আমার বোনটা আমার উপর কত রাগ করেছে যে আমার বুঝ জ্ঞান হওয়া অবধি বেঁচে থাকল না বিশ্বাস করো কেশবতী ও যদি বেঁচে থাকত তাহলে আমি ওর সব ইচ্ছা পূরণ করতাম।
আচ্ছা থাক এসব কথা বাদ দাও চলো আজ একটু বাহির থেকে ঘুরে আসি অনেকদিন তো ঘুরতে যাওয়া হয় না। অনেকদিন কি তুমি এই বাসায় আসার পর থেকে আর তো ঘুরতে গেলাম না।
তাহলে আজকে বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাবেন আমি তো তেমন একটা বাইরে বের হতাম না। স্কুল যাওয়ার সময় স্কুল যেতাম স্কুল শেষে আবার বাড়ি ফিরে আসতাম।
আজকে অনেক সুন্দর জায়গায় তাহলে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব। আমার একটা নীল পাঞ্জাবি আছে ওইখানে আমি আমার বোনের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলাম একই রংয়ের। পরে বুঝেছি আমার বোনের রাগ কমেনি, শাড়িটা পরলোই না পড়বেই বা কি করে তুমি পড়ে নাও।
আরে না না তোমার বোনের শাড়ি আমি কি করে পড়ি?
আরে আমার বোকা কেশবতী তোমাকে না বললাম আমার বোন আর এই পৃথিবীতে নেই তাহলে কি করে পড়বে তুমি পড়ে নাও অনেক সুন্দর লাগবে অনেক পছন্দ হয়েছিল শাড়িটা।
আমি একটু বাহির থেকে ঘুরে আসছি তুমি গোসল করে নাও আর ঘরের কাজ তো সব শেষ আমিও কাজে যাব না বিকেলে একসাথে খাব পরে ঘুরতে যাব ঠিক আছে রান্না না থাকলে করে নাও।
আচ্ছা ঠিক আছে রান্না সব করা আছে আমার এখন আর কোন কাজ নাই তাহলে আমি একটু শুয়ে থাকি।
শুয়ে না থেকে একটা কাজ কর এই ঘরের খাটের নিচে একটা পুরনো ডাইরি আছে ওইটা বের করো উপরে নাম লেখা মাই পার্সোনাল ডাইরি।
মাই পার্সোনাল ডাইরি এটা আবার কি এখানে কি আছে বলুন না।
আরে বউ আমার খাটের নিচ থেকে আগে বের কর পরে আমি বলব কি আছে ওখানে ঠিক আছে আর মাই পার্সোনাল ডাইরি অর্থ।
তুহিনের পুরো কথা শেষ না করতে গিয়ে রায় বলে আমার ব্যক্তিগত ডাইরি জানি আমি আমাকে শেখানো লাগবে না বুঝলেন।
উফ আমি তো ভুলে গেছি তুমি তো আমার বউ তুমিতো সব জানবেই তুমি জানবে না তো আর কে জানবে।
আচ্ছা আপনি বাহির থেকে ঘুরে আসুন আমি খুঁজে বের করে রাখবো যেহেতু এটা আপনার পার্সোনালি ডাইরি তাহলে খাটের নিচে কেন রেখেছেন চুরি হয়ে যাবে তাই।
না চুরি হবে না কেউ যাতে না পড়তে পারে তাই খাটের নিচে রাইখা দিছি তুমি একটু বেশি কথা বলছো আজকাল বের করে রেখে দিলেই তো হয়।
আপনি তো বললেন বেশি কথা বলতে এখন আবার বেশি কথা বলছে এখন এসব কেন বলেন এখন সহ্য করতে হবে কিচ্ছু করার নাই আমি আর চুপ হবো না।
ঠিক আছে ঠিক আছে চুপ হতে হবে না। ডায়েরিটা বের করে রেখো। ওইটা আমি বললে তুমি পড়বা ঠিক আছে আর আমি না আসা পর্যন্ত ডাইরি কিন্তু খুলবানা এতে কিন্তু আমি খুব রেগে যাব।
আচ্ছা যান যান বাহিরের থেকে ঘুরে আসুন।
আমি বাহিরে ঘুরতে যাব আর তুমি আমাকে জান বলে ডাকছো এভাবে ডাকলে কি বাহিরে ঘুরতে যাওয়া যায়।
আমি আপনাকে বাইরে যেতে বলেছি যান।
আবারো এভাবে ডাকছো উফ বউ তোমার এই জান ডাকটা আমার কলিজায় এসে লাগছে।
আরে আপনি আবার শুরু করলেন এই যান মানে আমি আপনাকে বাইরে যেতে বলেছি।
আমার জানামতে জান ত জানি হয়। এখন তুমি আবার কোন জান আমাকে বলছো আমি কি করে বুঝবো।
উফ বাবারে আমার কথার মানে আপনি বাইরে যান।
এই মেয়ে একদম জানে মেরে ফেলবে বাবাকে হে বলো বাবা কে তোমার জামাই লাগি জামাই।
আমি কথাটা এইভাবে বলতে চাইনি আপনি যেভাবে বলতেছেন। এটা তো কথার কথা বলছি আমি।
আচ্ছা ঠিক আছে যাইতাছি আমি বাইরে তুমি মনে করে ডাইরিটা বের করে রেখো।
হুম।
তুহিন বের হয়ে যাওয়ার পর রায় খাটের নিচ পরিষ্কার করতে যায় এর আগেই সে পরিষ্কার করে ফেলত কিন্তু তুহিন একবার বলেছিল এই খাটের নিচ পরিষ্কার করতে না।
খাটের নিচে তাকাতেই রায় অবাক হয়ে যায় এত কিছু এগুলা সরাতে সরাতে তো তার দিন শেষ হয়ে যাবে ঘুরতে আর যাওয়া লাগবোনা শুধু খাটের নিচে পরিষ্কার করমু।
বাবারে বাবা খাটের নিচ নাকি আরো কিছু দুজনের একটা খাটের নিচে দুইটা লেদার যার উপরে ময়লায় ভরপুর। তার পাশে বারোটা বড় বড় বালতি ঢাকনা দেওয়া যার মধ্যে ৩০ কেজি চাল আটানো যাইবো। তার পিছে অসংখ্য বই একটাও কাজের না ওর ফ্রেন্ডরা পইড়া পইড়া ওরে দিয়া যাইতো রাখতে এগুলা বের করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যাবে তার পিছে আবার অনেকগুলা খাতা খাতার একেবারে নিচে ডাইরি।
এই কাজ করতে করতে রায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে সকাল দশটায় শুরু করেছিল আর এখন তিনটা বাজে এটা কোন কথা।
তুহিন বাড়ি ফিরে সাড়ে তিনটার দিকে রায় ততক্ষণে আবার গোসল করে ফেলে।
কেশব এখানে আসুন আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি খেয়ে নিন। আজকে একটু বেশি করে ভাত বের তো।
আচ্ছা আপনি হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসুন।
তুহিন হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে আজকে বেশ ভালোই রান্না হয়েছে তাদের বাড়ির সামনে কালকে হাঁস বিক্রেতা এসেছিল তুহিন হাঁস কিনেছি রায় সকালে উঠে সেগুলো রান্না করেছিল এখন তা দিয়ে ভাত খাবে।
তুহিনকে ভাত বেড়ে দিয়ে রায় তুহিন এর পাশে বসে। তুহিন বলে হা করো আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
আমি নিজের হাতে খেতে পারবো সকাল রাতে এমনিও আপনি আমাকে খেতে দেন না নিজের হাতে এখন কি বিকেলেও এই অধিকারটা কেড়ে নেবেন তোমাকে কত অধিকার দিলাম আমি আর তোমার থেকে এই অধিকারটা তুমি আমাকে দিতে পারছ না আমি কি তোমার থেকে বেশি কিছু চাইছি।
তা ঠিক আছে আপনি আমাকে একটা স্বাধীন জীবন দিয়েছেন তাই বলে আমি নিজের হাতে খাব না এ আবার কেমন কথা প্রতিবেলা খাওয়ে দিতে হবে আমার কি হাত কাটা গেছে।
আজ থেকে তোমাকে তোমার মতন চলতে দিলাম কিন্তু নিজের হাতে খাওয়ার অধিকার দিলাম না প্রয়োজন পড়লে এখন থেকে বিকেলে এসেও তোমাকে খাইয়ে দিয়ে যাব তুমি পারলে কিছু করে দেখাও।
আরে না এমন করবেন না আমার সাথে নিজের হাতে খাওয়ার যে মজা তাকি আর অন্য কোথাও আছে।
জীবনে তো অনেক মজা করলে এই মজা করা লাগবে না অনেক মেয়ে আছে যারা জামাইয়ের হাতে খেতে পাগল হয়ে থাকে জামাই খাওয়ায় দিতে চায় না আর তুমি এমন কেন আমি তোমাকে খাইয়ে দিতে চাচ্ছি আর তুমি খেতে চাচ্ছ না এটা কোন কথা।
প্লিজ। এত ইনোসেন্ট মুখ করে কোন লাভ হবে না।
ইনোসেন্ট আপনি ইংরেজি বলছেন।
ঠিক আছে আমি মূর্খ কিন্তু আমি একটু আকটু ইংরেজি জানি বুঝছো এভাবে অপমান করোনা আমাকে আমি তোমার জামাই লাগি।
করব আপনার কি?
না না আমার আবার কি হবে আমাকে অপমানও করবে আমার বউ আবার আমাকে সম্মানও করবে আমার বউ বউ ছাড়া আছে টা কে আমার।
দুজনে খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে নেয় তুহিন পাঞ্জাবী পড়ে কিন্তু রায় শাড়ি পরতে পারে না।
রায় কোনরকম শাড়ি পড়তে পারলেও কুচির নিচের অংশ ঠিক করতেই পারছিল না উবুর হয়ে ঠিক করতে গেলে হাতের অংশ এলোমেলো হয়ে যাবে এখন কি করব রায় নিজেও বুঝতে পারতাছে না।
তুহিন তখন নিচে বসে খুব সুন্দর ভাবে রায়ের কুচি ঠিক করে দেয়।
চলে এখন ঘুরতে যাব।
কোথায় যাব এটা তো বলেন নাই।
এটাতো সারপ্রাইজ।
আচ্ছা চলেন বের হই না হলে যেতে যেতে রাত হবে তাহলে আর ফিরবো কখন।
তুহিন রায় একসাথে বের হয়ে যায় তুহিন রায় কে আজিমপুরের কবরস্থানের সামনে একটা পার্কে নিয়ে আসে যাতে তারা ঘুরাঘুরি করে রায় তার দাদিমাকে আর তুহিন তার ছোট বোনকে দেখতে পারে।
পার্কটা বেশ সুন্দর তারা একসাথে হাত ধরে অনেকক্ষণ হাটে রায়ের ছোটবেলায় মনে হতো তার জামাই হয়তোবা তাকে কখনোই ঘুরতে নিয়ে যাবে না তার গায়ের রঙের জন্য কিন্তু তার ভাবনা একেবারেই ভুল।
আরো অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে একটা ফুচকার দোকানে ফুচকা খেতে যায় রায়ের জন্য এক প্লেট ঝাল ঝাল ফুচকা এবং তার নিজের জন্য ও এক প্লেট ফুচকা নেয়।
তারা দুজন গল্প করতে করতে ফুচকা খেয়ে শেষ করে। ফুচকা খেয়ে ফুচকাওয়ালাকে টাকা দিয়ে তারা দুজন বেরিয়ে আসে দোকান থেকে।
হঠাৎ রায়ের পায়ের সাথে তার শাড়ি লেগে পড়ে যেতে নেই তুহিন তখনই রায়ের পেটে হাত দিয়ে ধরে নেয়।
রায় তো শাড়ি পড়েছিল পেটের পাশ থেকে তার শাড়ি সামান্য সরে গিয়েছিল পড়ে যাওয়াতে তুহিন সেখানেই হাত দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে নিল তুহিনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ রায়ের সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়।
তুহিন বলে কেশবতী? ঠিক আছে।
হে আমি ঠিক আছি আপনি ছাড়ুন আমাকে লোকে দেখছে।
দেখুক তাতে আমার কি যায় আসে, প্রথমবার যখন বের হয়েছিলাম তখন তোমাকে স্পর্শও করিনি তাও লোকজন তোমার আমার সম্পর্কে খারাপ কথা বলে আমাদের বিয়ে করিয়ে দিয়েছে এখন তো তুমি আমার বউ এখন রাস্তায় তোমাকে কোলে নিয়ে হাঁটব তাতে কার কি যায় আসে আমিও দেখবো। কিছু বললে বলবো তুমি আমার বউ আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে তোমাকে ধরার। তুহিন নিচে বসে রাস্তার সকল লোকের সামনে তার কেশবতীর কুচি ঠিক করে দেয়
আচ্ছা আচ্ছা থামুন এবার।নির্লজ্জের মতন যা তা বলে যাচ্ছে আপনার কি শরম নেই ঘরে বলেন ঠিক আছে কিন্তু বাইরে কি এসব বলা যায়।
চলো তোমাকে তো এখনো স্পেশাল সারপ্রাইজ টা দেওয়াই হলো না তোমাকে তো আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাব।
এখন আবার কোথায় যাব রাত হয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার সাতটা বেজে গেছে এখনই বাড়ি চলুন।
এখন তুমি তোমার বাপের বাড়িতে নেই ঠিক আছে এটা তোমার শ্বশুর বাড়ি এখানে সন্ধ্যার ৭ টা বাজুক আর রাতের এগারোটা বাজুক কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলবে না।
তুহিন একটা কাপড় বের করে রায়ের চোখে বেঁধে দেয়। রায়ের কানে ফিসফিস করে বলে কেশবতী এখন তো আমি তোমাকে কোলেই নেব তুমি শরম পাবে তাই তোমার চোখে বেঁধে দিলাম।
তুহিনের ইচ্ছা ছিল রায়ের সাথে হাত ধরে তার দাদি শাশুড়ির সামনে যাওয়ার। হঠাৎ তুহিন দেখে তাদের বিয়ের আগে যখন সবাই রায় আর তুহিন কে মারছিল তখন এই মহিলাও ছিল মহিলাকে দেখানোর জন্যই তুহিন রায়ের চোখ বেঁধে কোলে করে নেয়।
তুহিন যখন রায়কে কোলে নিয়ে হাঁটছিল তখন মহিলাটি খেয়াল করে মহিলাটি ওদের দিকে এগিয়ে আসে অপমান করার জন্য আর তুহিন মহিলাকে এগিয়ে আসতে দেখে রায়কে বলতে থাকে বউ সারপ্রাইজ টা কেমন লাগলো এটাতো কেবলমাত্র শুরু এরপর আরো কত উপহার দেবো তুমি শুধু দেখতে থাকো।
মহিলাটি ওদের কথা শুনে আর কিছু বলে না চুপচাপ ওদের পাশ দিয়ে হেটে চলে যায়।
তুহিন রায় কে কোলে করে তার দাদি শাশুড়ি কবরের সামনে দাঁড়ায় তারপর রায়কে নামিয়ে দিয়ে তার চোখের বাঁধন খুলে দেয়। রায় তার দাদির কবরস্থান দেখে কান্না করে তখন তুহিন রায় কে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়।
তুহিন কবরস্থানের পাশে বসে কবরের উপর হাত রেখে বলে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি দাদীমা আপনার নাতনির কিছু হতে দেবো না যতদিন আমি বেঁচে আছি যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আগলে রাখার আপনি তো ওর বাবা মার সামনে ওকে বাঁচাতে পারতেন না আমি আর তা হতে দেব না আজ থেকে এখন থেকে ওকে আর কেউ অপমান করতে পারবে না।
ওর অপমান কে আমি নিজের অপমান ধরে রুখে দাঁড়াবো ওর গায়ের রঙের জন্য ও আর কোনদিন কষ্ট পাবে না বরং নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করবে। এই তুহিন আপনাকে কথা দিচ্ছে।
রাত ৮টার প্রায় এক ঘন্টা দাদির কবরস্থানে সামনে রায় বসেছিল তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে আমি আমার ননদের কবরস্থান দেখব। আমাকে দেখাবেন?
কেন দেখাবো না তোমার তো সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার রাগী বোনটাকে দেখার দেখো ওকে রাগিও না ওর শাড়ি তো তুমি পড়ে আছো।
আরে না ননদিনী আমার উপর রাগ করবেনা রাগ করবে আপনার উপর আমি বলেছিলাম এই শাড়ি পড়বো না তাও আপনি জোর করে পরিয়ে দিলেন।
তারা প্রিয়ন্তীর কবরস্থানে সামনে গিয়ে কিছু দোয়া পড়ে বাড়ি ফিরে আসে।
বাড়ি ফিরে তারা ঘুমিয়ে পড়ে কিন্তু প্রতিদিনের থেকে একটু ভিন্ন কারণ আজ তুহিন রায় কে দূরে সরিয়ে নয় তার বুকের উপর শোয়াই তার কোমর দু হতে জড়িয়ে ধরে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেয়।
এভাবে কেটে যায় আরো একটি রাত সকালবেলা প্রতিদিনের মতন রায় সব কাজ করে ফেলে আজ তাকে নিয়ে স্কুলে যাবে তার নতুন স্কুল। তাকে ভর্তি করে দেবে ১ তারিখ থেকে তার ক্লাস তার যে কি আনন্দ লাগছে তা বলার মতন না।