"আমি আপনার ছানাদের আম্মু হতে......
ঠাস....
কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই একটা প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া করা থাপ্পড় এসে পড়ল “অষ্টাদশী নরম গালে। মুহূর্তেই তার গালটা টনটন করে জ্বলে উঠল, যেন সেখানে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বলন্ত গালে হাত চেপে ধরে সামনে তাকাতেই অষ্টাদশীর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল।
ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে অতিরিক্ত মাত্রায় সুদর্শন এক যুবক। ধূসর চোখের বিরক্তিকর চাহনি আর কুঁচকে থাকা ভুরু জানান দিচ্ছে তার চরম অসন্তোষ।
“অষ্টাদশী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, এই মুহূর্তে তার এই যুবকের ওপর ক্রাশ খাওয়া উচিত, নাকি তার দেওয়া চড়ের তীব্র ব্যথায় কেঁদে ফেলা উচিত।
ওর এই দ্বিধাবিভক্ত ভাবনার মাঝেই সামনে থাকা পুরুষটি গম্ভীর, রাগী গলায় ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে বলল,
"ডাক্তার হতে এসেছ, নাকি বেবিস মম হতে? কলি থেকে ফোটার আগেই বেবিস মম হওয়ার শখ জাগার কারণ?"
অপমান আর লজ্জায় রিদির মাথা যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। একটা সেকেন্ডের জন্যও তার সাহস হলো না চোখ তুলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে তাকানোর। বান্ধবীদের সাথে করা একটা বোকা বাজিই যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। অপরিচিত এক কঠোর মানুষের কাছে এমন চড় খাওয়ার পর রিদির পুরো পৃথিবীটাই যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে।
মাটি থেকে চোখ না তুলেই সে কান্নাভেজা গলায় মিনমিন করে বলল, "সরি ভাইয়া... আমি আসলে বুঝতে—"
কিন্তু রিদিকে পুরো বাক্যটা শেষ করার সুযোগটুকুও দিল না ওই সুদর্শন যুবক। রাগে ফেটে পড়ে সে গর্জে উঠল,
"আই হ্যাভ আ সিস্টার! যাকে তাকে বোন বানানোর শখ নেই আমার। গেট আউট ফ্রম মাই সাইড!"
কথাটা শেষ করেই রিদিকে পাশ কাটিয়ে রাগে থমথমে মুখে গটগট পায়ে সে ওখান থেকে চলে গেল।
এদিকে রিদি এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তার সাথে ঠিক কী ঘটে গেল। গালে হাত দিয়ে সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল শূন্যতার দিকে। তার দোষটাই বা কোথায় ছিল? একটুখানি বোকামি আর একটা ফাজলামোর খেসারত যে এতটা ভয়ংকর হবে, কে জানত? ব্যথায় গালটা তখনো টনটন করছে, চোখের কোণে জমে উঠেছে কান্নার নোনা জল।
ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁপতে কাঁপতে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এল তার তিন বান্ধবী—পৃথা, সুমি আর ফারহা।
চারপাশের থমথমে বাতাসে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পেতেই সুমি যেন খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরল রিদিকে। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে তার গলা দিয়ে তখন শুধু একরাশ আকুলতা আর বুকফাটা শঙ্কা বেরিয়ে এল,
"তুই কী করছিস ভাই, কাকে বাচ্চার বাবা বানাতে চেয়েছিস জানিস?"
রিদির চোখের সেই নিষ্পাপ কৌতূহল আর ভ্রু কুঁচকে থাকা প্রশ্নবোধক দৃষ্টি তখন থমকে থাকা বাতাসে সুমির আতঙ্কিত মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল।
ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া সুমি দুহাতে রিদির কাঁধ চেপে ধরে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে উঠল,
"এমপি ফারিস খন্দকারের ভাই, আর শিক্ষা মন্ত্রী সারহান চৌধুরীর একমাত্র ছেলে! তাও যেই সেই ছেলে না ভাই। লোকে বলে এক কথায় বেয়াদব, কথার আগেই হাত চলে। এর সামনে ভয়ে বড় বড় নেতারা পর্যন্ত কাঁপে। এই লোক নাকি মারামারি আর বেয়াদবিতে পিএইচডি করা। তার সাথে এই কলেজের কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার প্রফেসর হিসেবে জয়েন করেছে!
সুমির এই বিস্ফোরক তথ্য শুনে রিদির পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সে চমকে উঠে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার মানে এটাই কি তবে তার সেই রগচটা খালাতো ভাই, যে বছরের পর বছর দেশের বাইরে কাটিয়ে দিয়েছে? কিন্তু মানুষটা দেশে ফিরলই বা কবে? আর ফিরলেই বা তাদের কী যায় আসে? ওই পরিবারের সাথে তো বহু যুগ ধরে ছায়াও মাড়ানোর সম্পর্ক নেই যে তারা এসব খবর জানবে!
রিদির মনে যখন এসব চিন্তার ঝড় বইছে, ঠিক তখন ফারহা আনমনা হয়ে তাকিয়ে রইল দূরে মিলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ্যের যাওয়ার পথের দিকে। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গিয়ে সে বুঁদ হয়ে ফিসফিস করে বলল,
"সে যাই হোক, দেখতে হেব্বি! ইস, কী হাঁটার স্টাইল! কপাল কুঁচকে কীভাবে কথা বলল, আমি তো পুরা ফিদা!"
ফারহার এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আর বুঁদ হয়ে থাকা কথাগুলোয় রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন বিষাক্ত বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে উঠল। পরিস্থিতি হালকা করতে সে জোর করেই কথা ঘুরিয়ে খটমটে গলায় বলল,
"চল ক্লাসে যেতে হবে। আজকের ক্লাসটা ইম্পর্টেন্ট!"
কথা শেষ করেই রিদি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে সামনের দিকে পা বাড়াল। তার ঠিক পেছনেই ছায়ার মতো নিঃশব্দে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল পৃথা আর সুমি।
এদিকে ফারহা তখনো গালে হাত গুঁজে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। হঠাৎ বান্ধবীদের দ্রুত হেঁটে চলে যাওয়ার শব্দে তার ধ্যান ভাঙল। ঝটকায় বাস্তবে ফিরে সে রিদিদের পিছু নেওয়ার জন্য এক দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"ওই দাঁড়া, তোরা! আমি আসছি!"
সৌহার্দ্য চৌধুরী— একত্রিশের কোঠায় পা রাখা এক সুদর্শন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। শিক্ষা মন্ত্রী সারহান চৌধুরী ও স্বনামধন্য গাইনোকলজিস্ট ডা. শাহেদা চৌধুরীর একমাত্র সন্তান! একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ ধরে নয় বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের সাথে জোর করে বিয়ে দেওয়ায় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখে। তবে এই অল্প কয়েক দিনেই তার রগচটা আর বদমেজাজি স্বভাবের কারণে বেশ বদনাম কামিয়ে নিয়েছে!
এদিকে আরমান খান, রামিশা খানের আদরের ছোট মেয়ে রিদিতা খান। শ্যামবর্ণের মায়াবী চেহারা ছোটখাটো একটা পুতুল। রং শ্যাম হলেও তার মায়াবী চেহারা যে-কোনো পুরুষের কঠিন হৃদয় থমকে দিতে বাধ্য!
রিদিরা ক্লাসে প্রবেশ করার আগেই কড়া নাড়ার সুযোগ না দিয়ে প্রফেসর ঠিকই ক্লাসের ভেতরে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। বুকটা তখন ভয়ে ঢিপঢিপ করছে সুমির। কাঁপাকাঁপা গলায় খানিকটা মিনমিন করে সে বলেই ফেলল, "আসতে পারি স্যার?"
প্রফেসর আরিয়ান খান প্রজেক্টর থেকে চোখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। তারপর তার সেই চিরপরিচিত স্বভাবসুলভ নরম কণ্ঠেই শীতল গলায় বললো, "এসো।"
অনুমতি পেয়ে তিন বান্ধবী আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত ক্লাসে ঢুকে নিজেদের জায়গায় গিয়ে বসল। কিন্তু আরিয়ানের চোখ তখনো স্থির। রিদির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে সে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "দেরি হওয়ার কারণ?"
রিদি একটু থতমত খেয়ে খুব ছোট করে মিষ্টি স্বরে উত্তর দিল, "জ্বি স্যার, বাইরে একটু সমস্যা হয়েছিল।"
আরিয়ান এরপর আর একটি কথাও বাড়ালো না। নিজের লেকচারে সম্পূর্ণ মন দিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক একটানা ক্লাস করিয়ে গম্ভীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।রিদির নিজের চাচা আকরাম খানের ছেলে, অর্থাৎ সম্পর্কে তার আপন চাচাতো ভাই!
ক্লাস শেষ করে তিন বান্ধবী বের হয়ে গেইটের সামনে এক বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম নিয়ে খেতে খেতে গল্প করছে। রিদি কথা বলার মাঝে আনমনে মুখ দিয়ে বাদামের খোসা থু করে ছুড়ে মারল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে আসা এক যুবকের মুখের ওপর গিয়ে সেটা পড়ল!
মুখে বাদামের খোসা ও থুথুর মতো কিছু এসে পড়ায় যুবকটি থমকে দাঁড়াল। রাগে চোয়াল শক্ত করে সামনে তাকাতেই তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। রাগে-অপমানে জ্বলে উঠে সৌহার্দ্য চোয়াল শক্ত করে হিসহিস করে বলে উঠল, "ইউ হাফ ইঞ্চি ফুলা,গাল কাম!"
কারো ধমকের এমন বিকট আওয়াজ কানে আসতেই রিদি চমকে চোখ তুলে তাকাল। সামনে সৌহার্দ্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল আর সে ভয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলল। মনে মনে ভাবল, আজ কোন পাপ করে ঘর থেকে বের হয়েছিল আল্লাহই জানে! বারবার এই পেঁচামুখো গন্ডারের সাথেই কেন এমন অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে চলেছে?
ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা করে রিদি বলে উঠল, "ওয়ালাইকুম আসসা— না মানে আসসালামু আলাইকুম স্যার?"
সৌহার্দ্যের রাগ যেন নিমেষেই বাঁধ ভেঙে কয়েক গুণ বেড়ে গেল! চোখের পলকে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে উপচে পড়া রাগ আর চরম বিরক্তি নিয়ে সে রিদির নরম তুলতুলে গালটা লক্ষ্য করে সজোরে একটা কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রাগে কটমট করে তাকিয়ে সে হিসহিস করে বলে উঠল, "স্টুপিড, ম্যানারহীন গার্ল!"
দ্বিতীয় দফায় সৌহার্দ্যের এমন শক্ত হাতের নিষ্ঠুর থাপ্পড়ে মেয়েটার মায়াবী শ্যামবর্ণ গালটা মুহূর্তেই টুসটুসে লাল হয়ে ফুলে উঠল। আকস্মিক এই অপমানে বুকটা ভেঙে এলেও তীব্র জ্বালা ও ব্যথায় সে গালে হাত গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল। বাবা আর আদুরে ভাইয়ের কাছে সে তো রাজপ্রাসাদের রাজকন্যার মতো— কেউ কখনো গায়ে একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত পড়তে দেয়নি, অথচ আজ এই রাক্ষুসে লোকটা তাকে সবার সামনে কথায় কথায় গায়ে হাত তুলছে!
রিদির চোখের কোণে জল দেখেও সৌহার্দ্যের রাগ কমল না; বরং তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত বিরক্তি ভর করল। সে কঠোর গলায় ধমক দিয়ে বলে উঠল, "স্টুপিড! ডোন্ট ক্রাই! গেট আউট ফ্রম মাই সাইড!"
রিদি ভয়ে একদম চুপসে গেল। কে জানে, মুখ খুললে লোকটা আবার না ঠাস করে আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়! এমনিতে থাপ্পড়ের চোটে তার গালটা তখনো জ্বলে যাচ্ছিল। রিদি কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে সেখান থেকে সরে যাওয়ার উপক্রম করতেই সৌহার্দ্যের গমগমে ও তীক্ষ্ণ গলার ভারী আওয়াজ ভেসে এল, "স্টপ দেয়ার!"
রিদি থমকে দাঁড়িয়ে গালে হাত দিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে কড়া গলায় বলে উঠল, "ইউ ফুলা গাল, ম্যারেড উইমেন?"
সৌহার্দ্যের মুখে এই কথা শুনে রিদি যেন একদম তব্দা খেয়ে গেল! তার মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে এই লোকটার কোন দিক থেকে বিবাহিত বলে মনে হলো? রিদি ভয়ে ভয়ে সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকাতেই তার আত্মা কেঁপে উঠল। লোকটা যেন ঠিক একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এমন হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, একটু ভুলভাল উত্তর দিলেই বুঝি তাকে টুপ করে গিলে খাবে!
রিদি কাঁপাকাঁপা ভয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, "জ্বি মানে... না স্যার!"
সৌহার্দ্য চরম বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে ফেলে শীতল গলায় বলল, "ডিসগাস্টিং গার্ল!" — বলে সে বড় বড় পা ফেলে সেখান থেকে চলে গেল।
এদিকে রিদি একদম বোকা বনে তাকিয়ে রইল। তার মানে সে বিবাহিত না বলাতেই লোকটা তাকে 'ডিসগাস্টিং' বলে চলে গেল? তার কি তবে এখনই বিবাহিত হওয়া উচিত ছিল নাকি! রিদি রাগে নাক-মুখ কুঁচকে মনে ফুঁসে উঠল, "লুচ্চা ডাক্তার! মনে হয় বিবাহিত মহিলা খুঁজে খুঁজে পরকীয়া করে বেড়ায়! ছিঃ, খালামণি কি জানে তার ছেলে এত বড় লুচ্চা, যে ঘুরে ঘুরে বিবাহিত মহিলা খুঁজে বেড়ায়!"
বিকালের নরম আলোয় ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন সারহান চৌধুরী ও ফারিস খন্দকার। ফারিস হলো সৌহার্দ্যের বড় মামার ছেলে। ফারিসের জন্মের সময় তার মা মারা যান এবং বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় ডা. শাহেদা চৌধুরী এই ভাতিজাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং নিজের সন্তানের মতোই বড় করেন।
সারহান চৌধুরী তখন ফারিসের সাথে রাজনৈতিক কোনো এক বিষয় নিয়ে গুরুতর কথা বলছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করল সৌহার্দ্য। চারপাশের দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে সে হনহন করে পায়ে সিঁড়ির দিকে উঠতে যাবে, এমন সময়ই সারহান চৌধুরীর তীব্র ধমকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো সৌহার্দ্য!
সারহান চৌধুরী রাগী ও কঠোর গলায় গর্জে উঠে বললেন, "বীরের গায়ে হাত উঠিয়েছ কেন তুমি?"
বাবার এমন তীব্র ধমক শুনেও সৌহার্দ্যের রাগের এতটুকু কমতি হলো না; বরং তার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছিল। সে উল্টো তিন গুণ তেজ আর চরম বিরক্তি নিয়ে বাবার চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা ও শক্ত গলায় বলে উঠল, "হাত আছে, তাই উঠিয়েছি!"
এত বড় স্পর্ধা দেখে সারহান চৌধুরীর রক্ত মাথায় চড়ে বসল। এই ছোট্ট একটা জবাব দিয়েই সৌহার্দ্য যখন উদাসীনভাবে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন সারহান চৌধুরী ক্ষোভে ফেটে পড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, "বেয়াদব ছেলে! তুমি কি দেশে এসেছ গুন্ডামি করতে?"
বাবার এমন কথায় সৌহার্দ্য এক পলক ফিরে তাকাল। তার চোখের সেই চাউনিতে উপচে পড়া বিরক্তি আর অনীহা স্পষ্ট ফুটে উঠল। সে কাঠখোট্টা গলায় বলে উঠল, "বেশি ভদ্রতা আমার পোষায় না!" — বলেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
সারহান চৌধুরী তখনো রাগে হাঁপাচ্ছেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, ঠিক তখনই ফারিস শান্ত মুখে এগিয়ে এসে মৃদু গলায় বলল, "তুমি শান্ত হও মামা, আমি দেখছি!"
ফারিসের এমন নির্লিপ্ত কথা শুনে সারহান চৌধুরীর রাগ যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। তিনি ফারিসের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, "তুমি তো কোনো সমস্যা হলেই ওই কাস্টমার কেয়ারের মতো এক কথা বলো — 'শান্ত হন, আমি দেখছি'! সমস্যা সমাধান তো দূরের কথা, তুমি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলো, বেয়াদব কতগুলো!"
ওনার এমন কড়া কথা শুনে ফারিস মনে মনে তীব্র বিরক্তিতে কুঁকড়ে গেল। সে মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'নিজের গোডাউনে ভেজাল পণ্য উৎপাদন করে রেখেছ, আর এখন দোষ পড়ছে আমার ঘাড়ে। এখন আমার পিছু লেগেছে!' — মনে মনে অসন্তোষ চেপে রেখে সেও আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা নিজের মতো করে ঘর ছেড়ে উঠে চলে গেল।
গোধূলির ধোঁয়াশা আলোয় ছাদে একা বসে আছে রিদি। ভিডিও কলে সে তখন কথা বলছে সায়েম, পৃথা, ফারিহা ও সুমির সাথে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রিদির উদ্দেশ্যে সায়েম প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "কিরে, আজ ক্লাসে আসিসনি কেন?"
সায়েম মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে জবাব দিল, "আরে আর বলিস না, লুজ মোশন হয়ে গেছে!" বলেই সে হঠাৎ খেয়াল করে রিদির দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী ও চিন্তিত গলায় বলল, "তোর মুখের এই অবস্থা কী? গালটা অমন লাল হয়ে আছে কেন?"
সায়েমের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুমি চটপট করে বলে উঠল, "আরে আর বলিস না, ওই সৌহার্দ্য স্যা..."
সুমির কথা মাঝপথেই কেড়ে নিয়ে সায়েম নাক-মুখ কুঁচকে ঘৃণাভরে বলে উঠল, "ওই খাটাশটা তো আমাদের ক্লাসে পায় না, তাহলে ও রিদিকে মারল কীভাবে?"
ফারিহা তখন চোখে-মুখে তীব্র ক্রোধ ফুটিয়ে তুলে বলে উঠল, "স্যারের কোনো দোষ নেই, ও নিজের ভুলেই মার খেয়েছে!"
পৃথা সঙ্গে বাধা সেঁধে তেড়ে উঠে বলল, "তুই এখন ওর দোষ দিচ্ছিস কেন? ডেয়ারটা তো তুই-ই দিয়েছিলি! বল তো ওর সাথে তোর শত্রুতা কী, কেন সব সময় রিদিকে এভাবে ফাঁসাতে চাস?"
নিজেকে ধোয়া তুলসি পাতা প্রমাণ করার চেষ্টা করে ফারিহা আমতা আমতা করে বলল, "আমি তো শুধু দুষ্টামি..."
ফারিহার কথা শেষ হতে না দিয়েই সায়েম ধমকের সুরে রিদিকে একচোট শুনিয়ে দিল, "তোকে কতবার বলছি, যার-তার কথায় যা-তা করবি না?" — বলেই সে রাগী দৃষ্টিতে তাকাল ফারিহার দিকে, কারণ এই মেয়েটাকে সায়েম একদম চোখের বিষের মতো সহ্য করতে পারে না!
পরিস্থিতি খারাপ দেখে ফারিহা কাচুমাচু মুখ করে রিদির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল, "সরি রিদি!"
কিন্তু রিদি তখন চরম অপমানে ও মনে ভেঙে পড়ে আছে। সে আর একটা কথাও বাড়াল না। বন্ধুদের সাথে ভিডিও কল থেকেই বিদায় নিয়ে ফোনটা একপাশে রেখে চুপচাপ বসে রইল।
ফারিস তখনো ফোনে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলতে বলতে ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ করে পেছন থেকে কেউ একজন হুড়মুড় করে এসে সোজা তার শক্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। আকস্মিক এই ধাক্কায় চমকে গিয়ে ফারিস চোখ তুলে তাকাতেই দেখল — রিভা!
রিভা হলো তার ছোট মেজো খালা রায়েদা শেখের মেয়ে। লন্ডনে থাকে পুরো পরিবার, আর সৌহার্দ্যের সাথেই তারা সদ্য দেশে ফিরেছে বলে খালার বাড়িতেই থাকছে।
হঠাৎ এমন ঘটনায় ফারিসের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস আর তীব্র বিরক্তি একসাথে বেরিয়ে এল। মেজাজটা তার মুহূর্তেই তিরিক্ষি হয়ে উঠল। সে চরম রাগ ও অসহ্য এক বিরক্তি নিয়ে রিভাকে এক ঝটকায় নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দিয়ে তেতে উঠে বলে উঠল:
"আপদের ঘরের বিপদ! হোঁচট খাওয়ার জন্য তুই সব সময় কি আমাকেই খুঁজে পাস? আমি কি রাস্তার মোড়ের কোনো সরকারি মাল নাকি!"
ফারিসের এমন ব্যঙ্গাত্মক ও ঝাঁঝালো কথার পরেও রিভা এতটুকু দমল না; বরং তার চোখের সেই দুষ্টু মিটিমিটি আলোয় এক অপূর্ব চপলতা খেলে গেল। সে তিন গুণ তেজ দেখিয়ে চটজলদি জবাব দিল, "এমপিরা তো সরকারি মালই হয়, ফারিস ভাই!"
রিভার এমন কথায় ফারিস যেন রাগে ফেটে পড়ার জোগাড় হলো। তার চোয়ালগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সে রাগে থমথমে গলায় রিভাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে ধমকে উঠল:
"আপদের ঘরের বিপদ! উল্টাপাল্টা কথা বললে থাপ্পড়ে তোর আধভাঙা দাঁত ফেলে দেব। সর আমার সামনে থেকে!"
— বলেই ফারিস আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, রাগে গজগজ করতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
এদিকে রিভা একটুও ভয় পেল না; বরং ফারিসের যাওয়ার সেই রাগী ও শক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে এক ফালি দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে মনে মনে মুখ ভেংচে বলে উঠল, "যতই রাগ দেখান না কেন, কীভাবে আমার প্রেমে না পড়ে থাকেন — সেটা আমি ভালোভাবেই দেখে নেব!"
#সৌহার্দ্য_রিদির_প্রেমবিলাস
#রিদিতা_চৌধুরী
সূচনা পর্ব