৪.
বিকেল পাঁচটা।
বাংলাদেশ, বনলতা কুঞ্জ।
আম্বিয়া শেখ তখনও মুসকানের এপার্টমেন্টেই ছিলেন। মুসকান এবং সে মুসকানের পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলল। কিছুকক্ষন গল্পের পর।
মুসকান বলল—
— আপু, আমি কাল থেকেই ভার্সিটিতে যেতে চাই। অনেকদিন তো মিস হয়ে গেছে।
আম্বিয়া শেখ নরম গলায় উত্তর দিলেন—
— আর কিছুদিন রেস্ট নাও। তারপর কন্টিনিউ করো।
মুসকান সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ করল—
— না আপু। এমনিতেই আমি অনেক পিছিয়ে পড়েছি।
আম্বিয়া শেখ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর একটু চিন্তিত সুরে বললেন—
— আসলে একটা সমস্যা তো আছেই। তুমি কি ড্রাইভিং পারো?
মুসকান কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
— না। কেন? কোনো সমস্যা?
আম্বিয়া শেখ পরিষ্কার করে বোঝালেন—
— গ্যারেজে তিনটা গাড়ি পড়ে আছে, কিন্তু ড্রাইভার নেই। আর আমাদের বাসায় রায়িনের অনুমতি ছাড়া নতুন কোনো লোক রাখা নিষেধ। তো… বুঝতেই তো পারছো।
মুসকান হালকা হেসে বলল—
— এটা তো খুব সাধারণ বিষয়। আমি না হয় কিছুদিন ক্যাবেই যাতায়াত করব। আপনার ভাই যখন ফোন করবে, তখন ওনার কাছ থেকেই অনুমতি নিয়েন।
আম্বিয়া শেখ মাথা নেড়ে বললেন—
— আচ্ছা। তুমি যা ভালো মনে কর।
" সাইবেরিয়া, রাশিয়া।
বাংলাদেশের তুলনায় রাশিয়া আয়তনে প্রায় একশ গুণ বড়। অথচ জনসংখ্যা মাত্র প্রায় চৌদ্দ কোটি। এর মধ্যে প্রায় আশি শতাংশ মানুষই বাস করে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে। কারণ একটাই—এখানকার কঠোর, রুক্ষ পরিবেশ।
রাশিয়ার শীত কেবল আবহাওয়া নয়—এটা এক ধরনের সতর্কবার্তা। বরফে ঢাকা রাস্তাগুলো যতটা শান্ত দেখায়, তার নিচে ঠিক ততটাই নিষ্ঠুর এক জগত লুকিয়ে থাকে। রাত নামলেই শহরের আলো আর ছায়ার ভেদরেখা মুছে যায়, আর তখনই শুরু হয় সত্যিকারের লেনদেন—যেখানে টাকা নয়, ক্ষমতাই আসল মুদ্রা।
মস্কোর ঝলমলে স্কাইলাইনের পেছনে আছে এমন এক রাশিয়া, যেখানে আইন কাগজে লেখা থাকে, কিন্তু রাস্তায় চলে অন্য নিয়ম। সেই নিয়ম বানায় মাফিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম নেয় এই অদৃশ্য সাম্রাজ্য। দুর্বল রাষ্ট্র, ক্ষুধার্ত মানুষ আর ভাঙা অর্থনীতি—এই তিনে মিলে গড়ে ওঠে সংগঠিত অপরাধের শক্ত ভিত্তি।
রাশিয়ান মাফিয়া শুধু অপরাধী চক্র নয়; তারা এক ধরনের বিকল্প সরকার। চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসা, অবৈধ মদ ও মাদক, মানব পাচার—সবকিছুই চলে নিরব নিখুঁত শৃঙ্খলায়। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে ঠান্ডা মাথার হিসাব, আর প্রতিটি ভুলের মূল্য দিতে হয় রক্তে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে এই জগতের অস্তিত্ব আছে। অনেক সময় তারা লড়ে, অনেক সময় তারা নীরব থাকে। কারণ এখানে শক্তি মানেই নিরাপত্তা। যাদের পিছনে ক্ষমতাশালী ছায়া আছে, তাদের ছোঁয়া কঠিন। তাই অপরাধ এখানে চিৎকার করে না—ফিসফিস করে ঘটে।
সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো মাফিয়ার জন্য আদর্শ। বিস্তীর্ণ জঙ্গল, জনশূন্য রাস্তা আর বরফে ঢাকা সীমান্ত—সবকিছু মিলিয়ে নিখুঁত আড়াল। এখানে মানুষ নিখোঁজ হলে প্রশ্ন ওঠে না, আর সত্য চাপা পড়ে যায় বরফের নিচে।
এই দেশ বরফে মোড়া, কিন্তু ভেতরে আগুন। আর সেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করে কিছু মানুষ—যাদের নাম কাগজে নেই, কিন্তু ভয় তাদের পরিচয়। রাশিয়ায় মাফিয়া কোনো গল্প নয়; তারা এক নীরব বাস্তবতা, যা অন্ধকারেই সবচেয়ে নিরাপদ।
রাশিয়ার সাইবেরিয়া—বরফে মোড়া, মৃত্যুসম নীরব এক ভূমি। বছরের বেশিরভাগ সময় সূর্য এখানে দুর্বল, আর রাতগুলো অস্বাভাবিক দীর্ঘ। এই নিষ্ঠুর শীত আর নির্জনতাকেই নিজের ঢাল বানিয়ে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর নাম—
“Vampire Kingdom.”
এটা কোনো সাধারণ অপরাধচক্র নয়। এটা এক মাফিয়া সাম্রাজ্য—যার আতঙ্ক সীমান্ত মানে না, মানচিত্র মানে না। ইউরোপ, এশিয়া, এমনকি আমেরিকার আন্ডারওয়ার্ল্ডেও এই নামটা উচ্চারণ করা হয় ফিসফিস করে। কারণ যারা বেশি জোরে বলে… তারা বেশিদিন বাঁচে না।
এই সংগঠনের আসল ঘাঁটি সাইবেরিয়ার গভীর জঙ্গলে। যেখানে সরকারি ম্যাপেও ঠিকঠাক লোকেশন নেই। স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে না, ড্রোন হারিয়ে যায়, আর মানুষ গেলে—ফিরে আসে না।
সেখানে আছে এক বিশাল, প্রাচীন দুর্গ—বরফ আর কুয়াশার আড়ালে লুকানো। বাইরের দুনিয়া একে Vampire Palace নামে চেনে, কিন্তু ভিতরে কী হয়—তা কেউ জানে না।সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার?
এই সাম্রাজ্যের রাজা।
Vampire Kingdom-এর King সম্পর্কে পৃথিবীতে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। নাম নেই, মুখ নেই, বয়স নেই। কেউ জানে না সে আদৌ একজন মানুষ, না কি শুধু একটা ছায়া। কেউ তাকে কখনো দেখেছে—এমন প্রমাণও নেই।
কিন্তু তার আদেশে সরকার পড়ে, সাম্রাজ্য ভাঙে, শহর নিশ্চুপ হয়ে যায়। রাজা সামনে আসে না। সে শাসন করে… অদৃশ্য থেকে।তার হয়ে সবকিছু সামলায় চারজন মানুষ—যাদের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বলা হয়
“The Four Gems of Vampire Kingdom.”
তাদের নাম জানা গেছে।কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তাদের মুখ দেখেনি।কারণ তারা কোনো কাজের প্রমাণ রাখে না।না লাশ, না সাক্ষী, না রেকর্ড।
এই চারজনের মধ্যে—
🔹 তিনজন পুরুষ।
🔹 একজন নারী।
নারীটি সবচেয়ে রহস্যময়। বলা হয়, সে তথ্য আর মনস্তত্ত্বের রানী। শত্রু ধ্বংসের আগেই সে তার ভেতরটা ভেঙে দেয়।
তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন—সে রাজার Right Hand__ফারহান মির্জা। রাজা যেখানে অদৃশ্য, সে সেখানে উপস্থিত।রাজা যা ভাবে,সে তা বাস্তব করে।সে শুধু একজন যোদ্ধা নয়—সে হচ্ছে রাজার ছায়া, তার কণ্ঠস্বর, তার নির্মম সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপ। আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা কথাই প্রচলিত—
“If the Right Hand moves… someone is already dead.”
Vampire Kingdom কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করে না।তারা শুধু নিশ্বাস নেয়…আর পৃথিবী কেঁপে ওঠে।" "
এক সুন্দরী মানবী কমফোর্টে শুয়ে উপরোক্ত প্রতিবেদনটি পড়ছিল। সে শুধু গুগল করেছিল ভ্যাম্পায়ার কিংডম সম্পর্কে। প্রতিবেদনটি পড়া শেষে সে আবার গুগল করে "বাংলাদেশের সব থেকে কম বয়সী টপ টেন সাকসেসফুল বিজনেসম্যানস"। সেখানে মুসকান তার স্বামীকে দেখতে পায়। ও মনে মনে বিড়বিড়ালো,
“মাই ডিয়ার ভিলেন হাবি, আপনি তো খুব ট্যালেন্টেড। শুধু একটা জিনিস খটকা লাগছে। যেখানে Google পর্যন্ত আপনার পরিচয় জানে না, সেখানে আপনি কেন আপনার পরিচয় আমাকে দিলেন?”
সাইবেরিয়াতে সারাবছরই তুষারপাত হয়। হেলিকপ্টার সামলাচ্ছে রায়িন, সহকারি পাইলট হিসেবে আছে ফারহান। ফারহান জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ মস্কো..??”
রায়িন নিরলুপ্ত গলায় উত্তর দিল,
“প্রস্টিটিউট ক্লাব এন্ড ক্যাসিনো গুলো ভিজিট করা দরকার, তাছাড়া আজকে একটু হ্যাংআউটের মুড।”
ফারহান উত্তর দিল,
“হ্যাংআউটটা মানা যায় কিন্তু বাকিগুলো রায়িন আল জাফিরের সাথে যায় না। তাহলে ‘ব্লু সি বার’ ক্লোজ করতে বলি।”
রায়িন ফারহানকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“নো। আজ রোডসাইড রোমিও হব। রোডের মধ্যে ড্রিংক করব।”
ফারহান তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
“যত সব আজগুবি চিন্তাভাবনা, তোমার মাথাতেই আসতে পারে।”
ফারহান কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলল,
“রায়িন, ক্যান আই আসক ইই এ কোশ্চেন,,? আই নো, তোমার পার্সোনাল লাইফে ইন্টারফেয়ার করার কোন রাইট আমার নেই। এটা আমার কর্ম এবং ধর্ম বিরোধী হবে। তবুও একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।”
রায়িন সামনের দিক নজর রেখেই উত্তর দিল,
“কথা না ঘুরিয়ে সোজাসুজি বল। আজকে মুডটা ভালো আছে। সো, ইউ ক্যান আসক এনি কাইন্ড অফ সি'ট কোশ্চেন,,।”
ফারহান বলল,
“কিছু গ্রেডি পারসনের কথায় তুমি বিয়েতে রাজি হয়েছ, এটা কোনভাবে মাথায় ঢুকছেনা।”
রায়িন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“অ্যাকচুয়ালি, দ্যাট লিটল গার্লস মম এন্ড মাই মম ওয়ার বেস্ট ফ্রেন্ডস। এন্ড ইউ নো, টিপিকাল বাঙালি বেস্ট ফ্রেন্ডরা কি করে। সো, মমের লাস্ট উইস হিসেবে করেছি। নাথিং এলস। আই এম নট ইন্টারেস্টেড ইন গার্ল।”
ফারহান শয়তানি মার্কা হাসি দিয়ে বলল,
“দেন, ইন্টারেস্টিং বয়।”
রায়িন ভ্রু কুচকে ফারহানের দিক তাকিয়ে বলল,
“তাহলে তো তুমি সব থেকে বেশি ডেঞ্জার জনে আছো।”
ফারহানের কাশি উঠে গেল, ও কাশতে কাশতে বলল,
“ইটস টাইম টু লেন্ডিং।”
রায়িনের পুরো পৃথিবীব্যাপী হাজারখানিক নামকরা বার, ক্যাসিনো, প্রোস্টিটিউট ক্লাব আছে। কিন্তু একটাও ও নিজের নামে পরিচালনা করে না। প্রতিটি ক্যাবই নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বা এনজিও-এর নামে চলে। এই বড় বড় ক্যাবসগুলোর আন্ডারে আরও হাজারো ছোট ছোট ক্লাব, ক্যাসিনো চলে। কোনো কিছুতে রায়িনের নাম না থাকায়, দুনিয়ার চোখে সে একজন সৎ ব্যবসায়ী।
“Dreamy Night Casino”-এর হেলিপ্যাডে এসে নরম শব্দে ল্যান্ড করল রায়িনদের হেলিকপ্টারটি। রোটরের শব্দ থামতেই দু’জন ভিতরে প্রবেশ করল। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা সব অ্যাটেন্ডারদের দৃষ্টি একসাথে গিয়ে থামল দুই সুদর্শন পুরুষের উপর। ক্যাসিনোর স্টেজে রাশিয়ান রমণীদের চলছে অসম্ভব সুন্দর, ছন্দময় ও আকর্ষণীয় অঙ্গভঙ্গিনৃত্য—রঙিন আলোয় তাদের নাচ যেন পুরো জায়গাটাকে জীবন্ত করে তুলেছে।
রায়িন কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা ১২ নম্বর টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। পুরো ক্যাসিনোতে একমাত্র এই টেবিলটাই খালি ছিল। অনুভূতিশূন্য কণ্ঠে রায়িন বলল, __“I know you can lose me, but let’s make a bet.”
ফারহান ঠাট্টার সুরে উত্তর দিল, __“আমি গরিব মানুষ, আমি কি বাজি ধরবো?”
রায়িন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল, __“Let’s play. Just for fun.”
১২ নম্বর টেবিলের রমণীকে দেখে একেবারেই রুশ কন্যা মনে হচ্ছে না। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। ফর্সা গায়ের রং। চুলে কৃত্রিম গোলাপি রঙ। মুখে হালকা মেকআপ, শরীরে ক্যাসিনোর নির্ধারিত পোশাক। ফারহান আর রায়িনের কথোপকথনের ফাঁকে মেয়েটি ধীরে রায়িনের দিকে হাত বাড়ায়—কাস্টমারদের সিডিউস করাই তাদের কাজের অংশ।
কিন্তু রায়িনের গায়ে হাত লাগার আগেই সে গর্জে ওঠে, __“Shulikha (বেশ্যা), don’t dare to touch me.”
চিৎকার শুনে মেয়েটি হতভম্ব হয়ে যায়। কোনো কাস্টমার তার উপর এভাবে রাগ করলে, সেটা যদি উপরের অফিসাররা জানে—তার চাকরি থাকবে না। আতঙ্কে মেয়েটি বারবার রায়িনের কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফারহান গম্ভীর স্বরে বলে, __“You, girl. Start this game.”
মেয়েটি নিজেকে সামলে শান্ত গলায় জবাব দেয়, __“Okay, sir. Which numbers will I lock, and how many dollars?”
রায়িন একবার টেবিলটার উপর চোখ বুলাল। ফারহান রায়িনের দৃষ্টির দিক অনুসরণ করে মুচকি হাসল। রায়িন প্রথমে বলল, __“One million dollars. Lock ten.”
এক সেকেন্ড থেমে আবার যোগ করল, __“Lock seven.”
টেবিলের এক কোণায় গোল চরকির মতো অংশ। মেয়েটি সেখানে একটি ছোট বল ছেড়ে দিল। বলটা কিছুক্ষণ ঘুরে শেষ পর্যন্ত ১০-এ এসে থামল। যদি ১০ বা ৭—কোনোটাতেই না থামত, তাহলে টাকাটা ক্যাসিনোর হতো। কিন্তু রায়িন জিতেছে, তাই পুরো অর্থ তারই থাকল।
এভাবে তারা আরও তিন রাউন্ড খেলল। প্রতিবারই রায়িনের জয়। অবশেষে সে উদাসীন কণ্ঠে বলল, __“I’m done for today. ”
ফারহান আর কথা বাড়াল না। সে মেয়েটার বকশিস হিসেবে হাজার রুবেলের একটি বান্ডিল টেবিলের উপর রেখে দিল। তারপর দু’জন একসাথে ক্যাসিনোর গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়।
মেয়েটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রায়িনের দিকেই তাকিয়ে ছিল। রায়িনের লুক, অ্যাটিটিউড, ফ্যাশন সেন্স—সবকিছু মিলিয়ে সে প্রবলভাবে আকৃষ্ট। বিশেষ করে তার অবহেলায়। কথায় আছে না—নারী আটকে যায় অবহেলায়।
ক্যাসিনোর এলিভেটরে উঠে রুফটপের বাটন টিপে ফারহান মুচকি হেসে রায়িনের দিকে তাকিয়ে বলল, __“Manipulating.”
ফারহানের কথায় রায়িন জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে ডেভিল হাসি দিয়ে উত্তর দিল, __“I think, from now on, we’ll have to come here for the next couple of days—either the betting side or the bar side.”
বনলতা কুঞ্জ, বাংলাদেশ।
ভোরের আলো কিছুক্ষণ আগেই ফুটেছে। মুসকান রান্নার উদ্দেশ্যে কিচেন কাউন্টারের দিকে পা বাড়াতেই তার ফোনে একটি অজানা বিদেশি প্রাইভেট নাম্বার থেকে কল আসে। __“আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?” __“ওয়ালাইকুম আসসালাম, ম্যাম। আমি বিনা বলছি। আপনার ওখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি? কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে? Money or anything else?”
__“No. জিজ্ঞেস করার জন্য ধন্যবাদ।”
আর কথা না বাড়িয়ে মুসকান কল কেটে দেয়। অজানা কারণে মেয়েটার মনে রাগ জমে ওঠে। বিদেশি নাম্বার দেখে হয়তো ওর সরল মনটা বেশি কিছু আশা করে ফেলেছিল। বিনাকে ফারহানই বলেছিল মুসকানকে কল দিতে। আর ফারহানকে হয়তো আবার অন্য কেউ অনুরোধ করেছিল।
প্রায় দশ দিন পর আজ ভার্সিটি ক্যাম্পাসে পা রাখল মুসকান। ক্যাম্পাস এরিয়ায় ঢুকতেই এক যুবক এসে তার সামনে দাঁড়াল। চিন্তিত কণ্ঠে বলল, __“মায়াবিনী, are you okay?”
__“Yes, sir. I’m absolutely fine.”
__“তাহলে এতদিন ভার্সিটিতে আসনি কেন? আমি ইতালি থেকে ফিরে শুনি তুমি নাকি দশ দিন ধরে absent.”
মুসকান কিছু বলতে যাবে, তার আগেই একজন পিয়ন এসে ডেকে উঠল, __“মিস্টার জায়দার, আপনাকে ভার্সিটির ডিন ডাকছেন।”
যুবকটি মুসকানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ডিনের রুমে যায়। অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে ডিন তাকে বসতে বলেন, __“Mr. Sayan Zayder, দয়া করে আগামী দুই মাস আর কোনো লিভ নেবেন না। স্টুডেন্টদের এক্সাম সামনে। আপনি আপনার family business-এর কাজে যান, সেটা ভালো কথা—কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানের কথাও আপনাকে ভাবতে হবে। আপনি একজন professor, এই প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দ আপনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।”
সায়ান ভদ্রভাবে জবাব দেয়, __“Sorry, sir. It was an emergency. I promise, next two months I won’t take any leave.”
__“Okay. You can go now.”
সায়ান সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে গিয়ে ডেস্ক থেকে Apple-খচিত ফোনটি তুলে চেয়ারে হেলান দেয়। ফোনের ওয়ালপেপারে থাকা মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, __“তোমার জন্য আর কতদিন থাকতে হবে এখানে?”
দেড় বছর আগের কথা—সায়ান ইতালির একজন নামকরা বিজনেসম্যান। কিন্তু তার শখ শিক্ষকতা। ইতালিতে সে ছয় মাস করে দুইটি ভার্সিটিতে চাকরি করেছে। এক জায়গায় বেশিদিন মন টেকে না বলেই বাংলাদেশে চাকরির আবেদন করে। ন্যাশনাল ভার্সিটিতে আজ তার প্রথম দিন। লেকচারাররা আর প্রিন্সিপাল তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
প্রিন্সিপাল তাকে ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে নিয়ে গিয়ে বলেন, __“Good morning, my dear students. ইনি তোমাদের new English professor.”
তারপর সায়ানের দিকে তাকিয়ে বলেন, __“আপনি সবার সাথে পরিচিত হয়ে নিন, আমি আসছি।”
প্রথম দর্শনেই প্রায় সব female student-এর নজর গিয়ে পড়ে সায়ানের উপর। এত অল্প বয়সী লেকচারার, তাও আবার সুদর্শন। উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। শ্যামল গায়ের রং। চুলে স্পষ্ট কোনো professional artist-এর ছোঁয়া। সাদা শার্ট, ধূসর ব্লেজার ও ধূসর প্যান্টে পরিপাটি ফরমাল লুক। ব্লেজারের ফাঁক দিয়ে CK খচিত বেল্ট দৃশ্যমান। হাতে banded ঘড়ি।
পরিচয় নিতে নিতে সায়ান এসে দাঁড়ায় এক খয়েরি রঙা সালোয়ার-কামিজ পরা তরুণীর সামনে। তাকিয়ে সে মুহূর্তের জন্য নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠে, __“মায়াবিনী…”
মেয়েটি শব্দটা শুনে ভ্রু কুঁচকে বলে, __“অ্যা?”
সায়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নেয়, __“Nothing.”
সেই দিনের কথা মনে করে আজ সে নিজের উপর হেসে ওঠে। মনে মনে বলে, __“তুমি সেই মায়াগড়ের রাজকন্যা। মায়া-মাখা তোমার মুখ, কাজল-রাঙা মায়াবী ডাগর ডাগর অক্ষী। মায়াবনের মায়াবিনী তুমি—আমার মায়াবিনী।”
"আমার একলা আকাশ
থমকে গেছে
রাতের স্রোতে ভেসে
কিছু তোমায় ভালোবেসে
আমার দিনগুলো সব
রঙ হারিয়েছে ....! "
আজ মুসকান বিনার কল কাটার পর রায়িন আবার বনলতা কুঞ্জের ফুটেজ চেক করেছিল। কিন্তু ফলাফল আগের দিনের মতোই শূন্য—এপার্টমেন্টে কেউ ছিল না।
চলবে...