পর্বঃ১
ভোর-দুপুরের মিষ্টি ঘুমটা যখন সবে জেঁকে বসেছে মেহরিনের চোখে, ঠিক তখনই রাস্তা থেকে ভেসে এলো কর্ণভেদী চিৎকার! এক-দঙ্গল মানুষের গোলমাল, আর তার মধ্যে মিশে আছে বেশ কিছু বেয়াড়া স্লোগান।।
"বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!"
'ফারিশের হাতে অঙ্গীকার, ধানের শীষের জয় হবে আবার!'
'দুর্নীতি নয়, চাই সুশাসন, ফারিশের হাতে দেশ গড়ন।'
'ধানের শীষে ভোট দিন, জনগণের অধিকার নিন
"বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
ধানের শিষ জিতবে আবার"
কানের কাছে যেন কারা ড্রাম বাজাচ্ছে—কানে তালা লাগার জোগাড়! মেহরিনের মেজাজ বিগড়ে গেল। সারা রাত এমনিতেই ঘুম হয়নি, তার উপর এই বজ্জাত গুলোর হট্টগোলে কাঁচা ঘুমটা গ ভেঙে গেল!
বিরক্তিতে চোখ কচলাতে কচলাতে গুটি গুটি পায়ে সে বিছানা থেকে নামল। বারান্দায় গিয়ে নিচে তাকাতেই মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল। দেখল, অনেক লোকজন জর হয়ে আছে– তাদের হাতে হাতে প্লাকার্ড, আর মুখ ভর্তি তাদের সেই বিরক্তিকর স্লোগান।
দাঁতে দাঁত চেপে মেহরিন বিড়বিড় করল, "বজ্জাতগুলো! তা হলে নমিনেশন পেয়ে গেছে!"
এই সব আওয়াজেই তার ঘুম ভেঙেছে, ভাবতেই রাগে গা জ্বলে উঠল। "না! এদের একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত! দাঁড়া, তোদের সমাবেশ করাচ্ছি!"
এই বলে মেহরিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটল তার বড় আপুর ঘরের দিকে। কারণ মেহরিন জানে, তার আপুই এই গোলমাল থামাতে পারবে।
-----
মেহরিন তার আপু মেহনুরের ঘরে ঢুকতেই দেখল,
সে একদম চুপচাপ বারান্দার গ্রিল ধরে নিচে তাকিয়ে আছে। মেহরিনের প্রবেশ টের পেয়েই মেহনুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "এদের কি শিক্ষা দেওয়া উচিত না, মেহু?"
মেহরিনও যেন তার মনের কথাটাই শুনতে পেল। সেও আপুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল, নিচে তাকিয়ে।
"ওরা ইচ্ছে করেই আমাদের জ্বালাতে এখানে দাঁড়িয়ে শোরগোল করছে। নমিনেশন পেয়েছে তো, তাই শোনাচ্ছে!"
মেহনুর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, "এটা শোনানো? উহুঁ, ওরা খুচানোর জন্য এসেছে।"
"কী করা যায় বলো তো আপু?" মেহরিন
অসহায়ভাবে জানতে চাইল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেহনুর এবার মেহরিনের দিকে তাকাল। তার চোখে দুষ্টু বুদ্ধির ঝিলিক। সে মেহরিনকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলল,
"মেহু!!!"
"বলো!" মেহরিনের কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা।
"রফীক চাচাকে বল স্পিকারগুলো ছাদে নিতে!" মেহনুর প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
মেহরিন আবারও আপুর দিকে তাকাল। কিছু একটা আন্দাজ করেই সে উত্তেজিত কণ্ঠে
জিজ্ঞেস করল,
"আপু, আমি যা ভাবছি, কি তাই?"
মেহনুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে জবাব দিল, "ইয়েস মাই সিস্টার! চলো, একটু 'ঝাকানাকা' ড্যান্স আমরাও করি!"
বলেই দুই বোন তড়িঘড়ি করে নিচে নামল।
মেহরিন রফীক চাচাকে নিয়ে ছুটল। রফীক চাচাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দ্রুত স্পিকারগুলো ছাদে উঠিয়ে আনল। তারপর দুই বোন নিচে দেখল—নেতা সাহেবের চেলা-পেলাগগুলো তখনও দাঁড়িয়ে চিল্লাপাল্লা করেই যাচ্ছে।
মেহরিন আর মেহনুর আবার একে অপরের দিকে তাকাল, চোখে সেই বাঁকা হাসি। এরপর তারা দু'জনেই একজোড়া করে সানগ্লাস পরে নিল।
তারপর... লাউড স্পিকারে ফুল সাউন্ড দিয়ে গান প্লে করল।
"জয় বাংলা, জিতবে আবার নৌকা!
জয় বাংলা, জিতবে আবার নৌকা!
এসেছে, এসেছে আবার ইলেকশন
জিতবে নৌকা, নাই কোনো টেনশন...
জয় বাংলা, শেখ হাসিনার সালাম নিন,
জয় বাংলা, নৌকা মার্কায় ভোট দিন!"
ছাদের সেই স্পিকারের গর্জন যেন নিচের সমস্ত শোরগোলকে ধামাচাপা দিয়ে দিল।
পুরো এলাকা যেন মুহূর্তে পাল্টে গেল এক অন্যরকম সমাবেশে!
সামনের বাড়ি থেকে ভেসে আসা সেই চরম মাত্রার আওয়াজ আর এই নির্বাচনী গান শুনে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা 'ধানের শীষের' সমাবেশের লোকগুলো মুহূর্তের জন্য তাদের স্লোগান থামিয়ে দিল। এ কী কাণ্ড!
তারা কিছুক্ষণের জন্য একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল, তাদের মুখে কিছুক্ষণ আগেও ছিল তীব্র স্লোগান, অথচ ছাদ থেকে ভেসে আসছে অন্য দলের নির্বাচনী গান!
মুহূর্তেই পরিবেশটা পাল্টে গেল! এতক্ষণ নিচে ধানের শীষ নিয়ে স্লোগান দিতে থাকা ছেলেরা বিরোধী দলের স্লোগান দেওয়াটা তারা ভুলে গেল, তার বদলে নিজেরাই তালে তালে সেই নৌকার গানে কোমর দোলাতে শুরু করে দিল! শুরু হলো উরাধুরা নাচ!
নেতা-কর্মী সবাই যেন ভুলে গেল যে তারা একটা সমাবেশে, আর ভুলে গেল তারা বিরোধী দলীয় নেতার নমিনেশন পাওয়ার খুশি উদযাপন করতে এসেছে । মুহূর্তের মধ্যে পথের সেই উত্তপ্ত সমাবেশটা রূপান্তরিত হলো এক ফাটাফাটি 'জাকানাকা ড্যান্সে-! কেউ হাত উপরে তুলছে, কেউ হাঁটু গেড়ে বসছে, কেউবা লাফাচ্ছে সেই গানের তালে!
ছাদে সানগ্লাস পরে দাঁড়ানো মেহরিন আর মেহনুর এই দৃশ্য দেখে হেসে কুটি কুটি। তারা তো এটাই চেয়েছিল। তাদের সমাবেশের ব্যাঘাত ঘটাতে।
মেহরিন হাসতে হাসতে বলল,
-"বেশ হয়েছে এবার বুঝুক আমদের সাথে লাগতে আসার কি মজা"
--------
বাড়ির গেট দিয়ে বেরিয়ে এসেই ফারহান এই দৃশ্য দেখে একদম থমকে গেল। পায়ের রক্ত যেন সোজা মাথায় উঠে গেল তার! কিছুক্ষণ আগেই ভাইয়ের এম পি পদে মনোনয়ন পাওয়ার যে আনন্দ, তা যেন এক লহমায় মাটি হয়ে গেল। ইট মারতে গিয়ে যেন পাটকেল খেল! মেহরিনদের জ্বালাতেই এখানে ভিড় জমা করেছিল সমাবেশের। কিন্তু তারা এটা এভাবে বেস্তে দিবে সে কল্পনাও করনি।
রাগে গজ গজ করে বেরিয়ে এসেই সে তারেক নামের ছেলেটিকে জোরে ধমক দিলো, যে তখনো হেলেদুলে গানটিতে নেচে যাচ্ছিল।
তাদের নেতার ভাইয়ের ধমক শুনে তারেক সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল। নাচা থামিয়ে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল।
"কী হচ্ছে কী এইসব? তোদের কি এই কারণে এখানে আনা হয়েছে? তোরা কোন দলের রে? আমাদের হয়ে বিরোধী দলের গানে নাচতে লজ্জা করছে না? দাঁড়া, তোদের নাচা বের করছি! ভাইয়াকে বলে সব কটাকে পার্টি অফিস থেকে বিদায় করব!"—এই বলে ফারহান পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত নম্বর ডায়াল করতে লাগল।
তারেক অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "আরে আরে ছোট ভাইয়া, কী করতাছেন? গানটা সুন্দর, তাই নাচতেছি আমরা। বিরোধী দলের তো কী হইছে? দল যার যার, গান সবার!"
এই বলে সে পিছনে দাঁড়ানো ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলল, "কী কও তোমরা? ঠিক কইতাছি না?"
এই কথা শুনে ফারহান যেন আরও বেশি রেগে গেল। তার রক্ত টগবগ করে ফুসছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় মেরে দিলো তারেক নামের ছেলেটিকে।
"এত নাচার যখন, তখন এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন হারামির দল কোথাকার!" চিৎকার করে বলল সে, "সব কটা বেয়াদব কে নিয়ে বিদেয় হ আমার চোখের সামনে থেকে!"
রাগে ফারহানের গা জ্বলছে। সে অনবরত তার ভাই ফারিশকে কল দিচ্ছে , কিন্তু ধরছে না। অবশেষে কল ধরল ফারিশ।
"ভাইয়া, চাচার মেয়েদের কিন্তু বেশি বাড় বেড়ে গেছে! ওদের কিন্তু আমি শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব। জানো কী কর..."
বাকিটুকু শেষ করতে পারল না ফারহান। অপর পাশ থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে এল, "জানি আমি। বলতে হবে না। বাঁদরদের স্বভাবই এটা। তুই কিছু না বলে ছেলেদের নিয়ে এখান থেকে পার্টি অফিসে চলে আয়। আমি দেখে নেব পরেরটা।"
"ভাইয়া, এভাবে ওদের ছেড়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না বলে দিলাম! আমি এর বিহিত করেই ছাড়ব!"—রাগে গজ গজ করতে করতে ফারহান কলটা কেটে দিলো।
-----
এদিকে ছাদের ওপর এই পুরো দৃশ্য দেখে মেহরিন হাসি আর ধরে রাখতে পারল না। সে আপুকে কনুই দিয়ে একটা গুতো মেরে হেসে উঠে বলল,
"ডিলটা কিন্তু জায়গায় মতো লেগেছে আপু! ছোট নবাবের চেহারাটা দেখার মতো হয়েছে!"
এই বলে সে হাসি থামিয়ে আবারও সেই গানের তালে তালে হালকা করে দুলতে শুরু করল।
নিচের লোকগুলো চলে যাচ্ছে দেখে যেন তার আনন্দ আরও বেড়ে গেল।
মেহনুরও নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহানের রাগান্বিত চেহারা আর ছেলেদের নাচার দৃশ্য দেখছিল।
তার ঠোঁটের কোণে তখন এক বিজয়ের হাসি। মুখ ফুটে কিছু না বললেও, সেও সেই গানের সাথে হালকা মাথা দোলাতে শুরু করল।
-------
ফারহান রাগে চোখ ছোট করে উপরে তাকাল। ছাদে দাঁড়িয়ে দুই বোন হাসছে। তার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে মজা নিচ্ছে দেখে সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
-"হাসো, হাসো! যত খুশি হেসে নাও। তোদের এই কর্মকাণ্ডের শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব, তা না হলে আমার নামও মিনহাজ খান ফারহান না!"
এই বলে সে দ্রুত কাউকে কল দিলো। রিসিভ হতেই চিৎকার করে বলতে লাগল, "এই শা*লা, তোর বোনদের সামলা! কী শুরু করেছে রে এইসব? এখনই গিয়ে স্পিকার বন্ধ করা, না হলে কিন্তু খবর খারাপ আছে!"
ওপাশ থেকে বিরক্তি নিয়ে উত্তর এলো, "রিল্যাক্স! ওরা আবার কী করল? চেঁচাচ্ছিস কেন?"
"জানিস না কী করেছে? ছাদে গিয়ে দেখ তোর বাঁদর বোনরা কী কাণ্ড করেছে! এখনই যদি এইসব বন্ধ না করাস, তাহলে ভিতরে এসে তোর বোনদের আর আস্ত রাখব না, বলে দিলাম!"—এই বলে ফারহান ঝট করে কলটা কেটে দিলো।
মাহির ফোনের দিকে তাকিয়ে বেশ বিরক্ত। এইসব নতুন নয়, প্রতিদিনের নিয়মিত ঝামেলা। তার হয়ে সে যত জ্বালা,দোষ করবে তারা আর ধমক খাবে সে।
-"লাইফটা হেল করে ছাড়ল এই নূরজাহান বিবির নাতি-নাতনিরা!"—বিড়বিড় করে একটা গালি দিয়ে সে বলল, "ধ্যাৎ তেরি! শুধু শুধু সাধের ঘুমটা নষ্ট হয়ে গেল!"
এই বলে বিছানা থেকে নেমে স্লিপার পরে সে রুম থেকে বের হয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
"দেখি, বাঁদররা আবার কোন তুলকালাম কাণ্ড ঘটাল!"
------
মাহির এসে বোনদের এই কাণ্ড দেখে বিরক্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এমন অশান্তি এই বাড়িতে লেগেই আছে।
দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে স্পিকার বন্ধ করল। সঙ্গে সঙ্গে দু'বোনের পিছনে গিয়ে দু'হাতে দুজনের কান ধরল।
"বাঁদরামো না করলে শান্তি পাস না তোরা? কী লাভ হয় শুধু শুধু ওদের সাথে লেগে?"
মেহরিন কান থেকে হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, "উফফ! ভাইয়া, ব্যথা পাচ্ছি, ছাড়ো তো!"
মেহনুরও মুচড়ামুচড়ি করছে কান ছাড়ানোর জন্য, "ভাইয়া, ছাড়ো তো! বেশ করেছি যা করেছি। ওরা যা খুশি করুক, কিন্তু বাড়ির সামনে এসে কেন চিল্লাপাল্লা করবে? ওরা ইচ্ছে করে আমাদের জ্বালানোর জন্য এইসব করেছে, তাই উচিত শিক্ষা দিয়েছি!"
মাহির জানে এসব। এ আর নতুন কী! সেও মৃদু হাসছে। দু’বোনের কান ছেড়ে দিয়ে বলল, "যাই বলিস, ইটের পালটা পাটকেলটা কিন্তু সেই ছিল!"—বলেই সে বোনদের সাথে হেসে উঠল।
তবে পরক্ষণেই সে গম্ভীর হয়ে সতর্ক করল,
"এই, এই শেষ বার। শুধু শুধু ওদের সাথে লাগিস না আর। ফারহান কিন্তু প্রচণ্ড রেগে আছে, ফারিশ ভাইয়ার কানেও গেছে ব্যাপারটা। ফারহানের থেকে সাবধানে থাকিস। সেও কিন্তু পাল্টা জবাব দেবে।"
মেহনুর ভাব নিয়ে বলল, "তাতে কী হয়েছে? আমরাও দেখে নেব! মেহনুরের সাথে লাগতে আসা! একবারে শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব বজ্জাত দুটোকে!"
মাহির অসহায় হয়ে তাকাল বোনদের দিকে, "আমায় মাফ করিস বইন, তোরা যা ইচ্ছে করিস, কিন্তু আমায় এসবের মধ্যে জড়াস না।"
মেহরিন ভেংচি কেটে ভাইকে বলল, "হয়েছে, ঢং করো না তো ভাইয়া! ওরা লাগলে আমরাও লাগব। ব্যাস,কথা ফাইনাল!"
"হে হে, যাস ফারহানের সামনে! তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!" মাহির টিপ্পনি কাটল।
মেহরিন আবারও ভেংচি কেটে যেতে যেতে বলল, "আমাদের বয়েই গেছে হিটলারটাকে ভয় পেতে! আমরাও দেখব ধান বেশি না চাল বেশি!"—এই বলে সে ছাদ থেকে প্রস্থান করল।
মেহরিনের এই ছেলেমানুষি কথা শুনে মেহনুর আর মাহির একে অপরের দিকে চেয়ে হেসে ফেলল। আসলে এই দুই বোনকে সামলানো যে অসম্ভব, তা মাহির ভালো করেই জানে। এদের জেদ একবার চেপে বসলে, আর রক্ষা নেই।
----
পরিচয় পর্বে আসা যাক,
আমার নাম মেহনূর খান নূর, যাকে সবাই নূর নামে ডাকে। আমি আমাদের দাদুর, অর্থাৎ নূরজাহান বিবির, অতি আদরের বড় নাতনি। আমার ছোট বোন মেহরিন খান নোহা এবং বড় ভাই নওরোজ খান মাহির। আমরা তিন ভাই-বোন। ভাই আমাদের মধ্যে বড় হলেও, খান বংশের সেই দুই 'হিটলার'—ফারহান আর ফারিশের—থেকে সে বয়সে ছোট। এই ফারহান আর ফারিশ হলো আমাদের বড় চাচার দুই নবাবপুত্র, যাদের কাজই হলো শুধু হিটলারি করা।
আমাদের ছোট চাচারও এক মেয়ে আর এক ছেলে আছে ইরহাম খান নিহান আর ইনায়া খান নিলু । তারা এখনও নূরজাহান বিবির সাথে **'নূর মহল'-**এই থাকেন।
আসলে আমরা সবাই একসঙ্গেই থাকতাম, কিন্তু দশ বছর আগে একটি বড় ঝামেলা হওয়ার কারণে আমাদের পরিবার 'নূর মহল' ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। ঠিক একই দিনে বড় আব্বুর পরিবারও একই মনোমালিন্যের কারণে ঢাকায় চলে আসেন।
আমার বাবার নাম নেওয়াজ খান, বড় আব্বুর নাম ফাইয়াজ খান, আর ছোট আব্বুর নাম নওশাদ খান।
বাবার আর বড় আব্বুর এই মনোমালিন্যের কারণেই আজ এত বড় একান্নবর্তী পরিবারের বিচ্ছেদ ঘটল। তবে ঢাকায় এসে আলাদা বাড়িতে বসবাস করলেও, দুই ভাই দূরে যাওয়ার সাহস করেননি। ঠিক একই জায়গায় বাড়ি করেছেন—একটি বাড়ির উল্টো দিকেই আরেকটি বাড়ি, একেবারে মুখোমুখি খানদের এই দুটি বিশাল অট্টালিকা, 'খান প্লেস' আর 'খান মঞ্জিল'।
পাশাপাশি থেকেও আজ এত বছর ধরে কেউ কারও সাথে কথা বলেন না। এমনকি সামনে পড়লেও যেন অভিমান আর অহংকারে একে অপরকে উপেক্ষা করে চলে যান। এমনটাই চলছে আজ এত বছর ধরে। কেউ কারো সাথে কথা না বললেও এক ভাই আরেক ভাইয়ের যান। ঠিকই একে অপরের ছায়াসঙ্গী।
চলমান.....