ফন্ট সাইজ:
থিম:
বাঁধন হারা পথ

২য় পর্ব

লেখক: সাইদা মুন

#বাঁধনহারা_পথ 

#সাইদা_মুন
পর্ব-০২
পারুলরা তখন বেপারী বাড়ির সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যাচ্ছে। অথচ বাড়িটার আশপাশে আজ যেন মানুষের আনাগোনার শেষ নেই। দু-একজন তাদের বয়সি মেয়ে বাড়ির সীমানা ঘেঁষে অকারণে পায়চারি করছে, কেউবা পাশের বাড়ির আড়াল থেকে বান্ধবীদের নিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে ফিসফিস করে কীসব বলাবলি করছে। তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে কারও আসার অপেক্ষায় তারা কমবেশি সবাই ওঁত পেতে আছে।
পারুল ভ্রু কুঁচকে একবার চারপাশে তাকাল। এমনিতে বিকেল হলেই বড় পুকুরপাড়টা মেয়েদের দখলে চলে যায়। কেউ কলসি নিয়ে আসে, কেউ কাপড় কাচার বাহানা করে বসে থাকে, আবার কেউবা গাছতলায় বসে গল্প জুড়ে দেয়। পুকুরপাড়ে গিয়ে একটু শান্তিতে বসার জো নেই তাদের। সারাক্ষণ কিচিরমিচির আর হাসাহাসি। অথচ আজ সেই পুকুরপাড় ফাঁকা রেখে সবাই এসে জড়ো হয়েছে বেপারী বাড়ির চারপাশে। ব্যাপারটা কী? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আসল কারণটা মাথায় এলো পারুলের। সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেল। বেপারী বাড়ির মেঝো ছেলে শহর থেকে বাড়ি ফিরেছে। এই খবর কি আর রসুলপুর গ্রামের মানুষের কানে যেতে সময় লাগে? একজনের কান থেকে আরেকজনের কান, তারপর সেটা মুহূর্তেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকে আসা মানুষ দেখার কৌতুহল সকলেরই। আর কৌতূহল যেখানে, সেখানে তো খবরের সঙ্গে পা-ও গজায়।
পারুল বিরক্ত চোখে আবারও বাড়িটার দিকে তাকাল। গ্রামের আর দশটা বাড়ির মতো নয় বেপারী বাড়ি। আকারে-আয়তনে বেশ বড়সড়। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুই বাড়িকে ঘিরেই ছড়িয়ে আছে বেপারী বংশের বিস্তৃতি। একসময় অবশ্য এখানে ছিল একটাই বাড়ি। সেই বাড়ির কর্তা ছিলেন সামসুল বেপারী। তাঁর ছিল দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে বহু আগেই। এখন তারা যার যার শ্বশুরবাড়িতে স্বামী-সংসার সামলাতেই ব্যস্ত। আর দুই ছেলের মধ্যে জলিল বেপারী বড়, আর মাহমুদ বেপারী ছোট। একসময় দুই ভাই একই উঠোনে, একই ছাদের নিচে আপনজনদের নিয়ে সংসার করতেন। কিন্তু সময় তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে, তাদের বিয়ে হয়েছে, সংসারে নতুন মানুষ এসেছে। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাইয়ের সংসারও আলাদা হয়ে গেল। গড়ে উঠল পাশাপাশি দুটি আলাদা বাড়ি। সেই দুই বাড়ি ঘিরেই আজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বেপারী বংশের বড়সড় এক পরিবার।
পারুলরা এখন মাহমুদ বেপারীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বাড়ির বিস্তৃত জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। পুরোনো বাঁশের গায়ে কোথাও শ্যাওলা ধরেছে, কোথাও আবার নতুন করে বাঁশ বদলে দেওয়া হয়েছে। মাঝখানে মোটা কাঠের তৈরি বড় ফটক। দিনের বেলা সেটাই খোলা থাকে, সন্ধ্যা নামলেই ভেতর থেকে আগল দিয়ে দেওয়া হয়। ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিশাল উঠোন। বর্ষায় কাদায় মাখামাখি হলেও শীত-গ্রীষ্মে বেশ পরিপাটি থাকে জায়গাটা। উঠোনের এক পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে টিনের চাল দেওয়া বসতঘর। অবশ্য একটানা ছয়টা ঘর নয়। দুই ঘর পরপর খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে আলাদা আলাদা করে তোলা হয়েছে। মাহমুদ বেপারী বেঁচে থাকতে তিন ছেলের সংসারের কথা মাথায় রেখেই ঘরগুলো আলাদা করে তুলে দিয়েছিলেন। ঘরগুলো পুরোনো, কিন্তু অযত্নে পড়ে নেই। কোথাও টিনের চাল নতুন করে বদলানো হয়েছে, রোদের আলো পড়লে দূর থেকেই ঝকঝক করে। কোনো ঘরের দেয়ালে আবার সদ্য লেপা মাটির প্রলেপের গন্ধ এখনো শুকোয়নি। উঠোনের ডানদিকে বড়সড় রান্নাঘর। তার পাশেই বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বানানো গোয়ালঘর। গরুগুলোর গলায় বাঁধা ঘণ্টা মাঝেমধ্যে টুংটাং শব্দ তুলে উঠোনের নীরবতা ভাঙে। একটু দূরে বিশাল ধানের গোলা। 
উঠোনের আরেক কোণে সারি করে রাখা বড় বড় মাটির হাঁড়ি, কলসি। এসবই বেপারী বাড়ির গিন্নি কুলসুম বেগমের সখ। একসময় মাটির জিনিস বানানো ছিল তাঁর ভীষণ সখের কাজ। অবসর পেলেই কাদা-মাটি নিয়ে বসে পড়তেন। নিজের হাতে গড়ে তুলতেন হাঁড়ি-পাতিল, কলসি কিংবা সংসারের টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিস। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, শরীরও আগের মতো সায় দেয় না। তাই সেই সখের কাজটুকুও এখন ধীরে ধীরে বেপারী বাড়ির বড় বউয়ের কাঁধে এসে পড়েছে। শাশুড়ির কাছ থেকেই হাতেখড়ি পাওয়া বড় বউও কম যায় না, মাটির সঙ্গে মিশে থাকা সেই পুরোনো সখটাকে বেশ যত্ন করেই আগলে রেখেছে। তাদের সংসারের পাশাপাশি চাষাবাদেরও বেশ রমরমা অবস্থা। উঠোনের একপাশে কৃষিকাজের সরঞ্জাম, অন্যপাশে গোলাভরা ধান দেখলেই বোঝা যায় বেপারী বাড়িতে অভাব-অনটনের চেয়ে ফসল আর ব্যস্ততাই বেশি।
গ্রামের লোকেদের আকর্ষণ বেপারী বাড়ি হলেও, ছেলে-মেয়েদের চোখে বেপারী বাড়ির আসল আকর্ষণ সামনে নয় পেছনে। বাড়ির পেছন দিকে ঘন বাঁশঝাড়। এমন ঘন যে দুপুরের কড়া রোদও সেখানে ঢুকতে গিয়ে যেন দুবার ভাবে। বাতাস এলেই বাঁশের মাথাগুলো একে অপরের গায়ে ঘষা খেয়ে শোঁ শোঁ শব্দ তোলে। বাঁশঝাড় পেরোলেই তাদের নিজস্ব পুকুর। পুকুরের চারপাশে কলমি লতা, শেওলা আর কচুরিপানার আনাগোনা। পাড়ের কয়েকটা পুরোনো গাছের ডাল পানির ওপর ঝুঁকে আছে। আর পুকুর পেরোলেই শুরু বিশাল আমবাগান। পুরোনো আমগাছগুলো বছরের পর বছর ধরে এমন ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে ভেতরে ঢুকলে বাইরের বাড়িঘর তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও মাথার ওপরের আকাশটুকু ঠিকমতো দেখা যায় না। গাছের ডালে ডালে লতাপাতা জড়িয়ে আছে, মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার ওপর পা ফেললেই মচমচ শব্দ ওঠে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে কাঁচা আমের গন্ধে পুরো বাগানটা মাতোয়ারা হয়ে থাকে। আর এই আমবাগান নিয়েই রসুলপুর গ্রামের ছেলেমেয়েদের আগ্রহের কোনো শেষ নেই। বিশেষ করে পারুলদের।
পারুল একবার চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসল। কাঁধ থেকে পিছলে পড়তে চাওয়া আঁচলটা ভালো করে টেনে কোমরের কাছে গুঁজে নিল। তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তাহেরা এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
"কই বেপারীগোর মেঝো পোলা কই? তারে তো দেহি না।"
পান্না চোখ সরু করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"হে আইয়া তো তোমার লাইগ্যা বাইরে সং-এর মতো দাড়াই থাকবো?"
তাদের কথা কাটাকাটির মাঝে রোকসানা তড়িঘড়ি করে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচু গলায় বলল,
"কথা কম ক তো। বেপারী বাড়ির মানুষজন কিন্তু এই সময় উঠানেই থাকে।"
তাহেরা তারপর ফিসফিস করে বলল,
"সামনের দিয়া গেলে ধরা খামু। পেছনের বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়া ঢুকমু। ওইহানে একটা জায়গা আগেই দেইখ্যা রাখছি।"
কথা শেষ করেই চারজন একসঙ্গে পাশ ফিরল। কিন্তু পারুল তাদের সঙ্গে নেই। মেয়েটা ইতোমধ্যে কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেছে।
"এই পারুল কই গেল?"
তাহেরা ফিসফিস করে বলতেই বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে একটা হাত উঁকি দিল। সঙ্গে সঙ্গে পারুলের চাপা গলা ভেসে এলো,
"এইহান দিয়া আয়।"
বাকিরা দ্রুত তাকে অনুসরণ করল, কাছে গিয়ে হাজির হলো। পারুল এরই মধ্যে জায়গাটা ভালো করে দেখে নিয়েছে। বাড়ির উঠান থেকে কারও গলার আওয়াজ আসছে কি না, কেউ বাগানের দিকে এগিয়ে আসছে কি না, সবকিছু একবার চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হয়ে তারপর বাকিদের হাতের ইশারায় কাছে ডেকেছে। বাঁশের বেড়ার মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেই ফাঁক দিয়েই একজন একজন করে ভেতরে ঢুকে পড়ল তারা। সবার শেষে পারুল ঢুকতে গিয়ে বিপাকে পড়ল। তার আঁচলটা বাঁশের চিকন কঞ্চির সঙ্গে আটকে গেছে।
টানাটানি করে আঁচলটা ছাড়াতে ছাড়াতে বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল,
"এই বাঁশডাও মনে হয় বেপারীগোর চাকর।"
পান্না ফিসফিসিয়ে ধমকাল,
"বেশি কথা কবি না পারুল। তোর লাইগ্যাই ধরা পরুম।"
কোনোমতে আঁচল ছাড়িয়ে ভেতরে ঢুকল পারুলও। তারপর চারজনেই সাবধানে পা ফেলে আমগাছগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। তাহেরা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিচু গলায় দায়িত্ব ভাগ করে দিল,
"ফরিদা, তুই ওইদিকে থাক। কেউরে আইতে দেখলেই কুউ দিবি। পান্না আর রোকসানা, তোরা ওই গাছটা থাইক্যা আম পারবি। আমি বড় গাছটায় উঠতাছি। পারুল, তুই আমার লগে আয়। নিচে থাইক্যা আমগুলা আঁচলে নিবি।"
পারুল সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি তুলল,
"আমি খালি কুড়ামু ক্যান? আমিও গাছ থেইকা পাড়মু।"
ফরিদা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"হো, শাড়ি পইরা উইড়া উইড়া আম পারবি! চুপ কইরা আমটুক্কাইয়া এই ব্যাগে ভর।"
বলেই একটা সাদা পলিথিনের ব্যাগ পারুলের হাতে ধরিয়ে দিল। পারুল মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইল। পান্না আর রোকসানা একট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দুজন মিলে গাছের ডাল ঝাঁকিয়ে দিতেই টুপটাপ শব্দে একের পর এক কাঁচা-পাকা আম মাটিতে পড়তে শুরু করল। এদিকে তাহেরা বড় গাছটার মোটা ডালে উঠে একে একে বড় বড় আম পেড়ে নিচে পারুলের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। আর পারুল সেগুলো কুড়িয়ে আঁচলে জমাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আঁচল ভারী হয়ে উঠল। বড় বড় আট-দশটা আম জমে আছে ততক্ষণে।
"নাম, নাম। আর লাগবো না।"
তার কথায় তাহেরা গাছ থেকে নেমে এলো। এরপর চারজন মিলে মাটিতে পড়ে থাকা আমগুলো কুড়োতে শুরু করল। ঠিক তখনই পারুলের চোখ গিয়ে আটকাল পুকুরপাড়ে। সাদা সাদা রাজহাঁসগুলো নিশ্চিন্তে পুকুরের ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে কিছু খুঁজছে, কখনো আবার গলা উঁচু করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। মুহূর্তেই তার চোখে অন্যরকম একটা ঝিলিক ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে সে বলল,
"তোরা চড়ুইভাতি খেলবি?"
পান্না আম কুড়াতে কুড়াতেই অন্যমনস্কভাবে বলল,
"পরশু না খেললাম? এহন আবার আম্মায় চাইল-ডাইল দিব না।"
পারুল এবার দাঁত বের করে হাসল,
"এবার হাসের মাংস রান্না করমু। তাও চাউল আনবি না?"
কথাটা শেষ হতেই যেন চারপাশের সব শব্দ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সবার হাত থেমে গেল। চার জোড়া চোখ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল পারুলের দিকে। তারপর পারুলের দৃষ্টি অনুসরণ করে একসঙ্গে চলে গেল পুকুরপাড়ের রাজহাঁসগুলোর দিকে। রোকসানা হকচকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
"পারুল, ভুলেও ওইদিকে নজর দিবি না। বেপারী বাড়ির হাঁস চুরি কইরা ধরা পড়লে গেরামে বড়সড় বিচার বইবো।"
পারুল মুখ ভার করে বলল,
"আমরা লুকাইয়া চুরি করলে হেরা বিচার বওয়ায়। আর হেরা যে দিনদুপুরে ডাকাতি করে, হেই বেলায় কোনো বিচার নাই?"
কথার ঝাঁজ বাড়তে লাগল তার কণ্ঠে ফের বলল,
"হাস পালে মাইনসে কত কষ্ট কইরা। কত দিন খাওয়ায়, যতন করে। আর হেরা সেই হাস ন্যায্য দামের চাইতে অর্ধেক দামে কিইন্না নেয়। পরে আবার বাজারে ডাবল দামে বেচে। ওইডা ডাকাতি না?"
তাহেরা দ্রুত পারুলের হাত থেকে আমভর্তি ব্যাগটা টেনে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর চারপাশে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল,
"জোর যার, মুলুক তার। এহন বাদ দে। আগে নিজের জান বাঁচা।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝোপের আড়াল থেকে ফরিদাকে ছুটে আসতে দেখা গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েই সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
"দেইখ্যা যা, বেপারীর মেঝো পোলা ঘর থেইকা বাইরাইছে।"
কৌতুহলে সবার চোখ চকচক করে উঠল, ফরিদার পিছু পিছু সবাই নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। ঝোপঝাড়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে একসময় উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল উঠোনের দিকে। উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা-চওড়া গড়নের এক যুবক। বয়স সাতাশ-আটাশের কাছাকাছি হবে। গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট, পরনে কালো প্যান্ট। তাদের দিকে পিঠ ফেরানো থাকায় মুখটা দেখা যাচ্ছে না। শুধু প্রশস্ত পিঠ আর ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা দেহটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে কথা বলছেন জলিল বেপারী। মুকুল বাড়িতে এসেছে শুনেই খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন ভাতিজাকে একনজর দেখতে।
পান্না ঘাড়টা একটু বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আরেকটু সামনে গেলে চেহারাডা দেখা যাইত।"
তাহেরা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরল,
"চুপ! বেশি আগাইস না। ধরা পইড়া যামু।"
কিন্তু কৌতূহলের কাছে সাবধানবাণী কতটুকুই বা টেকে। একজনের পেছনে আরেকজন দাঁড়িয়ে চারজনই একটু একটু করে সামনে ঝুঁকে পড়ল। শুকনো পাতার ওপর পা ফেলার শব্দটুকুও যেন তখন ভয়ংকর মনে হচ্ছে। হঠাৎ পান্নার পা কেমন করে যেন পিছলে গেল। নিজেকে সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে পড়ল তাহেরার গায়ের ওপর। তাহেরাও ভারসাম্য রাখতে না পেরে ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। মুহূর্তেই শুকনো পাতাগুলো পায়ের নিচে মাড়িয়ে এমন শব্দ তুলল যে নিস্তব্ধ বাগানটাকে যেন এক নিমিষেই জাগিয়ে দিল।
উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা জলিল বেপারীর কথা থেমে গেল। কান খাড়া করে তিনি মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন বাগানের দিকে। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থেকে শব্দের উৎসটা বুঝে নিতেই চোখেমুখের ভাব বদলে গেল। গলা উঁচু করে হাঁক ছাড়লেন,
"এই কেডারে আমগো আমবাগানে?"
তারপর আরেকটু জোরে চেঁচিয়ে বললেন,
"খাড়া আইতাছি, চোরের দল, ধরতে পারলে আইজকা ছাড়মু না, বাইন্দা পিডামু।"
ব্যস! মুহূর্তের মধ্যেই তাহেরাদের মুখের হাসি উধাও।
"ভাগ সবডি।"
রোকসানা ফিসফিস করে বলতেই ফরিদা আর সে মিলে আগে তাহেরা ও পান্নাকে টেনে তুলল। তারপর চারজনই যে যেদিকে পারল, সেদিকেই ছুট লাগাল। কারও হাতে আমভর্তি ব্যাগ, কারও আঁচলে গোঁজা কয়েকটা আম। কে কোনদিকে যাচ্ছে, সেদিকে তাকানোরও সময় নেই। শুধু একটাই চিন্তা, যেভাবেই হোক বেপারী বাড়ির সীমানা পেরোতে হবে।
পেছন থেকে জলিল বেপারীর গলার আওয়াজ আরও কাছে শোনা গেল,
"মুকুল তুই পুকুরপাড়টা দেইখ্যা আয়। আমি এদিক দিয়া যাইতাছি। যারে পাইবি, ধইরা লইয়া আইবি।”
কথার শেষে রাগে গলা আরও ভারী হয়ে উঠল তাঁর,
"খবিশের ঘরে খবিশগোর সাহসও দিন দিন বাড়তাছে।"
রাগে গিজ গিজ করতে করতে তিনি একদিকে গেলেন। মুকুল একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে পুকুরপাড়ের দিকেই পা বাড়াল।
এদিকে পারুল পুকুরপাড়ে জিম মেরে বসে আছে। রাজহাঁসের দলটা সঙ্গী-বেঁধে পুরো পুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে কিছু খুঁজছে, কখনো আবার পাখা ঝাপটিয়ে পাড় ঘেঁষে ভেসে যাচ্ছে। পুকুরের একেবারে শেষ সিঁড়িটায় বসে পারুলের চোখ অবশ্য হাঁসগুলোর ওপরই স্থির। কখন ঘুরে আবার এই পাড় ঘেঁষে আসবে, সেই অপেক্ষাতেই ওত পেতে বসে আছে সে। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো। হাঁসের দলটা পুকুরের পাড় ঘেঁষে এক চক্কর দিয়ে এদিকে আসতেই পারুল চিলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। খপ করে একটা হাঁসের ছানা ধরে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ছানাটাকে বুকে চেপে ধরে ভোঁ দৌড়। এক নিশ্বাসে পুকুরের সাতটা সিঁড়ি পার হয়ে উপরে উঠে পেছন ফিরে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠল তার। বাকি হাঁসগুলো প্যাকপ্যাক শব্দ তুলে তার দিকেই ছুটে আসছে। লম্বা লম্বা গলাগুলো উঁচিয়ে এমনভাবে ধেয়ে আসছে, যেন একেকটা ফণা তোলা সাপ। দৃশ্যটা দেখে পারুলের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার জোগাড়।
ছানাটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আবার দৌড় দিল সে। পুকুরপাড় পেরিয়ে হাঁসগুলোর নাগালের বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছে। ঠিক তখনই আচমকা সামনে থেকে আসা কারও প্রশস্ত বুকের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল। ধাক্কার চোটে এক পা পিছিয়ে গেল পারুল। এক হাতে হাঁসের ছানাটাকে ধরে অন্য হাত দিয়ে মাথাটা ঘষতে ঘষতে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
"কোন খাম্বার ঘরে খাম্বারে, শালা..."
কথাটা শেষ করার আগেই মাথা তুলে তাকাল। পরমুহূর্তেই মুখের কথা মুখেই আটকে গেল। চোখেমুখের সমস্ত রাগ এক নিমিষে উধাও হয়ে সেখানে জায়গা করে নিল বিস্ময়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা-চওড়া গড়নের এক সুপুরুষ। ফর্সা মুখে কপাল কুঁচকে, প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট, পরনে কালো প্যান্ট। চিনল না কে, আগে কখনো দেখেনি এই গ্রামে। তবে চেহারার গম্ভীরতা দেখেই পারুলের বুঝতে বাকি রইল না, এ বাড়িরই কেউ। তারমানে ধরা পড়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই তেজ যেন কোথায় উধাও হয়ে গেল। ঠোঁটে জোর করে হাসি ফুটিয়ে নিজের কথাটা সামলে নিয়ে বলল,
"শ্লামালাইকুম.."
বলেই দৌড় দিতে যাবে অমনি লোকটা খপ করে তার হাত ধরে ফেলল। মুকুলের চোখ তখন নেমে গেছে তার হাতে ধরা হাঁসের ছানাটার দিকে। ভ্রু দুটো কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
"দিনদুপুরে চোখের সামনে আমাদের বাড়িরই হাঁস চুরি, সাহস দেখছি কম না মেয়ে।"
পারুল আমতা আমতা করে বলল,
"কি কন না কন, হাঁস কই চুরি করলাম?"
মুকুল ভ্রু তুলে তার হাতের দিকে ইশারা করল,
"তাহলে হাতে ওইটা কী?"
পারুল নিজের হাতের দিকে তাকাল। তারপর উত্তর দিল,
"হাঁস।"
"তো হাতে কেন?"
"ধরছি।"
"কেন ধরছ?"
পারুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। উত্তরটা যেন মাথায় আসছে না। শেষমেশ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
"এমনি।"
মুকুলের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে মেয়েটাকে আপাদমস্তক একবার পরখ করে নিল। তবে চিনল না, আগে কোনোদিন দেখেছে বলেও মনে হচ্ছে না। কম বয়সী এক মেয়ে বয়স ষোলো হবে বোধহয়। লাল শাড়ি পরা চিকন গড়নের মেয়েটা নিঃসন্দেহে সুন্দরী। লম্বা চুলগুলো একপাশে বেনুনি করে ছেড়ে রাখা, যা কোমর ছাড়িয়ে গেছে। ডাগর ডাগর চোখজোড়া বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখেমুখে ভয় থাকলেও কৌতূহলেরও কমতি নেই। মুকুল দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল,
"কে তুমি, আগে তো দেখিনি।"
প্রশ্নটা শুনে ভীতু পারুলের চোখজোড়া আরও বড় হয়ে গেল। মুখে ফুটে উঠল অবাকতা। তাকে চিনে না? এমনও মানুষ আছে এ গ্রামে? সে এক পা এগিয়ে এসে অবিশ্বাস্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
"আমারে চিনেন না?"
"না।"
উত্তরটা শুনে পারুলের চোখেমুখ চকচক করে উঠল। যেন এটাই তার প্রত্যাশিত উত্তর ছিল। মুখটা তার দিকে আরেকটু এগিয়ে এনে বলল,
"ভালা কইরা দেহেন। চিনতে পারেন কি না।"
মুকুল এবারও নির্বিকার উত্তর দিল,
"চিনি না।"
পারুলের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল,
"আমার আব্বারে চিনেন?"
"না।"
"আমার দাদারে?"
"না।"
"আমাগো বাড়ির কারও নাম হুনছেন?"
মুকুল এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
"তোমাকেই চিনি না, তোমার গোষ্ঠীর কাউকে কিভাবে চিনব? কোন বাড়ির মেয়ে তুমি? আর এখানেই বা কি কাজ?"
পারুল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক অন্তত তাকে চেনে না। এবার পালাতে পারলেই হলো তার নাম ও বলতে পারবে না তো বিচার বসাবে কি করে। ভাবতে ভাবতেই হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
"হাত ছাড়েন আমি তো হাসগুলারে দেখতে আইছিলাম একটু।"
মুকুলের চোখ আবার নেমে গেল তার হাতের হাঁসের ছানাটার দিকে,
"দেখতে এসে হাতে করে নিয়েও যাচ্ছিলে?"
পারুল এবার ছানাটার দিকে তাকিয়ে ধীরেসুস্থে বলল,
"এইডা একটু ভয় পাইছিল। তাই কোলে নিছি।"
"ভয়?"
"হ।"
"তাই বাড়ি নিয়ে যাবা?"
পারুল গম্ভীর মুখে বলল,
"বাড়িত নিলে ভয়ডা আর থাকত না।"
মুকুল কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার যুক্তি শুনে সে নির্বাক। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
"তারপর?"
পারুল নিরীহ গলায় বলল,
"তারপর আর কী, আবার ফিরাইয়া দিয়া যামু। আমি আবার চুরটুর না।"
মুকুলের মুখের গাম্ভীর্য কিছুটা কমলো। মেয়েটা বেশ ফটরফটর করে। পারুলকে যে বিশ্বাস করেনি তা স্পষ্ট। সে বলল,
"হাঁসটা রেখে যাও।"
পারুল সঙ্গে সঙ্গে হাঁসের ছানাটাকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। মুকুল সরু চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পারুলের মুখে তখন ছাড়বে কি না সেই নিয়ে গভীর চিন্তার ছাপ। হঠাৎই তার চোখ চলে গেল মুকুলের মাথার পেছনের দিকে। পরমুহূর্তে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল,
"ওইযে চোর চোর পলাইতাছে।"
মুকুল স্বভাবতই সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ফিরে তাকাল। আর সেই মুহূর্তই যথেষ্ট ছিল। হ্যাচকা টানে পারুল হাতটা ছাড়িয়ে নিল। হাঁসের ছানাটাকে বুকে চেপে ধরে মুকুলের পাশ কাটিয়ে ভোঁ দৌড় দিল, যেন পেছনে বাঘ লেগেছে। মুকুল হাতে টান খেয়েই বুঝতে পারল, তাকে বোকা বানানো হয়েছে। ঘুরে তাকাতেই দেখল, পারুল ইতোমধ্যে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে। মুকুল গলা উঁচিয়ে ডাকল,
"এই মেয়ে দাঁড়াও বলছি।"
কিন্তু পারুল কি আর দাঁড়ানোর পাত্রী। দৌড়াতে দৌড়াতে অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়ির সীমানা পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল সে। মুকুল আর সেদিকে পা বাড়াল না, চোখের সামনে তাকে বলদ বানিয়ে হাঁস নিয়ে চলে গেল। মাথা চুককাতে চুলকাতে বিড়বিড় করে উঠল,
"পাক্কা ডাকাত রানি, দিনদুপুরে ডাকাতি।"
এরমধ্যেই জলিল বেপারী ছুটে এলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন,
"কাউরে পাইছস?"
মুকুল তখনও পারুল যে দিক দিয়ে পালিয়েছে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল। চাচাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হাসিটা সামলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"না চাচা, কাউরে দেখিনাই। হয়তো পালাইছে। বাদ দেন, চলেন ঘরে যাই। ভাবি চা বানাইছে।"
জলিল বেপারী আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। একবার আশপাশে চোখ বুলিয়ে ভাতিজার সঙ্গে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলেন। আর মুকুল হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছন ফিরে তাকাল। যেদিক দিয়ে মেয়েটা পালিয়েছে, সেদিকটা এখন পুরোপুরি নিস্তব্ধ। 
চলবে....
[ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেবেন, আর কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন