উপন্যাস: হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা
লেখিকা: বৃষ্টি জান্নাত
পর্ব ১: শেষ বিকেলের চিঠি
ঢাকা শহর। বুড়িগঙ্গার পাড়। বিকেল ৫টা।
আকাশে মেঘ। বৃষ্টি হবে করেও হচ্ছে না। বাতাসে কেমন গুমোট গন্ধ।
আরিয়ান চৌধুরী বসে আছে নদীর ঘাটে। বয়স ২৪। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। চোখ লাল। হাতের মুঠোয় একটা খাম। খামের উপর নীল কালি দিয়ে লেখা: *"আরিয়ান এর জন্য"
এটা নূরের হাতের লেখা। আরিয়ান চেনে। ৩ বছরে হাজার বার এই লেখা দেখছে।
খামটা কাঁপতেছে। খুলতে ভয় লাগতেছে। কারণ আরিয়ান জানে এটা তে ভালো কিছু নাই।
গতকাল রাতেও নূরের সাথে ২ ঘন্টা কথা হইছে। নূর বলছিল "কাল দেখা করি? জরুরি কথা আছে।"
আরিয়ান বলছিল "কি হইছে?"
নূর শুধু বলছিল "সামনাসামনি বলব।"
সামনাসামনি আর দেখা হয় নাই। সকালে নূরের বান্ধবী তানিয়া এসে এই চিঠি দিয়ে গেছে।
"নূর বলছে তোমাকে এটা দিতে। ও আর আসবে না।"
আরিয়ান কাঁপা হাতে খাম খুলল।
ভিতরে একটা চিঠি। ৪ লাইন।
> আরিয়ান,
>
> আমি মালদ্বীপ চলে যাচ্ছি কাল সকাল ১০টার ফ্লাইটে।
> বাবা-মা জোর করছে। আমাদের ফ্যামিলির জন্য এটা ভালো।
> তুমি আমাকে ভুলে যাও। প্লিজ আমাকে আর খুঁজো না।
> ভালো থেকো।
>
> নূর
চিঠি পড়ে আরিয়ানের দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল।
৩ বছর। ভার্সিটির প্রথম দিন থেকে। নূর মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বাবা জামাল মিয়া ছোট চাকরি করে। মা রোকেয়া বেগম মানুষের বাসায় কাজ করে।
আর আরিয়ান? রাশেদ চৌধুরীর ছেলে। ঢাকার নাম করা বিজনেসম্যানের একমাত্র ছেলে।
তবুও ওরা ভালোবাসছিল। নূর বলতো "টাকা দিয়ে কি হবে? তুমি থাকলেই হবে।"
আরিয়ানও বলতো "আমার সব তুমি।
আক কই নূর কই তর ভালো বাসা?
পেছন থেকে কে যেন ডাকল, "ভাইয়া।"
আরিয়ান পেছন ফিরল। ওর ছোট বোন তোহা। বয়স ১৬। চোখে পানি।
"ভাইয়া বাসায় চল। মা কান্না করতেছে। বাবা রাগ করতেছে।"
"কেন?" আরিয়ানের গলা বসে গেছে।
"বাবা জানছে তুমি ওই মেয়ের জন্য পাগল। বাবা বলছে ওই মেয়েকে ভুলে যেতে। নাহলে... নাহলে তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে।"
আরিয়ান হাসল। তেতো হাসি।
"বাড়ি? যে বাড়িতে নূর নাই, ওটা বাড়ি না তোহা। ওটা জেলখানা।"
বলে উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে ফোন বের করল। নূরের নাম্বার ডায়াল করল।
টুট... টুট...
ওপাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠ: "আপনি যাকে কল করছেন, তার নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।"
আরিয়ান নদীর দিকে তাকাল। পানি কালো। আকাশ কালো। ওর বুকের ভেতরটাও কালো।
বিড়বিড় করে বলল, "নূর, তুমি বলছিলা না আমাদের ভালোবাসা বৃষ্টির মতো? বৃষ্টি কখনো হারায় না..."
এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে পড়ল। বুঝল না ওটা বৃষ্টির পানি নাকি চোখের পানি।
সেদিন রাতে আরিয়ান বাড়ি ফিরলো না। পর দিন সকালে।
আরিয়া বাড়ি ফিরল মা জিগ্যেস করলো কোথায় ছিলি
সে জবাব দিল না সোজা পাসপোর্ট নিয়ে!
আরিয়ান হাতে পাসপোর্ট নিয়ে দাঁড়ায় আছে। চোখ লাল। ৩ দিন ধরে ঘুম নাই।
বাবা: "কোথায় যাবি তুই?"
আরিয়ান: "মালদ্বীপ। নূরকে আনতে"
বাবা: "ঐ মেয়ের জন্য পাগল হইছিস? সংসার ভাসায় দিবি?"
আরিয়ান পা ধরে বসল। "বাবা, ওরে ছাড়া আমি মরে যাবো"
বাবা লাথি মেরে সরায় দিল। "মর! আমার এই বাড়িতে তোর জায়গা নাই।
বের হয়ে যা এখনই। আমার অফিসের ১ টাকাও তুই পাবি না"
আমি বলছি বের হয়ে যা"
আরিয়ানের চোখে পানি নাই। সব শুকায় গেছে।
হাতে শুধু একটা ব্যাগ। ব্যাগে ২টা জামা, নূরের ছবি, আর পাসপোর্ট।
বের হওয়ার সময় মা ৫০ হাজার টাকা গুঁজে দিল। "বাবা সাবধানে যাস"
আরিয়ান দরজা দিয়ে বের হয়ে পেছনে তাকাল না।
শুধু বিড়বিড় করল, "নূর, তোমার জন্য আজ আমি নিংশ
মালদ্বীপ এয়ারপোর্ট - রাত ২টা
" বাষা বুঝে নাহ আরিয়ান?
হঠাৎ পিছন থেকে কেও ডাকলো
আরিয়ান?? ওই আরিয়ান??
পেছনে তাকিয়ে দেখে সোহেল। সাদা গাড়ি। দামি ঘড়ি।
"তুই!!! ক্লাস ৫ এর আরিয়ান???"
আরিয়ান হে তুই সোহেল,
সোহেল হে কেমন আছিস আর তুই এই খানে কেন
আরিয়ান সব খুলে বলে
সোহেল সব শুনে বলল, "বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিছে?
সমস্যা নাই দোস্ত। আজ থেকে আমার বাড়িই তোর বাড়ি।
আর আমার কোম্পানিতেই কাজ করবি। আমরা মিলে নূরকে খুঁজবো"
আরিয়ান সোহেলের সাথে ওর বাড়িতে গেল,
দুই বন্ধু মিলে কাজ শুরু করলো ""
"" ২ বছর পর
"চৌধুরী & সোহেল ট্যুরস" এর ব্যানার।
আরিয়ান এখন মালদ্বীপের নাম করা বিজনেস মেন
গায়ে স্যুট। কিন্তু রাতে ছাদে গেলে আবার সেই ছেড়া পাঞ্জাবির আরিয়ান হয়ে যায়।
ডায়েরিতে লিখে: "বাবা, আজ আমি কোম্পানির মালিক।
কিন্তু তোমার বাড়ির দরজাটা আজও বন্ধ। আর নূরও নাই"
মালদ্বীপ। রাত ১টা। "নূর ট্যুরস" এর অফিসের ছাদ।
আরিয়ান ছাদে বসে আছে। হাতে সিগারেট না। হাতে নূরের পুরান ছবি।
চোখ বন্ধ করতেই ৩ বছর আগের দিনগুলা ছবির মতো ভাসতেছে।
ফ্ল্যাশব্যাক*
ঢাকা ইউনিভার্সিটি। নূর লাইব্রেরিতে। সাদা জামা।
আরিয়ান প্রথম দেখেই ক্রাশ খাইছিল।
এরপর ৬ মাস নূরের পিছনে ঘুরা। চিঠি দেয়া। ফুল দেয়া।
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে প্রোপজ: "নূর, আমি তোমাকে ভালোবাসি"
নূর লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ছিল। সেদিন থেকে প্রেম।
এই সব মনে করে চিতকার করলো
"নূউর..." আরিয়ান হাও মাও করে কান্না করে দিল।
হঠাৎ পেছন থেকে, "দোস্ত কাঁদিস না"
সোহেল। হাতে গাড়ির চাবি।
"চল শপিং এ যাই। মন ভালো হবে। আজ 7 নাম্বার ফ্লোর থেকে শপিং করবো"
*মালদ্বীপ সিটি মল - 7 নাম্বার ফ্লোর
লিফট উপরে উঠতেছে। আরিয়ান নিচে তাকাল।
আর সাথে সাথেই বুকের ভেতর ধ্বক!!!
নিচে একটা মেয়ে। কালো বোরকা। মুখে মাক্স।
কিন্তু হাঁটার স্টাইল... চুলের ঢেউ... এটা নূর!!!
"নূর!!!!" আরিয়ান পাগলের মতো চিৎকার দিয়ে 4 এর বাটন চাপল।
লিফট খুলতেই সোজা সিঁড়ি দিয়ে দৌড়।
ঠাসস করে পড়ে গেলো পা কেটে রক্ত। তবুও খেয়াল নাই।
পুরো মল খুঁজল। "নূর... নূর... কোথায় তুমি??"
হাও মাও করে কান্না।
সোহেল দৌড়ে এসে আরিয়ানকে জরাই ধরে ক্লিনিকে নিল। পায়ে ব্যান্ডেজ।
তারপর আরিয়ান কে সোহেলের বাসায় নিয়ে গেলো সোহেল ঘুমায় গেলো " আরিয়ানের চোখে ঘুম নাই।
*রাত ৩টা। মালে সিটি*
আরিয়ান চুপ করে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল।
গন্তব্য: পুরো মালে সিটি। একটা একটা গলি।
গাড়ি চালাতে চালাতে কাঁপা কাঁপা গলায় গেয়ে উঠল:
"জান রে মন তরে আমায় মারিস না...
জান রে তুই এত নিষ্ঠুর হতে পারিস না..."
বলেই আবার হাও মাও করে কান্না।
সমুদ্রের পাশ দিয়ে যেতেই...
একটা মেয়ে। মুখে মাক্স। গায়ে কয়েকটা আঘাতের দাগ।
মেয়েটা গাড়ির গ্লাসে টোকা দিল।
আরিয়ান গ্লাস খুলতেই মেয়েটা ইশারায় বলল "চুপ"
তারপর গাড়িতে উঠে বসল।
আরিয়ান গাড়ি ঘুরায় সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে থামাল।
মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
আরিয়ানের হাত কাঁপতেছে। জীবনে প্রথম কোনো মেয়ের এত কাছে।
আস্তে করে মাক্সটা খুলল... অন্ধকার। দেখা যায় না।
ফোনের ফ্ল্যাশ অন করল। মেয়েটার মুখে আলো পড়তেই...
আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।
"নূর !
আরিয়ান মেয়েটাকে বুকে জড়ায় ধরে হাও মাও করে কান্না।
"নূর তোকে আমি কত জায়গায় খুঁজেছি... কত রাত তোর জন্য কান্না করেছি...
কোথায় ছিলি তুই???"
আধা ঘণ্টা কান্নার পরে। আরিয়ান চোখ মুছল।
"তুই আমাকে কাঁদাইছিস? আমিও তোকে কাঁদাবো"
মেয়েটাকে কোলে করে বাসায় নিয়ে আসল। বেডে শোয়ায় দিল।
নিজের মুখে মাক্স পড়ল। তারপর আস্তে করে নূরের জ্ঞান ফেরালো....
---
#হারিয়ে_ফেলা_ভালোবাসা #বৃষ্টি_জান্নাত
---