ফন্ট সাইজ:
থিম:
অ্যান্টেবায়েটিক

৯ম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#অ্যান্টিবায়োটিক

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৯

বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের সামনে তখন বিশাল এক ইসি ট্যুরের এসি বাস দাঁড়িয়ে আছে। ভোর সাড়ে ছয়টা। সকালের হালকা মিষ্টি ঠান্ডা বাতাসে পুরো ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গণ জমে উঠেছে। ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েরা রঙিন জামাকাপড় পরে হাসাহাসি করছে, সেলফি তুলছে, আর গিটারে টিউন ডলছে। রাফি, তানিয়া আর নীলু একপাশে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খেতে খেতে বাসের সেরা সিটটা দখল করার মহোড়া দিচ্ছিল। মেহজাবিন একটা হালকা নীল রঙের সুতি কুর্তি আর জিন্স পরে মাথার চুলগুলো উঁচিয়ে পনিটেল করছে। হঠাৎ তার চোখ গেল বাসের দরজার দিকে। সেখানে চশমা ঠিক করতে করতে শান্ত, গম্ভীর পায়ে এগিয়ে আসছে প্রফেসর আরহাম মির্জা। গায়ে কালো রঙের একখানা লেদার জ্যাকেট, ভেতরে সাদা টি-শার্ট। জিন্সের পকেটে এক হাত ঢোকানো। চোখে-মুখে গম্ভীর প্রফেসরের ট্রেডমার্ক লাগানো। ওনাকে দেখে ক্লাসের ঢ্যাপসা মেয়েগুলো একপাশে দাঁড়িয়ে অমনি ফিসফিস শুরু করে দিল, "মাই গড, মির্জা স্যারকে আজ কী হট লাগছে বল তো!"

মেহজাবিন মনে মনে নিজের চোখ দুটোকে ছানাবড়া করে এক চোট গালি দিল, “হু, ঢং কত! ক্লাসরুমে তো মনে হয় জীবন্ত ডাই*নোসর, আর বাইরে এলেই অমনি হিরো আলমের চেয়েও বড় সেলিব্রিটি!” এমন সময় বাসের পেছন দিক থেকে হুট করে একটা প্রকাণ্ড ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে হাজির হলেন এক পরিচিত মুরুব্বি। ওনার গায়ে একটা বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ি, এক হাতে বড় একখানা প্লাস্টিকের ঝুড়ি, অন্য হাতে বিশাল পলিথিনের ব্যাগ। ওনার ঠিক পেছনেই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকছেন আরো তিনজন লোক। একজনের হাতে বিশাল একখানা পানির জাগ, অন্যজনের ঘাড়ে দুটো কোলবালিশ! মেহজাবিনের চোখ মুখ নিমেষেই থমকে গেল। এ তো অন্য কেউ নন! তার পরম আদরের শাশুড়ি আম্মা সুলতানা বেগম! আর ওনার পেছনে মেহজাবিনের বাবা, মেহজাবিনের আম্মা এবং মেহজাবিনের ষোলো বছরের বাদর, ছোট ভাই মাহিন! পুরো ডিপার্টমেন্টের হইচই এক সেকেন্ডের মধ্যে গায়েব হয়ে গেল। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল এই অদ্ভুত চারজনের মিছিলের দিকে। আরহাম বাস ওঠার জন্য দরজায় পা দিতে যাবেন, ঠিক তখনই সুলতানা বেগম পিছন থেকে হেঁকে উঠলেন, "ওরে আরহাম! দাঁড়া দাঁড়া! তুই একা একা চড়ে বসাচ্ছিস, আর আমরা পেছনে ট্রাভেল ব্যাগের ভারে ম*রে যাচ্ছি!"

আরহামের পা বাসের সিঁড়িতে জমে বরফ হয়ে গেল। তার হাতের ঘড়িটা দেখতে দেখতে মুখটা এক সেকেন্ডেই ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেল। চশমাটা নাক দিয়ে একটু নিচে খসে পড়ল। সে খুব ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল। চোখের মনি দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা হলো।

“মা?! আপনি... আপনারা সবাই এখানে... এই সকালবেলা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে কী করছেন?!"

সুলতানা বেগম হাতের প্লাস্টিকের ঝুড়িটা ঝাকিয়ে বললেন, "কী করছি মানে রে বাঁদ*র? তোর ডিপার্টমেন্ট থেকে সিলেটের ইকো-ট্যুরে যাচ্ছে না? কাল রাতে যখন শুনলাম স্টুডেন্টদের জন্য আলাদা বাস আর টিচারদের জন্য আলাদা বাস করা হয়েছে, আর সিলেটে গিয়ে নাকি কটেজে তোরা সবাই আলাদা আলাদা ঘরে থাকবি, অমনি আমার বুকটা ধক করে উঠল! আমার মিষ্টি সোনা বউটা বাসে একা একা বমি করতে করতে যাবে, আর তুই টিচারদের বাসে চড়ে নবাবজাদা সেজে চশমা মোছবি? তা তো হতে দেওয়া যায় না! তাই তোর শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ভোর চারটায় ফোন করে ডেকে তুলে গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসলাম।"

মেহজাবিনের বাপের বাড়ির গোষ্টি শুদ্ধ ট্রিপে এসে হাজির! রাফি একপাশে দাঁড়িয়ে চোখ ছানাবড়া করে মেহজাবিনের কানে কানের কাছে ফিসফিস করল, "দোস্ত মেহু, তোদের বিয়ের পর কি এই ট্রিপটা 'ফ্যামিলি প্যাক' হিসেবে সিলেক্ট হয়েছিল নাকি রে? শাশুড়ি আম্মা তো তোদের সিলেটে হানিমুন করার বন্দোবস্ত পুরো বাসের মধ্যেই সেরে ফেলেছেন!"

মেহজাবিন মুখ চেপে ধরে হাসি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারল না। ওর শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে হাসি বেরোতে লাগল। মাহিন দৌড়ে গিয়ে আরহামের কোমর জড়িয়ে ধরে দাঁত কেলিয়ে বলল, "দুলাভাই! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! আপনার বদৌলতে সিলেটের তিন দিনের ট্যুরটা পুরো ফ্রিতে হয়ে গেল! আর শোনো দুলাভাই, সিলেটে গিয়ে কিন্তু জাফলংয়ের পাথর কেনার টাকা আর চা-বাগানের খাসির কাচ্চির পুরো বিল তোমার পকেট থেকেই যাবে, ওকে?"

আরহাম এক সেকেন্ড মাহিনের দিকে তাকালেন, তারপর চশমাটা খুলে পকেট থেকে রুমাল বের করে খুব শান্ত ভঙ্গিতে মুছতে লাগল। তার কপালের একপাশের রগ দপদপ করে ভাসছে। সে বেশ বুঝতে পারছিল আজকের এই ট্যুর ওনার প্রফেসর জীবনের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির অধ্যায় হতে চলেছে। সুলতানা বেগম বাসের ভেতরে উঠে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সিট খালি করতে করতে বললেন, "এই যে শোনো বাবুরা, তোমরা একটু পেছনের সিটে সরে বোসো তো! আমার বেয়াই মশাইয়ের আবার বাসে চললে মাথা ঘোরে, ওনার জন্য জানালার পাশের সিটটা ছেড়ে দাও। আর মেহজাবিন, তুমি তোমার স্বামীর, আই মিন আরহাম স্যারের পেছনের সিটে এসে বস! আমি নিজে নজর রাখব, বাসে যেন কোনো লু*চ্চামি না হয়!" পুরো বাসের ছেলেমেয়েরা একযোগে হেসে উঠল। আরহাম বাসের একদম সামনের সিটে গিয়ে বসল, মাথাটা পেছনের দিকে কুপোকাত করে দুই আঙুলে কপাল টিপ*তে লাগল। সে মনে মনে ভাবছে, বায়োলজির ডিএনএ কোডিং মেলানো সহজ, কিন্তু তার মায়ের প্ল্যানিং ঠেকানো এই দুনিয়ার কোনো বিজ্ঞানের পক্ষে সম্ভব নয়!

বাস সিলেট অভিমুখে ছুটতে শুরু করল। এসি বাসের শীতল পরিবেশের মধ্যে মেহজাবিনের ছোট ভাই মাহিন আর ওনার বন্ধুরা মিলে বাসের মধ্যে গানজুটি শুরু করে দিয়েছে। মাহিন একটা খালি প্লাস্টিকের বোতল বাজিয়ে গান ধরল, "সিলেট শহরের কটেজেতে বৈরাগী হইয়া থাকব গো..." সঙ্গে তানিয়া ও রাফি কোরাস ধরে গাইতে লাগল। বাসের পুরো পেছনের অংশ যেন কোনো জলসাঘর! সুলতানা বেগম ওনার ঝুড়ি থেকে সুবিশাল টিফিন ক্যারিয়ার বের করলেন। বাসের ভেতর তখন মুখরোচক শুঁটকির ভর্তা, পরোটা আর সিদ্ধ ডিমের গন্ধে ম-ম করছে। উনি সামনের সিটে বসা আরহামের মাথার চুল ধরে একটা টান মে*রে বললেন, "ওরে আরহাম! নে, টিফিন ক্যারিয়ার থেকে দুটো পরোটা আর ডিম সিদ্ধ খাবি আয়! সকালে তো কিছু না খেয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলি। শাশুড়ি নিজ হাতে বানিয়ে এনেছে!"

আরহাম চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার পাশের সিটে বসা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর তানভীর সাহেব তো হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। আরহাম খুব নিচু, থমথমে গলায় বলল,, “ আমি বাসে খাই না। আপনি দয়া করে এটা বন্ধ করুন। পুরো ডিপার্টমেন্টের সামনে আপনি আমার ইমেজটা নষ্ট করছেন।"

"ইমেজ দিয়ে কী ধুয়ে জল খাবি রে ব্যাটা?" সুলতানা বেগম গর্জে উঠলেন, "তোর ওই ইমেজের বায়োলজি আমি ভালো করেই জানি! বউকে বাসে একলা ফেলে রেখে সামনে চশমা চোখে দিয়ে প্রফেসর ভাব দেখাচ্ছিস! মেহজাবিন, এই নেও, তুমি একটা পরোটা খাও তো মা! তোমার শাশুড়ি থাকতে তোমার জামাই তোমাকে অনাহারে রাখতে পারবে না!"

মেহজাবিন মেকি কান্নার ভান করে বলল, "আম্মা! আপনি যে কী ভালো! আপনার ছেলে তো আমাকে ঘরেও ঠিকমতো খেতে দেয় না! প্রতিদিন বায়োলজির মোটা মোটা বই পড়ায় আর ধমক দেয়!"

আরহাম ঝট করে ঘুরে পেছনের সিটের দিকে তাকাল। তার চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরোচ্ছে! মেহজাবিন তার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল।

আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে শুধু এতটুকু বলল, "একবার সিলেটে পৌঁছাতে দাও মিসেস মির্জা। বাসের এই সবকটা জটলার হিসেব আমি কটেজে গিয়ে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব।"

মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা হুট করে ছ্যাঁৎ করে উঠল। আরহামের এই গলার আওয়াজ তার খুব চেনা। যখনই সে এই স্বরে কথা বলে, তার মানে রাতের বেলা আরহাম তার ওপর নিজের কোনো না কোনো শক্ত 'শাসন' চাপাতে চলেছে!

-

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই বাস সিলেটের ছবির মতো সুন্দর টি-রিসোর্টে গিয়ে পৌঁছাল। চারদিকে সবুজ পাহাড়, ওপরে নীল আকাশ আর নিচে কুয়াশার মতো ছড়িয়ে থাকা চা-বাগান। রিসোর্টের বিশাল কাঠের লবিতে সব স্টুডেন্ট আর টিচাররা জমা হয়েছে। রিসোর্ট ম্যানেজার হাতে চাবি নিয়ে রুম বরাদ্দ করছিলেন। ঠিক এমন সময় অনন্যা যে পুরো সেমিস্টার জুড়ে আরহামকে নিজের প্রেমে ফেলার জন্য দিন-রাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে খুব স্টাইল করে একটা গোলাপি সানগ্লাস মাথায় তুলে আরহামের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার গায়ে দামী পারফিউমের গন্ধ। অনন্যা খুব মিষ্টি, মিহি গলায় বলল, "মির্জা স্যার! আমি শুনলাম টিচার্স ব্লকের ঠিক উল্টোপাশের চার নম্বর কটেজটা নাকি একদম নিরিবিলি। আমি কি ওই কটেজটা পেতে পারি? মানে বলছিলাম কী, সকালে চা-বাগানে ঘুরে আসার পর যদি বায়োলজির ইকো-সিস্টেমের স্পেশাল নোটসগুলো নিয়ে আপনার সাথে একটু পার্সোনালি ডিসকাস করতাম..."

অনন্যার কথা শেষ হতে পারল না। পিছন থেকে এক প্রকাণ্ড সাইক্লোনের মতো হাজির হলেন সুলতানা বেগম! উনি হাতের ছাতাটা দিয়ে অনন্যা আর আরহামের মাঝখানের শূন্যস্থানে এমনভাবে বাড়ি মার*লেন যে অনন্যা তিন ধাপ পেছনে পিছিয়ে গেল!

"কিসের নোটস গো মা?" সুলতানা বেগম অনন্যাকে ওপর থেকে নিচে একনজর মেপে নিয়ে বললেন, "সিলেটের পাহাড়ে এসে প্রফেসরের ঘরে গিয়ে বায়োলজি ডিসকাস করবে? বলি, তোমারে কি কোনো ইস্কুল-কলেজে পড়ায় নাই যে প্রফেসরেরও একটা পার্সোনাল লাইফ থাকে? তার ঘরে এখন তোমারে নোটস নিতে দেওয়া হবে, আর আমার বউ বাইরে বসে নখ কামড়াবে, তা ভেবেছ?"

অনন্যা তো বাকরুদ্ধ! সে তোড়জোড় করে বলল, "আ-আমি তো জাস্ট স্টাডি পারপাসে..."

"থামো থামো! স্টাডি পারপাসের নমুনা আমি অনেক দেখেছি!" সুলতানা বেগম ম্যানেজারকে ডেকে হাঁকলেন, "এই যে ম্যানেজার সাহেব! শোনো! আমার ছেলে আরহাম মির্জা আর আমার রাজকন্যা বউ মেহজাবিনকে ওই পাহাড়ের চূড়ার সবচেয়ে লাক্সারিয়াস, ফায়ারপ্লেস ওয়ালা কাঠের প্রাইভেট কটেজটা দাও! আর শোনো, মাঝখানে যেন কোনো চাবি দিয়ে খোলা যায় এমন দরজা না থাকে! ঘরের চাবি আমার হাতে দাও, আমি নিজে রাতে বাইরে থেকে দরজায় তালা মা*রব। আর খেয়াল রাখব যেন কোনো স্টুডেন্ট নোটস নেওয়ার বাহানায় ভেতরে ঢুকতে না পারে!"

লবিতে বসা রাফি আর তানিয়া হাততালি দিয়ে উঠল। অনন্যার মুখ নিমেষেই র*ক্তশূন্য, বেগুনী হয়ে গেল। সে তো অপমান সহ্য করতে না পেরে হনহন করে একদিকে হেঁটে চলে গেল। মেহজাবিন আড়ালে দাঁড়িয়ে মনে মনে বেশ একটা আনন্দ পাচ্ছিল। সে ভাবল, এবার নিশ্চয়ই আরহাম রাগ করে মাকে চিল্লাচিল্লি করবে। কিন্তু আরহামের প্রতিক্রিয়া হলো সম্পূর্ণ বিপরীত! আরহাম খুব শান্ত হাতে চশমাটা খুলে মোছল। তারপর গভীর গলায় ম্যানেজারকে বললেন, "আম্মা যখন এত জোর করছেন... নিয়ম কিছুটা ফ্লেক্সিবল করা যেতে পারে। আপনি কটেজ নম্বার ৯-এ আমাদের যাবতীয় লাগেজ পাঠিয়ে দিন।"

চাবিটা পকেটে ঢোকানোর সময় আরহাম মেহজাবিনের দিকে একবার তাকাল। তার চোখ দুটো অন্ধকার ঘরে জ্বলতে থাকা কোনো ক্ষুধার্ত চিতাবাঘের মতো চকচক করে উঠল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিপজ্জনক হাসির রেখা। মেহজাবিন ঢোক গিলল। সে বেশ বুঝতে পারল শাশুড়ি আম্মা ভেবেছেন উনি মেহজাবিনকে বাঁচালেন, কিন্তু আসলে উনি মেহজাবিনকে নেকড়ের খাঁচায় বন্দি করে দিয়ে গেলেন!

-

পরদিন সকালবেলা। পাহাড়ি সিলেটে ঝিরঝির করে কুয়াশা আর হালকা বৃষ্টি পড়ছে। পুরো বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট সিলেট চা-বাগানের ঢালে নেমেছে প্র্যাকটিক্যাল স্টাডি সেশনের জন্য। পাহাড়ের পিচ্ছিল মাটির ওপর চা-গাছের সারি। মেহজাবিন একটা হলুদ রঙের হালকা শাল গায়ে জড়িয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে সাবধানে নামছিল। হঠাৎ তার খেয়াল হলো অনন্যা ওর ঠিক পেছন পেছনে আসছে। অনন্যার চোখে-মুখে হিং*সার স্পষ্ট ছাপ। যখন মেহজাবিন পাহাড়ের এক্কেবারে খাঁজকাটা পিচ্ছিল জায়গাটার কাছে পৌঁছাল, অনন্যা নিজের পা-টা একটু বাড়িয়ে মেহজাবিনের পিঠে এক ধাক্কা মার*তে গেল! প্ল্যান ছিল খুব পরিষ্কার মেহজাবিন কাদার মধ্যে ধপাস করে পড়ে পুরো ডিপার্টমেন্টের সামনে কালিমালিপ্ত হবে। কিন্তু মেহজাবিন তো সাধারণ কোনো অবলা নারী নয়! সে অনন্যার ছায়াতেই ওর চাল ধরে ফেলেছিল। অনন্যা হাত দিয়ে ধাক্কা মারা*র ঠিক আগের মূহূর্তে মেহজাবিন এক পাশের ঝোপের ওপর হালকা লাফিয়ে সরে গেল, আর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে অনন্যার হাতটা ধরে উল্টো কায়দায় এক মোচড় দিল!

"ও মাগো!"

অনন্যা নিজেকে সামলাতে পারল না। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সে সোজা গড়িয়ে গিয়ে পড়ল ড্রেনের ভেতরে জমা হয়ে থাকা আধা-ফুট গভীর ঘন কাদার স্তূপে!

"মাই গড!" তানিয়া চিৎকার করে উঠল, "অনন্যা! তুমি কি চা-বাগানের মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ মাপতে কাদায় ডুব দিলে নাকি?!"

রাফি হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল, "হা হা হা! দোস্ত, এটা বায়োলজির প্র্যাকটিক্যাল ডেমো না, এটা হলো সোজা কাদায় মা*র্ডার!"

অনন্যা কাদা মেখে, চোখ-মুখ বন্ধ করে কাঁদতে কাঁদতে কাদার ড্রেন থেকে উঠল। ঠিক তখনই ওপরের পাহাড়ের চূড়া থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে নেমে এলেন প্রফেসর আরহাম মির্জা। তার হাতে একখানা ফাইল আর ট্রেডমার্ক কলম। অনন্যা কাদামাখা অবস্থায় কেঁদে কেঁদে আরহামের কাছে গিয়ে বলল, "স্যার! স্যার আপনি বিশ্বাস করুন, এই মেহজাবিন ইচ্ছা করে আমাকে ধাক্কা দিয়ে কাদায় ফেলে দিয়েছে! ও অসম্ভব ভায়ো*লেন্ট একটা মেয়ে! আপনি ওকে সাসপেন্ড করুন স্যার!"

আরহাম মেহজাবিনের দিকে তাকাল। মেহজাবিন শান্তভাবে শালটা গায়ে জড়িয়ে একজোড়া নিষ্পাপ, ধোয়া তুলসীপাতার মতো চোখ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন সে কিছুই জানে না! আরহাম খুব শান্ত, গম্ভীর গলায় অনন্যাকে বললেন, "বায়োলজির ডারউইন তত্ত্বটা মনে আছে অনন্যা? 'সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট'। যে প্রজাতি অন্যকে ধ্বংস করার জন্য গর্ত খুঁড়তে যায়, প্রকৃতির সরল নিয়মে সে নিজেই সবার আগে সেই গর্তে আছাড় খায়। মেহজাবিন কোনো অন্যায় করেনি, সে শুধু তার বায়োলজিক্যাল 'সেলফ-ডিফেন্স' ব্যবহার করেছে। এখন গিয়ে কটেজে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। স্টাডি সেশনের সময় নষ্ট করো না। আর এমনিতেও তোমার বাবা হাতে ধরে অনুনয় করেছে বলে, উনার মুখের দিকে চেয়ে তোমাকে বের করিনি এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট।”

অনন্যা কান্নায় ভেঙে পড়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ক্লাসের সব স্টুডেন্টরা মুচকি হাসতে লাগল। আরহাম আস্তে আস্তে মেহজাবিনের একদম কাছে এলো

ওনার ঢ্যাঙা শরীরটা মেহজাবিনের ওপর এক গভীর ছায়া ফেলল। সে মেহজাবিনের ঝুঁকে থাকা কানের লতির কাছে মুখটা আনল। আরহাম খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন, "পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে কাদায় ফেলার হাতটা বেশ পাকা করেছ দেখছি, ক্লাসরুমের মারকুটে ছাত্রী। তবে মনে রেখো, দিনের আলোয় এই যে বাঘিনীর মতো থাবা দেখাচ্ছ, রাতের অন্ধকারের একান্তে কিন্তু এই প্রফেসরের কাছেই তোমাকে বন্দি হতে হবে। তখন এই অবাধ্যতার মাশুল কীভাবে দেবে, ভেবে রেখেছ?"

মেহজাবিনের গায়ের লোমগুলো মুহূর্তের মধ্যে খাড়া হয়ে গেল। ওনার শিরদাঁড়া দিয়ে এক অজানা, রোমাঞ্চকর উত্তাপ নেমে গেল একদম নিচে। আরহাম তার দিকে একপলক কড়া চোখে তাকিয়ে শান্ত পায়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে হেঁটে চলে গেল।

-

রাত সাড়ে আটটা। সিলেটের পাহাড়ে মুষলধারে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বাইন আর পাইন গাছের পাতা ছুয়ে হাওয়ার শব্দ আসছে। থেকে থেকে বিজলী চমকাচ্ছে আর পাহাড়ের বুক চিরে গর্জে উঠছে মেঘ। পাহাড়ের এক্কেবারে চূড়ায় অবস্থিত ৯ নম্বর কাঠের প্রাইভেট কটেজ। কটেজের ভেতরে কাঠ পোড়ানোর ফায়ারপ্লেসের লালচে আলো জ্বলছে। ঘরের আবহাওয়া বেশ গরম, বাইরে চরম ঠান্ডা। মেহজাবিন একটা হালকা লাল আর সাদা কম্বিনেশনের সুতি শাড়ি পরে ফায়ারপ্লেসের একদম সামনে পাতা একটা কাঠের টুলের ওপর বসে আছে।। তার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আর সে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে। হঠাৎ কটেজের প্রধান কাঠের ভারী দরজাটা খুলল। বাতাস আর বৃষ্টির ছাঁট ঘরের ভেতরে এসে লাগল। ভেতরে ঢুকল আরহাম। সে বাইরের বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছে। তার কালো জ্যাকেটটা জলে একদম ভিজে চপচপ করছে। চশমার কাচে জলের ফোঁটা জমায় সে চশমাটা এক টানে খুলে কাঠের টেবিলের ওপর রাখল। মেহজাবিন আড়চোখে তাকাল। আরহাম তার জ্যাকেটটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল। তারপর হাত বাড়িয়ে নিজের ভেজা সুতি শার্টের ওপরের বোতামগুলো একের পর এক খুলতে লাগল। ফায়ারপ্লেসের লালচে আগুনের আলো গিয়ে পড়েছে আরহামের সুগঠিত, চওড়া বুকের ওপর। সে শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলতেই ওনার উন্মুক্ত শরীরটা আগুনের আলোয় ভাস্কর্যের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। তার বুকের ওপর বৃষ্টির জলের ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো চকচক করছে। মেহজাবিন ভয়ে আর লজ্জায় নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলতে চাইল, কিন্তু ওর চোখের মনি যেন নড়ল না। আরহামের সেই সুগঠিত শরীরের দিকে তাকিয়ে ওর বুকটা দড়ফড় করে উঠল। আরহাম কোনো কথা বলল না। সে লম্বা লম্বা ভারী পদক্ষেপে মেহজাবিনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার ভেজা শরীর থেকে ঠান্ডা জল আর দামি পারফিউমের এক মাতাল করা ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। আরহাম মেহজাবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর এক মুহূর্ত সময় না দিয়ে, মেহজাবিনের কোমল কবজিটা এক শক্ত হাতে চেপে ধরে তাকে টুল থেকে দাঁড় করিয়ে দিল! অন্য হাতটা এক ঝটকায় মেহজাবিনের নমনীয় কোমরে জড়িয়ে ধরে তাকে নিয়ে গিয়ে সোজা ফায়ারপ্লেসের পাশের শক্ত কাঠের দেয়ালে চেপে ধরল!

"আ-আপনি..." মেহজাবিনের কণ্ঠস্বর কটেজের ভেতরের গরম বাতাসে একদম আটকে গেল। তার নিশ্বাস দ্রুত হতে লাগল। আরহাম ওর হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেহজাবিনের থুতনিটা ধরে ওনার মুখটা উঁচিয়ে ধরল। তার ভেজা চুল থেকে জলের ফোঁটা এসে পড়ল মেহজাবিনের বুকের ওপরের খোলা শাড়ির অংশে।

"আপনি এভাবে ভেজা শরীরে কেন আসছেন?" মেহজাবিন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "আর... আর বাইরে আম্মা যদি এখনও জেগে থাকেন? যদি দরজায় নক করেন?"

আরহাম মেহজাবিনের আরও কাছে এল। তার ঠোঁট দুটো মেহজাবিনের ঠোঁটের থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে। তার ভেজা চওড়া বুকটা মেহজাবিনের বুকের সাথে একদম পিষে যাচ্ছে। আরহাম তার মেঝের মতো গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল,

"আম্মা বাইরে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে গেছেন, মিসেস মির্জা। উনি নিশ্চিত করেছেন যেন আজকের এই বৃষ্টিভেজা রাতে আমার আর তোমার মাঝে এই পৃথিবীর কোনো শক্তি এসে না দাঁড়ায়। উনি খুব ভালো করেই জানেন, ওনার এই দুর্দান্ত, অবাধ্য আর চতুর ছেলে ওনার বউকে কতটা উন্মাদের মতো ভালোবাসে! আর অনন্যার কথা বলছিলে না চা-বাগানে? দিনের আলোয় তুমি যে বাঘিনীর মতো নখ দেখাচ্ছিলে, সেই নখগুলো এখন আমার এই উন্মুক্ত বুকের ওপর আঁচড় কাটা*র জন্য কতটা ব্যাকুল হয়ে আছে, তা কি আমি বুঝি না, মেহজাবিন?"

মেহজাবিন নিশ্বাস বন্ধ করে আরহামের চোখের দিকে তাকাল। মেহজাবিন কাঁপতে কাঁপতে হাত দুটো আরহামের বুকের ওপর রেখে বলল, "আমি... আমি কোনো আঁচড় কাট*তে চাইনি! আপনি মিছামিছি আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছেন..."

আরহাম মেহজাবিনের কোমরের বাঁধনটা আরও কড়া করে দিল। তার আঙুলগুলো মেহজাবিনের শাড়ির আঁচল ঠেলে কোমরের উষ্ণ চামড়ায় গিয়ে বিধল। উনি মেহজাবিনের ঘাড়ে নিজের গরম, ভেজা ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল। মেহজাবিনের মুখ দিয়ে কোঁকানি বেরিয়ে এলো। আরহাম মেহজাবিনের কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে বলল,

“তুমি কি ভেবেছ এই প্রফেসর শুধু বইয়ের পাতা, প্র্যাকটিক্যাল খাতা আর বায়োলজির ডেফিনিশন চেনে, মেহজাবিন? তুমি জানো না, তোমার এই অবাধ্যতা, তোমার এই চঞ্চলতা আর তোমার এই রাগী চোখ দুটো আমাকে দিন দিন কতটা পশুর মতো পাগল করে তোলে! সারাদিন তোমাকে সবার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখে এই বন্দি কটেজে নিজের চরম ভালোবাসায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করার যে লোভ, তা সামলানো আমার পক্ষে কতটা অসম্ভব! আজ রাতে এই পুরো কটেজ তোমার আর আমার উষ্ণ শ্বাস-প্রশ্বাসে ফুটবে। তুমি যতবার আমার শাসন থেকে পিছু হটতে চাইবে, আমি ততবার তোমাকে আমার এই বাহুডোরে আরও শক্ত করে পিষে ফেলব। আজ রাতে তুমি কোনো শিক্ষককে নয়, তোমার এই চরম একরোখা স্বামীকে সহ্য করবে যার একমাত্র রাজত্ব শুধু তোমার এই পুরো শরীরের ওপর!"

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই আরহাম মেহজাবিনের লাল হয়ে থাকা ঠোঁটে তার তৃষ্ণার্তে ভরা চুুমু বসিয়ে দিল। মেহজাবিনের ভেতরের সব রাগ, সব জল্পনা-কল্পনা আর প্রতিরোধ নিমেষেই উবে গেল। সে নিজের দুটো হাত তুলে আরহামের চওড়া, ভেজা পিঠটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর নখগুলো আরহামের পিঠের চামড়ায় গেঁথে গেল। আরহাম মেহজাবিনকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে ফায়ারপ্লেসের সামনের নরম, উষ্ণ বিছানায় শুইয়ে দিল। তার সুগঠিত শরীরটা মেহজাবিনের ওপর এক প্রকাণ্ড ছায়ার মতো নেমে এলো।

বাইরে তখন সিলেটের পাহাড়ে মুষলধারে ঝুম বৃষ্টি আর কটেজের ভেতরে আরহামের সেই কড়া, উন্মাদ ভালোবাসার শাসনে মেহজাবিন নিজের অস্তিত্ব পুরোপুরি সমর্পণ করে দিল…

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন