গিয়ে কী মনে করে যেন থামলো। টেবিলের উপর রাখা পানির বোতলটা হাতে নিয়ে পুরোটা পানি জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলো। অতঃপর খালি বোতল হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দরজায় পা রাখতেই কদম আপনাআপনি থেমে গেল তার।
হাত উঁচু করে কপালের ওপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে নিল তৃষা। সেই সঙ্গে কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ির আঁচল খানিকটা আলগা হয়ে গেল। অন্যমনস্ক মেয়েটা টেরই পেল না কোমরের একপাশের কোমল বাঁক অনাবৃত হয়ে উঠেছে।
উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকে মুক্তদানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। রায়েফ যেন মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। দৃষ্টি সরিয়ে শুকনো একটা ঢোক গলাধঃকরণ করে কলসি থেকে পানি ঢালতে লাগলো।
আগুনের তাপে তরতর করে ঘামছে শরীর। তৃষা কোনোমতে হাত দিয়ে পিঠে পড়ে থাকা চুলগুলো সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু পারল না। ঠিক তখনই এলোমেলো খোঁপায় একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের উপস্থিতি টের পেতেই চমকে উঠলো। পিছনে না ফিরেই মানুষটাকে চিনে ফেলতে খুব একটা বেগ পোহাতে হলো না তাকে। পুরুষালী হাতের অভিনব কৌশলে চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপায় জড়িয়ে কী যেন একটা গেঁথে দিলো। অতঃপর হনহন করে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর ছেড়ে।
___________________
অন্দরমহল থেকে পা টিপে টিপে বের হলো নূর। বের হওয়ার আগে চারদিকে তাকিয়ে ভালো করে খেয়াল করলো কেউ দেখছে কিনা তাকে। অতঃপর দুইহাতে আলতো করে তালি দিয়ে উল্লাস করতে করতে খোলা মাঠে এসে দাঁড়ালো। অশ্বশালার দিকে পা বাড়াবে, ঠিক এমন সময় পথ আটকে দাঁড়ালো লম্বা চওড়া জমকালো একটা মানুষ। মাথা নীচু, ধীর তার কন্ঠ।
"আপনার এদিকে আসা বারন। আপনি ফিরে যান।"
নূবের ছোটো ছোটো আঁখি যুগলের মাঝে ভাঁজ পড়ল। এই মানুষটাকে দেখলে তার ওই জীবজন্তুর বইয়ের মাঝে দেখা ভাল্লুকের কথা মনে পড়ে যায়। মানুষটাকে একান্তে ভাল্লুক বলেও ডাকে সে। তবে লোকটার সাথে তার কথা হয়নি এভাবে কখনও। এতদিন শুধু জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে বড় ভাইয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কীসব বকবক করতে দেখত। কখনও আবার দরজার বাইরে একেবারে সটান খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে। এর বাইরে মুখোমুখি দেখা এই প্রথম।
"ওদিকে যাওয়ার অনুমতি নেই আপনার। আপনি বাড়ির মধ্যে চলুন।"
হাত উঁচিয়ে অন্দরমহলের দিকে দেখিয়ে নূরকে বাড়ির দিকে পাঠাতে চাইলো রজার। কিন্তু বিধিবাম। মেয়েটা সাথে সাথে মাটিতে বসে পড়লো। এক মুহূর্তে দেরি না করে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে শুরু করলো।
রজার হতভম্বের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ। তারপর কেমন যেন উশখুশ করে খানিকটা দূরত্ব রেখে হাঁটু গেঁড়ে বসলো তার সামনে। নিজের বেজার কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নরম করার চেষ্টা করে বলল,
"দয়া করে এভাবে কান্নাকাটি করবেন না। চুপ করুন।"
অথচ তার ওই অত্যধিক গম্ভীর কণ্ঠের নরম স্বরও যথেষ্ট ভয় পাইয়ে দিলো নূরকে। মনে হলো লোকটা যেন বকাঝকা করছে তাকে। অতঃপর কান্নার গতি বেড়ে তার দ্বিগুণ হলো।
রজার বেজার মুখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। পরনে যার গোড়ালি অব্দি ঢাকা ঘের দেওয়া একটা ফ্রক। মেয়েটাকে এই মুহূর্তে দেখলে যে কেউ ভাববে 10 বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে সে। অথচ কাগজে কলমে বয়স তার সতেরো। মানসিকভাবে অবশ্য সে 10, 12 বছরের বাচ্চাদের মতোই।
নিজের বয়সের মানুষদের মতো স্বাভাবিক না নূর। জন্মগতভাবেই এই ত্রুটি ছিল তার। জন্মের দুই বছর পর থেকে আধো আধো কথা বলা শুরু করেছে সে। অতঃপর বয়সের সাথে সাথে তার এই ত্রুটি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। এজন্য ইরিনা আর রায়েফ দুজনেই বেশ চোখে চোখে রাখেন তাকে। এই চার দেওয়ালের গণ্ডির বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার। ছোটবেলায় আর পাঁচটা বাচ্চার সাথে খেলতে গিয়ে একবার বেশ হেনস্তার স্বীকার হয়েছিল। এরপর থেকেই রায়েফ তাকে আশেপাশের মানুষের সাথে মিশতে দেয়নি আর। নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারে সে, তবে সেটা শুধুমাত্র ঘরের এই চার দেওয়ালের মধ্যে।
তাই আজ দুপুরে যখন সবাই ঘুমাচ্ছিল। বড্ড সাহস করে চুপিচুপি বের হয়েছে সে। উদ্দেশ্য বড়ো ভাইয়ের প্রিয় ওই কালো ঘোড়াটা দেখা। নূরের অবশ্য সাদা রঙের ঘোড়াটাকে বেশি ভালোলাগে। কিন্তু সাদা ঘোড়াটা বেশি অশান্ত। কেমন করে যেন সামনের পা দুইটা তুলে ভাইয়ের বুকের উপর রাখে মাঝেমধ্যে। দেখলেই ভয় লাগে তার।
"আপনি কান্না করছেন কেন? কাঁদবেন না। দয়া করে কাঁদবেন না। আজ ফিরে যান। আমি আপনাকে অন্যদিন ঘোড়া দেখাব।"
"সত্যি দেখাবে?"
কান্না ভুলে আচমকা চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল নূরের। তা দেখে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো রজার।
"আর কী করবে?"
"আপনি এখন চুপচাপ ভেতরে চলে গেলে, আপনি যা বলবেন তাই শুনবো।"
"সত্যি তো?"
মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়তে নাড়তে রজার ঘাসের উপর বসে পড়ল। খানিকটা ইতস্তত করে অবশেষে হাত বাড়িয়ে বাচ্চা মেয়েটার চোখের পানি আলতো করে মুছে দিলো। তৎক্ষনাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে ভোঁ দৌড় নূরের। যাওয়ার আগে রজারের দিকে একপলক ফিরে দুই হাত কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ভেংচি কেটে জোরালো কন্ঠে বলে,
"তুমি একটা ভাল্লুক।"
তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মৃদু হাসলো রজার।
________________________
রাত আটটা। রায়েফের ফিরতে রাত হবে আজ। দলের সাথে কাল জাহাজ নিয়ে বের হবে সে। তাই পূর্বপরিকল্পনা হিসেবে কিছু কাজ রয়েছে। সেসব সামলাতে সামলাতেই আজ দেরী হবে তার।
দুপুরে তৈরি হয়ে বের হওয়ার সময় রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথাখানা জানিয়েছিল সে তৃষাকে।
খাওয়া সময় ইরিনা রায়েফের খোঁজ করছিল। তখনই ব্যাপারটা শাশুড়িকে জানিয়েছিল তৃষা। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক চললেও আচমকা এই সন্ধ্যারাতে শাশুড়ির ঘরে ডাক পড়ে তার। প্রথমে সে ভেবেছিল শাশুড়ির শরীরটা আবার হয়তো খারাপ করেছে। তাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে ঘরে আসতেই সুস্থ সবল তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আশ্বস্ত হলো তৃষা।
ইরিনা নিজের ঘরের আলমারি থেকে থেকে একটা প্যাকেট বের করে তৃষার হাতে দিলেন। এরপর তার হাত ধরে বিছানায় বসলেন। নূর তখন নিজের মতো রং পেন্সিল নিয়ে কাগজে আঁকিবুকি করতে ব্যস্ত। তিনি একপলক নূরের দিকে তাকিয়ে এরপর পুরোপুরি তৃষার দিকে মনোযোগী হলেন। মমতাময়ী কন্ঠে বললেন,
"তোমাদের সম্পর্কের বোঝাপড়াটা তোমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। এ বিষয়ে আমি কিংবা বাইরের কারোর কিছু বলা উচিত হবে না। তবে আজ আমি তোমাকে কিছু কথা বলব, যেগুলো তোমার জানা দরকার।"
খানিকটা থামলেন তিনি। অতঃপর লম্বা একটা নিঃশ্বাস টেনে বলা শুরু করলেন,
"ছেলেটা আমার বড্ড রাগী, অতিরিক্ত চাপা স্বভাবের। সম্পর্কের প্রতি তার অনীহা ভীষণ। এতে অবশ্য তাকে দোষ দেওয়া যায়না। ছোটো থেকেই নিজের জীবনের সাথে জড়িত প্রতিটা সম্পর্ককে সে শুধু ছিন্ন হতেই দেখেছে। সম্পর্ক, ভালোবাসা এসবের প্রতি মানুষের আসক্তি জন্ম হয় যে বয়সে, সেই বয়সে ছেলেটা জীবনের ভয়াবহ কিছু সত্যর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। জন্মের পর থেকে আপনজন বলে জেনে আসা মানুষগুলোকে মুহূর্তেই পর হতে দেখেছে। দেখেছে নৃশংসতা, নিস্পৃহতা। অনুভূতি প্রকাশ কীভাবে করতে হয় কেউ হাতে ধরে শেখায়নি ওকে। শিখিয়েছে কীভাবে অস্ত্র ধরতে হয়। কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। কোন পন্থায় শত্রুকে কাবু করতে হবে, সে বড্ড ভালো জানে। অথচ মনের মানুষকে মুগ্ধ করার উপায় তার জানা নেই। সে জানে না কীভাবে ভালোবাসতে হয়, জানে না ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করতে হয়। কারন ভালোবাসার মানুষ বলতে হাতে গোনা এক, দুইজনই ছিল তার জীবনে।
জানো তৃষা, ওর বুকের মধ্যে অনেকখানি আগুন আছে। অনেক ক্ষোভ আছে। অনেক না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে। যা কেউ কখনও জানে না। অথচ আমি টের পাই। ছেলেটা আমার পুরোপুরি জীবনবিমুখ হয়ে গিয়েছিল। আর এরপরই তোমার সাথে দেখা। তুমি এলে তার জীবনে।
আমি অস্বীকার করব না, ও তোমাকে দয়া দেখিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে। ওর জীবনের খুব প্রিয় একজন ঠিক তোমার মতো পরিস্থিতিতে ছিল। সেই ট্রমা থেকেই তোমাকে এমন অবস্থায় দেখে কোনোকিছু না ভেবে বাঁচিয়েছে তোমায়। তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে যা যা করা লেগেছে, করেছে। যার পরিণতি তোমাদের বিয়ে।
ও তোমাকে ভালোবেসে এই ঘরে নিয়ে আসেনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই অনুভূতির নাম বদলেছে। এখন আর তোমাকে দয়া করে না ও। তোমার জন্য ভাবে। তোমার যন্ত্রণায় ওর চোখে বিষাদের পরদ পড়ে। আমরা দুই প্রাণী ছাড়া তুমি সেই তৃতীয় ব্যক্তি, যার চিন্তায় ছটফট করে ছেলেটা। তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, কিন্তু আমার ছেলেটা তোমাকে ভালোবাসে।"
একটানা অনেকখানি কথা বলে থামলেন ইরিনা। গলা শুকিয়ে এসেছে তার। সদ্য অসুস্থতা থেকে উঠে এত কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। তৃষা বুঝল ব্যাপারটা। তাই গ্লাসে পানি ঢেলে সেটা এগিয়ে দিলো তার দিকে।
ইরিনা ওই গ্লাস ধরার মুহূর্তেটুকু তৃষার হাত ছাড়লেন। এরপর আবারও আগের মতো করে তার ডানহাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় পাকড়াও করে ধিমী কন্ঠে বললেন,
"বাকি চেষ্টাটুকু এখন তোমাকে করতে হবে। আমি তোমাকে জোর করব না। যদি তোমার মনে হয় যে, এই সংসারটা বাঁচিয়ে রাখতে চাও তুমি, তবে তোমাকে আগাতে হবে। সম্পর্কের খুঁটিটা শক্ত হাতে ধরতে হবে। আর যদি এই অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কতে তুমি অখুশি থাকো, সবকিছু ছিন্ন করে নিজের জীবনে ফিরতে চাও, তবে আমি তোমাকে সাহায্য করব।"
তৃষা কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ শাশুড়ির বলা কথাটুকু শুনলো। এরপর অনেকটা সময় তারা সেভাবেই বসে রইলো। কেউ কোনো কথা বলল না। অবশেষে ইরিনা তৃষার হাত ছাড়লেন। প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"এখানে তোমার জন্য কিছু উপহার আছে। সংসারটা বাঁচাতে চাইলে তৈরী হয়ে নাও। ছেলেটা যে কোনো সময় এসে পড়লো বলে।"
তৃষা চোখ তুলে তার দিকে তাকালো। চোখে মুখে তার হাজারও প্রশ্ন। সেদিকে চেয়ে নরম হাসলেন ইরিনা। অতঃপর দুষ্টু হেসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন কিছু। তৃষা লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলল সাথে সাথে। অতঃপর তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে ইরিনা বললেন,
"ঘরে যাও।"
______________
বড্ড ক্লান্ত শরীরটা। ঘরে ঢুকে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসলো রায়েফ। অতঃপর পরণের পাঞ্জাবিটা খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে শরীরটা এলিয়ে দিলো সে বিছানায়। হৃষ্টপুষ্ট মাংসল শরীরে একটা কালো রঙের সরু ফিতার গেঞ্জি আচ্ছাদিত।
ক্লান্তিতে চোখ বুঁজেছিল, ঠিক এমন সময় নূপুরের ঝমঝম শব্দে তড়িৎ গতিতে চোখ মেলল সে। নুপুর! বেশ অনেকদিন হলো মেয়েটার পায়ে সে নুপুরজোড়া দেখেনি। শব্দটা বেশ কাছ থেকে টের পেতেই তৎক্ষনাৎ চোখ মেলল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে বামপাশে তাকালো সে। আর মুহূর্তেই থমকে গেল।
কালো রঙের পাতলা একটা শাড়ি পরনে তার। যার দরুন শরীরের অবয়ব অনেকখানি স্পষ্ট। চোখে হালকা করে কাজল দেওয়া। তার দিকে উল্টো ফিরে আয়নায় তাকিয়ে চুলগুলো খোপা করে সেই কাঁটাটা গুঁজলো সে। যেটা আজ দুপুরেই তার চুলে গেঁথে দিয়েছিল সে।
ধাতব লম্বা শলাকার উপরিভাগে ময়ূরের নকশা করা। আর সেখান থেকে ঝুলছে দুটো ধাতব ঝুরি। নড়াচড়া করলে শব্দ হয় যেটা দিয়ে। বিগত দুইদিন মা আর নূরের এভাবে খেয়াল রাখার জন্য মেয়েটাকে কিছু একটা উপহার দিতে মন চেয়েছিল তার। তাই আজ প্রথমবারের মতো মেয়েলী মার্কেটে গিয়ে এই জিনিসটা চোখে পড়তেই এক দেখায় পছন্দ হয়েছিল তার। এই সুন্দর কাঁটাটা যেন এমন সুন্দর চুলের রমণীর জন্যই মানানসই। তাই আর অপেক্ষা না করে সেটা কিনে ফেলেছিল।
ধবধবে ফর্সা শরীরে কালো রংটা এত মানায় কেন? এমনভাবে নেশালো লাগে কেন? ঘরে কি নেশালো কিছু সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়েছে? মাথাটা তার ঝিমঝিম করছে কেন? এমন অহেতুক সব প্রশ্নদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চট উঠে উঠে বসলো সে। দৃষ্টি এদিক সেদিন ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই রমণীকে নিজের একদম সামনে আবিষ্কার করে ভ্রু উঁচালো। খসখসে কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"এভাবে সেজেগুজে কেন এসেছেন আমার সামনে?"
"মা পাঠিয়েছেন। আর বলেছেন..."
কথাটা বলেই থামলো তৃষা। জিভটা আপনাআপনি থেমে গেল যেন আড়ষ্টতায়।
"কী বলেছে?"
রায়েফের তাড়া দেওয়া কন্ঠ।
তৃষা শুকনো ঠোঁট দুটো সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে মিনমিনে সুরে বলল,
"খাবার জিনিস সুন্দর প্লেটে রাখা থাকলে রুচি বাড়ে।"
রায়েফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। অতঃপর বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
"আসুন, পুরোটা চেটেপুটে খেয়ে ফেলা উচিত তবে আজ।"
লজ্জায় হাঁসফাঁস করতে করতে তৃষা উল্টো ফিরে পা বাড়াতে যাবে, এমন সময় খপ করে তার হাত আঁকড়ে ধরলো রায়েফ। কাছে টেনে এনে একদম মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সরাসরি দৃষ্টি রাখলো তার চোখে। তৃষা সরাসরি তাকাতে পারল না সেই দৃষ্টির দিকে। কখনোই পারে না সে ওই দৃষ্টিতে সরাসরি তাকাতে। তাই মেঝেতে চোখ রেখে আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। অপেক্ষা করলো মানুষটার পরবর্তী পদক্ষেপের।
রায়েফ মুহূর্তকাল সেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি তাক করে রইলো। এরপর তার হাত ছেড়ে দিয়ে খসখসে কন্ঠে বলল,
"গেঞ্জিটা খুলে দিন, জামাকাপড় পরে খেতে অসুবিধা হয়।"
#চলবে....