— "আমি একজন পয়ত্রিশ বৎসরের পুরুষ হইয়া কি করিয়া মাত্র বারো বৎসর বয়সী এক শিশুকন্যাকে বিবাহ করিতে রাজি হইতে পারি, আব্বাজান? জমিদারীর ভার কাঁধে লওয়ার জন্য এহেন নিম্ন কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নহে।"
জমিদারবাড়ির বিশাল বৈঠকখানাজুড়ে আলী আনসারী খানের ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হইলো। ঘরের একপাশে দাঁড়াইয়া থাকা ভৃত্যগণ ভয়ে মাথা নিচু করিয়া ফেলিলেন। এমনভাবে উত্তরাধিকারী জমিদারকে কখনো তাঁহারা কথা বলিতে শুনেন নাই।
সামনের কারুকার্যময় সেগুন কাঠের আসনে বসিয়া থাকা জমিদার আমিনুল্লাহ খান চোখ তুলে চাহিলেন নিজ পুত্রের পানে। বয়সের ভারে তাহার চুলে রূপালি আভা ফুটিয়া উঠিলেও দৃষ্টির কঠোরতা এখনো অটুট রহিয়াছে। পুত্রের উত্তপ্ত প্রতিবাদ শুনিয়া তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিয়েন.....
— "এটি কোনো সাধারণ বিবাহ হইতে যাইতেছে না, আলী। এই বিবাহের মাধ্যমে দুই জমিদার পরিবারের মধ্যকার বহু বছরের র*ক্ত-ক্ষয়ী বিরোধের অবসান ঘটিবে। তাই তোমার না করিবার কোনো সুযোগ নাই। কারণ তুমি এই বিবাহে অস্বীকৃতি জানাইলে পুনরায় র*ক্ত-পাত শুরু হইবে। প্রাণ হারাইবে বহু নিরীহ প্রজা, ভস্মীভূত হইবে অসংখ্য পরিবার।"
আলী আনসারী খান এক মুহূর্তের জন্য স্থির দৃষ্টিতে পিতার দিকে তাকিয়া রহিলেন। অতঃপর ধীর পায়ে জানালার নিকট গিয়া দাঁড়াইলেন। বাহিরে সূর্যের তেজ কমিয়া আসিতেছে বুঝিয়া দূরে ক্ষেত হইতে নিজ নিজ ঘরে ফিরিতেছেন সকল কৃষকেরা। তিনি পুনরায় ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন......
— "প্রজাদের জীবন রক্ষা করা আমার কর্তব্য ইহা আমি জানি। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য একটি অবুঝ শিশুকন্যার শৈশব কাড়িয়া লওয়া ইহা কিরূপ ন্যায়, আব্বাজান? যে কন্যা আজও পুতুল লইয়া খেলিবার বয়সে আছে তাহাকে আমি কিরূপে আমার স্ত্রী বলিয়া স্বীকার করিবো?"
আমিনুল্লাহ কিছুক্ষণ নীরব রহিলেন। তারপর ভরাট কণ্ঠে বলিলেন.....
— "তুমি যাহা ভাবিতেছো আমিও তাহাই ভাবিয়াছি। বিশ্বাস করো আলী! এই সিদ্ধান্ত লইতে আমারও হৃদয় হইতে র*ক্ত-ক্ষ*রণ হইয়াছে। কিন্তু জমিদারী সামাল দেওয়া এতো সহজ না। মাঝেমাঝে এমন কিছু সিদ্ধান্ত লইতে হয় যাহার ভার বহন করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হইয়া যাবে বলিয়া মনে চিন্তা কাজ করে। জমিদারি ক্ষমতা যাহার কাঁধে পরে তাহার কেবল নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও চাহিদার কথা চিন্তা করিলেই হয় না, পাশাপাশি হাজারো মানুষের জীবন-মরণের দায়িত্বও যেহেতু তাঁহার উপর বর্তায় তাই তাহাদের কথাও সমানভাবে ভাবিতে হয়।"
অতঃপর আমিনুল্লাহ আসন ত্যাগ করিয়া পুত্রের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন....
— "পশ্চিম পরগণার জমিদার আবদুল কাদির চৌধুরীর সহিত আমাদের শ*ত্রুতা প্রায় বিশ বৎসরের। এই দীর্ঘ সময়ে কতো নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাইয়াছে, কতো নারী বিধবা হইয়াছে, কতো শিশুরা পিতৃহীন হইয়াছে তাহার হিসাব কেহ সঠিক ভাবে দিতে পারিবে না। দুই পক্ষ বহুবার অস্ত্র উঠাইয়াছে। আদালত, সালিশ, মধ্যস্থতা কোনো কিছুতেই সমাধান হয় নাই। অবশেষে উভয় পরিবারের প্রবীণেরা সিদ্ধান্ত লইয়াছেন একমাত্র আত্মীয়তার বন্ধনই পারিবে এই শত্রু*তার অবসান ঘটাইতে।"
আলী দৃঢ়স্বরে বলিলেন....
— "তাহা হইলেও আমার বয়স আর কন্যার বয়সের মধ্যকার পার্থক্য লইয়া প্রবীণদের একবার চিন্তা করা উচিত ছিলো। তাহারা ইহা করার প্রয়োজন মনে করেন নাই। সমাজ ইহাকে স্বাভাবিক বলিয়া মানিলেও আমার বিবেক ইহা মানিতে অস্বীকার করিতেছে।"
আমিনুল্লাহ খান পুত্রের কাঁধে হাত রাখিয়া বলিলেন.....
— "আমি জানি তোমার ভিতর লালসার থেকে বিবেক বেশি কাজ করে। আর এই কারণেই আমি নিশ্চিত হইয়া কহিতে পারিতেছি, যদি সেই কন্যার ভাগ্যে তোমার সহিত এই বিবাহ লিখিত থাকেই তবে তোমার ন্যায় নিরাপদ মানুষ তাহার জন্য আর কেহ হইতে পারিবে না।"
আলী ভ্রু কুঁচকাইয়া বলিলেন.....
— "আপনি কি বলিতে চাহিতেছেন?"
— "আমি বলিতে চাহিতেছি, এই বিবাহ বর্তমানে কেবল রাজনৈতিক সন্ধির প্রতীক হইবে। যতোদিন পর্যন্ত কন্যাটি পূর্ণবয়স্কা না হইতেছে ততোদিন তুমি তাহার প্রতি কেবল অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করিবে। তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু ঘটিবে না। এই শর্ত আমি নিজ হাতে লিখিয়া উভয় পরিবারের মধ্যে তুলিয়া ধরিবো।"
কথাগুলো শুনিয়া আলী কিছুটা বিস্মিত হইলেন। কিন্তু অন্তরের অস্বস্তি এখনও পুরোপুরি দূর হইলো না। আলী বলিলেন.....
— "আর যদি সেই কন্যা নিজেই এই বিবাহে সম্মতি না দেয়, তখন কি হইবে?"
আলীর এই প্রশ্নে আমিনুল্লাহ খান খানিক স্তব্ধ হইয়া গেলেন।খানিকক্ষণ নীরব থাকিবার পর বলিলেন.......
— "সেই প্রশ্নের উত্তর আমার নিকটও নাই, আলী। এই সমাজে কন্যাদের মতামতের মূল্য যে বড়ই সামান্য। আর ইহা যে অন্যায় তাও আমি জানি। কিন্তু এমন অনেক বিষয়ই রহিয়াছে এই সমাজে যেইসব ক্ষেত্রে একজন জমিদার নিজের ক্ষমতা খাটাইয়াও কিছু করিতে পারেন না।"
আলী মাথা নিচু করিয়া বলিলেন......
— "সন্ধি রক্ষার অন্য পথ থাকিলে আমি জীবন দিতেও রাজি ছিলাম। কিন্তু একটি শিশুকন্যার শৈশব কাড়িয়া লইয়া তাহাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করিবার মতো নিম্ন কাজ কখনও আমাকে করিতে হইবে তাহা আমি কল্পনাও করিতে পারি নি।"
ঘরজুরে বিরাজ করিতেছিলো নিস্তব্ধতা। এই যুগে ব্যক্তিগত ইচ্ছাগুলো সব হারাইয়া যাইতো বংশের সম্মান বাঁচাইতে যাইয়া। ঠিক তেমনি বহু অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আলী আনসারী খানকেও এই বিবাহে সম্মতি দিতে হইলো।
...........
কয়েকদিন পর পালকিতে করিয়া নববধূ আসিলো। বারো বৎসরের কিশোরী কন্যা নাম তাহার মেহরূন খাতুন। ফর্সা, মায়াবী, নিরীহ মুখশ্রী জুরিয়া নিজের অজানা ভবিষ্যত লইয়া আ*ত*ঙ্কি*ত হইবার ছাপ স্পষ্ট ফুটিয়া ছিলো। বিবাহের পর আজ আলী ও মেহরূনের প্রথম রাত। সেই রাতে আলী প্রথমবার তাহার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিলেন।
আলী মেহরূনের থেকে যথাযথ দূরত্ব রাখিয়া বসিয়াই বলিলেন.....
— "ভয় পাইও না। তোমার বয়স এখনো খেলিবার, পড়িবার তাহা আমি জানি। তাই আমি তোমার উপর কখনো কোনো জোর খাটাইবো না।"
মেহরূন মাথা নত রাখিয়া পালঙ্কের উপর বসিয়া ছিলো। আলীর কন্ঠে এরূপ ভরসাযোগ্য বাক্য শুনিবার পর মেহরূন মাথা খানিক উঠাইয়া বলিলো......
— "একটি কথা বলিতে চাই যদি আপনি রাগ না করিয়া বসেন!"
— "কি কথা বলিতে চাও?"
— "আমার একটি বা*জে স্বভাব আছে যাহার কারণে বাবার গৃহে থাকাকালীন আমায় অনেক কথা শুনিতে হইতো। কিন্তু আমি কোনোভাবেই সেই স্বভাব পরিবর্তন করিতে পারি নাই।"
—"কি স্বভাব?"
—"আমার যেকোনো বিষয়েই কৌতুহল বেশি কাজ করে। আমি কোনো কিছু জানিবার জন্য অপর ব্যক্তিকে অতিরিক্ত প্রশ্ন করিয়া বসি। এতে তিনি রাগ করিয়া বসেন নতুবা বিরক্তি বোধ করেন। আপনাকেও যদি একই ভাবে প্রশ্ন করিয়া বসি আপনি আমার এই স্বভাবটাকে কিভাবে লইবেন যদি বলিতেন!"
আলী মৃদু হাসিয়া বলিলেন....
— "প্রশ্ন করিতে জানে যাহারা, তাহারাই একদিন পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করিতে সক্ষম হয়। তোমার যতো খুশি ততো প্রশ্ন তুমি আমায় করিতে পারিবে বিনা সংকোচে। আমি কখনও রাগও হইবো না, বিরক্তিও বোধ করিবো না।"
মেহরূন কিছুক্ষণ চুপ থাকিবার পর বলিলো....
— "আমি, পড়িতে চাই।"
এক মুহূর্তের জন্য সময় যেনো থমকাইয়া গেলো। কারণ সেই যুগে মেয়েদের হাতে বই দেখিলেই সমাজ বলিতো, "বই হাতে লইলেই মেয়েরা নষ্ট হইয়া যাইবে, সংসারধর্ম ত্যাগ করিয়া উড়িতে শিখিবে।"
#চলবে_ইনশাআল্লাহ.....
#জমিদার_আলী_আনসারী_খান
#পর্ব_১
#মাইশা_জান্নাত_নূরা (লেখিকা)