১.
“ইয়া আল্লাহ আজকে মত বাচিয়ে দাও। এরপর আর একা বের হবো না রাতে!”
ইশতি চোখ-মুখ খিঁচিয়ে আপন মনে দৌড়াচ্ছে রাতের জনশূন্য রাস্তা দিয়ে। ল্যাম্পপোস্টের মরা আলো বৃষ্টির ঝাপটায় কাঁপছে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় তার কোমর ছাড়ানো দীর্ঘ চুলগুলো ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, যা প্রায় হাঁটু ছুঁইছুঁই করছে। দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ের জুতো জোড়া কখন খুলে পড়ে গেছে, তার হুঁশ নেই। বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে তার।
পেছনে চার থেকে পাঁচজন বখাটে যুবক পৈশাচিক উল্লাসে তাকে ধাওয়া করছে। তাদের মধ্যে একজন অট্টহাসি দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“আরে জানেমান খুব জোর দেখছি। এত এত দৌড়েও এখনো ক্লান্ত হচ্ছে না। আরে দাঁড়াও। একটু আদরই তো করবো আমরা।”
আর একজন বললো, “আরে দাড়াও জানেমান।”
ইশতি আজ তার বান্ধবীর জন্মদিনের পার্টি থেকে নিজের গাড়ি চালিয়ে ফিরছিল। বাবা রহমান খান নিজে এসে তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইশতি শোনেনি। বড় আদরের মেয়ে বলে বাবাও আর জোরাজুরি করেননি, মেয়ে আজ একাই ড্রাইভ করে ঘুরবে, এটাই ছিল আবদার। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটল বিপত্তি। মাঝরাস্তায় হঠাৎ গাড়িটা নষ্ট হয়ে থেমে গেল। ইশতি গাড়ি থেকে নেমে চেক করতে যেতেই কোত্থেকে যেন উদয় হলো এই বখাটেগুলো। তাদের কুৎসিত চাহনি আর উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি রইল না তার। তখন থেকেই সে আপন মনে ছুটছে, আর তারা শিকারি কুকুরের মতো পিছু নিয়েছে তার।
ইশতির ফুসফুস যেন ফেটে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। তবুও থামার উপায় নেই। কিন্তু সামনে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল, রাস্তাটা সামনে গিয়ে দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, আর চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক সেই মুহূর্তে হুট করে অন্ধ করে দেওয়া তীব্র একজোড়া হেডলাইটের আলো এসে পড়ল তার চোখে।
ভেজা রাস্তায় টায়ার ঘষার বিকট শব্দ তুলে ঠিক ইশতির ইঞ্চিখানেক সামনে এসে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষল কালো কালো একটি দামী গাড়ি। হঠাৎ এভাবে গাড়ি চলে আসায় ইশতি নিজেকে সামলাতে পারল না, টাল সামলাতে না পেরে সে সরাসরি গিয়ে পড়ল গাড়িটির বোনটের ওপর। শরীরের সবটুকু শক্তি যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল তার। পেছনে ধাওয়া করতে থাকা বখাটেগুলোও হঠাৎ গাড়ি দেখে থমকে দাঁড়াল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো আর বৃষ্টির ঝাপটায় তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের নেতাগোছের ছেলেটা একটু দমে গেলেও পরক্ষণেই দাঁত বের করে হাসল। ভাবল, হয়তো কোনো সাধারণ শহরের মানুষ গাড়িতে।
গাড়ির ইঞ্জিনটা এখনো গোঙাচ্ছে, যেন কোনো এক শান্ত শিকারি অন্ধকারে ওত পেতে আছে। ইশতি বোনটের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে, তার ভেজা চুলগুলো উইন্ডশিল্ডের ওপর ছড়িয়ে আছে। সে ভয়ে চোখ মেলতে পারছে না, শুধু ভাবছে, এই গাড়ির ভেতর যে আছে, সে কি তার রক্ষাকর্তা হবে, নাকি বিপদ আরও বাড়বে?
পেছন থেকে একটা ছেলে চিৎকার করে উঠল, “ওই মিয়া! গাড়ি সরাও! আমাদের মাল আমাদের হাতে দিয়ে ভাগো এখান থেকে!”
ঠিক তখনই কালো কাঁচ ঘেরা দরজাটা ধীরলয়ে খুলে গেল। রাস্তায় পা রাখল আন্ডারওয়ার্ল্ড জর্জ। ৩১ বছর বয়সী দীর্ঘ দেহী মানুষ। ৬ ফুট দীর্ঘ দেহ, জিম করা সুঠাম পেশিবহুল শরীর, সাদা শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। শার্টের ওপরের কয়েকটা বোতাম খোলা থাকায় তার সিক্স প্যাকের সুগঠিত পেশি আর বুকের প্রশস্ততা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৩ বছর বিদেশে মাফিয়া জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে থাকার পর আজ সে নিজের শহরে ফিরেছে। তার গায়ের রঙ বৃষ্টির ঝাপটায় এক রহস্যময় উজ্জ্বলতা ধারণ করেছে।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটেগুলোর হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। এত বিশালদেহী আর ভয়ংকর ব্যক্তিত্বের কাউকে তারা আগে কখনো দেখেনি। তাদের নেতা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“এই যে ভাই, বেশি হিরো সাজার চেষ্টা করবেন না। মেয়েটাকে আমাদের হাতে দিয়ে কেটে পড়ুন।”
জর্জ কোনো কথা বলল না। তার বরফ শীতল চোখ দুটো একবার বখাটেদের ওপর বুলিয়ে নিল। ইশতির মাথা তখন কাজ করছিল না, সে কী করবে বুঝতে পারল না। চোখের সামনে দীর্ঘদেহী একজন মানুষকে দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে হুট করেই ছুটে গিয়ে তার বুকে আছড়ে পড়ল। সাদা শার্ট খামচে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে একদম মিশে গেল মানুষটার শরীরের সাথে। ছয় ফুট দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ বুকের প্রশস্ততায় মাত্র পাঁচ ফুটের ইশতিকে মনে হচ্ছিল অতি সামান্য এক মানবী।
আচমকা এমন কিছু হওয়াতে কিছুটা চমকে গেল লোকটা। নাম তার আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ‘জর্জ’। যার ইশারায় পুরো মাফিয়া জগৎ নিয়ন্ত্রিত হয়, যার হৃৎপিণ্ড পাথরের চেয়েও কঠিন বলে পরিচিত। প্রেম-ভালোবাসার মতো আবেগ থেকে শত যোজন দূরে থাকা এই মানুষটির জীবনে আজ হঠাৎ এক অদ্ভুত পরিস্থিতির উদ্ভব হলো।
ইশতি তার বুকের সাথে মিশে কান্না মাখা স্বরে বলে উঠল, “প্লিজ আমাকে বাঁচান! ওদের কাছে আমায় দিবেন না, আমাকে বাঁচান। প্লিজ বাঁচান আমায়!”
আব্রাহাম সিকান্দার মির্জার পেশিবহুল বক্ষস্থলে ইশতির থরথর করে কাঁপা শরীরের পরশ এক অজানা আলোড়ন সৃষ্টি করল। আব্রাহাম বুঝতে পারল না ঠিক কী হচ্ছে। তার শক্ত বুকের ওপর মেয়েটির ভিজে যাওয়া চুলের স্পর্শ আর হিক্কা তুলে কান্নার শব্দে তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার পুরো স্নায়ুতন্ত্র যেন অবশ হয়ে গেল। এই প্রথম তার নিয়ন্ত্রিত জীবনে কেউ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করল, তাও আবার এত নিবিড়ভাবে। সে বিরক্ত হবে না কি দূরে সরিয়ে দেবে, সেই বোধটুকু কাজ করার আগেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ধকধক অনুভব করল সে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখ জোড়া কুঁচকে আরও ধারালো দেখাল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনের অন্ধকার রাস্তা চিরে আরও চার-পাঁচটি কালো গাড়ি দ্রুতবেগে এসে আব্রাহামের গাড়ির চারপাশে বৃত্তাকার হয়ে দাঁড়াল। টায়ার ঘষার শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। প্রতিটি গাড়ি থেকে কালো পোশাকধারী সশস্ত্র বডিগার্ডরা নিপুণ দক্ষতায় নেমে এল। মুহূর্তেই পুরো এলাকা একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। জর্জের ম্যানেজার এবং সবথেকে বিশ্বস্ত লোক, আহমদ, তড়িঘড়ি করে এসে জর্জের সামনে মাথা নত করে দাঁড়াল। আব্রাহামের বুকে মুখ গুঁজে থাকা ইশতির মুখটা একপলক দেখে সে কিছুটা চমকে গেল। নিচু স্বরে সে জর্জকে বলল,
“বস, মেয়েটাকে চিনি আমি। এ হলো আপনার বিজনেস রাইভাল আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো শত্রু রহমান খানের একমাত্র মেয়ে। আর আরিয়ান খানের বোন।”
আহমদের কথায় কুঁচকে থাকা ভ্রু জোড়া আরও সটান হলো আব্রাহাম সিকান্দার মির্জার। বুকের ওপর চেপে বসা তপ্ত নিঃশ্বাস আর আহমদের দেওয়া তথ্য এক মুহূর্তের জন্য তার চিন্তার জগতকে স্থির করে দিল। তার মানে, এই হলো সেই মেয়ে, রহমান খানের কলিজার টুকরো, একমাত্র মেয়ে ইশতি।
আহমদ আবারও নিচু স্বরে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইল, “আপনি তো চেয়েছিলেন এই মেয়েটাকে তুলে নিতে! ভালোই হলো, এটাই সুযোগ। নিয়ে চলুন।”
এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের নীল নকশা নিয়ে দীর্ঘ তেরো বছর পর দেশে ফিরেছিল জর্জ আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা। তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, রহমান খান আর আরিয়ান খানের সাজানো গুছানো সাজানো দুনিয়াটা উজাড় করে দেওয়া। আর সেই পরিকল্পনার তুরুপের তাস ছিল তাদের এই আদরের প্রিন্সেসকে অপহরণ করা। কিন্তু এভাবে মাঝরাস্তায় ইশতি নিজেই এসে তার হাতে ধরা দেবে, সেটা ছিল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত।
অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল আবেগহীন আব্রাহাম। দীর্ঘদিনের সাজানো সমস্ত প্ল্যান যেন তাসের ঘরের মতো ওলটপালট হয়ে গেল এক নিমেষে। ইশতি যখন তার বুকে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে বলল, “আমাকে বাঁচান”, তখন আব্রাহামের ইস্পাতকঠিন হৃদয়ের কোথাও একটা কম্পন অনুভূত হয়েছিল। সে নিজের ভেতরের এই অপরিচিত অনুভূতিটা বুঝে উঠতে পারছে না। তার ললাটে এখন চিন্তার গভীর ভাঁজ। এতটুকু সে নিশ্চিত যে, যে ভয়াবহ জিঘাংসা নিয়ে সে ফিরেছিল, এই মুহূর্তে সেটা ইশতির ওপর কার্যকর করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলছে।
আব্রাহাম মির্জা তার শীতল দৃষ্টি ইশতির ওপর থেকে সরিয়ে সামনে দাঁড়ানো ওই বখাটেদের দিকে স্থির করল। তার গম্ভীর, বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মাঝেও এক হিমশীতল আতঙ্কের সৃষ্টি করল। সে আহমদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এগুলোর চিহ্ন যাতে আমি আর এই পৃথিবীতে কোথাও না পাই। মাটির সাথে মিশিয়ে দাও আহমদ।”
আহমদ বুঝে গেছে তাদের কী করতে হবে। সে ইশারা দিতেই একদল সশস্ত্র লোক নিয়ে এগিয়ে গেল বখাটেগুলোর দিকে। আব্রাহাম মির্জা তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, কিন্তু হঠাৎ সে অনুভব করল তার বুকের সাথে মিশে থাকা মেয়েটি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে। ইশতি তার শরীরের ভার ছেড়ে দিচ্ছে, যেন তার সমস্ত শক্তির অবসান ঘটেছে। জ্ঞান হারাচ্ছে সে।
আব্রাহাম মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই তার বলিষ্ঠ দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইশতিকে। তার কপাল কুঁচকে গেল। সে নিচু হয়ে প্রথমবারের মতো মেয়েটির মুখের দিকে নিবিড়ভাবে তাকাল। এতক্ষণ পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে মুখটা ভালো করে খেয়াল করা হয়নি। আব্রাহাম দেখল, মেয়েটির গায়ের রঙ দুধে-আলতা, অসম্ভব মায়াবী একটা চেহারা। তার কোমর ছাপানো ভিজে থাকা দীর্ঘ চুলগুলো প্রায় হাঁটু ছুঁইছুঁই করছে। ইশতি চোখ বুজে আছে, আর আকাশের হালকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার স্নিগ্ধ মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত আলোড়ন আব্রাহাম নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারছে না। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থেকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল মেয়েটাকে। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজা খুলে পরম যত্নে তাকে বসিয়ে দিল।
ইশতির শরীরটা সিটে এলিয়ে পড়ার পর আব্রাহাম ড্রাইভিং সিটে বসে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল সিট বেল্টটা বেঁধে দেওয়ার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে ইশতির মুখের খুব কাছাকাছি চলে যায় তার মুখ। সাথে সাথে থমকালো আব্রাহাম। তার দৃষ্টি আটকে গেল ইশতির অসাধারণ সুন্দর গালের ওপর, তারপর দৃষ্টি সরে গেল গোলাপের পাপড়ির মতো লালচে ঠোঁট জোড়ার দিকে। কেন যেন এক অদৃশ্য মায়ায় তার দৃষ্টি সেখানে অবশ হয়ে যাচ্ছে। কপালটা কুঁচকে থাকলেও সে চোখ সরাতে পারছে না।
এ কী হচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হর্তাকর্তা আব্রাহাম সিকান্দার মির্জার? কেন যেন এক অদম্য বাসনা হচ্ছে মেয়েটার গাল আর ঠোঁট একটু ছুঁয়ে দেখার। নিজের ভেতরের যুক্তি দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল সে, কিন্তু মন মানল না। কপাল কুঁচকে রাখা অবস্থাতেই সে ধীর হাতে ইশতির গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
স্পর্শটা হওয়ামাত্রই যেন এক প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক খেলে গেল আব্রাহামের সারা শরীরে। শরীরটা তার ঝাকি দিয়ে উঠল। এক অজানা তীব্র অনুভূতিতে সে ছিটকে নিজের ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে, বড় বড় নিঃশ্বাস ছাড়ছে সে। মাথাটা জোরে একটু ঝাঁকিয়ে নিল সে, এসব কী হচ্ছে তার সাথে? সে তো এমন নয়! কপাল কুঁচকে আবারও পাশের সিটে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল সে। এবার নিজের ওপরই এক চরম বিরক্তি দানা বেঁধে উঠল তার। কপাল কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে আর কিছু না ভেবে আব্রাহাম গাড়ি স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে সাথে চাকাগুলো ভেজা রাস্তা কামড়ে ধরে দ্রুতবেগে ছুটতে শুরু করল।
___________
শহরের এক প্রান্তে এক বিশাল রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে আছে দুটি রাজকীয় অট্টালিকা। রাস্তার একপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'মির্জা হাউস', যাদের আভিজাত্য আর ক্ষমতার দাপটে পুরো শহর থমকে থাকে। আর সেই রাস্তার ঠিক উল্টো পাশেই সগর্বে অবস্থান করছে আর এক অট্টালিকা, যার নাম 'খান মহল'।
খান আর মির্জা, এই দুই নাম একে অপরের পরিপূরক নয়, বরং চরম শত্রুতার প্রতীক। দিনের আলোয় সাধারণ দুনিয়ায় তারা বিজনেস টাইকুন হিসেবে একে অপরের টুঁটি চেপে ধরতে চায়, আর রাতের অন্ধকার দুনিয়ায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের রণক্ষেত্রে তারা একে অপরের রক্ত পিয়াসী। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই শত্রুতার আগুনে দুই পরিবারই পুড়ছে, কিন্তু কেউ কাউকে একচুল ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কেউ কাউকে ভয় পেয়ে চলে না।
মির্জা হাউসে আজ খুশির জোয়ার বইছে। ল্যাম্পপোস্ট আর বাগানগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত। দীর্ঘ ১৩ বছর পর বিদেশ বিভুঁই থেকে বাড়ির বড় ছেলে আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা ফিরছে। দাদু ফুলজান বেগম থেকে শুরু করে চাচা রোবায়েদ মির্জা, সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের বংশের প্রদীপের জন্য।
অন্যদিকে, ঠিক উল্টো পাশের খান হাউসে এখন চিন্তার কালো মেঘ। উৎসবের ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই, বরং এক অস্থির নীরবতা বিরাজ করছে। তাদের বাড়ির নয়নমণি, প্রিন্সেস ইশতি এখনো বাড়ি ফেরেনি। সেই বিকেলে বান্ধবীর বার্থডে পার্টিতে গিয়েছিল সে। বাবা রহমান খান নিজে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইশতি জিদ ধরেছিল আজ সে একাই গাড়ি চালিয়ে আসবে। মেয়ের সেই আবদারের কাছে হার মেনেছিলেন বাবা। কিন্তু এখন মাঝরাত পার হতে চলল, বৃষ্টির এই অঝোর ধারায় মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে রহমান খানের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন তিনি, মনের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধছে। ইশতির দেরি হওয়াতে পুরো খান মহলে এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি।
আব্রাহাম সিকান্দার মির্জার গাড়িটা এসে থামল খান মহলের বিশাল লোহার গেটের সামনে। যখন জানতে পেরেছে মেয়েটা তার চরম শত্রু রহমান খানের, তখন আর কষ্ট করে ঠিকানা খুঁজতে হয়নি, কারণ বছরের পর বছর ধরে তাদের দুই পরিবারের বসতভিটা একে অপরের মুখোমুখি।
সিট বেল্ট খোলার জন্য সে যখন আবারও ইশতির ওপর ঝুঁকে পড়ল, সেই একই তপ্ত অনুভূতি তাকে গ্রাস করতে চাইল। এক অজানা আকর্ষণ তাকে বারবার টেনে ধরছে এই মেয়েটির দিকে। আব্রাহামের ভেতরটা রাগে রি রি করে উঠল। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, আর এই অক্ষমতা তার পুরুষত্বে আঘাত করছে। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে দাঁত পিষে অজ্ঞান ইশতির গলাটা এক হাতে টিপে ধরল। তার ঠোঁট জোড়া রাগে থরথর করে কাঁপছে। ফিসফিস করে বলে উঠলো,
“এমন হচ্ছে কেন? হু দ্যা হেল আর ইউ? একি ক্ষমতা তোমার? কিভাবে করছো এসব?”
কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, এই নিষ্ঠুরতায় তার ভেতরের সেই নেশালো অনুভূতিটা কমার বদলে যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুট করেই সে তার ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিল ইশতির নরম স্নিগ্ধ গালে।
কয়েক সেকেন্ড পরেই এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের সিটে ফিরে বসল সে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত। এ কী করল সে? কেন সে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না? তবে কি তার সেই অবদমিত সাইকো সত্তা আবারও জেগে উঠছে? দীর্ঘ তেরো বছর ধরে যে দানবটাকে সে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, এই মেয়েটা কি তাকে আবারও সেই পুরনো অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?
গাড়ি থেকে নেমে আব্রাহাম উল্টো পাশে গিয়ে দরজা খুলল। বৃষ্টি এখনো ঝরছে সমানতালে। সাদা শার্টটা তার সুঠাম দীর্ঘ দেহে লেপ্টে আছে, যা তার কাঠামোর প্রতিটি পেশিকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সেই বলিষ্ঠ দুই হাত দিয়ে সে ইশতির ছোট্ট দেহটাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। এরপর গম্ভীর পায়ে এগিয়ে গেল খান মহলের সদর দরজার দিকে। ঠিক তখনই রহমান খান হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন নিজের কলিজার টুকরোকে খুঁজতে। কিন্তু দরজার মুখেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। সামনেই বৃষ্টির মাঝে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা, আর তার কোলে নিথর ইশতি।
দুই শত্রুর চোখাচোখি হলো। রহমান খানের চোখে ফুটে উঠল তীব্র ঘৃণা আর রক্তচক্ষ, নিজের মেয়ের এই অবস্থা আর তার চরম শত্রুর কোলে তাকে দেখে তার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। অন্যদিকে, আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক চিলতে বিদ্রূপাত্মক আর বাঁকা হাসি। তেরো বছর আগে যে শত্রুতার বীজ বোনা হয়েছিল, আজ যেন সেই আগুনের লেলিহান শিখা দুই পরিবারের মাঝখানের এই বৃষ্টিভেজা রাস্তাটুকু পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাইছে। কেউ কারোর কাছে নতি স্বীকার করার পাত্র নয়, বরং এই এক মুহূর্তের নীরবতায় যেন কয়েক প্রজন্মের জিঘাংসা আর দাফন করে রাখা বহু রহস্য ফণা তুলে দাঁড়াল।
#চলবে.......
#আব্রাহাম_সিকান্দার_মির্জা
#কামরুল_ইসলাম_মাহিন
#সূচনা_পর্ব