ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার আলাদিন

৬৩তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফুরকান

#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৬৩ (প্রথমাংশ)

ক্লাবের পাশে পার্কিং লট। মাঝারি আকৃতির আধুনিক ডিজাইনের গ্যারাজের ভেতরটা আধো আলো আধো ছায়ায় পরিবেষ্টিত। কোনো মানুষ নেই, সকলেই ক্লাবের ভেতরে। সাইবান অরণ্যকে টেনে নিয়ে গেল সেখানে। অরণ্য যে গাড়িতে করে এসেছে সেটাও এখানে পার্ক করে রাখা আছে। কালো রঙের মার্সিডিজ। সেই গাড়ির সামনে থেমে দাঁড়াল সাইবান। অরণ্যর হাতটা ছেড়ে দিল। অতঃপর অতর্কিতে উল্টো ঘুরে মোক্ষম এক ঘুষি বসিয়ে দিল অরণ্যর চোয়ালে। হঠাৎ আক্রমণ আশা করেনি অরণ্য। ঘুষির জোরে সে ছিটকে গিয়ে ধাক্কা খেল গাড়ির দরজায়। দাঁতে লেগে ঠোঁট কে*টে গেল, মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ পেল সে। সাইবান একদম স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয়নি। দুহাতে ভেজা চুল এলোমেলো করে সে ঠোঁটে জিভ চালিয়ে অরণ্যকে দেখল। হাসল হালকা,

“কেঁদেকেটে জজ সাহেবাকে বিচার দিস। বলিস, আলাদিন আমাকে মেরেছে, ভ্যাঅ্যাঅ্যা!”

বাচ্চাদের মতন ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নার ভং ধরল সাইবান। তার এমন ব্যাঙ্গে অরণ্য অপমানিত বোধ করার থেকে বেশি বিনোদন অনুভব করল। বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা এক বিন্দু র*ক্ত মুছে নিয়ে তীর্যক হাসল।

“কাজী অফিসে বিয়ে পড়ানো হয় জানতাম। এখন দেখছি বক্সিং ম্যাচও হয়।”

“আয় তবে বক্সিং শেষে বাসর করি। মন ভরে দেখিস যা যা দেখার, চোরের মতন লুকিয়ে নজর দিতে হবে না আর।”

অরণ্য কাঁধ নাড়িয়ে ঘাড় একবার এদিক আরেকবার ওদিক করল। বুঝি মাংসপেশীর সঞ্চালন ঠিকঠাক করে নিল। তারপর প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টিতে দেখল সাইবানকে।

“তোকে দেখি না। দেখি তোর ভাগ্যকে।”

“এজন্যই তো বলি। আজকাল ভাগ্যটা এমন চ্যালচেলিয়ে চাঙ্গে উঠছে কেন! শকুনের নজর লেগেছে বলে কথা!”

এবার শব্দ করে হাসল অরণ্য। নিজের গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সাইবানকে। রগচটে, বাউন্ডুলে এবং বেপরোয়া এক অস্তিত্ব। সামান্যতম ভয় নেই, নেই পরিণতির চিন্তা। গুরুতর মুহূর্তও তার কাছে বিনোদন। এমন কাউকে আগে কখনো মোকাবেলা করেনি অরণ্য। তাই এই খেলাটা তার কাছে জমজমাট লাগছে। নিজের উপর অরণ্যর কুটিল দৃষ্টি সহ্য হলোনা সাইবানের।

“ভালোয় ভালোয় বলছি শুনে রাখ, তুই যদি ভেবে থাকিস আবার একটা সিনক্রিয়েট করে আমাকে কোর্টে ফাঁসানোর চেষ্টা করবি, তাহলে এমন সিন ক্রিয়েট করব যে হাসপাতাল থেকে কোর্টে যাওয়ার মতন অবস্থায়ই থাকবিনা। তোকে টপকে যদি আমাকে জেল খাটতে হয়, আমি হাসতে হাসতে জেলে যাব, গট ইট?”

সাইবানের চেহারায় ঝরে পড়ল তীব্র ক্রোধ এবং সতর্কবানী। অরণ্য এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিছু না বলে পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। লাইটার দিয়ে ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে লম্বা এক সুখটান দিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর মাথা কাত করে সরাসরি সাইবানের চোখের দিকে তাকিয়ে শুধাল,

“তুই আমাকে এত ঘৃণা করিস কেন? বউয়ের কথায়?”

সাইবানের ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো। পাল্টা কিছু বললনা সে। অরণ্য নিজে থেকেই সিগারেট টানতে টানতে বলে গেল,

“আমি তো এসেছিলাম পুরুষ হিসাবে আরেক পুরুষের উপর দরদ দেখাতে।”

“তোর দরদ তোর কিডনিতে ভরে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব।”

“ব্রেইন ওয়াশড?”

সাইবান থামল। অরণ্য ধীরপায়ে তাকে ঘিরে তার চারিপাশে বৃত্তাকার পথে হাঁটতে লাগল। বলল,

“শুনেছিলাম তোদের জেনারেশনের ছেলেপিলেরা অনেক বুদ্ধিমান হয়। তোর বেলায় কি বুদ্ধি উল্টো পথে হেঁটেছে? নাহলে তুই- ই ভাব, তোর মতন একটা ইয়াং ছেলে এখন একটা মহিলা আর আরেক পুরুষের বাচ্চাকে নিয়ে কোর্ট কাচারিতে দৌঁড়ে জুতার তলা ক্ষয় করছে, কেন? তোর জীবনটা এমন সাদাকালো হওয়ার কথা ছিল? উঁহু, রঙে রঙে রঙিন হওয়ার কথা ছিল।”

সাইবানের দুই হাতের মুঠো শক্ত হলো।

“কি বলতে চাইছিস তুই?”

“এটাই যে, দুই পক্ষের কথা তো আদালতেও শোনে। তুই কেন এক পক্ষের কথা শুনে অবুঝ শিশুর মতন লাফাচ্ছিস? পৃথিবীর মহামানবেরা বলে গিয়েছেন, এই জাতিকে একটা মিথ্যা বিনোদন দিয়ে বসিয়ে রাখো, জাতি আর প্রশ্ন করবেনা।”

থামল অরণ্য। সিগারেট অর্ধেক ফুরিয়েছে। সেটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষতে লাগল,

“তোর মনে হয় না তোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সাইবান?”

অরণ্য বুঝি প্রথমবার সাইবানের নামটা উচ্চারণ করল। তাতে মস্তিষ্কে কেমন যেন দপদপে একটা অনুভূতি হলো। বিষাক্ত এক কন্ঠ, তাতে বিষাক্ত উচ্চারণ।

“তোকে ইরাম কি বলেছে? ও কেন আমাকে ছেড়েছে? কখনো এটা বলেছে আমি কেন ওকে ছেড়েছি?”

সাইবান শক্ত একটি ঢোক গিলল। বলার মতন শব্দ খুঁজে পেলনা। তাকে নির্বাক লক্ষ্য করে মৃদু হাসল অরণ্য। ওভারকোটের পকেটে দুহাত ভরে এগিয়ে এলো,

“শি ইয মাচ গ্রেটার প্লেয়ার দ্যান বোথ অব আস।”

একটু থেমে পরক্ষণেই অরণ্য বলল,

“দেনমোহর ব্যবসায়ী।"

সাইবান হতবিহ্বল হলো। ইচ্ছা হলো অরণ্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। চোখ বুঁজে বহু কষ্টে নিজের অন্তরকে সামলাল সে। রাগের মাথায় আর কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না। চোখ খুলে মাথা কাত করে সে তাই বিরক্তি প্রকাশ করল,

“এক্সকিউজ মি?"

অরণ্যর মাঝে বিশেষ হেলদোল নেই। সে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“আমাদের বিয়ের দেনমোহরের টাকা দিয়ে কি করেছে জানিস?"

“না জানিনা। জানতেও চাইনা।"

“ঘুষ খাইয়ে ভাইকে চাকরি দিয়েছে।"

সাইবান মানা করলেও উত্তর দিল অরণ্য। যেন কানে যায়নি তার কোনোকিছু। পাল্টা শুধাল,

“তোর দেনমোহরের টাকা কত?"

”তোকে বলব কেন?"

“না বল। এটুকু বল যে এখনো দিয়ে দিসনি। নাকি আহাম্মকের মতন দিয়ে ফেলেছিস?"

সাইবান মুখ খুললেও কিছু বলতে পারলনা। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অরণ্যর দিকে। অরণ্য উত্তর বুঝে তীর্যক হাসল, বলল,

“পাখির তবে নতুন খাঁচায় উড়াল দিতে বিশেষ দেরী নেই।"

“তোকে আমি শেষ ওয়ার্নিং দিচ্ছি, এরপরেও যদি চুপ না করিস, যা হবে তার জন্য আমি দায়ী থাকবনা।”

সাইবানের সতর্কবার্তার বিপরীতে অরণ্য শুধু শব্দহীন হাসল,

“এমনটাই হয়। মানুষ সত্যের মুখোমুখি হতে ভীষণ ভয় পায়। প্রশ্ন করতে ভয় পায়। পাছে তার আঁকড়ে ধরা বিশ্বাসটুকু যদি ভেঙে যায়? তোর মাথায় যে অন্ধবিশ্বাসের পরত পড়েছে, তার বিপরীতে নিজের মাথা ঠুকে মরার ইচ্ছা আমার নেই। শুধু একটাই কথা বলব, শুনে রাখ। তোর বউ এতই সতী সাবিত্রী যে তার গর্ভের বীজটা আদৌ আমার কিনা সেই নিয়েও সন্দেহ হয়।”

কালো। অন্ধকার। সাইবান চোখের সামনে শুধু সেটাই দেখতে পেল। তার জ্বলজ্বলে নয়নাভিরাম চোখজোড়া হুট করেই কেমন ঘোলাটে হয়ে উঠল। এতক্ষণ যাবৎ যে নিয়ন্ত্রণের লাগাম টেনে ধরেছিল তার অন্তর, সেই লাগাম এক লহমায় অদৃশ্য হলো। অরণ্য একটি ঢোক গিলল। এতক্ষণ যাবৎ সামনে একজন মানুষ থাকলেও এখন ভিন্ন কেউ আছে এমনটাই মনে হচ্ছে তার। প্রতিক্রিয়া করার সময়টুকু অব্দি পাওয়া গেলনা। সাইবান তড়িৎ গতিতে এগোল, এতটা ক্ষীপ্র সেই আক্রমণ যে চোখে দেখতেও বেগ পোহাতে হলো। অরণ্য শুধু অনুভব করল, রীতিমত হাওয়ায় ভাসতে শুরু করেছে সে। তারপরই তার ভারীক্কি পুরুষালী শরীরটা আছড়ে পড়ল গাড়ির বনেটের উপর। ধাতুর বনেট মহৎ জোরে খানিক দেবে গেল। অঙ্গ প্রত্যঙ্গে তীব্র ব্যাথা টের পেল অরণ্য। বুঝতে পারল, তার শ্বাসরোধ হয়েছে। সাইবান দুই হাতে জোরালোভাবে তার গলা চে*পে ধরে রেখেছে। ছটফট করেও লাভ হলনা। নিজেকে ছাড়াতে পারলনা অরণ্য। ঝাপসা চোখে দেখল নিজের উপর ঝুঁকে থাকা হিংস্র মুখটা। এক নীরব পিশাচ যেন। ঘাড়ে এবং কপালে ফুলে উঠেছে নীলচে শিরা। দপদপ করছে হৃদস্পন্দন তীব্র ক্রোধের তাড়নায়। সাইবান নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে সম্পূর্ণ। তার কণ্ঠটাও অদ্ভুতুড়ে শোনাল,

“এত সন্দেহ নিয়ে বেঁচে আছিস কেন? জাহান্নামে যা।”

“ক্ষক…ক্বক..!”

অরণ্য কোনো কথা বলতে পারলনা। তার অবরুদ্ধ গলা বেয়ে ম্রিয়মাণ শব্দ বেরোল। সাইবান একচুল ছাড় দিলনা। হাতের জোর ক্রমশ বাড়াল। ঝুঁকে এসে অরণ্যর আতঙ্কিত চোখের মাঝে নিজের অসহনীয় দৃষ্টি মিলিয়ে বলে উঠল,

“অন্ধ? হ্যাঁ, আমি শুধু অন্ধ না, আমার ছোট্ট সুখের দুনিয়ার জন্য আমি অন্ধ রাক্ষস। এই অন্ধের সামনে আয়না দেখানোর চেষ্টা করবি না, ওই আয়না ভেঙেচুরে তোর বুকেই সিল মেরে দেব!”

সাইবানের কব্জি খামচে ধরল অরণ্য। ধারাল নখের আঁচড় পড়ল ত্বকে, লাল ঘা ফুটে উঠল। অথচ বিন্দুমাত্র টললনা সাইবান। মেঘের ঘর্ষণের ন্যায় গর্জন তুলল,

“বউ সতী সাবিত্রী না? তুই কোন ভাগাড়ের পুঃত পবিত্র? কতজনের জীবন নষ্ট করেছিস? কত জনের গায়ে কাপুরুষের মতন হাত তুলেছিস? হাড় চিবিয়ে ফেলে দিয়েছিস, সেই হাড় নিয়ে এখন এত সুড়সুড়ি লাগে কেন? পরের সুখ সহ্য হয়না? মেইল ইগোতে জ্বলে? যে তোর কপালে ঝাঁটা মেরে এক রমণী বেজায় সুখে আছে?”

অরণ্য চোখে কিছুই প্রায় দেখতে পাচ্ছে না এখন। বুকের ভেতর অক্সিজেনের প্রচন্ড অভাব। শুধু কানে সাইবানের গমগমে কন্ঠস্বর ভেসে আসছে,

“সত্যটা তোকে আমি বলি জঙ্গল মির্জা! তোর শরীরে অনেক কুরকুরানি, এক নারীতে চৈত্র মাসের কুত্তার উত্তেজনা মেটে না। তাই তুই পরনারীতে মেতেছিস। এখন কেন মেতেছিস, সেটা তো তোর দুই ইঞ্চির ব্রেইনকে জাস্টিফাই করতে হবে। এজন্য তুই অত্যাচার শুরু করলি। নিজেকে ডমিনেটিভ রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলি। কাল্পনিক খুঁত বের করে নিলি। রান্নায় লবণ কম হলে বউ পেটানো পুরুষগুলোর মতন। ওহ, তুই তো আবার সেই জেনারেশনেরই পাবলিক! নিজের তৈরি করা ধূসর দুনিয়ায় তুই নিজেই এখন বন্দী। তোর ইগোতে উষ্টা মেরে কেউ সুখে থাকছে সেটা তোর মতন স্যাডিস্টের সহ্য হবে কেন? এখন তুই চাচ্ছিস, আমার মধ্যেও সেই ইগো জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু তোকে বলে রাখি, এই সাইবান আলাদিন মাচা টি খায় ঠিকই, তবে ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। তোর ইগো তুই তোর ঝোলায় রাখ। সব নারী বেঈমান বলে গাইতে গাইতে গিলতে গিলতে রাস্তায় পড়ে ম*রে থাক। পৃথিবীর কারো কিছু যায় আসবেনা। আন্ডারস্ট্যান্ড? পরেরবার আমি হাতের কাজ শুধু কথায় শেষ করব না।”

অরণ্যকে ছেড়ে দিল সাইবান। হুট করে বাতাস গ্রহণ করতে পেরে ভীষণ জোরে কাশতে লাগল অরণ্য। গাড়ি থেকে পিছল খেয়ে মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ল। গলায় দাগ বসে গিয়েছে তার। সাইবানের লম্বাটে আঙুলের ছাপ সেখানে স্পষ্ট। নিজের হাত ঝাড়া দিয়ে সরে দাঁড়াল সাইবান। যেন ঘৃণিত বস্তু দেখছে কোনো।

“একটা কথা ঠিকই বলেছিস তুই। বীজ তোর না, আমার। ইরাম কিবরিয়া আমার, সাহরান আলাদিন আমার। দূর দূরান্তে কোনো জঙ্গলের নাম নিশানা নেই!”

এটুকুই। আর দাঁড়ালনা সাইবান। উল্টো ঘুরে হনহন করে বেরিয়ে গেল। একবারও পিছন ফিরে তাকালনা। অরণ্য নিজের স্থানেই হাঁপাতে লাগল। মাটিতে তার দুহাত মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। সমস্ত শরীর কাঁপছে। মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে বিধায় দেখা যাচ্ছেনা, এই অবস্থাতেও তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে আছে!

─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──

ভোররাত। বারান্দা থেকে আসা মৃদু আলো মায়ার জাল বিছিয়ে রেখেছে বেডরুমজুড়ে। ইরাম ঘুমে আচ্ছন্ন। আজ সাইবান বাড়িতে নেই তাই ইযান তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখছিল ইরাম। সে মেঘের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হুট করে মেঘ সরে গেল তার পায়ের নিচ থেকে। তক্ষুণি সে নিচে পড়ে যেতে লাগল। এমন সময়েই নিজের কোমরে উষ্ম স্পর্শ পেয়ে ইরাম চমকে উঠল। ঘুম ভেঙে গেল এক লহমায়। কেঁপে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে পাশ ফিরতে চাইলেও পারলনা। কেউ তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে নিজের বুকের সঙ্গে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড ইরাম কিছু টের পেলনা। অতঃপর অতি চেনা সুবাসটুকু নাকে গেল তার। তৎক্ষণাৎ আতঙ্ক দূরীভুত হলো। মাথা কাত করে তাকাল ইরাম। অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমের ভেতর অতি মৃদু আভায় কাঙ্ক্ষিত মুখটা নজরে এলো।

“আলাদিন।”

ঘুম জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করল ইরাম। সাইবান হুট করে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। মাথা গুঁজে দিল অর্ধাঙ্গিনীর বুকের ভেতর। যেন শিশুটি সে, আশ্রয় খুঁজছে নমনীয়তায়। ইরামের ঘুম অনেকটা কেটে গেল। মস্তিষ্ক সতর্ক হলো। সাইবানের চুলে আঙুল চালিয়ে সে শুধাল,

“কি হয়েছে?”

“অশান্তি লাগছে। আপনার বুকে একটু ঘুমাতে দেবেন?”

প্রশ্নটায় এত মায়া, এত আবেগ যে ইরামের মন মোমের মতো গলে গেল। সাইবানকে আগলে নিল সে পরিপূর্ণভাবে। পিঠে আর মাথায় নরম হাত বোলাতে লাগল। তার ইচ্ছা হলো সাইবানকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে, শো তে গিয়ে কি এমন হয়েছে। কিন্ত এই নাজুক মুহূর্তে সেটা করতে ইচ্ছা হলনা। তাই সে ফিসফিস করল,

“সব অশান্তি কেটে যাবে। ঘুমাও তুমি।”

সাইবান বড় করে প্রশ্বাস টানল। তার বুকে আরও শক্তভাবে লেপ্টে গেল। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“আমার পোটলা কোথায়?”

“আমার পাশেই ঘুমাচ্ছে।”

সাইবান ইরামের কোমরের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওপাশে চিৎ হয়ে ঘুমাতে থাকা ছোট্ট ইযানকে ছুঁয়ে দিল। বাচ্চাটা দুহাত মুখের কাছে মুঠো পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে। সাইবান সেই মুঠো পাকানো হাতের একটা নিজের হাতে শক্তভাবে ধরল। তার বিশাল হাতে ইযানের হাতটা ছোট্ট এক অস্তিত্বমাত্র। তবুও মনে হলো, ছোট্ট এক চারাগাছ আজ বিশাল এক বটগাছকে শক্তি যোগাচ্ছে। সম্পূর্ণ ঘটনায় ইরাম বেশ অবাক হলো। নিজের আলিঙ্গনের জোর বাড়াল। সাইবান তাকে আর ইযানকে ধরে ওভাবেই শুয়ে রইল। যেন পৃথিবীতে এই দুজন মাত্র ব্যক্তিই আছে যারা তাকে শান্তি দিতে পারে।

“আপনাকে ভালোবাসি। জানেন তো? তাইনা?”

গমগমে শোনাল সাইবানের কন্ঠটা। ইরাম শক্ত একটা ঢোক গিলল।

“হুম। জানি।”

“ওকে। নিশ্চিত হচ্ছিলাম।”

এটুকুই। সাইবান আর কিছু বললনা। ইরামও চুপটি করে রইল স্বামীকে বুকে রেখে। অথচ, সাইবানের অশান্তি দূর করতে গিয়ে মাত্রই তার নিজের অশান্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। কেন এমন করছে ছেলেটা?

—চলবে—

#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৬৩ (শেষাংশ)

“হ্যাঁ। আমি তো বললামই ক্লায়েন্টকে আগামীকালের মধ্যে ডিটেইলস বুঝিয়ে দিতে হবে।”

এক হাতে ফোন কানে চেপে রেখেছে মিসির। অন্য হাতে ব্রিফকেস, সেই বাহুতে ঝুলছে কোট। অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে ব্রিফকেসটা সোফায় রেখে ফোন কানবদল করল সে। হেঁটে হেঁটে গেল বেডরুমের দিকে।

“নো। আ’ম নট হেয়ারিং এক্সকিউজেস এনিমোর। যদি ও না পারে তবে নেক্সট মাস থেকে ওকে রাখা যাবে না। ওর সিভিতে এক্সপার্টাইজ দেখেই হায়ার….”

মিসিরের কথা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে গেল। বেডরুমের ভেতর পা রাখতেই চোখের সামনে সে যা দেখল এরপর যেকোনো পুরুষই হয়ত নিজের শব্দ গুলিয়ে ফেলবে। বেডরুমের বিছানায় বসে আছে সারিকা। সে বসে আছে এটা আজব ব্যাপার নয়, আজব হলো তার পোশাক। কিছুদিন আগে কচুপাতা রঙের উপর জরির কাজ করা যে শাড়িটা মিসির পছন্দ করে কিনে দিয়েছিল, সেই শাড়ি পরনে সারিকার। অথচ আজ তাদের কোনো দাওয়াত নেই। মিসির তাই বিস্মিত হলো। মেয়েটার কোমর সমান লম্বা চুল পিঠ ভাসিয়ে নেমে গিয়েছে নিচে। বেডরুমের নরম আলোর প্রতিফলনে সুদর্শনাকে অসম্ভব জেল্লাদার লাগছে। নিজের স্ত্রী বলেই বুঝি মিসির চোখ ফেরাতে পারলনা। আনমনে ফোনে বলল,

“আমি তোমাকে পরে কল দিচ্ছি।”

এটুকু বলেই ফোনটা কেটে দিল সে। ততক্ষণে সারিকা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। শাড়ির আঁচলটা ঠিকঠাক করে পায়ে পায়ে মিসিরের কাছে পৌঁছাল সে।

“আজ দেরী করে এলে যে? আমি দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি।”

মিসিরের ভ্রু উঁচু হলো। স্ত্রীকে না চাইতেও আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে বাধ্য হলো সে। অজান্তেই গালে হালকা লালিমা ফুটল। বিব্রতবোধ লোকাতে হাত মুখে ঠেকিয়ে মৃদু গলায় জানাল,

“একটা মিটিংয়ে দেরী হয়ে গিয়েছে। কিন্ত আজ তো কোনো দাওয়াত নেই, সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলে কেন?”

“দাওয়াত থাকলেই সাজতে হয়? স্বামীর জন্য সাজা যায়না?”

মিসিরের চেহারার লাল ভাবটা আরও গাঢ় হলো। তার গালে খুব সূক্ষ্ম একটা টোল পরে। ভালোমত না তাকালে বোঝা যায়না। ওই সূক্ষ্ম টোলখানি সারিকার ভীষণ পছন্দের। মিসির গলা খাঁকারি দিল,

“আমার জন্য সাজগোজের কি আছে? তুমি যেভাবে কমফোর্টেবল তেমনি ঠিক আছে।”

“কেন? আমাকে দেখতে খারাপ লাগছে?”

সারিকা শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে চারপাশে ঘুরতে লাগল। তার চুলগুলো দোল খেয়ে উড়ে বেড়াল বাতাসে। মিসির মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যটার উপর থেকে সে চোখ ফেরাতে পারলনা। বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল তার! নাহ, আর দূর্বল হওয়ার সুযোগ নেই। হাত বাড়িয়ে খপ করে সারিকার কব্জি ধরে থামিয়ে ফেলল মিসির। বলল,

“বদলে নাও। আমি একটা শাওয়ার নিয়ে আসছি।”

হাত থেকে কোট রেখে দিয়ে মিসির দ্রুত টাই খুলতে লাগল। কাজকর্মে তাড়াহুড়ো তার। যত জলদি আড়াল হতে পারবে ততই মঙ্গল। তবে তার মনোবাসনা পূর্ণ হলোনা। বাথরুমের দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে সারিকা তার হাত ধরে ফেলল। বিষণ্ন কন্ঠে শুধাল,

“আমি কি খুব খারাপ, মিসির?”

মিসির বরফখন্ডে পরিণত হলো। খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। সারিকার চেহারার ঔজ্জ্বল্য ফিকে হয়ে এসেছে। তাতে মাখা বিষাদের আবরণ। চোখদুটো শীতল আতঙ্কে ভরপুর। মিসিরের হাতের লম্বাটে আঙুলগুলো নিজের নরম দুহাতে নিয়ে মিনমিন করে সে বলল,

“তুমি সত্যিই আমাকে তালাক দিতে চাও?”

এবার ঘাবড়াল মিসির। ভীষণ ঘাবড়াল। সারিকার সঙ্গে তার সংসার বছরখানেকের। এর আগে কখনোই এমন আচরণ করেনি মেয়েটি। ঘুরে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে কাছে টেনে নিল মিসির। লতানো দুহাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে গভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি তালাক চাওনা?”

সারিকার শুকনো চোখে অশ্রু টলটল করে উঠল হঠাৎ। জোরে জোরে ডানে বামে মাথা নাড়ল সে। রীতিমত ফিসফিস করে জানাল,

“আমি সেদিন তোমাকে তালাকের কথা বলতে চাইছিলাম না। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলাম।”

মিসিরের মনে হলো তার গোটা দুনিয়া দুলে উঠেছে। সারিকার চোখের অশ্রুজল তার বুকে ছু*রির ঘা বসিয়ে দিল বুঝি। কীভাবে কি করবে বোধগম্য হলোনা। দুহাত তার সামান্য কাঁপল দ্বিধাদ্বন্দ্বে। সারিকা অবশ্য থেমে নেই, সে গড়গড় করে বলে যাচ্ছে,

“আমি জানি, মানুষ হিসাবে আমি পারফেক্ট না। আমার মাঝে অনেক খুঁত আছে। অতীতের মায়াজালে আজও আমি বন্দী। কোনোকিছুই আমার দোষ না। দোষ শুধু একটাই, সেটা হলো এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা না করা। তুমি যেমন নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছ, আমি তেমন করে পারিনি। আজও নিজের প্রথম প্রেমকে দেখলে এই বেহায়া অন্তরকে আমি সামলাতে পারিনা। আমাদের মাঝে যত অসম্পূর্ণতা, তার সবটুকু দায় আমার এবং শুধুমাত্র আমার।”

মিসিরের ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো। অথচ সে হাজার চাইতেও কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলনা। সারিকা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। উভয়ের ধরে রাখা হাতের পানে।

“আমি তোমার সঙ্গে অনেক অন্যায় করেছি, মিসির। হয়ত সেটাকে অনুভূতির প্রতারণাও বলা যায়। নিজেকে সুযোগ দেয়ার কথা আমি ভাবতেও পারিনি। আবদ্ধ থেকেছি একটা চক্রে। সেই চক্র আমাকে তোমায় দেখতে দেয়নি। এগোতে দেয়নি। অথচ সেদিন যখন তুমি হুট করে তালাকের কথাটা বললে, তখন আমি বুঝলাম, কি জিনিস পায়ে ঠেলে দিচ্ছিলাম। মিসির, বিশ্বাস করো, এত ভয় সেদিন আমি পেয়েছি যা তোমাকে বলে বোঝানো যাবেনা। আমি সংসার হারানোর ভয় পাইনি, পেয়েছি তোমাকে হারানোর ভয়।”

মিসির হতবাক হয়ে গেল। স্থির চেয়ে রইল স্ত্রীর মুখপানে। টলটলে অশ্রু চোখ গড়িয়ে পড়ার আগেই সে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। বৃদ্ধাঙ্গুলে মুছে নিল সেই অশ্রুকনা। সারিকা তার হাতে নিজের মুখটা রাখল। দুই চোখ বুঁজে অতি আবেগ নিয়ে অনুভব করল।

“আমি জানি, আমি তোমার যোগ্য নই। নিজের পক্ষে উপস্থাপনের মতন কোনো যুক্তি আমার হাতে নেই। তবুও একটা জিনিস চাইব। তোমার ক্ষমা।”

“আর যদি না করি?”

এই প্রথম মিসির বিপরীতে কিছু বলল। সারিকা হুট করে চোখ মেলে তাকাল। অশ্রুরেখা টলমল করল সেথায়। মিসিরের চোখে নমনীয়তা ফুটল।

“যদি বলি এই অপরাধের শাস্তি তোমায় আরও কিছুকাল বয়ে যেতে হবে?”

সারিকার চেহারায় অদ্ভুতুড়ে এক অনুভূতি ফুটল। মিসিরের অত্যন্ত কাছে সরে দাঁড়াল সে। গভীর গলায় শুধাল,

“সেই কিছুকালের মধ্যে কি আমরা নতুন করে প্রেমে পড়ার চেষ্টা করতে পারি?”

বাকরুদ্ধ হলো মিসির। তার অভ্যন্তরের সকল আবেগ তালগোল পাকিয়ে গেল। মস্তিষ্কে ভীষণ ঝড় উঠল। চিন্তাভাবনা লোপ পেল। হৃদযন্ত্রের ছন্দপতন ঘটল। সারিকা দুবাহু বাড়িয়ে মিসিরের পাঁজরের চারপাশে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে সরাসরি তাকাল তার চোখের মাঝে,

“আমি সবসময় চাইতাম, আমার একটা প্রেমের সংসার হবে। আমি আর আমার স্বামী দুজন দুজনাকে খুব করে ভালোবাসব। ভাগ্য সেই ভালোবাসা আমার কপাল থেকে মুছে ফেলেছে। শুধু দায়িত্বের বেড়াজাল বয়ে বেড়ালে আমরা দুজন আর মানুষ থাকবনা, রোবট হয়ে যাব। আমার কাছে সংসার শুধু কর্তব্য না। সংসার একটা অনুভূতি, একটা আবেগ, একটা ভালোবাসার নাম। তুমি বলেছিলে আমাদের পক্ষে নতুন করে ভালোবাসা সম্ভব না। তাই দায়িত্ব বুঝে এগিয়ে যাওয়াই মঙ্গল। অথচ দেখো, আমি তোমার মাঝে এক নতুন ভরসা খুঁজে পেলাম। তোমার জায়গায় আমি থাকলে হয়ত নিজেকে বহু আগেই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তুমি এখনো আমায় বহন করে চলেছ। মিসির, আমরা কি নিজেদেরকে একটা নতুন সুযোগ দিতে পারিনা? পারিনা সব ভুলে একটা নতুন শুরুর চেষ্টা করতে?”

মিসির চেয়েই রইল একনাগাড়ে। তার হাতটা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে সারিকা অত্যন্ত আবেগ নিয়ে বলল,

“নতুন শুরুর পথটা যে আমার বড্ড অচেনা। তুমি কি আমার হাতটা ধরে খানিক এগিয়ে দেবে, মিসির?"

এরপর নিজেকে কীভাবে আটকানো যায় সেটা মিসিরের জানা নেই। আজীবন সে মানুষকে শুধু দিয়েই গিয়েছে। কখনো পাওনার হিসাব কষেনি। যদি কষত তাহলে বিনিময়ের খাতাটা শূন্যই পাওয়া যাবে। কেউ কোনোদিন তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। কেউ কোনোদিন এভাবে আঁকড়ে ধরে বলেনি, থেকে যেতে। মিসিরের মতন কাউকে কেউ নিজের জীবনে অপরিহার্য মনে করে এও বিশ্বাসযোগ্য। পারলনা মিসির। মনের মাঝে জমা হওয়া পাওনার বাসনাকে সে রুখতে পারলনা। দুবাহু বাড়িয়ে দিল, সারিকাকে টেনে নিল নিজের বুকের মাঝে। মেয়েটার চোখ শুষ্কতা হারিয়েছে। উষ্ণ অশ্রুফোঁটা ভিজিয়ে তুলছে মিসিরের বুক। তাতে বড্ড প্রশান্তি লাগছে। মিসির আলিঙ্গনের জোর বাড়াল। ভাঙা গলায় বলল,

“যদি এগিয়ে দেই, মজুরি কি দেবে?”

“প্রেম দেব।”

বিনা দ্বিধায় ফিসফিস করল সারিকা। মিসিরের কিছু বলা হলোনা। স্ত্রীর কাঁধে মুখ গুঁজে ফেলল সে। প্রাণভরে গ্রহণ করল তার অস্তিত্বে জড়ানো সুবাস। অতঃপর অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে বসল,

“তোমাকে আজ বৃষ্টিভেজা পাতার মতন লাগছে। সূর্যের কিরণ উঁকি দিলেই গা ছেড়ে জেগে উঠবে নতুন উদ্যমে।”

সারিকা শুনল। আজ সে সব শুনবে। এই লোকটার কন্ঠনিঃসৃত প্রত্যেকটা শব্দ আজ থেকে তার অস্তিত্বের অলংকার।

─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──

হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন ভোরের দিকে। ক্লান্ত সামিয়া বিছানায় শুয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। চোখটা লেগে আসতেই ঘুমে তলিয়ে গেলেন। সেই ঘুম ভাঙল গায়ে কিছু একটার ছোঁয়া পেয়ে। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালেন তিনি। মাথা উঁচু করে তাকাতেই অতি পরিচিত দৃশ্যটা দেখতে পেলেন।

তার পেটের উপর মাথা রেখে বাচ্চাদের মতন চুপটি করে শুয়ে আছে সাইবান। ছেলের এমন কান্ডে সামিয়ার বুকটা আবেগে টইটুম্বুর হলো। আগে হরহামেশাই এমন করত সাইবান। শো থেকে ফিরেই তার রুমে এসে গা ঘেঁষে নীরবে শুয়ে থাকত। ইরামের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর থেকে মা ছেলের এই আবেগঘন মুহূর্তের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। সামিয়া তাতে অখুশি হননি। একটা বয়সের পর ছেলেমেয়ে নিজেদের সঙ্গীর প্রতি বেশি নির্ভরশীল থাকে, এটা তিনি বোঝেন। একটি হাত বাড়িয়ে ছেলের মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“কি খুঁজছিস ব্রো?”

সাইবান তার পেটে মুখ গুঁজে শিশুদের মতন শব্দ করে বলল,

“মায়ের গায়ের গন্ধ।”

সামিয়া মুচকি হাসলেন,

“পেলি?”

“উম হুম। মিস করছিলাম এতদিন।”

ছেলেকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললেন সামিয়া। বাইরের কেউ দেখলে এখন বলতে পারে এত বড় ধারী ছেলে হয়েছে, তবুও মায়ের আঁচলের তলে ঘুরঘুর করছে? সেই আলোচনার কোনো পরোয়া সামিয়া করেননা। ধীরে ধীরে সাইবানের পিঠ চাপড়ে দিতে লাগলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথাই হলোনা তাদের মাঝে। তারপর সাইবান হঠাৎ বলে উঠল,

“ব্রো?”

“বল ব্রো।”

“আমি পারব তো? পোটলা আর ওর আম্মু আমার হয়েই থাকবে তো?”

সামিয়া আগেই বুঝেছিলেন ছেলের এমন শিশুসুলভ আচরণের অর্থ। আজ তৃতীয় শুনানি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকে ইযানকে আদালতে হাজির করতে হবে। কাউকে বুঝতে না দিলেও সামিয়া ঠিকই বোঝেন, সাইবান উপরে উপরে যতখানি শক্ত ভেতরে ঠিক ততটাই নরম। ওভারথিংকিংয়ে তো এই ছেলের পি এইচ ডি করা আছে। সামিয়া মৃদু হাসলেন। হাসিটুকু ছেলের থেকে বেশি তার নিজের জন্যই। কারণ তিনিও ব্যতিক্রম নন।

“ওরা তো তোরই। এত ভাবনা কিসের?”

সাইবান মুখ ঘষল, ফিসফিস করল,

“ড্যাম রাইট! দে আর মাইন! ইউ টু, বায় দ্যা ওয়ে।”

সামিয়া এবার খিলখিল করে হাসলেন। বললেন,

“নো চিন্তা, ডু স্ফূর্তি। তোদের সাথে আমি যাচ্ছি আজ।”

“দরকার নেই। ওই জজকে তুমি দেখোনি, বাপরে বাপ! ইজ্জতের ফালুদা করে দেবে আমার। বাসাতে থাকো, খুশিতে থাকো, কোর্ট কাচারিতে গিয়ে শেষে জজ সাহেবার সাথে মারামারি লাগিয়ে দিতে পারো, তোমার বিশ্বাস নেই ব্রো।”

“থাকবে কীভাবে ব্রো? তোর মতন ছেলে যার আছে, সে মারকাটারি না হয়ে পারে?”

“এতদিন বাপ মাকে ছেলেমেয়ে নষ্ট করতে দেখেছি। এখন তো দেখছি, ছেলে মাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। শেইম অন ইউ ব্রো, শেইম শেইম…আহহ!”

সাইবানের কান মুচড়ে ধরলেন সামিয়া। বিপরীতে বেদনার ভং ধরে হাসতে লাগল সাইবান। তারপরই মায়ের হাতটা চেপে ধরে গাঢ় একটা চুমু খেল। বলল,

“সারাজীবন আমার ব্রো হয়েই থাকবে তো, থাকবে না?”

“কেন? আমাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাপের গলায় নতুন মালা ঝোলানোর চিন্তায় আছিস? খবরদার বলে দিচ্ছি, আগে তুই ম*রবি তারপর তোর বাপ!”

বিপরীতে আরও জোরে হেসে মায়ের সঙ্গেই বালিশযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গেল সাইবান। মা ছেলে জুটি সকালের সূচনাটা সেভাবেই কাটাল। সুগন্ধা সকালের নাস্তা সাজিয়ে ডাক দেয়ার পর তাদের একান্ত সময়টার অবসান ঘটল।

ইরাম ভোর থেকেই ব্যস্ত আছে। সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। ইযানকে খাইয়ে তৈরি করে নেয়ার ব্যাপার আছে। সাইবান সাহায্য করার আগ্রহ জানালেও তাকে ধরে জোর করে নিচে নাস্তা করতে পাঠিয়ে দিল সে। সামিয়া টেবিলে বসেছেন ততক্ষণে। সুগন্ধা নাস্তা বাড়তে শুরু করেছে। এমন সময়েই খোলা সদর দরজা বেয়ে প্রবেশ করল নীরব। তবে আজ সে একা নয়, অনুসরণে আছে অনুরাগও। পরিধানে একটা আকাশী শার্ট আর খাকি ফরমাল প্যান্ট। সাইবান চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে তাকে দেখে থমকাল,

“কিরে? তোর ভার্সিটি চাঙ্গে উঠে গিয়েছে নাকি?”

অনুরাগ চোখ ওল্টাল।

“এইজন্যই তোকে দরদ দেখানো উচিত না। কত কষ্টে বন্ধুকে সাপোর্ট করতে আদালত যাব বলে এক দিনের ছুটি ম্যানেজ করেছি! কষ্ট গেয়া পানিমে, ছাপাক!”

“তোর দরদ দিয়ে কি আমি চেরাগ মাজব?”

“উফফফ! অনুরাগ, নীরব। তোরা দুটো এদিকে আয় তো। টেবিলে বসে পর। আর বাসায় খেয়ে এসেছিস এমন ঢংয়ের কথা শুরু করলে সারাদিন এই বাড়িতে রেখে দেব, একফোঁটা পানিও খেতে দেবনা।”

সামিয়া নিজের ছেলে আর তার বন্ধুদের ধমক লাগালেন। নীরব তৎক্ষণাৎ বিরাট হেসে টেবিলে বসে পড়ল। যেন সে আসলেই এখানে খেতে এসেছে। অপরদিকে অনুরাগ সাইবানের পাশের চেয়ার টানতে টানতে আড়চোখে সুগন্ধাকে দেখল। ইতোমধ্যে মেয়েটা তার প্লেট সাজিয়ে দিচ্ছে। ডিম পোচ, পরোটা, আলুভাজা আর মিক্সড সবজি সালাদ। অনুরাগ হালকা চালে বলল,

“গুড মর্নিং। কেমন আছো?”

“ভালো।”

খুব সংক্ষিপ্ত জবাব। অবাক করা ব্যাপার, সুগন্ধা একটাবার অনুরাগের দিকে মুখ তুলে তাকাল পর্যন্ত না। সমস্ত সময়টা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাজ করে গেল। অনুরাগ তাতে বেশ বিস্মিত হলো। সকাল সকাল সবার মেজাজই একটু বিগড়ানো থাকে। সুগন্ধাও হয়ত ব্যতিক্রম হবেনা। তাইনা?

নিজের নাস্তা চটজলদি শেষ করল সাইবান। পাঁচ মিনিটও লেগেছে কিনা সন্দেহ। একটা পরোটাকে শুধু দুইভাগ করে মুখে পুরেছে। ওতেই তার খাওয়া ফিনিশ। দ্বিতীয় ভাগটা চিবুতে চিবুতে নিজের প্লেটেই আরেকটু বাড়তি আলুভাজা, ডিমপোচ আর পরোটা তুলে নিল সে। কারোরই বুঝতে বাকি নেই ওটা ইরামের জন্য। এমন সময়েই আরেক দলের প্রবেশ ঘটল বাড়িতে।

“মম!”

উৎফুল্ল ডাকটা শুনেই চমকে উঠলেন সামিয়া। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখা মিলল সারিকার। টপ আর ঢোলা জিন্স পরনে রমণী দুবাহু মেলে ছুটে গেল মায়ের দিকে। তখনি বোঝা গেল সে একা নয়। পিছনে ছোট একটা ডাফল ব্যাগ নিয়ে হেঁটে আসছে মিসির। চেহারায় নমনীয়তা।

“আরে, জামাই যে! এভাবে হুটহাট না জানিয়ে কেউ আসে? বলে আসবি না?”

সামিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসল সারিকা,

“দেখেছ? এসেছে মেয়ে, দেখছে জামাইকে। তোমার সাথে আমার আড়ি মম!”

বলেই সে মিছিমিছি অভিমানের ভান ধরে সাইবানের দিকে তাকাল। এমন নজরে ভাই তাকে দেখছে যেন রোডের মাঝে স্পিডব্রেকার দেখেছে। তার হাতে ধরা প্লেটের দিকে তাকাল সারিকা, তারপর কিছু না বলেই অতর্কিতে হাত বাড়িয়ে ডিম পোচ তুলে মুখে ঢুকিয়ে দিল ভো দৌঁড়! ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে সাইবান প্রথম কয়েক সেকেন্ড প্রতিক্রিয়াই করতে পারলনা। তারপরই তার হুংকারে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি,

“ডিম চুন্নি!”

প্লেট রেখে সে ছুটল বোনের পিছনে। তাদের দৌরাত্ম্যে বুঝি ভূমিকম্প খেলে গেল চারপাশে। সারিকা প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে। সোফার উপর লাফিয়ে উঠছে, আবার টি টেবিলের উপর ঝাঁপ দিচ্ছে। পিছন থেকে তার চুল পাকড়াও করে মাছ ধরার জালের মতন হ্যাঁচকা টান দিল সাইবান, চেঁচিয়ে উঠল,

“লুব্বার ঘরের লুব্বা! আমার বউয়ের ডিম দে!”

“মুরগী তো। আর দুটো পাড়তে বল নাহয়!”

“মুরগী? আমার বউ মুরগী? তোর জামাই যে একটা ভ্যাদামাছ সেটা কি আমি কোনোদিন বলেছি?”

“সাইইইই!”

মিসির বেচারা থ হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে দুহাত রেখে বলে উঠল,

“যাক বাবা, আমরা আবার কি করলাম!”

“কিসু করেন নাই এইটাই তো দোষ। শালারে ধইরা পাবনায় পাঠাইতে পারেন না? অবশ্য পাঠাইয়াও লাভ নাই। ওইখানে যাইয়া আধপাগলাগোরে পুরা পাগলা বানাইয়া ছাড়বে আপনার শালাবাবু।"

মুখ ভেংচে বলল সুগন্ধা। মিসির বিপরীতে মুখে হাত চেপে না হেসে পারলনা। টেবিলে বসে ভয়ানক কান্ড দেখতে দেখতে হাসলেন সামিয়াও। তার বুক ভরে উঠল। অথচ, অভ্যন্তরে একটা খচখচানি রয়ে গেল। গোটা পরিবার আজ উপস্থিত হয়েছে এক স্থানে। আজকের পর কি তারা উদযাপন করতে পারবে? নাকি নতুন কোনো ঝড় মোকাবেলা করতে হবে বিধায় ভাগ্যের এহেন একজোট প্রস্তুতি?

—চলবে—

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন