ফন্ট সাইজ:
থিম:
শাহী টমেটো

২য় পর্ব

লেখক: সোহাগী আক্তার
#শাহী_টমেটো 
#আরহা_ফারিশ 
#পর্ব_২
দৌড়ে তোরষা ফিরে এল একই স্থানে যেখান থেকে পালিয়েছিল। হাটুর উপর হাত ঠেকিয়ে হাপাঁতে হাপাঁতে তাকিয়ে দেখল। না কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। সবকটা গেল কোথায়? এর মাঝেই সানিদ নাকের পাটাতন ফুলিয়ে কোমড়ে দু-হাত রেখে তোরষার কাছে এগিয়ে এল। 
— হারামি বন্ধুত্বের এই প্রমান দিলি? আমার মতো নান্না-মুন্না বাচ্চাটাকে এভাবে একা ফেলে তোরা কিভাবে চলে গেলি? একটুও চিন্তা করিস নি আমার মতো ভোলা ভালা ছেলেটাকে একবার ধরলে ওরা কি করতে পারে? 
— কেনো রে তোর পা নেই? পালাতে পারিসনি? 
— না নেই। তোরা কেনো আমাকে ফেলে গেলি? 
— তো আয় কোলে আয়। এবার তোকে কোলে নিয়ে পালাই।
তোরষা হাত বাড়িয়ে দিতেই সানিদও সামনে পা বাড়াল।ভাবখানা এমন যেনো সত্যি সত্যি কোলে উঠে আসবে। তোরষা কাঁধে থাকা ব্যাগটা নামিয়ে ওর পিঠ বরাবর মেরে বলল, 
— দূরে থাক বজ্জাত। বাকি তিনটে রামছাগল কোথায় রে? 
সানিদ দু-কাধ সামান্য উচিয়ে আবার সাথে সাথে নামিয়ে বলল, 
— কে জানে। 
অন্যদিকে বাড়ি পৌঁছে মায়ের ঝাঁটা-পেটা খেয়ে আবারো মোড়ের রাস্তায় ফিরে এল জাওয়াদ ও আমিরা। শরীর আর সায় দিচ্ছে না। বাজে ভাবে হাপাঁচ্ছে দুজন। পাশে ল্যাম্পপোস্টে গা ঘেসে বসে পরল। একপাশে জাওয়াদ অন্যপাশে আমিরা।দুজনের পিঠ ঠেকে আছে ল্যাম্পপোস্টে। হাপাঁতে হাপাঁতে দুজন একসঙ্গে ব্যাগ থেকে ওয়াটারপট বের করল। বের করেই একে অন্যের দিকে বাড়িয়ে দিল। জাওয়াদ নিল আমিরার-টা আর আমিরা নিল জাওয়াদের টা। দুজনে একসাথে ঢকঢক করে গিলেই আবার যার যার পট তার তার কাছে ফিরিয়ে দিল। শরীরটাকে কোনো রকমে ঠেলেঠুলে আবারো পা বাড়াল ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। 
কিছুক্ষণ বাদে পোঁছে গেল ওরা । তোরষা ও সানিদকে দেখে হাত নাড়িয়ে ইশারা করল। আমিরা ও জাওয়াদকে দেখে তাদের দিকে পা বাড়ায় তোরষা ও সানিদ। আমিরা আর জাওয়াদের অবস্থা দেখে পেট চেপে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সানিদ। বেচারা হাসতে হাসতে মাটিতে শুয়ে যাওয়ার উপক্রম। ওর গা জ্বালানো হাসি দেখে আমিরা দাঁত কটমট করে বলল, 
— এমন ষাড়ের মতো দাঁত কেলাচ্ছিস কেনো? মুখ থেকে মরা ইঁদুরের গন্ধ বের হচ্ছে। 
সানিদ হাসতে হাসতেই বলল, 
— কাছে আয় মরা ইদুরটা তোকে ভাজি করে খাইয়ে দেই। 
— তোর ইঁদুর তুই খা ।
তোরষা ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল, 
— আমরা সবাই তো এখানে আছি কিন্তু আদা কোথায়? 
সানিদ খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, 
— দেখ কোন কসাই তার মাংস রান্না করার জন্য আদাকে বেটে দিয়ে দিয়েছে। 
তোরষা বলল, 
— তোর ভাংঙা রেডিওটা বন্ধ করবি? 
— এটা না চালালে খাব কি? এটাই তো আমার জীবিকার মাধ্যম রে তোরষার পাত। 
— তুই আসলেই একটা গর্দভ ।সর সামনে থেকে। 
জাওয়াদ মোবাইলটা পকেট থেকে বের করতে করতে বলল, 
— দাঁড়া আমি কল করছি। 
পরপর কয়েকবার রিং হলো । কিন্তু কেউ রিসিভ করল না। তৃতীয়বার রিং হতেই কলটা রিসিভ হলো।জাওয়াদ স্পিকারটা বাড়িয়ে দিল। জাওয়াদ কিছু বলার আগেই সানিদ পাশ থেকে বলল, 
— কিরে আদা, রসুন, পেঁয়াজ, কার তরকারিতে বসে বসে পরকীয়া করছিস? 
আদা ভ্যাঁ ভ্যা করে বলল, 
— দোস্ত আমি আটকা পড়েছি আমাকে বাঁচা।
— হায় হায় ওরা তোকে ধরে ফেলেছে? মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেয়নি তো আবার? 
সানিদের কথা শুনে আদা বলল,
— ওরে মুখ পোড়া রুমের ভিতর আটকা পরেছি।
— কোন রুমে? 
আদার মাথা কাজ করছে না। অতিরিক্ত ভয়ে মাথাটা কেমন জ্যাম হয়ে আছে। সে চারদিকে একবার চোখ বুলাল।যেখানে বসে আছে সেখানটায় চোখ রেখে বলল, 
— সাদা রং করা দেয়ালের মাঝে আমি আটকে আছি ।
আদার উত্তর শুনে ওরা একসঙ্গে বলে উঠল, 
—এ্যাহ? 
— আমি যেখানটায় বসে আছি ওটার রং ও সাদা।নিচে আবার গোল গর্ত আছে। 
জাওয়াদ একটু ভেবে বলল, 
— তাহলে তুই ওখানে বসে আছিস কীভাবে? গর্তের উপর? 
আদা বিরক্ত হয়ে বলল, 
— এতো বোকা কেনো তোরা? একটা কথা বুঝতে পারছিস না। 
তোরষা একটু গভীর চিন্তার পর বলে উঠল, 
— ওয়েট ওয়েট তুই কি ওয়াশরুমে আটকা পড়েছিস? 
— হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি ওয়াশরুমে আছি। প্লিজ আমাকে এখান থেকে বের কর। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। 
— আসছি আমরা। 
কথাটা বলেই জাওয়াদ কলটা কেটে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা সেখানে পৌছে আদাকে বের করল।বেচারি গরমে একেবারে সিদ্ধ  হয়ে গিয়েছে। ঘেমে অবস্থা নাজেহাল। সানিদ ওর দিকে তাকিয়ে নাকের সামনে হাত নাড়াতে থাকল। যেনো কোনো দুর্গন্ধ নাক থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। 
আমিরা হেসে বলল, 
— দোস্ত তুই কিন্তু ডেফিনেশনটা সেই রকম দিয়েছিস। 
আমিরার কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল। আর নাক ফুলালো আদা।
দু-হাতে পপকর্ণ বাকেট নিয়ে দৌড়ে এসে আবানের সামনে বসল এমাদ। চোখ মুখে রাজ্যের কৌতূহল। একটা পপকর্ণের বাকেট পলাশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, 
— নে শুরু কর। সব খুলে বলবি, সামান্য কাহিনিও যেনো বাদ না পড়ে। 
পলাশ পপকর্ণ মুখে ঢুকিয়ে খেতে খেতে সব বলল। একটু আগে কি কি ঘটেছে সব বলল। ঘটনার বিবরন ছিল খুবই নাটকীয়। এমাদ মুখে হাত চেপে চোখ বড় বড় করে আবানের দিকে তাকিয়ে বলল, 
— মেয়েটা সবার সামনে তোর প্রেস্টিজের বারোটা বানিয়ে দিয়ে চলে গেলো আর তুই বসে বসে দেখলি আবান? মেয়েটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিলি? 
আবান শরীরটাকে পিছনের দিকে এলিয়ে দিল।ঘাড় সামান্য কাত করে এমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, 
— তোর মনে হয় আবান শাহনেওয়াজ মেয়েটাকে ছেড়ে দিবে? 
— তাহলে কি করবি? 
আবান ঠোঁট কামড়ে হাতে থাকা কলমটা পাচঁ আঙুলে ঘুরিয়ে ঘুড়িয়ে বলল, 
— দেখতে থাক। 
____________
একটা ক্লাস করে বেরিয়ে এল তোষরারা। ক্যাম্পাসের এক কোণে এসে বসল ওরা। সানিদ চোখ বুলিয়ে পর্যবেক্ষণ করল। না কেউ নেই আশে-পাশে। সূর্যটা সামান্য তেজ কমিয়েছে।আদা অস্থির হয়ে তোষরাকে বলল, 
— মনে করে এনেছিস তো? আজ কিন্তু তোর পালা ছিল। 
তোরষা ব্যাগের চেইন খুলতে খুলতে বলল, 
— এনেছি । এতো অস্থির হচ্ছিস কেনো? বের তো করতে দিবি নাকি। 
সানিদ বলল, 
— অস্থির না হয়ে উপায় কি? একদিন নেশা না করলেই তো রাতে নেশাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি না। 
পাশ থেকে জাওয়াদ জিজ্ঞেস করল, 
— কি স্বপ্ন দেখিস তুই? 
— আমাদের এই ড্রাগসের রাজ্যে আমি উড়জি আর খাচ্ছি। আহ কি দারুন খেতে। ইয়াম্মি।
ওদের সব কথা আড়াল থেকে শুনছিল পিয়ন।এর মাঝেই তোরষা এক এক করে পাঁচটা মুড়ানো কাগজ বের করল। একে একে সকলের হাতে ধরিয়ে দিল। সানিদ মুড়ানো কাগজটা খুলতেই দেখা গেল সাদা পাউডার। যার থেকে সানিদ নাক টেনে স্মেল নিল। অতঃপর সকলে মিলে জিভ লাগিয়ে খেতে আরম্ভ করল। পিয়নের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। দিন দুপুরে ক্যাম্পাসে বসে এসব বেআইনি কাজ? এখানে বসে মাদক গ্রহন করা হচ্ছে? না না সে তো এসব হতে দিবে না। দৌড়ে গেল ভিসির কাছে । এখনই সব জানাতে হবে। 
কিছুক্ষণ পর তোষরাদের ভিসির কক্ষে ডাকা হলো। ভিসি কেনো ওদের ডাকবে কথাটা ভাবতেই ভ্রু কুঁচকে এল। তবুও দেরি না করে পিয়নের সাথে পা মেলাল। সেখানেই যেতেই ভিসির নজরে গেল ওদের পাঁচজনের মুখে, নাকে লেগে থাকা গুড়োর উপর। ভিসি নুরুল আমিন গম্ভীর স্বরে বললেন, 
— তোমরা নাকি ক্যাম্পাসে বসে ড্রাগস নিচ্ছিলে কথাটাকি সত্য? 
ভিসির প্রশ্নে আকাশ ভেঙে পড়ল ওদের পাঁচজনের মাথায়। জাওয়াদ অবাক স্বরেই বলল, 
— এসব কি বলছেন স্যার। আমাদের দেখে কি আপনার নেশাখোর মনে হচ্ছে? 
— আব্দুল নিজ চোখে তোমাদের ড্রাগস নিতে দেখেছে। আর তোমাদের মুখে তো লেগেও আছে। যেটা আমি নিজে দেখতে পারছি। 
তোরষা হাতে থাকা কাগজে থাকা পাউডারটা দেখিয়ে বলল,
— আপনি কি এটার কথা বলছেন? 
