৩•
আজ টানা পনেরো দিন ধরে এলিনা নিয়মিত ভার্সিটিতে ক্লাস করছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লাসের সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। কারণ, মেয়েটার স্বভাবটাই ভীষণ মিষ্টি। যে-ই তার সঙ্গে কথা বলে, অজান্তেই আপন করে ফেলে।
তবে সত্যিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এলিনা নিজের মনের ভেতর চলা ঝড়গুলো কখনো কাউকে বুঝতে দেয় না। সবার সামনে সবসময় হাসিখুশি থাকা এই মেয়েটার বুকের ভেতর কতটা কষ্ট জমে আছে, সেটা শুধু উপর থেকে তাকিয়ে কখনোই বোঝার উপায় নেই।
আজ ক্লাস শেষ হওয়ার পর আলবা বায়না ধরল— আজ সে স্পা করতে যাবে, আর সঙ্গে তার দুই বান্ধবীকেও নিয়ে যাবে। নিকো তো একেবারে সুপার গ্লু! ওরা লেডিস স্পা সেন্টারে যাবে শুনেও বেচারা তিন কন্যার পিছু নিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ওদের ভেতরে ঢুকতে পারেনি। তবে একটা শর্ত জুড়ে দিল—
— তোদের স্পা শেষ হলে আমি এসে নিয়ে যাব। তারপর তোদের যার যার বাসায় পৌঁছে দেব।
ওর তিন বান্ধবীও রাজি হয়ে গেল। ছেলেটা ভীষণ দুষ্টু, একটু ফ্লার্টি ঠিকই; কিন্তু মনের দিক থেকে অসম্ভব ভালো। নিজের মানুষদের যত্ন নিতে সে কখনো কার্পণ্য করে না।
এলিনা বেলাকে ফোন করে অনুমতি নিয়ে নিল। বেলাও হাসিমুখে অনুমতি দিয়ে বললেন,
— এনজয় ইয়োর ডে, বেবি।
তার তিন বান্ধুবী নিজেদের জন্য পুরো একটা দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। স্পায় গিয়ে তারা হেয়ার ওয়াশ, ফুল বডি ম্যাসাজ, ফেসিয়াল, ম্যানিকিউর আর পেডিকিউর করাল। দীর্ঘ সময়ের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। হাসি, আড্ডা আর দুষ্টুমিতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, কেউ টেরই পেল না।
স্পা শেষ হতেই তারা নিকোকে ফোন করতে যাবে, ঠিক তখনই জানতে পারল— ছেলেটা অনেক আগেই গাড়ি নিয়ে স্পা সেন্টারের পার্কিং এরিয়ায় অপেক্ষা করছে। তিন মেয়ে একসঙ্গে অবাক হয়ে হেসে ফেলল। সময় এখনও হাতে ছিল। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল— এবার একটা মুভি দেখা যাক।
কিন্তু সিনেমা হলে গিয়েই ঘটল নতুন বিপত্তি। মুভিটা ছিল আঠারো প্লাস। নিনাকে দেখতে এতটাই ছোট লাগে যে, সিকিউরিটি গার্ড কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চাইছিল না সে প্রাপ্তবয়স্ক। বেচারিকে শেষ পর্যন্ত নিজের আইডি কার্ড বের করে প্রমাণ করতে হলো যে, সে সত্যিই ইউনিভার্সিটির ছাত্রী।
ওদের তিনজনের হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হওয়ার উপক্রম। আলবা তো হাসতে হাসতেই বলল,
— নিনা! তোর এই বেবি ফেসটা একদিন তোকে জেলে পাঠাবে!
নিনা মুখ ফুলিয়ে উত্তর দিল,
—গড! সুন্দর হওয়াও যে একটা অভিশাপ, আজ বুঝলাম!
ওদের হাসির রোল আবারও পুরো করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। মুভি শেষ হতে হতে রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেল। নিনা, আলবা আর নিকো আগের মতোই হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত। কিন্তু এলিনার বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল।
বিয়ের আগে চাকরির কারণে তার প্রায়ই রাত হতো। কিন্তু বিয়ের পর এই প্রথম এত রাতে বাড়ি ফিরছে।সে জানে, মি. আর মিসেস মোরেত্তি তাকে কিছুই বলবেন না। লিও কিংবা লিয়ামও হয়তো কোনো প্রশ্ন করবে না। কারণ... তাদের কাছে সে গুরুত্বপূর্ণ নয়।তবু নিজের কাছেই তার খারাপ লাগছে। বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে গিয়ে এতটা রাত করে ফেরা— বিষয়টা যেন তার নিজের কাছেই ঠিক মনে হচ্ছে না।
মুভি থিয়েটারের বাইরে রাস্তার ধারে চার বন্ধু কফি হাতে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। কিন্তু এলিনা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে। ওকে অন্যমনস্ক দেখে আলবা আলতো করে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল।
— কিরে? কোথায় হারিয়ে গেছিস?
এলিনা চমকে উঠে দ্রুত হাসল।
— কোথাও না।
নিনা দুষ্টু হেসে বলল,
— আরে আলবা, বুঝছিস না? ম্যাডাম-জি তার হাজবেন্ডদের কথা ভাবছে।
এলিনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— ধুর! তোরা কী সব বলিস! তেমন কিছু না।
আলবা ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করিস না। আমরা সব বুঝি। ইউ আর মিসিং দেম!
এলিনা লজ্জায় হেসে মাথা নিচু করে বলল,
— শাট আপ, গাইজ!
ঠিক তখনই নিকো নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরে বলল,
— নিনা, আলবা! তোরা আমাদের প্রিন্সেসকে এত জ্বালাচ্ছিস কেন? ও তো বলছেই কাউকে মিস করছে না। আর করবেই বা কীভাবে? ওর সামনে যখন আমার মতো একটা হ্যান্ডসাম, চার্মিং ছেলে দাঁড়িয়ে আছে!
কথা শেষ করে সে চোখ টিপে এলিনার দিকে তাকাল।
— এম আই রাইট, প্রিন্সেস?
এলিনাও মজা করে খেলায় যোগ দিল। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
— ইয়েস, হ্যান্ডসাম। ইউ আর অলওয়েজ রাইট।
ঠিক তখনই— তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো গাড়ির হর্ন রাতের নীরবতা ভেঙে বেজে উঠলো। শব্দটা শুনে চারজনই অন্যমনস্ক হয়ে সেদিকে তাকাল। গাড়িটার দিকে চোখ পড়তেই এলিনার বুক মোচড় দিয়ে উঠল।
সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
— এ... এটা কীভাবে সম্ভব? আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠল?... উফ! এখন তো আবার রাত! রাতে তো সূর্যও ওঠে না...
কথাগুলো বললেও তার ঠোঁটের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। অজানা এক অস্বস্তিতে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। সে... সব শুনে ফেলেনি তো?আবারও গাড়ির হর্ন বাজল। এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না। গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটা তাকেই ডাকছে।
এলিনা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
— গা... গাইজ... আই হ্যাভ টু লিভ।
ঠিক তখনই নিকো আলতো করে তার হাতটা ধরে ফেলল। মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
— প্রিন্সেস! তোমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তো আমি আছিই। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। এই মজনু সবসময় তোমার সার্ভিসে রেডি!
কথাটা শেষ হতেই— জোরে শব্দ করে গাড়ির দরজা খুলে গেল। পরের মুহূর্তেই লম্বা, সুঠাম দেহের একজন পুরুষ দ্রুত পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল। তার পরনে নিখুঁত ফিটিং কালো স্যুট, গলায় সিলভার টাই, হাতে দামি ঘড়ি, মুখভর্তি গম্ভীরতা। চোখেমুখে এমন এক শীতল ব্যক্তিত্ব, যা অজান্তেই আশপাশের মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়।
সে কোনো কথা না বলে সোজা এলিনার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর এক টানে নিকোর হাত থেকে এলিনার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে, এলিনা হতভম্ব হয়ে গেল। নিকো, আলবা আর নিনাও বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
একজন সম্পূর্ণ অচেনা লোক হঠাৎ এসে তাদের বন্ধুর হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে! স্বাভাবিকভাবেই নিনা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল।
— এক্সকিউজ মি, মিস্টার! আপনার সমস্যাটা কি? আপনি আমার ফ্রেন্ডের হাত ধরেছেন কেন?
আলবাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— লিভ হার হ্যান্ড!
নিকোও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই লোকটা ধীর ভঙ্গিতে নিজের ঠোঁটের ওপর তর্জনী আঙুল রেখে শান্ত গলায় বলল,
— শশশ... আই ডোন্ট লাইক নয়েজ।
সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল।লোকটাকে দেখে ভদ্র ঘরেরই মনে হচ্ছে। বরং তার ব্যক্তিত্বটাই আলাদা। দামি ফরমাল স্যুট, নিখুঁত গ্রুমিং, প্রায় ছয় ফুট লম্বা সুঠাম দেহ— দেখলেই বোঝা যায়, হয় কোনো বড় কোম্পানির সিইও, নয়তো কোনো প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য।
এদিকে এলিনার অবস্থা আরও খারাপ। ভয়ে তার হাতের তালু ঘেমে গেছে। নিনা এবারও সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
— আপনি কে, মিস্টার?
এলিনা তাড়াহুড়ো করে বলল,
— থা... থাম তোরা... হি... হি ইজ...
লোকটা এবার চোখ রাঙিয়ে এলিনার দিকে তাকাল।
— টানা তিন মাস ধরে আমাকে দেখছ। এখনও আমাদের দুই ভাইকে চিনতে কনফিউশন হচ্ছে?
এলিনা দ্রুত মাথা নেড়ে 'না' বোঝাল। তারপর তোতলাতে তোতলাতে বলল,
— হি... হি ইজ... লি... লিওন মোরেত্তি...
এক মুহূর্তও দেরি করল না লিও। সে সোজা নিকোদের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— আই'ম হার হাসবেন্ড।
লিওর মুখ থেকে কথাটা বের হতেই নিনা, আলবা আর নিকো একসঙ্গে থমকে গেল। তিনজনের মুখেই স্পষ্ট অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল। আর এলিনা? মনে হচ্ছিল, সে যেন এই পৃথিবীতেই নেই। সে বড় বড় চোখ করে একদৃষ্টিতে লিওর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
"হাজবেন্ড..." এই শব্দটা কি সত্যিই লিও বলল?
যে মানুষটা কয়েক দিন আগেও বলেছিল—
"শি ইজ নট আওয়ার রিয়াল ওয়াইফ"
আজ সেই মানুষটাই সবার সামনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই বলছে— সে তার হাসবেন্ড। এলিনার মনে হচ্ছিল, সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে। নিনা সবার আগে নিজেকে সামলে নিল।
মুচকি হেসে বলল,
— উই আর সরি, মি. মোরেত্তি। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এলিনা আমাদের খুব ভালো বন্ধু। হঠাৎ করে একজন অচেনা মানুষ এসে ওর হাত ধরলে আমরা এমন রিয়্যাক্ট করব, এটাই স্বাভাবিক।
আলবাও বিব্রত হেসে বলল,
— আর আমাদের ভুলটা হয়েছে শুধু একটা কারণেই। এলিনা তো কখনো আপনাদের কোনো ছবি দেখায়নি। তাই আমরা চিনতেই পারিনি।
এলিনা কাছে হয়তবা তাদের দেখানোর মতো কোনো ছবিই ছিল না। যাদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, তারাই কখনো তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে চায়নি। তাই তাদের ছবি নিয়ে কখনো অযথা কারও সঙ্গে কথা বলার সাহসও হয়নি তার।
ঠিক তখনই নিকো হেসে লিওর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
— ব্রো! ইউ আর দ্য লাকিয়েস্ট ম্যান অ্যালাইভ। পুরো একটা রয়্যাল প্রিন্সেস আপনাদের কপালে জুটেছে। ইস! কয়েক মাস আগে যদি ওর সঙ্গে দেখা হতো, তাহলে আমিও একটা চান্স নেওয়ার চেষ্টা করতাম!
লিও নির্বিকার গলায় উত্তর দিল,
— শি ইজ ওল্ডার দ্যান ইউ।
নিকো হো হো করে হেসে উঠল।
— ব্রো! এটা ২০২৬ সাল। এখনো আপনি বয়স নিয়ে ভাবছেন? এজ ইজ জাস্ট এ নাম্বার!
লিও আর কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু এলিনার দিকে তাকাল। মেয়েটা এখনও ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এমনকি বিস্ময়ে তার ঠোঁটও সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। লিও শান্ত গলায় বলল,
— লিনা... লেটস গো।
আরেক দফা বজ্রপাত যেন এলিনার বুকের ভেতর আঘাত করল। "লিনা?" সে কি ঠিক শুনেছে? লিও... তাকে নিকনেম দিয়েছে? আর সেই নাম ধরে ডাকলো? কথায় আছে না, বিষে বিষে বিষক্ষয়। তাই হলো এলিনার সাথে। সে বাস্তবতা ফিরে পায়। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসল।
— গাইজ, সি ইউ টুমরো। টেক কেয়ার। বাই।
নিনা আর আলবা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।নিকোও হাসিমুখে হাত নাড়ল। পুরো সময়টাতেই লিও একবারের জন্যও এলিনার হাত ছাড়েনি। এই প্রথম...প্রথমবার লিও নিজের ইচ্ছায় তার হাত ধরেছে। তার মুঠোটা শক্ত, দৃঢ়, অদ্ভুতভাবে নিরাপদ।মুহূর্তের জন্য এলিনার মনে হলো, এই হাতটা যদি কোনোদিন সত্যিই ছেড়ে না দিত...কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের ভাবনাটাকে ঝেড়ে ফেলল।
গাড়িতে উঠে সে ইচ্ছে করেই লিওর পাশের সিটে বসল। তার বন্ধুরা এখনও দাঁড়িয়ে আছে তাই। তাদের সামনে অস্বাভাবিক কিছু দেখাতে চাইল না সে।
গাড়ি কিছুটা এগিয়ে যেতেই লিও ঠান্ডা গলায় বলল,
— ডোন্ট স্টার্ট ডে-ড্রিমিং। দ্যাট ওয়াজ জাস্ট অ্যা পাবলিক ফরমালিটি। বিকজ অন পেপার, ইউ আর আওয়ার লিগ্যাল ওয়াইফ।
এলিনা তখনও জানালার বাইরে তাকিয়ে। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি।বচোখে কোনো অভিযোগ নেই। শুধু গভীর ক্লান্তি।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— এলিনা দিবাস্বপ্ন দেখে না। কারণ তার কোনো স্বপ্নই নেই। ছোটবেলায় একটা স্বপ্ন ছিল... সেটাও আজ মমের জন্য পূরণ হতে শুরু করেছে।
একটু থেমে সে আবার বলল,
— তবে একটা বিষয় বুঝলাম না... মোরেত্তি ম্যানশনের রাজপুত্র নিজে আমাকে নিতে এসেছে!
লিও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উত্তর দিল,
— আমি তোমাকে নিতে এসেছি? নো ওয়ে।
সে রাস্তার মোড় ঘুরিয়ে আবার বলল,
— আমি ওই থিয়েটারের দ্বিতীয় তলার রেস্টুরেন্টে একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিংয়ে ছিলাম। পরে মম ফোন করে জানালো তুমি এখানেই আছো। উনিই আমাকে রিকোয়েস্ট করলেন তোমাকে নিয়ে ফিরতে। উনি বলছিলেন, এত রাতে তুমি একা ফিরলে যদি কিছু হয়, তাহলে সেটা মোরেত্তি পরিবারের জন্য ভালো দেখাবে না। হোয়াট এভার।
শেষ কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ আবারও আগের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।
— বাট ট্রাস্ট মি... আই ডোন্ট কেয়ার। আমি শুধু মমের রিকোয়েস্ট রেখেছি। এর বেশি কিছু না।
লিওর পুরো কথাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত এলিনা একবারের জন্যও তার দিকে তাকাল না। সে শুধু জানালার বাইরে ছুটে চলা শহরের আলো দেখছিল।
ছোটবেলা থেকেই সে স্বপ্ন দেখেছে সে কারও দয়া কিংবা সহানুভূতির ওপর ভর করে বাঁচবে না।তাহলে আজ কেন বারবার অন্যের বোঝা হয়ে উঠছে সে?ভাবনাটা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধতেই তার মনে ভেসে উঠল সেই দিনের কথা...যেদিন বেলা প্রথমবার তাকে মোরেত্তি ম্যানশনে নিয়ে এসেছিলেন।
------------
ফ্ল্যাশব্যাক :
এলিনা আর বেলার পরিচয় প্রায় এক মাসের। এই এক মাসে তারা প্রায় নিয়ম করেই শহরের বিভিন্ন ক্যাফেতে দেখা করেছে। প্রথম পরিচয়টা ছিল সম্পূর্ণ কাকতালীয়, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পরিচয় যেন এক অদ্ভুত আত্মিক সম্পর্কে রূপ নেয়। বেলার কোনো মেয়ে নেই। তাই প্রথম দিন থেকেই সে এলিনাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতে শুরু করে। এলিনাও ধীরে ধীরে বেলার সেই অকৃত্রিম মায়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এমনকি এলিনার গত দুই মাসের ব্যাংক লোনের কিস্তিগুলোও বেলাই পরিশোধ করেছে। যদিও এলিনা প্রথমে কোনোভাবেই সেই সাহায্য নিতে রাজি হয়নি। অনেক অনুরোধের পর, বেলার কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েই টাকাগুলো নিয়েছিল—একদিন সে সব টাকা ফিরিয়ে দেবে। দান হিসেবে নয়, ধার হিসেবেই সে সেই সাহায্য গ্রহণ করেছে। দুই সপ্তাহ আগে একটি ছোট কফিশপে চাকরিও নিয়েছে সে।
আজ এলিনার অফ-ডে। যে মানুষটা এতদিন ধরে নিঃস্বার্থভাবে তাকে আগলে রেখেছে, সেই মানুষটি যদি একদিন তাকে নিয়ে কোথাও যেতে চায়, তাহলে তাকে না বলার সাহস এলিনার ছিল না।
সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে বেলা এলিনাকে নিয়ে আসে মোরেত্তি ম্যানশনে। বিশাল লোহার অলংকৃত গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই এলিনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। চারপাশ যেন কোনো রূপকথার প্রাসাদ। দু'পাশে ছাঁটা সবুজ ঘাস, নানারঙের ফুলে ভরা বাগান, মাঝখানে সাদা মার্বেলের ঝর্ণা—যার পানি সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। সারি সারি ইতালিয়ান সাইপ্রেস গাছ পুরো পরিবেশটাকে আরও রাজকীয় করে তুলেছে।
এলিনা অবাক হয়ে চারদিকে তাকাতে থাকে। তার ছোট্ট বাসার সঙ্গে এই জায়গার তুলনা করাই যেন অন্যায়। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—এটা কোনো বাড়ি নয়, যেন সিনেমার কোনো প্রাসাদ।
বেলা মুচকি হেসে বলল,
__কী হলো, বেবি? এভাবে চারপাশ দেখছিস কেন?
এলিনা লজ্জিত হেসে বলল,
__আন্টি... এটা তো বাড়ি কম রাজপ্রাসাদ বেশি মনে হচ্ছে!
বেলা হেসে ফেলল।
__হ্যাঁ, বেবি। এটাই আমাদের বাড়ি।
আজ এখানে সারাদিন কাটাবে বলেই নিজের বাসার সব কাজ শেষ করে তারপর বেলার সঙ্গে এসেছে এলিনা। দু'জনে গল্প করতে করতে বিশাল হলরুমে প্রবেশ করল।
হলরুমটি এতটাই বড় যে একপাশে ডাইনিং এরিয়া, অন্যপাশে ড্রয়িং এরিয়া, আর আরেক পাশে আধুনিক ওপেন কিচেন। উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। পুরো ঘরজুড়ে অভিজাত অথচ উষ্ণ একটা পরিবেশ। হাসতে হাসতেই ড্রয়িং এরিয়ার দিকে এগোচ্ছিল তারা। হঠাৎই বেলার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল।এলিনাও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল।
ড্রয়িং রুমের মাঝখানে সোফায় বসে আছেন মি. মোরেত্তি। তার সামনে দাঁড়িয়ে দুই যুবক কোনো একটা ফাইল হাতে নিয়ে কথা বলছে। অবশ্য 'কথা' বললে ভুল হবে—তারা প্রায় তর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
এলিনা প্রথমবার তাদের দেখল। লিও এবং লিয়াম মোরেত্তি, একই উচ্চতা, একই চেহারা, একই চোখ, একই কণ্ঠস্বর, এমনকি শরীরের গঠন পর্যন্ত এক।প্রথমবার দেখলে পৃথিবীর কোনো মানুষই বলতে পারবে না কে লিও আর কে লিয়াম।
শুধু প্রথমবার নয়, অনেক দিনের পরিচিত মানুষও তাদের আচরণ না দেখলে ভুল করে বসে। দু'জনের কণ্ঠস্বরও প্রায় অভিন্ন। হয়তো পোশাক পরার ধরনে সামান্য পার্থক্য আছে, কিন্তু সেটা দিয়ে কি মানুষ চেনা যায়? তাদের মা-বাবা ছাড়া প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময়ে দুই ভাইকে নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে।
বেলা ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। এলিনাও নীরবে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।কাছাকাছি পৌঁছাতেই তাদের কানে ভেসে এল কথাগুলো।
লিও দৃঢ় গলায় বলছে,
__ড্যাড! ইট'স আওয়ার লাইফ। সো, আমাদের সিদ্ধান্তটা আমাদেরই নিতে দিন।
লিয়ামও সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে বলল,
__হ্যাঁ! শুধু পারমিশন দিয়ে দিন। সব কাগজপত্র রেডি। আপনাদের অনুমতির অপেক্ষায়ই সাইন করছি না।
ঠিক তখনই দুই ভাইয়ের চোখে পড়ল বেলার উপর।দু'জনেই দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এল।
লিয়াম কিছুটা অনুনয়ের সুরে বলল,
__মম! প্লিজ রাজি হয়ে যাও। আমরা এসব তো শুধু তোমাদের জন্যই করছি।
বেলা শান্ত গলায় উত্তর দিল,
__কিন্তু আমরা তো কখনো এটা চাইনি।
লিও একটু এগিয়ে এসে বলল,
__মম! তুমিই সবসময় বলতে—তোমার নাতি-নাতনি চাই। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দুইটা বেবি অ্যাডপ্ট করব।
বেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
__লিও... আমি তো এটাও বলেছি, আমার একটা মেয়ে নেই। আমাকে অন্তত একটা মেয়ে এনে দিস।
লিও একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।
__ওকে! তোমার মেয়ে লাগবে? আগে বলবে তো। তাহলে একটা মেয়েও অ্যাডপ্ট করব। প্রবলেম সলভড। ডিসকাশন ফিনিশ।
বেলার চোখমুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠল। সে কড়া গলায় বলল,
__লিও! ডোন্ট বি ওভার স্মার্ট। আমি কী বোঝাতে চেয়েছি, সেটা তোমরা খুব ভালো করেই জানো। তারপরও না বোঝার অভিনয় করছ কেন?
লিয়াম এবার এগিয়ে এসে শান্ত স্বরে বলল,
__মম... তুমি যা চাইছ, সেটা ইম্পসিবল।
বেলা কয়েক সেকেন্ড দুই ছেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
__ওকে... তার মানে তোমরা সত্যিই সারাজীবন কোনো সম্পর্কে জড়াবে না। তাই তো?
লিও আর লিয়াম দু'জনেই কোনো দ্বিধা ছাড়াই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। বেলা মৃদু নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
__সো... তাহলে আমিও তোমাদের একটা লাস্ট অফার দিতে পারি।
দুই ভাই একসঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। লিও বলল,
__বলো।
লিওর প্রশ্নের জবাবে বেলা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীর, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
__আমি গ্র্যান্ডচাইল্ড চাই। তবে তারা হবে তোমাদের বায়োলজিক্যাল চাইল্ড।
কথাটা শেষ হতেই যেন পুরো হলরুমে নীরবতা নেমে এলো। লিও আর লিয়াম দু'জনেই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাল।
লিয়াম ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে বলল,
__মানে...? আমাদের বায়োলজিক্যাল চাইল্ড? আমাদের... ডিএনএ?
ঠিক তখনই মি. মোরেত্তি ধীর পায়ে এসে বেলার পাশে দাঁড়ালেন। স্ত্রীর কাঁধে আশ্বাসের হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
__ইয়েস। তোমাদের মম ঠিক সেটাই বলতে চাইছে।
এক মিনিটের মতো পুরো হলরুম নিশ্চুপ হয়ে রইল।কেউ কোনো কথা বলছে না। এলিনা নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে। এতদিন বেলার মুখে শুনেছিল, তার দুই ছেলে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু আজ নিজের চোখে সেই জেদ, সেই অনড় সিদ্ধান্ত দেখে বিষয়টা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।
লিও দু'হাত পকেটে ঢুকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
__ওকে। আমরা রাজি।
সে একবার লিয়ামের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
__আমরা সারোগেসির মাধ্যমে বেবি নেব।
বেলার মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। বরং সে একই শান্ত স্বরে বলল,
__ওকে। কিন্তু আমারও একটা শর্ত আছে।
দুই ভাই একসঙ্গে তাকাল। বেলা ধীরে ধীরে বলল,
__আমার গ্র্যান্ডচাইল্ডদের সারোগেট মাদার আমি নিজে নির্বাচন করব।
লিওর মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে উদাসীন ভঙ্গিতে বলল,
__তুমি যাকে ইচ্ছা সিলেক্ট করো। তাতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। হোয়াটএভার।
বেলা চুপচাপ মি. মোরেত্তির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বোঝাল। তিনি স্ত্রীর ইঙ্গিত বুঝে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
__বাট... উই হ্যাভ এ সেকেন্ড কন্ডিশন।
লিয়াম বিস্মিত হয়ে বলল,
__মানে? আবার কী শর্ত?
বেলা এবার ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। কয়েক কদম হাঁটল। তারপর দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
__বেশি কিছু না... কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ।
শব্দ দুটো উচ্চারণ হতেই চারজনই একসঙ্গে বেলার দিকে তাকিয়ে রইল। এমনকি এলিনাও বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
বেলা ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
__আমি চাই, তোমরা কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করবে। এটা শুধু সমাজকে একটা বৈধ সম্পর্ক দেখানোর জন্য হবে।
সে একটু থেমে আবার বলল,
__যেহেতু সারোগেট মাদার হিসেবে একজন মেয়েই যথেষ্ট, তাই তোমরা চাইলে একই মেয়েকে দু'জন কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করতে পারো।
কথাটা শুনে লিও আর লিয়াম একে অপরের দিকে তাকালেও কেউ বাধা দিল না। বেলা আবার বলতে শুরু করল,
__এতে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না। আমি এমন একজন মেয়েকে খুঁজে বের করব, যার শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ সুস্থ। যে টাকার বিনিময়ে এই কন্ট্রাক্টে রাজি হবে।
তার কণ্ঠে এবার বাস্তবতার ছোঁয়া স্পষ্ট।
__সমাজের কাছে আমি দেখাব, আমার দুই ছেলে বিবাহিত। এরপর বেবি হবে। তারপর কন্ট্রাক্ট শেষ হলে ডিভোর্স। সবাইকে বলব—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না, তাই আলাদা হয়ে গেছে।
লিয়াম এবার কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল,
__যদি... মেয়েটা পরে মত বদলে ফেলে? যদি কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ার পরও চলে যেতে না চায়?
মি. মোরেত্তি হালকা হাসলেন।
__তোমাদের মম তো আগেই সমাধান দিয়ে দিয়েছে।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
__কন্ট্রাক্টের মধ্যে তোমাদের যত শর্ত থাকবে, সব লিখে দেবে। সে যদি রাজি থাকে, তাহলে সই করবে। এরপর পুরো সম্পর্ক সেই কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী চলবে। কাজ শেষ... কন্ট্রাক্ট শেষ... তারপর সব সম্পর্কও শেষ।
লিও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
__ওকে।
সে লিয়ামের দিকে তাকাল। দুই ভাইয়ের চোখাচোখি হলো। যেন নীরব ভাষায় দু'জনেই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে।
অবশেষে লিও বলল,
__আমরা বিষয়টা ভেবে জানাব।
এতটুকু বলেই লিও ঘুরে দাঁড়াল। লিয়ামও কোনো কথা না বলে ভাইয়ের সঙ্গে হলরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর পুরো হলরুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মি. ও মিসেস মোরেত্তি ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসলেন। এতক্ষণ বেলা নিজেকে শক্ত করে রেখেছিল। দুই ছেলের সামনে নিজের দুর্বলতা একটুও প্রকাশ করেনি। কিন্তু তারা চলে যেতেই যেন তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত শক্তি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।
সে কপালে এক হাত রেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। চোখ দুটো বন্ধ করে সোফায় হেলান দিল। তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষটা কতটা অসহায়। একজন মা হিসেবে তার একটাই স্বপ্ন—তার সন্তানদের একটা পরিপূর্ণ পরিবার হোক। অথচ সেই স্বপ্নই যেন প্রতিদিন তার হাতের মুঠো থেকে পিছলে যাচ্ছে।
এলিনা কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বেলার পাশে গিয়ে বসল। মমতাভরা কণ্ঠে বেলার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল,
__আন্টি... কোনো চিন্তা করবেন না। গড সবকিছু ঠিক করে দেবেন।
বেলা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখের কোণে চিকচিক করছে জমে থাকা পানি। হঠাৎই সে এমন একটা কথা বলে বসল, যার জন্য এলিনা একদমই প্রস্তুত ছিল না।
__বিয়ে করবি... আমার ছেলেদের?
কথাটা শুনে এলিনার পুরো শরীর যেন জমে গেল।তার ঠোঁট শুকিয়ে এলো। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথাই বলতে পারল না। তার মাথায় যেন একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। সে? মোরেত্তি পরিবারের দুই ছেলেকে বিয়ে করবে? এটা কি আদৌ সম্ভব? নাকি সে ভুল শুনেছে?
বেলা এলিনার নীরবতা দেখে আবার বলল,
__বেবি... তোকে আমি যতটা বিশ্বাস করি, ততটা বিশ্বাস আমি অন্য কাউকে করতে পারব না।
সে আলতো করে এলিনার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,
__এত অল্প সময়ে তোর মতো একটা মেয়ে কোথায় পাবো বল? তুই ভালো, সৎ, দায়িত্বশীল... আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর মনটা খুব সুন্দর। আমার বিশ্বাস, তোর চেয়ে ভালো মেয়ে আমি আমার দুই ছেলের জন্য কোথাও খুঁজে পাব না।
এলিনা অসহায় হাসল। তার গলায় কথা আটকে যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
__আন্টি... আপনি কি বলছেন, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না...
ঠিক তখনই মি. মোরেত্তি গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
__বেলা!
তার কণ্ঠে হালকা ধমকের সুর ছিল। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
__ডোন্ট বি সেলফিশ।
তারপর তিনি এলিনার দিকে তাকালেন। চোখে ছিল গভীর মমতা।
__এলিনা মেয়েটা সারা জীবন শুধু কষ্টই পেয়েছে। তুমি কি এখন আবার ওকে আরেকটা আগুনের মধ্যে ঠেলে দিতে চাও?
কথাটা শুনে এলিনা দ্রুত মাথা নাড়ল। সে তাড়াতাড়ি বলল,
__না না, আঙ্কেল! আন্টি সেলফিশ হচ্ছেন না।
সে জোর করে একটা ছোট্ট হাসি ফুটিয়ে বলল,
__উনি তো আমাকে একটা কাজের অফার করছেন... টাকার অফার করছেন। যেটার এখন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। উনি আমার ভালোর কথা ভেবেই বলছেন।
বেলার আর নিজেকে সামলে রাখা সম্ভব হলো না।তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।কাঁপা গলায় সে বলল,
__আই'ম সরি, মাই ডিয়ার...
সে এলিনার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
__আমি সত্যিই স্বার্থপরের মতো কথা বলে ফেলেছি। নিজের ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গিয়ে তোর ভবিষ্যতের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দে, বেবি...
এলিনার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে জীবনে খুব কম মানুষকেই নিজের জন্য কাঁদতে দেখেছে। আর আজ... এই মহিলাটা তার জন্য কাঁদছে। এলিনা মুচকি হেসে বেলার চোখের পানি মুছে দিল।
__তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাইছো, আন্টি?
সে মাথা নাড়ল।
__তুমি কোনো ভুল কথা বলোনি। আমি... আমি একটু সময় নিয়ে ভাবতে চাই। তারপর... যদি আমি রাজি হই, তখন তুমি আমার মেডিকেল চেকআপ করিয়ো।
বেলা আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলাতে পারল না।সে এলিনাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। এমনভাবে, যেন বহুদিন হারিয়ে যাওয়া নিজের মেয়েকে ফিরে পেয়েছে। মি. মোরেত্তি আবেগভরা চোখে তাদের দু'জনকে দেখছিলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
__এলিনা বেবি... আমি চাই আমার ছেলেরা সুখে থাকুক। কিন্তু সেই সুখ যদি অন্য একজন মানুষের জীবন নষ্ট করে আসে, তাহলে আমি সেই সুখ কোনোদিনও চাইব না।
এলিনা সম্মানের সঙ্গে মাথা নাড়ল।বেলা কাঁদতে কাঁদতেই এলিনার চুলগুলো কানের পাশে গুছিয়ে দিল। তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল,
__বেবি... তুই যদি রাজি হোস, আই প্রমিস... আমি তোকে একটা বেটার ফিউচার দেব।
এলিনা খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল,
__আমার বাবার রেখে যাওয়া ঋণগুলো শোধ হয়ে গেলেই হবে... আমার আর কিছু লাগবে না।
বেলা মাথা নাড়ল। তার কান্না যেন আরও বেড়ে গেল।
__না...
সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
__তোর একটা স্বপ্ন আছে, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আমি পূরণ করব।
এলিনা হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বেলা নিজের চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তারপর আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে, বুকের ওপর হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
__মি ইসাবেলা মোরেত্তি প্রমিসেস টু হার গড...
সে আবার এলিনার দিকে তাকাল। চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
__ইউ উইল বি মাই ডটার-ইন-ল।
এক মুহূর্ত থেমে সে মৃদু হাসল।
__নট ইভেন ইন কন্ট্রাক্ট...
তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
__ইন রিয়েল!
চলবে.....