ফন্ট সাইজ:
থিম:
বাড়িয়ে দাও তোমার হাত

৪র্থ পর্ব

লেখক: তাসনিয়া ফাইজা

লেখক -তাসনিয়া ফাইজা

দেওয়ান মঞ্জিলের বিশাল ড্রয়িংরুমে ভোরের স্নিগ্ধ আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। দোতলার নিরিবিলি গেস্ট রুমটিতে চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ভেসে আসছিল। কাঠের পুরোনো টেবিলটিতে থরে থরে সাজানো মোটা মোটা ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির বই। টেবিল ল্যাম্পের আবছা হলুদ আলোয় তামান্নার ফ্যাকাশে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
সারাটা রাত একফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি সে। গতকাল রাতে ওয়াসিফের ওই উগ্র আচরণ, জোর করে হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেওয়া আর অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ—সবকিছু তার মনের ভেতর এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তামান্না নিজের ক্লান্ত চোখ দুটো কয়েকবার মিটমিট করল। বইয়ের পাতায় রাসায়নিক সংকেত আর বায়োলজির টার্মগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু সে থামল না। নিজের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো বিলাসী দিন এখন তার নেই। সে কোনো বড় বড় কথা বা অহংকার দেখাতে চায় না, শুধু নিজের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখতে চায়।
ভোর সাড়ে ছ’টা বাজতেই তামান্না বই বন্ধ করল। ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পর্দাটা সামান্য সরাতেই দূরের লালচে সূর্যটা চোখে পড়ল। আজ তার মনটা এক অদ্ভুত শান্ত অথচ শক্ত অনুভূতির মুখোমুখি। সে জানে, এই বাড়িতে তার অবস্থান কতখানি নড়বড়ে। তাই অনর্থক কোনো বাকবিতণ্ডা বা নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে অহংকার দেখানোর কোনো অর্থ নেই। তাকে কাজ করে যেতে হবে, আর নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।
বাথরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে তামান্না নিচের রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
দেওয়ান মঞ্জিলের রান্নাঘরটি বেশ বড় ও আধুনিক। কাজের লোক বুয়া আগেই এসে চায়ের পানি চড়িয়েছিল। তামান্না ঘরে ঢুকতেই বুয়া সসম্মানে সরে দাঁড়াল, "ছোট আম্মা, আপনি এত সকালে উঠে পড়লেন? রেশমা আম্মা তো এখনো উঠেননি।"
তামান্না মৃদু হেসে বলল, "ঠিক আছে ,  আপনি বাকি কাজগুলো করে ফলেন।  আমি সকালের নাশতা আর কফিটা গুছিয়ে নিচ্ছি।"
তামান্না খুব শান্ত মনে প্রতিটি কাজ করতে লাগল। পরোটার কাই মেখে তা পাতলা করে বেলা, ডিম পোচ করা আর ফল কেটে ট্রেতে সাজানো—সবকিছু সে অত্যন্ত পরিপাটি করে করল। রেশমা দেওয়ান যখন সাড়ে সাতটা নাগাদ কিচেনে এলেন, তখন ডাইনিং টেবিলে অলরেডি প্রাতঃরাশের সব আয়োজন সাজানো শেষ।
রেশমা দেওয়ান ডাইনিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু থমকে দাঁড়ালেন। তামান্নার কাজের এই সুশৃঙ্খল ভাব দেখে তিনি মনে মনে কিছুটা অবাক হলেও মুখে কোনো প্রশংসার আলো ফুটতে দিলেন না। তার চেহারায় সেই আগের মতোই দূরত্বের বরফ জমে রইল।
রেশমা দেওয়ান ডালের বাটিটা সোজা করতে করতে গম্ভীর গলায় বললেন, "কাজকর্ম তো গুছিয়েছ দেখছি। কিন্তু মনে রেখো, কাজের চেয়েও বড় হলো এই বাড়ির শৃঙ্খলা রাখা। ওয়াসিফ সকালে বেশি কথা বলা বা টেবিলে ভিড় করা একদম পছন্দ করে না।"
তামান্না নিচু চোখে শান্ত গলায় উত্তর দিল, "আমি বুঝতে পেরেছি, আম্মা। আমি ট্রেতে কফি আর নাশতা রেডি করে রেখেছি।"
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন আসাদ দেওয়ান। চশমাটা চোখে দিয়ে তিনি ডাইনিংয়ের দিকে এগোতেই তামান্না এগিয়ে গিয়ে তার দিকে চেয়ার টেনে দিল।
"শুভ সকাল, বাবা," তামান্না ধীর ও বিনীত গলায় বলল।
আসাদ দেওয়ান স্নেহের দৃষ্টিতে তামান্নার দিকে তাকালেন। কাল রাতের সব ঘটনা তিনি হয়তো পুরোপুরি জানেন না, কিন্তু ওয়াসিফের সাথে তামান্নার যে চরম দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা তিনি ভালোভাবেই টের পাচ্ছিলেন। আসাদ দেওয়ান চেয়ারে বসে বললেন, "শুভ সকাল, মা। তুমি এত সকালে কষ্ট করে এসব করতে গেলে কেন? শরীরের যত্ন নিচ্ছ তো?"
"কষ্ট নয় বাবা, এগুলো আমার কাজ," তামান্না বিনীতভাবে বলল।
হঠাৎ করেই পুরো ঘরের আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত ভারিক্কি চাপ সৃষ্টি হলো।
সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে নেমে আসছিল ওয়াসিফ। পরনে সম্পূর্ণ ডার্ক গ্রে রঙের থ্রি-পিস স্যুট, ইনসেট করা শার্টের কলার নিখুঁত। তার ৬ ফুট সুঠাম দেহ আর গম্ভীর্ভাব যেন ঘরের সমস্ত আনন্দকে এক মুহূর্তে শুষে নেয়। তার বাদামী চটজলদি চোখ দুটি সরাসরি তামান্নার ওপর এসে স্থির হলো।
তামান্না আজ কোনো জেদ বা অহংকার দেখাল না। সে নিজের দৃষ্টি নিচু রেখে শান্তভাবে ওয়াসিফের নির্দিষ্ট জায়গায় কফির কাপটা এনে রাখল। কফিটি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে একদম সঠিক তাপে বানিয়েছে সে, যাতে তাপমাত্রা নিয়ে আজ সে কোনো অজুহাত তুলতে না পারে।
ওয়াসিফ চেয়ার টেনে বসল। তার শরীর থেকে দামী কোলন আর কফির স্ট্রং সুবাস ছড়াচ্ছিল। সে তামান্নার দিকে এক নজর তাকাল—মেয়েটির মুখে কালকের মতো কোনো রাগ বা তর্কের চিহ্ন নেই। চরম নিস্তব্ধতা আর সহনশীলতার এক আবরণে সে যেন নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। তামান্নার এই নীরবতা ওয়াসিফের ভেতরের অহংকারকে এক অচেনা অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
ওয়াসিফ কফির কাপে চুমুক দিল। তাপমাত্রা এবং স্বাদ দুটোই নিখুঁত, কিন্তু সে তা স্বীকার করল না। কাপটা টেবিলে রেখে সে বাবার দিকে তাকিয়ে নিচু, ধারালো কণ্ঠে বলল, "আজকে হাসপাতালে দুটি জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি আছে। তারপর মেডিকেল কলেজে ইমার্জেন্সি মিটিং। আসতে রাত হবে।"
আসাদ দেওয়ান খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বললেন, "ওয়াসিফ, প্রতিদিন তো একই কথা শোনাই। তামান্না মেয়েটা একাকী এই বাড়িতে দিন কাটাচ্ছে। ওর সাথে একটু দুটো কথা বলা বা ওকে সময় দেওয়া কি তোমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?"
ওয়াসিফ কফির কাপ শক্ত করে ধরে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে তামান্নার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা ও বরফশীতল কণ্ঠে বলল, "যে সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই, বাবা, সেখানে সময় দেওয়ার নাটক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তামান্না ভালো করেই জানে সে কেন এই বাড়িতে আছে। ওর যা প্রয়োজন, এই বাড়ি থেকেই পাবে। কিন্তু আমার থেকে কোনো বাড়তি আশা করা বোকামি।"
কথাটা শুনে তামান্নার বুকটা ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে মুখ ফুটে একটি শব্দও বলল না। কোনো তিক্ততা প্রকাশ করল না, কোনো উচ্চবাচ্য করল না। স্রেফ এক পা পিছিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আপনার কফি শেষ হলে আমি কাপটা নিয়ে যেতাম।"
তামান্নার এই অতিরিক্ত শান্ত আর সংযত রূপ দেখে ওয়াসিফ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ভেবেছিল তামান্না হয়তো আগের মতো তর্ক করবে, কিংবা কাঁদবে। কিন্তু তামান্না সম্পূর্ণ চুপ। ওয়াসিফ নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক বিষাক্ত দৃষ্টি হেনে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল।
আসাদ দেওয়ান এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তামান্নার দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি ওকে ক্ষমা করে দিও, মা। ছেলেটার মনটা বরফের মতো শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, এক দিন ও বুঝবে।"
তামান্না স্রেফ একটু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না।
বেলা এগারোটা।
দেওয়ান মঞ্জিলে হাজির হলো মাহির। তার সাথে আজ তামান্নার চাচাতো বোন রিনাও এসেছে। রিনার চেহারা ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালো দাগ স্পষ্ট।
ড্রয়িংরুমে রেশমা দেওয়ান বসে এক আত্মীয়ার সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। রিনাকে দেখে তিনি ফোনের ওপাশেই গলার সুর কিছুটা কড়া করে ফেললেন। লিপি আহমেদ আর তার পরিবারের ওপর রেশমা দেওয়ানের চরম ক্ষোভ এখনো বিন্দুমাত্র কমেনি।
মাহির এসে সোফায় বসে বলল, "চাচি! স্পেশাল চা পাঠাও তো এক কাপ! বাইরে আজ যা গরম পড়েছে!"
রেশমা দেওয়ান ফোন রেখে রুক্ষ গলায় বললেন, "তোর চা বানাতে হবে না। আর রিনা, তুমি এত ঘন ঘন এই বাড়িতে আসছ কেন? তোমার মা তো কাল রাতেও ফোনে আমার সাথে নানা রকম অহেতুক তর্ক করল। রিমির বিয়ের পর থেকে তোমাদের পরিবারের নাটক তো আর শেষ হচ্ছে না।"
রিনা মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠল।
পেছন থেকে তামান্না হেঁটে এলো। রিনার কাঁধে হাত রেখে সে রেশমা দেওয়ানকে খুব নিচু ও বিনীত গলায় বলল, "আম্মা, ও তো স্রেফ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। আপনার কোনো অসুবিধা হলে আমি ওকে আমার রুমে নিয়ে যাচ্ছি।"
রেশমা দেওয়ান মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেলেন, "নিয়ে যাও। কিন্তু এই বাড়িতে কোনো বাইরের ঝামেলা যেন না আসে।"
গেস্ট রুমে এসে রিনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তামান্নার পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। "তামান্না  আপু! আমাকে বাঁচাও! আম্মা সায়েমের কথা জেনে ফেলেছে! কাল রাতে সায়েমের সাথে আম্মা ফোনে চরম গালাগালি করেছে। আর আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে ঠিক করছে এক মধ্যবয়সী প্রবাসী লোকের সাথে! আমি মরে যাব আপু, আমি সায়েমকে ছাড়া বাঁচব না!"
তামান্না বুকটা কেঁপে উঠল। জীবনের অপূর্ণতা আর ভালোবাসার এই নিঃস্ব রূপ তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। সে রিনাকে ধরে তুলে জড়িয়ে ধরল। "রিনা, শান্ত হ! কান্না করলে কোনো সমাধান হবে না।"
রিনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, "তোমার কাছে তো এখন ক্ষমতা আছে আপু! তুমি বড় ঘরের বউ! তুমি কি ইব্রাহিম ভাই বা ভাইয়াকে (ওয়াসিফকে) বলে সায়েমের জন্য কিছু করতে পারো না? সায়েম একটা ভালো চাকরি পেলে আম্মা হয়তো মেনে নিত..."
তামান্না এক তিক্ত সত্যিটা নিজের মনের ভেতর অনুভব করল। ক্ষমতা? সে তো নিজেই এই বাড়িতে এক আশ্রিতা, জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এক বন্ধনের বন্দি। ওয়াসিফ দেওয়ান যাকে স্ত্রীর মর্যাদাই দেয় না, তার কথার কী মূল্য থাকবে সেখানে?
তামান্না রিনার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, "রিনা, আমি তোকে মিথ্যা আশা দেব না। আমার নিজের কোনো ক্ষমতা বা অধিকার এই বাড়িতে নেই। তবে সায়েমকে বলিস ও যেন ভেঙে না পড়ে। ও যেন ভালো কোনো চাকরির জন্য চেষ্টা চালায়। আমিও সুযোগ পেলে কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করব।"
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ল মাহির।
মাহির ভেতরে ঢুকে তামান্না আর রিনার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকাল। মাহিরের চেনা চঞ্চলতাটা যেন এক মুহূর্তে বাতাসে মিলিয়ে গেল। সে রিনার কান্নাজড়ানো মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিনার এই অসহায়ত্ব মাহিরের মনের কোথায় যেন এক গভীর ধাক্কা দিল।
মাহির একটু এগিয়ে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, "রিনা... এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই। তোমার সায়েম যদি সত্যি তোমায় ভালোবাসে, তবে ও লড়াই করবে। আর যদি চাকরিরই প্রশ্ন হয়, তবে আমি দেখতে পারি। আমার চেনা কিছু ভালো কোম্পানিতে সার্কুলার আছে। কিন্তু তার জন্য তোমার নিজেকেও শক্ত হতে হবে।"
রিনা চোখ তুলে মাহিরের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল অসীম কৃতজ্ঞতা। "সত্যি মাহির ভাই? আপনি সাহায্য করবেন?"
"হুম, করব," মাহির রিনার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল। কিন্তু মাহিরের মনের ভেতরে তখন এক অজানা দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছিল—রিনার প্রতি তার এই আকস্মিক অনুভূতি কি স্রেফ সহানুভূতি, নাকি অন্য কিছু? যা কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়, তার প্রতি এই টান কি এক নতুন অপূর্ণতার জন্ম দেবে?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল।
দেওয়ান মঞ্জিলের তিনতলার ছাদটা বেশ বড়। চারপাশে অনেক গাছগাছালির টব রাখা। তামান্না নিজের গেস্ট রুমের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে একটু রেহাই পেতে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিকেলের হাওয়া তার এলোমেলো চুলগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
তামান্নার হাতে ফিজিক্সের একটা ফর্মুলার বই। সে ছাদে পায়চারি করতে করতে মনে মনে রিভিশন দিচ্ছিল। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিন যত এগিয়ে আসছে, তার ভেতরের অস্থিরতা তত বাড়ছে। ওয়াসিফ তার ফোনটা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু সে দমে যায়নি। বই-ই এখন তার একমাত্র অস্ত্র।
হঠাৎ পেছনে সিঁড়িতে ভারী জুতার শব্দ পাওয়া গেল।
তামান্না চমকে ঘুরে তাকাল। ওয়াসিফ!
এত বিকেলে ওয়াসিফ সচরাচর বাড়ি ফেরে না। তার গায়ে এখনো হাসপাতালের কাজের স্যুট, তবে জ্যাকেটটা হাতে ধরা, শার্টের হাতা গোটানো। মুখটা চরম ক্লান্ত ও গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
ওয়াসিফ ছাদে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল। সে ভাবেনি ছাদে তামান্নাকে দেখতে পাবে। বিকেলের রোদ তামান্নার শ্যামলা ত্বকে এক অদ্ভুত তামাটে দ্যুতি তৈরি করেছিল। বাতাসের তোড়ে তামান্নার কোমর সমান চুলগুলো উড়ছিল। তামান্না এক মুহূর্তের জন্য ওয়াসিফের দিকে তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে নিজের বই নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে পড়া শুরু করল।
ওয়াসিফের বাদামী চোখ দুটি তামান্নার দিকে স্থির হলো। কাল রাতের চরম অসৌজন্যমূলক আচরণের পরও এই মেয়েটার মধ্যে কোনো রাগ বা অভিযোগ নেই। এই অতিরিক্ত নীরবতা ওয়াসিফের সুপ্ত পসেসিভ স্বভাবকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিল। সে এক ধাপ এগিয়ে এলো।
"পড়ালেখা কেমন চলছে?" ওয়াসিফের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত গম্ভীর ও নিচু।
তামান্না বই থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় উত্তর দিল, "ভালো।"
ওয়াসিফ ছাদের রেলিংয়ে এক হাত রেখে তামান্নার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওয়াসিফের সেই দীর্ঘ দেহের উপস্থিতি তামান্নাকে ঘিরে ফেলল। ওয়াসিফ তামান্নার হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "তুমি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজেই পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তা করছ, তাই তো?"
তামান্না এবার চোখ তুলে ওয়াসিফের দিকে তাকাল। তার হরিনী চোখে কোনো ভয় বা ক্ষোভ ছিল না, ছিল স্রেফ এক নিস্পৃহ ভাব। "যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমার সেন্টার পড়বে, আমি সেখানেই পরীক্ষা দেব। আপনার সীমানা ডিঙানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই।"
ওয়াসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তামান্নার এই নিরুদ্বেগ উত্তর তার সহ্য হচ্ছিল না। সে তামান্নার আরও এক পা কাছে চলে এলো। তামান্না সরতে চাইল, কিন্তু ওয়াসিফ ছাদের দেয়ালের সাথে তাকে একপ্রকার আটকে ফেলল।
"আমার কথা শোনো, তামান্না," ওয়াসিফ তামান্নার চোখের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠা নিচু গলায় বলল, "তুমি নিজেকে যতোই নিষ্পাপ আর শান্ত দেখানোর চেষ্টা করো না কেন, আমি জানি তুমি ভেতরে ভেতরে কতটা ধূর্ত। সায়েম বা অন্য কোনো পুরুষের সাথে যদি আমি তোমাকে আবার কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করতে দেখি, তবে পরিণতি খুব খারাপ হবে।"
তামান্না নিজেকে ছাড়ানোর কোনো চঞ্চলতা দেখাল না। সে ওয়াসিফের বাদামী চোখের গভীরে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "আপনি প্রতিদিন আমাকে একই কথা বলে নিজের সময় নষ্ট করছেন, প্রফেসর দেওয়ান। আমি কোনো পুরুষমানুষের সাথে যোগাযোগ রাখছি না, আর না আপনার কাছে কোনো মিথ্যা পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি আমাকে সন্দেহ করতে চাইলে করতে পারেন, তা আপনার মানসিকতা। কিন্তু দয়া করে আমাকে স্পর্শ করবেন না।"
তামান্নার এই বরফশীতল আর বিনীত প্রতিবাদ যেন ওয়াসিফের চড়া মেজাজে এক বালতি বরফ পানি ঢেলে দিল। ওয়াসিফ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তামান্না কোনো তর্ক করল না, চিৎকার করল না—স্রেফ সোজা গলায় নিজের মর্যাদাটুকু বজায় রেখে কথাটা বলল।
ওয়াসিফ ধীরে ধীরে তার হাত সরিয়ে নিল। তার নিজের ওপরই এক অদ্ভুত বিরক্তি জন্মাল। সে তামান্নার দিকে এক দীর্ঘ, বিষাক্ত দৃষ্টি হেনে ছাদ থেকে দ্রুত পায়ে নেমে গেল।
তামান্না ছাদের রেলিং ধরে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটি ভিজে উঠেছিল, কিন্তু সে তা মুছল না। সে জানে, এই লড়াইয়ে কান্না তার সবচেয়ে বড় শত্রু।
দিনগুলো কাটতে লাগল এক অদ্ভুত গতিতে।
তামান্না দেওয়ান মঞ্জিলের প্রতিটি কাজ নীরবে, নিখুঁতভাবে করে যেতে লাগল। রেশমা দেওয়ান তার ওপর কতশত কড়া নির্দেশ জারি করলেও সে কোনো প্রতিবাদ করত না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সে সংসার সামলাতো, আর মাঝরাতে আলো জ্বেলে নিজের গেস্ট রুমে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার পড়া শেষ করত।
ওয়াসিফের সাথে তার কথা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। টেবিলের সামনে দুজন বসলেও এক অস্বস্তিকর নীরবতা ছেয়ে থাকত। ওয়াসিফ কাজের অজুহাতে বেশিরভাগ দিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরত, আর সকালে তামান্নাকে এড়িয়ে চলত। তবে তামান্না খেয়াল করত, সে যখনই রুম থেকে বের হতো বা ছাদে যেত, ওয়াসিফের সেই তীক্ষ্ণ বাদামী চোখ দুটো আড়াল থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারি করত। এক অদ্ভুত, অনাকাঙ্ক্ষিত পসেসিভনেস ওয়াসিফকে তাড়া করে ফিরছিল, যা সে নিজেও স্বীকার করতে চাইছিল না।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত ও আশঙ্কার দিনটি এসে উপস্থিত হলো—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।
সকাল সাতটা।
তামান্নার অ্যাডমিট কার্ড অনুযায়ী তার পরীক্ষা সেন্টার পড়েছে ঢাকার 'সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ'-এ! ঠিক যেটার ভয় ওয়াসিফ পাচ্ছিল, আর যে কলেজের প্রধান প্রফেসর ওয়াসিফ নিজেই!
ডাইনিং টেবিলে তামান্না প্রস্তুত হয়ে এসে দাঁড়াল। পরনে একটি সাধারণ সাদা ও হালকা নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো পেছনে শক্ত করে খোঁপা করা। হাতে অ্যাডমিট কার্ড আর ফাইল।
আসাদ দেওয়ান তামান্নাকে দেখে হাসিমুখে বললেন, "আজ তো তোমার পরীক্ষা, তাই না তামান্না? অল দ্য বেস্ট, মা! তুমি অনেক কষ্ট করেছ, ঈশ্বর তোমার সহায় হবেন।"
তামান্না আসাদ দেওয়ানের পা ছুঁয়ে সালাম করল। "দোয়া করবেন, বাবা।"
রেশমা দেওয়ান পাশে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে বললেন, "পরীক্ষা দিয়ে সোজা বাড়ি ফিরবে। বাইরে কোনো ঘুরাঘুরি করবে না।"
তামান্না মাথা নাড়ল, "জি, আম্মা।"
ঠিক সেই সময় টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল ওয়াসিফ।
পরনে সুতির সাদা ফর্মাল শার্ট আর কালো ট্রাউজার। চোখে তার গাম্ভীর্য। সে তামান্নার অ্যাডমিট কার্ডের দিকে তাকাল। সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ নামটা দেখে তার বাদামী চোখে এক তীব্র আলোর ঝলক খেলে গেল।
ওয়াসিফ এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। তারপর গাড়ি চাবি পকেট থেকে বের করে অত্যন্ত নিচু ও ঠাণ্ডা গলায় বলল, "আমিও সেন্ট্রাল মেডিকেলেই যাচ্ছি। আজ আমার ভিজিটিং ডিউটি আর এক্সাম হলে তদারকি আছে। আমার গাড়িতে ওঠো, আমি পৌঁছে দিচ্ছি।"
রেশমা দেওয়ান চমকে উঠলেন, "ওয়াসিফ! তুই ওকে নিয়ে যাবি?"
তামান্না এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রইল। ওয়াসিফ তাকে নিজের গাড়িতে তুলতে চাইছে? লোকটা তো তাকে নিজের ছায়াও সহ্য করতে পারত না!
তামান্না বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল, "দরকার নেই। আমি বাস বা রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারব। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।"
ওয়াসিফের চোয়াল মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল। তামান্নার এই প্রত্যাখ্যান তার  সত্ত্বায় এক প্রচণ্ড আঘাত করল। সে তামান্নার কব্জিটা কোনো ভূমিকা ছাড়াই শক্ত করে চেপে ধরল।
"আমি তোমাকে অনুরোধ করিনি, তামান্না," ওয়াসিফের কণ্ঠস্বর থমথমে ও ভয়ঙ্কর রূপ নিল, "আমার গাড়িতে ওঠো। আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি ফার্দার ড্রামা ইন ফ্রন্ট অফ মাই হাউস।"
তামান্না আর কথা বাড়াল না। সে জানে, এই লোকটার সাথে তর্ক করে নিজের পরীক্ষার মূল্যবান সময় নষ্ট করা বোকামি। সে নীরবে ওয়াসিফের পেছনে পেছনে গিয়ে গাড়ির সামনের সিটে বসল।
গাড়ির ভেতরের নীরবতা ছিল শ্বাসরোধী।
ওয়াসিফ দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল। তার এক হাত স্টিয়ারিংয়ে, অন্য হাত গিয়ারে। তামান্না জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। গাড়ির সুবাস আর ওয়াসিফের উপস্থিতি তাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলছিল, কিন্তু সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল।
ওয়াসিফ আড়চোখে একবার তামান্নার দিকে তাকাল। তামান্নার ফ্যাকাশে শ্যামলা মুখ, শক্ত হয়ে ধরে রাখা ফাইলের ওপর তার আঙুলগুলো—সবকিছু যেন ওয়াসিফের বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত তোলপাড় তৈরি করছিল। সে তামান্নাকে দূরে ঠেলতে চায়, কিন্তু আবার নিজের চোখের সামনে থেকেও হারাতে দিতে চায় না। এই দ্বিমুখী টান ওয়াসিফকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল।
গাড়ি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের বিশাল গেটে এসে থামল। চারপাশে শত শত ছাত্র-ছাত্রী আর অভিভাবকদের ভিড়।
তামান্না গাড়ির দরজা খুলে নামতে গেল।
ওয়াসিফ হঠাৎ গাড়ির লক বাটন চেপে দিল! দরজা খুলল না।
তামান্না অবাক হয়ে ওয়াসিফের দিকে তাকাল। "দরজা খুলুন, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
ওয়াসিফ তামান্নার দিকে শরীর হেলিয়ে আনল। তার বাদামী চোখ দুটো তামান্নার চোখের ওপর স্থির হলো। ওয়াসিফের নিশ্বাস তামান্নার গালে এসে লাগছিল।
ওয়াসিফ অত্যন্ত নিচু, হুমকিঘেরা কণ্ঠে বলল, "পরীক্ষার হলে মন দিয়ে পরীক্ষা দেবে। কোনো ছেলে বা পরিচিত কারো সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না। পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই হলের সামনে আমার জন্য ওয়েট করবে। যদি দেখি তুমি অন্য কারো সাথে কথা বলছ, তবে ফলাফল ভালো হবে না।"
তামান্না একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ওয়াসিফের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমি এখানে পরীক্ষা দিতে এসেছি, প্রফেসর। আপনার বাধ্যগত বন্দি হয়ে থাকতে আসি নি। দরজাটা খুলুন।"
ওয়াসিফ মুহূর্তের জন্য তামান্নার চোখের সেই তীব্রতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে লক বাটন আনলক করে দিল।
তামান্না আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
ওয়াসিফ স্টিয়ারিং হুইলে এক প্রচণ্ড ঘুষি মারল। তার হাত কাঁপছিল রাগে আর এক অজানা অস্থিরতায়। 'কেন? কেন এই মেয়েটা আমাকে এভাবে উপেক্ষা করতে পারে? কেন ওর চোখে আমার জন্য কোনো ভয় বা অনুশোচনা নেই?'
পরীক্ষার হল নম্বর ৪০২।
তামান্না নিজের সিট খুঁজে নিয়ে বসল। তার মন এখন সম্পূর্ণ শান্ত। সে তার সমস্ত মনোযোগ প্রশ্নপত্রের দিকে নিবদ্ধ করল। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দিতে লাগল।
পরীক্ষার ঠিক মাঝপথে হলের দরজায় এক ভারী পদক্ষেপের শব্দ হলো।
হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত জুনিয়র চিকিৎসকেরা সসম্মানে দাঁড়িয়ে উঠলেন। "গুড মর্নিং, প্রফেসর দেওয়ান!"
ওয়াসিফ দেওয়ান হলে প্রবেশ করল।
তার পরনে ডক্টরস অ্যাপ্রন। ৬ ফুট সুঠাম দেহের ওপর সাদা অ্যাপ্রনটা তাকে এক অবিশ্বাস্য আকর্ষণীয় রূপ দিয়েছে। হলের বেশ কিছু ছাত্রী এক মুহূর্তের জন্য পরীক্ষার কথা ভুলে প্রফেসরের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু ওয়াসিফের বাদামী চোখ দুটি চারপাশের কাউকে দেখছিল না। সে ধীর পায়ে হেঁটে সোজা চলে এলো তামান্নার বেঞ্চের পাশে।
তামান্না খাতা থেকে মুখ তুলে তাকাল না। সে একমনে বায়োলজির উত্তর লিখছিল।
ওয়াসিফ তামান্নার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তার উপস্থিতি তামান্নার ওপর এক প্রকাণ্ড ছায়া ফেলল। ওয়াসিফ তামান্নার খাতার দিকে নজর দিল—প্রতিটি উত্তর নিখুঁত, হাতের লেখা ঝরঝরে ও পরিষ্কার। ওয়াসিফ মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো, এই মেয়েটির মেধা অসাধারণ।
ওয়াসিফ পকেট থেকে নিজের দামী পেন বের করে তামান্নার খাতার ওপর স্বাক্ষর করে দিল। স্বাক্ষর করার সময় ওয়াসিফের হাত তামান্নার হাতের সামান্য ছোঁয়া পেল। তামান্নার শরীর এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল, কিন্তু সে নিজের মনোযোগ সরাল না।
ওয়াসিফ নিচু স্বরে, কেবল তামান্না শুনতে পায় এমনভাবে বলল, "টাইম ইজ রানিং আউট। ফিফটি মিনিটস লেফট।"
তামান্না শুধু একবার মাথা নেড়ে নিজের কাজ চালিয়ে গেল।
ওয়াসিফ হলের এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরো মনোযোগ ছিল তামান্নার ওপর। কেউ যদি তামান্নার দিকে একটু অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকে, ওয়াসিফের বাদামী চোখে সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ফুলকি ফুটে উঠছিল। তার সুপ্ত, পসেসিভ মানসিকতা তামান্নাকে কারো নজরে পড়তে দিতে চাইছিল না।
ঘণ্টা বাজল। পরীক্ষা শেষ।
শিক্ষার্থীরা খাতা জমা দিয়ে হল থেকে বের হতে লাগল। তামান্নাও ফাইল গুছিয়ে করিডোর দিয়ে বের হয়ে এলো।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামার উপক্রম। আকাশে কালো মেঘ।
তামান্না করিডোরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। সে নিশ্চিত, সে চান্স পাবে। তার মুখে বহুদিন পর এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তামান্নার পেছনে এসে দাঁড়াল এক তরুণ ডাক্তার। সে সেন্ট্রাল মেডিকেলেরই ইন্টার্ন ডক্টর, নাম ফাহিম।
ফাহিম হেসে তামান্নাকে বলল, "হাই! আপনার পরীক্ষা কেমন হলো? আমি দেখছিলাম আপনি খুব দ্রুত লিখছিলেন।"
তামান্না সৌজন্যমূলকভাবে বিনীত গলায় বলল, "জি ভালো হয়েছে। ধন্যবাদ।"
"আপনি কি এই মেডিকেলেই ফার্স্ট চয়েস দিয়েছেন? যদি চান্স পান, তবে তো আমরা সিভিল জুনিয়র হিসেবে আপনাকে পাব," ফাহিম বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বলল।
তামান্না হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল না, স্রেফ বিনীতভাবে বলল, "দেখা যাক কী হয়।"
ঠিক সেই মুহূর্তে—
করিডোরের বাতাস যেন হঠাৎ বরফ হয়ে গেল!
এক তীব্র জোরালো পদশব্দে ফাহিম আর তামান্না দুজনই ঘুরে তাকাল।
ওয়াসিফ হেঁটে আসছে। তার ডক্টরস অ্যাপ্রন খোলা, ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে আছে। তার বাদামী চোখে এমন এক ভয়ঙ্কর আলো, যা দেখলে যে কারো রক্ত হিম হয়ে যাবে!
ওয়াসিফ এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে সোজা এসে ফাহিমের সামনে দাঁড়াল। ওয়াসিফের দীর্ঘ শরীরের সামনে ফাহিমকে বেশ ছোট দেখাচ্ছিল।
"ডক্টর ফাহিম," ওয়াসিফের কণ্ঠস্বর থমথমে ও কামানের গোলার মতো গুমরে উঠল, "ওয়ার্ড ফোরের পেশেন্টের ইসিজি রিপোর্ট নিয়ে ইমার্জেন্সিতে থাকার কথা ছিল তোমার। এখানে কী করছ?"
ফাহিম ভয় পেয়ে তোতলাতে লাগল, "স-সরি, প্রফেসর! আমি জাস্ট পরীক্ষা শেষে ক্যান্ডিডেটের সাথে..."
"গেট ব্যাক টু ইউর ডিউটি! রাইট নাও!" ওয়াসিফ  রাগে এমন এক ধমক দিল যে আশেপাশের কয়েকজন শিক্ষার্থী চমকে উঠল।
ফাহিম আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দ্রুত সরে গেল।
করিডোরে তখন স্রেফ তামান্না আর ওয়াসিফ।
তামান্না ওয়াসিফের এই অহেতুক উগ্র রূপ দেখে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। সে কোনো চেঁচামেচি করল না, স্রেফ বিনীত ও ঠাণ্ডা গলায় বলল, "আপনি একজন শিক্ষকের মতো আচরণ করছেন না, প্রফেসর দেওয়ান। লোকটা স্রেফ সৌজন্যমূলক কথা বলছিল।"
ওয়াসিফ তামান্নার এক হাত শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল! তামান্নার শরীর গিয়ে ধাক্কা খেল ওয়াসিফের শক্ত বুকের ওপর।
"আমি তোমাকে কী বলেছিলাম, তামান্না?" ওয়াসিফের গলার আওয়াজ অতিরিক্ত নিচু ও হিসহিস করে বের হলো, "অন্য কোনো পুরুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে দেখলে আমি সহ্য করব না। ইউ আর মাই ওয়াইফ! গেট দ্যাট ক্লিয়ার ইন ইউর হেড!"
তামান্না ব্যথা পাওয়া সত্ত্বেও নিজের চোখ থেকে অশ্রু পড়তে দিল না। সে সোজা ওয়াসিফের বাদামী চোখের গভীরে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীব্র ভঙ্গিতে বলল, "স্ত্রী? আপনি কি আমাকে সত্যি স্ত্রী বলে মনে করেন, ওয়াসিফ দেওয়ান? নাকি স্রেফ নিজের অহংকার আর পসেসিভনেস দেখানোর জন্য একটা খেলনা বানিয়ে রেখেছেন? আপনার এই হিংসা আর অহেতুক সন্দেহ আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।"
ওয়াসিফ থমকে গেল। তামান্নার সেই শান্ত কথাগুলো তার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তামান্না কোনো কান্না বা দুর্বলতা দেখায়নি, স্রেফ এক অদ্ভুত দৃঢ়তায় তাকে থামিয়ে দিল।
ওয়াসিফ তামান্নার হাত ছেড়ে দিল, কিন্তু তার বাদামী চোখ দুটো তামান্নার ওপর নিবদ্ধ রইল। "গাড়িতে গিয়ে বোসো। বৃষ্টি বাড়ছে।"
তামান্না কথা না বাড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। ওয়াসিফ পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখতে পেল, বৃষ্টিতে ভিজে তামান্নার সালোয়ার-কামিজটা শরীরের সাথে সেঁটে গেছে, আর তার দীর্ঘ কালো চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে।
ওয়াসিফের বুকের ভেতর এক অচেনা, তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো। এক অদম্য আকুলতা আর উগ্র অধিকারবোধ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটিকে সে কোনো দিন নিজের জীবন থেকে বের করে দিতে পারবে না। তামান্না তার জীবনের এমন এক অভিশাপ বা আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে, যা তাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস বা সৃষ্টি করবে!
সপ্তাহ খানেক পর।
দেওয়ান মঞ্জিলে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছেয়ে ছিল।
রিনা আজকাল প্রায় প্রতিদিনই আসে, কিন্তু তার মুখে কোনো হাসি নেই। সায়েমের সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বন্ধের পথে, কারণ লিপি আহমেদ রিনার ফোন কেড়ে নিয়েছেন এবং ঘরের মধ্যে বন্দি করে রেখেছেন। মাহির সায়েমের জন্য একটি কোম্পানিতে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, কিন্তু সায়েমের পরিবার লিপি আহমেদের এই চরম অপমানের পর সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সাহস পাচ্ছে না।
বিকেলে তামান্না রিনাকে ফোন করার জন্য ড্রয়িংরুমের ল্যান্ডলাইন ফোনের কাছে এসেছিল। রেশমা দেওয়ান সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন।
তামান্না বিনীতভাবে বলল, "আম্মা, আমি কি রিনাকে একটা ফোন করতে পারি?"
রেশমা দেওয়ান চায়ে চুমুক দিয়ে রুক্ষ স্বরে বললেন, "তোমার ওই উচ্ছন্ন যাওয়া বোনকে ফোন করার দরকার নেই। লিপি আহমেদ কাল রাতেও আমাকে ফোন করে বলেছে, আমরা নাকি রিনাকে উসকে দিচ্ছি! নিজেদের ঘরের ঝামেলা নিজেরা সামলাক। তুমি আর ওই বাড়ির কোনো বিষয়ে মাথা গলাবে না।"
তামান্না নিচু চোখে দাঁড়িয়ে রইল। "জি, আম্মা।"
তামান্না বুঝতে পারল, জীবনের এই অপূর্ণতাগুলো কতটা নিষ্ঠুর। রিনা আর সায়েমের ভালোবাসা হয়তো কোনো দিন পূর্ণতা পাবে না, লিপি আহমেদের অহংকার আর সামাজিক মর্যাদার চাপে তা পিষে যাবে। তামান্না নিজের জীবনের দিকে তাকাল—তার জীবনেও তো কোনো পূর্ণতা নেই। এক জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া বন্ধন, এক নিষ্ঠুর স্বামী আর এক অচেনা ছাদের নিচে সে দিন কাটাচ্ছে।
ঠিক সেই সময় দেওয়ান মঞ্জিলের ডাকপিয়ন দরজায় একটা অফিসিয়াল চিঠি দিয়ে গেল।
কাজের লোক চিঠিটা এনে রেশমা দেওয়ানের হাতে দিল। রেশমা দেওয়ান চিঠির ওপরের লোগো দেখে চমকে উঠলেন—সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ, ঢাকা!
চিঠিটা তামান্নার নামে!
রেশমা দেওয়ান হাত বাড়িয়ে চিঠিটা খুললেন। চিঠির ভেতরে জ্বলজ্বল করছে রেজাল্ট শিট!
"মেডিকেল এডমিশন টেস্ট রেজাল্ট: তাসনিয়া নওরোজ তামান্না — মেরিট পজিশন: ৪র্থ! সিলেক্টেড ফর: সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ!"
রেশমা দেওয়ান স্তব্ধ হয়ে চিঠির দিকে তাকিয়ে রইলেন! দেশের অন্যতম কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় তামান্না চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে!
তামান্না রেশমা দেওয়ানের হাতের চিঠির দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো মেধা আর আনন্দের অশ্রুতে ভরে উঠল। সে পেরেছে! নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পেরেছে!
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এসে দাঁড়াল ওয়াসিফ।
পরনে কালচে স্যুট, হাতে কিছু ফাইল। সে ঘরের পরিবেশ আর মায়ের হাতের চিঠিটা দেখে থমকে দাঁড়াল।
রেশমা দেওয়ান ফিসফিস করে বললেন, "ওয়াসিফ... তামান্না মেডিকেলে ৪র্থ হয়েছে। ও তোর সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজেই চান্স পেয়েছে..."
ওয়াসিফ এক পা এগিয়ে এলো। তার বাদামী চোখ দুটো তামান্নার ওপর গিয়ে থামল। তামান্না তখনো রেশমা দেওয়ানের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—তার চোখে কোনো অহংকার নেই, কিন্তু এক অদম্য আত্মবিশ্বাসের আলো জ্বলজ্বল করছে।
ওয়াসিফ তামান্নার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার ৬ ফুট কায়া তামান্নাকে ঘিরে ফেলল। ওয়াসিফ চিঠির দিকে এক নজর তাকিয়ে তামান্নার চোখের দিকে তাকাল।
ওয়াসিফের কণ্ঠস্বর অতিরিক্ত নিচু, গম্ভীর ও এক অদ্ভুত  ভারী হয়ে উঠল:
"কনগ্র্যাচুলেশনস, তামান্না। তুমি আমার ক্লাসরুমে আসার যোগ্যতা অর্জন করেছ।"
তামান্না ওয়াসিফের সেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বাদামী চোখের গভীরে তাকিয়ে শান্ত অথচ স্পষ্ট গলায় বলল, "ধন্যবাদ, প্রফেসর দেওয়ান। কিন্তু মনে রাখবেন, আমি আপনার ক্লাসরুমে একজন ছাত্রী হিসেবে যাচ্ছি, আপনার সীমানার বন্দি হয়ে নয়।"
ওয়াসিফ সামান্য বাঁকা হাসল—এক অন্ধকার, ওভারপসেসিভ ও উগ্র অধিকারবোধের হাসি।
"দেখা যাক, তামান্না... আমার ক্লাসরুমে আর আমার জীবনে তুমি কত দিন নিজেকে আমার থেকে আলাদা রাখতে পারো।"
বাইরে তখন আবার ঝুম বৃষ্টি নেমে এসেছে। দেওয়ান মঞ্জিলের বাতাসে এক নতুন আলোড়ন, এক জটিল অনুভূতির সূচনা হলো। এক প্রফেসরের বরফশীতল পসেসিভনেস আর এক অভিমানী চঞ্চল মেয়ের আত্মসম্মানের এই লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেবে—তা সময় বলে দেবে!
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন