#অ্যান্টিবায়োটিক
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৪
পরদিন সকাল আটটা। মেহজাবিনের গোড়ালিটা বরফ আর মলমের গুণে অনেকটাই ভালো। হেঁটে হেঁটে ডাইনিং টেবিলে এসে বসতেই তার চোখ ছানাবড়া! টেবিলে সাধারণ দিনের রুটি-ভাজির বদলে সাজানো রয়েছে গরম হাঁসের ডিমের পোচ, ডালিম আর কলমার রস, ঘি দিয়ে তৈরি স্পেশাল পরাটা আর দেশি খাঁটি মধু! মেহজাবিন অবাক হয়ে চেয়ারে বসতে বসতে বলল, "আম্মা, আজ কি বিশেষ কোনো দিন? এত সব ভারী ভারী নাস্তা?"
সুলতানা বেগম শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে মেহজাবিনের প্লেটে দুটো ডিমের পোচ ঢেলে দিলেন। তার চেহারায় এক রহস্যময় হাসি। তিনি নিচু গলায় গম্ভীর কিন্তু উৎসাহী স্বরে বললেন, "বিশেষ দিন মানে? বিয়ের দু-দিন পার হয়ে গেল, আর তুমি বলছ বিশেষ দিন? শরীরের শক্তি-সামর্থ্য না থাকলে সংসারে প্রদীপ জ্বলবে কীভাবে, শুনি?"
মেহজাবিন কফির কাপ তুলে মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেল, "মানে?"
"মানে আবার কী?" সুলতানা বেগম মেহজাবিনের আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, "আমি তো আর চোখে ঠুলি দিয়ে বসে নেই! আরহাম কাল সারাটা দিন তোমাকে ঘরে আটকে রাখল, তোমার সেবা করল, পা টিপে দিল... এসবের উদ্দেশ্য আমি বুঝি না ভাবছ? কিন্তু দু-দিন ধরে তো তোদের ঘরে কোনো সুসংবাদের আলামত দেখলাম না! আরহামের বাবা বলছিল, এই বছরই নাকি আমাদের নাতি বা নাতনির মুখ দেখতে চায়!"
"কী?" মেহজাবিনের মুখের গরম চা প্রায় ছিটকে বের হওয়ার জোগাড়! সে কাশতে কাশতে লাল হয়ে গেল। "আম্মা! মাত্র দু-দিন হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে! দু-দিনে কীভাবে..."
"কেন সম্ভব না?" শাশুড়ি চোখ কপালে তুললেন। "আমাদের জামানায় বিয়ের প্রথম সপ্তাহেই সব পাকা হয়ে যেত! তোমরা আজকালকার মেয়েরা খালি কেরিয়ার আর পড়াশোনা বোঝো! শোনো বউমা, আজ রাতে আমি ঘরে বিশেষ কিছু জাফরান দেওয়া দুধ পাঠিয়ে দেব। আর শুনলাম তোমরা নাকি আলাদা বালিশে শুচ্ছ? এসব ছাড়ো! আজ রাতে বরকে কীভাবে কাছে টানতে হয়, সেসবের কিছু টোটকা আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব..." কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মেহজাবিনের গাল কান গরম হয়ে একদম টকটকে লাল হয়ে গেল। লজ্জায় তার ইচ্ছা করছিল ডাইনিং টেবিলের নিচে ঢুকে যেতে! একজন শাশুড়ি তার বউকে এভাবে দু-দিনের মাথায় 'সুসংবাদ' আর 'বর পটানো'র টিপস দিচ্ছে? ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল প্রফেসর আরহাম মির্জা। পরনে তার নেভি ব্লু সুতোর শার্ট, চশমাটা যথাস্থানে। সে টেবিলে এসে বসে শান্ত চোখে মেহজাবিনের লাল হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকাল। "কী ব্যাপার মেহজাবিন? সকালে কোনো বায়োলজিক্যাল ফিভার হলো নাকি? মুখ এত লাল কেন?" আরহাম ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করল।
মেহজাবিন আড়চোখে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে আবার আরহামকে দেখল। শাশুড়ি ততক্ষণে আরহামের প্লেটে পরাটা তুলে দিচ্ছেন আর মেহজাবিনকে চোখে ইশারা করছেন, 'কাজের কথা বলছ না কেন!'
মেহজাবিন মনে মনে নিজের কপাল চাপড়ালো, 'আল্লাহ! এই পরিবারে আমি কোন ফাঁদে পড়লাম! একদিকে জ*ল্লাদ বর, আর অন্যদিকে নাতি-নাতনির জন্য অধৈর্য শাশুড়ি!'
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শাশুড়ি আম্মা মেহজাবিনকে ডেকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা "কীভাবে নতুন বউ বরের মন জয় করে আর দ্রুত বাচ্চা পেটে আসে" তার এক দীর্ঘ লেকচার দিয়ে ছেড়েছেন। মেহজাবিনের কান দিয়ে তখন প্রায় ধোঁয়া বের হচ্ছিল! সে সোজা দোতলার স্টাডি রুমে গিয়ে ঢুকল। আরহাম তখন ল্যাপটপে কী যেন টাইপ করছিল। মেহজাবিন ধপাস করে একটা চেয়ার টেনে বসে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, "আপনার মাকে একটু থামান তো! উনি আমাকে সকালে হাঁসের ডিম আর রাতে জাফরান দুধ খাওয়াচ্ছেন কেন, জানেন? উনি নাকি এই বছরই নাতি চান! দু-দিনে নাকি বাচ্চার সুসংবাদ তৈরি হয়! এসব কী ধরনের অসভ্যতা?"
আরহাম ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে ধীরলয়ে মেহজাবিনের দিকে তাকাল। সে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর চেয়ার থেকে উঠে মেহজাবিনের দিকে হেঁটে এল।
"মা ভুল কিছু বলেনি।" আরহাম মেহজাবিনের চেয়ারের দুই পাশে হাত রেখে নিচু হয়ে এল।
মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল, "মানে?!"
আরহাম মেহজাবিনের একদম চোখের কাছে মুখ এনে ধীর, গভীর গলায় বলল, "তুমি তো পড়ালেখায় ভীষণ কাঁচা মেহজাবিন। আর কাল রাতে ক্লাসের পড়া না পড়ার শাস্তি কিন্তু এখনো বাকি।"
মেহজাবিনের বুক দড়ফড় করে উঠল। "ক... কী শাস্তি?" মেহজাবিনের গলা তোতলে গেল।
আরহাম কোনো কথা বলল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং আচমকা মেহজাবিনের কবজি শক্ত করে ধরে তাকে চেয়ার থেকে দাঁড় করিয়ে দিল। সে মেহজাবিনকে সোজা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করাল। ঘরের দরজাটা সে এক টানে লক করে দিল। মেহজাবিনের শ্বাস আটকে এল, "আ... আরহাম স্যার! আপনি কী করছেন? দরজা বন্ধ করলেন কেন?"
আরহাম আবার মেহজাবিনের কাছে এল। সে মেহজাবিনের দুটো হাত নিজের এক হাত দিয়ে শক্ত করে দেয়ালের ওপর চেপে ধরল। মেহজাবিন এতটুকু নাড়ার শক্তি পেল না। আরহামের অন্য হাতটা আস্তে করে উঠে এল মেহজাবিনের গলায়। তার দীর্ঘ গরম আঙুলগুলো মেহজাবিনের সংবেদনশীল ঘাড়ে আলতো করে স্পর্শ করল। মেহজাবিনের পুরো শরীরে যেন এক ভোল্টের কারেন্ট খেলে গেল! সে চোখ বন্ধ করে এক তীব্র কাঁপুনিতে শিউরে উঠল।
"আজকের অ্যাসাইনমেন্ট ফেল করার শাস্তি," আরহামের কণ্ঠস্বর মেহজাবিনের কানের কাছে মুখ এনে বলল।
আরহাম তার ঠোঁট দুটো মেহজাবিনের কানের লতির খুব কাছে নিয়ে এল, কিন্তু স্পর্শ করল না। শুধু তার উত্তপ্ত নিশ্বাস মেহজাবিনের চামড়ায় আগুনের অনুভূতি তৈরি করতে লাগল। আরহামের খালি হাতটা মেহজাবিনের সুতির কামিজের ওপর দিয়ে আস্তে করে নেমে এলো মেহজাবিনের কোমরে। মেহজাবিন থরথর করে কাঁপছে।
"আ... আরহাম... ছাড়ুন..." মেহজাবিন অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করল, কিন্তু তার ভেতরের তীব্র আকুলতা আর উত্তেজনায় সে আরহামের শার্টের হাতা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। মেহজাবিন চোখ দুটো বন্ধ করে আরহামের আরও কাছাকাছি সরে এল। তার ঠোঁট দুটো আপনা থেকেই একটু ফাঁক হয়ে গেল, এক অনাকাঙ্ক্ষিত আদরের তীব্র অপেক্ষায়! সে চাইল আরহাম তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরুক, তার ঠোঁটে নিজের অধিকার বসাক… ঠিক সেই মুহূর্তে আরহাম মেহজাবিনের ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে নিল। মেহজাবিনের হাত দুটোকে মুক্ত করে দিল। মেহজাবিন চমকে উঠে চোখ খুলল। তার চোখ দুটি তখনও কামনায় ও উত্তেজনায় আবছা, নিশ্বাস ঘন আর বুকটা দ্রুত উঠছে আর নামছে। আরহাম একধাপ পেছনে সরে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো স্পন্দন নেই! সে অত্যন্ত শান্ত হাতে চশমাটা নিয়ে আবার চোখে পরল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চরম নিষ্ঠুরতায় ভরা মুচকি হাসি। সে পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে বলল, "তোমার হার্টবিট এখন পার মিনিটে ১২০। মেটাবলিক রেট হাই। শাস্তি কমপ্লিট। এবার মাথা ঠান্ডা করে টেবিলের বই খোলো আর চার নম্বর চ্যাপ্টার মুখস্থ করো। আমি নিচে যাচ্ছি, মায়ের সাথে নাতি-নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু কথা বলতে।"
কথাটা বলেই আরহাম চাবি দিয়ে দরজা খুলে শান্ত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল! মেহজাবিন দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের তীব্র উত্তেজনাটা এক সেকেন্ডে চরম হতাশায় বদলে গেল! তার রক্ত গরম হয়ে ফুটছে, আর এই লোকটা তাকে মাঝপথে এভাবে ছেড়ে রেখে চলে গেল?! মেহজাবিন রাগে, লজ্জায় আর অপমানে হাত দিয়ে দেয়ালটা সশব্দে ঠুকে দিল, "শয়তান! পাষাণ! রা*ক্ষস! তুই আমাকে এভাবে ডিস্টার্ব করে রেখে চলে গেলি?! দাঁড়া, তোকে যদি আমি পাগল না বানিয়ে ছেড়েছি, তবে আমার নামও মেহজাবিন না!"
সন্ধ্যার পর থেকে মেহজাবিন নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে । বিকেলে আরহাম তার সাথে যে খেলাটা খেলেছে, তা ভেবেই তার শরীর বারবার রী রী করে উঠছে। লোকটা কীভাবে পারল এত আবেগ তৈরি করে এক নিমেষে বরফ হয়ে হেঁটে চলে যেতে? এটা তো সোজা মানসিক অ*ত্যাচার! এমন সময় মেহজাবিনের ফোনে নোটিফিকেশন বেজে উঠল। তার বন্ধু রাফির মেসেজ। "ম্যাডাম ভাবিজী, বেঁচে আছ নাকি কাল রাতের মতো আজকেও সারারাত ল্যাবের শাস্তি খাটছ?"
“তোরা আমাকে একটু বাঁচা রাফি! এই লোকটা একটা আস্ত মনস্টার! প্রফেশনাল জল্লাদ!"
তানিয়া ভয়েজ নোট পাঠাল। "কী করেছে রে স্যার? আবার কি কোনো সিট-আপ বা পড়া ধরেছে?"
মেহজাবিন বিকেলে স্টাডি রুমের ঘটনা তো আর বিস্তারিত বলতে পারে না! সে ঘুরিয়ে লিখল, "না রে, লোকটা আমাকে এমনভাবে মেন্টাল টর্চার করে যে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়! আমি এর একটা শক্ত প্রতিশোধ নিতে চাই! তোরা কোনো আইডিয়া দে!"
রাফি সাথে সাথে কল দিল। মেহজাবিন রিসিভ করতেই রাফি ফিসফিস করে বলল, "মেহু, শুন! প্রফেসরের মতো সাইকোলজিক্যাল বান্দাদের সোজা করার একটাই রাস্তা উনাকে ওনার লাইনের বাইরে এনে কুপোকাত করা! স্যার তো চরম ডিসিপ্লিনড আর গম্ভীর, তাই না? তুই আজ রাতে এমন কিছু করবি যাতে স্যারের ওই বরফ চেহারার কন্ট্রোল ছুটে যায়! তুই উনাকে অ্যাটাক করবি, কিন্তু উনি কাছে এলে তুই কেটে পড়বি! সেম টু সেম টেকনিক!"
মেহজাবিনের চোখে এক শয়তানি আলো জ্বলে উঠল। "হুমম... মানে উনার নিজের অস্ত্র দিয়েই উনাকে ঘয়েল করব?"
"একদম!" তানিয়া পেছন থেকে বলল। "তুই আজ ওনার স্পেশাল স্টপওয়াচ লুকাবি, আর শাশুড়ি আম্মার দেওয়া ওই জাফরাানি দুধের গ্লাসে একটু বেশি করে চিনি আর কেশর মিশিয়ে খুব আদিখ্যেতা করে সার্ভ করবি! বরফ গলাইতেই হবে!"
মেহজাবিন শয়তানের মতো হেসে বলল, "ডান! আজ রাতে দেখা যাক প্রফেসর আরহাম মির্জার মেটাবলিজম কত স্ট্রং!"
রাত সাড়ে নয়টা। আরহাম তখনও স্টাডি রুমে ব্যস্ত।
মেহজাবিন রান্নাঘর থেকে সুলতানা বেগমের নিজ হাতে বানানো সেই বিশেষ "জাফরান-বাদাম দুধ"-এর গ্লাসটা ট্রেতে করে নিয়ে এল। শাশুড়ি আম্মা মেহজাবিনকে ট্রে হাতে দেখে মুখে এক প্রকাণ্ড হাসি নিয়ে বললেন, "একদম পুরোটা খাওয়াবি বউমা! এক ফোঁটাও যেন না ফেলে! আজ রাতেই কাজ হওয়া চাই!"
মেহজাবিন লজ্জা চেপে মাথা নাড়ল। সে ঘরে ঢুকে দেখল আরহাম কেবল শার্ট বদলে একটা হালকা ধূসর রঙের টি-শার্ট পরে বিছানার ওপর ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। মেহজাবিন ট্রে-টা সাইড টেবিলে রাখল। তারপর অতি নাটকীয়ভাবে নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটু খসিয়ে দিল। সে একগাল মিষ্টি হাসি নিয়ে আরহামের খুব কাছে এসে বিছানায় বসল। আরহাম ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে মেহজাবিনের এই হঠাৎ পরিবর্তিত ভঙ্গি আর খসে পড়া আঁচলের দিকে তাকাল। তার চোখে সামান্য কৌতূহল।
"তোমার স্টাডি শেষ মেহজাবিন?" আরহাম গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
"পড়ালেখা কি সারাজীবন করতেই হয় প্রফেশনাল বর মশাই?" মেহজাবিন তার গলার আওয়াজ একদম মোলায়েম আর রোমান্টিক করে ফেলল। সে ট্রে থেকে দুধের গ্লাসটা তুলে আরহামের ঠোঁটের কাছে বাড়িয়ে ধরে বলল, "আম্মা নিজ হাতে আপনার জন্য এই স্পেশাল দুধ পাঠিয়েছেন। এক চুমুকে খেয়ে নেন তো!"
আরহাম গ্লাসের দিকে আর মেহজাবিনের মুখের দিকে আড়চোখে তাকাল। সে চশমাটা একটু ঠিক করে বলল, "দুধে এত কেশর আর এলাচ কেন? মা কি আবার কোনো আয়ুর্বেদিক এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে?"
"আহা! আম্মার ভালোবাসার দুধ, খেয়েই দেখেন না!" মেহজাবিন আরও একধাপ এগিয়ে এসে আরহামের কাঁধে নিজের হাত রাখল। তার আঙুলগুলো আরহামের শার্টের কলার ছুঁয়ে ছুঁয়ে নামতে লাগল।
আরহাম এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল মেহজাবিনের ওপর। মেহজাবিনের এই প্রকাশ্য আকর্ষণ আর তার গায়ের মিষ্টি সুবাস আরহামের ভেতরের সেই কড়া টিচারকে নিমেষে নড়িয়ে দিল। আরহাম গ্লাসটা মেহজাবিনের হাত থেকে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে অর্ধেকটা গিলে ফেলল। দুধের গ্লাসটা সাইড টেবিলে রাখতেই মেহজাবিন আরহামের বুকের কাছে ঝুকে এল। মেহজাবিনের চোখে তখন বিজয়ের হাসি। সে ভাবল, 'এবার বাঘ আমার ফাঁদে!'
আরহাম মেহজাবিনের কোমর ধরে তাকে এক টানে নিজের আরও কাছে নিয়ে এল। আরহামের নিশ্বাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে। আরহাম নিচু গলায় বলল, "তুমি কিন্তু আগুনে হাত দিচ্ছ মেহজাবিন। আর এই আগুনের উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নেই।"
মেহজাবিন আরহামের শার্টের কলার চেপে ধরে তার খুব কাছে মুখ নিয়ে গেল, একদম ঠোঁটের দূরত্বে! মেহজাবিন ফিসফিস করে বলল, "পরীক্ষা করে দেখবেন নাকি কার ক্ষমতা বেশি, স্যার?"
আরহাম চোখ বন্ধ করে মেহজাবিনের ঠোঁটের দিকে ঝুঁকতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে! মেহজাবিন ঝটপট আরহামের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল! সে হাত ঝাড়া দিয়ে এক বিকট মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, "উফস! আমার তো পনেরো মিনিটের পড়া শেষ করা বাকি! আপনি বরং দুধের পুষ্টি উপভোগ করুন, আমি ঘুমাতে চললাম! গুড নাইট, প্রফেসর!"
মেহজাবিন আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে অন্যপাশের বালিশটা তুলে নিয়ে সোজা বারান্দার কাছের সোফাটার দিকে দৌড়ে গেল! আরহাম বিছানায় বসে রইল একদম স্তম্ভিত হয়ে! তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে রইল, নিশ্বাস তখনও দ্রুত চলছে, আর গায়ের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার আগুন! কিন্তু সামনে মেহজাবিন নেই! মেয়েটা তাকে নিজের অস্ত্রেই সোজা কুপোকাত করে সোফায় গিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে!
রাত দুটো। সোফায় শুয়ে মেহজাবিনের ঘুম আসছে না। সে কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে মনে মনে হাসছিল। 'হা হা হা! প্রফেশনাল বরকে আজ কেমন শিক্ষা দিয়েছি! বিকেলের শোধ রাতে তোলা বলে এটাকে! এবার বোঝো ঠ্যালা!'
কিন্তু ঘরের ভেতর তাপমাত্রা যেন হঠাৎ করে খুব বেড়ে গেছে। মেহজাবিন খেয়াল করল, বিছানায় আরহাম শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। তার শ্বাসের শব্দ অস্বাভাবিক ভারী। মেহজাবিন শাশুড়ির সেই জাফরান দুধের কথা ভেবে হঠাৎ একটু ভয় পেয়ে গেল। 'আল্লাহ! শাশুড়ি আম্মা ওই দুধে মারাত্মক কিছু মিশিয়ে দেয়নি তো? লোকটার আবার কোনো ক্ষতি হলো না তো?!'
মেহজাবিন কম্বল সরিয়ে আস্তে আস্তে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। লাইট না থাকলেও জানালার বাইরের আবছা আলোয় মেহজাবিন দেখল আরহামের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তার টি-শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। সে ছটফট করছে।
"আরহাম স্যার!" মেহজাবিন নিচু গলায় ডাকল।
আরহাম অমনি চোখ খুলল। তার চোখ দুটি লালচে হয়ে আছে, দৃষ্টিতে এক তীব্র ব্যাকুলতা। সে কোনো কথা না বলে আচমকা হাত বাড়িয়ে মেহজাবিনের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। সেই এক টানে মেহজাবিন সোজা গিয়ে পড়ল আরহামের ওপর, বিছানায়! "আহ্!" মেহজাবিন চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু আরহাম তার এক হাত মেহজাবিনের পিঠে আর অন্য হাত দিয়ে মেহজাবিনের মুখ চেপে ধরল।
আরহামের শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছে! "খুব মজা লাগছিল, তাই না?" আরহামের গলা একদম জড়িয়ে আসছে, কিন্তু তাতে রয়েছে এক অদ্ভুত গভীর রোমান্টিক মাদকতা। "কাউকে নাচিয়ে পালিয়ে যাওয়া খুব সহজ মেহজাবিন... কিন্তু তার পরিণতি সামলানো মারাত্মক কঠিন।"
মেহজাবিন ভয়ে আর লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আ... আরহাম স্যার! আপনার শরীর এত গরম কেন? আম্মা দুধে কী মিশিয়েছিল?"
"জানি না," আরহাম মেহজাবিনের মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের কপালটা মেহজাবিনের কপালে ঠেকালো। দুটো উত্তপ্ত নিশ্বাস একসাথে মিশে গেল। "কিন্তু আমি শুধু জানি, আজ রাতে তোমার এই রিভেঞ্জ আমি সুদে-আসলে উসুল করব।"
আরহাম মেহজাবিনকে আর কোনো সুযোগ দিল না। সে মেহজাবিনকে নিজের বাহুবন্ধনে এমনভাবে জড়িয়ে নিল যে মেহজাবিনের আর পালানোর কোনো রাস্তা রইল না। মেহজাবিন আরহামের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, এই কড়া, শক্ত কাঠখোট্টা লোকটার ভেতরের বরফটা আজ সত্যি সত্যিই পুরোপুরি গলে গেছে। মেহজাবিনও আর সরার চেষ্টা করল না। সে আস্তে করে নিজের হাত দুটো আরহামের পিঠের ওপর রেখে আরহামের বুকের ওমে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল।
চলবে?