ফন্ট সাইজ:
থিম:
দ্য কন্ট্রাক্ট অব ফেইট

পর্ব-৬

লেখক: ফারহানা ইসলাম

৬•

বেলা রেগে আছে। কারণ তারা যে রেস্টুরেন্টে এসেছে, সেই রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেই তার চোখে পড়ে তার দুই ছেলে এবং ছেলের বউকে। বেলা সঙ্গে সঙ্গে তাদের দিকে এগিয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত লিয়াম বা লিও—কেউই নিজেদের মা-বাবাকে খেয়াল করেনি।
বেলা গিয়ে লিয়ামের পিঠে হাত রাখে। কারণ সে নিজের ছেলের কাঁধে হাত রাখতে পারে না। হাত অতদূর পৌঁছায় না। তার দুই ছেলে দুজনেই ছয় ফুটের ওপরে, আর সে মাত্র চার ফুট আট ইঞ্চি। এমনকি এলিনাও তার থেকে বেশ খানিকটা লম্বা।
লিয়াম, মায়ের হাতের স্পর্শ পেয়ে বলে ওঠে,
__ইয়েশ!
বলেই পিছনে ঘুরে তাকায়। সামনে নিজের মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে লিয়ামের মুখে খুশির ছাপ ফুটে ওঠে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মায়ের রণমূর্তি দেখে মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। সে ঢোক গিলে পাশ থেকে বাম হাত দিয়ে লিওকে খোঁচা মারে।
লিও বিরক্ত হয়ে বলে,
__হোয়াট হ্যাপেন্ড?
বলেই পিছনে ঘুরে তাকায়। লিয়ামের দৃষ্টি অনুসরণ করে বেলার দিকে তাকাতেই তার মুখও শুকিয়ে যায়। সে অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠে,
__ম..মম!
এলিনা তখনো লিওর বুকে আঁথারে খেয়ে শুয়ে ছিল। কিন্তু লিওর মুখ থেকে ‘মম’ শব্দটা কানে যেতেই সে চোখ খুলে তাকায়। সামনে বেলাকে দেখেই এলিনা এক লাফে লিওর কোল থেকে নেমে যায়। মুখে সঙ্গে সঙ্গে খুশির ছাপ ফুটে ওঠে। সে বেলাকে জড়িয়ে ধরার জন্য এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু বেলা হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দেয়। এলিনা থেমে যায়। মুহূর্তেই তার খুশি মুখটা বেজার হয়ে যায়।
বেলা এবার নীরবতা কাটিয়ে বলে ওঠে,
__তোদের জ্বালায় কি আমরা একটু রোমান্টিক ডেটেও আসতে পারবো না? রেস্টুরেন্টের কি অভাব পড়েছিল যে তোদের এই রেস্টুরেন্টেই মরতে হলো?
বেলার কথা শুনে লিয়াম তোতলানো শুরু করে দেয়,
__মম! একচুয়ালি! তোমার.. তোমার মেয়ের শরীরটা খারাপ করছিল। ও ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেনি। ওকে খাওয়ানো প্রয়োজন ছিল। এই রেস্টুরেন্টটা থানার সবচেয়ে কাছের এবং ভালো মানের ছিল। তাই আমরা এখানে এসেছি।
লিও সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
__তোমরা তোমাদের রোমান্টিক ডেট ইনজয় করো, তোমাদের বাধা দিয়েছে কে? আমরা অন্য টেবিল বুক করে নিচ্ছি।
বেলা এলিনার দিকে তাকিয়ে বলে,
__রাইট আইডিয়া! তোরা দুই ভাই আমার চোখের সামনে থেকে সর। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি।
দুই ভাই মায়ের কথায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। লিও একটু আমতা আমতা করে বলে,
__মম! তুমি রোমান্টিক ডেট ইনজয় করবে তোমার হাজবেন্ডের সাথে। সেখানে আমাদের ওয়াইফকে টানছো কেন?
বেলা এলিনার হাত ধরে বলে,
__কারণ! আমার এখন মনে হচ্ছে তোদের জন্মের পর আমার বাচ্চা দুটোকে এক্সচেঞ্জ করে ডক্টর বা নার্স তোদেরকে আমার বাচ্চা হিসেবে ধরিয়ে দিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই মি. মোরেত্তি সেখানে এসে হাজির হন। তিনি বেলার কথায় মাথা নেড়ে বলে ওঠেন,
__বেলা! আমি তোমার সাথে সহমত। আমাদের আসল সন্তান দুটোকে খোঁজা লাগবে। এরা আমাদের সন্তান হতেই পারে না।
দুই ভাই হা করে নিজেদের মা-বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। লিয়াম অবশেষে বলে,
__ডিএনএ টেস্ট করা যাক।  
বেলা মুখ বুজে হাসে। তবুও নিজের হাসিটাকে কন্ট্রোল করে বলে,
__ওসব ডিএনএ টেস্ট করে কি হবে? ৩০টা বছর ধরে তো তোদের পালছি। তাও নিজেদের মতো বানাতে পারলাম না তোদের। আফসোস।
লিও এবার বলে,
__মম! ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা না বলে ডিরেক্ট বলো কি বলতে চাও? লিনার শরীরটা এমনিতেই খারাপ।
মি. মোরেত্তি বেলার হাত ধরে রেস্টুরেন্টের ড্যান্স ফ্লোরের দিকে চলে যান। যাওয়ার সময় পিছনে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন,
__আমাদের সন্তান হলে আজ প্রমাণ করে দেও।
লিয়াম সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__শি ইজ সিক।
বেলা চোখে টিপ দিয়ে মুচকি হাসে।
__শি ইজ মাই বেবি গার্ল। স্টং লাইক হার মম। সে পারবে পাঁচ মিনিট নিজেকে সামলে নিতে। কিন্তু তোদের সাহস নেই, সেই সত্যিটা বল।
বেলার কথায় দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকায়। লিও কোনো কথা না বলে ডিরেক্ট একশন করে। সে এলিনার হাত ধরে ড্যান্স ফ্লোরে যায়। লিয়ামও তাদের জয়েন করে।
মুহূর্তের মধ্যেই মিউজিকের তালে দুই ভাই তাদের স্ত্রীকে নিয়ে সুন্দর কলিব্রেশন ডান্স শুরু করে। কিছুক্ষণ পর এলিনা, লিয়াম, লিও-দের নাচ শুরু হতে বেলা ও আলেসান্দ্রো থেমে যায়। তারা দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের সন্তানদের হাসিখুশি মুখ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বেলা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার ছেলেদের দিকে। সে শুধু চায়, তার ছেলেরা যেন আবার আগের মতো হাসিখুশি হয়ে যায়। যেন জীবনের কোনো কষ্ট তাদের মুখের সেই হাসিটাকে কেড়ে নিতে না পারে। মিউজিক যতক্ষণ চলে, ততক্ষণ তিনজনই হাসিখুশিভাবে ডান্স করে। এলিনার মুখেও তখন মিষ্টি একটা হাসি লেগে আছে। বেলা এমন দৃশ্য দেখে নিজের চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারে না। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার গালে। এগুলো দুঃখের অশ্রু নয়। এগুলো খুশির অশ্রু। নিজের দুই ছেলেকে এতদিন পর এভাবে হাসতে দেখে একজন মায়ের হৃদয় যেন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গান শেষে অন্যান্য বাকি সব কাপলের মতো তারাও থেমে যায়। লিয়াম, এলিনা এবং লিও—তিনজনই হাঁপাচ্ছে। তবুও দুই ভাই এলিনাকে ছাড়েনি। মেয়েটার শরীর এমনিতেই দুর্বল। কিন্তু দুই পাশে দুই হাজবেন্ডের সাপোর্টে সে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বেলা নিজের চোখের পানি মুছে তাদের কাছে এগিয়ে যায়।
__অর্ডার টেবিলে চলে এসেছে। চলো খাবে।
---
মোরেত্তি ম্যানসনের ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে এলিনা। রাতের ঠান্ডা বাতাস তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিছুক্ষণ আগেও যে ছেলেগুলোর সঙ্গে সে এতটা হাসিখুশি সময় কাটালো, যে ছেলেগুলো তাকে এতটা কেয়ার করলো, যে ছেলেগুলো তাকে পৃথিবীর সামনে নিজেদের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিল— তাদের কথাই ভাবছে এলিনা।
অজান্তেই তার মনে পড়ে যায় সেই দিনের কথা।যেদিন প্রথম তারা জানতে পেরেছিল, এলিনার সঙ্গে তাদের বিয়ে হবে। সেদিন তাদের রিয়াকশন কতটা ভয়ানক ছিল!
------
ফ্ল্যাশব্যাক :
মোরেত্তি মেনশনের ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছে। ঘরের পরিবেশটা ভারী হয়ে আছে। এলিনা নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের হাত কচলাচ্ছে। তার আঙুলগুলো বারবার একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে ভীষণ অস্বস্তিতে আছে।
লিয়াম রাগে ফুঁসছে। তবুও অদ্ভুতভাবে নিজেকে সামলে রেখেছে। সে কিছু বলছে না। কিন্তু লিও তো ঠোঁটকাটা। তাই ওর মুখে কোনো কিছুই আটকায় না। লিও বেলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
__মম! তুমি কিভাবে এইসব মেয়ের উপর বিলিভ করতে পারো? আমরা যেদিন এসব নিয়ে কথা বলছিলাম, ও সেদিন এখানে উপস্থিত ছিল। তাই টাকার জন্য ও সম্পূর্ণটা করছে।
লিওর কথায় এলিনা আরও মাথা নিচু করে ফেলে। কথাগুলো যেন সরাসরি তার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছে। বেলাও এবার উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে,
__তোমরা বা কোথায় রিয়েল বিয়ে করছো? আমাদের কথা অনুযায়ী তো এটাই ফিক্সড ছিল যে টাকার জন্য বিয়ে এবং সারোগাসির জন্য রাজি হবে তাকেই সিলেক্ট করা হবে।
লিও বা লিয়াম কেন জানি এলিনাকে সেই মেয়ে হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। তাদের চোখেমুখে বিরক্তি আর অস্বস্তি স্পষ্ট। লিও আবার বলে,
__মম! ইতালিতে মেয়ের অভাব পড়েনি। আমাদের সিদ্ধান্তেরও একটু মূল্য দাও।
বেলা এবার হেসে ওঠে। তার হাসিতে যেন ছেলেদের কথার কোনো গুরুত্বই নেই।
__তোমাদেরকে আগেই বলা হয়েছিল, মেয়ে আমরা সিলেক্ট করবো। এখন কোনো এক্সকিউজ হবে না।
বেলা এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে দাঁড়ায়। তার দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলে,
__এলিনাই হবে তোমাদের ওয়াইফ।
কথাটা বলেই বেলা থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। এলিনা বিস্ময়ে মাথা তুলে তাকায়। তার বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিকভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে।
কিন্তু লিও যেন এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। হঠাৎ রাগে টি-টেবিলের ওপর থাকা ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে নিয়ে মেঝের দিকে ছুড়ে মারে। বিকট শব্দে ভাসটা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কেউ কিছু বলার আগেই লিও সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। তার পেছন পেছন লিয়ামও চলে যায়। এলিনা স্থির হয়ে বসে থাকে। চোখের সামনে তখনো ভাঙা ভাসের টুকরোগুলো পড়ে আছে।
--------
সেই দিনের ভয়ংকর মুখগুলো আর আজকের এই যত্নশীল মানুষ দুটো—দুটো যেন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। এলিনা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে। তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—
"কীভাবে এতটা বদলে গেল তারা?"
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব-৬ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন