৬•
মি. নাভিদ শাহরিয়ারের বাড়িতে পা রাখতেই তিনি যেন আনন্দে অবাক হয়ে গেলেন। তার সবচেয়ে আদরের ভাগ্নি জিয়া এসেছে, সঙ্গে এসেছে তার বন্ধু-বান্ধবও। জিয়াকে তিনি নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন। বরং জিয়ার নামটাও তিনিই রেখেছিলেন। অনেকদিন পর সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে পুরো বাড়িটা হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠল। গল্প, আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় দেখতে দেখতেই দিনটা কেটে গেল।
পরদিন সকালেই তাদের গন্তব্য হলো বুসানের বিখ্যাত হাউনদে বিচ।নীল সমুদ্র, সোনালি বালুকাবেলা আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। সারাদিন সবাই খালি পায়ে সমুদ্রের ধারে দৌড়াল, ঢেউয়ের সঙ্গে খেলল, অসংখ্য ছবি তুলল, একে অপরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করল।
ইয়াশও তাদের সঙ্গে এসেছিল। তবে সে বরাবরের মতোই একটু আলাদা। বন্ধুদের কোলাহল থেকে দূরে সমুদ্রের ধারে একটা নারকেল গাছের নিচে হেলান দিয়ে শান্ত মনে নিজের ড্রয়িং বুক খুলে বসে রইল। একের পর এক স্কেচ আঁকতে লাগল।
ছেলেটা সত্যিই অসাধারণ প্রতিভাবান। পড়াশোনা, ছবি আঁকা, রান্না—প্রায় সবকিছুতেই তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। শুধু... মেয়েদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, স্মার্টভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা—এই কয়েকটা কাজই যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বিষয়।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। হাউনদে বিচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর একটি হলো স্কাই ক্যাপসুল। এতটাই জনপ্রিয় যে এতে উঠতে হলে অন্তত দুই দিন আগে বুকিং দিতে হয়।
জিয়া আর তার বন্ধুরা যেহেতু আগেই পুরো ট্যুরের পরিকল্পনা করেছিল, তাই আগেভাগেই দুটি ক্যাপসুল বুক করে রেখেছিল। প্রতিটি ক্যাপসুলে চারজন করে বসতে পারে। প্রথম ক্যাপসুলে বসল না-বি, সিওজুন, জিয়া আর ইয়াশ। দ্বিতীয়টায় বসল মিনজে, বোরা, তাইজুন।
ইয়াশের কাছে সারাদিনটা মোটামুটি ভালোই কেটেছিল। কারণ বেশিরভাগ সময় সে একা একাই ছিল। কিন্তু এখন... এটা এক ঘণ্টার রোমান্টিক স্কাই ক্যাপসুল জার্নি। তার পাশেই বসে আছে জিয়া। আর সামনে বসে আছে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা।ভাবতেই ছেলেটার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ঠান্ডা আবহাওয়া হওয়া সত্ত্বেও তার কপালে ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা জমে উঠল। সে মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবছে—
"হে আল্লাহ... আজ যেন কোনো ভুল না করে ফেলি। যদি ভুল করে বসি, জিয়া হয়তো আমাকে এই ক্যাপসুল থেকেই নিচে ফেলে দেবে!"
ধীরে ধীরে ক্যাপসুলটি মিপো স্টেশন ছেড়ে চিয়ংসাপো স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলল। এক পাশে বিশাল নীল সমুদ্র। অন্য পাশে পাহাড়ের সারি। তার ওপর সন্ধ্যার ধূসর আলো... সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর এক দৃশ্য। এদিকে না-বি আর সিওজুন নিজেদের গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে আশপাশের পৃথিবীটাই যেন ভুলে গেছে।
নাবি ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে সিওজুনের হাতের ওপর রাখল। সিওজুন হালকা কেঁপে উঠল।এতদিন ধরে যে মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিল... আজ সেটাই সত্যি হয়ে গেল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নাবির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল। দুজনের মুখেই লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
সেই দৃশ্যটা দেখে জিয়ার বুকের ভেতর হালকা একটা শূন্যতা তৈরি হলো। তারও হঠাৎ করে খুব ইচ্ছে হলো... একবার... শুধু একবার... ইয়াশের হাতটা ধরতে। অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত সাহস করে সে ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে ইয়াশের হাতের ওপর রাখল।
পরের মুহূর্তেই— ইয়াশ যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মানুষের মতো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। পুরো ক্যাপসুলটাই দুলে উঠল।
নাবি বিরক্ত হয়ে বলল,
__হোয়াট হ্যাপেন্ড, ইয়াশ? নিজের জায়গায় বসো। এভাবে লাফাচ্ছো কেন?
ইয়াশ তো নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না কী বলবে।লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তিতে মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত মাথায় যেটা প্রথম এল, সেটাই বলে ফেলল—
__আমি... আমি কারেন্টে শক খেয়েছি... তাই লাফ দিয়ে উঠেছি।
কথাটা শুনেই নাবি আর সিওজুন ভয় পেয়ে একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
__কী! কারেন্ট?
তাদের মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। এমনিতেই ক্যাপসুলটা বিদ্যুতের সাহায্যেই চলছিল। জিয়ার রাগ এবার সত্যিই মাথায় উঠে গেল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
__সিওজুন ওপ্পা আর নাবি, তোরা বস। ওর কোনো কারেন্ট লাগেনি। আমি শুধু ওর হাত ধরেছিলাম... আমার একটু আনকমফোর্টেবল লাগছিল, তাই।
কথাটা শেষ হতেই পুরো ক্যাপসুলে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এল। ইয়াশের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।সে এতক্ষণ ভেবেছিল— হয়তো ভুলবশত জিয়ার হাত তার হাতে লেগে গিয়েছিল। কিন্তু... জিয়া ইচ্ছে করেই তার হাত ধরেছিল! ভাবতেই ছেলেটার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেল।
সে আস্তে করে আবার নিজের জায়গায় বসে পড়ল।কিন্তু আর একটা কথাও বলতে পারল না। অন্যদিকে... জিয়ার মনটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
এরপর বন্ধুরা অনেক গল্প করল, হাসল, ছবি তুলল।কিন্তু জিয়া আর কোনো কথারই উত্তর দিল না। তার মুখের অভিমানটা কেউ না বুঝলেও... ইয়াশ ঠিকই বুঝতে পারছিল। কিন্তু কীভাবে ক্ষমা চাইবে... সেটাই সে বুঝে উঠতে পারছিল না।
মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
"আমি কি আবার কোনো ভুল করে ফেললাম?"
তিন দিনের ট্রিপের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরদিন খুব সকালেই জিয়া নিজের লাগেজ গুছিয়ে নিচে নেমে এল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজই সিউলে ফিরে যাবে।
ঠিক তখনই তার ফুপি ডাক দিলেন,
__জিয়া! মা! এত সকালে লাগেজ নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
জিয়া শান্ত গলায় বলল,
__আমি ফ্লাইটের টিকিট কেটেছি। আজই বাড়ি ফিরে যাব। মাকে খুব মিস করছি।
মিসেস শাহরিয়ার মেয়েটার কাছে এগিয়ে এসে স্নেহভরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
__আমিও তো তোর আরেকটা মা। আমার কাছে কয়েকটা দিন থাকতে পারিস না?
জিয়া মুচকি হেসে বলল,
__পিপি, এখন তো তোমার ছেলে তোমার কাছে আছে। ও যখন আবার আমাদের বাড়িতে চলে যাবে, তখন আমি এসে অনেকদিন তোমার সঙ্গে থাকব।
মিসেস শাহরিয়ার অভিজ্ঞ চোখে বুঝে গেলেন—সমস্যাটা অন্য কোথাও। তিনি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
__মা... ইয়াশের সঙ্গে কিছু হয়েছে?
জিয়া সঙ্গে সঙ্গে নাক ফুলিয়ে বলল,
__ওই গাধার কথা জিজ্ঞেসই করো না। ওর সঙ্গে আমার কথা নেই।
মিসেস শাহরিয়ার হেসে ফেললেন। মেয়েটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন,
__আচ্ছা... তাহলে আমরাও ওকে ইগনোর করব। তুই টিকিট ক্যানসেল করে দে। আজ সারাদিন তুই শুধু আমার সঙ্গে থাকবি। আর তোর বন্ধুরা ঘুরুক।
জিয়া কিছু বলল না। তবে তার অভিমানী মুখটা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল— রাগটা আসলে ইয়াশের ওপরই।
মিসেস কিম অরিনের কথা শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারল না জিয়া। যতই রাগ করে থাকুক না কেন, নিজের প্রিয় পিপির অনুরোধ সে কখনোই ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ফ্লাইটের টিকিটটা ক্যানসেল করে দিল।
আসলে জিয়া ভীষণ রাগচটা আর জেদি স্বভাবের মেয়ে। খুব সহজেই রেগে যায়, আবার ভালোবাসার মানুষের সামান্য আদরেই সেই রাগ বরফের মতো গলে যায়।
জিয়ার বন্ধুরা সারাদিন হাউনদে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াল। কেউ শপিং করল, কেউ বিচে সময় কাটাল, কেউ আবার নতুন নতুন ক্যাফে ঘুরে দেখল।
আর জিয়া?
সে সারাটা দিন নিজের পিপির সঙ্গেই কাটাল। কখনো গল্প করল, কখনো রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্নায় সাহায্য করল, আবার কখনো পুরোনো দিনের গল্প শুনে হেসে উঠল।
অন্যদিকে...
ইয়াশ নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে সারাদিন প্রায় বেরই হলো না। মাঝে কয়েকবার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েও আবার ফিরে গেল। তার মাথায় বারবার ঘুরছিল সেই স্কাই ক্যাপসুলের ঘটনাটা।
সে কি সত্যিই জিয়াকে কষ্ট দিয়েছে? এই প্রশ্নটার উত্তর সে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না।বিকেলের দিকে...
মিসেস অরিনের বেডরুমে বসে আছে জিয়া। বিছানার ওপর ছড়িয়ে রাখা পুরোনো ফটো অ্যালবামগুলো একের পর এক উল্টে-পাল্টে দেখছে সে। সেপিয়া রঙের পুরোনো ছবিগুলো যেন একটা একটা স্মৃতি হয়ে ধরা দিচ্ছিল তার চোখের সামনে।
জিয়া এখনো পর্যন্ত কখনো বাংলাদেশে যায়নি। কিন্তু মিসেস অরিন বিয়ের পর দুই-তিনবার গিয়েছিলেন। ইয়াশও ছোটবেলায় একবার গিয়েছিল। তখন তার বয়স এতটাই কম ছিল যে, সেই ভ্রমণের কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই।
অ্যালবামের পাতায় পাতায় বাংলাদেশের নদী, গ্রাম, সবুজ মাঠ, আত্মীয়স্বজন আর পারিবারিক অনুষ্ঠানের অসংখ্য ছবি। সবকিছুই ভীষণ আগ্রহ নিয়ে দেখছিল জিয়া।
ঠিক তখনই মিসেস অরিন হালকা হেসে বললেন,
__কী দেখছিস এত মনোযোগ দিয়ে?
জিয়া ছবি থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
__পিপি... আমিও ভাবতাম, আমার কোরিয়ান পিপি কী দেখে আমার মামার প্রেমে পড়ল! এখন বুঝলাম।
একটা ছবি সামনে ধরে সে বিস্মিত গলায় বলল,
__ওয়াও! আমার মামাটা কত হ্যান্ডসাম ছিল!
মিসেস অরিন লজ্জা পেয়ে মুচকি হেসে বললেন,
__কেন রে? তোর পিপি বুঝি সুন্দর ছিল না?
জিয়া নাটকীয়ভাবে চোখ বড় বড় করে বলল,
__ছিল? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই "ছিল"?
তারপর মিসেস অরিনের দুই গাল আলতো করে ধরে বলল,
__তোমাকে এখনো আবার বিয়ে দেওয়া যাবে। কে বলবে তোমার ইয়াশের মতো একটা দামড়া ছেলে আছে!
জিয়ার কথা শুনে মিসেস অরিন হেসে ফেললেন।
জিয়ার দৃষ্টি এবার গিয়ে আটকে গেল তাদের বিয়ের ছবিতে।
সাদা ওয়েডিং গাউনে মিসেস অরিন যেন কোনো রূপকথার রাজকন্যা। আর তার পাশে কালো স্যুট পরা নাভিদ শাহরিয়ারকে যেন একদম সিনেমার নায়ক লাগছে।
জিয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল,
__ওয়াও! পিপি! তোমাদের তো পুরো কে-ড্রামা কাপল লাগছিল। বাই দ্য ওয়ে... তোমার গাউনটা হেব্বি ছিল!
মিসেস অরিন ভুরু তুলে দুষ্টু হেসে বললেন,
__কথা ঘুরিয়ে না বলে সোজাসুজি বল। যদি গাউনটা পরতে চাস, তাহলে পরতে পারবি। আমি এখনো খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
জিয়ার মুখে মুহূর্তেই বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল।এতক্ষণ ধরে এত প্রশংসা করার আসল উদ্দেশ্যটাই ছিল এই গাউনটা পরা। মিসেস অরিন আলমারির ভেতর থেকে অত্যন্ত যত্ন করে সংরক্ষণ করা সাদা ওয়েডিং গাউনটা বের করে দিলেন।
ড্রেসটা দেখেই জিয়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
__ওয়াও...
তার মুখ থেকে অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে গাউনটা পরে নিল। মিসেস অরিন নিজের হাতে তার চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিলেন। খুব হালকা মেকআপ করে দিলেন। ছোট্ট মুক্তোর দুল আর একটা চিকন নেকলেস পরিয়ে দিলেন।
হোয়াইট ওয়েডিং গাউন... হালকা জুয়েলারি... নরম মেকআপ... আর মুখভরা হাসি... জিয়াকে যেন সত্যিই স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো পরীর মতো লাগছিল।
মেয়েদের হয়তো সাজতে আলাদা কোনো কারণ লাগে না। সাজাটাই যেন তাদের এক অদ্ভুত ভালোবাসা। জিয়াও ব্যতিক্রম নয়। একটার পর একটা পোজ... হাসি... ঘুরে দাঁড়ানো... জানালার পাশে... বারান্দায়.. পুরো বাড়ি ঘুরে প্রায় হাজারখানেক ছবি তুলে ফেলল সে।
মিসেস অরিন হেসে বললেন,
__এত ছবি দিয়ে কী করবি?
জিয়া দুষ্টু হেসে উত্তর দিল,
__দু-তিনটা আপলোড করব। বাকিগুলো শুধু আমার কাছে থাকবে।
মেয়েদের ছবি তোলাও তো একটা আলাদা শখ!
শেষ পর্যন্ত অনেক ছবি থেকে বেছে বেছে মাত্র তিনটা ছবি নিজের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে আপলোড করল জিয়া। ছবি পোস্ট করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের বন্যা বয়ে গেল।
কমেন্ট বক্সে সবাই একটাই প্রশ্ন করতে শুরু করল—
"জিয়া কি প্রি-ওয়েডিং শুট করছে?"
"সে কি রিলেশনে আছে?"
"বিয়ের খবর কবে দেবে?"
"বর কে?"
...
এই হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যেই ছিল আরেকজন নীরব দর্শক— ইয়াশ। জিয়া জানেই না যে, ইয়াশেরও একটা ইনস্টাগ্রাম আইডি আছে। ছেলেটা অনেক আগেই জিয়ার অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট ফলো করেছিল। তার আইডিতে কোনো প্রোফাইল ছবি নেই। কোনো পোস্টও নেই।
তাই জিয়া কখনো বুঝতেই পারেনি, সেই অচেনা আইডিটার পেছনে লুকিয়ে আছে ইয়াশ। নিজের মায়ের বিয়ের গাউন পরে জিয়ার সেই ছবিগুলো চোখে পড়তেই ছেলেটা সম্পূর্ণ স্থির হয়ে গেল। তার আঙুল স্ক্রিনের ওপর থেমে রইল। নিঃশ্বাস যেন বুকের মাঝখানেই আটকে গেল। সে বারবার একই ছবিগুলো দেখছিল... মনে হচ্ছিল, চোখ সরালেই বুঝি স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। তার শান্ত হৃদয়ের ভেতর যেন হঠাৎ করেই তুমুল এক ঝড়ের সৃষ্টি হলো।
তিন দিন পর জিয়া আর তার বন্ধুরা সিউলে ফিরে এল। তবে ইয়াশ থেকে গেল আরও দু-এক দিন। অনেক দিন পর বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে সে। তার সিদ্ধান্ত ছিল, যেদিন ভার্সিটি খুলবে, সেদিনই সোজা বুসান থেকে ভার্সিটিতে চলে যাবে।
যেমন ভাবা, তেমনই কাজ।
ভার্সিটি খোলার প্রথম দিন সকালেই ইয়াশ ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেল।
অন্যদিকে জিয়া বাইরে থেকে যতই রাগ দেখাক না কেন, এই কয়েক দিনে বুঝে গেছে—ইয়াশকে না দেখলে তার দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে। তাই আজ অনেক দিন পর ইয়াশকে দেখবে ভেবেই সে একটু বেশি যত্ন নিয়ে তৈরি হয়ে ভার্সিটিতে এসেছে।
ক্যাম্পাসে পা রাখতেই চারপাশে হালকা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। ঠিক তখনই ভার্সিটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্র, সু তেজাং, সবার সামনে এসে জিয়ার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসল। হাতে টকটকে লাল গোলাপের বিশাল এক তোড়া।
মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। সে গোলাপগুলো জিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
__আমার মনে হয়, এখন ভার্সিটির মোস্ট পপুলার গার্ল জিয়া সিঙ্গেল... এম আই রাইট?
একটু থেমে আবার মুচকি হেসে বলল,
__তাহলে... সেই সুযোগটা কি আমি নিতে পারি?
চারপাশে মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই আগ্রহ নিয়ে জিয়ার উত্তরের অপেক্ষা করছে।
জিয়া ঠোঁট দুটো হালকা পাউট করে দুঃখিত মুখে বলল,
__ওপ্পা... সো সরি ফর ইউ। আই'ম নট ইন্টারেস্টেড ইন লাভ রাইট নাউ। সো... সরি।
তেজাং হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাসতে হাসতেই বলল,
__ইস... কেউ এত সুন্দরভাবে রিজেক্ট করলেও ভালো লাগে! ইটস ওকে। আই উইল ট্রাই নেক্সট টাইম।
তার কথা শুনে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একসঙ্গে আওয়াজ তুলল—
__ওওওও... হাউ কিউট!
হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই ধীরে ধীরে ভিড় সরে যেতে লাগল। ঠিক তখনই জিয়ার চোখ গিয়ে থামল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের ওপর।
ছেলেটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু। যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে সবার আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে।জিয়া ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ইয়াশ ভেবেছিল, বুসানের ঘটনাটা নিয়ে জিয়া এখনো রাগ করে আছে। হয়তো আজও কথা বলবে না। কিন্তু তার সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে জিয়া স্বাভাবিক গলায় বলল,
__কখন এলি?
ইয়াশ নিজের চশমাটা ঠিক করে নিচু স্বরে উত্তর দিল,
__এই তো... মাত্রই এলাম।
একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করল,
__ছেলেটা... তোকে প্রপোজ করল?
জিয়া একদম স্বাভাবিকভাবে বলল,
__হ্যাঁ।
ইয়াশের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।তবুও মুখে কিছু প্রকাশ না করে সে বলল,
__তুই... একসেপ্ট করলি না কেন?
জিয়া ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে উত্তর দিল,
__বলেছিলাম তো... আর রিলেশন করব না।
ইয়াশ এবার সত্যিই অবাক হয়ে তাকাল।
__আমি তো ভেবেছিলাম তুই মজা করে বলেছিলি... তুই তাহলে সিরিয়াস ছিলি?
জিয়া শুধু রহস্যময় একটা হাসি দিল। হ্যাঁ-ও বলল না। না-ও বলল না। তারপর ধীরে ধীরে ইয়াশের পাশে হেঁটে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
জিয়া জানত... সে অন্য কাউকে চায় না। তার হৃদয়ে একজনের জন্যই জায়গা আছে। ইয়াশ।
...
কিন্তু ইয়াশ?
আজ সকালে বুসান থেকে ফেরার সময় সে জিয়ার জন্য একটা ছোট্ট টবভর্তি বেগুনি অর্কিড নিয়ে এসেছিল। সে জানে— অর্কিডই জিয়ার সবচেয়ে প্রিয় ফুল। ভাবছিল, ফুলটা দিয়ে হয়তো মেয়েটার রাগ ভাঙাবে।
কিন্তু ভার্সিটিতে এসেই সে দেখল... সু তেজাংয়ের মতো জনপ্রিয় একটা ছেলে লাল গোলাপ নিয়ে জিয়াকে প্রপোজ করছে। আর সেই দৃশ্য দেখেই ইয়াশের সাহসটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
সে মনে মনে ভাবল,
"ভার্সিটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ছেলের দেওয়া গোলাপই যদি ও ফিরিয়ে দিতে পারে... তাহলে আমার দেওয়া এই ছোট্ট অর্কিডটা হয়তো ও আমার মুখের ওপরই ছুড়ে দেবে..."
চুপচাপ সে অর্কিডের টবটা নিজের ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলল। ফুলগুলো আর সেদিন জিয়ার হাতে পৌঁছাল না।
চলবে...
[আই নো, এসব সফট রোম্যান্টিক গল্প আমার দ্বারা ভালো হয় না। তারপরও ট্টাই করলাম। খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিব এটা, হয়তো বা গল্পের শেষে একটু বেশি রোমান্টিকতা থাকবে ]