ফন্ট সাইজ:
থিম:
অ্যান্টেবায়েটিক

১২তম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#অ্যান্টিবায়োটিক

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_১২

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে তখন উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের সে এক এলাহী কাণ্ড! কারো কাঁধে ট্রাভেল ব্যাগ, কারো হাতে সিলেটের খাসিয়া পুঞ্জির চা-পাতা আর আনারসের ঝুড়ি। রাফি আর তানিয়া এক পাশে দাঁড়িয়ে ট্রেনের হকারদের থেকে ঝালমুড়ি আর সিদ্ধ ডিম কেনাকাটা নিয়ে দরদাম করছিল।

ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কেবিনের চার সিটের একটা প্রাইভেট ‘কুপে’র ভেতরে তখন একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে বসে আছেন সুলতানা বেগম। তিনি কেবিনের দরজায় পা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের স্টুডেন্টদের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।

"এই যে শোনো পোলাপান!"সে গলার রগ ফুলিয়ে হাঁকলেন, "তোমাদের টিচারদের জন্য আর সাধারণ স্টুডেন্টদের জন্য তো আলাদা বগি আছেই! আমার এই চার সিটের কেবিনে কিন্তু ভুলেও কেউ ঢুকতে আসবি না! ভেতরে আমার ছেলে আরহাম আর আমার মিষ্টি বউ মেহজাবিন একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেবে। আর ওই বাদর মাহিনকে আমি জানালার পাশে বসিয়ে রেখেছি যাতে ও বাইরে লাফ দিতে না পারে!"

রাফি জানালার বাইরে থেকে ঝালমুড়ির ঠোঙা চিবাতে চিবাতে বলল, "মেহুর শাশুড়ি আম্মা! আপনি তো পুরা সিলড কুপে বানিয়ে ফেললেন! আমাদের মেহু দোস্তকে অন্তত ট্রেনের করিডোরে একটু হাওয়ায় ভাসতে দিয়েন, নাকি সিলেটের কটেজের মতো ট্রেনেও ওনাকে একদম হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখবেন?"

মেহজাবিন কেবিনের ভেতরের নরম সিটে বসে ছিল। তার গায়ে একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতির কুর্তি, চুলগুলো ঢিলেঢালা করে খোঁপা করা। রাফির কথা শুনে সে লজ্জায় একপ্রকার লাল হয়ে জানালার কাচের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কাল রাতের আর বিকালের লালাখালের সেই ‘নৌকার’ দৃশ্যগুলো এখনো তার মাথার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন সময় কেবিনের কাঠের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল প্রফেসর আরহাম মির্জা। তার গায়ে কালো রঙের একটা টি-শার্ট, হাতে ট্রাভেল ফাইল আর ল্যাপটপের ব্যাগ। চুলগুলো কিছুটা উস্কোখুস্কো হলেও চোখে সেই চিরাচরিত কড়া রোদচশমা আর চেহারায় গম্ভীর ভাব। আরহাম সোজা এসে মেহজাবিনের একদম সামনাসামনি সিটটায় বসল। সে ল্যাপটপ ব্যাগটা একপাশে রেখে চশমাটা খুলে শার্টের কোনায় মুছতে মুছতে মেহজাবিনের দিকে একবার তাকাল। মেহজাবিন আড়চোখে তাকে দেখতেই অমনি চোখ সরিয়ে নিল। সে মনে মনে ভাবছে, ঢং কত! যেন কত ভালো মানুষ! ট্রেনে সবার সামনে কেমন প্রফেসরের ভাব নিয়ে ঘুরছে, আর একান্তে পেলেই একদম বাঘের মতো ছোঁ মে*রে ধরে!”

আরহাম মেহজাবিনের এই আড়চোখে তাকানো আর চোর-চোর ভাবটা এক সেকেন্ডেই ধরে ফেলল। সে বলল, "তুমি কি ট্রেনের জানালার কাচটা গিলে ফেলার প্ল্যান করছ, মেহজাবিন? নাকি সিলেটে এসে চোখ দুটো স্থায়ীভাবে ত্যাড়া হয়ে গেছে? ওদিকে মুখ ফিরিয়ে না থেকে ব্যাগ থেকে বায়োলজির ফিল্ড খাতাটা বের করো। ডেটা এন্ট্রি এখনো বাকি।"

মেহজাবিন মুখ ঝামটা দিয়ে ঘুরে বলল, "ট্রেন ছাড়েনি এখনো! স্টেশনে বসে কে প্র্যাকটিক্যাল খাতা খোলে বলুন তো? আর আপনি তো সিলেটে প্র্যাকটিক্যালের চেয়ে আমার ভুল ধরতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন!"

"আমি ভুল ধরি কারণ তোমার মাথার ভেতরের ঘিলুগুলো ঠিকমতো কাজ করে না," আরহাম অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, "আর ভুল না ধরলে তুমি যে পরিমাণ ফাল*তুগিরি করো, তাতে পুরো ডিপার্টমেন্টের সামনে নিজেকে হাস্যাস্পদ বানাতে তোমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।"

"আপনি আমাকে ফালতু বলছেন?!" মেহজাবিন রেগে গিয়ে চিল্লাতে গেল।

ঠিক তখনই কেবিনের কোণ থেকে একপ্রকাণ্ড কাণ্ড ঘটে গেল! মেহজাবিনের ছোট ভাই মাহিন হঠাৎ ট্রেনের ছোট্ট বাথরুমের দিকে দৌড় দিল, "আম্মাগো! আমার পেটের ভেতর সিলেটের খাসির কাচ্চি আর পেয়ারা একসাথে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে! আমি বাথরুমে গেলাম!"

মাহিন বাথরুমে ঢুকে ঠাস করে স্টিলের মেটাল দরজাটা বন্ধ করে দিল। আর সাথে সাথে ট্রেনের ভেতরে এক বিকট আওয়াজ হলো। পাঁচ মিনিট গেল, দশ মিনিট গেল... উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি হেলেদুলে সিলেটের জংশন ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটতে শুরু করেছে। কিন্তু ট্রেনের বাথরুমের দরজা আর খোলে না! ভেতর থেকে মাহিনের হাউমাউ কান্না ভেসে এলো, "ও আম্মা গো! দুলাভাই বাঁচাও! দরজার লক আটকে গেছে! আমি ট্রেনের বাথরুমে বন্দি হয়ে গেছি রে বাবা!"

মেহুর মা লাফিয়ে উঠলেন, "ওরে বাফরে! আমার কোল খালি হয়ে গেল রে! ট্রেনের বাথরুমে আমার একমাত্র পোলার সলিল সমাধি ঘটে গেল! আরহাম বাবা, তুমি বসে বসে চশমা মুছছো কেন?! দরজায় লা*থি মা*রো!"

পুরো বগিতে হুলস্থুল পড়ে গেল! তানভীর সাহেব, রাফি, তানিয়া আর ট্রেনের টিকিট চেকার টিটিই সাহেব দৌড়ে এলেন। আরহাম বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে খুব শান্তভাবে দাঁড়াল। তার চেহারায় একফোটা দুশ্চিন্তা নেই। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বাথরুমের দরজায় দুটো টোকা দিয়ে বলল, "মাহিন, দরজার মেটাল নবটা ডানদিকে না ঘুরিয়ে যদি ওটাকে ধরে বেশি বাঁদ*রামো করো, তবে ট্রেন ঢাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত ওই চার স্কয়ার ফিটের বাথরুমেই তোমাকে কাটাতে হবে। আর যদি তাতেও লক না খোলে, তবে আমি টিটিই সাহেবকে বলব পরবর্তী স্টেশনে তোমাকে এই বাথরুমসহ আনলোড করে দিয়ে যেতে।"

ভেতর থেকে মাহিন কেঁদে কেঁদে বলল, "দুলাভাই! আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ কেন, একটু জোরে লা*থি মা*রো না! আমার ভয় করছে!"

"লা*থি মার*লে ট্রেনের দরজা ভাঙবে না, আমার জুতো নষ্ট হবে। তার চেয়ে বরং বুদ্ধির পরিচয় দাও। নবের নিচের ছোট বাটনটা চেপে ধরে বামে ঘোরাও।" আরহাম ঠাণ্ডা মাথায় নির্দেশনা দিল।

মাহিন ভয়ে ভয়ে ভেতরে বাটনটা ঘুরিয়ে এক টান দিল, আর অমনি খটাস করে দরজা খুলে গেল! মাহিন ঘেমে-নেয়ে চোরের মতো বাথরুম থেকে বের হয়ে সোজা মেহজাবিনের পেছনে গিয়ে লুকাল। মেহুর মা মতি বিবি মাহিনের কান ধরে একটা ডন-বৈঠক করানোর ভঙ্গি করে বললেন, "পা*জামা কোথাকার! ট্রেনের বাথরুমে গিয়ে লক আটকে বসে আছিস! আরহাম না থাকলে তো আজ তুই সিলেটে ট্রেনের পায়খানাতেই আটকে থাকতি!"

মেহজাবিন মুখ বাঁকিয়ে আরহামের দিকে তাকাল। আরহাম তার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "তোমার ভাই আর তোমার বুদ্ধির লেভেল যে একই ক্যাটাগরির, তা আজ ট্রেন কর্তৃপক্ষও জেনে গেল, মিসেস মির্জা।"

মেহজাবিন রাগে ফুঁসতে লাগল, কিন্তু ট্রেনের ভর্তি মানুষের সামনে কিছু বলতে না পেরে চুপ করে নিজের ঠোঁট কাম*ড়ে ধরে বসে রইল।

--

রাত সাড়ে দশটা। সিলেট থেকে আসা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছাল। স্টেশনের পরিচিত ব্যস্ততা, মাইকের ঘোষণা, ঢাকা শহরের চেনা ধুলোবালি আর শহুরে ঈষৎ গরম বাতাস এসে সবার গায়ে লাগল। ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী আর তানভীর স্যারকে স্টেশনেই বিদায় জানানো হলো। প্ল্যাটফর্মের আলোর নিচে তখন দুটি ভিন্ন পরিবারের লাগেজ গোছানোর তোড়জোড় চলছে। মেহজাবিনের বাবা, মা মতি বিবি, আর ভাই মাহিন একদিকে দাঁড়িয়ে সিএনজি খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। মতি বিবি মেহজাবিনের মাথায় হাত রেখে আদর করে বললেন, "রেহাই পেলি রে মেহু! সিলেটের কটেজের পাহাড়ি ঠাণ্ডা আর প্রফেসরের ধমক সহ্য করে তো শেষমেশ ঢাকায় ফিরলি। এবার তো জামাইয়ের সাথে নিজেদের বাড়ি গিয়ে একটু শান্তিতে শুয়ে-বসে রেস্ট নে।"

ঠিক তখনই মেহজাবিনের শাশুড়ি সুলতানা বেগম পান চাবাতে চাবাতে আড়াল থেকে এসে মেহজাবিনের একটা হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে গেলেন। সুলতানা বেগম মেহজাবিনের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে অত্যন্ত চটপটে গলায় বললেন, "শোনো মেহু মা! তোমার এই শাশুড়ি কিন্তু দুনিয়া দেখে বুড়ো হয়েছে! সিলেটের কটেজে আর ট্রেনের কেবিনে আরহাম তোমার ওপর যে পরিমাণ কড়া মেজাজ দেখাল, আমি তো ভাবছি তোমাদের মধ্যে কবে কি হবে? না বুঝতে পেরেছি এই আমাকে নতুন কোনো টোটকা বের করতে হবে। কালকে আমি দয়াল বাবা ক্যাবলা খাবার থেকে কালি কুত্তার গু ইয়ে মানে স্পেশাল বংশ বিস্তারের পানি পড়া এনে দিব। তারপর দেখবে বছর না ঘুরতেই এত বাচ্চা হবে যে মির্জা বাড়ি শেষমেশ বেবি কেয়ার সেন্টার হয়ে যাবে।”

মেহজাবিনের মুখের রক্ত যেন এক সেকেন্ডে শুকিয়ে গেল! "আ-আম্মা! এসব আপনি কী বলছেন?! তার আর আমার মধ্যে... মানে..."

"আহা, এত লজ্জা পেতে হবে না!" আম্মা মেহজাবিনের পিঠে এক আলতো চাপড় মেরে বললেন, "তুমি তো একদম সাদাসিধা বোকাসোকা মেয়ে! জামাইয়ের কড়া কথার পেছনে যে কতটা টান থাকে, তা বুঝো না। শোন, আজ মির্জা ভিলায় গিয়ে সোজা আরহামকে রুমে ঢোকাবে। আর শোনো, আমার কিন্তু আর দেরি সহ্য হচ্ছে না, দ্রুত একখানা গোলগাল নাতি, নাতনি আমার কোলে তুলে দাও! আরহাম যদি প্রফেসরি ঝাড়ে, তুমি আমার নাম করে ওরে ঝেড়ে দিবে, বুঝলে?"

মেহজাবিন লজ্জায় একদম মাটির সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম হলো! সে শাশুড়ীকে একদম বুঝতে দিল না যে আরহামের সাথে তার সম্পর্কের সমীকরণ অলরেডি কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে। সে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে চোরের মতো আরহামের কালো প্রাইভেট কারের দিকে হাঁটা দিল। স্টেশনের বাইরে দুটো আলাদা গাড়ি রেডি ছিল। মেহজাবিনের বাবা, মতি বিবি আর মাহিন তাদের নিজস্ব গাড়ি চড়ে চলে গেল নিজেদের বাসার দিকে। আর আরহামের ড্রাইভিং সিটে বসা কালো প্রাইভেট কারটিতে উঠল সুলতানা বেগম আর পেছনের সিটে ক্লান্ত, লজ্জায় লাল হয়ে থাকা মেহজাবিন।

-

ফ্লাইওভার পার হয়ে গাড়িটি যখন নিকুঞ্জের অভিজাত এলাকা ‘মির্জা ভিলা’র সামনে এসে থামল, তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। চারপাশ বাগান ঘেরা দোতলা এই বাড়িতে আরহাম, তার বাবা-মা একসাথে থাকে। মেহজাবিন ভেবেছিল সিলেট থেকে ফিরে এসে হয়তো একটু রেস্ট নেওয়া যাবে। কিন্তু মির্জা ভিলায় পা রাখতেই সুলতানা বেগম আবার নিজের পুরোদস্তুর হুকুমদাত্রী গৃহিণী রূপে ফিরে এলেন।

"ওরে রহমতের মা!" আম্মা কাজের মহিলাকে হেঁকে উঠলেন, "ফ্রিজ থেকে খাসির মাংস বের কর তো! ট্রেনের বিস্কুট আর চা খেয়ে আমার পেটের ভেতর ক্ষিধেয় আগুন জ্বলছে! আজ রাতে সবাই একসাথে গরম গরম বিরিয়ানি খেয়ে তারপর ঘুমাতে যাব! আর মেহু মা, তুমি ওপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেও, আরহাম তোমাকে আবার ডাকবে!"

মেহজাবিন নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা নিয়ে দোতলায় আরহামের বিশাল গুছানো শয়নকক্ষটির দিকে হেঁটে গেল। রুমের এসি ছাড়ার পর গরম হাওয়া কেটে পরিবেশ বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠল। মেহজাবিন ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে একটা হালকা নীল রঙের সুতির নাইটড্রেস পরে বাইরে এলো। সে খাটের ওপর বসে নিজের ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছছে। এমন সময় আরহাম রুমে ঢুকল। সে গায়ের জ্যাকেট আর টি-শার্ট খুলে একপাশে রাখল। তার ওপরের উন্মুক্ত, চওড়া বুকটা এসি-র আলোয় চকচক করছে। সে টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিতেই দেখল অনন্যার পর পর চারটে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আর কল এসে বসে আছে! মেহজাবিন খাটে বসে আড়চোখে আরহামের ফোনের স্ক্রিনের দিকে নজর রাখছিল। অনন্যা মেসেজে লিখেছে:

‘স্যার, আপনি কি ঢাকায় পৌঁছেছেন? সিলেটের ইকো-ট্যুরের ফাইলটা নিয়ে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। কাল সকালে কি আপনার পার্সোনাল স্টাডি রুমে আমি একটু আসতে পারি? প্লিজ স্যার...’

আরহাম মেহজাবিনের আড়চোখে তাকানোটা খেয়াল করল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে মেহজাবিনের দিকে একবার তাকাল, তারপর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে অনন্যাকে টাইপ করে একখানা ঝাঝালো রিপ্লাই পাঠাল,

‘অনন্যা, সিলেটের কটেজে আম্মার ঝাড়ুর বাড়িগুলো মনে হয় তোমার স্মৃতিশক্তি ফেরাতে পারেনি। কাল সকালে স্টাডি রুমে আসার নাম করে যদি কোনো ফালতু বাহানা করার চেষ্টা করো, তবে ডিপার্টমেন্টের নোটিশ বোর্ডে তোমার নাম টাঙিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। আর আমাকে পার্সোনাল মেসেজ দেওয়া বন্ধ করো, আমার স্ত্রী পাশে আছে। ইউ আর ব্লকেড।’

মেসেজটা সেন্ড করেই আরহাম এক ক্লিকে অনন্যার নম্বরটা সোজা ব্লকলিস্টে পাঠিয়ে দিল! মেহজাবিন এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার মনের ভেতরের হিং*সার আগুনটা এক সেকেন্ডে নিভে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত তৃপ্তির আলো জ্বলে উঠল! কিন্তু সে শাশুড়ির দেওয়া পরামর্শ মনে করে মুখে কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করল না। সে মুখ ঘুরিয়ে অত্যন্ত ভাবলেশহীন গলায় বলল, "বাহ্! আপনি তো বেশ ভালো ড্রামা করতে পারেন! বেচারি ছাত্রী নোটস চাইতে এসেছিল, আর আপনি তাকে এভাবে অপমান করে ব্লক করে দিলেন?"

আরহাম ফোনটা টেবিলে রেখে ধীরে ধীরে খাটের দিকে এগিয়ে এলো। তার খালি গায়ের সুগঠিত পেশীগুলো বেশ স্পষ্ট। সে খাটের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। মেহজাবিনের থুতনিতে নিজের দুটো আঙুল ঠেকিয়ে তার মুখটা ওপরে তুলে ধরে খুব ঠোঁটকাটা ও রুক্ষ গলায় বলল, "আমি ড্রামা করি না, মেহজাবিন। আর আমার চারপাশে কোনো ফালতু মাছি ভনভন করুক, তা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু তুমি যেভাবে আড়চোখে ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলে, তাতে মনে হচ্ছিল আমি যদি ওকে ব্লক না করতাম, তবে তুমি রাতে ঘুম বাদ দিয়ে আমাকে কটেজের সেই মারকুটে বাঘিনীর মতো কাম*ড়াতে আসতে!"

মেহজাবিনের কান দুটো আবার লাল হয়ে উঠল, "আমি কেন কামড়া*তে যাব?! আপনার যা ইচ্ছা আপনি করুন! আমি ডাইনিংয়ে যাচ্ছি, আম্মা বিরিয়ানি টেবিলে দিয়েছেন!"

মেহজাবিন এক ঝটকায় আরহামের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল। আরহাম তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে গভীর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল।

-

মির্জা ভিলার বিশালাকার কাঠের ডাইনিং টেবিলে তখন সুলতানা বেগমের স্পেশাল খাসির বিরিয়ানি আর বোরহানির ম-ম গন্ধে চারপাশ মৌ মৌ করছে।

টেবিলের একপাশে আরহামের বাবা গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ উল্টাচ্ছেন, আর অন্য পাশে সুলতানা বেগম প্লেটে বিরিয়ানি সাজাচ্ছেন। সুলতানা বেগম মেহজাবিনের প্লেটে প্রকাণ্ড এক টুকরো বিরিয়ানি আর খাসির নলী তুলে দিয়ে চোখের ইশারায় বললেন, "খাও মা মেহু, পেট ভরে খাও! তোমাকে তো সিলেটে গিয়ে সেই আরহামের ধমক আর ক্লাসের পড়া ছাড়া কিছুই খেতে দেখলাম না! ঢাকা শহরের মেয়ে, ট্রিপে গিয়ে শরীর একদম শুকিয়ে কাঠ বানিয়ে ফেলেছে! শরীর ভালো না থাকলে তো নতুন মেহমান আসবে না রে মা!"

মেহজাবিন বিরিয়ানির লোকমা মুখে দিতে গিয়েও কাশির তোড় সামলাতে পারল না!, “হে খোদা! আম্মা কি পুরো ডাইনিং টেবিলের সামনেই নাতি-নাতনির কথা তুলবেন নাকি?!

এমন সময় আরহাম টেবিলে এসে মেহজাবিনের ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসল। সে একটা প্লেটে খুব অল্প পরিমাণ বিরিয়ানি নিয়ে অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে খেতে শুরু করল। খেতে খেতে আরহামের বাবা হুট করে বললেন, "হ্যাঁ রে আরহাম, তোর ডিপার্টমেন্টের এই সিলেটি ট্যুরের পারফরম্যান্স কেমন হলো? শুনলাম ওই অনন্যা নামক মেয়েটি নাকি স্টুডেন্টদের মধ্যে বেশ ঝগড়াঝাঁটি বাঁধিয়েছিল?"

আরহাম ডালপুরির জল দিয়ে মুখ মুছে খুব ঠাণ্ডা মাথায় দীর্ঘ গলায় উত্তর দিল, “বাবা, বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে যারা প্রফেশনালিজম বাদ দিয়ে অহেতুক ডাবল গেম খেলতে আসে, তাদের জায়গা আমার ক্লাসরুমে হয় না। অনন্যাকে আমি চিরদিনের মতো ব্লকলিস্টে আর ওয়ার্নিংয়ে রেখে দিয়েছি। আর মেহজাবিন ট্রিপে যতটা বাঁদরা*মো করেছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাল সকাল আটটার মধ্যে তাকে আমার স্টাডি রুমে পূর্ণাঙ্গ ল্যাব রিপোর্ট সাবমিট করতে হবে। কোনো এক্সকিউজ বা ভুল আমি বরদাশত করব না।"

মেহজাবিন খাওয়া থামিয়ে আরহামের দিকে একজোড়া অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। “ইশ! খাওয়ার টেবিলেও প্রফেসরি ভাব! মানুষটা কি সত্যি মানুষ নাকি কোনো রোবট?! ঘরের ভেতরে এতকিছু হয়ে গেল, আর ওনার মাথায় এখনো প্র্যাকটিক্যাল রিপোর্ট ঘুরছে?!

মেহজাবিন রাগ করে চামচটা প্লেটে ঠাস করে নামিয়ে রেখে বলল, "আম্মা, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আমি রুমে যাচ্ছি।"

সুলতানা বেগম অবাক হলেন, "কী গো মেহু? এতটুকু বিরিয়ানি খেয়ে উঠে পড়লে যে?!"

"আমার ক্ষিধে নেই আম্মা," মেহজাবিন গাল ফুলিয়ে বলল, "আর কাল সকালে যেহেতু আমাকে প্রফেসরের সামনে ল্যাব রিপোর্ট জমা দিতে হবে, তাই আমার তাড়াতাড়ি ঘুমানো দরকার।"

মেহজাবিন এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সোজা দোতলার রুমে চলে গেল। আরহাম প্লেটের বিরিয়ানি শেষ করে শান্ত হাতে পানির গ্লাসটা মুখে তুলল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে তার ক্লাসরুম মার্কা কথাবার্তা শুনে মেহজাবিন এবার বেশ ভালো রকমের অভিমান করে বসেছে!

-

রাত সাড়ে বারোটা। মির্জা ভিলার দোতলার ঘরগুলো একদম শান্ত, নিঝুম। বাইরে ধানমন্ডির রাস্তায় মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ির হর্নের শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেহজাবিন তাদের শয়নকক্ষের দরজার ছিটকিনি না লাগিয়েই কম্বল গায়ে দিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরে শুয়ে ছিল। তার বুকের ভেতরে ভীষণ রাগ আর অভিমান জমেছে। “লোকটা কেমন রে বাবা! মুখে কোনোদিন একটা ভালোবাসার মিষ্টি কথা বলবে না! সব সময় ধমক, সব সময় শাসন, সব সময় পরীক্ষা! কাল রাতে সিলেটে অতটা কাছে এলো, আজ ট্রেনের ভিআইপি কেবিনে একপ্রকার জোর করে ভালোবাসলো, আর ঢাকায় এসে ডাইনিং টেবিলে আবার সেই বরফ হয়ে গেল!”

হঠাৎ ঘরের দরজার হ্যান্ডেল ঘুরল। রুমের ভেতর ঢুকল আরহাম। তার হাতে কোনো ক্লাসের ফাইল বা ল্যাপটপ নেই। তার এক হাতে সুন্দর একখানা ট্রে, আর সেই ট্রে-তে রয়েছে এক বাটি গরম বিরিয়ানি আর এক গ্লাস ঠাণ্ডা বোরহানি! আরহাম নিজের পা দিয়ে ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে দিল, আর তারপর এক টানে দরজার ভেতরের সিকিউরিটি লক আটকে দিল। লকের আওয়াজ পেতেই মেহজাবিনের গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেল! সে কম্বলের ভেতর আরও একটু গুটিয়ে গেল।

আরহাম ট্রে-টা সাইড টেবিলে রাখল। তারপর একদম নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে বিছানার পাশে বসল। সে খুব শান্ত হাতে কম্বলের এক কোনা ধরে এক টানে মেহজাবিনের মুখ থেকে সরাতে গেল। মেহজাবিন কম্বল আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "সড়ান হাত! আমি ঘুমাব! আমার সাথে কথা বলবেন না!"

আরহাম এক সেকেন্ডও সময় দিল না। সে নিজের প্রকাণ্ড শরীরটা মেহজাবিনের ওপর সামান্য ঝুঁকিয়ে দিয়ে এক টানে কম্বলটা পুরো নিচে নামিয়ে দিল!

"আপনি কী শুরু করছেন বলুন তো?!" মেহজাবিন রেগে গিয়ে সোজা হয়ে বসতে গেল।

কিন্তু আরহাম মেহজাবিনের দুটো নরম কবজি এক হাতে শক্ত করে ধরে তাকে বিছানার তোষকের সাথে চেপে ধরল! আরহামের মুখে সেই কড়া প্রফেসরের গম্ভীর ভাব। সে মেহজাবিনের মুখের ওপর ঝুঁকে এসে খুব নিচু গলায় বলল,

"আম্মার বানানো বিরিয়ানি প্লেটে ফেলে রেখে উঠে এসেছ কেন, মেহজাবিন? তোমার এই অভিমানী নাটকের মাশুল কি আমাকে এখন খাবার কুড়িয়ে এনে দিতে হবে? তুমি কি ভেবেছ মুখে 'ভালোবাসি'র ফালতু খই ফোটালেই বড় প্রেমিক হওয়া যায়? আমি তোমার নাম ধরে ডাকলে ক্লাসরুমের স্টুডেন্টরা ভয়ে কাঁপে, অথচ এই ঘরে তুমি আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাও। অনন্যা তোমার দিকে একটা খারাপ নজর দিয়েছিল বলে আমি তাকে পুরো ডিপার্টমেন্টের সামনে অপমান করে ছুড়ে ফেলেছি। সিলেটের কটেজে আর ট্রেনের কেবিনে আমি তোমাকে কীভাবে নিজের অধিকার দিয়েছি, তা কি তোমার ভোলা মন এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল? আর তুমি বলছ আমি তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিই না?"

মেহজাবিন নিশ্বাস বন্ধ করে আরহামের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহজাবিন কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আ-আপনি... আপনি এত বাজে কথা বলেন কেন? একটু সোজা ভাষায় ভালো কথা বলতে পারেন না?"

আরহাম মেহজাবিনের কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে বলল, "সোজা ভাষা আমার ডিকশনারিতে নেই, মিসেস মির্জা। আমার ভালোবাসার ভাষা একটাই তোমাকে নিজের সীমানায় বন্দি করে রাখা। আর তুমি যে বিরিয়ানি না খেয়ে আম্মার সামনে এই নাটকটা করলে, তার জন্য তোমাকে এখন প্রফেসরের দেওয়া স্পেশাল শাস্তি পেতে হবে। বিরিয়ানিটা আমি নিজের হাতে তোমাকে খাইয়ে দেব, আর তারপর আজকের রাতের এই মির্জা ভিলার বন্ধ ঘরে প্রফেসরের সোহাগ হবে ডাবল!" কথাগুলো শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আরহাম মেহজাবিনকে ছেড়ে সাইড টেবিল থেকে বিরিয়ানির এক চামচ খাবার নিয়ে নিজের হাতে তাকে খাইয়ে দিল। মেহজাবিন আর বারণ করল না। সে আরহামের চওড়া, শক্ত পিঠটা দু হাতে জড়িয়ে ধরল। আরহাম বিরিয়ানির থালাটা একপাশে সরিয়ে রেখে আর দেরি না করে মেহজাবিনকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। তারপর সময় নষ্ট না করে বাতি বন্ধ করে বিছানায় চলে গেল।

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন