লেখক -তাসনিয়া ফাইজা
ভোরের নরম আলো দেওয়ান মঞ্জিলের বিশাল কাঁচের জানালা গলে ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই রাজপ্রাসাদতুল্য দুপ্লেক্স বাড়ির বাতাসে উৎসবের কোনো আমেজ নেই, বরং ছেয়ে আছে এক দমবন্ধ করা নীরবতা।
দোতলার এক কোণের গেস্ট রুমে একফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি তামান্না। সারাটা রাত সে খাটের কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে কাটিয়েছে। গতকাল রাতের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, চাচির বিষাক্ত কথা, প্রতিবেশীদের কটূক্তি আর সর্বশেষে এক চরম অমানবিক বাধ্যবাধকতায় সম্পন্ন হওয়া আকদ—সবকিছু যেন তার ১৯ বছরের সরল জীবনটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার পরনে এখনো গতকালের সেই ভারী শাড়ি, চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে ফুলে লাল হয়ে আছে।
দরজায় পরপর দুটো শব্দ হতেই তামান্না চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল।
দরজা খুলে ভেতরে এলেন রেশমা দেওয়ান। তার হাতে একটা ট্রে, তাতে এক গ্লাস দুধ আর কিছু নাশতা। রেশমা দেওয়ানের মুখটা গম্ভীর, চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অসন্তোষ আর দূরত্ব। কাল রাতের ঘটনার পর তিনি নিজের মনকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছেন না। নিজেদের বংশমর্যাদা, সমাজের কাছে মুখ দেখানো আর এক সাধারণ, অনাথ মেয়ের এভাবে হুট করে দেওয়ান মঞ্জিলের বড় বউ হয়ে আসাটা তিনি সহজভাবে নিতে পারছেন না।
তিনি ট্রে-টা টেবিলে রেখে তামান্নার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বললেন, "উঠে পড়ো। সারারাত তো কান্নাকাটিই করলে। এখন অন্তত শাড়িটা বদলে ফ্রেশ হয়ে নাও। দেওয়ান মঞ্জিলের বউ হয়ে এভাবে উস্কোখুস্কো চুলে ঘুরে বেড়ানোটা দেখতে ভালো লাগে না।"
তামান্না নিচু গলায় বলল, "আমি কিছু খাব না, খালাম্মা..."
রেশমা দেওয়ান তৎক্ষণাৎ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। তার গলায় একটা ঠান্ডা কঠিন ভাব ফুটে উঠল, "প্রথমত, আমাকে খালাম্মা বলবে না। এখন যখন পরিস্থিতির চাপে পড়ে এই বাড়ির বউ হয়েছ, তখন 'আম্মা' বলতে পারো, আর না হয় কিছু ডাকার দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, না খেয়ে নাটক করার কোনো প্রয়োজন নেই। গতকাল যা নাটক হওয়ার তা সমাজ দেখেছে। আমরা দেওয়ান পরিবার, আমাদের নিজেদের একটা নিয়ম-কানুন আর মর্যাদা আছে। পছন্দ করি বা না করি, তুমি এখন এই বাড়ির অংশ। তাই বাড়ির নিয়ম মেনে সকালে টেবিলে এসে নাশতা করবে।"
রেশমা দেওয়ান আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। তামান্না চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে বুঝতে পারল, এই বাড়িতে তাকে মেনে নেওয়া হলেও তা ভালোবাসায় নয়, স্রেফ বাধ্যবাধকতায়। এখানে তার পদার্পণ কারো কাছেই স্বস্তিকর নয়।
একটু পর তামান্না বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এলো। রেশমা দেওয়ান যাওয়ার সময় কাপড়ের আলমারি থেকে একটা সাধারণ সুতি সালোয়ার-কামিজ বের করে রেখে গিয়েছিলেন। তামান্না কালকের ভারী শাড়িটা ছেড়ে সেই সাধারণ পোশাকটি পরে নিল। তার দীর্ঘ, ঘন কালো চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে নিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল, 'না তামান্না, ভেঙে পড়লে চলবে না। তুই এতিম হতে পারিস, কিন্তু তুই দুর্বল নয়। তোর পথ তোকে নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে।'
সকাল সাড়ে আটটা। দেওয়ান মঞ্জিলের বিশাল ডাইনিং টেবিলে প্রাতঃরাশের আয়োজন।
আসাদ দেওয়ান চশমা পরে পত্রিকা পড়ছিলেন, তবে তার মনোযোগ পত্রিকায় নেই। গতকাল রাতের ঘটনায় তিনিও বেশ চিন্তিত। রেশমা দেওয়ান টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলেন।
ঠিক সেই সময় উপর থেকে ধীর পায়ে নেমে এলো তামান্না। ডাইনিং রুমে পা দিতেই এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা ছেয়ে গেল। আসাদ দেওয়ান পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে তামান্নার দিকে তাকালেন।
"এসো মা, বসো," আসাদ দেওয়ান কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব মৃদু রাখার চেষ্টা করে বললেন।
তামান্না ইতস্তত করে ডাইনিং টেবিলের এক কোণে গিয়ে বসল। রেশমা দেওয়ান তামান্নার সামনে প্লেট এগিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, "তুমি তো পড়ালেখা করেছ শুনলাম। এইচএসসি শেষ হলো মাত্র। কিন্তু রান্নাবান্না বা ঘরের কাজ কি কিছু জানা আছে? নাকি সারা দিন শুধু পড়ালেখা নিয়ে ভাবলেই চলে?"
তামান্না প্লেটের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "আমি সব কাজই করতে পারি। রান্নাবান্না, ঘরের কাজ—চাচির বাড়িতে সবই আমাকে করতে হতো।"
রেশমা দেওয়ান প্লেটে রুটি দিতে দিতে মনে মনে একটা বিরক্তির ভাব প্রকাশ করলেন। চাচির বাড়িতে কাজ করা আর দেওয়ান মঞ্জিল সামলানো এক কথা নয়। তিনি মুখে কিছু না বলে ডালের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "ভালো। এই বাড়ির কাজ কিন্তু অন্যরকম। কাজের লোক থাকলেও রান্নাবান্না আর নিজের দায়িত্ব নিজেকেই বুঝতে হয়। আর যাই হোক, আমার ছেলে কিন্তু খাবারের ব্যাপারে খুব খামখেয়ালী এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করে। তার সামনে যেন কোনো ভুল না হয়।"
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে ভারী জুতার শব্দ ভেসে এলো।
ওয়াসিফ নামছে। পরনে নেভি ব্লু রঙের ফর্মাল শার্ট, কালো ট্রাউজার। চুলগুলো নিখুঁতভাবে আছড়ানো। তার গম্ভীর, ধারালো মুখে কাল রাতের ক্ষোভের অবশিষ্টাংশ এখনো স্পষ্ট। হাতে হাতঘড়ি পরতে পরতে সে ডাইনিংয়ের দিকে এলো।
ওয়াসিফ টেবিলে চোখ বোলাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তামান্নার ওপর। তামান্না এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু ওয়াসিফের সেই বরফের মতো ঠান্ডা, বিষাক্ত চাহনি দেখে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।
ওয়াসিফ নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসল। রেশমা দেওয়ান দ্রুত এগিয়ে এসে বললেন, "ওয়াসিফ, বাবা, কিছু খেয়ে নে। কাল রাতে তো কিছুই খাসনি।"
ওয়াসিফ কফির কাপের দিকে হাত বাড়িয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বলল, "আমার খিদে নেই, মা। স্রেফ এক কাপ ব্ল্যাক কফি দাও। ৮টায় আমার মেডিকেল কলেজে ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে।"
রেশমা দেওয়ান কফি ঢালতে ঢালতে তামান্নার দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বললেন, "দেখেছ তো? কফিটা পর্যন্ত সময়মতো টেবিলে দেওয়া হয়নি। যাই হোক, ওয়াসিফ, তুই কি আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবি? কাজী অফিসে গিয়ে কালকের আকদের কিছু কাগজপত্র ঠিক করার আছে..."
"নো!" ওয়াসিফ টেবিল কাপড়ে কফির কাপটা বেশ জোরেই নামিয়ে রাখল। ঠক করে একটা শব্দ হলো।
ওয়াসিফ বাবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শক্ত ও ধারালো গলায় বলল, "বাবা, তুমি আর মা কাল রাতে সমাজের চাপে পড়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছ, আমি তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি স্রেফ তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু দয়া করে আমার ওপর আর কোনো নতুন নাটক চাপিয়ে দেবে না। আমার লাইফে এখন শুধু আমার পেশা আর ক্যারিয়ার। অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের বোঝা বইতে আমি রাজি নই।"
কথাটা সোজা তামান্নার বুকে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। তামান্না নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করল। সে বাচাল হতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু এই অচেনা বাড়িতে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ঝগড়া করার মানসিকতা তার এখন নেই।
আসাদ দেওয়ান খাতা বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বললেন, "ওয়াসিফ! কীভাবে কথা বলছ তুমি? যা হয়েছে তা দুর্ঘটনা হতে পারে, কিন্তু তামান্না এখন তোমার স্ত্রী। তাকে এভাবে সবার সামনে অপমান করার কোনো অর্থ হয় না।"
"স্ত্রী?" ওয়াসিফ একটা তিক্ত হাসল। তার বাদামী চোখে তীব্র অবজ্ঞা ফুটে উঠল। "একটা সামান্য এক্সিডেন্টকে কেন্দ্র করে যারা আমাকে আর আমার পরিবারকে ব্ল্যাকমেইল করল, সেই ঘটনার ফসলকে আমি স্ত্রী বলে মেনে নেব? ইম্পসিবল। আমি ওকে এই বাড়িতে থাকার জায়গা দিয়েছি, এটাই ওর ভাগ্য। এর বেশি কিছু আশা করা বোকামি।"
ওয়াসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ ৬ ফুট কায়া ডাইনিং রুমে এক বিশালাকার ছায়া ফেলল। সে এক নজর তামান্নার দিকে তাকাল—তামান্না তখনো মাথা নিচু করে বসে আছে, তার হাত দুটো শক্ত হয়ে কামড়ে ধরে আছে নিজের ওড়না।
ওয়াসিফ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, হুমকিঘেরা গলায় বলল, "আর একটা কথা তাসনিয়া। তুমি এই বাড়িতে কীভাবে থাকবে, না থাকবে তা আমার দেখার বিষয় নয়। কিন্তু আমার কাজের মধ্যে, আমার হাসপাতালে বা আমার প্রাতিষ্ঠানিক সীমানায় তোমাকে যেন কখনো দেখতে না পাই। তোমার স্বপ্ন যদি মেডিকেল কলেজে পড়া হয়, তবে মনে রেখো—আমার চোখের সামনে আসার ভুল যেন না হয়।"
ওয়াসিফ আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুম পার হয়ে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই বাইরে তার গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার বিকট শব্দ শোনা গেল।
ডাইনিং টেবিলে এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
রেশমা দেওয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তামান্নার দিকে তাকালেন। তার মনে তামান্নার জন্য কোনো দয়া জাগল না, বরং উল্টো বিরক্তি জন্মাল। তিনি ভাবলেন, এই মেয়েটার জন্যই আজ তার এত বড় ডাক্তার, সম্মানীয় ছেলের মেজাজ এমন বিগড়ে গেল!
রেশমা দেওয়ান প্লেটগুলো সরাতে সরাতে রুক্ষ স্বরে বললেন, "শুনলে তো? ওর রাগ কিন্তু খুব খারাপ। আর সত্যি বলতে, ও ভুল কিছু বলেনি। কালকের ঘটনার পর ও কোনোভাবেই তোমাকে সহজে মেনে নেবে না। তাই বলছি, নিজের সীমানায় থাকাই তোমার জন্য ভালো হবে। খাও শেষ হলে প্লেটগুলো রান্নাঘরে দিয়ে এসো।"
রেশমা দেওয়ানও সেখান থেকে চলে গেলেন।
পুরো ডাইনিং রুমে একা বসে রইল তামান্না। তার চোখের কোণ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে প্লেটে পড়ল। কিন্তু সেই অশ্রু মোছার লোক কেউ নেই। তামান্না নিজের হাত দিয়ে চোখটা মুছে ফেলল। তার ভেতরের অভিমানী, চঞ্চল মেয়েটা কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু একই সাথে তার ভেতরে এক জেদ চেপে বসল।
'আপনি আমাকে অপমান করলেন, ওয়াসিফ দেওয়ান? আপনি ভাবছেন আমি আপনার দয়ায় এই বাড়িতে আছি? আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব, আমি কোনো অবলার মতো দয়া চাইতে আসিনি। আমার স্বপ্ন মেডিকেল কলেজে পড়া, আর আমি সেখানেই পড়ব—আপনি বাধা দিলেও পড়ব!'
দুপুরের দিকে দেওয়ান মঞ্জিলে এসে হাজির হলো মাহির।
ড্রয়িংরুমে রেশমা দেওয়ান বসে ছিলেন। মাহির এসে সোফায় বসে বলল, "চাচি! বাড়ির পরিবেশ এত থমথমে কেন? ওয়াসিফ কি সকালে কোনো তুলকালাম করেছে নাকি?"
রেশমা দেওয়ান বিরক্ত হয়ে বললেন, "আর বলিস না মাহির! ছেলেটা সকাল সকাল কফি খেয়েই বেরিয়ে গেল। মেয়েটার সাথে একটা কথাও ঠিকমতো বলল না। সত্যি বলতে, আমারও এই মেয়েকে সহ্য হচ্ছে না রে। না আছে কোনো চালচলন, না আছে ওদের বংশের সাথে আমাদের মেলবন্ধন। কীভাবে যে ওই লিপি আহমেদ মেয়েটাকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল!"
মাহির একটু হেসে বলল, "চাচি, তুমি কিন্তু তামান্না ভাবির প্রতি অন্যায় করছ। মেয়েটার কোনো দোষ ছিল না কাল। ও তো লিপি আহমেদের ঘরে প্রায় ঝি-এর মতো থাকত, আমি যতটুকু শুনেছি। মেয়েটা পড়ালেখায় খুব ভালো, এবার নাকি গভর্মেন্ট স্কলারশিপও পেয়েছে।"
"পড়ালেখা দিয়ে আমি কী করব?" রেশমা দেওয়ান মুখ বাঁকালেন। "সংসার সামলানো আর দেওয়ান মঞ্জিলের মর্যাদা রাখাটাই বড় কথা। যাই হোক, তুই একটু ওয়াসিফের সাথে কথা বলিস তো। ছেলেটা রাগ সামলাতে না পেরে আবার কোনো বিপদে না পড়ে।"
মাহির রেশমা দেওয়ানকে আশ্বস্ত করে দোতলার দিকে উঠে গেল। সে দেখতে পেল, তামান্না পেছনের কিচেন গার্ডেনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
মাহির এগিয়ে গিয়ে বলল, "হাই ভাবি! আমি মাহির... কাল রাতে বোধহয় ভালো করে পরিচয় দেওয়া হয়নি।"
তামান্না ঘুরে তাকাল। মাহিরের চঞ্চল আর হাসিখুশি মুখটা দেখে তার বিষণ্ণ মনে সামান্য স্বস্তি এলো। সে মৃদু হেসে বলল, "হ্যাঁ, চিনেছি আপনাকে। আপনি কাল রাতে ওই কোণটায় দাঁড়িয়েছিলেন।"
মাহির হেসে উঠল, "আরে বাহ! নজর তো বেশ তীক্ষ্ণ! তা ভাবি, কেমন লাগছে দেওয়ান মঞ্জিল? আমাদের প্রফেসর সাহেব তো সকালে একপ্রস্থ ঝাড় দিয়ে গেছেন শুনলাম। মন খারাপ করে বসে আছেন নাকি?"
তামান্না বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে বলল, "মন খারাপ করে লাভ কী? যারা আমাকে এই বাড়িতে ঠাঁই দিয়েছেন, তারাই যখন আমাকে মেনে নিতে পারছেন না, তখন কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। তবে আমি কারোর বোঝা হয়ে থাকতে আসিনি, মাহির ভাই।"
মাহির তামান্নার কথার ভেতরে এক গভীর আত্মবিশ্বাস আর তেজ দেখতে পেল। সে মনে মনে ভাবল, 'ওয়াসিফ তোর জীবনে কালবৈশাখী ঝড় নিয়ে এলেও, এই মেয়ে কিন্তু সহজে ভেঙে পড়ার পাত্রী নয়।'
মাহির একটু দুষ্টুমির ছলে বলল, "ভাবি, একটা গোপন কথা বলি? ওয়াসিফকে দেখে যতটা কাঠখোট্টা আর পাষাণ মনে হয়, লোকটা কিন্তু আসলে ভেতর থেকে... না না, ভেতর থেকেও বরফের টুকরোই! তবে ওর ওপর যদি কেউ একবার অধিকার জমায়, ও কিন্তু ছারখার হয়ে গেলেও সেই অধিকার ছাড়বে না। কাল রাতের ঘটনার পর ও হয়তো রেগে আছে, কিন্তু ও আপনাকে পুরোপুরি অবহেলাও করতে পারবে না।"
তামান্না কৌতূহল নিয়ে মাহিরের দিকে তাকাল, "মানে?"
"মানে সময় হলেই বুঝবেন!" মাহির হেসে উত্তর দিল। "এখন বলুন, আপনার মেডিকেল এডমিশনের প্রিপারেশনের কী খবর? শুনলাম আপনি মেডিকেলে পরীক্ষা দেবেন?"
তামান্না চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "হ্যাঁ! আমার একটাই স্বপ্ন—পাবলিক মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়া। আমি ডাক্তার হতে চাই।"
মাহির কপালে হাত দিয়ে হেসে বলল, "ওরে বাবা! এক বাড়িতে দুই দুইটা ডাক্তার? ওয়াসিফ তো অলরেডি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলোজির প্রফেসর! ওখানকার সব স্টুডেন্ট ওর নামে কাঁপে! আপনি যদি ওই মেডিকেলে চান্স পান, তবে তো প্রফেসরের ক্লাসে বউকেই স্টুডেন্ট হিসেবে বসতে হবে!"
কথাটা শুনে তামান্নার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। সে জানত না ওয়াসিফ কোন মেডিকেল কলেজের প্রফেসর। সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ? সেখানেই তো তামান্নার প্রথম পছন্দ!
তামান্না মনে মনে শিউরে উঠল। ওয়াসিফ সকালে তাকে কী বলেছিল? 'আমার প্রাতিষ্ঠানিক সীমানায় তোমাকে যেন কখনো দেখতে না পাই...'
তামান্না দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল, 'যদি ভাগ্যে থাকে, তবে আমি আপনার ক্লাসেই আসব, প্রফেসর ওয়াসিফ দেওয়ান। দেখি আপনি কীভাবে আমাকে আটকান!'
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, তারপর রাত।
দেওয়ান মঞ্জিলের রান্নাঘরে রেশমা দেওয়ানের সাথে তামান্নাও সাহায্য করছিল। রেশমা দেওয়ান মুখ ফুটে তামান্নাকে কোনো ভালো কথা না বললেও, তামান্নার কাজের ক্ষিপ্রতা আর পরিচ্ছন্নতা দেখে ভেতরে ভেতরে কিছুটা অবাক হলেন। তামান্না খুব চুপচাপ সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিল।
রাত ১১টা বেজে গেলেও ওয়াসিফ ফিরল না।
আসাদ দেওয়ান রাতের খাবার খেয়ে রুমে চলে গেলেন। রেশমা দেওয়ানও তামান্নাকে বললেন, "তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো। ওয়াসিফের আসার কোনো ঠিক নেই। ও মাঝরাতেই ফেরে।"
তামান্না বাধ্য মেয়ের মতো নিজের গেস্ট রুমে চলে গেল। কিন্তু তার চোখে ঘুম ছিল না। সে টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নিজের পুরোনো এইচএসসি বইগুলো খুলে বসল। আগামী মাসেই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। তাকে যেকোনো মূল্যে চান্স পেতেই হবে। এই পড়ালেখাই তার একমাত্র মুক্তি, তার একমাত্র পরিচয়।
রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিট।
বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ পাওয়া গেল। একটু পরেই দোতলায় পরিচিত ভারী পদক্ষেপের শব্দ।
ওয়াসিফ ফিরেছে।
ওয়াসিফের শার্টের হাতা গোটানো, টাই হাতে ধরা। সারা দিনের ক্লাস, হাসপাতালের জটিল সার্জারি আর মিটিংয়ের পর তার শরীর ও মন চরম ক্লান্ত ও বিরক্ত।
সে নিজের মাস্টার বেডরুমের দিকে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে গেস্ট রুমের দরজার নিচে আলো দেখতে পেয়ে সে থমকে দাঁড়াল।
ওয়াসিফের বাদামী চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সংকীর্ণ হয়ে এলো। এত রাতেও মেয়েটা জেগে আছে? কিসের নাটক চলছে ভেতরে?
ওয়াসিফ না চাইতেও এক অদ্ভুত কৌতুহল আর বিরক্তি নিয়ে দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিল। দরজাটা কোনো শব্দ ছাড়াই খুলে গেল।
ভেতরে টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় বসে আছে তামান্না। মন দিয়ে সে ফিজিক্স আর বায়োলজি বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে। তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে দীর্ঘ ঘন কালো চুল। আলোর রেখা তার মুখের শ্যামলা ত্বকে এক অদ্ভুত মায়াবী দ্যুতি তৈরি করেছে।
ওয়াসিফ দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তার সিক্স ফুট শরীরটা দরজার ফ্রেমে এক বিশাল ছায়া তৈরি করল।
তামান্না দরজার শব্দে চমকে উঠে পেছনে তাকাল। ওয়াসিফকে এত রাতে নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বুকে ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল।
ওয়াসিফ ঘরের ভেতরে এক পা দিল। তার ঠান্ডা, গম্ভীর আর নেশাক্ত বাদামী চোখ দুটো তামান্নার ওপর স্থির হলো। ঘরের আবহাওয়া মুহূর্তের মধ্যে ভারী হয়ে উঠল।
"এত রাতে আলো জ্বেলে কী নাটক হচ্ছে?" ওয়াসিফের গলা অতিরিক্ত নিচু, কিন্তু তাতে ছিল চরম বিরক্তি আর গাম্ভীর্য।
তামান্না নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে শান্ত স্বরে বলল, "আমি পড়ালেখা করছি। নাটক করছি না।"
"পড়ালেখা?" ওয়াসিফ এক পা এগিয়ে এলো। তার দীর্ঘ শরীরটার চাপে তামান্না নিজেকে ছোট মনে করতে লাগল। ওয়াসিফ টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর দিকে এক নজর তাকিয়ে ঠান্ডা চোখে বলল, "মেডিক্যাল প্রিপারেশন? কাল রাতে একটা ড্রামা করে এই বাড়িতে ঢোকার পর এখন ডক্টর হওয়ার শখ জেগেছে?"
তামান্ন আঘাতটা সহ্য করতে পারল না। তার হরিণী চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, "আপনি নিজের সীমা অতিক্রম করছেন, প্রফেসর দেওয়ান! কালকের ঘটনার জন্য আমি ১ শতাংশও দায়ী ছিলাম না। আপনি যেমন বাধ্য হয়ে এই আকদ করেছেন, আমিও বাধ্য হয়েছি! আর আমার পড়ালেখা আমার নিজের যোগ্যতা, আপনার দয়া নয়! তাই আমার স্বপ্ন নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকার আপনার নেই!"
ওয়াসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তামান্নার এই সাহস, মুখের ওপর এভাবে সত্যি কথা ফুটিয়ে তোলার তেজ—ওয়াসিফের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা এক অদম্য, উগ্র ওভারপসেসিভ সত্ত্বাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিল।
ওয়াসিফ আর এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে তামান্নার কব্জি চেপে ধরল!
"আহ্!" তামান্না ব্যথায় কোঁকড়ে উঠল।
ওয়াসিফ তামান্নাকে নিজের খুব কাছে টেনে আনল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। তামান্না ওয়াসিফের গায়ের তীব্র পুরুষালি পারফিউম আর কফির গন্ধ পেল। ওয়াসিফের বাদামী চোখ দুটো তখন অন্ধকারের মতো ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে।
"আমার সামনে এত কথা বলবে না, তামান্না," ওয়াসিফের নিশ্বাস তামান্নার কপালে আছড়ে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর অতিরিক্ত নিচু ও ভয়ঙ্কর, "মনে রেখো, তুমি এই বাড়িতে আছ কারণ তুমি এখন আমার নামের সাথে যুক্ত। আমার অনুমতি ছাড়া তুমি নিঃশ্বাসও ফেলতে পারবে না। আর আমার সাথে তর্ক করার দুঃসাহস কখনো দেখাবে না।"
তামান্না ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু সে হার মানল না। সে চোখের জল আটকে রেখে ওয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন না। আপনি আমার শরীরকে বন্দি করতে পারেন, কিন্তু আমার সিদ্ধান্তকে নয়!"
ওয়াসিফ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এই মেয়েটার চোখে ভয় নেই, আছে এক অবিশ্বাস্য তেজ আর অহংকার।
ওয়াসিফ তামান্নার চিবুকটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখ এনে থমথমে গলায় বলল, "সিদ্ধান্ত? তোমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমি কাল রাতেই কেড়ে নিয়েছি । কাল থেকে যদি রাত ১২টার পর এই রুমে আলো জ্বলে, তবে বইগুলো আমি নিজের হাতে জ্বালিয়ে দেব। গেট দ্যাট ইন ইউর হেড!"
ওয়াসিফ তামান্নাকে এক ধাক্কায় ছেড়ে দিল। তামান্না সামলাতে না পেরে টেবিলে গিয়ে ধাক্কা খেল।
ওয়াসিফ আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে ধপ ধপ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এবং নিজের রুমের দরজা বিকট শব্দে বন্ধ করে দিল।
তামান্না টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কব্জিতে ওয়াসিফের আঙুলের লাল দাগ বসে গেছে। চিবুকেও প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠল তার ভেতরের জেদ।
তামান্না টেবিল ল্যাম্পটার দিকে তাকাল। সে আলো নেভাল না। বরং ল্যাম্পের আলোটা বইয়ের আরও কাছে এনে আবার পড়া শুরু করল।
'আপনি আমার বই জ্বালাবেন, প্রফেসর? দেখা যাক আপনার বরফশীতল অহংকার জেতে, নাকি আমার আত্মসম্মান!'
একই সময়ে, নিজের ঘরে গিয়ে শার্টের বোতাম খুলছিল ওয়াসিফ। তার হাত কাঁপছিল এক অচেনা উত্তেজনায়। তার আঙুলে এখনো লেগে আছে তামান্নার নরম ত্বকের স্পর্শ, আর চোখের সামনে ভাসছে তামান্নার সেই তেজোদ্দীপ্ত বাদামী চোখ।
ওয়াসিফ গ্লাসে পানি ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে নিল। তার মাথার ভেতর একটা নামই অনবরত হাতুড়ি পিটছিল—তাসনিয়া নওরোজ তামান্না।
সে বুঝতে পারছে না, একটা ১৯ বছরের সাধারণ মেয়ে কীভাবে তার মতো কঠোর, নিয়ন্ত্রণপ্রিয় মানুষকে এভাবে অস্থির করে তুলছে! কিন্তু ওয়াসিফ দেওয়ান কখনো হারতে শেখেনি। এই খেলা শুরু হয়েছে মাত্র, আর এর শেষ কোথায় হবে—তা কারো জানা নেই।
চলবে.....