ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক সুতোয় বাঁধা

৩য় পর্ব

লেখক: jannatlu Armin

এক সুতোয় বাঁধা

পর্ব — ৩
ডাক্তার মেহের বিবিকে চেকআপ করার পরে আরহাম চৌধুরী সামনে গিয়ে বললেন,
—ওনাকে কোনো কিছু নিয়ে কোনো রকম প্রেসার দেওয়া যাবে না এবং কোনো মানসিক স্ট্রেসও দেওয়া যাবে না। ওনার কথামতো আপনারা সবাই চলবেন। কারণ, ওনার বয়স হয়েছে।
সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের কথা শুনছিল।
ডাক্তার যাওয়ার আগে আবার বলে গেলেন,
—ওনাকে খাবার-দাবার একটু ভালো করে খাওয়াবেন। খাবার ভালো করে না খাওয়ার কারণেও শরীর দুর্বল হয়ে আবার অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।
তীর্থ ডাক্তারকে বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তারপর সে এসে সোফায় বসল। তার মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো নাটক-সিনেমার ভিতরে ঢুকে গেছে।
ফারজানা বেগম রান্নাঘরে গেলেন। শাশুড়ির জন্য তাড়াতাড়ি করে স্যুপ বানালেন। সঙ্গে দুটো ডিম সিদ্ধ করলেন। হাফ-বয়েল ডিম দুটো সুন্দর করে ছিলে, মাঝখান দিয়ে কেটে একটুখানি বিট লবণ ছিটিয়ে নিয়ে গেলেন শাশুড়ির ঘরে।
কিন্তু মেহের বিবির একটাই কথা—
—আমি খামু না।
আরহাম চৌধুরী বললেন,
—আম্মা, আপনি যদি এখন না খান, আপনার শরীর আরও খারাপ করবে। আপনার কিছু হলে আমাদের কী হবে?
পাশ থেকে তিথি বলে উঠল,
—হ্যাঁ, বুড়ি সতীন। মামা ঠিক বলেছে। তোমার কিছু হলে আমি কার সঙ্গে ঝগড়া করব?
মেহের বিবি বিরক্ত হয়ে বললেন,
—আমি একবার কইছি না, আমি খামু না! তারা তাও কিল্লাইগা আমারে জোর করতাছস?
তারপর তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
—তোর পোলাডারে এতদিন নিজের হাতে পাইলা বড় করলাম, মানুষ করলাম। আর এখন আমি একটা আবদার করছি, আমার আবদারটা তোর পোলায় রাখবো না? আমি মইরা গেলে তো কারো কাছে... আল্লাহ আমারে তোর কাছে বোঝা হিসাবে রাইখা দিছে। তগো বাপটারে নিয়ে গেছে আল্লাহ। আমারে নিলো না। মানুষটা একা একা আমারে রাইখা গেল গা আল্লাহর কাছে। আর তোর কাছে আমারে বোঝা বানাইয়া দিল!
ঠিক তখনই রুমে তীর্থ ঢুকল।
—দাদি, এগুলো তুমি কী বলছ?
মেহের বিবি বললেন,
—আমি যা কইছি ঠিকই কইছি। তোরা কেউ আমার এই জীবনে মূল্য দিলি না। আমি তোর কাছে জীবনের প্রথম একটা ইচ্ছা করলাম, আর তুই আমার ইচ্ছাডারে রাখলি না। আমার মনে হয়, তোর কাছে আমি বোঝা রে!
মেহের বিবি আবার বললেন,
—আমি খামু নাই। খাওন নিয়া যাও। ও আল্লাহ, তুমি আমারে উঠায়া নাও। তুমি আমারে যে এত তাড়াতাড়ি উঠায়া নিবা, ততই আমার মঙ্গল। আমি কারো মাথার উপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।
তীর্থ কিছুক্ষণ চুপ করে দাদির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—দাদি, আমি একটা সত্যি বিয়ে করব।
মেহের বিবি অবাক হয়ে বললেন,
—কি?
তীর্থ শান্ত গলায় বলল,
—আমি তিথিকে বিয়ে করব। তবে আজই করব। আর বাইরের কেউ এই বিয়ের কথা জানবে না।
মেহের বিবি খুশি হয়ে বললেন,
—আচ্ছা, আমি রাজি আছি। কাজী সাহেবরে কল দে। আর তিথিরে একটা শাড়ি পড়াইয়া দে।
সুহানা তিথিকে একটা রুমে নিয়ে গেল। মামীকে একটা শাড়ি বের করে দিতে বলল।
সাদা রঙের জামদানি, গোল্ডেন জরি সুতার কাজ করা। শাড়িটা দেখতে খুব সুন্দর।
মামী নিজের বিয়ের ওড়নাটাও বের করলেন। তারপর তিথিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর তিথিকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসা হলো।
কাজী আসার সঙ্গে সঙ্গে সবাই বসে পড়ল।
কাজী সাহেব তীর্থ ও তিথির সামনে গিয়ে বসলেন।
—বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করি?
কাজী সাহেব কাবিনের বিষয়ে জানতে চাইলেন।
—কাবিন কত লিখব?
তীর্থ বলল,
—৫০ লক্ষ লিখেন।
কাজী সাহেব বললেন,
—কাবিন পরিশোধ না করে কিন্তু তুমি তোমার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
তীর্থ বলল,
—ঠিক আছে। অনুমতি ছাড়া ধরব না। তাও ৫০ লক্ষ লিখুন।
কাজী সাহেব বললেন,
—ঠিক আছে। তাহলে এবার বিয়ে পড়ানো শুরু করি।
কাজী সাহেব তীর্থের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আপনি কি শেখ কন্যা সুনায়রা শেখ তিথিকে ৫০ লক্ষ ১ হাজার ১ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহ করতে রাজি আছেন? যদি রাজি থাকেন, তাহলে বলুন—কবুল।
তীর্থ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কবুল। কবুল। কবুল।
এরপর কাজী সাহেব তিথির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তীর্থ চৌধুরী তন্ময় আপনাকে ৫০ লক্ষ ১ হাজার ১ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। আপনার যদি এই বিয়েতে সম্মতি থাকে, তাহলে তিনবার কবুল বলুন।
তিথি নিজের বাবার দিকে তাকাল। বাবার চোখে আশ্বাস দেখতে পেল।
তারপর তিথি একসঙ্গে তিনবার বলল,
—কবুল। কবুল। কবুল।
কাজী সাহেব বললেন,
—ইসলামি শরিয়াত অনুযায়ী আজ থেকে সুনায়রা শেখ তিথি এবং তীর্থ চৌধুরী তন্ময় স্বামী-স্ত্রী।
এরপর সবাই নবদম্পতির জন্য দোয়া করল। মোনাজাত শেষে সবাই মিষ্টিমুখ করল।
এসব করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেল।
তিথিকে তীর্থের রুমে বসিয়ে দেওয়া হলো।
তিথি চারপাশে তাকিয়ে দেখল, রুমটা খুব সুন্দর করে গোছানো। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, নিজের একটা সংসার যেন সাজানো হয়েছে।
সে ঘুরে ঘুরে রুমটা দেখছিল।
ঠিক তখনই তীর্থ রুমে ঢুকল।
তীর্থকে দেখে তিথি গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তীর্থ তিথির দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল,
—এভাবে সংসারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? জামাকাপড় চেঞ্জ করে আয়। তোকে দেখতে একদম পেত্নীর মতো লাগতেছে!
তিথি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তীর্থের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল,
—তীর্থ ভাই, আমার তো এই বাসায় কোনো জামাকাপড় নেই।
তীর্থ বলল,
—এখানে বস। আমি সিমরানের কাছ থেকে একটা জামা নিয়ে আসছি।
যাওয়ার আগে তীর্থ বলে গেল,
—কিছু ধরবি না।
তিথি খাটের এক কোণে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর তীর্থ সিমরানের কাছ থেকে একটা ড্রপ-শোল্ডার আর একটা প্লাজো নিয়ে এল।
রুমে ঢুকেই জামাকাপড়গুলো তিথির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—যা, চেঞ্জ করে আয়।
তিথি চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেল।
চেঞ্জ করে বের হয়ে এল। চুলগুলো খুলে দুই পাশে দিয়ে নিল।
বের হতেই তীর্থ তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,
—চুল বড় করবি?
তিথি আস্তে করে বলল,
—আচ্ছা, তীর্থ ভাই।
তীর্থ ফ্রেশ হয়ে নিজের রুমের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ পর সে তিথিকে ডাকল,
—এই তিথি, এইখানে আয়।
তিথি বারান্দায় গিয়ে তীর্থের পাশে দাঁড়াল।
তীর্থ কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে বলল,
—শোন, আমি শুধু দাদির চাপে পড়ে তোকে বিয়ে করেছি। না হলে তোকে জীবনেও বিয়ে করতাম না।
তিথি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তীর্থ আবার বলল,
—শোন, তুই আমার প্রতি কখনো কোনো...
তিথি আস্তে করে বলল,
—বাকিটুকু আমি বলি?
তীর্থ চুপ করে গেল।
তিথি দূরের কোনো এক জায়গার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনার প্রতি কোনো ভালোবাসার অনুভূতি রাখব না। কোনো মায়াও জন্মাতে দেব না। আপনার আর আমার নামমাত্র সম্পর্ক হবে। আপনার ওপর কখনো কোনো অধিকার দেখাব না, কোনো প্রত্যাশাও রাখব না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল,
—ঠিক বললাম তো, তীর্থ ভাই?
তীর্থ মাথা নাড়ল।
তিথি জিজ্ঞেস করল,
—তীর্থ ভাই, আপনি একা চলে যাবেন?
—হ্যাঁ।
—কোথায় যাবেন?
তীর্থ ধীরে বলল,
—অনেকদিন আগেই লন্ডনের ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম। ভিসা হয়ে গেছে। তিন দিন পর ফ্লাইট।
তিথি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তীর্থ বলল,
—আমি ভেবেছিলাম আজ বিকেলে সবাইকে বলব। কিন্তু বলার আগেই সবকিছু হয়ে গেল।
একটু থেমে সে বলল,
—তোকে বললাম, তুই কাউকে বলিস না। এই তিন দিন আমি একটা বন্ধুর বাড়িতে থাকব।
তিথি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
দুজনের মাঝখানে তখন শুধু রাতের নীরবতা।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন