ফন্ট সাইজ:
থিম:
আলো আঁধারের নুর

৮ম পর্ব

লেখক: মাঈমা_তাহসিন_জান্নাহ

পর্বঃ৬ 

ইতালির উঁচু পাহাড়ের কোলে, শীতের রাত আজ ভীষণ থমথমে। বরফজমাট চূড়াগুলো চাঁদের আলোয় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, আর পাইন বনের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা বাতাস শিসের মতো শোনাচ্ছে। 
বিশাল কাঁচের জানালাযুক্ত আধুনিক ডুপ্লেক্সটির লনে, একটি ধূসর সোফায় গাঢ় কালো পোশাকে বসে আছেন এক পুরুষ। সাথে ভ্যাপ এর ধোঁয়া শীতের হাওয়ায় দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। তাঁর চোখ স্থির, যেন বহু দূরকে লক্ষ্য করছে। 
চারপাশে কঠোর নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলেছে কালো কমব্যাট পোশাকে সজ্জিত সশস্ত্র গার্ডরা টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তাদের মুখ ঢাকা, হাতে রাইফেল। প্রত্যেকেই যেন মূর্তিমান সতর্কতা। 
নীরবতা ভেঙে ভীত কণ্ঠে, কাঁপাকাঁপা স্বরে কথা বললো নির্ঝর,
—"স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ। আমার দশটা না, পাঁচটা না, একটা মাত্র লক্ষ্মী-মতো বউ আছে! তারে অকালে বিধবা কইরেন না, স্যার, প্লিজ্জ!" 
বলে কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
নির্ঝরের মাথায় একটি আপেল রাখা। সে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে আছে। ভয়ে কাঁপছে সে।
তার বিপরীতে সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে সেই ব্যক্তি। তীক্ষ্ণ, শক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে হাতে থাকা ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে নির্ঝরের দিকে তাকালো। তাকিয়েই উচ্ছ্বসিতভাবে শয়তানি হাসি দিলো। এদিকে নির্ঝর থরথর করে কাঁপছে। 
লোকটি একজন গার্ডকে ইশারা করতেই সাথে সাথে একটি রিভলভার এগিয়ে দিল। লোকটি তা নিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে নিরজরের দিকে তাকালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
—"Is there any doubt in my target?" (আমার লক্ষ্যে কোনো সন্দেহ আছে?)
নিরজর কাঁপাকাঁপা গলায় আবার বলল, "ন... না, স্যার।" 
লোকটি বাঁকা হাসলো। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
— "Then be ready." (তাহলে প্রস্তুত হও) 
বলেই লোকটি নির্ঝরের দিকে বন্দুক তাক করলো।
নির্ঝর এক চোখ খুলে তা দেখে আবার চোখ খিচে বন্ধ করে দিল। এবার কাঁপাকাঁপি যেন আরও বেড়ে গেল। কনকনে ঠান্ডার মাঝেও ঘেমে নেয়ে একাকার। বিড়বিড় করে আল্লাহর নাম জপছে।
তা দেখে লোকটি বাঁকা হেসে নির্ঝরের পায়ের বরাবর মাটিতে 'শুট' করে দিলো। 
নির্ঝর এতক্ষণ দম আটকে রেখেছিল। শুট হতেই কাঁপাকাঁপা হাত মাথার ওপর চলে গেল। হাত দিয়ে দেখলো আপেলটি জায়গায় রয়েছে! তার মানে কী? তার বুকে লেগেছে? নাকি সে মরে গেছে? এসব ভাবতে ভাবতে ভয়ে ভয়ে বুকে হাত দিয়ে চেক করলো— না, কিছু হয়নি! এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। 
ভাবলো, স্যার হয়তো গুলি করবেন না আর। তাই চোখ বন্ধ রেখেই মাথার ওপর রাখা আপেলটি হাতে নিয়ে খাওয়ার জন্য কামড় দিতেই আরেকটি গুলির আওয়াজ হলো! সাথে সাথে নিরজর অনুভব করল, সে তার আঙুলে কামড় দিয়ে দিয়েছে! 
সহসা চোখ খুলে তাকালো। খেয়াল করল হাতে আপেলটি নেই। মেঝেতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। তার মানে সে যখন আপেল হাতে নিয়েছিল, তখন কি তার স্যার টার্গেট করে হাত থাকা অবস্থায় শুট করেছেন? 
সে স্যারের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোঁক গিললো। দেখলো সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে, এক ভ্রু উঁচু করে, এক হাতে রিভলভার আর অন্য হাতে ওয়াইন নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে চুমুক দিচ্ছে— যেন কোনো কিছুতেই তার ভ্রুক্ষেপ নেই। 
আশপাশে তাকাতেই দেখলো দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডগুলো ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসছে। নির্ঝর ভ্রু কুঁচকে তাকালো— কী কারণে হাসছে বুঝার জন্য। একজন গার্ড চোখ দিয়ে ইশারা করতেই নির্ঝরও সেই দিকে তাকিয়েছে। সাথে সাথে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। 
তার পুরো প্যান্ট ভিজে আছে! মানে কী সে...? ছি ছি! ভাবতেই লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। যার একটা হুঙ্কারে লোকজনের প্যান্ট ভেজার মতো ক্ষমতা রাখে, আর আজ সে কী না... এসব ভেবেই লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকালো তার স্যারের দিকে।
লোকটি কোনো কিছু না ভেবেই হাতের ওয়াইনের গ্লাসটি মেঝেতে আছাড় মেরে চুরমার করে ফেলল। কাঁচ ভাঙার শব্দে রাতের নীরবতা চূর্ণ হলো। সে এক হাত দিয়ে পাশে রাখা ভ্যাপ (Vape) হাতে নিল। তাতে টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া উড়িয়ে বসা থেকে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। 
তারপর রিভলভারটি বাম দিকে তাক করে পরপর চারটে বার শুট করে দিলো! 
তাতেই লুটিয়ে পড়লো গার্ডের পোশাক পরিহিত চারটি লোক। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল, বাকি গার্ডরা আতঙ্কে কাঁপছে।
​নিরজর দ্রুত গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া গার্ডদের কাছে যেতেই দেখলো— এই চারজন গার্ডের হাত থেকে একটি করে ক্যামেরা মাটিতে পড়ে আছে। এতে নিরজর যা বোঝার বুঝে নিল। এরাও বিশ্বাসঘাতক।
​লোকটি সোফায় গা এলিয়ে, শীতল কণ্ঠে বলল,
— "I am hungry, Nirjar."
​বলে ভ্যাপে এক টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শয়তানি হেসে আকাশের দিকে তাকালো।
​নির্ঝর স্যারের কথা শুনে বুঝলো যে তিনি কী চান। কিন্তু এই কনকনে শীতের মাঝে? সে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,— "স... স্যার, এখন?"
​লোকটি একই ভঙ্গিতে বসে আকাশের দিকে চেয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
—" right now i wanna need red water with..." থেমে বাঁকা হেসে বলল, "Red Fairy."
​নির্ঝর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সে জানে, সে কিছু বললেও লাভ হবে না।
​
নির্ঝর গার্ডদের কিছু ইশারা করে ভেতরে গেল শাওয়ার নেওয়ার জন্য। 
নির্ঝরের ইশারা পেতেই গার্ডরা মৃত গার্ডের পোশাকে থাকা এই চারটি ডেড বডিকে সুইমিং পুলের কাছে নিয়ে এল।ঠাণ্ডা হিমেল বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। চারজন গার্ডের মৃতদেহকে যখন সুইমিং পুলের ধারে নিয়ে গিয়ে তাদের গলা কাটা হল, সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে বাকি গার্ডরাও ভয়ে কেঁপে উঠল। প্রতিটি ধারা, প্রতিটি রক্তবিন্দু পুলের স্ফটিক স্বচ্ছ জলের সাথে মিশে এক ভয়ংকর, গাঢ় লাল রঙ তৈরি করল—যেন পুরো পুলটা এক বিশাল, থিকথিকে রক্তের ভাণ্ডার। 
​কিছুক্ষণের মধ্যে নির্ঝর শাওয়ার শেষ করে ফিরে এলো। তাকে দেখে গার্ডরা পেছনে দাঁড়ানো চারজন রাশিয়ান তরুণীকে সামনে আনল। মেয়েগুলোর পরনে গাঢ় লাল, অশালীন পোশাক। ভয়ে তাদের শরীর কাঁপছে, চোখগুলো আতঙ্কে স্থির। 
​নির্ঝর এসে দাঁড়াতেই তার 'স্যার'-এর কাছে একজন সার্ভেন্ট এলো। লোকটির শরীর থেকে কালো কোট ও ভেতরের শার্টটি খুলে নেওয়া হলো। নিমেষেই উন্মুক্ত হলো তার সুঠাম, জিমে গড়া পেশিবহুল ধবধবে ফর্সা দেহ। প্রতিটি পেশি যেন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আর ঠিক তখনি তার পিঠের সেই ঈগলের টেটু যেন আলোয় ঝলমল করে উঠল। 
​ঠোঁটে এক বাঁকা, ভয়ংকর হাসি নিয়ে লোকটি ধীরে ধীরে পুলের কিনারায় এলো। তার দৃষ্টি ছিল স্থির, শীতল এবং উন্মত্ত। যেন কোনো ক্ষুধার্থ শিকারী তার শিকারের সামনে দাঁড়িয়ে। 
​এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, কনকনে ঠাণ্ডা রক্ত-মিশ্রিত সেই জলে সে ঝাঁপ দিল। সাঁতার কাটতে কাটতে সে ফিসফিস করে উঠল, তার কন্ঠস্বর তখন রক্তপিপাসু এক দানবের মতো শোনাচ্ছিল, 
​“রক্ত! আমার আরও রক্ত চাই! আরও... আরও... আরও চাই!” 
​তার উচ্চ, উন্মাদ হাসি সেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। উপস্থিত সবার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। মানুষ কতটা সাইকো হলে এমন জমাট বাঁধা শীতে, এমন ভয়াবহ দৃশ্যের মাঝে সাঁতার কাটতে পারে, তা নির্ঝর আগে জানত না। 
​লোকটি জলে কয়েকটি ডুব দিয়ে নির্ঝরকে কিছু ইশারা করতেই নির্ঝর সব গার্ডকে সাথে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। সে জানে, এরপর কী ঘটবে।
​নির্ঝরা চলে যেতেই ভয়ে কাঁপতে থাকা মেয়েগুলো ধীরে ধীরে পুলের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের অসহায় শরীরগুলো কাঁপছিল, কিন্তু তার নির্দেশ অমান্য করার সাহস তাদের ছিল না। তারা এক এক করে সেই হিমশীতল রক্ত-জলে পা রাখল।
​আর তক্ষুনি! 
​হিংস্র বাঘের মতো সেই লোকটি জাপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। যেন কতদিনের অভুক্ত এক শিকারী তার হাতের কাছে নরম, দুর্বল শিকার খুঁজে পেয়েছে। পুলের লাল জল আরও একবার উত্তাল হয়ে উঠল। মেয়েদের চাপা আর্তনাদ আর লোকটির উন্মত্ত হাসির শব্দ সেই অন্ধকার রাতে মিশে এক ভয়ংকর পরিবেশ সৃষ্টি করল। 
-------
​কিছুক্ষণ পর ​জল থেকে মাথা তুলে, চোখগুলো লাল করে, সে এক হিংস্র হাসি হেসে বলল: “এই ঠান্ডা জল আর এই রক্তের উষ্ণতা... আহ! এটাই আমার জীবন! আমার ক্ষুধা কখনও মেটে না, ! কখনও না!”এই বলে উচ্চ শব্দে হাসতে লাগলো। পুলের জলে ভাসছে চার তরুণীর পরে থাকা নিথর দেহ। তা দেখে লোকটি বাঁকা হাসলো।
টাওয়াল পেছিয়ে উঠে দাঁড়ালো ধীরে ধীরে পুল থেকে। এরপর লোকটি শান্তভাবে ভ্যাপে আরেকটি টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে দিল। কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসি দিয়ে বিড়বিড় করল, 
—"That was so silly buddy! I think you should try another way"—বলেই ভ্যাপে টান দিয়ে ধোয়া উড়াল আকাশে। পরক্ষণে কাউকে কল দিল রিসিভ হতেই। 
গম্ভীর স্বরে বলল,
—"We'll meet very soon, I'm on my way" 
--------
খান বাড়ির সকলে শীতের সকালে হাঁটার জন্য বেরিয়েছে,মাহির, নিহান, ফারিন, মারোয়া, মিরান, নীলু, মেহনু‌র, আর মেহরিন। 
​কুয়াশার পাতলা চাদর আর শিশিরভেজা সবুজ ঘাসের গালিচা ভেদ করে তাদের যাত্রা। হাঁটার পথে প্রতিটি পদক্ষেপ এক নতুন অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। মেহনু‌র শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটছে। শীতল, ভেজা স্পর্শ পায়ের তলায় এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছে, যা সরাসরি মনের গভীরে শান্তি নিয়ে আসে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি তার সমস্ত স্নিগ্ধতা যেন পায়ে পায়ে ঢেলে দিয়েছে। চারপাশের নীরবতা আর দূর্বাঘাসের হিমেল স্পর্শে তার মন মুগ্ধতায় ভরে উঠছে। 
​মারওয়া আর মিরান যেহেতু এই দেশে প্রথম, তাই তারা অবাক বিস্ময়ে চারপাশ দেখছে। গ্রামীণ শীতের সকালের এমন শান্ত, নির্জন রূপ তাদের কাছে একেবারেই নতুন। মিরান হাঁটতে হাঁটতে এই স্নিগ্ধ দৃশ্যের ক্যামেরাবন্দি করছে—যেন এই সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে চিরকাল ধরে রাখা যায়।
​পেছনে, মাহির আর নিহান নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে আর বোনদের দিকে নজর রাখছে। তাদের আলাপচারিতায় মিশে আছে হালকা হাসির শব্দ আর ভোরের শীতল হাওয়া। 
​কিছুক্ষণ পর সবাই হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল এক সুবিশাল সরিষা ক্ষেতের দিকে। মাঠটি বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত, দূর দূর পর্যন্ত কোনো পাকা রাস্তা বা স্থাপনা নেই। বিশাল প্রান্তর জুড়ে শুধুই হলদে সরিষার ফুল। শীতের হালকা রোদে সেই হলুদ ফুলেল গালিচা যেন আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, এক স্বর্গীয় আভা ছড়াচ্ছে।
​সবাই সেই মনোরম দৃশ্য ঘুরে দেখছে আর ছবি তোলায় ব্যস্ত। মুঠোফোনের ক্যামেরায় সবাই এই হলুদ সমুদ্রের স্মৃতি ধরে রাখতে চাইছে। 
​কিন্তু এই ছবি তোলার ভিড়ে মেহনু‌রের কোনো আগ্রহ নেই। সে কিছুটা দূরে সরে গেল। তার চোখ গেল একটি শান বাঁধানো পুকুরের দিকে। পুকুরের স্থির জলে ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। নিজের গায়ের শালটি আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে সে নীরবে সেই পুকুরঘাটে গিয়ে বসল। ঠাণ্ডা শানপাথরের স্পর্শে তার শরীরে এক আরামদায়ক অনুভূতি এল। চারপাশের হলুদ ঢেউ আর কলরব থেকে দূরে, এই নির্জনতায় তার মন শান্ত হয়ে গেল। মেহনু‌র আপন মনে গুন গুন করে গান ধরল, যেন সে প্রকৃতির এই নীরব সুরের সাথে নিজের মনের কথা মিশিয়ে দিতে চাইছে। সেই সকালের স্নিগ্ধতা আর গানের সুর মিশে তার হৃদয়কে এক গভীর প্রশান্তি এনে দিল।
মেহনু‌র তখন সেই শান বাঁধানো পুকুরঘাটে শান্ত হয়ে বসে আছে। চারপাশের সরিষা ক্ষেতের ভিড় আর ছবি তোলার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে এনেছে সে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় তার মন এক গভীর শান্তিতে ভরে উঠেছে। 
​সে এক দৃষ্টিতে স্থির জলের দিকে চেয়ে রইল, আর আপন মনে গুন গুন করে গান ধরল। তার কণ্ঠে ভেসে এলো সেই চিরচেনা সুর,
★​"কেন লাগে শূন্য শূন্য বলো,
​ তোমায় ছাড়া এতো, 
    ​তুমি কি তা বলতে পারো?"★
​ 
​শীতের সকালের নরম বাতাস আর জলের মৃদু ঢেউয়ের তালে মেহনু‌রের এই উদাসীন সুর পুকুরপাড়ের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলল। তার গানে মেশানো ছিল এক বিষণ্ণ মাধুর্য, যা কেবল নিজের মনের গভীরে থাকা অনুভূতিকেই প্রকাশ করে। 
হঠাৎই মেহনু‌র তার পাশে কারো উপস্থিতি টের পেল। মুহূর্তেই তার মনোযোগ ভেঙে গেল। দ্রুত হাতে সে ভিজে ওঠা চোখ মুছে নিল। সে ভালো করেই জানে কে এসেছে—কারণ সেই চিরচেনা অরকিড পারফিউমের গন্ধটি বাতাসের সাথে ভেসে এসে তার নাকে পৌঁছাল। 
মেহনু‌র ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে দেখল ফারিশকে—কালো ট্রাউজার আর সাদা হুডি পরিহিত সেই স্নিগ্ধ পুরুষকে। শীতের তীব্রতার কারণে তার ফর্সা গাল লাল হয়ে আছে, আর সেই সাথে নাকটাও অসম্ভব লাল হয়ে উঠেছে। ফারিশের এই অবস্থা দেখে মেহনু‌র হালকা হাসল, কিন্তু পরক্ষণেই সহসা চোখ নামিয়ে নিল। 
​ফারিশ মেহনু‌রের পাশে বসতে বসতে শান্ত স্বরে বলল, 
​—"কার বিরহে এত পুড়ছিস শুনি! কার শূন্যতা গ্রাস করলো তোকে?" 
ফারিশের প্রশ্নের উত্তরে মেহনু‌র তার দিকে একটি শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলল এক হালকা, মলিন হাসি। কোনো কথা না বলে সে নিচু হয়ে পুকুরঘাটের নিচ থেকে কয়েকটি নুড়ি পাথর হাতে তুলে নিল। 
​একটার পর একটা পাথর সে পুকুরের শান্ত জলের দিকে ছুড়তে শুরু করল। প্রতিটি পাথর পড়ার সাথে সাথে জলে তৈরি হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী ছোট ছোট ঢেউ। পাথরের মৃদু শব্দ আর জলের চঞ্চলতা নীরবতা ভাঙল। 
​পাথর ছুড়তে ছুড়তে স্থির ও নিস্পৃহ কণ্ঠে সে বলল, 
​—"মেহনু‌রকে শূন্যতা গ্রাস করেনি... বরং মেহনু‌রই শূন্যতাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে।" 
​তার কণ্ঠস্বরে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, যা এক গভীর অভিমান এবং নির্লিপ্ততাকে ফুটিয়ে তুলল। ফারিশের দিকে না তাকিয়ে, তার চোখ দুটি তখনো পুকুরের গভীরে, যেখানে প্রতিটি নুড়ি মিশে গিয়ে জলের শান্তি নষ্ট করে দিচ্ছে। 
মেহনু‌রের কথায় ফারিশ কোনো জবাব না দিয়ে একদৃষ্টে সামনের সেই শুভ্র পরীকে দেখতে লাগল।
​সম্পূর্ণ মনোযোগ তখন তার ওপর—ফুল-স্লিভ কালো চুড়িদার আর শাল জড়ানো সেই মেহনু‌র। 
তার কোমর-সমান বাদামি চুলগুলো হালকা করে খোঁপা করা, আর সামনের লেয়ার-কাট ছোট চুলগুলো দু'ভাগ হয়ে কপাল ছুঁয়েছে। তার 'ছাই রঙের চোখগুলো (হেমন্তের পাতার মতো) সামান্য লাল হয়ে আছে, যা তাকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলেছে। ফারিশ ভাবছিল, এই শুভ্র পরী কি জানে সে ঠিক কতটা আকর্ষণীয়? বিশেষ করে তার ঠোঁটের নিচে থাকা সেই তিলটি, যা বড়োই মোহময়। এই গভীর শূন্যতার মধ্যেও তার সৌন্দর্য ফারিশকে যেন এক ঘোর লাগা জগতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। 
​ফারিশ কোনো কথা না বলে এভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মেহনু‌র গলা খাঁকারি দিল। 
​সহসা যেন ঘোর ভাঙল ফারিশের, তার হুঁশ ফিরল। কিন্তু চোখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও সে পারল না। তার অবাধ্য চোখ বারবার মেহনু‌রের উপরই আটকে যাচ্ছিল। যেন তার সমগ্র সত্তা তাকে বলছে, এই দৃষ্টি যেন এক মুহূর্তের জন্যও সরে না যায়। 
মেহনু‌র হালকা হেসে কিছুটা সাহস জুগিয়ে ফারিশকে প্রশ্ন করল, 
​—"ফারিশ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?" 
​ফারিশ তখনো ফোনের দিকে চোখ রেখেছিল, ছোট করে জবাব দিল, 
—"হুম, কর।"
​মেহনু‌র ঢোঁক গিলে আরেকটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, 
— "কাউকে ভালোবাসেন?" 
​সাথে সাথে ফারিশ চোখ তুলে তাকাল। একটি ভ্রু উঁচু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, —"আপাতত বলতে পারছি না। উত্তরটা তোলা রইল, সময় হলে দেব।" 
​মেহনু‌র আর কিছু বলল না। শুধু মলিন হাসল। তারপর মৃদু স্বরে আবার জিজ্ঞেস করল,
​—"আচ্ছা, জোর করে কি কাউকে নিজের করা যায়?" 
​ফারিশ একই ভঙ্গিতে জবাব দিল,
—"জোর করে পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে পাবো না জেনে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে, এমন কোনো কথা-ও কিন্তু নেই। পেতে হলে লড়তে হবে আর সেই লড়াইয়ে যদি হেরে যাস তাহলে ধরে নিবি এটা না তো তোর আর না তো ছিল তোর জন্য মঙ্গলজনক । " 
​এই বলে সে হালকা হেসে উঠে দাঁড়াল। এক হাতে ফোন পকেটে রেখে আরেক হাত বাড়িয়ে দিল মেহনু‌রের দিকে। চোখ দিয়ে ইশারা করল হাতটি ধরার জন্য। 
​বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে রইল মেহনু‌র। তার মনে হলো সে কি ভুল দেখছে? 'মেহরাজ ফারিশ' তার দিকে হাত বাড়িয়েছে, তাও নিজে থেকে!
​মেহনু‌রের মনের কথা হয়তো ফারিশ বুঝতে পারল। হালকা হেসে মেহনু‌রের সম্মতির অপেক্ষা না করেই সে মেহনূর শাল দিয়ে তার হাত পেঁচিয়ে ধরে এবং তাকে দাঁড় করাল। শান্ত স্বরে বলল, 
—"চল, যাওয়া যাক।" 
​এই বলেই মেহনূরে হাত এভাবেই শাল দিয়ে ধরে সামনের দিকে পা বাড়াল ফারিশ। 
ভোরের নরম আলো আর শীতের ভেজা বাতাস তাদের স্পর্শ করে যাচ্ছিল। এমন সময় ফারিষের নজর পড়ল পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন গ্রাম্য লোকের ওপর, যাদের কাঁধে বাঁশের কঞ্চিতে ঝোলানো মাটির হাঁড়িগুলো থেকে সতেজ খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। 
​ফারিষ আলতো করে মেহনূরের হাত ধরে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল। মেহনূরের সম্মতির অপেক্ষা না করেই সে দুটি কাঁচের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে রস নিতে বলল। দোকানির হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে, একটি গ্লাস মেহনূরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অন্যটি নিজে তুলে নিল। সে জানত, মেহনূর এই মিষ্টি খেজুরের রস খুব পছন্দ করে, আর তাই জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। 
​মেহনূর হাসিমুখে গ্লাসটি নিল, যদিও ফারিষের এমন হঠাৎ সিদ্ধান্তে সে একটু অবাক হয়েছিল। সে ছোট করে শুধু বলল, —"ধন্যবাদ," 
তাই ফারিশ ও মুচকি হাসলো।
-------- 
​
​এদিকে মারওয়া আর মেহরিন নিজেদের মধ্যে খুনসুটির আলাপ করতে করতে সামনের দিকে হাঁটছিল। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের এই শান্ত পরিবেশে তারা নিজেদের মতো করে চারপাশ দেখছিল। 
​তাদের থেকে কিছুটা দূরে গ্রামের কয়েকটি বখাটে ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখজোড়া যেন এই দুই শহরকন্যাকে গিলে খাচ্ছিল। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন—যে চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরেছিল—উচ্চস্বরে গান ধরল, 
​"চুমকীরা চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে?
রাগ করো না সুন্দরী গো, রাগলে তোমায় আরও ভালো!" 
​পাশে থাকা আরেক বখাটে ছেলে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল, 
​"ছেলে আমি মন্দ না, কলেজেতে পড়ি,
ভুল করিলে মাফ করিবেন, আই অ্যাম ভেরি সরি।
নালিশ কিন্তু করবেন না বাবার কাছে যাইয়া রে,
গ্রামে আইসা দেখি কোন শহরের মাইয়া রে!" 
​অন্য একজন বুকে হাত দিয়ে হিন্দি গান ধরল, 
​"দেখা হে তুজকো যবসে হ্যায়, মে তো হিল গ্যয়া,
লাগতা মেরে সিনে সে দিল নিকাল গ্যয়া!" 
​গানগুলো যে তাদের উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে, তা বুঝতে মেহরিন আর মারোয়ার এক মুহূর্তও বাকি রইল না। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটি শয়তানি হাসি দিল—এক দুষ্টু খেলার ইঙ্গিত। মুখে সেই হাসি রেখেই তারা পিছন ফিরে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। 
​তাদের এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে বখাটে ছেলেগুলো কিছুটা হকচকিয়ে গেল, কিন্তু নিজেদের ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করল। 
​মেহরিন বেশ স্বাভাবিকভাবে, ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি নিয়ে, আশেপাশে কিছু একটা খোঁজার ভান করে বলল, 
—"দেখি কোথায়?" 
​ছেলেগুলোর কপালে যেন বাজ পড়ল। তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, 
—"ইয়ে মানে কী... কোথায়?!"
​মেহরিন যেন খুব অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, —"আরে বাবা, এই না বললে 'দিল নিকাল গ্যয়া'? সেটাই খুঁজছি তো! তোমাদের দিলের রং কী—সেটা দেখতে চাই।" 
​যে ছেলেটি চুলে ব্যাকব্রাশ করে ভাব নিচ্ছিল, সে নিজেকে বেশ স্মার্ট প্রমাণ করতে বলল,
— "আহা মিস! এটা তো গান মাত্র। বললেই কি আর সত্যি সত্যি বের হয়ে যায় নাকি!" 
​মেহরিন ফিক করে হেসে বলল,
— "উহুঁ, বলেছেন যেহেতু, দেখতেই তো হচ্ছে আপনার দিলের রং কী—লাল না নীল! আর সেটা আমি এখনই বের করব।" এই বলে সে একটি তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসি দিল। 
​ছেলেরা এই কথা শুনে অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল এবং উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তাদের মধ্যে একজন তাচ্ছিল্য করে বলল, 
—"পাগলা কুত্তা কামড়াইছে নাকি সুন্দরী? ইশ! ওই কুত্তার জায়গায় যদি আমি কামড়টা দিতে পারতাম, তাহলে তো শুধু পাগল না হয়ে আমার প্রেমে পাগল হতেন!" 
​মারওয়া আর মেহরিন এই কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মারওয়া বলল,
— "হাউ ফানি! লাইক সিরিয়াসলি?" এই বলে সে আরও জোরে হাসতে লাগল। 
​মেহরিন শয়তানি হাসি হেসে বলল, 
—"পাগলা কুত্তা আর তোরা—তাদের মধ্যে কোনো তফাত আছে? বাই দ্য ওয়ে, আমায় না কামড়ালেও কিন্তু তোদের এবার ঠিকই কামড়াবে!" 
​এই বলে সে একটি শিস দিতেই তাদের বাড়ির পোষা, প্রশিক্ষিত বুল ডগ মারকো ছুটে চলে এল। মেহরিন ইশারা করতেই মারকো 'ঘেউ ঘেউ' করে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। 
​মুহূর্তের মধ্যেই ছেলেগুলো ভয়ে পালাতে শুরু করল, কিন্তু মারকো মুহূর্তের মধ্যে তাদের ধরে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কামড়ে-আঁচড়ে তাদের একজনের অবস্থা নাজেহাল। তারা কোনোমতে ছুটে গিয়ে পাশে থাকা একটি পুকুরে ঝাপিয়ে পড়ল। 
​মারকোও 'ঘেউ ঘেউ' করতে করতে পুকুরের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল এবং সমানে চিৎকার করতে থাকল। ছেলেগুলো ভয়ে এবার কেঁদেই ফেলল। একদিকে কামড়ের জ্বালা, অন্যদিকে এই শীতের সকালে ঠান্ডা পানির মধ্যে ভেজা শরীর। 
​তাদের এই করুণ দৃশ্য দেখে মেহরিন আর মারোয়া হাসতে হাসতে মারকোর পিছনে পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়াল। মেহরিন আফসোস করার সুরে বলল, —"কী, কেমন লাগছে? ইশ, শেষে কিনা আমাদের প্রেমে না পড়ে পুকুরে পড়লেন! ইশ ইশ!" সে মুখ দিয়ে 'চ' 'চ' শব্দ করল। 
​ছেলেগুলো হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, —"আইজ থেইকা তোমরা আমার আম্মা। মাফ কইরা দাও আম্মা, দয়া কইরা মাফ কইরা দাও আম্মা। খালি তোমরা কেন, আমার নিজের আপন মা-বোন আর বউ বাদে দুনিয়ার সকল মেয়ে জাতি আমার আম্মা! আর জীবনেও এই ভুল করমু না।" 
পাশের ছেলেগুলোও একই কথা বলল।
​মেহরিন নাক সিটকে বলল, 
—"ওয়াক! তোদের মতো দামড়া ছেলের 'আম্মা' হওয়ার গুনাক্ষরেও আমি হবো না। আমারে কি তোদের বুড়ি মনে হয়? ছ্যাহ! দাঁড়া, তোদের আরও কয়েকটা 'ডোজ' দিতে হচ্ছে।" এই বলে সে মারকোকে ইশারা করতে যাবে, তখনই ছেলেগুলো উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল। 
​একজন কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— "না ম্যাডাম, আম্মা ডাকমু না ম্যাডাম! দয়া কইরা ওই কালো কুত্তাডারে সরান। আপনি যা বলবেন তাই করমু, তাও এইডারে সরান!" 
​মেহরিন বাঁকা হাসল। 
—"এক তো এটা কুত্তা না, এটার একটা সুন্দর নাম আছে—মারকো। 'কুত্তা' বলে ওর সম্মানে আঘাত করেছিস। তার ওপর আমার মতো সুইট এইটিনের একটা বাচ্চাকে 'আম্মা' বলছিস! তাই তোদের শাস্তি হলো, আজ সারাদিন এইভাবে পুকুরে দাঁড়িয়ে থাকবি আর মারকো তোদের পাহারা দেবে। পালানোর চেষ্টা করলেই বুঝতেই পারছিস—মারকো স্পেশাল 'ডোজ' ফ্রিতে পাবি।" 
​ছেলেগুলোর কাকুতি-মিনতি তারা শুনল না। মেহরিন আর মারোয়া যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। মারোয়া হাসতে হাসতে মারকোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে গেল, 
—"বেস্ট অফ লাক মারকো! ক্যারি অন!" 
​এই বলে দু'জনে হাসতে হাসতে চলে গেল। আর ছেলেগুলো অসহায় হয়ে তাদের যাওয়ার পানে চেয়ে রইল। 
​মেহরিনরা চলে যেতেই এগিয়ে এল ফারহান আর মাহির। তারা দূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ তাদের কাণ্ড দেখছিল। যেহেতু দোষ করেছে ছেলেগুলো, তাই এতটুকু শাস্তি তাদের প্রাপ্য। 
​ফারহান এগিয়ে আসতেই মারকো ছুটে এসে ফারহানের পায়ের কাছে মাথা ঘষতে লাগল। ফারহান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মারকোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "গুড বয়। ফিরে যাও এখন।" মারকো 'ঘেউ ঘেউ' করে কিছু একটা বলল। ফারহান হাসল। সে যাওয়ার ইশারা করতেই মারকোও চলে গেল। 
​মারকো চলে যেতেই ফারহান কঠোর অগ্নিদৃষ্টিতে ছেলেগুলোর দিকে চেয়ে বলল,
— "শিক্ষা হয়েছে? আর কখনো যদি মেয়ে দেখলে এরকম করিস, তাহলে এর থেকেও ভয়ংকর শাস্তি পাবি। আজ শুধু শীতের দিন বলে বেঁচে গেলি, না হলে খানবাড়ির মেয়েদের দিকে নজর দেওয়ার শাস্তি এই ফারহান নিজের হাতে দিত।" 
​মাহির হেসে বলল, 
—"আবে শা*লারা, দেখছিস কী রে? বিদায় হ এখুনি! বোইনদের শাস্তি তেই এরকম কুপোকাত! আর ভাইদেরটা পেলে তখন আর তোদের চিহ্নও খুঁজে মিলবে না। তাই বিদায় হ শালা।" 
​ঘাড় ঘুরিয়ে ফারহানের দিকে তাকাতেই দেখল, ফারহান অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাহিরের দিকে। 
​মাহির ফারহানের এমন দৃষ্টির কারণ বুঝল, কেন সে চেয়ে আছে। মনে মনে ঢোক গিলল—'এই রে, ভুল জায়গায় ভুল বাক্য বলে ফেলেছি!' স্বাভাবিক হয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
— "ইয়ে মানে... আমার কথা বলেছি আর কি!" 
​ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে চেয়েও বলল না। শুধু ছোট করে বলল, 
—"শালা! আরেকদিন শুধু বলিস 'বোন', তাহলে তোর এই মুখের নকশা আমি পাল্টে দেব!" এই বলে সে সামনে হাঁটা ধরল।" 
​মাহিরও দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারহানের পিছু পিছু হাঁটা ধরল এবং বিড়বিড় করে বলল,— "ইজ্জত দেবে না, আবার তেজ দেখাবে! শালা বেত্তমিজ!"
---------
নূর মহলে তখন তোরজোর কদমে চলছে সকালের নাস্তার আয়োজন। আজকের সকাল যেন উৎসবের চেয়ে কোনো অংশেই কম না। দীর্ঘ দশ বছর পর খান বাড়ির সকল ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হয়েছে। দীর্ঘদিনের মান-অভিমান ভুলে যেন শুরু হতে চলেছে এক নতুন সূচনা। 
​বাড়ির তিন বউ মিলে হাতে হাতে নাস্তা তৈরি করছেন, আর বাড়ির অন্যান্য সার্ভেন্টরা তাতে সহায়তা করছেন। তাদের কর্মব্যস্ততা ও হাসির শব্দে যেন পুরো বাড়িতে এক আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। 
​ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ন'টা বাজতেই একে একে খান বাড়ির সকল সদস্য নাস্তার টেবিলে উপস্থিত হলেন। প্রত্যেকেই নিজেদের চেয়ার খুঁজে নিয়ে বসলেন। সেই মুহূর্তে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এক দৃশ্য—বাড়ির কর্তা ফাহশাম উদ্দিন খান সযত্নে তাঁর স্ত্রী নূরজাহান বিবির হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামছেন। এই দৃশ্য দেখে সকলে মুগ্ধ হয়ে তাকাল। বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের অভিমানের যে পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তা এই ছোট একটি কাজ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। 
​নূরজাহান বিবির মনে তখন গভীর প্রশান্তি। তাঁর সংসার যেন আবার পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিজের হাতে গড়া সংসারে সুখ ফিরে এসেছে, যা একমাত্র সম্ভব হয়েছে তাঁর প্রিয় নাতি-নাতনিদের ভালোবাসার কারণেই। তাঁর হৃদয় ভরে উঠেছে এক অকৃত্রিম তৃপ্তিতে। 
টেবিলে বসে সকলে টুকটাক কথাবার্তা বলতে বলতে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। ভোরের সেই স্নিগ্ধতা যেন উষ্ণ খাবারের গন্ধে আর হালকা আলোচনায় ভরে উঠেছিল। ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে গলা খাঁকারি দিলেন ফাহশাম উদ্দিন খান। 
​সবাই বুঝলো—উনি কিছু বলতে চান। ফাইয়াজ খান সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, 
—"বাবা, আপনি কিছু বলতে চান?" 
​ফাহশাম উদ্দিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি তাঁর গম্ভীর, দৃঢ় কণ্ঠে শুরু করলেন, 
​—"যেহেতু সকলে এখানে উপস্থিত আছো, তাই সকলের উদ্দেশ্যেই বলছি।" একটু থেমে, তিনি চোখের সামনে থাকা পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকালেন। —"পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো কেন, কীভাবে কেটেছে, তা নিয়ে আমি কথা বাড়াতে চাই না। আগামীটা কীভাবে সুন্দর হবে, সেটাই সকলকে ভাবতে হবে।" 
​তিনি তাঁর দুই ছেলে ফাইয়াজ আর নেওয়াজ খানের দিকে চাইলেন। তাঁদের চোখে ছিল অপরাধবোধের ছায়া। 
​—"কারো কৃতকর্মের প্রভাবে আমার মেয়ের জীবন নষ্ট হোক, সেটা আমি আর চাই না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—নাজোয়া আর রাজিনের বিয়ে কিছুদিনের মধ্যে ঠিক করব। আশা করছি, এতে কারোর আপত্তি নেই।" 
​—"আমার আপত্তি আছে, বাবা।" 
​হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো একটি মেয়েলি, কিন্তু অত্যন্ত শক্ত কণ্ঠস্বর। 
মুহূর্তে সেই নীরব, শান্ত পরিবেশে যেন বোমা ফাটল। 
​সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাল। সাদা শাড়ি পরিহিত এক নারী, এক হাতে ফাইল আর অন্য হাতে কালো কোট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নাজওয়া খান। তাঁর চেহারায় ছিল দীর্ঘদিনের জমানো অভিমান আর জেদের কঠিন ছাপ। 
​মেয়ের কথা শুনে নূরজাহান বিবি অসহায়ভাবে চেয়ে রইলেন। তিনি ভালো করেই জানেন মেয়ে কেন এমন করছে। মেয়েটা যে তাঁর ভেতরের সেই জেদ পুষে রেখেছে বাবা-ভাইয়ের ওপর—সেই অভিমান কি এত সহজে মুছে ফেলতে পারবেন তাঁরা? 
​ফাহশাম উদ্দিন খানও অবাক হলেন মেয়ের কথা শুনে। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে কারো আপত্তি থাকতে পারে? অবাক হয়ে তিনি বললেন, 
—"কী বলছিস মা? আপত্তি কেন থাকবে?" 
​নাজোয়া খান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বাবার চোখে চোখ রাখলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল কঠোর ও দৃঢ়, 
—"অবশ্যই আপত্তি থাকবে! কেন, কারণটা নিশ্চয় আপনারা ভালো জানেন। দশ বছর পর এভাবে হুট করে চাইলেই কি পারবেন সব ঠিক করতে? পারবেন আমার জীবনের সেই রঙিন সময় ফিরিয়ে আনতে? পারবেন না। আপনারা—বাবা-ছেলে—কেউ কি একবারও আমার কথা ভেবেছিলেন? যে আপনাদের কারণে কতটা প্রভাব আমার জীবনে পড়েছে? শুধু আমি পারিনি স্বার্থপর হতে, আপনাদের মতো।" 
​তাঁর কথাগুলো যেন একেকটি তীরের মতো টেবিলের পরিবেশকে বিদ্ধ করছিল।
​—"যা-ই হোক, আমি বিয়ে করব না—এটাই আমার ফাইনাল কথা। সে হোক না আমার ভালোবাসার মানুষ বা অন্য কেউ। এতে যদি আপনাদের মনে হয় আমাকে এভাবে থাকতে দেওয়া উচিত না, তাহলে বলবেন দয়া করে। এবার না হয় আমি যাব বাড়ি ছেড়ে।" 
​এই কথা বলেই নাজোয়া উত্তরের অপেক্ষা না করে, হিল জুতোর 'কট কট' আওয়াজ তুলে দ্রুত বাইরে চলে গেলেন। 
​ডাইনিং টেবিলের পরিবেশ থমথমে, যেন কেউ নিঃশ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছে। নূরজাহান বিবি আঁচলে চোখ মুছছেন। খান বংশের ছেলেমেয়েরা কেন এত একরোখা, জেদি হলো! এটা যে তাদের ধ্বংসের কারণ, তা কি তারা জানে? 
​ফাহশাম উদ্দিন খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন এমনটাই হওয়ার ছিল; তাঁর মেয়েকে তিনি ভালো করেই চেনেন—এত সহজে মানবার পাত্রী সে নয়। 
​ফাইয়াজ খান আর নেওয়াজ খান নীরবে একে অপরের দিকে চেয়ে রইলেন। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা মনে মনে নিজেদেরই অপরাধী ভাবছেন, যার অনুশোচনায় ভুগছেন। তাঁদের কারণেই আজ এমনটা, তাঁদের জন্যই বোনের সুসময় দিনগুলোতে বিষাদ নেমে এসেছে। 
ফারিশ খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, 
—"আজ আমি এখানকার অফিসে যাব। তবে কাল-ই আমাকে আবার ঢাকায় ফিরতে হবে।" 
​ফাইয়াজ খান ছেলের ব্যস্ততা জানেন, তাই আপত্তি করার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সম্মতি দিলেন, ছোট করে বললেন, 
—"ঠিক আছে। তবে ছুটির দিনগুলো এখানে চলে আসবি।" 
​ফারিশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
​পাশে বসা মেহরিন কী যেন বলতে গিয়ে হাঁসফাঁস করছিল। তা দেখে ফারহান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 
—"কিছু বলবি?" 
​ফারহানের এমন প্রশ্নে শুকনো ঢোক গিলল মেহরিন। সাহস জুগিয়ে সে বলল, 
—"আসলে... আমার টেস্ট পরীক্ষা। আমি ঢাকায় ফিরতে চাই।" 
​নেওয়াজ খান মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন,
—"কবে যেতে চাও?" 
​মেহনু‌র সাথে সাথেই বলে উঠল, 
—"কাল-ই না হয় যাব। আমারও তো পরীক্ষা আছে।" 
​মনীরা বেগম তখন চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, 
—"কিন্তু একা কীভাবে থাকবে তোমরা? আমিও যাব তোদের সাথে।" 
​মেহনু‌র আর মেহরিন একে অপরের দিকে তাকাল। চোখের ইশারায় যেন তারা নিজেদের মধ্যে কথা সেরে নিল। মেহনু‌র বলল, 
— "না মা, তোমার যেতে হবে না। আমরা থাকতে পারব। অল্প ক'দিনের ব্যাপার তো, আবার চলে আসব।" 
​সবার বুঝিয়ে বলায় মনীরা বেগম রাজি হলেন। মেয়েরা যেহেতু ভরসা দিচ্ছে, তাই তিনি আর কথা বাড়ালেন না। তাছাড়া, এত বছর পর বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি, জা'দের রেখে যেতে তাঁরও মন চাইছিল না। 
​এদিকে ফারিন, মাহির ও ফারহানও যেহেতু ঢাকায় ফিরবে, তাই সবাই মিলে ঠিক করল—মারোয়া, মিরান, নিহান আর নীলুও যেন ওদের সঙ্গে যায়।
​এ কথা শুনে সবাই খুশি হয়ে গেল এবং একসাথে যাত্রার জন্য রাজি হলো।
-------- 
দুপুর দুটো। ফারিশ সবে নিজেদের কোম্পানি থেকে বেরিয়েছে। ঠিক তখনই একটি পুলিশের জিপ এসে থামল তার সামনে। 
​পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কনস্টেবলরা নিচে নেমে এলো। একজন দরজা খুলে দিতেই নেমে এলেন ডিএসপি—চোখে সানগ্লাস, পরনে ইউনিফর্ম, বয়স আনুমানিক ৩৯ কি ৪০। নেমেই তিনি ফারিশের দিকে চেয়ে বাঁকা হেসে গম্ভীর স্বরে বললেন,
— "You are under arrest, Mr. Khan." 
​ফারিশের গার্ডরা সামনে এগিয়ে আসতে নিলে ফারিশ ইশারায় তাদের থামিয়ে দিল।
​ফারিশ নিজের চোখের সানগ্লাসটি পরে নিলো। প্যান্টের পকেটে হাত রেখে টানটান হয়ে দাঁড়াল। বাঁকা হেসে বলল,
— "ওয়ার‍্যান্ট এনেছেন?" 
​ডিএসপি-র কপালে ভাঁজ পড়ল। কাউকে অ্যারেস্ট করতে এলে সাধারণত নিজের অপরাধ আগে জিজ্ঞেস করবে, তা না করে সে আগে ওয়ার‍্যান্ট চাইছে —'interesting' 
​হালকা কেশে একজন কনস্টেবলকে ইশারা করতেই সে হাতে একটি কাগজ এনে দিল। ডিএসপি বাঁকা চোখে সেটি ছোট করে দেখে ফারিশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 
—"নিজের চোখেই দেখে নিন, মিস্টার খান।" 
​ফারিশ কাগজটায় একবার চোখ বোলালো, তারপর সেই হালকা হাসিটি বজায় রেখেই বলল, "তাহলে চলুন, যাওয়া যাক।" 
​ডিএসপি হাসলেন। তিনি গিয়ে গাড়িতে বসলেন। একজন কনস্টেবল গাড়ির দরজা খুলে দিতেই ফারিশ গিয়ে ডিএসপি-র পাশে উঠে বসলো।
-------
​
​ফারিশ অ্যারেস্ট হয়েছে—খবরটা শোনা মাত্রই নাজওয়া খান ছুটে এসেছেন থানায়। জুতোর 'কট কট' আওয়াজ করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। এক কনস্টেবলকে ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 
— "মেহরাজ ফারিশ কোথায়?"
​কনস্টেবল ভয়ে কেঁপে উঠলো তাঁর চিৎকার শুনে। ঢোঁক গিলে কাঁপাকাঁপা হাতে ডিএসপি-র কেবিন দেখিয়ে দিল। 
​নাজওয়া খান দেরি না করে, অনুমতির অপেক্ষা না করেই সজোরে আওয়াজ করে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঝাঁঝালো কণ্ঠে ডিএসপি-র উদ্দেশ্যে বললেন, 
— "How dare you arrest him?" 
​বলেই ডিএসপি-র ডেস্কে একটি ফাইল ছুঁড়ে দিলেন, যাতে ফারিশের জামিনের কাগজপত্র ছিল। 
​ফারিশের কোনো হেলদোল নেই। সে আরামে পা-এর ওপর পা তুলে বসে ফোন-এ গেম খেলছে। তা দেখে নাজোয়া ভ্রু কুঁচকালেন। 
​ডিএসপি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই 'অগ্নিশিখা'-কে দেখে মুচকি হাসলেন। হাতে থাকা পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
—"রিল্যাক্স, মিস নাজওয়া খান। উত্তেজিত হবেন না। এটা আপনার আদালত নয়, তাই উচ্চস্বরে চেঁচাবেন না। এটা আমার অফিস, মাথায় রাখবেন।" 
​নাজওয়া খানের বেশ রাগ হলো। ইচ্ছা করছে এই ডিএসপি-কে কয়েকটা কড়া কথা শোনাতে। তবে তিনি জানেন—আইনের শক্ত বেড়াজালে তাঁর হাত-পা বাঁধা। 
​ভ্রু কুঁচকে এবার জিজ্ঞেস করলেন, 
—"কোন অপরাধে আমার ক্লায়েন্ট মিস্টার ফারিশকে অ্যারেস্ট করেছেন, তা কি জানতে পারি?" 
​এমন কথা শুনে ডিএসপি হো হো করে হেসে উঠলেন। 
—"আপনার ক্লায়েন্ট? আমি তো জানতাম আপনার আর ওঁর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে!" 
​দাঁতে দাঁত চেপে মুখে হাসি টেনে বললেন,
— "বি প্রফেশনাল, মিস্টার চৌধুরী। আপনি বলছেন এটা আপনার অফিস, তাই আমি আমার ডিউটিই করছি। কথা না বাড়িয়ে বলুন, কী অপরাধ করেছে ফারিশ?" 
​ডিএসপি স্বাভাবিক হয়ে ডেস্কের ওপর হাত রেখে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,
— "আপনার ক্লায়েন্ট কোনো অপরাধ করেনি।"—এই বলে বাঁকা হাসলেন। 
​টেবিলে এক হাত দিয়ে আওয়াজ করে তেজি কণ্ঠে নাজোয়া বললেন,
— "তাহলে ওকে থানায় আনার সাহস করলেন কীভাবে?" 
​ডিএসপি ব্যঙ্গ করে ভাবলেশহিন ভাবে বললেন, —"অপরাধে ফাঁসাবো বলে!" 
​নাজোয়া খান তাচ্ছিল্য করে হেসে বললেন, 
—"ও আচ্ছা! তা কী অপরাধে ফাঁসাবেন শুনি?" 
​ডিএসপি হালকা হেসে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন,
— "এই ধরুন—শহরের নামকরা এসপি কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার্স-এ আগুন ধরানোর অপরাধে ওনাকে অ্যারেস্ট করা হলো।" তাঁর আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন টিভি স্ক্রিনের দিকে, যেখানে এমপি শাহজাহান পাটোয়ারি লাইভ বক্তব্য দিচ্ছেন। "ধরুন, এমপি-কে গুলি করানোর অপরাধে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।" ল্যাপটপে দু'টো ক্যাসিনোর ছবি বের করে ভাবুক ভঙ্গিতে বললেন, "এবার এই ক্যাসিনোতে ব্লাস্ট করানোর অপরাধে ধরুন অ্যারেস্ট করা হলো। আপনার কোনটা পছন্দ হয়েছে, বলুন? সেটাতেই আমি অ্যারেস্ট করব আপনার ক্লায়েন্টকে!" 
​ফারিশ বাঁকা হেসে সব শুনছে। চোখ তুলে একবার দেখল দু'জনকেই। 
​নাজওয়া খানও বাঁকা হেসে সব শুনলেন। 
—"তা অপরাধ করার আগে কোন আইনে লেখা আছে অপরাধীকে অ্যারেস্ট করার?"
​ডিএসপি হেসে বললেন, 
—"তা অবশ্য ঠিক, তবে হতে কতক্ষণ?" 
​ঠিক তখনই টিভিতে ব্রেকিং নিউজ চলতে শুরু করল। স্ক্রিনে হেডলাইনগুলো ভেসে উঠলো, 
​ব্রেকিং নিউজ: দেশের নামকরা কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার্স-এ শর্ট সার্কিট থেকে ভয়াবহ আগুন। 
​ব্রেকিং নিউজ: এমপি শাহজাহান পাটোয়ারি-কে কেউ গুলি করেছে, অবস্থা আশঙ্কাজনক। 
​ব্রেকিং নিউজ: শহরের বড় বড় ক্যাসিনো-তে বোমা বিস্ফোরণ, একাধিক হতাহতের আশঙ্কা। 
​তা দেখে ফারিশের হাসি আরও প্রশস্ত হলো। নাজওয়া খানও হাসলেন। ডিএসপি চোখ তুলে এবার নাজোয়া খানের দিকে তাকালেন। 
— "দেখলেন তো, অপরাধ হতে সময় লাগেনি।" 
​বাকা হেসে বললেন,
—"এসব কি আপনার অপরাধ মনে হচ্ছে?" 
​নাজওয়া খানের কথা শুনে তিনি তাঁর সামনে ঝুঁকে জোরালো গলায় বললেন, 
—"অবশ্যই অপরাধ! জানলেওয়া হামলা, কোটি টাকার ফ্যাক্টরিতে আগুন, ব্লাস্ট করানো—এসব অবশ্যই অপরাধ!" তারপর সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, —"তবে সেটা আমার জন্য নয়, মিস।" 
​এই বলে হাসলেন। সকলের মুখে রহস্যময় হাসি। 
​নাজওয়া খান উঠে দাঁড়ালেন। ডিএসপি-র দিকে চেয়ে বললেন,—"আসছি।" 
​নাজওয়া খান যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ডিএসপি বলে উঠলেন,
— "আসেন না, আপনার অপেক্ষাতেই তো আছি, উড-বি মিসেস চৌধুরী ।" 
​নাজওয়া খান চোখ পাকিয়ে তাকালেন। শক্ত কণ্ঠে বললেন, "শাট আপ।" বলেই বাইরে বের হলেন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। 
​ফারিশ উঠে দারাতেই ডিএসপি রাজিন চৌধুরী 
বললেন,—"এবার আমি ছিলাম পরের বার আমি নাও থাকতে পারি তাই বি কেয়ারফুল।" 
ফারিশ শুধু মুচকি হাসলো কিছু না বলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।তবে আবার থেমে ঘুরে তাকালো ডিএসপি-র দিকে। ফিসফিস করে বলল, 
—"আর কত আগুনে ঘি ঢালবেন, আঙ্কেল? এবার সুযোগ এসেছে, আগুনে পানি ঢালার ব্যবস্থা করুন। আসছি।" 
​বলে হ্যান্ডশেক করে হেসে বেরিয়ে গেল। 
​তাদের যাওয়া দেখে ডিএসপি মুচকি হাসলেন। বিড়বিড় করে বললেন, 
— "সে কি আর বলতে! আগুনে জ্বলে গেলেও ওই আগুনে-এই এবার ঝাঁপ দেব অতি শীঘ্রই।"
 চলমান......। 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন