'মেয়েটাকে কেমন করে ধ*র্ষণ করা হয়েছে।ইশরে কি বেহাল অবস্থা। ধর্ষ*ণ তো করেছেই তার ওপর আবার খু*ন।'
'শুনেছি এই মেয়ে নাকি নষ্টা?নষ্টাদের মৃ*ত্যু এমন ভাবেই হওয়া উচিত।দেশটা পুরো বিগড়ে ফেলেছে এরা।'
বেশকিছুক্ষণ ধরে এমন নানা বাজে মন্তব্য হিমাদ্রী হিমির কানে ঠেকছে।হিম ধরা হিমেল হাওয়াও আজ তার নিস্তেজ ধরণীকে সুস্থির করতে নিরর্থক। মানুষের মুখের বুলি এমন অ*শ্লীল হয় কি করে?কি এমন আছে ওতে?যা মানুষের হৃদয়ে প্রহার করে বিষা*ক্ত ছুড়ির ন্যায়?মন খারাপের দিনে হিমি নিজের আত্নসতেজতার জন্য বারিধারার ঝিল পার্কে এসে সময় কাটায়।এইখানটায় নির্জন সময় কাটাতে তার বেশ লাগে।মনের মধ্যে প্লাবিত যন্ত্র*ণা গুলো সে ঝিলের ঢেউয়ে উপড়ে ফেলে।কিন্তু আজ মন খারাপের ওপর আরো অগভীর মন খারাপ এসে হানা দিয়েছে হিমির দ্বারে।কারন ঝিলে এসে সে জানতে পারে লা*শের খবর।রাতে বোধ হয় কোনো মেয়েকে ধর্ষ*ন করে নির্মম ভাবে হ*ত্যা করা হয়েছে। আর তারপর লা*শটি ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে ঝিলের স্রোতে। খুনি আসলেই বোকা।ছোট্ট একটি ঝিলে কেও এত বড় একটা প্রমাণ ভাসিয়ে দেয় নাকি?
হিমি একটু মুখ বাকিয়ে হাসল।তার হাসিটি অস্পষ্ট। বোঝা যাচ্ছে না এই হাসিতে কি লুকিয়ে আছে? ইতিমধ্যে আকাশ কালো হয়ে এসেছে।সন্ধ্যা হবে খানিক বাঁধে।হিমি তার হাতে পড়হিত কালো ঘড়িটির দিকে তাকালো।ছয়টা ত্রিশ বাজে।একটু পরই আজান দিবে। পশ্চিমের অম্বরও আজ কালো মেঘে আচ্ছাদিত। প্রগাঢ় বৃষ্টি হবে নিশ্চিত ।কিন্তু বৃষ্টি বিলাসের ইচ্ছে আজ হিমির মনে জাগ্রত হচ্ছে না।মনের মধ্যে শুধুমাত্র জেগে উঠছে কারো জন্য তৈরি হওয়া ব্যাকুলতা। মন গাইছে অপেক্ষার গান।কিন্তু সময় বয়ে যাচ্ছে।হিমি ঝিলের ধারে অবস্থিত কাঠের বেঞ্চেতে বসে আছে।লা*শ দেখার ভিড় বেড়েই চেলছে।বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।তারা এখনো এসে পৌঁছাতে পারে নি। হিমি দূর থেকেই স্পষ্ট লা*শটি দেখতে পাচ্ছে।যা সাদা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে । লা*শের কাছে কাওকে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে না।তাতে হিমির মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।কারন আজ তার মন ভালো না।এমন মন খারাপের দিনে দুনিয়া উলোটপালোট হয়ে গেলেও তার মধ্যে জন্মায় না কোনো অনুভূতি। হঠাৎ দরাজ এক কন্ঠ স্বরে হিমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে। দৃশ্যমান হয় বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী এক তরুণের উজ্জ্বল মুখখানা। চকচকে নিখুঁত দুটো চোখ তারই পানে চেয়ে রয়েছে। এই নেশালো চোখ জোড়ার দিকে তাকালেই মনে হয় এক্ষুনি সে খু*ন হয়ে যাবে। কি এমন আছে ওই চোখে?যা হার মানায় আফিমের ভয়াবহতাকেও? ছেলেটি হিমির পাশে এসে বসল। মাথার কালো কুচকুচে কেশদয় তার হাওয়ায় দোল খাচ্ছে।তাতে ছেলেটি বেশ তৃপ্তি নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।পরনে সাদা রঙের শার্ট।আর কালো প্যান্ট।হাতে দামি ঘড়ি। শার্টে ঝুলিয়ে রেখেছে একটি কালো সানগ্লাস। রোজকার মত আজো তাকে আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। হিমি ছেলেটির কাঁধে মাথা রেখে বলল,
‘আজ তুমি বড্ড দেরি করে ফেলেছ তাসরিফ।’
তাসরিফের চেহারায় অনুসূচনা নেই। তবুও সে মুখ ফুটে হিমির তুলতুলে গালে নিজের হাত রেখে বলল,
‘কি করবো বলো?জানোই তো কাজে ব্যস্ত ছিলাম।যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে তাদের জীবনটাই আসলে এমন। সময়ের অনেক অভাব। সামনে নির্বাচন। তাই ইদানীং আমি একটু ব্যস্ত বলতে পারো।’
হিমি হতাশ কন্ঠে বলল,
‘সে তো তুমি বিগত দু’বছর ধরেই ব্যস্ত।রোজই তো একই কথা বলো। ’
'তুমি কি মিন করছো?দেখো হিমি তোমাকে আমি ভালোবাসি।তাই তোমার ও উচিত আমাকে একটু বোঝা।সারাদিনের ব্যস্তটা ডিঙিয়ে আমি তোমার সাথে দেখা করতে আসি।কিন্তু তুমি? সেই তোমার তেতো কথা উগলে ফেলো আমার সামনে।ভালো লাগে না আমার এসব।'
হিমি কোনো উত্তর দেয় না।তাসরিফ নিজের রাগ দমিয়ে হিমির কপালে একটা চুমু দেয়। হিমির হাতে হাত রেখে বলে,
’ হয়েছে অনেক রাগ অভিমান। এখন চলো তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি।এমনিতে এই জায়গায় আজ ঝামেলা চলছে।মৃ*ত মানুষের আত্মা ঘুরঘুর করছে।সন্ধ্যা হয়েছে তাই এখানে না থাকাই ভালো।’
'সবে মাত্রই তো এলে।একটু বসো না প্লিজ।'
'একটা জরুরি মিটিং আছে।সমাবেশ হবে।আমার তো এখনই সেখানে থাকার কথা ছিলো।কিন্তু আমার কাছে সবার আগে তুমি।তোমাকে রোজ একবার না দেখলে আমার দুনিয়া ঘোলাটে রুপ ধারন করে।'
হিমি খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
'এত মানুষ মেয়েটার লা*শ দেখতে এসেছে। অথচ তুমি নেতা সাহেব হয়ে এত শান্ত কি করে আছো?'
'তোমাকে দেখেই তো কুল পাই না।আমার অন্য কাওকে কখন দেখবো?এছাড়া বে*শ্যাদের লা*শ কে দেখে? আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই ওসব ছাইপাঁশ দেখার।'
'তুমি কি করে জানলে মেয়েটা বে****শ্যা?'
তাসরিফ ভ্রু কুঁচকে হিমির দিকে তাকায়।তারপর স্বাভাবিক হয়ে বলে,
’আরে বোকা মেয়ে! এটা আবার কেমন প্রশ্ন করলে? দেখছো না লোকে বলাবলি করছে। সেখান থেকেই শোনা।’
_
হিমির বাসায় ফিরতে ফিরতে সারে ছয়টা বেজে যায়।কারন রাস্তায় তীব্র জ্যাম ছিলো।বাড়িতে এখন কেওই নেই।তালাবদ্ধ পড়ে আছে বাড়িটা।হিমির কাছে বাড়ির এক্সট্রা চাবি সর্বদা বিরাজ করে।ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতেই কেমন যেনো নিশ্বাসটা বন্ধ হয়ে এলো তার। এটা তার প্রিয় বাড়ি।কিন্তু পরিবারের সদস্য ছাড়া কেমন জেনো আজ একে বড্ড বেমালুম দেখাচ্ছে। তিনতলা বিশিষ্ট এই বাড়িটি বহুকাল আগের । তবুও ১৯৪৮ সালের তৈরিকৃত এই বাড়িটি এখনো শক্ত-পোক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বাড়ির গেটে বিশাল বাগানবিলাস গাছ লাগানো।ফুলে ছেয়ে থাকে সর্বদা সেথা। বাড়িটির নাম "আনন্দবিলাশ"।হিমির দাদা মনসুর আলী খুব শখ করে বাড়িটি বানিয়েছিলেন।যদিও পারিবারিক ব্যবসার জন্য তাকে বেশির ভাগ সময়ই রাজশাহী থাকতে হয়েছে। তাই শখের বাড়িটিতে খুব বেশিদিন আয়েশ করে থাকা হয় নি তার।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে শহিদ হন তিনি।সেই সময় তার তিন ছেলের বয়স খুব একটা বেশি ছিলো না। মনসুর আলীর স্ত্রী আয়েশা বিবি নিজ হাতে কষ্ট করে তিন ছেলেকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়েছেন । যদিও আজ সেই বৃদ্ধ মহিলাও বেঁচে নেই।অনেক গুলো বছর কেটে গিয়েছে তার মৃ*ত্যুর। মনসুর আলীর বড় পুত্র মোর্শোদ আলী,মেজো পুত্র মনির হোসাইন আর ছোট পুত্র মাঈনুল রাহনুমার। মোর্শেদের ঘরে যেমন রয়েছে দুই ছেলে তেমনি মনিরের ঘরেও দুই ছেলে রয়েছে। শুধুমাত্র মাঈনুল রাহনুমার ঘরে জন্মেছে এক ছেলে এবং মেয়ে।মেয়েটা এই বাড়ির সকলের জান। বংশে কোনো মেয়ে ছিলো না বলে সকলের মনেই অনেক আফসোস ছিলো।কিন্তু শেষে সেই আফসোস ঘুচেছে হিমির জন্মের মাধ্যমে। হিমিও সকলকে অনেক ভালোবাসে।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী হিমি।বয়স সবেমাত্র উনিশ ছুঁই ছুঁই।তিনদিন হলো বাড়ির সকলে মিলে গ্রামে গিয়েছেন। এমনিতেও জমি নিয়ে একটা ঝামেলা ছিল তাদের সেখানে। তার ওপর বিয়ের একটা দাওয়াত এসে জুটলো।তাই এক সঙ্গে দুই কাজ সারতে সকলে গ্রামের বাড়ি রাজশাহী গিয়েছেন।হিমির ও যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তার কয়েকদিন পরেই এক্সাম।তাই তাকে একাই এখানে থেকে যেতে হয়।
রাজশাহীতে আজ দুইবছর যাবৎ এ বাড়ির বড় ছেলে ফারদিন আহমেদ ফারিশ পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছে। সারা দিন কাজ নিয়েই ছেলেটা পড়ে থাকে।বংশের সকলের চোখে সে সাক্ষাৎ যোগ্য পুত্র।উপযুক্ত বড় ছেলে। তার দায়িত্ববোধে সকলেই সন্তুষ্ট। ছেলেটি অনেক বিচক্ষণ এবং মেধাবী। শ্যামবর্ণের এই বলিষ্ঠ তরুণ নিশ্চিত নারীদের কা*ঙ্ক্ষিত পুরুষ। কিন্তু হিমি তার ভাইকে নিয়ে কখনো কোনো বাজে চিন্তা করে নি।কেনোই বা করবে? কারন সে বিগত দুই বছর ধরে একজন পুরুষের মায়ায় বাজে ভাবে আসক্ত হয়ে বসে আছে। বিয়ের স্বপ্ন সাজিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এমন এক পুরুষে আসক্ত নারীদের কাছে পৃথিবীর সেরা সুদর্শন পুরুষও তুচ্ছ বেমালুম।
_
ঝর্ণা ছেড়ে হিমি দাড়িয়ে আছে। শরীর ভিজে চপচপে।প্রায় মিনিট ত্রিশ হবে সে এভাবেই দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজায় কড়া নরতেই হিমির হুশ ফিরলো। হিমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
'কে?'
ওপাশ থেকে বজ্রকন্ঠ ভেসে আসল,
‘কিরে হয়েছে তোর? এতক্ষন কি করছিস তুই ওয়াশ রুমে?আমার ক্ষুধা লেগেছে।কিছু রান্না করিস নি কেনো?আমি পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। যদি তুই ওয়াশরুম থেকে না বের হোস তবে আজ অনেক খারাপ হয়ে যাবে।'
হিমির শরীর কেঁপে উঠল। ফারিশ ভাইয়ের গলা না?কিন্তু তার তো রাজশাহী থাকার কথা সে এখানে কি করছে?ভূত না তো আবার?হিমির গা ভয়ে কুঁকড়ে উঠে।পাঁচ মিনিট আর লাগলো না।তিন মিনিটের মধ্যেই হিমি জামা পড়ে বেরিয়ে আসে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই হিমি ফারিশকে তার টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের ফুলদানিটা পর্যবেক্ষণ করতে দেখে।সঙ্গে সঙ্গে তার হৃদয় কেঁপে উঠল। কারন ওই ফুলদানিটা ক'দিন হলো তাসরিফ তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে।যদি এটা কোনো মতে ফারিশ ভাইয়ের কানে যায় তবে সে তাকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁ*তে ফেলবে। প্রেম পিরিতি ফারিশ ভাইয়ের কাছে একটি আনলেস বিষয়। নিজেও যেমন করে না, তেমনি অন্যের প্রেম পীরিতিও তার সহ্য হয় না।কি অদ্ভুত না?অথচ বাড়ির সকলের অগোচরে গিয়ে হিমি দু'বছর ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে তাসরিফের সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। জেনে শুনে নিক্ষেপ করেছে নিজেকে ভয়ানক এক পাপে। ফারিশ ফুলদানিটা জায়গায় রেখে হিমিকে বলল,
‘হয়তো ফুলদানিটা দামী অথচ এটার গায়ে ভালোবাসার গন্ধ লেগে নেই।'
হিমি তার ভাইয়ের এমন উক্তির মানে খুজে পেলো না।
'দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ন্যাকামো করা বাদ দিয়ে যা গিয়ে কিছু একটা রান্না কর। এসব ন্যাকামি আমার একদম সহ্য হয় না।'
চিবুক শক্ত করে বলল ফারিশ।হিমির এবার মরমর অবস্থা। কি এক জ্বালায় পড়লো সে।লোকটা বাড়িতে থাকলে হিমিকে অক্ষরে অক্ষরে সব নিয়ম মেনে চলতে হবে।প্রত্যাকটা মুহুর্তের হিসাব দিতে হবে।
হিমি কাঁপা কাঁপা গলায় হঠাৎ ফারিশকে প্রশ্ন করে,
'ভাইয়া তুমি?কখন এলে?তুমি একা যে? বাকিরা সব কোথায়?আর তুমি বাড়ির দরজা কি করে খুললে?’
'বাকিরা কোথায় মানে?কেনো তুই বুঝি জানিস না?সবাই এখনো রাজশাহী। ফিরবে জলদি।আমার ওইসব নাচ গান, লাফালাফি আমার পছন্দ না।তাই আমি ঢাকা চলে এসেছি।কেনো রে তোর কোনো সমস্যা আছে?আর এ বাড়ির এক্সট্রা চাবি আমার কাছেও আছে গোবররানী।প্রথমে ভেবেছিলাম দুবছর বাড়ি আসি নি।বাড়ির তালাটা বদলে ফেলা হয় নি তো?পরে দেখলাম না, তালাটাও বদলায় নি আর বাড়িটিও না।তবে দু'বছরে তুই কিন্তু বেশ বদলে গেছিস।’
কথাখানা বলেই ফারিশ হনহনিয়ে হিমির রুম থেকে চলে যায়।ফারিশ যেতেই হিমির কান্না করার উপক্রম। বিয়েতে নাচানাচি পছন্দ না তাই বলে একটা মানুষ নিজের সব ব্যবসা-বানিজ্য ফেলে ঢাকা চলে আসতে পারে?
.
হিমি দ্রুত গতিতে রুম থেকে বেড়িয়ে কিচেনে চলে যায়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সে কিচেন থেকে বের হয়ে ফারিশ ভাই বলে হাঁক ছাড়ে।ফারিশ শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন উপন্যাসটি পড়ছিল। হঠাৎ হিমির ডাকে বেশ অবাক হলো সে।মনে মনে শুধাল,
’বাহ এত জলদি রান্নাও শেষ? মেয়েটা অনেক ট্যালেন্ডেড হয়ে গিয়েছে দেখি।’
খাবারের টেবিলে বসতেই ফারিশের চক্ষু চড়কগাছ।
'এটা কি রেঁধেছিস?'
'কেনো চশমা লাগবে নাকি? দেখতে পাচ্ছো না?'
'লাঠি আনবো নাকি?দুবছর ধরে মা'র খাস না তো।'
হিমি ভয় পেয়ে যায়।লোকটার সাথে ভালো করে কথাও বলা যায় না। পুরো একটা কলাগাছ।
ফারিশ হিমির মাথায় একটা ঠোকা মে*রে বলল,
’তুই জানিস না আমি ডিম পছন্দ করি না।এত জলদি সব ভুলে গেছিস? যাকগে আর কিছু রান্না করতে পারিস না?দিন দিন তো বুড়ি হচ্ছিস।এখনো রান্না করতে পারিস না।মা,চাচিদের আহ্লাদের পরিনতি এসব।ক'দিন পর বিয়ে দিলে দেখবো তোর জামাই তোকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।'
হিমির মুখ কালো হয়ে গেলো। মনে মনে সে বলে উঠল,
‘তুমি কি করে জানবে ফারিশ ভাই?আমার বর আমাকে কি করবে?'
'মনের মধ্যে পকপক না করে যা বলার সামনাসামনি বল।'
হিমি আবারো অবাক হলো।কিন্তু সে নিশ্চুপ। ফারিশ কিচেনের দিকে পা বাড়ায়।সঙ্গে অনুসরণ করতে বলে হিমিকেও।বেশ সময় নিয়ে ফারিশ যত্নসহকারে ফ্রিজ থেকে গরুর মাংস বের একা হাতেই তা ভুনা করে। হিমি ফারিশের রান্নার স্কিল দেখে মুগ্ধ। তার ভাই দেখি অলরাউন্ডার।দু'বছর একা রাজশাহীতে থাকতে থাকতে সব শিখে গেছে দেখি। রান্না করার সময় হঠাৎ করে ফারিশ হিমিকে জিজ্ঞেসু কন্ঠে শুধাল,
'আমকে দেখে এমন ভূত দেখার মতো অবাক হচ্ছিস কেনো?তোর না সারপ্রাইজ পছন্দ? তাই তো না বলেই চলে এলাম।কিন্তু এখন দেখছি আমার অপ্রত্যাশিত আগমন তোর একদমই সহ্য হচ্ছে না।’
'না এসব কি বলছো?আসলে হঠাৎ না বলে চলে এসেছো তো তাই।'
'আমার বাড়িতে আসতে হলে তোকে জিজ্ঞেস করে আসতে হবে নাকি?তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছিস না তো আবার?টেম্পু না চালালে আমাকে দেখে তো আর তোর মুখ অমাবস্যার চাঁদ হওয়ার কথা না।'
হিমি আবারো চমকে উঠে।হিমি তার সামনে দন্ডায়মান তাগড়া পুরুষটিকে এখনো ঠিক বুজে উঠতে পারে নি।কিন্তু সে ছোট থেকে একটা বিষয় লক্ষ করেছে।এই ফারিশ ভাই কেমন করে যেনো তার মন খারাপের বিষয়টি ধরে ফেলতে পারতো।কিন্তু কি করে পারতো তা কখনো লোকটিকে হিমির জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠে নি। বোধহয় সাহস করে জিজ্ঞেস করলেও কোনো জবাব মিলতো না তার।
'কিরে বোবায় ধরেছে নাকি?কথা বলছিস না কেনো?'
ফারিশের গম্ভীর স্বরে হিমির হুশ ফিরলো।সঙ্গে সঙ্গে সে জবাব দিলো,
’আরে না কি বলছো ভাইয়া?সামনে পরীক্ষা তার ওপর বিগত দুই বছরে যিনি এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায় নি। সে আজ না বলে হঠাৎ করে বাড়িতে চলে এসেছে।গরুর মাংসও রান্না করছে তাই একটু অদ্ভুত লাগছে আর কি।'
ফারিশ হিমির কথায় প্রত্যাুহর করে না।সে কেনো এখানে এসেছে,কোনো তার জন্য রান্না করছে,কোনো হিমির বিষয়ে তার এত চিন্তা এসব যদি হিমি একবার মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করত!
.
রাত দু'টোর কাছাকাছি। ফারিশ বারান্দার কার্নিশে দাড়িয়ে আপন মনে সিগারেটের ধোঁয়া উরাচ্ছে।ভেবেছিলো ছাদে যাবে কিন্তু কি একটা চিন্তা করে আর তার ছাদে যাওয়া হয় নি।কাল পরশু বাড়ির বাকিরা চলে আসবে।তখন আবার বাড়ি জমে উঠবে। ফারিশ সিগারেটটা ফেলে মুখে একটা সেন্টারফ্রেশ পুরলো।তারপর ধীরগতিতে গিয়ে দাঁড়ালো হিমির দরজার সামনে।মেয়েটা এখনো ঘুমায় নি। উপুর হয়ে ফোনে কার সাথে যেনো বিড়বিড় করে কথা বলছে। হিমির ছোট থেকেই রুমের দরজা খুলে ঘুমানোর অভ্যাস।দরজা বন্ধ করে দিলে তার ফোবিয়া হয়। হিমির পানে চেয়ে ফারিশের বুক ভার হয়ে আসে।সে ক্লান্তি ভরা এক নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজ কক্ষে পাড়ি জমায়।ফারিশের এখনো মনে পড়ে যায় রাজশাহীতে থাকা তাদের পারিবারিক ব্যবসা যখন লাটে উঠে গিয়েছিলো তখন তার বাপ-চাচাদের অবস্থা কতটা খারাপ হয়ে পড়েছিলো।বাবার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না।তাই সেদিন ফারিশ শুধুমাত্র তার বাবার কথা চিন্তা করে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব কাঁধে নেয়।নিজের সব ছেড়ে চলে যায় রাজশাহী।পণ করে রাজশাহীর সমস্যা সমাধান করেই হঠাৎ একদিন সে ফিরবে নিজের চেনা বাড়িতে।আজ সেই সময় হয়েছে।ফারিশ ঠিকই ফিরেছে।অথচ যার জন্য আসা সেই মানুষটা কি আদৌও তাকে বুঝবে? রুমে প্রবেশ করতেই পুরো রুমটায় সে একবার চোখ বুলায়।সব আগের মতোই আছে।বুঝতে হবে না মায়ের হাতের জাদু বলে কথা। রাতে শুধুমাত্র হিমি বিছানার চাদরটা বদলে দিয়ে গিয়েছিলো। ফারিশ বালিশে মাথা রাখতেই তার মনের মধ্যে একটা কবিতা অনবরত স্লোগান তোলা শুরু করে,
"এভাবে বাঁচা যায় না ফারিশ। এটা কোনো জীবন হলো?
পরক্ষণেই সে আবার বলে উঠল,
‘যত ডানা ঝাপটানোর ঝাপটিয়ে নাও।দু'দিন পর তোমার এই ডানা ছেঁটে আমি মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখবো।’
চলবে?
#তুমি_অন্য_গ্রহের_চাঁদ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#সূচনা_পর্ব
(গল্পটি কাজিন রিলেটেড। তবে ভিন্ন ধরনের একটা গল্পে সাজানো।আশা করি আপনাদের এটাও ভালো লাগবে। তাছাড়া এটাও আমার লিখা পুরোনো একটা গল্প। নতুন করে রিপিট করছি।)