#আব্রাহাম_সিকান্দার_মির্জা
#কামরুল_ইসলাম_মাহিন
#পর্বঃ৯
[ ⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ🚫 ]
.
ইশতি ইতিমধ্যেই পূরভকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছে। নিজের জীবন থেকে ওই বিশ্বাসঘাতক ছেলেটার অস্তিত্ব ও পুরোপুরি মুছে ফেলেছে। ইশতি অন্তত ওই ধাঁচের মেয়ে নয় যে কারো ধোঁকা বা অবহেলার জন্য সারা জীবন কেঁদে-হেদিয়ে মরবে। আঘাতের বিপরীতে পাল্টা দশটা আঘাত ফিরিয়ে দেওয়াই তার স্বভাব। সেদিন বারের ভেতর নিজের আত্মসম্মান আর জেদ বজায় রাখতে আব্রাহাম মির্জাকে নিজের বয়ফ্রেন্ড বলে দাবি করে এসেছিল সে। কিন্তু তারপর থেকেই যেন ওই লোকটা দিন দিন বড্ড বেশি লাগামহীন হয়ে উঠেছে! কীভাবে যেন ইশতির পার্সোনাল ফোন নাম্বারটা জোগাড় করে ফেলেছে। যখন তখন কোনো কারণ ছাড়াই কল দেয়, আর ওপাশ থেকে কেমন একটা অদ্ভুত সুরে কথা বলে। কখনো যদি রাস্তায় বা বাইরে কোথাও সামনাসামনি দেখা হয়ে যায়, তবে তো আর কথাই নেই! লোকটা প্রকাশ্যেই চোখ মারে, ঠোঁট বাঁকিয়ে চপল ভঙ্গিতে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেয়। একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা! যাই হোক, আপাতত ওই বজ্জাত লোকটার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল সে।
আজ আবহাওয়াটা বেশ চমৎকার। মনটা ফুরফুরা থাকায় বান্ধবীর সাথে পার্কে এসেছে ইশতি। দুজনে গল্প করতে করতে সারা পার্কজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই দূরের একটা দৃশ্যের ওপর গিয়ে তার নজর আটকে গেল। পার্কের কোণের একটা নির্জন বেঞ্চে বসে গভীর মগ্নতায় একে অপরকে চুমু খাচ্ছে পূরভ আর তার সেই নতুন গার্লফ্রেন্ড! দৃশ্যটা দেখামাত্রই ইশতি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানে। এক মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ দুটো রাগে আর অপমানে রক্ত-লাল হয়ে উঠল। কেন তার মনের ভেতর এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো, সেটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না।
ঠিক তখনই তার পাশের বান্ধবীটা ফিসফিস করে বলে উঠল, “ইশতি, ওটা পূরভ না?”
ইশতি দাঁতে দাঁত চেপে চরম ঘৃণায় তাদের দিকে তাকিয়ে রইল, বান্ধবীর কথার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করল না সে। ওদিকে পূরভ আর তার নতুন গার্লফ্রেন্ডের নজরও হঠাৎ এসে পড়ল ইশতির ওপর। ইশতিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের দুজনের ঠোঁটেই এক চিলতে বাঁকা, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ইশতিকে উত্যক্ত করার আর রাগানোর এক নোংরা চেষ্টা ছিল সেই হাসিতে। ইশতি চোখ গরম করে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। ঠিক তখনই তারা দুজন নিজেদের হাতজোড়ো শূন্যে উঁচু করে আঙুলের চকচকে আংটিজোড়া দেখাল। দৃশ্যটা দেখে ইশতির ভ্রু যুগল টানটান হয়ে উঠল। তার মানে কি ওরা দুজন এর মধ্যেই এনগেজমেন্ট সেরে ফেলেছে?
পূরভের মতো একটা চরিত্রহীন, বারোভাতারি ছেলে মাত্র কয়েক দিনের মাথায় একটা মেয়ের সাথে আংটি বদল করে ফেলল! ব্যাপারটা যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনই আশ্চর্যের। আর সবচেয়ে বড় কথা, সেই আংটি এখন ইশতিকে দেখিয়ে জ্বালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে সে হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে! অপমানে আর রাগে ইশতির হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল, নখগুলো গিয়ে বিঁধল হাতের তালুতে। মাথায় এক চরম জেদ চেপে বসল তার। এমনিতেই জেদি মেয়ে সে, মাথা খারাপ হয়ে গেলে ভালো-মন্দের তোয়াক্কা না করে যা খুশি তা-ই করে ফেলতে পারে। মনে মনে একটা ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বান্ধবীর দিকে ঘুরে অত্যন্ত কড়া গলায় বলল,
“তুই এখন বাড়ি যা!”
বান্ধবী অবাক হয়ে বলল, “মানে? এইতো মাত্রই তো আসলাম!”
“বেশি কথা বলিস না তো! তোকে বাড়ি যেতে বলেছি, তুই বাড়ি যা। যাহ্!”
বান্ধবী আর কথা বাড়াল না। সে খুব ভালো করেই চেনে ইশতিকে। মেয়েটার রাগ যখন চড়ে, তখন তার সামনে থাকা আর বাঘের মুখে পড়া একই কথা। তাই আর কোনো প্যাঁচালে না গিয়ে সে পার্ক থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির পথ ধরল। বান্ধবী চলে যেতেই ইশতি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। মারমুখী ভঙ্গিতে স্ক্রিন স্ক্রল করে কার যেন একটা নাম্বার হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল সে। যার নাম্বারটা খুঁজছে, সেটিকে সে ফোনে সেভ করে রাখেনি। তবে ইশতির তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির কল্যাণে নাম্বারটির শেষের দুটো সংখ্যা খুব ভালো মনে আছে। সেই দুটো সংখ্যা মিলিয়েই নিজের ডায়াল লিস্ট চষে বেড়াতে লাগল সে। অবশেষে পেয়েও গেল।
কোনো দ্বিধা না করে সাথে সাথে নাম্বারে চাপ দিল ইশতি। কয়েক সেকেন্ড রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। ওপাশের মানুষটা ঠিক কী বলল বা কেমন করে সম্ভাষণ জানাল, তা বোঝা গেল না। কিন্তু ইশতি আর এক মুহূর্তও অপচয় না করে চরম গরম গলায় বলে উঠল,
“কোথায় আছেন?”
“.........!”
ওপাশের উত্তর শুনে ইশতি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, “বেশি কথা বলবেন না! আমি যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটার উত্তর দিন। কোথায় আছেন আপনি?”
“..........!”
ওপাশ থেকে আবারও কিছু একটা বলা হলো। ইশতি নিজের জেদি গলায় হুকুম দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “এক্ষুনি এসে আমাকে নিয়ে যান!”
“...........!”
ওপাশের মানুষটা হয়তো আবারও চপল ভঙ্গিতে কিছু বলতে চাইল, যা শুনে ইশতির মেজাজ একদম তুঙ্গে উঠে গেল। সে চিল্লিয়ে বলল, “আবার বেশি কথা! আমি বলছি নিয়ে যেতে, মানে আপনি নিয়ে যাবেন। আসবেন কি আসবেন না, সেটা বলুন?”
“..........!”
ওপাশ থেকে অবশেষে একটা জবাব আসতেই ইশতি ফোনের লাইনটা কাটার আগে শেষবারের মতো শাসিয়ে বলল, “জলদি আসুন, আমি পার্কের ভেতর ওয়েট করছি!”
ইশতি যার নাম্বারে কল করেছে, সে আর কেউ নয়, আব্রাহাম সিকান্দার মির্জা!
আব্রাহাম তখন বসে ছিল নিজের অফিসের কেবিনে। দিনের বেলা সে তার বাবার বিশাল বিজনেস সাম্রাজ্যের হাল ধরে অত্যন্ত সুচারুভাবে, আর রাত নামতেই তার রূপ বদলে যায়—তখন সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে অপরাধ জগৎ শাসন করে। ইশতির নাম্বারটা সে নিজের ফোনে বেশ শখ করে সেভ করে রেখেছে ‘স্পাইসি চিলি’ নাম দিয়ে। প্রথম দিকে মেয়েটাকে ‘বাটারফ্লাই’ বলে ডাকলেও, দিন দিন তার এই রূপ দেখে মনে হয়েছে বাটারফ্লাই নামটা এখন আর এই মেয়ের ওপর ঠিক খাটছে না। তাই সে তাকে ‘স্পাইসি চিলি’ বা তিখি মরিচ বলেই ডাকে। ফোনে ইশতির কলটা আসতেই সে বেশ তড়িঘড়ি করেই রিসিভ করেছিল, কারণ ইশতি নিজে থেকে কখনোই আব্রাহামকে কল করে না। মাঝের এই কদিন আব্রাহাম নিজেই তাকে জ্বালানোর জন্য বহুবার কল করেছে, কিন্তু ওপাশ থেকে শুধু রাগ আর ধমকই জুটেছে।
ফোনটা রেখেই আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া হয়ে উঠল। তার স্পাইসি চিলি আজ নিজে থেকে তাকে ডেকেছে, তাও আবার তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার জন্য! ৩১ বছর বয়সী এই শক্তপোক্ত, গম্ভীর মানুষটা যেন ওই ১৯ বছরের জেদি মেয়েটার ওপর দিন দিন পুরোপুরি মত্ত হয়ে যাচ্ছে। নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত ভালো লাগাটাকে আর চেপে না রেখে, সে এক মুহূর্তও বিলম্ব করল না। দ্রুত নিজের কোটটা গায়ে জড়িয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল।
_____________________
ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে ঠিক পার্কের সামনে এসে ব্রেক কষল আব্রাহাম। গাড়ি থেকে নেমে পার্কের ভেতর প্রবেশ করার পর ইশতিকে খুঁজে পেতে তাকে খুব একটা বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না। পার্কের লেকের ধারে মুখ কালো করে, বুকে দুই হাত গুঁজে বেশ থমথমে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে। আব্রাহাম নিজের ঠোঁটে সেই চেনা রহস্যময় হাসিটা ঝুলিয়ে অত্যন্ত ধীর পায়ে ইশতির ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ইশতির একদম কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিচু, গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড মাই স্পাইসি চিলি?”
আচমকা এমন গভীর কণ্ঠস্বর শুনে যেন ধড়ফড়িয়ে উঠল ইশতি। ঝট করে পেছনে ফিরতেই তার নজরে পড়ল সেই দীর্ঘদেহী, সুঠাম গড়নের মানুষটা। আব্রাহামের ঠোঁটে তখনো সেই চেনা বাঁকা হাসি লেগে আছে, আর চোখের সরু দৃষ্টিতে খেলা করছে এক তীব্র কৌতুহল। তাকে দেখেই ইশতি আর নিজের ভেতরের রাগ চেপে রাখতে পারল না। মুখটা কুঁচকে বেশ রাগী কণ্ঠে বলতে লাগল,
“এভাবে কেউ হুট করে পেছন থেকে এসে চমকে দেয়? ভয় পায় না মানুষ? আর এখন আসার সময় হলো আপনার? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে প্রায়?”
কথাগুলো বেশ ঝাঁঝালো আর গরম গলায় বলল সে। আব্রাহাম তার এই অগ্নিমূর্তি দেখে একটুও না দমে হালকা করে হেসে উঠল। তারপর ইশতির আরও এক কদম কাছে এসে শান্ত গলায় বলল,
“রিল্যাক্স, রিল্যাক্স মাই স্পাইসি চিলি! হোয়াট হ্যাপেন্ড? হোয়াই আর ইউ এংরি সো মাচ? কাম ডাউন!”
“হোয়াট কাম ডাউন, হ্যাঁ?” ইশতি এবার রীতিমতো ফুঁসে উঠে বলল, “সেই কখন আপনাকে আসতে বলেছি! আর আপনি এতক্ষণ পর হেলেদুলে এখন আসলেন?”
আব্রাহাম মৃদু হাসল। ইশতি এই মুহূর্তে ঠিক এমন আচরণ করছে, যেন কোনো প্রেমিকা তার প্রেমিককে নির্দিষ্ট সময়ে কোথাও আসতে বলেছে আর সে দেরি করায় প্রেমিকা এখন তার ওপর রীতিমতো চিল্লাচিল্লি আর মান-অভিমান করছে। ব্যাপারটা আব্রাহামের মনের কোণে এক অদ্ভুত ও দারুণ ভালো লাগার সৃষ্টি করল। সে নিজের কণ্ঠস্বর আরও কিছুটা নরম করে ইশতিকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“ওকে, আই অ্যাম সরি! এখন বলো কী হয়েছে? এভাবে হুট করে ডাকলে যে?”
আব্রাহামের এমন শান্ত জবাবে ইশতি নিজের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা সামলে নিল। এতক্ষণ লেকের পাড়ে একা একা দাঁড়িয়ে সে নিজের মনে বেশ বড়সড় একটা পরিকল্পনা করে ফেলেছে। তার মাথা এখন প্রচণ্ড গরম। আর ইশতির স্বভাবই এমন, মনে যখন তীব্র জেদ চাপে আর মাথা গরম থাকে, তখন সে উল্টোপাল্টা সব প্ল্যান করে বসে এবং সেটা নিয়েই ভাবতে থাকে। রাগের মাথায় এখন যে পরিকল্পনাটা সে করেছে, রাগ যেহেতু এখনো কমেনি, তাই সেটা পূর্ণ করার চিন্তাভাবনাতেই মগ্ন সে। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে সে আব্রাহামকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা, আপনি সব সময় ওইভাবে আমার সাথে কথা বলেন কেন?”
আব্রাহাম এক জোড়া ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “উম্ম! ঠিক কোন ভাবে?”
“ওই যে কেমন যেন একটা ভাবে কথা বলেন না সব সময়!”
আব্রাহাম এবার মজা পেয়ে বলল, “কেমন ভাবে কথা বলার কথা বলছ, একটু পরিষ্কার করে বলো না, স্পাইসি চিলি?”
ইশতি খানিকটা ইতস্তত বোধ করল, নিজের ভেতরের দ্বিধাটুকু আড়াল করার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলল, “ওই যে সব সময় বলেন না... আমি নাকি আপনার! আমায় নাকি আপনারই হতে হবে। ওই যে যেসব হাবিজাবি বলেন... ব্লা ব্লা!”
আব্রাহাম এবার নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বাঁকা হাসল। তারপর আরও কয়েক কদম এগিয়ে এসে একদম ইশতির মুখোমুখি দাঁড়াল। আব্রাহাম উচ্চতায় ইশতির চেয়ে বেশ লম্বা, তাই তার চোখের দিকে তাকাতে গিয়ে ইশতিকে নিজের ফর্সা ঘাড়টা বেশ খানিকটা উঁচু করতে হলো। আব্রাহাম তার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“ওউউউউ! তার মানে ওসব কথা বললে তোমার ভালো লাগে, কিউটি?”
আব্রাহামের এমন আচমকা জবাবে ইশতি ভীষণ থতমত খেয়ে গেল। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “মা... মানে! ও... ওমন কিছু বলতে চাইনি আমি। আসলে—”
আব্রাহাম তার কথা লুফে নিয়ে চোখের দৃষ্টি আরও গভীর করে বলল, “ইয়া ইয়া, বলো বলো! একবার শুধু মুখে বলো যে তোমার ভালো লাগে, তাহলে দেখোই না আমি কী করি!”
ইশতি নিজের থতমত ভাব কাটিয়ে উঠে আবারও চেহারায় রাগী ভাব এনে বলল, “আমি ওগুলো ভালো লাগার কথা বলিনি! আমি শুধু জিজ্ঞাসা করেছি যে আপনি এসব কেন বলেন?
“বিকজ আই রিয়েলি ওয়ান্ট ইউ! আই নিড ইউ. আই জাস্ট ওয়ান্ট টু মেক ইউ মাইন, অ্যান্ড দ্যাটস হোয়াই আই সে ইট.”
আব্রাহামের মুখ থেকে এতটা সরাসরি স্বীকারোক্তি শুনে ইশতি কিছুক্ষণ একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল। আব্রাহাম যে তাকে চায়, সেটা সে বেশ আগে থেকেই জানে। কারণ লোকটা যখনই সামনে আসে, মুখে কোনো লুকোছাপা না রেখে সবসময়ই বলে—হি নিডস হার। কিন্তু আজ ইশতির মাথায় অন্য এক জেদ চেপে বসেছে। সেই জেদের বশেই সে মনে মনে একটা বড়সড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। জেদটা এখনো তার মাথায় এমনভাবে চড়ে আছে যে, সে যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সেটা আদেও সঠিক নাকি ভুল, তা বিচার করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে তার নেই। তার শুধু মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে এটাই একমাত্র সঠিক পথ।
ইশতিকে ওভাবে চুপ করে থাকতে দেখে আব্রাহাম এক পা দু পা করে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তা দেখে ইশতিও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পিছিয়ে যেতে থাকল। পিছোতে পিছোতে একপর্যায়ে লেকের পাড়ের লোহার গ্রিলে গিয়ে তার পিঠ ঠেকল এবং সে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আব্রাহাম সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে একদম ইশতির মুখোমুখি এসে, তার দুই পাশে গ্রিলের ওপর নিজের দুই হাত রেখে লক করে দিল এবং ঝুঁকে এল তার মুখের কাছাকাছি। আব্রাহামের দুই হাতের সেই মজবুত বেড়াজালে বন্দি হয়ে ইশতি ডানে-বামে কোনো পাশেই সরার জায়গা পেল না।
আব্রাহাম তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে চোখের গভীরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি তো আমার এসব কথায় এতদিন কখনো কোনো ইন্টারেস্ট দেখাওনি। আজ হঠাৎ এমন কথা জিজ্ঞাসা করছ যে? ব্যাপার কী, কিউটি?”
ইশতি নিজের ভেতরের কাঁপন আড়াল করে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “কী ব্যাপার হবে আবার? কিছুই না!”
আব্রাহাম ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, “প্রেমে-টেমে পড়ে যাচ্ছ না তো আবার?”
আব্রাহামের এমন কথায় ইশতি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আব্রাহামের প্রশস্ত সুঠাম বুকে একটা ধাক্কা মেরে তাকে একটু দূরে সরিয়ে দিল। তারপর বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“নো ওয়ে! আমি পড়তে যাব আপনার প্রেমে? বয়স দেখেছেন নিজের?”
আব্রাহাম হালকা শব্দে হেসে উঠল। তারপর নিজের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল, “উহু! ওইদিন বলেছিলাম না, আই অ্যাম 31 অ্যান্ড ইউ 19। পারফেক্ট ফর ইউ, মাই স্পাইসি চিলি! অ্যান্ড আই অ্যাম হ্যান্ডসাম, আই অ্যাম রিচ, আই অ্যাম কুল। প্রেমে পড়তেই পারো, ইটস নট আ বিগ ডিল। ইটস নরমাল, কিউটি!”
“জি না, আমি আপনার প্রেমে-টেমে মোটেও পড়িনি। ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন, আই অ্যাম অলসো রিচ! সো, আই ডোন্ট নিড আ রিচ পারসন ইন মাই লাইফ। বাট...”
ইশতির মুখের কথা আচমকা এভাবে থমকে যেতেই আব্রাহাম এক জোড়া ভ্রু কুঁচকে শুধাল, “হোয়াট বাট?”
ইশতি ঝট করে মুখটা ঘুরিয়ে লেকের শান্ত জলের দিকে তাকাল। সে কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু কেন যেন আব্রাহামের ওই তীক্ষ্ণ আর নেশাক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলতে পারছে না। আব্রাহাম তার এই ভেতরের দ্বিধা আর ছটফটানিটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। সে নিজের কণ্ঠস্বর আরও নরম আর মায়াবী করে আলতো গলায় বলল,
“তুমি কি কিছু বলতে চাও, কিউটি?”
ইশতি লেকের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই খুব নিচু স্বরে বলল, “হুম...!”
“সো, দেরি করছ কেন? বলে ফেলো!”
ইশতি মনে মনে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল। সে কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু কথাগুলো যেন তার গলার কাছে এসে বারবার আটকে যাচ্ছে। মনের ভেতর তীব্র জেদ আর লজ্জার এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। তাকে ওভাবে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে আব্রাহাম তার জড়তাটুকু টের পেল। মেয়েটাকে কিছুটা সহজ এবং আশ্বস্ত করতে সে আরেকটু এগিয়ে এসে গভীর এক আশ্বাসের সুরে বলল,
“লিসেন কিউটি! আমাকে কিছু বলার জন্য তোমার এত ভাবনা-চিন্তা বা দ্বিধাবোধ করতে হবে না কখনো। তোমার যখন যা চাই, যা লাগবে, কিংবা যা বলতে চাও, সবকিছু আমাকে যেকোনো সময়, যখন খুশি, যেভাবে খুশি বলতে পারো। বিকজ আই অ্যাম অনলি ইয়োরস। যদিও তুমি সেটা এখনো বিশ্বাস করো না বা মানো না, তারপরও বলছি, আই অ্যাম অনলি ইয়োরস অ্যান্ড ইউ আর অনলি মাইন!”
আব্রাহামের মুখ থেকে ‘ইউ আর অনলি মাইন’ শব্দ কটা বের হওয়া মাত্রই ইশতি ঝড়ের গতিতে পেছন ফিরে তাকাল। এবার সে আর চোখ সরিয়ে নিল না, বরং সমস্ত দ্বিধা আর জড়তা ঝেড়ে ফেলে সরাসরি আব্রাহামের চোখের গভীরে চোখ রেখে অত্যন্ত স্পষ্ট আর চড়া গলায় বলল,
“বিয়ে করবেন আমায়?”
#চলবে.........