পর্বঃ৮ (প্রথম_অংশ)
রাত তখন গভীর হয়ে এসেছে। সকলে ক্যাম্প-ফায়ার জ্বালিয়ে লনে আড্ডা দিচ্ছেন। সাথে ফাহ্শাম উদ্দিন খানের ইচ্ছায় বারবিকিউ করা হচ্ছে।
কাঠকয়লার উষ্ণ গন্ধে ভরে গেছে চারপাশ। বাঁশের কাঠিতে মাংসের মেরিনেট করা টুকরোগুলো উল্টে দেওয়া হচ্ছে আগুনের আঁচে। ফোঁটা ফোঁটা তেল আগুনে পড়ে 'সোঁদা' শব্দ তুলছে। মধ্যখানে আগুন জ্বলছে আর বাড়ির সকলে চেয়ারে গোল হয়ে বসে আছেন।
ফারিশ সকলের কথা শুনছে আর নিউজফিড স্ক্রল করছে। পাশে বসা ফারিন সবার গল্প শুনছে আর কিছুক্ষণ পর পর কুয়াশায় ভরে যাওয়া চোখের চশমাটা মুছছে, আবার পরছে। ফারিন বরাবরই নীরব স্বভাবের, কম কথা বলে। কারও সাথে মিশে না, দূরে দূরে থাকে—এক কথায় সে নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করে।
মেহনূর আর ফারহানও এতক্ষণ ছিল। তবে মাহির আর নিহান জোর করে তাদের নিয়ে গিয়েছে ব্যাডমিন্টন কোর্টে। তাদের বাগানের পাশেই ব্যাডমিন্টন কোর্ট বানানো হয়েছে —যা ফাহ্শাম উদ্দিন খান বানিয়েছেন নাতি-নাতনিদের জন্য। বর্তমানে কোর্টে খেলছে মেহরিন, মারওয়া, ফারহান, নিহান। মাহির আর মেহনূর পাশে রাখা চেয়ারে বসে দেখছে।
খেলার স্কোরবোর্ড অনুসারে, মেহরিন আর মারওয়ার জুটি শুরু থেকেই দাপট দেখাচ্ছিল। মেহরিন খেলাধুলায় বেশ এক্সপার্ট। একের পর এক ড্রপ শট আর স্ম্যাশ দিয়ে তারা ফারহান ও নিহানের জুটিকে হারানো অসম্ভব করে তুলেছে। মেহরিনদের জুটির জয় হলো ২১-১৪ পয়েন্টে।
মেহরিনরা জিতেই ফারহানের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে বিরবির করে বলল,"লুজার!"এই বলে বিশ্বজয়ের হাসি হাসলো। ফারহান শুনেছে সেও রেগে কটমট দৃষ্টিতে তাকালো।
এবার মেহনূররা নামবে। মাহির তাড়াহুড়ো দেখিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। মেহনূরের উদ্দেশ্যে বললো, "আয় নূঁর! আজ ওদের আমরা হারাবোই এখন!"
মেহনূরের ভালো লাগছিল না। সন্ধ্যা থেকেই সে নীরব। বারবার ফারিশের এমন আচরণ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাইয়ের কথায় ধ্যান ভাঙলো মেহনূরের। সে স্তম্ভিত ভাব কাটিয়ে উঠলো, চেয়ার থেকে দাঁড়ালো। ভাবলো, বসে থেকে লাভ নেই। অনেক দিন খেলা হয় না। এই শীতের দিনে এসব খেলা আসলেই ভালো লাগে। তাই সেও মেহরিনদের চ্যালেঞ্জ দিয়ে ব্যাট হাতে নিয়ে কোর্টে গেল।
মেহরিনরা খেলে হাঁপিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নেওয়া চাই, তাই তারা সাফ জানিয়ে দিলো—একটু পর শুরু করবে। তবে মাহিরের বেশ রাগ হলো। কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, এখন তারা নামবে আর এরা ভাব দেখাচ্ছে! চার জন লাগবে।
ফারিনকে তো মারলেও কোর্টে নামাতে পারবে না, এটা তারা জানে। কোর্টে আছে শুধু নীলু, মাহির আর মেহনূর। এদিকে মিরান বেটা ফ্রি ফায়ার খেলায় ব্যস্ত—একে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিলেও এক চুল নড়বে না তার খেলা ছেড়ে। এদিকে মেহনূর তাড়া দিচ্ছে খেলা শুরু করার জন্য, তিন জনেই খেলে নেবে।
মাহির দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হঠাৎ কিছু মনে হতেই দুষ্টু হাসি হাসলো। গা ঘুরিয়ে একবার মেহনূরকে দেখলো। উঠে ঘুরে হাঁটা ধরলো যেখানটায় সবাই বসে, সেখানে।
ফারিশের সামনে ব্যাট ধরে কাঁদো কাঁদো মুখে বললো, —"ভাই, আমার ইজ্জত এবার তোমার হাতে। নাও এটা!"
ফারিশ ফোন থেকে চোখ তুলে তাকালো কী বলতে চাইছে বোঝার জন্য। সহসা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,—"কী হয়েছে?"
মাহির তাড়া দেখিয়ে একই ভঙ্গিতে বললো,
—"আগে ধরো তো, তারপর বলছি!"
ফারিশ এক হাতে ফোন আর অন্য হাতে ব্যাট নিলো।
মাহির এবার বললো,— "এবার যেহেতু আমার ইজ্জত হাতে নিয়েছো, এবার তাড়াতাড়ি চলো! নাহলে আজ নাক কাটা যাবে।" বলেই ফারিশের হাত ধরে দাঁড় করালো।
ফারিশ বুঝতে পারছে না কী বোঝাতে চাইছে, ব্যাটের সাথে ইজ্জতের কানেকশন কী! সাথে মাহিরের টানাটানি দেখে রাগে ধমক দিলো, —"হয়েছেটা কী? এই ব্যাটের সাথে ইজ্জতের কানেকশন কী, সেটা বল!"
মাহির কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো,
—"আমার সাথে খেলতে আসো! নাহলে ছোট ভাই-বোনদের কাছে নাক কাটা যাবে হারলে। সবার খেলা হয়ে গেছে, এখন বাকি আমরা। কাউকে পাচ্ছি না, তাই তোমাকেই চাই। আমি জানি তুমি বেস্ট প্লেয়ার, সেটা তো অস্বীকার করতে পারবে না।"
ফারিশ এতক্ষণে বুঝলো কাহিনি। তবে সে ইন্টারেস্টেড নয় এখন এসবে। তাই মাহিরকে না করতে যাবে, তখনই মাহিরের থেকে চোখ সরিয়ে কোর্টের দিকে নজর যেতেই দেখলো মেহনূর বিরক্ত হয়ে ব্যাট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে নীলুর সাথে কথা বলছে। ফারিশ নিজের হাতের ব্যাটের দিকে তাকালো। তারপর বাঁকা হেসে এবার কোর্টের দিকে এগিয়ে গেল। নীরবতা সম্মতির লক্ষণ—এই ভেবে মাহির খুশিতে গদগদ হয়ে গেল ফারিশের পিছু পিছু কোর্টে ছুটলো সে।
কোর্টে ফারিশকে ব্যাট হাতে আসতে দেখে মেহনূর সহ বাকিরা চোখ বড় বড় করে তাকালো। চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। মেহরিন বসে মাত্র পানি খাওয়ার জন্য মুখে নিয়েছিল, তবে ফারিশকে দেখে আর গিলতে পারলো না। ওভাবে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে যখন বুঝলো ফারিশ খেলবে, সাথে সাথে হিঁচকি উঠে মুখের পানি সব বেরিয়ে এলো। ফারহান পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, পানির ছিটে এসে পড়তেই কটমট দৃষ্টিতে তাকালো মেহরিনের দিকে।
সে এখনও বোঝেনি মেহরিনের মুখ থেকে পানি ছিটকেছে, ভাবলো ইচ্ছে করে পানি ছিটিয়ে দিয়েছে মেহরিন। ফারহানের তাকানো দেখে ভয়ে শুকনো ঢোঁক গিললো সে। এই সারমা যদি জানে মুখের পানি, তাহলে আজ মেহরিনের কাজ তামাম। তাই ঢোঁক গিলে কেবল হেসে বললো, —"সরি ভাই! হাত ধুতে গিয়ে পড়ে গেছে।"
ফারহান ভ্রু গুটিয়ে বললো, —"হাত ধুয়েছিস তোর? তাহলে তোর থেকে 'সীমা অতিক্রম' করে আমার কাছে আসবে কেন? স্টুপিড!"
মেহরিন অসহায় হয়ে তাকালো। কী বলবে এখন সে! তাই কথা ঘোরানোর জন্য সামনে ইশারা করে বললো,—"ফারিশ ভাই কোর্টে নামলেন কেন?"
ফারহানের মন চাইছে এই মেয়েকে চাবকে ঠিক করতে! তাই দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—"কেন আবার? নাঁচতে! তুই নাঁচবি? চাইলে গিয়ে 'বাদর-নাচ' নাঁচতে পারিস!" বলেই চোখ ঘোরালো।
মেহরিন মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। সে তো জানে খেলতেই নেমেছেন, শুধু কথা ঘোরানোর জন্যই উল্টা প্রশ্ন করেছে। তাই আবারও বললো, —"না, মানে উনি কি খেলা পারেন?"
ফারহান নিজের মাথা নিজে চাপড়াতে মন চাইছে এই মেয়ের কথা শুনে। একজন স্পোর্টসম্যান নাকি খেলা পারবে না! কী হাস্যকর কথা! তাই বললো,—"না, উনি পারেন না। শুধু তোরাই পারিস!"
বলেই চোখ-মুখ কুঁচকে সামনে তাকালো।
মেহরিন দাঁত কেলিয়ে হাসলো। হেসে বললো, —"অবশ্যই পারি। সেটা নিশ্চয়ই একটু আগে বুঝেছেন ভালো করে।" 'মাছি তাড়ানোর মতো' ভঙ্গি করে, "তাই তো এমন গ হারা হেরেছেন!" বলেও মুখ বাঁকালো।
ফারহান নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারছে না। একবার জিতেছে তাই বলে এই মেয়ে তাকে নাস্তানাবুদ করছে? নাহ! এই মেয়ের সাথে কথা বলাই বেকার! বলে সে মেহরিনের থেকে কিছুটা দূরে চলে গিয়ে বসলো।
তা দেখে মেহরিন খিটখিট করে হাসলো। ভালোই জব্দ করতে পেরেছে বিটকেলটাকে।
-----------
এদিকে ফারিশ মেহনূরের সামনে দাঁড়িয়ে। মেহনূরের চাহনি দেখে আড়ালে হালকা হাসলো সে। তার দিকে একটু ঝুঁকে কণ্ঠ নরম করে বললো, —"চলুন ম্যাডাম, চ্যালেঞ্জ হয়ে যাক?"
ফারিশের কথা শুনে মেহনূরের ধ্যান ভাঙলো। ফারিশ যে তার সামনে এসেছে, তা তার খেয়ালই হয়নি। মেহনূর ফারিশের চোখের দিকে একবার চেয়েই অন্য দিকে চোখ ঘোরালো। এই চোখে কিছু একটা আছে, যাতে সে তাকিয়ে থাকতে পারে না। অন্যদিকে ফিরে নিজের জায়গায় যেতে যেতে বললো, —"চলুন, তবে হয়ে যাক চ্যালেঞ্জ!" এই বলে হালকা হাসলো।
হাসলো ফারিশও। সে তার জায়গায় দাঁড়ালো। মাহির আর ফারিশের মুখোমুখি মেহনূর আর নীলু।
সকলেই বেশ মনোযোগ দিয়ে চেয়ে আছে। দুই দলে ভাগও হয়ে গেল—মিরান, ফারহান, নিহান ফারিশদের দলে; মারওয়া, মেহরিন, ফারিন মেহনূরদের। সবাই উত্তেজিত। এদিকে ফারহান পকেটে দু'হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে।
মাহির এক্সাইটেড হয়ে সিটি বাজাতেই খেলা শুরু করলো তারা। মেহনূর বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে খেলছে।
দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। প্রতিটি পয়েন্ট একই গতিতে এগোচ্ছে। কোর্টে চারজনই নিজেদের সেরাটা দিচ্ছে। লং শট, নেট শট, স্ম্যাশ—কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়ছে না। শেষ মুহূর্তে স্কোর একদম টাই! এবার যে দল ড্রপ করবে, সেই দল হারবে। এমন সময় মেহনূর আর ফারিশের চোখাচোখি হলো।
ফারিশের ঠোঁটে লেগে থাকা দুষ্টু হাসিটা দেখে মেহনূর ভ্রু কুঁচকালো। আর ফারিশ মেহনূরের তাকানো দেখেই দুষ্টু হাসি দিয়ে চোখ টিপ মারলো।
সাথে সাথে মেহনূর থমকে দাঁড়ালো, বরফের মতো জমে গেছে সে। প্রসারিত চোখ জোড়া আরও প্রসারিত হলো। সাথেই হাত থেকে ব্যাট নিচে পড়ে গেল, আর শাটলকক-ও ড্রপ হলো।
এক কথায় ফারিশরা উইন! ছেলেরা সব সিটি বাজিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো জিতার আনন্দে।
এদিকে মেহনূরের এই হাল দেখে ফারিশ নীরবে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। মেহনূরের তাতে হেলদোল নেই। সে আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে। বুকের ভেতরে হৃদস্পন্দন যেন বেসুরো হয়ে ঢাক বাজাচ্ছে। ফারিশের সেই চোখের ইশারা তাকে যেন এক শীতল স্রোতে ডুবিয়ে দিয়েছে, যেখানে সব চিন্তা থমকে গেছে।
--------
গভীর রাত পার হয়ে ভোর হয়েছে। ঘড়িতে তখন ঠিক সাতটা।
'নূর মহল'-এর চারপাশ তখনো শীতের নরম কুয়াশার চাদরে মোড়া। ভোরের আলো এখনো তীক্ষ্ণ হয়নি, বরং কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এসে লনের সবুজ ঘাসের ওপর মুক্তো দানার মতো জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলোতে নরম, সোনারঙের স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে। চারপাশে পিনপতন নীরবতা, শুধু রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে দুধ গরম করার মৃদু শব্দ আর গরম চা-কফির হালকা সুবাস।
সারারাত মেহনূর ঘুমাতে পারেনি। গতকাল সন্ধ্যা থেকে শুরু করে যা যা ঘটেছে—এসব ভাবতে ভাবতে দু'চোখ এক করতে পারেনি। অবশেষে ফজরের নামাজ পড়ে ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল, ঘুমিয়েছিল হয়তো অল্প কিছুক্ষণ।
কিন্তু বেশিক্ষণ বিশ্রাম জুটলো না। সকলে ডাকাডাকি শুরু করতেই আবার ঘুম থেকে উঠতে হলো। কারণ, আর কিছুক্ষণ পরই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
সে আর দেরি না করে আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো। মন থেকে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নিচে নামলো—যেখানে এই মুহূর্তের মধ্যে সকলে ডাইনিং টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে।
মেহনূর নিজের চেয়ার টেনে মেহরিনের পাশে বসলো। সে বসতেই ফাইয়াজ খান মেহনূরের উদ্দেশ্যে আদেশের সুরে বললেন,
—"মেহনূর, তুমি ড্রাইভ করে যাবে না। আসার সময় কিছু বলার অবস্থায় কেউ ছিল না, তাই বাধ্য হয়ে সবাই রাজি হয়েছে। কিন্তু এত দূরের পথ, তোমাকে ড্রাইভ করতে যেন না শুনি।"
মেহনূর মাথা নেড়ে শুধু সম্মতি দিলো, দিয়ে বললো, —"ঠিক আছে বড় আব্বু।" ফাইয়াজ খানের মুখের ওপর কিছু না বললেও সে নাছোড়বান্দা—সে ড্রাইভ করে যাবে মানে যাবেই। এখানে কথা বললো না, কারণ জানে—বড়দের ধমক খাবে।
মেহনূর যে ড্রাইভ করেই যাবে, সেটা ছোটরা ঠিকই জানে। তবে তাকে মিথ্যে কথা বলতে দেখে বাকিরা খেতে খেতে ঠোঁট টিপে হাসছে।
ফারিশ আর মেহনূর মুখোমুখি বসে। সে মেহনূর আর বাবার কথা ঠিকই শুনলো। এমনকি এ-ও জানে মেহনূর নিজে এখানে 'না' বললেও ড্রাইভ করেই যাবে। তাই আপন মনে নিজের খাওয়া শেষ করলো।
মাত্রই তাদের সার্ভেন্ট গরম কফি এনে রাখলো মেহনূরের পাশেই।
ফারিশ হাত বাড়িয়ে কফি কাপটি ধরতে যাবে, তখনই অসাবধানতাবশত মেহনূরের ডান হাতে গরম কফি পড়ে গেল।
মেহনূর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলো হাত ধরে।
ফারিশ ভোঁকা বনে গেল—এতটা পড়ে যাবে সেটা আশা করেনি। সে উঠে গিয়ে মেহনূরের হাত ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে অসহায় হয়ে বললো,
—"সরি, সরি নূর! আমি খেয়াল করিনি! আই অ্যাম রিয়্যালি—"
তখনই মেহনূর ঝাড়া মেরে সরিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো,—"একদম ধরবেন না হাত! নিজে ফেলে এখন দরদ দেখাতে এসেছেন? লাগবে না! ছাড়ুন!" এই বলে ছাড়িয়ে নিলো হাত।
ফারিশ অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলো।
মেহনূরের ফর্সা হাত লাল হয়ে গেছে। সে হাত চেপে ধরে ব্যথায় কুঁকিয়ে যাচ্ছে। ভাগ্যিস অতটাও গরম ছিল না, নাহলে ফোস্কা পড়ে যেত।
মেয়ের এই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে মনিরা বেগম, মাহমুদা বেগম, ইনশিরা বেগম ব্যস্ত হয়ে বরফ দেওয়া পানি এনে দিলেন হাতে। তাতে হাত ভিজিয়ে মেহনূর খানিকটা স্বস্তি পেলো। নেওয়াজ খান ফার্স্ট এইড বক্স এনে হাতে মলম লাগিয়ে দিলেন ধীরে ধীরে, তারপর হালকা ব্যান্ডেজ করে দিলেন।
এদিকে ফাইয়াজ খান চোখ পাকিয়ে তাকালেন ফারিশের দিকে। সে ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে। গম্ভীর স্বরে ধমক দিয়ে বললেন, —"তোমাকে কে বলেছিল নিজে নিতে? পারবে না যখন, কাউকে বললেই তো পারতে!"
ফারিশ 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বললো,
—"স্লিপ কেটে পড়ে গেছে, তাতে আমার কী দোষ? তোমার ভাতিজি ওখানে হাত না রাখলেই তো পারতো। আমি কি ইচ্ছে করে করেছি?"
এই বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। পিছন ঘুরে একবার মেহনূরকে দেখে বাঁকা হাসলো। সে যে ইচ্ছে করেই করেছে, সেটা তার চোখ-মুখে স্পষ্ট।
এদিকে মেহনূর ব্যথার সাথে রাগে পারছে না কাঁচা চিবিয়ে খেতে ফারিশকে! সকাল সকাল মুড তেরোটা থেকে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এই বদজাত লোকটা!
মেহরিন, ফারহান, নিহান, মিরান, মারওয়া, ফারিন, নীলু—অবাক হয়ে নীরব সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো। মানে, তাদের ডিসেন্ট নেতার হাত ফস্কে কারও হাতে কফি পড়ে যায়? যার সব কাজ ধীরে-সুস্থে পারফেক্টলি হয়, সে কি না এরকম করেছে! তবে ফারহান তার ভাইকে চেনে, তাই সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে আপন মনে নিজের খাবার খেতে ব্যস্ত।
------
ঠিক দশটা বাজতেই এর মধ্যে সকলে তৈরি হয়ে নিচে নামলো। শুধু বাচ্চারা যাবে আজ, তাই তাদের লাগেজ সার্ভেন্টরা নিয়ে গাড়িতে তুলে দিচ্ছে।
তৈরি হয়ে ফারিশ নিচে নামলো। পরনে তার ব্লেজারের স্যুট, চোখে সানগ্লাস। পুরো ড্যাশিং লাগছে তাকে। মা-চাচিরা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছেন তাদের ছেলেকে।
সে বেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো নিজের গাড়ির কাছে।
ধীরে ধীরে একে একে সকলে নামলো। সব শেষে নামলো ফারহান, মেহনূর, মেহরিন। মেহনূরের পরনে অফ-হোয়াইট রঙের আগানূর ড্রেস, সাথে একটি শালও জড়িয়ে নিয়েছে।
তারা নেমে গাড়ির কাছে দাঁড়ালো। সকলের থেকে বিদায় নিয়ে যাবে, তখনই গেইটের কাছে শোরগোল শোনা গেল। কোনো মহিলার গলার আওয়াজ।
সকলের কপালে বাজ পড়লো। এ অ-সময়ে কে এমন করছে!
নেওয়াজ খান, নওশাদ খান, ফারিশ, ফারহান, নিহান এগিয়ে গেল গেটের দিকে। ফারিশ গম্ভীর স্বরে গিয়ে বললো,
—"কী হচ্ছে এখানে? এত চেঁচামেচি কেন?"
তখনই একটি বৃদ্ধ মহিলা তাদের জোর করে ঠেলে ভিতরের দিকে ছুটে গেল। সকলে আশ্চর্য বনে গেল। তখনই গার্ডরা মহিলাটিকে আটকে ফেললো। এদিকে দারোয়ান মহিলাটির ওপর চেঁচিয়ে তারপর ফারিশকে বললো,
—"স্যার, এই মহিলা সেই সহ-সকাল থাইকা জোর করতাছে। ভিতরে যাইবো। এই মহিলার বাচ্চার বাপ নাকি ভিতরে আছে।"
সকলে অবাক হলো। এই মহিলাই বা কে, আর বাচ্চার বাবাই বা কে হতে পারে!
ফারিশরা গেট থেকে ভিতরে এসে গার্ডকে ইশারা করলো মহিলাটিকে ছাড়তে। তখনই মহিলা ছুটে গিয়ে ফাহ্শাম উদ্দিন খানকে জড়িয়ে ধরলো। কান্না ভেজা কণ্ঠে টেনে টেনে বললো,
—"ইউ আর মকদ্দুসের বাপ! আমি ইউ কে ভেরি, ভেরি মিস করেছিং!"
বিনা মেঘে যেন বজ্রপাত হলো। কী বলছে এই মহিলা তাদের দাদুকে! এদিকে ছেলে-বৌয়েরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে। ফাহ্শাম উদ্দিন খানেরও একই অবস্থা।
ওনার তো তিনটে-ই ছেলে, তাহলে মকদ্দুস আসলো কোত্থেকে!
নূরজাহান বিবি রাগে কটমট দৃষ্টিতে তাকালেন। উনি গিয়ে ঝাড়া মেরে হাত ছাড়ালেন। খেঁকিয়ে বললেন,
— "এই বদজাত মহিলা কী কইতাছস আমার ফাইয়াজের বাপ্রে? কে তোর মকদ্দুসের বাপ্? আরেকবার খালি ধইরা দেখ, তোর হাত কাইট্টা ফাইলামু, কইয়া দিলাম!" এই বলে চাবির গোছা আঁচলের পিঠের ওপর রাখলেন।
অচেনা মহিলাটি ঝগড়া করার সুরে বললো,
—"উ বেডি! ইস্টপ ইউর মুহুকজ!" তারপর ফাহ্শাম উদ্দিন খানকে ইশারা করে বললো, "উনি মাই মকদ্দুস এর বাপ! উ এত বিগ সাহস মাই হ্যান্ড ছাড়িং? মুই কিল ইউ ওল্ড মহিলা!"
নূরজাহান বিবি রাগে গজ গজ করতে করতে আশেপাশে খুঁজছেন কিছু। ওনার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে এভাবে বলছে! সাথে তাকেও আবার 'ওল্ড মহিলা' বলছে—কত বড় সাহস! তিনি গিয়ে পাশে পড়ে থাকা লাঠি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসলেন। চেঁচিয়ে বললেন, —"দাঁড়া বদজাত মহিলা! আইজকা তরে খাইছি!"
এদিকে মহিলাটিও মনে হয় ভয় পেল। সে ফাহ্শাম উদ্দিন খানকে মাঝখানে রেখে দুজন গোল হয়ে ছুটছেন।
বাকিরা নির্বাক—কী বলবেন তারা!
অবশেষে ফাহ্শাম উদ্দিন খান ছুটে গিয়ে চেপে ধরলেন ওনার নূর বানুর হাত। —"আরেহ ছাড়ো নূর বানু! কী করছো তুমি? অসুস্থ হয়ে পড়বে!"
নূরজাহান বিবি রাগে গজ গজ করতে করতে বললেন, —"তুমি ছাড়ো আমারে ফাইয়াজের বাপ! আইজকা এই বেডিটারে আমি শেষ কইরা ছাড়মু।"
ফাইয়াজ খান, নেওয়াজ খান, নওশাদ খানও গিয়ে মাকে ধরলেন।
ফাইয়াজ খান ব্যস্ত হয়ে বললেন,
—"আপনি শান্ত হোন আম্মা, আমরা দেখছি।"
নেওয়াজ খান বললেন, —"আম্মা, আপনি এভাবে ছুটলে আবারও অসুস্থ হয়ে যাবেন।"
এতক্ষণে শান্ত হলেন নূরজাহান বিবি। তাতেও তার রাগ কমছে না। যেন তিনি আবারো বললেন,
—"তোরা জিজ্ঞেস কর কে এই মহিলা আর কে ওর মকদ্দুশ ফকদ্দুশের বাপ!"
ছেলেরা মাকে আশ্বস্ত করে এবার এগিয়ে গেলেন ওই অচেনা মহিলাটির দিকে। ফাইয়াজ খান খেঁকিয়ে বললেন,
—"কী সমস্যা আপনার? কে আপনি? আর এসব কী বলছেন?"
অচেনা মহিলাটি ভয় মেশানো কণ্ঠে বললো, ফাহ্শাম খানের দিকে ইশারা করে,
—"ওই যে মাই মকদ্দুসের ড্যাডি! হি চালাকি করিং আমার লগে!"
মাহির আর নিহান অবাক হয়ে দেখছিল এতক্ষণ।
এবার ফিচেল হেসে ফেললো মাহির। সে হাসতে হাসতে দাদার উদ্দেশ্যে বললো,
—"হি হি! দাদু! এইটা কি আপনার 'ফোরথ জেনারেশন' নাকি? মকদ্দুসের নামটা কিন্তু হেব্বি!"
মিরানও হাসতে হাসতে বললো, —"তা আমার ম... মকদ্দুস মামু কোথায় নানাভাই?"
ছোটরা সহ সকলেই ঠোঁট টিপে হাসছে। ব্যতিক্রম ফারহান আর ফারিশ। ফারিশ গম্ভীর স্বরে ধমক দিয়ে সকলকে চুপ করালো।
ফাহ্শাম উদ্দিন খান তখনো হতভম্ব। এই পরিস্থিতিতে না পারছেন নিজের স্ত্রীকে শান্ত করতে, না পারছেন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। তাঁর চেহারা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, —"আমার জীবনের তিন ছেলে ছাড়া আর কোনো পুত্র নাই! তোমরা কী বলছো এসব? এই মহিলা কে আমি চিনি না!"
ফাইয়াজ খান এবার গম্ভীর হয়ে অচেনা মহিলাটির দিকে তাকালেন।
—"শুনুন, আপনার কোনো ভুল হচ্ছে। উনি আমার বাবা, এবং ওনার মাত্র তিনজন ছেলে। মকদ্দুস নামে কেউ নেই।"
মহিলাটি তখন মাটিতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।
—"আই এম এ গরিব মহিলা! মাই মকদ্দুস ড্যাডি ফেইক করিং! হি ডাস্টবিনে ফেইল মাই মকদ্দুস! হি শুড ম্যারি মি! আই উইল কল মাই ব্রাদার! মাই ব্রাদার ইজ এ বিগ মাস্তান!"
এই দেখে ফারিশ আর থাকতে পারলো না। চোখ থেকে সানগ্লাস সরিয়ে ঠান্ডা অথচ ধমকের সুরে গার্ডকে উদ্দেশ্য করে ইংরেজিতে বললো,—"গেট দিস লেইডি আউট ইমিডিয়েটলি।ইফ শি ক্রিয়েটস এনি ফারদার সিন, কল দা পুলিস"
নূরজাহান বিবি কিছু বলতে যাবেন, তখনই পনেরো-ষোলো বছর বয়সী একটা মেয়ে ছুটতে ছুটতে আসলো ভিতরে। এসেই হাঁপিয়ে তারপর মহিলাটির হাত ধরে বললো,
—"চলো দাদু, সেই কখন থেকে খুঁজছি তোমাকে! কোথায় চলে গিয়েছিলে হুট করে?"
মহিলাটি হাত ছাড়িয়ে বললো,—"এই এই! ছাড়! আমি কোথাও নট যাইং। মাই মকদ্দুসের বাপকে রেখিং!"
নূরজাহান বিবি চেঁচিয়ে বললেন, —"নিয়ে যা এই আধা-পাগল বদজাত মহিলাকে! নিয়া বাইন্ধা রাখ!"
মেয়েটি অনুতপ্ত হয়ে বললো,
—"আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইছি দাদুর হয়ে। আসলে ওনার মাথায় কিছু সমস্যা আছে তো, তাই আমরা কাজ খুঁজতে যখন বের হই, তখন সকালে," ফাহ্শাম উদ্দিন খানকে ইশারা করে বললো, "ওনাকে দেখে দাদুর পাগলামি আরও বেড়ে যায়। আমার দাদার কথা ওনার মনে পড়ে যায়। আসলে আমার দাদা ওনাকে ফেলে বিদেশ চলে গেছেন, সেই থেকে মাথায় সমস্যা। সাথে এখানে আমাদের কেউ নেই, আর না আছে আমাদের পরিবার। তাই কাজ খুঁজতে বেরিয়েছি। আবারও ক্ষমা চাইছি আপনাদের থেকে।"
এই বলে মহিলাটির হাত ধরে বের হতে যাবে, তখনই নাজওয়া খান পিছন থেকে ডাকলেন,
—"দাঁড়াও মেয়ে!"
মেয়েটি দাঁড়ালো। নাজওয়া খান বললেন,
—"তুমি আর তোমার দাদু আমাদের এখানেই থেকে যাও। আমাদের কাজের জন্য মানুষ দরকার।"
মেহরিনের মেয়েটির মায়াবী মুখটা দেখে বড্ড মায়া হলো। সে বললো,
—"হে! এখানেই থেকে যাও। তাছাড়া এখানে..."
নূরজাহান বিবি চোখ পাকিয়ে তাকালেন মেয়ের দিকে। কী বলছে তারা!
—"এই, এই! কী কইতেছস তোরা? এই পাগল বেডি রে এইহানে কিছুতেই আমি রাখতে পারমু না!"
নাজওয়া খান মাকে বললেন,
—"দেখুন, আপনি হাইপার হবেন না আম্মা। উনি মাত্রই মানসিক ভারসাম্যহীন, আর মেয়েটি কে দেখছেন, কতটা মায়াবী! তাছাড়া এভাবে যদি বাইরে বাইরে ঘুরে ঘুরে কাজের সন্ধান করে, কোথায় কখন কু-নজরে পড়বে—হিসেব নেই। সেদিক থেকে ভালো এখানে থাকুক। তাছাড়া ভাই-ভাবীরা আসছেন, ওনাদের কাজের সাহায্যের জন্য মানুষ লাগবে এমনিতেই। তাই ওরা এখানে থাকবে স্টাফ কোয়ার্টারে।"
বোনের কথায় যুক্তি দেখে ফাইয়াজ খান, নেওয়াজ খান ও নওশাদ খানও রাজি হলেন, সাথে তাদের বৌয়েরাও। নূরজাহান বিবি কিছু না বলে রাগে ভিতরে চলে গেলেন। এতক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহ্শাম উদ্দিন খান নাতি-নাতনিদের বিদায় জানিয়ে তিনিও ছুটলেন নূর বানুর পিছনে। উনি বেশ বুঝতে পারছেন, নূরজাহান বিবি রেগে আছেন।
তারপর সকলের সম্মতিতে মেয়েটি আর তার দাদু নূর মহলে থেকে গেল। অতঃপর সকলকে বিদায় নিয়ে মেহনূররা গাড়ির কাছে গেল। ফারিশ তার ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো। পেছনে বসলো ফারিন আর মিরান।
বিপত্তি ঘটলো মেহনূরের—কোথায় বসবে সে!
সকলের করা নিষেধ, সে গাড়ি চালিয়ে যাবে না। এর মধ্যে তার হাতে ব্যান্ডেজ, ব্যথায় সে স্টিয়ারিংও ঘোরাতে পারবে না। তাই অন্য গাড়ির পেছনে বসতে যাবে—দরজা খুলতেই তখনই হুরমুড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো মারওয়া, নিহান, মেহরিন। সামনে আগে থেকেই মাহির আর ফারহান বসে আছে। মেহনূর রাগে কিছু বলতে নিয়েও বললো না। এদের একটাকে ও এখন বোমা দিয়ে উড়ালেও নড়াতে পারবে, সেটা সে ভালো করেই জানে। মাহির দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো,
—"ফারিশ ভাইয়ের গাড়িতে জায়গা আছে, ওখানে চলে যা বোন!" এই বলে গাড়ি টান দিলো। মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল নীলু আর মেহনূরকে রেখে।
বাধ্য হয়ে এগিয়ে গেল ফারিশের গাড়ির কাছে। ফারিশ স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে সব কিছু এতক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছিল নীরবে। মেহনূরকে আসতে দেখেই তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটলো। মেহনূর কথা না বলে পিছনের দরজা খুলতেই দ্রুত নীলু উঠে বসলো। বসে দাঁত কেলিয়ে হাসলো—কারণ তার বাবা এত সাহস নেই যমদূতের সাথে সামনে বসার।
রাগে মেহনূরের ইচ্ছে হচ্ছে নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে। সাথে সাথে 'ঠাশ' করে দরজা লাগালো।
এখন তাকে সামনে বসতে হবে এই চেঙ্গিস খান এর সাথে! সে দরজা খুলছে না, তাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারিশ নিজে থেকে দরজা খুলে দিলো। তবে মুখের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক, দৃষ্টি তার সামনে। মেহনূর বিরবির করে ফারিশকে বকে গিয়ে বসলো সামনের সিটে। তবে এতক্ষণেও গাড়ি ছাড়ছে না দেখে তেজি কণ্ঠে ফারিশকে বললো,
—"গাড়ি ছাড়ছেন না কেন? গাড়ির ছাড়ার অনুমোদন এনে কি দিতে হবে!"
ফারিশ রেগে ধমক দিয়ে বললো,
—"শাট আপ! নো মোর ওয়ার্ডস! এটা আমার গাড়ি, তাই চুপচাপ থাকবি! আন্ডারস্টুড?"
—"নিজের গাড়িতে বসিয়ে খোঁটা দিচ্ছেন? তাহলে আমার হাতে কফি ফেললেন কেন?" মেহনূরও তেজ নিয়ে বললো।
ফারিশ ভ্রু কুঁচকে বললো,—"তুই হাত রাখলি কেন?"
মেহনূর ভাবলো, কী বলবে এই লোকের সাথে! কথা বলাই বেকার।
ফারিশ মেহনূরের থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো,
—"বিয়ে না করে জেলে যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই, তাই সিট বেল্টটা বেঁধে ফেলুন ম্যাডাম দয়া করে। নাহলে আপনার গুণধর বাপ আমাকে মেয়ের অ্যাক্সিডেন্টের অপরাধে জেলে ঢুকাবেন।"
মেহনূর হতভম্ব! কী নির্লজ্জ এই লোক! কী সুন্দর নিজের বিয়ের কথা বলছে এভাবে! অথচ দেখে মনে হবে ভাজা মাছ উল্টেও খেতে জানে না। মেহনূর সিট বেল্ট লাগাতে লাগাতে বিরবির করে বললো,—"অসভ্য লোক!"
ফারিশ সাথে সাথে মেহনূরের দিকে ঝুঁকে সিট বেল্ট কেড়ে নিয়ে সেটা লাগাতে লাগাতে ফিসফিস করে হাস্কি স্বরে বললো, —"অসভ্যতা কি আর কয় প্রকার, সেটা আর দেখাতে আর দিলে কই!"
এই বলে সরে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। এদিকে মেহনূর নির্বাক, হতভম্ব। সে কী বলবে, ভাষা হারিয়ে ফেললো। ফারিশ মেহনূরের মুখ দেখে আড়ালে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
------
দুপুর তখন দুটো বাজে। নাজওয়া খান মাত্রই কোর্ট থেকে বেরিয়েছেন। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসবে। চোখে সানগ্লাস, হাতে ফাইল। একবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন, আবার আশেপাশে দেখছেন।
চলমান.......