ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি অন্য গ্রহর চাঁদ

৯ম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#তুমি_অন্য_গ্রহের_চাঁদ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#শেষ_পর্ব

জীবন রঙ বদলায় প্রতিটি ক্ষণে চিত্রপটের মতোই।যেখানে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা মিশে তৈরি হয় বিচিত্র সব গল্প। এই পরিবর্তন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর। প্রতিটি মুহূর্ত জটিল ধাঁধার মতো, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কোনটা ভালো, আর কোনটা খারাপ, তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে ওঠে।

মানুষ ভালোবাসা কিংবা প্রতারণার জালে আটকে নিজের পথ ভুলে যায়। যখন উপলব্ধি হয় সে ভুল পথে পা বাড়িয়েছে তখন প্রায়শই ভুল শুধরানোর সময় ফুরিয়ে আসে। ফলস্বরূপ, এক তিক্ত আফসোস আর নিজের প্রতি ঘৃণার ভারে জীবন হয়ে ওঠে অসহনীয়। জীবনের এই গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই বেছে নেয় আত্মহ*ত্যার পথ।কিন্তু আত্মহ*ত্যা কি সত্যিই সব সমস্যার সমাধান? এই সিদ্ধান্ত হয়তো জীবনের চিরস্থায়ী সমাপ্তি বটে। তবে তা কোনো সমাধান নয়। আত্নহ*ত্যা হচ্ছে শুধুমাত্র নেহাৎ বোকামি। মনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। যেখানে ব্যক্তি তার জীবনের মূল সুর, লড়াই করার মানসিকতা, আর আশা সব হারায়।

থানার সামনের লোহার বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছে হিমি। চুল খোঁপা করা। পরনে লাল পাড়ের কালো শাড়ি। কালো শাড়িটিও একসময় হয়তো উজ্জ্বল ছিল তবে এখন ক্লান্তপ্রায়। আঁচল গড়িয়ে পড়ে আছে মাটির সঙ্গে।

থানার পাশেই ছোট্ট স্টেশন। দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের শব্দ আর মাঝে মাঝে বয়ে চলা শীতল বাতাসের ঝাপটা জায়গাটাকে আরও নিস্তব্ধ করে তুলেছে। হিমি রেল লাইনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কোনো আশা নেই, নেই কোনো ব্যস্ততা। ঠান্ডা বেশ ভালোই পড়েছে, অথচ সেই ঠান্ডা হিমির শরীরকে ছুঁতে আজ ব্যর্থ। হিমির আজ কিছুতেই কোনো ভাবান্তর নেই। তার সময় আজ অনুভূতির ঊর্ধ্বে চলে গেছে। থমকে থাকা এই মুহূর্তে হিমি নিজেই এক জীবন্ত নিস্তব্ধতার প্রতীক। তার জীবন আজ এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত। তার সমস্ত আশা, স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া একে একে মিলিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার অর্থ তার কাছে এখন শূন্য।হিমির মতো মেয়েদের বাচাঁর কোন অধিকার নেই।তার করা পাপের শাস্তি একটাই, আর তা হলো মৃ*ত্যু।মৃ*ত্যুর তারিখ যত পিছোবে ততই পাপের বোজা বাড়বে।তাকে যতদিন এই পৃথিবীতে থাকতে হবে, ততদিন সে হয়ে থাকবে একটি ভয়ানক বোজা। সমাজের, দুনিয়ার এমনকি নিজের কাছেও।এখন সে শুধুমাত্র মুক্তি চায়,নিজ অপরাধের শাস্তি চায়।এটাই যে তার প্রাপ্য।

হিমির আজ থেকে দু’সপ্তাহ আগের কথা মনে পড়ে যায়। তখন সবকিছু কত স্বাভাবিক ছিল। এই তো সেদিনের কথা, পুরো পরিবারের বাধার দেওয়াল টপকে সে তাসরিফের হাত ধরেছিল। কত সাহস দেখিয়েছিল! মনে হয়েছিল, ভালোবাসার জন্য করা এ লড়াই সার্থক। কিন্তু আজ তাসরিফের কথা মনে হলেই তার মনে তীব্র ঘৃণা আর যন্ত্রণা জেগে উঠে।এমনকি নিজেকেও অসহ্য লাগে।মনে হয়, যদি বিভৎস কোনো উপায়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়া যেত!হিমি নিজের হাতের দিকে তাকায় । মেহেদীর রং এখনো পুরোপুরি মুছেনি। কিন্তু জীবনের সব রঙ যেন এক লহমায় মুছে গেছে। সামনে আর কোনো পথ নেই,কিছুই করার উপায় নেই, সহ্য করার শক্তিও শূন্যের দেয়ার অতিক্রম করেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় ফারিশ চলে যেতেই আনন্দবিলাসের দুয়ার হিমির জন্য পুরোপুরো বন্ধ হয়ে যায়।হিমিকে এই বাড়ির ত্যাজ্য কন্যা হিসেবে ভূষিত করা হয়।হিমির বাবা সকলের সামনেই বলে উঠেন,

'তোর বাবা,তোর পরিবার আজ থেকে মৃ*ত।যার জন্য পুরো পরিবারের হাত ছেড়েছিস তার হাত ধরেই এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।যদি কখনো এই বাড়ির চৌকাঠে আমি তোর ছায়া দেখি তাহলে আমার ম*রা মুখ দেখবি তুই।'

হিমির মনেও সেদিন চিনচিন ব্যাথা অনুভব হয়েছিল।কিন্তু সে কাকে ব্যাথার কথা বলবে?সবাইকে তো সে নিজের ইচ্ছায় ছেড়েছে।সবাই সেদিন হিমির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।শুধুমাত্র তাসরিফ হিমির চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে বলেছিল,

'আমি তোমার পাশে সব সময় আছি।আমার জন্য তুমি এত কিছু ছেড়েছো এ কথা আমি সবসময় স্মরণে রাখব।বাবা-মা সন্তানের ওপর বেশিদিন রাগ করে থাকতে পারে না।দেখবে তোমার পরিবার, তোমার মা-বাবাও তোমাকে ভুলে বেশি দিন থাকতে পারবে না।তাদেরকে একটু সময় দাও।পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে।সব ঠিক হয়ে যাবে।একটা বাচ্চা হয়ে গেলে আর কেউ তোমাকে ফেলতে পারবে না।দূরে সরাতে পারবে না।'

তাসরিফ সকলের সামনে হিমির হাত ধরে বেরিয়ে যায়।হিমির বার বার পেছন ফিরে চাইছিল।সকলের দৃষ্টিতে তার জন্য অসীম ঘৃণা ছাড়া কিছুই নজর কারে নি।খুব কষ্ট হচ্ছিল।যাওয়ার সময় হিমির চোখে চোখ রেখে তাসরিফ বলেছিল,

'এই যে আজকে যেমন ভাবে আমার হাত ধরে এই বাড়ি থেকে তুমি বেরিয়ে যাচ্ছো।একদিন ঠিক এভাবেই তুমি এই বাড়িতে প্রবেশ করবে।সেদিন সবাই আমাদের ভালোবাসাকে মর্যাদা দিবে।তুমি মিলিয়ে নিও হিমি।'

হ্যাঁ যেই মানুষটা ঠিক এভাবেই সেদিন হিমির হাতটা শক্ত করে ধরেছিল আজ সেই মানুষটাই হিমির মৃ*ত্যুর কারন হতে চলেছে।সেদিন রাতেই তাসরিফ হিমিকে সঙ্গে নিয়ে তাসরিফের দেশের বাড়ি চলে আসে।তাসরিফের পুরো পরিবার তখন সেখানেই ছিল।রিপ্তিটাও তাদের সঙ্গেই গিয়েছিল।পরিবারের কোন খোঁজ হিমির কাছে ছিল না।তবুও তাসরিফ তো পাশে আছে এই ভেবে হিমি নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিল।কিন্তু বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই যে হিমির জীবন শেষ হয়ে যাবে তা কে জানত?

হিমির চারদিন আগের কথা মনে পড়ে।আগেরদিন তারা ঢাকায় চলে এসেছিল।কারন তুবার পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে দুইদিন পর বাঁধে ।সেদিন দুপুরে রিপ্তির হঠাৎ শরীর খারাপ হয়।তাই তাসরিফ তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়।বাড়িতে কেউ ছিলো না বিদায় হিমিকে একাই থেকে যেতে হয়।সাধারণত এমন সময় তুবাও বাড়িতে থাকে না।স্কুলে থাকে।কিন্তু সেদিন তুবা বাড়ি জলদি ফিরে আসে।এমনিতে বিয়ের পর তুবা একবারের জন্যও হিমির সঙ্গে দেখা করে নি।কথা বলে নি।কিন্তু সেদিন যখন বাড়িতে কেউ ছিল তখন হিমিকে একা পেয়ে তুবা তার রুমে প্রবেশ করে।তুবাকে নিজ রুমে আসতে থেকে খুব খুশী হয়েছিল হিমি।কিন্তু তুবা হিমিকে এমন কিছু বলে আর এমন কিছু দেখায় যা দেখে হিমির মুখের হাসি এক নিমিষেই উদাও হয়ে যায়।

প্রিয় মানুষের প্রতারণা এমন এক অনুভূতি যা শব্দে বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন। যার জন্য মানুষ নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তার থেকেই যখন অবহেলা কিংবা দূরত্বের দংশন আসে, তখন হৃদয়ের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত নিষ্ঠুর আর্তনাদ। জীবনের সব রং ফিকে হয়ে আসে।স্বপ্নগুলো অকালেই ঝরে পড়ে। বুকের গভীর থেকে উঠে আসে এক শীতল দীর্ঘশ্বাস।যা বলে দেয়, সব কিছু দিয়ে যে সম্পর্ক গড়েছিলাম, সেটাই আজ টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়েছে। অনুভূত হয় বিশ্বাস নামক দালানটা ধসে পড়েছে। আর তার নিচে চাপা পড়েছে হৃদয়ের সমস্ত আশা।এহেন মুহূর্তে অন্তরের ভাষা হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ। চিৎকার করে করা কান্নারাও হয়ে উঠে শব্দহীন। বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত হৃদয়ে এমনভাবে দাগ কাটে যে, সে ক্ষত কখনো শুকোয় না, বরং প্রতিনিয়ত র*ক্ত ঝরায়।

তুবার মাধ্যমে হিমি জানতে পারে, বিগত দুইবছর ধরে চলে আসা এক দুর্দশ পরিকল্পনার শিকার হিমি।তাসরিফ আর রিপ্তি আগ থেকেই স্বামী-স্ত্রী ছিল।হিমিকে শুধুমাত্রই ব্যবহার করেছে তারা।তাসরিফ শুরু থেকেই রিপ্তিকে ভালোবাসে।ভালোবাসার খাতিরেই তাসরিফকে হিমির সঙ্গে প্রেমের মিথ্যা নাটক করতে হয়েছে।সবটাই ছিল কাগজে মোড়ানো একটা মিথ্যা গল্প।রিপ্তির পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম সনাক্তকরণের পর ডাক্তার জানায় বাচ্চা নিলে তার মৃ*ত্যুর ঝুঁকি বাড়বে।কারন তার পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম সহ আরো বেশ কিছু শারিরীক সমস্যা ছিল।যার ফলে বাচ্চা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।যদিও বাচ্চা হয় তবে মা এবং বাচ্চা দু'জনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে।এসব জানার পর তাসরিফ নিজেই রিপ্তিকে বলেছিল,

'আমার কিছুই দরকার নেই।সারাজীবন এভাবেই কাটিয়ে দিব।তবুও চাই তুমি সুস্থ থাকো।আমার পাশেই থাকো।তোমাকে ছাড়া বাঁচা সম্ভব না রিপ্তি।'

রিপ্তি তাসরিফের কাছে সকল প্রকার মানসিক সাপোর্ট পেয়েছে।তবুও তো মনের ভিতর একটা আফসোস থেকেই যায়,সে তাসরিফকে বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করছে।একটা বৈধ বাচ্চার বাবা হওয়া তো সেও ডিজার্ব করে।সেই সময় রিপ্তি একেবারে মরীয়া হয়ে উঠে।অনেকবার হাসপাতাল থেকে বাচ্চা আনতে চেয়েছিল কিন্তু যতই হাসপাতাল থেকে বাচ্চা আনুক বা না আনুক একটা বৈধ বাচ্চার বাবা হওয়া প্রতিটি ছেলের স্বপ্ন।

হিমির সঙ্গে যখন রিপ্তির পরিচয় হয়, যখন তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তখন রিপ্তি ভালোমতোই আন্দাজ করতে পারে হিমি কতটা বোকাসোকা আর অবুঝ।ভালোবেসে বিশ্বাস অর্জন করে তাকে যাই বুঝানো হবে সে তাই বুঝবে।তাই সহজেই তাকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ উসুল করা সম্ভব।যদি তাসরিফ হিমিকে বিয়ে করে তবে একটা বৈধ বাচ্চা তারা পাবেই।আর একবার বাচ্চা হয়ে গেলে হিমির ব্যবস্থা করতে সময় লাগবে না।তখন যে করেই হোক একটা না একটা উপায়ে হিমিকে নিজেদের পথ থেকে সরানো যাবে।তাসরিফ যখন রিপ্তির এহেন পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারে তখন সে রিপ্তিকে সরাসরি নিষেধ করে দেয়।তার দ্বারা এসব করা সম্ভব নয়।রিপ্তি ব্যাতিত অন্য কাউকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া তো দূরে থাক হিমির সঙ্গে মিথ্যা প্রেমের নাটক করাও অসম্ভব।কিন্তু রিপ্তি কার কথা শুনে?সে তো নাছোড় বান্দি।তাসরিফকে রাজি করানোর জন্য শেষমেশ সে আত্নহ*ত্যা পর্যন্ত করতে গিয়েছিলো।দুইবার আত্নহ*ত্যার চেষ্টাও করেছিল।শেষে তাসরিফ এক প্রকার বাধ্য হয়েই এই জঘন্য কাজে নিজেকে শামিল করে।তাসরিফ বাচ্চার জন্য এমন কাজে রাজি হয় নি বরং নিজের স্ত্রীকে ভালো রাখার জন্য এমন কাজে রাজি হয়েছে।নিজের স্ত্রীকে বাঁচাতে যদি তাকে খু*ন করতে হতো তবে তাসরিফ বোধ-হয় তাতেও এক পায়ে রাজি হয়ে যেত।

তাসরিফ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে হিমির ভরসার পাত্র হয়ে উঠে।দুইবছর সে হিমির সঙ্গে প্রেমের মিথ্যা নাটক অব্দি করেছে।তবুও হিমি তাকে কখনো সন্দেহ করার সুযোগ পায় নি।কেমন করেই বা পাবে?অভিনয়ে তো কোনো খুঁত ছিল না।ইচ্ছে করেই তাসরিফ সময় নিয়েছিল কারন তাড়াহুড়ো করতে গেলে দেখা যেত ঘুড়ি আর লাটাই উভয়ই হাতছাড়া।আর হিমির মত শিকার একবার হাতছাড়া হতে জীবন বৃথা। এমন মেয়ে কি সবখানে পাওয়া যায় নাকি?আজ-কাল কার যুগের মানুষের মধ্যে তো সরলতা বেঁচে নেই।সবাই খোলস পড়ে থাকে।সেদিক বিবেচনা করলে হিমি লাখে একজন।রিপ্তি আর তাসরিফ আগেই সব ঠিক করে রেখেছিল। বাচ্চা হওয়ার পর জঘন্য কোন অপবাদ দিয়ে হিমির মুখে ছুঁড়ে দিবে ডিভোর্স পেপার।কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেলে র**ক্তপাতও হয়ে যেতে পারে।

তুবা শুরু থেকেই মূলত এসব কারনে হিমিকে নানা ইঙ্গিতে তাসরিফকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলে।কিন্তু হিমিতো তা বুঝেই নি উল্টো ভেবে নিয়েছে তুবা তাকে অপছন্দ করে।আসলে তুবা এসব বিষয় সম্পর্কে শুরু থেকেই জানত।শুধু যে তুবা জানত তা বললেও ভুল হবে।কারন তাদের পুরো পরিবার এসবের সঙ্গে জড়িত ছিল।তুবা যখন নিজে এসব জানার পর প্রতিবাধ করে তখন তাকেও পরিবারের করা হুমকির মুখোমুখি হতে হয়।তাকে বলা হয় যদি এসব কথা কখনো হিমি কিংবা বাহিরের কারোর কানে যায় তখন তুবা কে এর কড়া মাশুল দিতে হবে। তার শাস্তি পোহাতে হবে হিমিকে। তাই হিমির ভালো চাইলে মুখ বন্ধ রাখতে হবে।হিমির থেকে মেপে মেপে ১০ হাত দূরে থাকতে হবে।এসবের ফলে তুবার আর কিছু বলার সাহস হয়ে উঠে নি।তবুও সে অনেকবার হিমিকে সব খুলে বলার চেষ্টা করেছিলো।চেয়েছিল বিয়েটা যাতে কোনভাবে ভেস্তে দিতে।কিন্তু তা হলো কোথায়?তাসরিফ আর রিপ্তির নজর তো শকুনের মত। চব্বিশ ঘন্টা তার ওপরেই ছিল।আবার কখন কি হয়ে গেল সবার অজান্তে হিমি আর তাসরিফ বিয়েও করে নিল।তাই চাইলেই তার হাতে করার কিছুই ছিল না।বাচ্চা হওয়ার আগ অব্দিই এত যত্ন আর খাতিল হবে হিমির।কিন্তু এর পরে তার জন্য কি অপেক্ষারত তা কল্পনার বাহিরে।তাই এখনো সময় আছে হিমি যদি সবকিছু থেকে দূরে চলে যায় তবে অন্তত নিজের জীবনটা বাঁচাতে পারবে।

সব শুনে হিমির পুরো শরীর শীতল হয়ে শোঁ শোঁ করে কাঁপছে। নিজের কানকে সে কিছুতেই বিশ্বাসই করাতে পারছে না। তুবা তাকে রিপ্তি আর তাসরিফের কাবিন নামার ছবি দেখায়। শুধু তাই নয়, বিয়ের ছবি ও তাদের গোপন এক ভিডিও রেকর্ডও সামনে তুলে ধরে।

হিমি হতবাক । মনের ভেতর অগণিত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যেই ছেলের জন্য সে নিজের পরিবারের মান-সম্মানের তোয়াক্কা করেনি, সেই ছেলেটি তার সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করল কীভাবে? এতটা যত্ন নিয়েও বুঝি প্রতারণা করা যায়?

হিমির মনে মৃ*ত্যুর আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধছে। বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে পরিবারের সেই অসহায়, দুঃখ ভারাক্রান্ত চেহারাগুলো। এখন সে হারে হারে বুঝতে পারছে মাত্র দুইদিনের এক ছেলের জন্য পরিবারের সঙ্গে এমন অবিচার করা কতটা ভুল ছিল।সেই ভুল আজ সে তীব্রভাবে উপলব্ধি করছে।কিন্তু এখন সে যাবে কোথায়? কার কাছে আশ্রয় খুঁজবে? তার পরিবার তো তাকে ত্যাগ করেছে।ত্যাজ্য কন্যা করেছে।

জীবনের সব স্বপ্ন, সব আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো যেন হিমির সামনে এক মুহূর্তেই নিভে গেছে। বুকের গভীরের শূন্যতা আর যন্ত্রণা যেন প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে।

এই তীব্র যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার ভার সহ্য করা অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু এই বেদনার গল্প সে কাদের খুলে বলবে? যাদের সে নিজ হাতে কষ্ট দিয়েছে?সেই পরিবারকে? কোন মুখে হিমি তাদের সামনে যাবে?কি বলবে সবাইকে?

"যে ছেলের জন্য সে সব ছেড়েছে সে একটা প্রতারক " এ কথা বলবে?

সেদিন হিমি তবুও নিজের মনকে বোঝায়।কিছু না কিছু তো একটা হবেই। কিন্তু তার ভাবনারা আবারো বিচলিত হয়ে উঠে।কারন তুবার মাধ্যমে হিমি জানতে পারে তার এবং তাসরিফের বিয়ের দুইদিন পরেই রিপ্তি গর্ভবতী হয়।ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার জানায় তার রোগটি এখন আর নেই।যদিও রোগটি নাকি আরো অনেকদিন আগেই ভালো হয়েছিল কিন্তু রিপ্তি তখন তা জানত না।আজকে দুপুরেও রিপ্তির শরীর খারাপ হয় শুধুমাত্র প্রেসন্যান্সির কারনে।এখন তো রিপ্তি নিজেই সুস্থ। নিজেই বাচ্চার মা হবে দুইদিন পর।তাই এখন কি আর তাদের হিমিকে প্রয়োজন পড়বে?

সবশেষে তুবা সেদিন হিমিকে হাত জোর করেও বলে,

'ফারিশ ভাইকে আমি তো আর চিনি না, জানিও না।কিন্তু তার চোখে আমি তোমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি।এখনো সময় আছে তুমি এখান থেকে চলে যাও।কারন এই বাড়ি তোমার জন্য আর নিরাপদ নয়।ওরা তোমাকে বাঁচতে দিবে না।তুমি ফারিশ ভাইয়ের কাছেই চলে যাও।সে তোমাকে ফেলতে পারবে না।চলে যাও তুমি।নিজের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাও।দেখবে তারা তোমার থেকে কিছুতেই মুখ ফেরাতে পারবে না।তুমি যদি এখান থেকে নিজ ইচ্ছায় চলে যাও।নিজ ইচ্ছায় তাসরিফ ভাইকে ছেড়ে দাও তাহলে তারা তোমাকে কিছুই করবে না।কিন্তু তুমি এখানে থেকে যাওয়ার মানেই হলো নিজের মৃ*ত্যুকে নিজে নিজে ডেকে আনা।’

ভেঙে পড়া হিমি ফারিশের কথা শুনতেই তার ভেতরে তোলপাড় হয়ে যায়।সেদিন ওই মানুটিকে সে সবার সামনে কতবড় আঘাত করেছিল।কি করে সে এখন ফারিশের কাছে যাবে?কিন্তু ফারিশই যে তার শেষ আশা।এই নরকে থাকার চেয়ে ভালো সারাজীবন ফারিশের মুখের কথা শোনা।তাসরিফকে তো অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।হিমির জীবনটা বরবাদ করার জন্য তাকেও চুকাতে হবে মাশুল।সেও দহনে দগ্ধ হবে যেমনটা আজ হিমি হচ্ছে।শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

কারন হিমি যতটা না যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল ততটাই জ্বলে উঠছিল প্রতিশোধের স্পৃহায়।

দুইদিন কেটে যায় হিমির দ্বিধায়।এমন একটা মানুষের সঙ্গে তাকে রাত কাটাতে হচ্ছে যে প্রতিনিয়ত তার সঙ্গে প্রতারণা করেই যাচ্ছে।ধোঁকায় রাখছে।কি সুন্দর তার হাত ধরে, কপালে চুমু দিয়ে বলছে ভালোবাসি।অথচ ভেতরে ভেতরে চলছে তার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরিকল্পনা।হিমির সময় কাটে যন্ত্র*ণা, রাত কাটে নির্ঘুমতায়।সাহস করে ফারিশকে কল অব্দিও করেছে সে।সিম বন্ধ দেখায় প্রতিবার।শেষে আর অপেক্ষা করতে না পেরে মাহবুব ভাইকে কল করে।হিমির কন্ঠ শুনে মাহবুব সেদিন কলটা আর কাটে নি।ভাঙা কন্ঠে হিমির সঙ্গে সে কথা বলেছিল।কেমন যেন একটা ঘৃণা জড়িয়ে ছিল সেই গলায়।তবুও সে কথা বলেছিল।কিন্তু কে জানত হিমিকে আবারো নতুন ধাক্কার মুখোমুখি হতে হবে?নিজের জীবনটা তো নিজে শেষ করেই ফেলেছে,সঙ্গে ফারিশেরও?ফারিশের মৃ*ত্যুর কথা শুনতেই আকাশ ভেঙে পড়ে হিমির মাথায়।শেষ আশাও আজ নিরাশা। মাহবুব আরো জানায় ফারিশের মৃ*ত্যুর পর বড় চাচাও ছেলের শোকে স্ট্রোক করেছে।আনন্দবিলাস এখন দুঃখবিলাস হয়ে গেছে।আনন্দ বিলাসের সব আনন্দ হিমি নিজের হাতে শেষ করেছে।এত পাপ নিয়ে বেঁচে থাকাও একটা মারাত্মক পাপ।সব দুয়ার বন্ধ। এখন না আছে পরিবার,না আছে স্বামী আর না আছে ভালোবাসা। হিমি এখন পথের বৈরাগী।রিপ্তিকে সে নিজের একটা অংশ ভেবেছিল।বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল তারা দুজন।সে সবসময় রিপ্তিকে বোনের চোখে দেখেছে । আচ্ছা বোন কি বোনের সঙ্গে কখনো এমন কাজ করতে পারে?এসব ভাবলেই শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে পড়ে।

এই তো পরশুদিন মাহবুবের সঙ্গে হিমি দেখা করে।একটা ফাইল হাতে দরিয়ে দিয়ে মাহবুব বিনা বাক্যে চলে যায়। যাওয়ার আগে একটা কথাই শুধায়,

'জীবনে বাঁচতে হলে আগে মানুষ চেনা শিখ হিমি।তা না হলে আরো অনেক কিছুই তোকে হারাতে হবে।'

হিমির সেদিন আর কোন কথা গায়ে লাগে নি।কারন সে তো ইতিমধ্যে সব হারিয়েই বসে আছে।হারানোর আর কি বাকি আছে?পরিবার হারিয়েছে,ফারিশকে হারিয়েছে,তাসরিফ আর রিপ্তির কথা কি আর বলবে?

মাহবুব চলে যেতেই, হিমি দ্রুত ফাইলটা খুলে পড়তে শুরু করে। ফাইলের ভেতরের কাগজগুলো যেন একের পর এক চমক ছুঁড়ে দিচ্ছিল তার দিকে। প্রতিটি পাতায় স্পষ্ট প্রমাণ ছিল কানিজ হ*ত্যার। যাওয়ার আগে মাহবুব ভাই বলেছিল,পরদিন সকালে একটা মৃত আত্মা শান্তি পেয়ে যেত। কিন্তু সেই আত্মাকে শান্তি দেওয়ার আগেই আরেকটা আত্মা মৃতর কাঠগড়ায় দাঁড় হয়।"

হিমি তখন সেই কথার মানে না বুঝলেও এমন বুঝতে পারছে। ফারিশ ভাইয়ের পর সকালে থানায় কানিজ হত্যার প্রমান জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সবটা তো সেই রাতেই হিমি শেষ করেছে। মানুষটা ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়ার আগেই হিমি তার জীবন কেড়ে নিয়েছে। অন্যায় করে ফেলেছে তার সঙ্গে। হিমির শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। এটা কি সত্য? এতদিন যে মানুষটিকে সে নিঃশর্তে ভালোবেসে এসেছে, সেই তাসরিফ একজন খু*নী?

হিমির মনের ভেতর অশান্তির ঢেউ বাড়ে।জীবনের এমন চৌরাস্তার মুখে সে কখনো দাঁড়ায়নি। আরো বড় ধাক্কা এল যখন সে ভাবল ফারিশ ভাই তো আগেই তাসরিফের আসল রূপ সম্পর্কে জেনে গিয়েছিল।সেদিন যদি হিমি ফারিশের সতর্কবার্তায় একবার কান দিত, তাহলে কি আজকের এই পরিস্থিতির সম্মুখীন তাকে হতে হতো?

আসল কথা ভালোবাসা হিমিকে সেদিন অন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এখন? এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তার সামনে কি কোনো পথ খোলা আছে? এই সত্য কি হিমি মেনে নিবে? নাকি কি এর বিরুদ্ধে লড়াই করবে? কোনটা করবে হিমি?

-

বাতাসের ঝটকায় হিমি ধ্যান ভেঙে বাস্তবতায় ফিরে আসে। হৃদয়বিদারক স্মৃতিগুলো হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায়। চোখের কোণে অজান্তে জল জমে ওঠে। বুক ভেঙে কাঁদতে ইচ্ছে করলেও সে জানে এই শহরে এখন তার কান্না নিষিদ্ধ। তাকে শক্ত থাকতে হবে, নিজের জন্য নয় বরং ন্যায়ের জন্য।

একবার থানার দিকে তাকায় হিমি। কিছুক্ষণ আগেই সে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেছে। সমস্ত প্রমাণ জমা দিয়ে তাসরিফের নামে থানায় একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে। এখন কানিজ হ*ত্যার বিচারও হবে।মূলত তাসরিফের লোকেরাই মেয়েটাকে ধ*র্ষন করেছিল।কিন্তু এসব যদি জানাজানি হয়ে যেত তাহলে নির্বাচনের আগে অনেক বড় ঝামেলা হয়ে যেতে পারত।তাই তাসরিফ কিছুতেই চাইছিল না একটা সামান্য মেয়ে তার কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াক।তাইতো নিজের লোকেদের নিয়ে সে কানিজকে খু*ন করে রাতের আঁধারে ভাসিয়ে দেয় ঝিলের জলে।টাকা নিয়ে গায়েব করে খু*নের প্রমান

আজ সেই খু*নীর মুখোশ ও বাহিরে চলে আসবে।গত দু’দিন ধরে হিমির ভেতরে চাপা দ্বন্দ্ব চলছিল। প্রেম আর ন্যায়বোধের মধ্যে।আজ দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে সে প্রথমেই থানায় আসে।যতরকম প্রমান তার কাছে ছিল সব প্রমান নিয়ে সে তাসরিফের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।পুলিশ বোধ হয় এতক্ষণে তাসরিফ আর রিপ্তিকে আটক করতে বেড়িয়েও পড়েছে।

আজ তাসরিফের পাশাপাশি প্রতারণার শাস্তি রিপ্তিও পাবে। তারা দুজনই নিজেদের কর্মফল ভোগ করবে।তবে হিমি জানে, সবাই শাস্তি পেলেও তার নিজের কোনো মুক্তি নেই। হয়তো তারও সময় শেষ হয়ে এসেছে। এই জীবন আর এখন তার কাছে কোনো মূল্য রাখে না। সব বাসনা, সব স্বপ্ন একে একে হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও যেন আজ শেষ হয়ে গেছে। তবু, ন্যায়ের জন্য তার শেষ চেষ্টাটা সে করেছে। আফসোসের আর কিছু বাকি নেই।একসময় যে জীবনকে ভালোবেসে সে আঁকড়ে ধরেছিল, আজ সেই জীবনকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যই তার এত আয়োজন।

-

গোধূলির শেষ আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। আকাশের রঙ মিশে গেছে গাঢ় লালে, যেন হিমির মনোভাবের প্রতিচ্ছবি। রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে হিমি গভীর নিঃশ্বাস নেয়। চারপাশে নীরবতা, শুধু দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে ট্রেনের মৃদু গর্জন।

অকস্মাৎ হিমির মনের পর্দায় ভেসে ওঠে ফারিশের মুখ। সেই উজ্জ্বল চোখ, যার ভেতর কেবল তার জন্য ভালোবাসা ছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে সে ধরে রাখতে পারলো কোথায়? তার নিজের ভুলে, নিজের দুর্বলতায়, সে ফারিশের সুন্দর জীবনটা কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে।

"তোমাকে আর একা থাকতে হবে না, ফারিশ ভাই।আমি আসছি।"

মনে মনে আওড়ায় হিমি। তার কণ্ঠ বাতাসের সঙ্গে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে।

হিমির মনে পড়ে যায় পরিবারের কথা। বাবার রাগ, মায়ের কান্না, ভাইদের শাসন সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়ে। কিন্তু সে তো সবার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। মেয়ে হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে, সে ব্যর্থ। বাবার সেই কথাগুলো তার মনে বারবার ফিরে আসে, "এই বাড়িতে এলে আমার ম*রা মুখ দেখবি।"

ইচ্ছে ছিল শেষবার তাদের দেখে আসার। কিন্তু সাহস হয়নি। কী বলবে? কীভাবে বোঝাবে?হিমি চায় না তার উপস্থিতি আরেকটা মৃ*ত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াক।

রেললাইনের কাঁপুনিটা এখন স্পষ্ট। দূরের আলোটা বড় হচ্ছে। ধীরে ধীরে ট্রেনের ঝনঝন শব্দটা বাড়ছে।হিমির পায়ের নিচের কাঁকড় গুলো কাঁপছে, কিন্তু তার মন অদ্ভুত স্থির। হিমি রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়। আকাশ তখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে।হিমি দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ফারিশের হাসি মাখা মুখখানা কল্পনা করে।মনে মনে শুধায়,

'ফারিশ ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিও।এই সুন্দর পৃথিবী আমার মত পাপী আর নিকৃষ্ট নারীর জন্য নয়।আমার বেঁচে থাকার আর কোন কারন নেই।যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন শুধু বোজা বইতে হবে।পাপ বাড়বে। আমি জানি আত্ন*হ*ত্যা মহা পাপ।তবে আমি তো অনেক আগেই ভেতর থেকে মা*রা গেছি।মৃ*তরা আত্ন*হত্যা করলেও কি আর না করলেও বা কি।'

হঠাৎ ট্রেনের আলো হিমিট শরীরকে গ্রাস করে। একটি প্রচণ্ড শব্দে চারপাশ থেমে যায়।দূরে ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে যায়। নিস্তব্ধ প্রকৃতি যেন আবারও শ্বাস নিতে শুরু করে। তবে এবার হিমির অনুপস্থিতিতে।হিমির বেদনার গল্প শেষ হয়।কিন্তু রেললাইনের উপর চিরকাল থেকে যায় তার শেষ সিদ্ধান্তের চিহ্ন।

-

চারদিকে তীব্র শীতের দাপট। বিকেলের মিষ্টি আলো আর অসাধারণ সুন্দর পরিবেশ ঢেকে গেছে ঘন কুয়াশার চাদরে। মাহবুব সবে মাত্র কবর জিয়ারত শেষ করেছে। দুটি কবর পাশাপাশি শায়িত।

একটির গায়ে খোদাই করে লিখা ফারদিন আহমেদ ফারশি অন্যটিতে হিমাদ্রি হিমি। এই তো ফারিশের ভালোবাসা চিরকালের জন্য তার পাশে জায়গা পেয়েছে।এভাবে তারা একসঙ্গে থাকবে অনন্তকালের জন্য। তাদের মাঝে আর কোনো তাসরিফের প্রবেশাধিকার নেই, কোনো প্রতারক ঠাঁই পাবে না।।বরং তারা সুন্দর ভাবেই চির নিদ্রায় পাশাপাশি শুয়ে থাকবে।কারন তাসরিফ আর রিপ্তি এখন তাদের উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে ।হিমির চাপা যন্ত্রণারাও আজ মুক্ত। কানিজ হ*ত্যারও বিচার হয়েছে।এখন আর হিমির ওপর আনন্দবিলাসের কেউ রেগে নেই।হিমির বাবার মেয়ের প্রতি কোন অভিমান নেই। উল্টো তাদের আদরের মেয়েটিই তীব্র অভিমান নিয়ে নি*শংস ভাবে ধরনীর মায়া ত্যাগ করেছে।ফারিশের মৃ*ত্যুর দুই সপ্তাহ যেতে না যেতে এই বাড়ির আরেকটা চাঁদ খসে পড়েছে।

আজ সবাই তাদের প্রাপ্য শাস্তি ঠিকই পেয়েছে, কিন্তু মাঝখান থেকে ফারিশ বিনা অপরাধে মৃ*ত্যুর শাস্তি ভোগ করল। একটি নিষ্পাপ প্রাণের এহেন মৃ*ত্যু কি প্রকৃতির ন্যায়বিচার হতে পারে?

মানুষ মরণশীল, কিন্তু এমন করুণ মৃ*ত্যু কি ফারিশের প্রাপ্য ছিল? তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ভালোবাসার স্বপ্নে রচিত। তবু কেন তাকে এমন অপ্রত্যাশিত এবং অযাচিত পরিস্থিতির শিকার হতে হলো?

আর হিমি? সে কী করল? নিজের অপরাধের ভার সইতে না পেরে নিজেই নিজের বিচারক হয়ে আত্মহ*ত্যার পথ বেছে নিল?কিন্তু সত্যিই কি এই আত্মহ*ত্যা তাকে মুক্তি দিয়েছে?

হিমি হয়তো ভেবেছিল, নিজেকে শেষ করে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু জীবন তো এত সহজ নয়।এখন হিমির বাবা-মায়ের অভিমান মুছে গেলেও বুকে জমাট বেঁধেছে এক অশেষ শূন্যতা।সন্তানের লা*শের খাটিয়া বহন করা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা কেবল একজন পিতাই ভালো জানেন।

আত্মহ*ত্যা কখনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বরং এটি আরও বড় এক সমস্যার জন্ম দেয়। আর এই পদক্ষেপ হিমিকে কোনো মুক্তি দেয়নি বরং এটি আরো অনেকগুলো জীবনকে একত্রে বিষাদময় করে দিয়ে গেছে।

ফারিশের অকালে ঝরে যাওয়া জীবন আর হিমির আত্মহ*ত্যা এই দুটি ঘটনা শুধু মৃ*ত্যু নয় এগুলো ভালোবাসা, প্রতারণা, এবং অপরাধের এক জটিল গল্পের সমাপ্তি। যার ক্ষত পুরো পরিবারকে সারাটা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

মানুষ প্রকৃতপক্ষে এক অদ্ভুত সৃষ্টি। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও, তারা এমন সব ভুল করে, যা তাদের জীবনে অকাল মৃ*ত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কখনো ভুল সিদ্ধান্ত, কখনো সঠিক ভাবনার অভাব, আবার কখনো আবেগপ্রবণ হয়ে নেওয়া ভুল পদক্ষেপ সবকিছুই একটি সাজানো জীবনকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট।

বন্ধু হোক কিংবা ভালোবাসার মানুষ,উভয়ের নির্বাচন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি সেখানে ভুল হয়, তবে তার মূল্য দিতে হয় চিরস্থায়ী আক্ষেপ আর হতাশায়। বিশেষ করে যখন ভালোবাসার মানুষকে বেছে নিতে গিয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা হয়, তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয় তখন সেটি হয় আরও বেশি বেদনাদায়ক। কারণ এমন ভুলের মাশুল কেবল নিজের নয়, পরিবারকেও ভোগ করতে হয়।

হিমির গল্পটিই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। তার একটি ভুল সিদ্ধান্ত সাজানো-গোছানো পরিবারকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সে হারিয়ে ফেলেছে তার সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষটিকেও।আফসোস,মৃ*ত্যুর আগ মুহূর্তেও যেই মানুষটি হিমির দেওয়া সব কষ্ট সয়ে, এক হাসি মাখা মুখে তাকে স্মরন করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল,হিমি সময় থাকতে সেই মানুষটিকে চিনতে পারল না।পরিণতির পথে, হিমি নিজের স্বামী এবং প্রিয় বান্ধবীর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলল। পরিবারের কাছে তাকে হতে হলো ত্যাজ্য কন্যা, আর ফারিশের হ*ত্যার কারন হয়ে সমাজের চোখে হয়ে উঠল সে এক অপমানিত নিকৃষ্ট নারী।সবশেষে চারপাশের ঘৃণা, অবহেলা এবং তীব্র একাকীত্বের ভার সইতে না পেরে, হিমিকে আত্মহ*ত্যার পথ বেছে নিলো।

সময়ের স্রোতে হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ ভুলে যাবে এই ভুলে ভরা গল্পগুলো, জীবন চলবে নিজের গতিতে। তবে হিমি আর ফারিশের অপূর্ণ প্রেমের গল্প কেবল একটি করুণ কল্পকথা হয়ে রয়ে যাবে। তাদের সেই না হওয়া ভালোবাসা, যা বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে আঘাত পেয়ে কখনো পূর্ণতা পায়নি, তা কেবল স্মৃতির ধূসর ছায়ায় হারিয়ে যাবে।

এ গল্প শুধু ভালোবাসার নয়, এটি বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, এবং জীবনের অপূর্ণতার গভীর বেদনার প্রতিচ্ছবি। হিমির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ আর কখনো ফিরে আসে না।তাই জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আবেগ নয়, যুক্তি এবং বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তই কখনো কখনো পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।নিজের সঙ্গে গ্রাস করতে পারে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সকলের সুখকেও।কেড়ে নিতে তাদের গুছানো স্বপ্ন।

(সমাপ্ত)

(সকলের গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি। আর গল্প থেকে কি শিক্ষা নিলেন সেই বিষয়েও জানাবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন