“আমার দুছরা বিয়া অয় আমার আগের বউয়ের চাচাতো বইনের লগে। যার লগে পূর্বে আমার বিয়া ঠিক হয়াও ভাইঙ্গা গেছাল গায়ের রঙডা কালা দেইখ্যা।” কথাটা ভাবলেই জহির গাজীর বুকের ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। কার্তিক মাসের শেষ বিকেল। পাঁচগাঁও গ্রামের ওপর দিয়ে কংস নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছে। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোল ছেড়ে ধূসর রঙের ঘন কুয়াশা নেমে আসছে ধীর গতিতে। কংস নদীর পানি এখন ম্লান, কেমন শ্যাওলা ঘাসের রঙ ধরে আছে। চিলের ডাক কখন বন্ধ হয়ে গেছে। ধানক্ষেতের ওপারে একটা হিজল গাছের ডালে লক্ষ্মীপেঁচাটা ডাল ছেড়ে উড়ে গেল একদম নিঝুম রাতে নক্ষত্রের শব্দ পাওয়ার মতো নীরবতা। জহির কংসের চরে কাঠের গুঁড়ির ওপর বসে নিজের তামাটে হাতের দিকে তাকায়। রোদে পুড়ে, মেটে কাদায় খেটে তার আঙুলে কড়া পড়ে গেছে। সে তো কোনো রাজার ছেলে নয়, না আছে তার বিঘে বিঘে ধানজমি। সে অতি সামান্য একজন মানুষ। তার ভুলত্রুটি, অপূর্ণতা আর অপরাধের শেষ নেই। আজ থেকে বছর চারেক আগের কথা। এই মোল্লা বাড়ির বড় ভাই মাতব্বর সাহেব যখন জহিরের জন্য মেহেরজানের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, জহির তখন কচি বয়সের গরম মাথার ছেলে। মেহেরজান ছিল গায়ের রঙে একটু চ্যাঙড়া, শ্যাওলা কালো। জহিরের বাবা-চাচারা সোজা বলে দিয়েছিল,
“অত কালা ছেড়ী ঘরে আনতাম না। মোল্লাদের কমুগা বিয়া অইত না।"
বিয়েটা সেবার ভেঙে গেল। এরপর বিয়ে হলো মেহেরজানের চাচাতো বোন শরিফানের সাথে। শরিফান ছিল ফর্সা, ধপধপে। কিন্তু কপাল! শরিফানের সাথে জহিরের সংসার বেশিদিন টিকল না। আশ্বিন মাসের এক কালো রাতে ভয়াবহ কলেরার মহামারী এল গ্রামে। একরাতের পেটের ব্যথায় আর বমিতে শরিফান ছটফট করতে করতে শেষ হয়ে গেল। জহির তখনো নদীর ঘাটে বসে কাঁদছিল। ঘরে একখানা ভালো কাঁথা ছিল না শরিফানের গায়ে দেওয়ার জন্য, একটা ভালো ডাক্তার ডেকে আনার মতো হাঁড়ির কড়িও ছিল না জহিরের কাছে। অভাব যে কী কড়া জিনিস, তা জহির গাজী নিজের হাড় দিয়ে টের পেয়েছে। আর আজ? চার বছর পর সেই জহিরের ঘরেই বউ সেজে আসছে মেহেরজান। যার রূপের দোষ ধরে একদিন জহির ফিরিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই মেহেরজানই তার এই খালি, ভাঙা ঘরের আলো হতে আসছে। জহির নদীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘মাবুদ, আমি তো বড় অপূর্ণ মানুষ। আমার এই পাপ আর অপূর্ণতা কি নদীটা ধুইয়ে নিতে পারব?’
মেহেরজান মোল্লা বাড়ির মেয়ে। গ্রামে মোল্লা বাড়ির একসময় বিরাট দাপট ছিল, কিন্তু মেহেরজানের কপালটা শুরু থেকেই হুল ফোটানো। জহিরদের বাড়ি থেকে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর মেহেরজানের বাবা-ভাইয়েরা জেদ করে পাশের গ্রামের এক মাতব্বরের ছেলের সাথে তার বিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রথম বিয়েটা ছিল মেহেরজানের জন্য একদম জ্যান্ত নরক। গায়ের রঙ কালো এই নিয়ে শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা, যৌতুকের দায়ে স্বামীর চা*বুকের মতো কথা আর গায়ে হাত তোলা! দুই বছর সেই নরক সহ্য করে শেষমেশ মেহেরজান তালাক নিয়ে বাপের ভিটেয় ফিরে এসেছিল। গ্রামের মানুষের মুখে তখন কত কথা! এক তালাকপ্রাপ্তা, কালো মেয়ে বাপের ঘরে বসে থাকলে মোল্লা বাড়ির মান থাকে না। বাপের ভিটেয় ভাইয়ের বউদের বাঁকা কথা শুনতে শুনতে মেহেরজানের দিন কাটত। তাই যখন জহির গাজীর আবার বিয়ের কথা উঠল, মেহেরজানের বাবা-ভাইয়েরা এক কথায় রাজি হয়ে গেল। জহির তো অতি গরিব কৃষক, কিন্তু মানুষটা ভালো গ্রামের সবাই জানে জহির গাজীর অন্তরে কোনো প্যাঁচ-পায়াল নেই, কারো ক্ষতি সে জীবনে করেনি।
সন্ধ্যা নেমে আসার পর মেহেরজান যখন জহিরের দাওয়ায় পা দিল, তখন পাহাড়ি হিম হাওয়া তার সুতির মেহগনি রঙের শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিল। মেহেরজানের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই মেহেরজানের নজর পড়ল বাঁশের খুঁটিতে। সেখানে ঝুলছে তার মৃ*ত বোন শরিফানের একটা পরনের পুরানো শাড়ি। শরিফানের কথা মনে হতেই মেহেরজানের চোখের কোণে জল এসে জমল।
ঘরের মেঝের মাটি বর্ষার জলে এখনো স্যাঁতসেঁতে। দাওয়ার এক কোণে মেটে প্রদীপের মৃদু আলো মিটমিট করে জ্বলছে। জহির গাজী ঘরের এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে মেহেরজানের মুখের দিকে সোজা তাকাতে পারছিল না। তার খুব লজ্জা লাগছিল। জহির মনে মনে ভাবছিল, “যে মেয়েটাকে একদিন গায়ের রঙ কালো বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, আজ সেই মেয়েটাই আমার এই অপূর্ণ, ভাঙা ভিটেয় এসে দাঁড়াল!’ এ যেন জহিরের নিজেরই একটা বড় পাপের সাজা।
জহির কাঁপাকাঁপা হাতে হাত বাড়িয়ে হ্যারিকেনের সলতেটা একটু উঁচিয়ে দিল। সস্তার কেরোসিনের গন্ধ আর ধোঁয়া ঝাপসা করে দিল মেটে ঘরটা।
“মেহের..." জহির খুব কুণ্ঠিত আর নরম গলায় ডাকল। গলাটা তার থরথর করে কাঁপছে। মেহেরজান চোখ তুলে তাকাল। জহিরের পরনে একটা তালি দেওয়া সুতির শার্ট আর ময়লা লুঙ্গি। গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। সারা গায়ে খাটাখাটুনির ক্লান্তি। “মেহের,"জহির গাজী মেঝের মাটির দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “তোমার বুবুরে আমি অভাবের জ্বালায় ঠিকমতো দুই বেল্যা ভাতও দিবার পারি নাই। শেষ সময় একটা ভালা ডাক্তার ডাইক্যা আনুম, হেই সাধ্যও এই জহিরের আছিল না। আর... তোমার লগে আমি আর আমার পরিবার বহু বছর আগে যে অন্যায়ডা করছিনু... গায়ের রঙ দেইখা তোমারে ফিরায়া দিছিনু... হেই অপরাধের ক্ষমা চাওনের মুখও আমার নাই।"
মেহেরজান একদৃষ্টিতে জহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। জহির থামল না, "আমি ভাই চরম অপূর্ণ একডা মানুষ। আমার ঘরে অভাব ছাড়া আর কিচ্ছু নাই। তুমি অত বড় কষ্ট বুকে নিয়া, আমার এই খালি ভাঙা ঘরে আইসা কোনো ভুল করলা না তো মেহের? আমারে তোমার খুব ছোট মনে অয় না?" কথাগুলো শুনে মেহেরজানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ তোলপাড় করে উঠল। আগের বিয়েতে সে দেখে এসেছিল অহংকার, গায়ের রঙের খোঁটা, আর লাঠির দাপট। আর এই কৃষকটা যে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল আজ নিজের অভাব আর অতীতের ভুলের কথা চিন্তা করে একটা মেয়ের সামনে লজ্জায় ছোট হয়ে যাচ্ছে!
মেহেরজান চট করে উত্তর দিল না। হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় জহিরের ধুলোমাখা পায়ের দিকে তাকাল। তারপর মেহেরজান মৃদু গলায় বলল,
“ভুল আর কী করুম? ফর্সা রূপ দেইখা তো বুবুরে নিছিলেন, কিন্তু বুবুরে কি অভাব আর ম*রণের হাত থাইকা বাঁচাইবার পারছিলেন? মানুষ তো খালি রূপ আর টেহা-পয়সা খুঞ্জে, কিন্তু কতজন মানুষরে মানুষ হিসাব সম্মান দেয়? আপনি নিজেরে এত্ত ছোট ভাবতাছইন ক্যালাই?"
-
পরদিন সকালবেলা পাঁচগাঁও গ্রামে হালকা কুয়াশা পড়ে ছিল। ঘরের চালের ছন দিয়ে শিশিরের টিপ টিপ পানি পড়ছে। জহির গাজী খুব ভোরে উঠে কাস্তে আর ছালুন মাথায় নিয়ে মাঠে যাওয়ার আয়োজন করছে।
ঘরে চালের হাঁড়ি একদম শূন্য। কার্তিক মাস মানেই তো আকালের দিন। বোরো ধানের আবাদ এখনো শুরু হয়নি, আর আমন ধান তো গত বন্যায় কংস নদীর তোড়ে ভেসে গেছে। জহির গাজী বাপের আমলের দুই বিঘে জমিতে জন খেটে কোনোরকম দিন চালায়। মেহেরজান দাওয়ায় উঠে দাঁড়াল। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোল ছেড়ে সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা নামছে। পাহাড়ি বাতাস এসে গা জুড়িয়ে দেয়। মেহেরজান ঘরের কোণে গিয়ে দেখে চালের টিন খালি। রান্নাঘরে শুধু একটুকরো শুকনো মরিচ আর মেটে সরা ছাড়া কিছুই নেই। জহির যে কাল রাতে খালি পেটে শুয়েছিল, মেহেরজান তা বুঝতে পারল। জহির নিজের অভাবের কথা মেহেরকে বলে লজ্জিত হতে চায় না, তাই চুপচাপ কাস্তে নিয়ে মাঠের দিকে পা বাড়ায়।
"হুনুন..." মেহেরজান দাওয়া থেকে ডাক দিল।
জহির থমকে দাঁড়াল। পিছন ফিরে তাকাতেও যেন তার ভয় পাছে মেহেরজান চালের হাঁড়ি খালি দেখে কিছু মনে করে! "সাক্কালবেল্যা কিচ্ছু মুখে না দিয়া কামে যান ক্যালাই? কংস নদীর ঘাডে গিয়া একটু জিরান, আমি খুদের জাউ গরম করতাছি।" মেহেরজান ঘরের এক কোণে পেতে রাখা সামান্য একটু চালের খুদ আর বুনো শাক খুঁজে বের করেছে।
জহির গাজীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। জহির নরম গলায় বলল, "খুদের জাউ তুমি খাইয়া নেও মেহের। আমার পেট ভরা আছে।"
মেহেরজান মুখ বাকিয়ে বলল, "মিছা কথা কইয়েন না তো! কাল রাইতে যে খালি পেটে আছিলেন, হেইডা কি আমি বুঝি না? আপনি ঘাডে গিয়া বয়েন, আমি ভাত নিয়া আইতাছি।"
যে মেহেরজানের সাথে সে অত বড় অন্যায় করেছিল, যে মেহেরজানকে সে অত অপূর্ণতায় ভরিয়ে রেখেছে সেই মেয়েটি তার এই চরম আকালের দিনেও তাকে এতখানি মান-সম্মান দিচ্ছে!
-
সন্ধ্যাবেলা জহির যখন মাঠ থেকে ফিরল, তার হাতে ছিল কংস নদীর পাড় থেকে তুলে আনা কয়েকটি সাদা বুনো কলমি ফুল আর নদীর ঘাটের ছোট একটা বোয়াল মাছ। মহাজনের বকেয়া সুদের টাকার চিন্তায় সারাদিন তার মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল, কিন্তু ঘরে ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল কারো জন্য কিছু একটা নিয়ে যাওয়ার মাঝেই মানুষের আসল সুখ।
ঘরে এসে জহির বুনো ফুলগুলো মেহেরজানের হাতে দিয়ে কুণ্ঠিত গলায় বলল, “আমার তো তোমারে সোনার অলঙ্কার দিবার মতো কিছু নাই মেহের। রঙ দেইখা তো একদিন তোমারে চিনবার পারি নাই... আজ নদীর পার দিয়া আসার সময় এই ফুলগুলো দেইখ্যা মনে হইল এগুলার কোনো ফর্সা-কালা নাই, কিন্তু দারুণ সুবাস। তোমারে দেওনের ইচ্ছা অইল।"
মেহেরজান ফুলগুলোর দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে টলমল করে জল এসে পড়ল। মেহেরজান ফুলগুলো বুকে জড়িয়ে বলল, "যে মানুষডা সম্মান দিতে জানে, তার দেওয়া বুনো ফুলও সোনার থাইকা দামী ভাই।"
মেহেরজান মেটে প্রদীপের সলতেটা বাড়িয়ে দিল। ঘরের এক কোণে শরিফানের স্মৃতি আজও আছে, কিন্তু সেই স্মৃতির বিষণ্ণতা ঠেলে আজ দুই ভাঙা মানুষের বুকে এক নতুন আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
জহির গাজী প্রদীপের আলোয় মেহেরজানের মায়াভরা তৃপ্ত মুখটার দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল, “আমার ঘরে অভাব, আমার পকেটে টাকা নেই, আমার জীবনে হাজারটা অপূর্ণতা আর ভুলের দাগ। কিন্তু এই যে সামান্য মেয়েটি আমাকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিল, আমার এই অপূর্ণ জীবনটাকে সম্মান জানাল তার জন্য বুকের শেষ র*ক্তবিন্দু দিয়ে ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া এই জহির গাজীর আর যে কিছুই করার নেই।
পাঁচগাঁওয়ের ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাস কংস নদীর সবুজ জল ছুঁয়ে জহির আর মেহেরজানের ছোট মেটে ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে লাগল।
#হেমন্তের_ভেজা_রঙ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_১