সকাল সাতটা।
মির্জা বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠে গেলেও ইরায়া নূরের ঘুম ভাঙার কোনো নামগন্ধ নেই।
বিয়ের পর প্রথম সকাল।
আর সেই প্রথম সকালেই ইরায়া এমনভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন গতকাল বিয়ে নয়—ম্যারাথন দৌড়ে এসেছে!
রাইয়ান ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ ইরায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা একেবারে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়ে আছে।
রাইয়ান আস্তে করে বলল,
—“মিস ইরায়া?”
কোনো উত্তর নেই।
—“ইরায়া?”
আবারও কোনো সাড়া নেই।
রাইয়ান এবার একটু জোরে বলল,
—“ইরায়া!”
ইরায়া চোখ না খুলেই বলল,
—“আর পাঁচ মিনিট...”
রাইয়ান অবাক হয়ে বলল,
—“পাঁচ মিনিট আগে থেকেই আপনি পাঁচ মিনিট বলছেন।”
ইরায়া চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
—“তাহলে আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন।”
রাইয়ান মাথা নেড়ে হাসল।
—“ঠিক আছে।”
দশ মিনিট পর...
—“ইরায়া, উঠুন।”
—“উঠছি।”
আরও দশ মিনিট পর...
—“ইরায়া।”
—“উঠছি তো!”
রাইয়ান এবার হেসে ফেলল।
—“আপনি গত বিশ মিনিট ধরে উঠছেন, কিন্তু বিছানা থেকে উঠছেন না।”
ইরায়া হঠাৎ চোখ খুলে বসে বলল,
—“আপনি আমাকে ঘুমাতেও দেন না!”
—“সকাল আটটা বাজে।”
—“তাতে কী?”
—“নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।”
ইরায়া হাই তুলে বলল,
—“সবাইকে বলুন আমি অসুস্থ।”
রাইয়ান ভ্রু তুলে বলল,
—“কী অসুখ?”
ইরায়া একটু ভেবে বলল,
—“ঘুমের অসুখ।”
রাইয়ান হেসে ফেলল।
—“এই অসুখের চিকিৎসা খুব কঠিন।”
—“কী চিকিৎসা?”
—“আরও পাঁচ মিনিট ঘুম।”
ইরায়া খুশি হয়ে আবার বালিশে মাথা রাখতেই রাইয়ান বলল,
—“তবে পাঁচ মিনিট পর নিজেকেই উঠতে হবে।”
ইরায়া চোখ খুলে তাকাল।
—“আপনি খুব চালাক।”
—“ধন্যবাদ।”
—“আবার ধন্যবাদ!”
—“আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া কঠিন।”
ইরায়া বালিশটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আর একটা কথা বললে এটা আপনার মাথায় যাবে।”
রাইয়ান হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
—“ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি।”
রাইয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই ইরায়া বিছানায় বসে নিজের মাথায় হাত দিল।
—“এই মানুষটার সঙ্গে সারাজীবন কীভাবে থাকব?”
তারপর নিজেই ফিসফিস করে বলল,
—“তবে মানুষটা খারাপ না।”
কথাটা বলেই নিজের গালে হাত দিয়ে বলল,
—“ইরায়া! বিয়ের একদিন পরেই এসব ভাবছিস কেন?”
নিচে ডাইনিং টেবিলে মেহরিন বসে বসে ঘড়ি দেখছে।
—“ভাবি এখনও আসেনি?”
রাইয়ান শান্তভাবে চা খেতে খেতে বলল,
—“না।”
মেহরিন হেসে বলল,
—“ভাইয়া, তুমি গিয়ে ডাকো।”
—“ডেকেছি।”
—“উঠেছে?”
—“না।”
মেহরিন হাসতে হাসতে বলল,
—“ওকে উঠানো সহজ না।”
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ইরায়া নামতে নামতে বলল,
—“কে বলেছে?”
মেহরিন হেসে বলল,
—“আমি।”
ইরায়া এসে বসে বলল,
—“তোর ভাই আমাকে সকাল থেকে বিরক্ত করছে।”
রাইয়ান শান্তভাবে বলল,
—“আমি শুধু আপনাকে উঠিয়েছি।”
—“বারবার!”
—“কারণ আপনি উঠছিলেন না।”
মেহরিন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—“তোমরা দুজন একদম বাচ্চাদের মতো।”
ইরায়া বলল,
—“তোর ভাইয়ের দোষ।”
রাইয়ান বলল,
—“আপনার।”
—“আপনার!”
—“আপনার!”
দুজন একসঙ্গে বলে থেমে গেল।
মেহরিন মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—“আবার শুরু হলো!”
নাস্তা খেতে খেতে রাইয়ান লক্ষ্য করল, ইরায়া চুপচাপ প্লেটের এক পাশে বসে আছে।
সে জিজ্ঞেস করল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“তাহলে এত চুপ কেন?”
ইরায়া নিচু গলায় বলল,
—“আজ আমার ডান্স প্র্যাকটিস ছিল।”
রাইয়ান বলল,
—“তাহলে যান।”
ইরায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—“আমি যেতে পারি?”
—“অবশ্যই।”
—“আপনার আপত্তি নেই?”
—“আপনার নাচ আপনার স্বপ্ন। বিয়ে হয়েছে বলে সেটা বন্ধ করতে হবে কেন?”
ইরায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
রাইয়ানও হাসল।
—“এবার কিন্তু সত্যিকারের ধন্যবাদ।”
ইরায়া হেসে ফেলল।
দুপুরে ইরায়া ডান্স প্র্যাকটিসে গেল।
রাইয়ান অফিসে যাওয়ার আগে তাকে নামিয়ে দিল।
গাড়ি থেকে নামার সময় ইরায়া বলল,
—“আপনি কখন আসবেন?”
—“অফিসের কাজ শেষ হলে।”
—“ঠিক আছে।”
রাইয়ান গাড়ি চালু করতে যাচ্ছিল।
ইরায়া হঠাৎ বলল,
—“শুনুন!”
—“হুম?”
—“আজকে কিন্তু আপনার গান শুনব।”
রাইয়ান হেসে বলল,
—“আপনার নাচ শেষ হলে।”
—“ডিল।”
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ইরায়া দেখল, রাইয়ান সোফায় বসে গিটার বাজাচ্ছে।
ইরায়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুনল।
রাইয়ান তাকে দেখে বলল,
—“এসেছেন?”
—“হুম।”
—“আজকের প্র্যাকটিস কেমন হলো?”
—“ভালো।”
—“পা ব্যথা করছে?”
ইরায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি কীভাবে জানলেন?”
—“ডান্স প্র্যাকটিস করলে পা ব্যথা করতেই পারে।”
ইরায়া হাসল।
—“আপনি আমার ব্যাপারে অনেক কিছু খেয়াল করেন।”
রাইয়ান একটু থেমে বলল,
—“আপনি আমার স্ত্রী। খেয়াল তো রাখতেই হবে।”
ইরায়ার মুখে হালকা লজ্জার হাসি ফুটে উঠল।
সে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
—“গানটা আবার গাইবেন?”
—“কোনটা?”
—“যেটা কাল গেয়েছিলেন।”
রাইয়ান গিটার ঠিক করে আবার বাজাতে শুরু করল।
ইরায়া এবার একদম সামনে বসে শুনতে লাগল।
গান শেষ হওয়ার পর সে হাততালি দিয়ে বলল,
—“আপনি সত্যিই অনেক ভালো গান করেন।”
—“আর আপনি ভালো নাচেন।”
ইরায়া হেসে বলল,
—“তাহলে আমরা একটা টিম হতে পারি।”
—“কেমন টিম?”
—“আপনি গান করবেন, আমি নাচব।”
রাইয়ান বলল,
—“খারাপ আইডিয়া না।”
ইরায়া হাত বাড়িয়ে বলল,
—“পার্টনার?”
রাইয়ান তার বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—“পার্টনার।”
দুজনের হাত মিলল।
কিন্তু এই ছোট্ট হাত মেলানোটা যেন তাদের সম্পর্কের নতুন একটা অধ্যায়ের শুরু করে দিল।
রাতে ইরায়া নিজের ফোনে কিছু খুঁজছিল।
হঠাৎ রাইয়ান এসে বলল,
—“কী করছেন?”
—“আপনার একটা গান খুঁজছি।”
—“কেন?”
—“কালকের গানটা আবার শুনব।”
রাইয়ান মুচকি হেসে বলল,
—“আমার গান এত ভালো লেগেছে?”
ইরায়া দ্রুত বলল,
—“গান ভালো লেগেছে, গায়ক না।”
রাইয়ান হেসে বলল,
—“আমি তো গায়কই।”
ইরায়া থেমে গেল।
তারপর বলল,
—“আপনি খুব চালাক।”
—“আপনি আমাকে প্রতিদিন নতুন নতুন প্রশংসা করছেন।”
—“প্রশংসা নয়!”
—“ঠিক আছে।”
রাইয়ান চলে যেতে লাগল।
ইরায়া হঠাৎ পেছন থেকে ডাকল,
—“রাইয়ান!”
রাইয়ান থেমে ঘুরে তাকাল।
—“হুম?”
ইরায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
—“আজকের জন্য... ধন্যবাদ।”
—“কিসের জন্য?”
—“আমার নাচকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।”
রাইয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—“আপনার স্বপ্নকে সম্মান করা আমার দায়িত্ব।”
ইরায়ার মুখে এবার সত্যিকারের হাসি ফুটল।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে দুজনের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরছিল—
“এই মানুষটার সঙ্গে জীবনটা হয়তো এতটা খারাপ হবে না।”
চলবে…