পাশ থেকে আব্দুল চিৎকার করে বলল, 
— জ্বি স্যার ওরা এটাই খাচ্ছিল। আমি নিজ চোখে দেখেছি। 
জাওয়াদ বলল, 
— এ ড্রাগস তো সবাই প্রতিদিন খাচ্ছে । আপনি নিজে ও তো খাচ্ছেন। 
আব্দুল লাফ দিয়ে বলল, 
— ছি ছি এসব আমি জীবনে ধরে ও দেখি নি।প্রতিদিন কীভাবে খাব? 
নরুল আমিন শান্ত স্বরে বলে উঠেন, 
— ধরা পড়েছো তাই অন্যকে সাথে ফাসাতে চাইছো? 
— আমরা কাউকে ফাসাচ্ছি না। এটা কোনো ড্রাগস না গুড়ো দুধ। যেটা সবাই খায় ।
নরুল আমিন ভ্র গোটাতেই জাওয়াদ কাগজে মুড়ানো গুড়ো দুধ নিয়ে ওনাকে দেখাল। তিনি ভালো করে চেক করে বুঝতে পারলেন এটা আসলেই গুড়ো দুধ।নরুল আমিন বললেন,
--- এসব কি এভাবে বসে বসে খাওয়ার জিনিস?
ওনার কথাটা বেশ গায়ে লাগল ওদের। তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল ওরা। চাপা রাগ নিয়ে সবকটা একসঙ্গে বলে উঠল,
--- গুড়ো দুধ খায় না যে জন, মানুষ নয় পশু সে জন।
ওদের কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন নরুল আমিন।তিনি টাই টেনে  আব্দুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— পরের বার কারোর উপর দোষ চাপানোর আগে সব কিছু জেনেশুনে আসবে। 
আব্দুল তো হা । সানিদ পাশ থেকে তাকে ভেংচি কাটল। ওদের পাঁচজনের বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকেই এটা প্রতিদিনকার ব্যাপার আজকে একজন কালকে অন্যজন বাসা থেকে দুধ চুরি করে আনবে আর বসে বসে নেশাখোরের মতো গিলে। অবশ্য তোরষা আর জাওয়াদের বন্ধুত্ব প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই । আদা, আমিরা, সানিদের সাথে ওদের প্রথম দেখা হয়েছিল ক্লাস টেনে। তারপর থেকেই বাড়তে থাকল সম্পর্কের গভীরতা ।
নিজেদের নির্দোষ প্রমাণিত করে  ভিসি অনুমতি নিয়ে যেই যাওয়ার জন্য ওরা পা বাড়াল ঠিক এমন সময় সানিদের কল এল। রিংটুনের গান ভেসে এল, 
  তিরিশে দিছি পা, আর কবে বিয়ে করবাম
  লেট করলে হবে দেরি, কবে ইস টু কুলু করবাম
   ঘুম আসে না, ভালো লাগে না, বেকায়দা ব্যারাম
  আমায় বিয়া দাও, বিয়া দাও, বিয়া দাও বাজান।
এমন রিংটুন শুনে সকলের চোখ ছানাবড়া। সানিদ দ্রুত কলটা কাটে।দাতঁ কেলিয়ে হেসে মুখ ফস্কে বলে ফেলল, 
— বিয়ের বয়স হয়েছে আব্বুকে মুখে বলতে পারছিনা তাই রিংটুন দিলাম আর কি । হে হে। ডোন্ট মাইন্ড ।
নিস্তবদ্ধ রুমে হুট করেই আদা রুম কাঁপিয়ে হেসে ফেলল। হাসি উঠলে ওর একটা বদঅভ্যাস আছে, সামনে যে থাকবে তাকে হয় ধাক্কাবে না হয় থাপড়াবে। এবারও বেতিক্রম হলো না। অতিরিক্ত হাসির কারনে পাশে থাকা আব্দুলকে সজোরে ধাক্কা মেরে ফ্লোরে ফেলে দিল। আব্দুল পড়ে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, 
— আমার কোমরটা গেল গেল।
আদা জিভ কাটল। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সবকটা পালাল।তোরষা রুম বের হয়েই বলল, 
— আজকের দিনটা কুফা, ভার্সিটিটাই কুফা।
পাশ থেকে সানিদ বলল, 
— ভার্সিটি কুফা না । আসল কুফা তো হলি তোরা।
( চলবে….) 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন