#পরাণ_ছোঁয়ার_বাহানা
পর্ব: ১৩
কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে একটু বিকাল হয়ে যায় অরনীর। গেট খুলে ঢুকতেই বারান্দায় এক অপরিচিতাকে কিছুটা থমকে যায় সে। লম্বা গড়নের সরু কায়ার একটা মেয়ে আঁখি বেগমের পাশে বসে যাঁতি দিয়ে সুপারি কাটছে। বেশ লম্বা রেশমের মতো চুল খোলা অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শাড়ি পরিহিতা মেয়েটাকে দেখে একটু অবাক হয়ে যায় অরনী। কে ও?
"খালা আর যা-ই বলো, তোমার বাড়িতে আলাদাই একটা শান্তি পাই। পরিবেশটাই এতো স্নিগ্ধ এই বাড়ির।"
আঁখি বেগম পান মুখে পুড়তে পুড়তে বললো,"সে খুব জানি আমি। বছরান্তে একবার খালার খোঁজটাও নিস না।"
"ও কথা বলো না। আমার তো প্রায়ই ইচ্ছা হয় তোমার কাছে ছুটে আসতে। পড়াশোনা আছে তো বলো? তবে এবার এক মাস আমি আছি তোমার কাছে। তুমি তাড়িয়ে দিলেও যাচ্ছি না।"
আঁখি বেগম হাসে। কিছু বলার আগেই তার চোখ যায় উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা অরনীর দিকে। ভ্রু কুঁচকে সে তাকিয়ে আছে অচেনা মেয়েটার দিকে। আঁখি বেগম তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়।
"মা গো তুমি এসেছো? আজ এতো দেরি হলো যে? মুখটা শুকিয়ে কতোটুকু হয়ে আছে।"
অরনী ম্লান হাসে, কিন্তু তার দৃষ্টি এখনো মেয়েটার দিকে। মেয়েটা সুন্দর। গায়ের রঙ চাপা হলেও চেহারায় এমন কিছু আছে যা থেকে সহসাই চোখ সরিয়ে নেওয়া যায়না। বিশেষ করে চোখ দু'টো আকর্ষণীয় বেশি, যাকে বলে আয়তলোচনা।
মেয়েটাও উঠে দাঁড়ায়। শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বারান্দা ছেড়ে অরনীর দিকে এগিয়ে আসে। তার মুখে অদ্ভুত একটা হাসি, হাসছে কেনো কে জানে!
"খালা এইটা বুঝি আমাদের নতুন বউ?"
আঁখি বেগম মুখ টিপে হেসে বললো,"নতুন বউ কি রে? ভাবী বল। বয়সে তোর চেয়ে ছোট হলেও সম্পর্কে কিন্তু তোর ভাবী হয়।"
মেয়েটা জিভ কামড়ে বললো,"হ্যা ঠিকই তো। কিন্তু খালা ইমতিয়াজ ভাই কিন্তু জিতেছে। ভাবী দুর্দান্ত সুন্দরী।"
আঁখি বেগম এগিয়ে এসে অরনীর হাত ধরে।
"আর জ্বালাস না তো মেয়েটাকে। তোর দুষ্টু স্বভাবের কথা ও জানেনা। জানবে কি করে? ও তো তোকে চিনেই না।"
"তো তুমি চিনিয়ে দাও। মাস খানিক আমাকে সহ্য করতে হবে বলে কথা। চেনাপরিচয় হওয়া জরুরি।"
আঁখি বেগম অরনীর দিকে তাকিয়ে বললো,"ও তোমার আরেকটা ননদ। আমার ছোট বোনের মেয়ে, ইলোরা। মাস্টার্স শেষ করলো মাত্র। নিবন্ধনের পরীক্ষা দিবে, তাই এখানে কিছুদিন থাকবে। ইমতিয়াজের কাছে পড়বে এই এক মাস।"
অরনী জোর করে হেসে বললো,"ও আচ্ছা।"
ইলোরা হাই তুলে বললো,"ননদ না বলে উনার না হওয়া সতীন বলো খালা। ইমতিয়াজ ভাইকে কিন্তু আমারই হওয়ার কথা ছিলো। শেষ সময়ে তোমার ছেলে এমন ছক্কা মারলো যে বল বাউন্ডারি থেকেই আউট হয়ে গেলো। এটা ঠিক হলো না।"
আচমকাই মাথায় আগুন ধরে যায় অরনীর। রক্তলাল চোখে তাকায় ইলোরার দিকে। মেয়েটা কুটকুট করে হাসছে। অরনী থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আঁখি বেগম কপট রেগে বললো,"একদম আমার অরনীকে জ্বালাবি না ইলু। ফাজিল কোথাকার।"
অরনী ধাতস্থ হতে পারেনা তারপরেও। গলা শুকিয়ে আসে কেমন। এই মেয়ের সাথে ইমতিয়াজের বিয়ের কথা ছিলো? তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না তো আবার?
ইলোরা অরনীর হাত ধরে। অরনী ইতস্তত করে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তার বরফ শীতল হাতের স্পর্শে ইলোরা মুচকি হাসে।
"এ কি? তুমি দেখি রীতিমতো ঘামতে শুরু করলে। ভয় পেলে নাকি নতুন ভাবী?"
অরনী ওড়না দিয়ে কপাল মোছে।
"ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠছে না। গরমে ঘেমে যাওয়াটা তো খুব স্বাভাবিক, তাইনা?"
ইলোরা চমৎকৃত হয় অরনীর জোরালো কণ্ঠ শুনে।
"বাহ খালা, আমাদের ভাবী দেখি দুর্দান্ত কথা জানে। আমার সাথে জমবে ভালো, বলো?"
অরনী বিরক্ত হয় কিছুটা, উপরে প্রকাশ করেনা।
"শোনো নতুন ভাবী, তোমার দুইটা ননদ নিশ্চয়ই তোমার সাথে তেমন মজা করেনা। ভাবীদের সাথে ননদেরা যদি একটু মজা না করে কীভাবে হবে? তোমাদের বিয়ের সময় আমার মাস্টার্সের ফাইনাল চলছিলো। এজন্যই তো আসতে পারলাম না। এবার দেখো এই এক মাস কতো আনন্দ করি তোমাদের সাথে।"
অরনী স্মিত হেসে বললো,"দেখা যাবে।"
ধুপধাপ করে পা ফেলে অরনী বারান্দায় উঠে যায়। হঠাৎই দেখে ঘর থেকে ইমতিয়াজ বের হচ্ছে। তার পরনে সেই একই সাদা শার্ট, কালো জিন্স, এলোমেলো চুল সাজিয়ে আঁচড়ানোর ব্যর্থ প্রয়াস। আলাদা কিছুই না, তবু অরনীর কেনো যেনো মনে হচ্ছে ইমতিয়াজ আজ একটু বেশি সেজেছে! অতিরিক্ত কিছু চোখে পড়ছে না তবুও অরনী তা মানতে নারাজ। তারচেয়ে বড় কথা ইমতিয়াজ কোচিং এর জন্য বেরোতে এতো দেরি করেনা। আজকেই কেনো দেরি করছে? ওই মেয়েটার জন্য? রাগটা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। খুব তো ঘরনী ঘরনী করে মুখে ফেনা তুলে ফেলা। ইচ্ছা করছে তুলে একটা আছাড় দিতে।
ইমতিয়াজ অরনীর দিকে এগিয়ে আসে। তার শরীর থেকে দামী পারফিউমের গন্ধ আসে৷ অরনী ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে। এতো পারফিউম লাগিয়ে কোচিং-এ যাওয়ার প্রয়োজন কি?
"আপনি ফিরেছেন?"
অরনী উত্তর দেয়না। এই মুহুর্তে এই লোকটার দিকে তাকাতেও ইচ্ছা করছে না তার। কোনো কারণ নেই, এমনিতেই।
"আচ্ছা, হাতমুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিন।"
ইমতিয়াজ আর দাঁড়ায় না। ঘড়ির বেল্ট হাতে লাগাতে লাগাতে নেমে যায়।
বাইক স্টার্ট দেওয়ার সময় ইলোরা ইমতিয়াজের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। অরনী বারান্দা থেকেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। ঘন ঘন তপ্ত শ্বাস পড়ে তার।
"ইমতিয়াজ ভাই।"
ইমতিয়াজ ইলোরার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,"কি বলবি?"
"কখন ফিরবেন?"
"রোজ যখন ফিরি তখন। সন্ধ্যার পর, রাতও হয়ে যায় অনেক সময়।"
ইলোরা আদুরে গলায় বললো,"আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবেন।"
"কেনো আজ কি?"
"ওমা! আজ আমি এসেছি না? তাছাড়া পড়াশোনা শুরু করে দিতে হবে না? মাত্র এক মাস আছে পরীক্ষার।"
ইমতিয়াজ উত্তর দেয়না।
"আর একটা কথা।"
"দ্রুত বল, খুব দ্রুত।"
"তাড়াহুড়োতে শাড়ি আনতে ভুলে গেছি। মাত্র একটা শাড়ি এনেছি। আপনি তো জানেন, আমার মাঝে মাঝে একটু শাড়ি পরতে মন চায়। আপনি কি আসার সময় আমার জন্য একটা শাড়ি নিয়ে আসবেন? নীল রঙের শাড়ি।"
"আচ্ছা আনবো। আর কিছু?"
ইলোরা বাঁকা চোখে অরনীর দিকে তাকায়। অরনী এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের রংঢং দেখছে। তাদের বললে ভুল হবে। তার দৃষ্টি শুধু ইমতিয়াজের দিকে।
"না আর কিছু না। আপনার বউ যেভাবে তাকিয়ে আছে। আর কিছু চাইলে মেরেই বসবে এবার আমাকে।"
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে অরনীর দিকে তাকায়। অরনী অপ্রস্তুত হয়ে যায় সাথে সাথে।
"আপনার কিছু লাগবে অরনী?"
অরনী ইমতিয়াজের কথার উত্তর না দিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে চলে যায়। ইলোরা হাসতে হাসতে খোঁপা করে চুলে। যেনো ভীষণ মজা পাচ্ছে কোনো একটা কারণে।
ইমতিয়াজ কিছু বুঝতে পারেনা। অবশ্য মেয়েদের মন মেজাজ বোঝার মতো জ্ঞান তার হয়নি। তার বাবারই হয়নি, তার বাবারও হয়নি। কোনো পুরুষেরই বোধহয় হবে না এই পৃথিবীতে।
★
খাটের উপর অশান্ত ভাবে পা দোলাচ্ছে অরনী। সামনেই খাবার ঢাকা দেওয়া, আঁখি বেগম এসে দিয়ে গেছে। অরনী ছুঁয়েও দেখেনি। যদিও খিদা পেয়েছিলো ভীষণ, বাড়ি ঢোকার পর আর খিদা নেই। অযথাই সব রাগ যেয়ে পড়ছে ইমতিয়াজের দিকে।
খাটের উপর ইমতিয়াজের নতুন জামাকাপড় রাখা, নিশ্চয়ই ওই মেয়েটা এনেছে।
অরনী বিড়বিড় করে বললো,"আমি আসার আগে খুব মজামাস্তি হচ্ছিলো বোধহয়। দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেনা। অসভ্য লোক একটা।"
হঠাৎ দরজায় কারো ছায়া দেখে অরনী মুখ তুলে তাকায়। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিলো ইমতিয়াজ ফিরে এসেছে। আশ্চর্য! সে এসব কেনো চাচ্ছে? কেনোই বা ভাবছে? একটু বেশি ছেলেমানুষী হয়ে যাচ্ছে না?
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে তার। তার দাদা যতদিন বেঁচে ছিলো ততদিন তার দাদী টুকটুকে লাল শাড়ি পরতো, চুলে কলপ দিতো, হাতে সবসময় মেহেদী দিয়ে রাখতো। যদি কেউ বলতো, তোমার এসবের বয়স আছে? সে বলতো, স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমরা মেয়েরা এমন ছোট বাচ্চা-ই থাকি সবসময়। অরনী কি তবে...?
"মীরা তুমি?"
মীরা তীক্ষ্ণ চোখে টেবিলে খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে।
অরনী বুঝতে পারেনা কি বলবে। মীরা সচারাচর তার ঘরে আসেনা। আসলেও তার ভাইয়ের কাছে কোনো দরকারে। অরনীর সাথে বিশেষ কথা হয়না তার।
"তুমি এখনো খাবার খাওনি কেনো?"
তার কণ্ঠে কর্তৃত্বের সুর। অরনীর পছন্দ হয়না ব্যাপারটা।
"কি হলো? এখনো খাবারটা ওভাবে রেখে দিয়েছো কেনো? নষ্ট হয়ে যাবে না এভাবে থাকলে?"
অরনী দাঁতে দাঁত চেপে বললো,"আমার খিদে নেই।"
"না থাকলে খাবারটা ফ্রিজে রেখে দিতে। তোমার বাপের বাড়ি হতে পারে অনেক বড়লোক। তারা অনেক খাবার নষ্ট করে, ফেলে দেয়। আমরা তো তা নই জানো ভালো করে। আমরা খাবার নষ্ট করিনা, পছন্দও করিনা।"
মীরা চলে যায়। অরনীর অসম্ভব রাগ হলে চোখে পানি চলে আসে। সে ওই অবস্থাতেই শুয়ে পড়ে খাটের উপর গুটিশুটি মেরে। এই বাড়িটা অসহ্য লাগছে তার হঠাৎ। মনে হচ্ছে এখানে সে আর বেশিদিন থাকতে পারবে না। একটা বছর কেনো দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে না? মনের বিরুদ্ধে জোর করে নিজেকে কোথাও আটকে রাখতে নেই। এতে মন মরে যায়। শরীর বেঁচে থাকলেও মন যদি বেঁচে না থাকে তাহলে সে বেঁচে থাকায় কোনো স্বার্থকতা নেই। বাবার উপর অভিমান জন্মে হঠাৎই। নিজের উপরও জন্মে রাগ। কেনো মনকে পরিবর্তন করে ফেলছিলো সে বিগত দিনগুলোতে? কারণটা কি?
★
অরনী কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে সে জানেনা। ঘুম ভাঙে তার টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দে। চোখ দু'টো আস্তে আস্তে মেলতেই ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকায় সামনের দিকে। ইমতিয়াজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার দৃষ্টিতে মাদকতা। শার্টের উপরের দু'টো বোতাম খোলা, হাতা গুটানো। চুল চুঁইয়ে পানি পড়ছে, মনে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজেছে সে।
তড়িঘড়ি করে উঠে বসে অরনী। দেওয়াল ঘড়িতে সময় জানান দিচ্ছে নয়টা চল্লিশ। সে কি কথা! এতো ঘুমিয়েছে সে? আর এই লোকটাই বা কখন এসেছে। চুপচাপ বসে আছে কেনো এভাবে?
"ঘুম ভেঙেছে?"
অরনী সদ্য ঘুম ভাঙা ফোলা চোখে বিছানায় বসে থাকে। ইমতিয়াজের কথার উত্তর দেয়না।
ইমতিয়াজ নিজের চেয়ারটা আরেকটু এগিয়ে আনে অরনীর দিকে। অরনী সরু চোখে তাকায় সেদিকে।
"কি হয়েছে আপনার?"
"কি হবে?"
"বিকাল থেকে দেখছি মুখটা বাংলার পাঁচ বানিয়ে রেখেছেন। সারাদিন বাইরে খাটাখাটুনি করে এমন মুখ তো দেখতে চাইনা আমি। যে কয়দিন আমার কাছে আছেন একটু হাসিখুশি থাকেন। তার জন্য যা দরকার আমি দিবো।"
অরনী ঝাঁঝিয়ে ওঠে সাথে সাথেই।
"আমি দেখতে খারাপ এমনই। সারাদিন বাইরে খাটাখাটুনি করে বাড়ি ফিরে যাকে দেখতে ভালো লাগবে তাকেই বিয়ে করতেন। শুধু শুধু আমাকে বিয়ে করে নিজেকে এতো কষ্ট দিচ্ছেন কেনো?"
ইমতিয়াজ হতভম্ব হয়ে যায় অরনীর কথা শুনে। অরনী কিছুটা ইতস্তত করলেও নিজেকে সামলে নেয়। না, অনেক দূর্বল হয়েছে সে। আর না।
"অরনী...."
"আমি আবার ঘুমাবো। দয়া করে বিরক্ত করবেন না। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।"
এই বলে অরনী আবার শুয়ে পড়ে। আচমকাই বাম হাতে হ্যাঁচকা টান পড়ায় হতভম্ব হয়ে যায় সে। ইমতিয়াজ তার হাত ধরে তাকে উঠে বসিয়েছে।
"কি সমস্যা আপনার? হাত টানাটানি করছেন কেনো?"
"আপনার কি সমস্যা তাই বলুন আগে। দুপুরেও কিছু খাননি। রাতের খাবারটা খেয়ে তারপর ঘুমাবেন। সবাই অপেক্ষা করছে।"
"করুক অপেক্ষা, আমি যাবো না।"
ইমতিয়াজ সাধারণত রেগে যায়না। অরনীর উপর প্রশ্নই ওঠে না। তবে আজ বেসামাল লাগছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছে।
ইমতিয়াজ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে শান্ত গলায় বললো,"খেয়ে এসে ঘুমাবেন। একটু পর ঘুমালে কিছু হবে না।"
"এক কথা বার বার বলবেন না। বললাম না ঘুমাবো আমি? যান এখান থেকে।"
ইমতিয়াজ অরনীর হাত ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কপালের উপর জড়ো হওয়া ভেজা চুল গুলো হাত দিয়ে পিছনে ঠেলে দেয়।
"আপনি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিবেন না। আমি মানুষটা এতোটাও ভালো নই। আপনার যদি সত্যিই আমাদের ভালো না লাগে তবে চলে যান। জোর করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা আমার পছন্দ নয়, আমি তা চাইও না। এসব অশান্তি আমার ভালো লাগছে না। আমার বাবা মা কেনো এসব সহ্য করবে বলুন তো? তাদের তো দোষ নেই। দোষ করলে আমি করেছি। আপনার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম, সে যা বলবে আমি তা করবো। ফলস্বরূপ আপনার অনুমতি না নিয়েই আপনাকে বিয়ে করা। আমার ভুলের শাস্তি আমার পরিবার পাবে না। সকালে তৈরি থাকবেন, আপনাকে আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিবো আমি। আপনার বাবার হাতে আপনাকে তুলে দিয়ে বলবো আমাকে যেনো ক্ষমা করে দেয়। ভয় নেই, আমাকে আর দেখতে হবে না আপনাকে।"
খুব দ্রুত কথাগুলো শেষ করে ইমতিয়াজ বেরিয়ে যায়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তার বাইকের শব্দে সচকিত হয় অরনী।
নিজের অবাধ্য অভিমানের মাত্রা কি একটু বেশি সীমা ছাড়িয়ে গেলো?
ভাবতে ভাবতে অরনী উঠে দাঁড়ায়। সারাদিন না খাওয়ায় মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে তার। হাত দিয়ে ঠেকাতে যায় কিন্তু পারেনা।
মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে কেউ তার হাত ধরে ফেলে। অরনী চমকে উঠে তাকায়।
নতুন নীল শাড়ি পরিহিতা ইলোরাকে দেখে আবারও ভয়াবহ রাগ ওঠে তার। এতো সুন্দর শাড়িটা তাহলে ইমতিয়াজ এনেছে তার জন্য? কই তাকে তো কখনো এমন সুন্দর শাড়ি এনে দেয়নি। বউভাতের শাড়িটা পরেনি বলে?
"ভাবী তুমি ঠিক আছো?"
অরনী উত্তর দেয়না। মেয়েটা আবারও হাসছে। অরনীর সহ্য হয়না হাসিটা।
"ঝগড়া হয়েছে তোমাদের মধ্যে? ইমতিয়াজ ভাই যে চলে গেলো।"
অরনী ম্লান হেসে বললো,"ব্যক্তিগত ব্যাপার আপনাকে কেনো বলবো?"
ইলোরা বিচলিত হয়না অরনীর কথায়।
"শোনো ভাবী, তোমাকে একটা কথা বলি। পুরুষ মানুষকে সবসময় আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়। মানুষটা মাত্র এলো, ঝগড়া করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে ছাড়লে? এভাবে কি সংসার টিকবে?"
অরনী কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথায় জমা হওয়া হাজার শব্দগুলোকে বাক্যে রূপ দিতে থাকে। নাহলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে তীব্র রাগে।
"শুনুন মিস ইলোরা। পুরুষ মানুষ কোনো বস্তু নয় যে তাদের আঁচলে বেঁধে রাখতে হবে। যে আমার, সে পুরোটাই আমার। তাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। আর যে আমার নয়, তাকে আমি চাইও না। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আপনি কি দয়া করে আমাকে একটু একা থাকতে দিবেন?"
ইলোরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চলে যায়। তার মুখের হাসিটা কমে না যদিও।
অরনী ধপ করে খাটের উপর বসে পড়ে। সত্যিই কি কাল এ বাড়ি থেকে চলে যাবে সে? বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো? কিন্তু এতো রাতে সে কোথায় গেলো? অরনী জানালা খুলে দেয়। জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যে খুব বললো, 'যে আমার সে পুরোটাই আমার। তাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। আর যে আমার নয়, তাকে আমি চাইও না।'
ইমতিয়াজ কি আসলেই তার?
(চলবে.....)
[ভালো না লাগলেও ভালো ভালো কমেন্ট করবেন সবাই। নাহলে মন খারাপ কব্বো🙃]