#ঘুণে_খাওয়া_মেঘ
#সামিয়া_সারা
#কাজিন_রিলেটেড_গল্প
পর্ব - ৫৯
"ইহান বিপদমুক্ত এখন",খবরটি বোধহয় সবচেয়ে বেশি খুশি করেছে চৌধুরী শাজাহান রনি কে। বড়সড় এক স্বস্তির শ্বাস ফেলে তিনি হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যান তার পিএস কে কল করতে করতে।
ইহানের পরিচিত ছোট ভাইরা, বন্ধুরা সকলে ভীষণ খুশি। সকলের মধ্যে ভয় বিরাজমান ছিল এতোক্ষণ। তবে এখন সব শান্ত।" ইহানের এক্সি*ডেন্ট টা আসলেই এক্সি*ডেন্ট কি না "এ বিষয়টা প্রশাসনের কাছে চলে গিয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় তারা তদন্ত আসবেন না। নীল স্বয়ং তাদেরকে জানিয়েছে এটা এক্সি*ডেন্ট এবং তাদের পরিবার কোনো কেস করতে চায় না। ইনায়ার কান্না এখন থেমেছে।নীল হাত ধরে তাকে ইহানের কাছে নিয়ে গিয়েছিলো।
দেওয়ান বাড়িতে শুনশান নিরবতা।শিমু জাহান সকলের জন্যে রান্না করছেন। সাথে আনান এসেছে। সারাদিন হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করেছে সে। বাড়িতে এসেই জামা কাপড় ছেড়ে গোসলে গেলো আনান। শিমু জাহান বাড়ির সকলের জন্য খাবার বানিয়ে ইহানের জন্য বানালেন স্যুপ।
এক কাপ পানি তে ১ চামচ চিকেন কিমা করে দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দিলেন ১ চামচ কুচি করা গাজর। অর্ধেক টা আলু ছোট ছোট করে কেটে দিলেন।একটা লাউ এর কিছু অংশ কুচি কুচি করে কেটে দিলেন সাথে। এসকল কিছু দেওয়া হলে দেন এক চিমটি লবণ। ডক্টররা ঠিক যেমন বলেছিলেন মনে করে করে ওভাবেই রান্না করেন তিনি। তেল ঝাল একেবারেই দিতে মানা করেছিলেন। তাই এক ফোঁটা তেল দেয় এতে।
শিমু জাহান রান্না করতে করতে একটু চেখে দেখলেন কেমন হয়েছে। মুখে একটু নিতেই চোখ মুখ কুঁচকে যায় তার। চামচ তুলে কিছুক্ষণের জন্যে ভাবলেন ইহানের কথা।
কিছুদিন আগে রান্নায় লবণ কম হয়েছিলো বলে ইহান সেদিন খাবার আর মুখেই তোলেনি। শিমু জাহান কে বলেছিলেন,
-বড়মা তুমি জানো না! আমার খাবারটা একদম পারফেক্ট হতে হয়?
হাতে ইশারা দিয়ে একটু থেমে বলে,
-তেল ঝাল মাসালা সব মিডিয়াম টাইপ হবে। ওভার কুকড হবে না। লবন টা যেন একদম ঠিকঠাক হয়। আর ঠিকমত বয়েলড হতে হবে। তোমরা কীভাবে ভুলে গেলে?
আয়েশা আক্তার গম্ভীর গলায় সেদিন বলেছিলেন,
-এতোটুকুও যেদিন পাবি না?
-অভিশাপ দিলে?
ইহান প্লেটেই পানি ঢেলে হাত ধুয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যায়। শিমু জাহানের ডাকও শুনেছিলো না আর। ভাবতে ভাবতে চোখে পানি আসে শিমু জাহানের । মনে মনে বললেন,
-আজ কিচ্ছু পারফেক্ট হবে না আমার ছেলেটার।
তবে মুহুর্তেই আবার চোখের পানি মুছে বললেন,
-ও যে বেঁচে ফিরেছে এই জন্যেই খোদার কাছে কোটি শুকরিয়া। আর কিছু লাগবে না।
.
.
.
আনানের কিছুদিন পরেই এসএসসি পরীক্ষা। তবে পুরো একদিন হয়েছে সে বই ছুঁয়েও দেখেনি। গোসল শেষ করে বই নিয়ে বসে ছেলেটা। চুলও মুছেনি। চুল থেকে টুপ টুপ করে পানি পড়ে ভিজে গিয়েছে পড়নের টি-শার্ট। তার সমস্ত মন এখন বই এর পাতায়।কাল সকালে প্রাইভেট আছে,অথচ পড়া শেষ হয়নি। দ্রুত সেগুলো করতে শুরু করে।আধা ঘন্টা সময় মতো সেগুলো পড়ার সময় পায়।এরই মাঝে শিমু জাহান তাকে ডাকতে আসে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই
বললেন,
-চল বের হই,আমরা গেলে তোর মা আর অনু আবার আসবে।
আনান বই বন্ধ করে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-হু চলো..
-খেয়ে নে তাহলে। তোর মা আর অনু বাসায় এসে খাবে। আর আমি বাকিদের জন্য খাবার নিয়ে নিয়েছি।
-আমি খাবো না।
শিমু জাহান চিন্তিত হয়ে বললেন,
-কেন বাবা? দাদাভাইয়া তো এখন আগের থেকে ভালো আছে। আর তুমি তো সারাদিন না খেয়ে। খেয়ে নাও।
আনান সোজাসাপ্টা বলল,
-ইনুও তো না খেয়ে বড়মা। ও না খেলে আমিও খাবো না!
শিমু জাহানের কপালে ভাঁজ পড়ে আনানের কথা শুনে। ডাইনিং টেবিলে বসে বলা নীলের কথা মনে পড়ে যায় তার।তবে মুখে কিছু বললেন না। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন,
-জামা কাপড় তো ভিজিয়ে ফেলেছিস! মাথাটাও মুছতে পারো না আনান। এতো বড় ছেলে হয়েছে নাম মাত্র। শুধু লম্বা ই হয়েছেন। বোস! মুছিয়ে দেই।
আনান পুনরায় বসে। শিমু জাহান পরম যত্নে মাথা মুছিয়ে দেয় আনানের। মাথা মোছাতে মোছাতে বললেন,
-তুই তো নীলকে লম্বায় ছাড়িয়ে যাবি যা মনে হচ্ছে। এখনই ছয় ফুট ছুঁই ছুঁই।
আনান মুচকি হাসলো শিমু জাহানের কথা শুনে। নীলই দেওয়ান বাড়ির সবচেয়ে লম্বা আর সুদর্শন পুরুষ। তাকে ছাড়িয়ে যাবে মানে বিরাট বড় ব্যাপার।আনান মনে মনে খুশি হয়।
.
.
.
শিমু জাহান খাবার নিয়ে হসপিটালে এসেছেন। আনানের হাতে এক বক্স আর শিমু জাহানের হাতে এক বক্স। আকবর দেওয়ান দুইটা কেবিন নিয়েছেন। আয়েশা আক্তার এখনো কেবিনেই আছেন। আর আরেকটা ইহানের জন্য নিয়ে রেখেছেন। তাকে এখানেই শিফট্ করবেন। পাশাপাশি কেবিন দুটোই। নীল ইনায়ার আগে পিছে সারাদিন।মেয়েটা একটুও স্থির হয়ে বসে না। এদিকে সব কিছু সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত। মা কে আসতে দেখে নীল একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। ইনায়াকে শিমু জাহানের কাছে দিয়ে নীল বলল,
-নাও ধরো ওকে।অনেক জ্বালাতন করেছে।না মারতে পেরেছি আর না গালি দিতে পেরেছি!
শিমু জাহান চোখ বড় করে তাকায় নীলের দিকে। বললেন,
-বেচারা এমনিই সারাদিন না খেয়ে নীল। ওকে নিয়ে কিছু বলবি না একদম!
-কে না খেয়ে?
-ইনু
-নিজের ছেলের দিকে তাকাও একটু মা। ও ঠিকই খেয়েছে। সাথে আমার মাথাও খেয়েছে।
শিমু জাহান নীলকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। নীল মাথার চুল টেনে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিমু জাহান কিছুটা দূরে গিয়ে বললেন,
-জলদি এসে এক্ষুনি খেয়ে নিবে নীল। ইনায়াকেও নিয়ে এসো। ওকে খাওয়াতে হবে।
আরান আর রিসানও এসে দাঁড়ালো নীলের পাশে। নীল ওদের দিকে না তাকিয়ে বলল,
-চল খেয়ে নেই।
-খেয়ে এসেছিলাম বাসা থেকে।
-ওহ্
আরান একটু থেমে বলল,
-তোর কী তোর বোনকে গালি দিতে ইচ্ছে করছে নীল?
নীল এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,
-কে বোন? কার বোন? আমার তো কোনো বোন নেই!
আরান ভ্রু কুঁচকে বলল,
-এটা তো ইহান তোকে বলতে বলতে,কিন্তু তুইই তো বোন বোন বলে ফেনা তুলতি।
নীল কিছু বলে না। রিসান বলল,
-গালি দিতে চাইলি না তখন? একটা গালি মাথায় এসেছে..
নীল আড় চোখে রিসানকে দেখে বলে,
-কী?
রিসান ফিসফিস করে বলল,
-"নীলের বউ"
দুই বন্ধু হাসছে। দীর্ঘ অনেক সময় পরে তাদের মুখে একটু হাসি ফুটেছে। নীল নিজেও হেঁসে দেয় তাদের দেখে। বলে,
-এটা আবার কেমন গালি? "নীলের বউ!"
.
.
.
আনান নিজেও সারাটাদিন না খেয়ে দেয়ে ঘুরছে। তাই ইনায়াকে ডেকে এনে পাশে বসায়। আকবর দেওয়ান ওয়ান টাইম প্লেট,গ্লাস আর দশ লিটার পানি আনিয়ে রেখেছিলেন। টেবিলে খাবার রেখে শিমু জাহান সব ঠিকঠাক করার মধ্যে আনান গিয়ে বলল,
-বড়মা আমাদের খেতে দাও। ও না খেলে খেতে পারছি না আমি।
শিমু জাহান একটু ইতস্তত বোধ করলেও আনানকে বুঝতে দেন না। প্লেটে খাবার বেড়ে দেয় সুন্দর করে। তবে বিপত্তি ঘটে যখন আনান মুখে তুলে ইনায়াকে খাওয়াতে যায়।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নীল শক্ত করে আনানের হাত ধরে ফেলেছে। তারপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি তে শিমু জাহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি ওকে বলেনি যে নীলা খেয়েছে?
শিমু জাহান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
-আরে বাবা! তাতে কী? আবার খাবে! বিরক্ত করিস না নীল।
নীল মায়ের কথার আর কোনো জবাব দেয় না। ইনায়ার সামনে দাঁড়িয়ে আনানের বলল,
-তুই খেয়ে নে চুপচাপ। মেজাজ খারাপ আছে আমার। সারাদিন না খেয়ে তুই,ও না। নিজের কথা ভাব। আমি ওকে দেখছি।
বলে নীল হাত ধুয়ে প্লেটে খাবার তুলে শুরুতেই ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ইনায়া কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নীলের দিকে। কী ভাবলো কে জানে? তবে সে দৃষ্টি উপেক্ষা করে নীল বলল,
-হা কর
ইনায়া ভালো বাচ্চার মতো বড় করে হা করেছে।
.
.
.
ইহানকে কেবিনে আনা হয়েছে। তবে কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই সে। নলের মাধ্যমে খাওয়ানো হবে। শিমু জাহান সুন্দর করে স্যুপ ছেঁকে নিয়েছেন। তবে ইহানকে খাওয়ানোর মতো মানসিক শক্তি তার নেই। ছেলেটার কষ্ট চোখে দেখার মতো না। ফারিনের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। তবে কিছু প্রকাশ করছে না। বারবার করে চোখের পানি আড়াল করছে। আর যতোবারই নীলের সামনে পড়ছে ততবারই চোখ ফিরেয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। শাজাহান রনি ফারিনের মনে গেঁথে দিয়েছেন একটি কথা-
"দেওয়ান পরিবার কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।আমাদের নানা ভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করবে,তাই সাবধান।"
ফারিন তাই কারো সাথেই ফ্রি হতে পারছে না। তার ধ্যান জ্ঞান চিন্তা তে শুধুই ইহান। ইহানকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নয় ফারিন। আত্মবিশ্বাস সবাইকে নিয়ে বলল,
-যাকে মন থেকে আমার স্বামী ভেবে ফেলেছি,যাকে বিয়ে করতে চাই,তার সব কাজ গুলোও আমি নিজ হাতেই করবো।
শিমু জাহানের বেশ পছন্দ মেয়েটাকে। দেওয়ান বাড়ির সকলেই কমবেশি পছন্দ করেছে ফারিনকে একমাত্র নীল ব্যতীত।
ইহানকে খাওয়ানোর সময় ফারিন কানতে কানতে বিড়বিড় করে বলল,
-ইনান খুব খারাপ,ও তোমাকে পছন্দ করে না ইহান। তোমাকে ও হিংসা করে। তুমি সুস্থ হও,আমি সব বলবো তোমাকে।
চোখের পানি মুছে পুনরায় বলল,
-সবই বলে দিবো।
.
নীল এসেছে ইহানের কাছে। ভাই এর মাথার সাদা ব্যান্ডেজের উপরেই হাত রাখে আলতো করে। ইহানের চোখ পিটপিট করছে। হাতের আঙ্গুল হালকা নাড়ানোর চেষ্টা করলো সে। এরই মাঝে রিসান এসে ডাক দেয় নীল কে। নিম্নস্বরে বলল,
-বাইরে আয়।
নীল বেরোতেই দেখে বাইরে পুলিশ দাঁড়িয়ে। আকবর দেওয়ান মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছেন। নীলকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
-তুমি বলেছে ইহান এক্সি*ডেন্ট করেনি? মার্ডা*রের চেষ্টা করেছে কেউ ওকে এসব বলেছো?
আকবর দেওয়ান কথা কানে আসতেই নীলের মস্তিষ্ক চৌধুরী শাজাহান রনিকে খুঁজতে থাকে। আশে পাশে তাকিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা করতেই দেখে পেছনের দিকে গম্ভীর ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। নীলের রাগে হাত পা কাঁপছে। কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলো,
-জ্বী ,যা সত্য তাই বলেছি।
আকবর দেওয়ান হাত উঠিয়েও নামিয়ে ফেললেন। বললেন,
-ছোট মানুষ হয়ে এতো বেশি বুঝতে হয় কেন তোমার নীল? কে বলেছিলো এসব নিয়ে ভাবতে?
-ও আমার ভাই বা..
-চুপ! একটা কথাও বলবে না!
শাজাহান রনি বেরিয়ে এসেছেন ভীড় ঠেলে। আকবর দেওয়ান কে বললেন,
-আহা ভাই শোনেন! ও বলেছে তাতে তো সমস্যা নাই! বুঝেন নাই কথা? সমস্যা হলো-ও আমার নাম নিয়ে আসছে এসবে মধ্যে। ধরেন আপনারা আমাদের আত্মীয় হবেন,তারজন্যে আমি মুখ বুজে থাকলাম । কিন্তু আমার সমর্থন করে যারা তারা আবার এটা মানতে নারাজ।
-আমি আর কী বলবো..
-আপনার কিছু ভাবতে হবে না। জেলে যাক না হয়,আমরা ছাড়ায়ে আনবো কয়েকদিন পড়ে। জনগন ঠান্ডা হোক আগে। বুঝেনই তো। বুঝেন নাই? রাজনীতির সব ব্যাপার স্যাপার!
(চলবে.....
আমার প্রিয় পাঠক পাঠিকারা, গল্পটি নিয়ে আপনাদের মন্তব্য শুনতে চাই। একদম সব্বাই কমেন্ট করে জানিয়ে দিন,কেমন লেগেছে আপনাদের কাছে। আর আগের পর্বে এতো ভালোবাসা দেওয়ার জন্য অনেক কৃতজ্ঞতা। ভালোবাসা নিবেন 🥺🫶🏻