#প্রিয়_প্রণয়িনী২
#জান্নাত_নুসরাত
(৩৭) প্রথম অংশ
নিজাম শিকদারের বাড়ির সামনে কখন থেকে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছেন সুফি খাতুন। নিজাম শিকদার দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি লক্ষ করছেন তা। এই ভদ্রমহিলা এখানে এসে এরকম চোরের মতো হাবভাব করছেন কেন, তার কারণ খুঁজে পেলেন না তিনি। আকস্মিক পর্দা চেপে ধরা হাত কেঁপে উঠল। উনি আবার না সেদিনকার মতো গোলাপ ফুলগুলো চুরি করতে আসছেন। চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় করে হাতে বিড়াল মারার লাঠিটা নিলেন। গত কয়েকদিন যাবত ওই বাড়ির মেঝো মেয়ের বিড়ালটা একটু বেশি জ্বালাচ্ছে। উৎকৃষ্ট করে রেখেছ সবকিছু। নিজে নিয়ে আসছে বিড়াল আর ছেড়ে রেখেছে মানুষের বাড়িতে। সেদিন যখন দেখলেন তখন পেটটা সামান্য ফোলা মনে হলো। হয়তো বাচ্চা টাচ্চা হবে, ওগুলো নিয়ে যদি তার বাসায় আস্তানা ঘাড়ে তখন এসব সাফসফা করবে কে! হাতে লাঠি শক্ত করে চেপে ধরে পা বাড়ালেন ভদ্র মহিলাকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। সদর দরজা খুলে, চিৎকার করে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে বললেন,”কী চাই?
সুফি খাতুন কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালেন। একহাত শাড়ির আঁচলের নিচে ঢাকা। নিজেও এক ভ্রু উচিয়ে শুধালেন,”কিছু জানেন, নাকি এভাবেই?
পরবর্তী কথা আর পূরণ করলেন না, ইশারা দিয়ে বুঝিয়ে ফেললেন ফাউলের মতো হাসাহাসি করছেন। নিজাম শিকদার ঢোক গিলে এত বড় অপমান হজম করে নিলেন। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দু-হাত আড়াআড়ি বেঁধে শুধালেন,”কেন এসেছেন?
সুফি খাতুন উপহাস করে বলে ওঠলেন,
“আপনার নাতনীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
নিজাম শিকদার হেসে উড়িয়ে দিলেন সুফি খাতুনের কথা। মুখ দিয়ে ‘'হাহ’ করে কিছু শব্দ বের করলেন। বলে ওঠলেন,”আমার নাতনী নাছিরের বাড়িতে।
“এটাই ভাবতে থাকুন, গতকাল রাতেই ধরে নিয়ে গেছে।
“হেহ আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব কেন?
সুফি খাতুন নিজের কথায় ধীরতা বজায় রাখতে বললেন,”কেন বিশ্বাস করবেন না আপনি?
এমন করে অনেকক্ষণ যাবত চলল দু-জনের ভেতর বাকবিতন্ডায়। হঠাৎ সুফি খাতুন চকচক করতে থাকা লেডিস পিস্তল বের করলেন শাড়ির আড়াল হতে। নিজাম শিকদারের দিকে তা তাক করে বলে ওঠলেন,”চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসুন, আর আমাকে নিয়ে সিলেট সদর থানায় চুপচাপ চলুন।
নিজাম শিকদার ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেলেন। শঙ্কিত চোখে চেয়ে দু-হাত উপরের দিকে তুলে নিজেকে স্যারেন্ডার করলেন। ভয়ার্ত কন্ঠে বললেন,”গাড়ি বের করছি, আপনি প্লিজ হাইপার হবেন না!
সুফি খাতুন ঠোঁট বাঁকালেন। ঈষৎ ব্যগ্রতা নিয়ে ঠোঁট উচিয়ে বললেন,”সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে, আঙুল বাঁকাতে হয়।
পিস্তল মাথার দিকে তাক করে অগ্রসর হলেন সুফি খাতুন। প্রথমে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলেন নিজাম শিকদার। সুফি খাতুন হুমকি দিয়ে বলে ওঠলেন,”আমাকে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করলে, গাড়ির চাকা একদম শুট করে দিব।
কথা শেষ করে এসে ফ্রন্ট সিটে বসলেন। একহাতে দরজা টেনে লাগিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলেন নিজাম শিকদার এখনো স্যারেন্ডার করে সোজা হয়ে বসে আছেন। সুফি খাতুন চোখ রাঙিয়ে শুধালেন,”এখানে বসে থাকবেন সারাদিন নাকি গাড়ি চালাবেন? গাড়ি চালান..!
____________________________________
হেলাল সাহেব গম্ভীরমুখে নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। তখনো তিনি ভদ্র বাচ্চার ন্যায় বসে থাকা মৃন্ময়ের সুদর্শন মুখখানা ঠিকঠাক লক্ষ করেননি। দূর থেকে চেনা চেনা ঠেকল, তবুও কিছু একটা খটকা থেকেই গেল, হয়তো চোখের ভুল। বয়স বাড়ছে এজন্য চোখের কাছে সবাইকেই চেনা পরিচিত মনে হয়। চেয়ার টেনে বসতেই কানে আসলো মৃন্ময়ের স্বর। যতেষ্ট শীতল রাখা চেষ্টা করছে নিজেকে তবুও কথা বলতে বলতে গলা চড়ে যাচ্ছে। দেখেই মনে হচ্ছে সৈয়দ বাড়ির মানুষ জনের উপর খুবই বিরক্ত। খড়খড়ে কন্ঠে বলে ওঠে,”খুবই বেয়াদব একেকটা ছেলে মেয়ে, কোনো কথা বললে বা আদেশ দিলে কানে তোলার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করে না।
হেলাল সাহেব এটা শুনতেই খেঁকিয়ে উঠলেন। ভ্রু-যুগল কুঁচকে, ক্ষিপ্ত সুরে বললেন,”ওরা কেন তোমার কথা শুনতে যাবে? তুমি কে আদেশ দেওয়ার?
মৃন্ময় হেলাল সাহেবের এসব কথা কান দিল না। নাছির সাহেব নামক ভদ্রলোকের পানে এক নজর চেয়ে আবারো বলে ওঠল,”এদের আপনাদের বাড়িতে না রেখে পাগলা গারদে রাখা উচিত ছিল, সবগুলার মাথা নষ্ট, পাগল।
নাছির সাহেব এক পলক ভাইয়ের দিকে চাইলেন, রেগে ফেটে পড়ছেন তিনি। যথাসম্ভব পরিবেশ সামাল দিতে বলে ওঠলেন,”আমি বুঝতে পারছি।
হেলাল সাহেব বিরাট চটে গেলেন। খ্যাঁক করে ওঠে শুধালেন,”তুই কী বুঝতে পারছিস, আমাদের বাড়ির ছেলে মেয়ে পাগল?
নাছির সাহেব হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন। পরপর আবারো তিন জোড়া চোখের তোপে পড়ে না ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন। হেলাল সাহেব খিঁচানো মেজাজের কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসলো,”আমার মনে হয়, এই পুলিশ অফিসার নিজেই পাগল, ভদ্রলোককে পাগলা গারদে পাঠানো অতিব জরুরী! বাচ্চা, বাচ্চা ছেলে মেয়েদের পেছনে এমন হাত ধুয়ে পড়েছ কেন?
মৃন্ময় বিস্ময় বিমূঢ় নেত্রে দেখল হেলাল সাহেবকে। ঠোঁট ঠেলে না চাইতেও মিনমিনিয়ে বেরিয়ে আসলো,”এই পাগলদের গুরু মনে হচ্ছে আপনিই।
পরপর অবাক চোখে তাকিয়ে, কঠিন অপগারতা ঠোঁটের নিকট নিয়ে শুধাল,“এরা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে? কোনদিক দিয়ে? সবগুলোই বদমায়েশ, বাঁদর!
হেলাল সাহেব বললেন,
“তুমি হবে বদমায়েশ, বাঁদর। সামান্য দুটো দুষ্টুমি করায় কে বাচ্চাদের হাজতে নিয়ে আসে?
নুসরাত যখনই নিজেদের অপমান শোনল পেছন থেকে হাবিলদারকে ডেকে উঠল,”এইইইইই হাবিলদার…!
হাবিলদার মহৎপ্রাণ হৃদয় নিয়ে এসে হাজির হলেন নুসরাতের সামনে। মুখে হাসি নিয়ে বলে ওঠলেন,”জ্বি ম্যাডাম!
নুসরাত ভাবসাব নিয়ে লোহার শিকল চেপে ধরে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে ওঠল,”এই হাবিলদারের বাচ্চা, একটা কাজ করেন, এম্বুলেন্স এনে থানার বাহিরে রাখুন।
হাবিলদার অবাক কন্ঠে বলে ওঠলেন,
“কেন?
নুসরাত নাকের পাটা ফুলিয়ে, উচ্চ শব্দে চিৎকার করে বলল,”এখান থেকে বের হয়ে আমি আপনার স্যারকে কুত্তার মতো পেটাব।
হাবিলদারের দু-ঠোঁট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। হেলাল সাহেব এপ্রিশিয়েট করলেন নুসরাতকে। গর্বে ফুলে উঠা বুক দাপিয়ে বললেন,’”একদম ঠিক আছে, আমাদের বাড়ির সিংহ!
মৃন্ময় বিমূর্ত চোখে এক পলক ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসল। নুসরাতের কথা কানে না তোলে হেলাল সাহেবের আগের কথার সুর ধরে উপহাস করে বলল,”দুটো দুষ্টুমি করেছে? ওরা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে গ্লাস ভেঙে, সেটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
“তো, তোমার গাড়িতে লাগিয়েছে? আগুন লাগালে আমাদের গাড়িতে লাগিয়েছে, তোমার সমস্যা কী? প্রয়োজন হলে আরো দুটো গাড়িতে আগুন লাগাবে।
হেলাল সাহেবকে থামানোর চেষ্টা করলেন চার ভাই। তিনি সবাইকে চোখে রাঙিয়ে দেখলেন। মৃন্ময় আবারো বলল,’”তাহলে মুরগী চুরির বিষয়ে, কী বলবেন আপনি?
হেলাল সাহেব প্রথমে আমতা আমতা করলেন। পরপর আবারো স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলেন,
“ওগুলো কী ওরা চুরি করেছে, এনে পেলে পুষে বড় করবে বলেই তো নিয়ে আসছিল।
মৃন্ময়ের ইচ্ছে হলো নিজের মাথা দেয়ালে ঠুকে মরে যেতে। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে চেয়ে রইল হেলাল সাহেবের দিকে। তার কাছে মনে হলো কথা বলার শক্তি নেই, কেউ সব শুষে নিয়েছে। চোখ দুটো ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে আসা কন্ঠে বলে ওঠল,”জরিমানাগুলো দিয়ে উনাদের নিয়ে যান। নাহলে আগামীকাল কোর্টে চালান করা হবে।
হেলাল সাহবে কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলে ওঠলেন,”আমাদের কী টাকার অভাব যে জরিমানা দিতে পারব না? শুধু বলুন কতটাকা জরিমানা?
মৃন্ময় কিছু মিনিট নীরবে থেকে বলে ওঠল,
“সত্তর হাজার টাকা। আগেই বলে দেই, ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে ফেলার জন্য সরকারিভাবে পঞ্চাশ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে।
হেলাল সাহেব এক মুহুর্ত দ্বিরুক্তি না করে বললেন,
“ক্যাস না কার্ড?
মৃন্ময় বলে ওঠল,
“ আপনি যা ভালো বুঝেন।
হেলাল সাহেব নিজের পকেট হাতড়ে মানিব্যাগ বের করলেন খুচরা পয়সা। সব মিলিয়ে বিশ হাজারের মতো হলো। নাছির সাহেব নিজের পকেট থেকে দুঃখি মুখে এক হাজার টাকার বান্ডিল রাখলেন। গতকালই তিনি ক্যাস করেছেন এগুলো আর আজই এদের জন্য সব জলে চলে যাচ্ছে। খুবই কষ্টে সেটা রাখলেন টেবিলের উপর। মৃন্ময় অদ্ভুত চোখে চেয়ে রইল এই পরিবারের মানুষের দিকে। শোহেব আর সোহেদ মিলিয়ে বাকি টাকা দিয়ে দিলেন। টাকা দেওয়া শেষ হতেই জেলের তালা খুলে দিলেন হাবিলদার। পিঁপড়ের মতো একের পর এক লাইন ধরে সবাই বেরিয়ে আসলো। হেলাল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। কোনো কথা ছাড়া হাঁটা ধরলেন সামনে। তার সাথে পা মিলিয়ে হাঁটা ধরল ইরহাম,আহান। পেছন পেছন সবাই ও অগ্রসর হলো। নুসরাত তাদের সাথে না গিয়ে দৌড়ে আসলো মৃন্ময়ের কাছে। মৃন্ময় ভ্রু উচিয়ে চাইতেই প্যান্টের পকেট থেকে এক প্যাকেট নাপা এক্সাট্রা টেবলেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”নাপা এক্সাট্রা খান আর নিজের মাথাকে ঠান্ডা করেন। সারাক্ষণ ক্যাটক্যাট করতে থাকেন।
নুসরাত মৃন্ময়কে চুপচাপ চেয়ে থাকতে দেখে জোর করে তার হাতের মুঠোয় প্যাকেটটা ধরিয়ে দিল। তারপর দ্রুত গতিতে দৌড় দিয়ে চলে গেল সামনে। পেছন থেকে হাবিলদারের কথা আসলো কানে। হাবিলদার বলছেন,”স্যার আপনি হাসছেন?
পরপর মৃন্ময়ের সেই গম্ভীর কন্ঠ আসলো,
“কোথায় হাসছি? উল্টাপাল্টা কথা না বলে নিজের কাজে যান।
সামনে থেকে নুসরাতের হাত টেনে ধরল মমো। নুসরাতকে তাড়া দিয়ে বলল,”তাড়াতাড়ি আয়..!
সিলেট সদর থানা থেকে বের হতেই চোখে পড়ল দ্রতগামী এক গাড়ি এসে থেমেছে সেখানে। সবার তীক্ষ্ণ চোখ যখন সেখানে স্থির গাড়ির দরজা খুলে পাগলাটে ভঙ্গিতে বের হয়ে আসলো জায়িন। মাথার আমন্ড কালার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে বাতাসে। চোখদুটোতে অসহায়ত্ব ভালোই ভর করেছে। সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোক রশ্মি চোখে পড়তেই জ্বল জ্বল করে উঠল অক্ষিগোলক। কপালে ভাঁজ ফেলে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল গরমের তাপে লাল হওয়া নিজের প্রিয় মুখখানি। স্নিগ্ধতায় পরিপূর্ণ মুখটা চোখের সামনে উপলব্ধি করতেই হৃদয়ে শান্তি নেমে আসলো। এতক্ষণের ধড়াস ধড়াস করে কাঁপা বুকটা চলাচল নিস্তব্ধে ধীর হলো। নৈঃশব্দে কাটল সময়। ঘড়িতে তখন কাটায় কাটায় বারোটা। নিজের হয়রানি ছাপিয়ে, ঝড়ের গতিতে এসে পুরুষালি শক্তপোক্ত হাত পেঁচিয়ে ধরল ইসরাতকে। কয়েক পল কাটল। পিঠ পেঁচিয়ে ধরতেই পুরো মেয়েলি দেহ শূণ্যে ভাসল। ইসরাত প্রথমে কী হয়েছে বুঝে উঠতে পারল না। যখন বুঝল ততক্ষণে সে জায়িনের বাহুতে। পা জমিন হতে দু ইঞ্চি উপরে। অনুভব হলো হৃৎপিন্ডে চলাচলকৃত আন্দোলন। নিজেকে সামলে নিয়ে আশেপাশে চোখ বোলাতেই বাপ চাচার গোল গোল দৃষ্টি নিজেদের দিকে পেল ইসরাত। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে মোচড়া মুচড়ি করল, তবুও ছাড়া পেল না। কটমটিয়ে উঠে বলল,”জায়িনের বাচ্চা ছাড়ুন আমাকে..!
জায়িনের নাজুক কন্ঠ স্বর ভেসে আসলো,
“গিভ মিন জাস্ট ফাইভ সেকেন্ড ইসরাত, আমাকে আগে আপনাকে অনুভব করতে দিন।
ঠিক পাঁচ সেকেন্ড অতিবাহিত হলো। তারপরই ইসরাতকে নিজের বাহু থেকে ছাড়ল জায়িন। নির্মিশেষ দৃষ্টিতে উপর নিচ অবলোকন করে জানতে চাইল,”আপনি ঠিক আছেন ইসরাত?
ইসরাত নিজেকে জায়িন থেকে দূরে সরিয়ে নিল। চোখদুটো বিস্ফোরক রকম গরম করে বলে ওঠল,”বেয়াদব..!
হেলাল সাহেব নিজেও দূর থেকে নিজের নির্লজ্জ ছেলের দিকে চেয়ে কড়মড় করে, উচ্চস্বরে বললেন,”অসভ্য…!
জায়িন জড়িয়ে ধরতেই সুফি খাতুন আর নিজাম শিকদার এর আগমন ঘটেছে থানার বাহিরে। সুফি খাতুন গাড়ির গ্লাসের বাহিরে চোখ মেলে চাইতেই জায়িনের এমন বেহায়াপানায় দেখে চোখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন। ভৎসনা করে বললেন,”কেয়ামতের আলামত, নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ!
জায়িনের কানে স্পষ্ট গেল হেলাল সাহেবের কথা, সে পরোয়াই করল না। দু-পা বাড়িয়ে ইসরাতের হাত চেপে ধরতে যাবে, ইসরাত দু-পা পিছিয়ে গেল। তার পেছন থেকে পরপর উঁকি দিল চারটা মাথা। সবার শেষে একটু একটু চেনা মাথাটা উঁকি দিল। ইসরাতের ডান দিকে নুসরাত ইরহাম আহান, বাঁ-দিকে মমো আর সৌরভি। সবগুলো একসাথে মিলে ব্যঙ্গাত্মক কন্ঠে হেসে হেসে বলে ওঠল,”আপনি কী ঠিক আছেন জায়িন ভাইইই?
____________________________________
আরশের যখন জ্ঞান ফিরল তখন দুপুর দুটো বাজে। ততক্ষণে বিয়ের ডেট একদিন পিছিয়েছে। অনেক মেহমানকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আগামীকাল বিয়ে। মাহাদি ফোনে কথা শেষ করে আরশের কেবিনে ঢুকল। হসপিটালের ফিনফিনে কাপড় তার পরণে। চোখগুলো নির্মিশেষ দৃষ্টিতে জানালার বাহিরে নিবিষ্ট। মিয়িইয়ে পড়া আলোকে দেখছে, নির্জীব চোখে। আগের মতো পাগলামি করল না, জানতে চাইল না নুসরাত কোথায়! চুপচাপ চেয়ে রইল। মাহাদি গলা খাঁকারি দিল আরশের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। আরশ ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল তাকে। হাতের স্যালাইনের দিকে ইশারা করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানতে চাইল,”কখন যেতে দিবে?
মাহাদি আরশের হাতের স্যালাইনের দিকে একবার চেয়ে অন্য কথা উচ্চারণ করল ,”একটা কথা বলার ছিল।
আরশ নিরুদ্বেগ কন্ঠে, নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কোন বিষয়ে?
মাহাদির ঠোঁট থেকে ক্ষীণ শব্দ বের হলো,
“ নুসরাতের….
আরশ হাত তুলে থামিয়ে দিল। নিষেধাজ্ঞা জারী করল,”শুনতে চাচ্ছি না।
মাহাদি মনে করল হয়তো আরশ মনে করছে ওদের কিছু হয়ে গিয়েছে তাই শুনতে চাচ্ছে না, তাই নিজের কথায় জোর দিল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আরশের কোনো কথা না শুনে বলে ওঠল,”নুসরাত, ইরহাম, আহান…
আরশ খেঁকিয়ে উঠল। হাইপার হয়ে উঠে বসতে যাবে মাহাদি বলল,”ওরা বেঁচে আছে।
কঅথা শেষ হতেই সবকিছু ঠান্ডা হয়ে গেল। বেসামল ভঙ্গিতে নিজের জায়গা ছেড়ে ওঠা আরশের চোখমুখে নেমে আসলো রাজ্যের গম্ভীরতা। তা আবার নিমেষেই উবে গিয়ে উদয় হলো কিছু একটা। বাজপাখির ন্যায় দৃষ্টি স্থির করল মাহাদির দিকে। ইশারা করে বলল,”এদিকে আয়..!
মাহাদি আরশের দিকে এগিয়ে যেতেই আরশ উঠে বসার চেষ্টা করল। মাহাদি বন্ধুকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল। পেছনে বালিশ দিয়ে সুন্দর করে বসাতেই আরশ বলল,”আমার সামনে আয়…!
মাহাদি মাথা নাড়িয়ে আরশের সামনে দাঁড়াতেই, ঠাস করে কান ঝাঁঝানো একটা থাপ্পড় পড়ল বেচারার গালে। কান তালা লেগে গেল মাহাদির সেই শব্দে। মাহাদি একহাত গালে চেপে অবাক চোখে দেখল আরশকে। সাপের মতো হিসহিসিয়ে বলা আরশের কথা কানে আসলো,”ইউ ইডিয়ট, আগে বলবি না..!
মাহাদি হা করে চেয়ে থাকল। কর্কশ সুরে জানতে চাইল,“তুই আমায় বলতে দিয়েছলি?
এক হাত গালে আরেকটু চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে, নিষ্পাপ মুখে বলে ওঠল,“আমি তোর থেকে দুই-দিনের বড়, সম্মান দে আমায়..!
আরশ কোনো কথা না শুনে চিৎকার করল,
“শাট-আপ মাহাদি।
মাহাদি নাক ফোলাল। হিসহিসিয়ে আরশকে অভিশাপ দিল,”তোর থেকে বড় গাদ্দার তোর ভবিষ্যৎ বাচ্চা হবে, আমি মাহাদি খান আজ তোকে অভিশাপ দিলাম।
____________________________________
সৈয়দ বাড়ির ড্রয়িং রুমের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে থানা থেকে ফিরত সবাই। হাতে পাইনাপেল এর জুস। নিজাম শিকদার টিপেটিপে সৌরভির কাছ ঘেঁষছেন আর বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এতদিন তিনি কী কী বলেছিলেন! আজ তা একদম খাপে খাপ মিলেছে কিনা! সৌরভি বিরক্তি কন্ঠে যখন বলল,”দাদু তুমি থামবে?
তখন থেকে শুরু হয়েছে আবারো ভাষণ। বলেই চলেছেন তো বলেই চলেছেন। একটাই কথা তার,’'যেদিন বড়সড় বিপদে পড়বি সেদিন আমাকে বলতে আসিস না।
সৌরভি মুখ ঝামটা মেরে বলে ওঠল,
“আচ্ছা।
বাড়ির কর্তীরা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছেন ছেলে মেয়ের দিকে। যে নাজমিন বেগম খালি পায়ে ঘরে হাঁটলে তার ভালোবাসার সোফায় বসতে দেননা, সেই নাজমিন বেগম আজ কাদা গায়ে মাখামাখি সবাইকে বসতে দিয়েছেন, এমনকি সোফার একদিকে পা তুলে শোয়া নুসরাতকে পর্যন্ত ধমকাচ্ছেন না। নুসরাত মুখ দিয়ে আনন্দ পূর্ণ শব্দ নিশ্রিত করে বলে ওঠল,”আম্মা এরকম করে যদি রোজ শোয়া যেত তাহলে মজাই চলে আসত!
নুসরাতের কথায় আজ আর ধপ করে জ্বলে উঠলেন না নাজমিন বেগম। চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন মমতাভরা দৃষ্টিতে। ইসরাত বিরক্ত হয়ে মা চাচিদের বলে ওঠল,”চোখ সরাও আমাদের থেকে..!
চারজনের আট জোড়া চোখ সরল না। আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ফিরে আসলো! কিচেনের দায়বার পড়েছে নুসরাতের দু-মামির উপর। নুসরাতের নানি জোহরের নামাজ পড়ছেন৷ অনান্য আত্মীয়রা এতক্ষণ বসে থাকলেও এবার উঠে উঠে চলে গেল নিজেদের রুমের দিকে। গোসল সারার জন্য। নুসরাত ফিক করে হেসে উঠল আকস্মিক কিছু একটা মনে করে। এলিয়ে এলিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে ওঠল,”আপনাকে অনুভব করতে দিন..! আপনি ঠিক আছেন ইসরাত!
নুসরাত নিজের কথা শেষ করতেই সবগুলো হেসে উঠল খিকখিক করে। নিজাম শিকদার উঠে দাঁড়ালেন। সৌরভির হাত চেপে ধরে বিদায় নিলেন সবার কাছ থেকে। সৌরভি আরো একটু নাছির মঞ্জিলে সময় কাটাতে চাইল দাদা নামক লোকটার জন্য সম্ভব হলো না। জবরদস্তি টেনে টুনে নিয়ে গেলেন নিজ গৃহে। নাজমিন বেগম তাড়া দিলেন,”যাও যাও গোসল করতে যাও সবাই..! আজ আমাদের বাড়িতে দুপুরে খাবে সবাই।
সবাই হৈ হুল্লোড় করে উঠল। নেচে-কুঁদে চলে গেল নিজ নিজ রুমদখলে। সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময় দেখা হলো হেলাল সাহেবের সাথে। দু-জনে দু-জনের পানে চেয়ে মুখ ঝামটা মারল। অতঃপর ধুপধাপ পায়ে একজন উপরে অন্যজন উপরে চলে গেল। নিচে দাঁড়ানো ইরহাম আর আহান পরস্পরের পানে চেয়ে মিনমিনিয়ে আওড়াল,”সারাজীবন শুনে আসলাম বউ শাশুড়ীর যুদ্ধ, আর এখানে দেখছি শ্বশুর বউয়ের যুদ্ধ।
আহান সুর মিলিয়ে একটাই কথা আওড়াল,
“দুই দিনের দুনিয়ায় চারদিন এসব দেখতে হয়।
____________________________________
আজ সকালে বাড়ির বড়রা মিলে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করবে ভেবেছিল, তা সম্ভব হয়নি ওই দূর্ঘটনার কারণে। তাই বিকেল বেলা সিদ্ধান্ত নিলো অনুষ্ঠান করার। ইসরাতকে শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে পিঁড়িতে বসালেন বাড়ির বয়স্ক মহিলারা। ইসরাতের নানি নামাজি হলেও ব্যাপক কুসংস্কারে বিশ্বাসী তিনি। সাত পুকুরের পানি এনে বাড়ির বউকে না গোসল করালে নাকি জ্বীনের আছড় হয়, তাই এটাও পালন করবেন। নুসরাত তো মুখ ফসকে বলেই ফেলেছিল,'তোমার মায়ের উপর কী জ্বীন ভর করেছিল, যে এমন আজগুবি কথা বলছ? আজ সে শান্ত, ভদ্র, নির্মল হয়ে গিয়েছে, তাই কিছু বলেনি, কোনোভাবে কাউকে চটানো যাবে না, নাহলে তার দেওয়ার থেকে নেওয়ার বেশি পড়ে যাবে। সেটা আর কী, তার মায়ের রোবটিক্স জুতোর বারি নাহয় ঝাটার বারি। আজ যা করেছে তাতে নাছির সাহেব সম-পরিমাণ রেগে, তার কতটাকার গাড়ি সে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে। এরা আবার কীভাবে জেনে গেছে আরশের গাড়িও সে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে বম হয়ে ঘুরছেন, যেকোনো সময়, যেকোনো মুহুর্তে বমব্লাস্ট হয়ে যাবে।
ছালিমা বেগম জায়িনকে কোথা থেকে ধরে এনে বসালেন ইসরাতের পাশে। গায়ে সেন্ডু গেঞ্জি আর লুঙ্গি। লুঙ্গির অবস্থা খুবই নাজুক। বোঝাই যাচ্ছে জোরজবরদস্তি করে পরানো হয়েছে। একহাতে লুঙ্গি পেটের উপর চেপে ধরে আছে জায়িন। যখন তখন খুলে যাবে যাবে মনে হচ্ছে। পেটের উপর লুঙ্গি বাঁধা থাকলেও তা লুজ হয়ে ঠাখনুর নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পেছনের দিকে অনেকটা মাটির সাথে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দু-একবার উষ্ঠা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেচারা নিজেকে সামলেছে এর ভেতর। নুসরাত, ইরহাম, আহান, সুর ধরে শব্দ করে হেসে ফেলল জায়িনের লুঙ্গি পরে নাজেহাল অবস্থা দেখে। তাদের হাসি দেখে বাকি সবাই হাসল।।লিপি বেগম ছেলের পানে চেয়ে মিটিমিটি হাসলেন। জায়িন মায়ের দিকে চেয়ে, অসহ্য কন্ঠে বলল,”আম্মু তুমি ও হাসবে!
লিপি বেগম এক হাত ঠোঁটের উপর রেখে বললেন,
“হাসছি না বাবা, হাসছি না..!
ইসরাতকে সাদার মধ্যে লাল সুতোর কাজ করা শাড়ি পরিয়েছেন। ব্লাউজ লাল কালারের। চুলগুলো পিঠে ছেড়ে রেখেছেন। ছালিমা বেগন বাটা হলুদ এনে প্রথমে জায়িনের গায়ে ছোঁয়ালেন, পরে ইসরাতের। একে একে সকলে ছুঁইয়ে দিল। সুগন্ধি মিশ্রিত কলসিতে রাখা পানিগুলো প্রথমে নিয়ে ইসরাতের মাথায় ঢেলে দিলেন। গায়ের হলুদ যাতে শুয়ে যায় তার জন্য। এরপরের কলসির পানি জায়িনের শরীরে ঢেলে দিলেন। সবাই সুর টেনে গীত ধরল,”আইজ ময়নার গায়ের হলুদ কাইল ময়নার বিয়া, হলুদ বাটো মেন্দি বাটো লোহার পাটা দিয়া। ময়নার মা কাঁন্দইন করইন উন্দালে বসিয়া। ও বনোরসি কই গেলায় গো তোমার ফুরি তইয়া,তাই আইজকে কান্দন করের জামাই লগে যাইবার লাগিয়া।
নুসরাত ভদ্রমহিলাদের এসব গীত শুনে গলায় ফাস দিতে ইচ্ছে হলো। আবারো কানে আসলো জায়িনকে উদ্দেশ্য করে গাইছে সবাই,”আইজ ময়নার বিয়া রে, বাজে ঢোলের তান, কান্দে রে মায় গোপনে, শুনে গানের গান। হলুদের রঙ লাগলো গায়, রূপে উঠলো ফুটি, চোখে কাজল, মুখে লাজে, বউ রে যেন মতি।
নুসরাত এবার বাঁধ সেধে বলল,
“কিন্তু ইসরাতের মুখে তো কোনো লাজ নেই..!
জায়িন উঠে দাঁড়াল এর মধ্যে। ভদ্রমহিলারা নুসরাতের কথা না শুনে গাইছে গীত। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে তালি দিচ্ছেন সামনে গিয়ে। আবার পেছনে এসে হাঁটছেন। এরকম গোল গোল করে ঘুরতে ঘুরতে গান ধরলেন আবারো। জায়িন ভেজা শরীর নিয়ে সামনে হাঁটা ধরতেই লুঙ্গিখানা তার কোমর থেকে খসে পড়ল। ইসরাত পেছন থেকে চিৎকার করে ওঠে বলল,”আরে আপনার লুঙ্গি..!
নুসরাত, ইরহাম, আহান দাঁড়িয়ে নাচ দেখছিল বয়স্ক মহিলাদের, ইসরাতের চিৎকারে তড়িৎ মাথা ঘুরাল। হতবিহ্বল চেহারা নিয়ে পেছন ফিরল কী হয়েছে দেখার জন্য। জায়িনের অস্বাভাবিক শীতিল মুখের দিকে চোখদুটো গোল গোল করে চেয়ে রইল নুসরাত। চোখ নিচের দিকে নামাল না। শঙ্কায় ঠান্ডা হওয়া শরীর নিয়ে নড়চড় বিহীন দাঁড়িয়ে রইল। বড় থেকে শুরু করে ছোটদের পর্যন্ত জায়িনের দিকে উৎসুক দৃষ্টি। চোখদুটো হয়তো কোনোরকম আটকে আছে ভেতরে, সবার তাকানো দেখে মনে হলো এই অক্ষিগোলক থেকে বের হয়ে যাবে মণিগুলো। নুসরাত কোনোরকম ঢোক গিলল, চোখ দুটো তখনো সামনে স্থির। ভুল করে নড়চড় করল না। হাপিত্যেশ করে মিনমিনিয়ে আওড়াল,”গেল রে ইরহাম গেল, জায়িন ভাইয়ের সব মান-ইজ্জত গেল। সবাই সব দেইখা নিল রে..!
আহান ড্যাবড্যাব চোখে চেয়ে আওড়াল,
"জয় বাংলা, লুঙ্গি সামলা..!
ইরহাম সেই সুর ধরে বলে ওঠল,
"মান-সম্মান আল্লাহর হাওলা..!
চলবে….
#প্রিয়_প্রণয়িনী২
#জান্নাত_নুসরাত
(৩৭) দ্বিতীয় অংশ
আরশকে চারটার দিকে চেক-আউট করে বাসায় নিয়ে আসছে মাহাদি।ডাক্তারা একদিন রাখার কথা বললে ও আরশ জিদ করে চলে এসেছে, তার নাকি শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ডাক্তারের সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়েছে এই বলে, সুস্থ স্বাভাবিক তার মতো এক ব্যক্তিকে অসুস্থ বলে শুইয়ে রাখছে!সব টাকা নেওয়ার ধান্দা..! পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে দেখে মাহাদি বহু কষ্টে হসপিটালের সকল ফর্মালিটি শেষ করে নিয়ে এসেছে আরশকে। হাতে তখনো স্যালাইন লাগানো ছিল।
লিপি বেগম আগে থেকে জানেন অতিরিক্ত টেন্সড হলে আরশের এমন শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তাই কোনোরকম অভার রিয়েক্ট করেননি,কিন্তু হেলাল সাহেব করেছেন। বলেছেন পন্ডিতি করে তাকে কে বলেছিল আগে ওখানে যাওয়ার জন্য। লাস্ট ফ্রান্স থাকতে এমন অবস্থা হয়েছিল আরশের। ভার্সিটির এক ছেলের সাথে ঝগড়া লেগে গিয়েছিল বলে। ঝগড়া থেকে হাতাহাতিতে পৌঁছায়, তারপর একদম কেটে ফেলা মেরে ফেলার পর্যায়ে। ছেলেটা কী যেন বলেছিল, এজন্য রেগে বোম হয়ে নাক মুখ ফাটিয়ে ছিল ওই ছেলের। অতিরিক্ত টানা হেঁচড়া করায় হাপিয়ে উঠে, ফলে তাকে হসপিটালে ভর্তি করানো হয় ইমেডিয়েটলি। দু-দিন হসপিটালে থাকার পর যখন বাসায় এসেছিল ততক্ষণে ছেলেটার পরিবার পুলিশ কেস করে ফেলেছে। অনেক কষ্টে তা নিজেদের উপর থেকে সরিয়েছেন হেলাল সাহেব আর জায়িন মিলে। বাড়িতে ফিরার পর থেকে নীরব আছে সে৷ সাথে আটার মতো লেগে আছে মাহাদি। হাতে স্যালাইন এখনো লাগানো। অনিকার প্যা পু কান্না দেখে কিছুক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওই মুখপানে চেয়েছিল আরশ। মুখ দিয়ে বের হয়ে এসেছিল, আপনার মাথায় সমস্যা নাকি..! এরপর আর দেখেনি ওই মেয়েকে। মাহাদি হেল্পিং হ্যান্ড হয়ে তার স্যালাইন দু-হাতে চেপে ধরে হাঁটছে আরশের পেছন পেছন। জায়িনকে এসে যখন ছালিমা বেগম লুঙ্গি পরালেন তখন আরশের দিকে চেয়ে ভ্রু নাচালেন। হেসে হেসে শুধালেন,"কী গো নাত জামাই তুমি ও পরবা নাকি?
আরশ শুধু সামান্য হাসল কথা বলল না। জায়িনকে বগলদাবা করে নিয়ে চলে যেতেই আরশ এসে বসেছে বারান্দায়। আর তখন থেকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ দূরে। সৈয়দ বাড়ির দু-তলার বারান্দায় বসলে নাছির মঞ্জিলের সামনা স্পষ্ট দেখা যায়। সবাই ওখানে জমা হয়ে যে জায়িনকে হলুদ মাখাচ্ছে তা নিশ্চুপ বসে দেখল। মাহাদি নিজেও ড্যাবড্যাব করে রীতিনীতি গুলো দেখছে,।এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছে যখন কোনো বিয়ে সম্পাদন হচ্ছে এখানে। বয়স্ক মহিলাদের গীত গাওয়া শুনে মাথা দোলাল মাহাদি। নিজেও মিনমিন করে গাইল। আরশকে রোবটের মতো বসে থাকতে দেখে নিজেও তার পাশে বসল। আড় চোখে দেখল কঠিন করে রাখা উজ্জ্বল শ্যাম মুখখানা। মুখ দেখলে যেমন কঠোরতা প্রকাশ পাচ্ছে তেমন চোখদুটোতে নমনীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে। আরশের চোখে এত নমনীয়তার কারণ মাহাদি বুঝতে পারল। চোখ অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল নুসরাতকে। হাত তুলে হেলেদুলে নাচছে সবার সাথে। ঠোঁট দুটো নড়ছে সমানতালে। ইরহামের একহাত চেপে ধরে রাখা। হাসতে হাসতে একবার ইরহামের গায়ে ঢলে পড়েছে তো একবার আহানের। দু-জনেই আবার তাকে বিরক্ত ভঙ্গিমায় ঠেলে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, আবার তিনটা কানাঘুষা করছে আর হা হা করে হাসি দিচ্ছে। নুসরাতের পরণে ধুতি-ফ্রক-কুর্তি। গলায় ওড়না ঝুলানো, পায়ে সচারাচরের মতো স্লিপার, চুলদুটো পনিটেল করে বাঁধা। মেক-আপ বলতে কিছু নেই মুখে। মুখে হয়তো তৈল দিয়ে দিয়েছে। অস্তিমিত পশ্চিম সূর্যের আলোয় গালদুটো চকমক করছে। আরশ দূর থেকে বসে বসে খেয়াল করল নুসরাতকে খুঁটে খুঁটে। এর মধ্যে জায়িন উঠে দাঁড়াল। হেঁটে যেতে নিবে পূর্ব ক্ষণেই লুঙ্গি খুলে পরে গেল৷ মাহাদি হু হু করে হেসে ফেলল এটা দেখে। বিদেশিকে দেশের ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য লুঙ্গি পরানো হয়েছে আর বিদেশিরই কিনা লুঙ্গি কোমর থেকে খসে পড়ল। জায়িনের মুখটা থমথমে! আরশ চোখ ঘোরাল নুসরাত, ইরহাম, আহানের দিকে। তিনটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদম চোখ নিচের দিকে নামাচ্ছে না। এটা দেখেই এতক্ষণের চেপে রাখা হাসি আরশ নিজেও ফোঁস করে ছেড়ে দিল। পরপর আবার ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণ করে নিল দন্তপাটির আড়ালে। মাহাদি নাক কুঞ্চিত করে চেয়ে বলল,"সামান্য হাসলে তোর জাত যাবে না..!
আরশ চোখ রাঙিয়ে মাহাদি দেখল। যার মানে বোঝাচ্ছে, চুপ একদম চুপ...! মাহাদি কী চুপ হওয়ার পাত্র সে আরশকে ভেঙচিয়ে ভেঙচিয়ে বলল,"সম্মান দে দু-দিনের বড়..!
আরশ দম্ভ নিয়ে ঘাড় বাঁকাল। ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,"তো কী হয়েছে? আটচল্লিশ ঘন্টা আগে পৃথিবীতে এসে কোন দেশ জয় করেছিস তুই?
"কোনো দেশ জয় না করলেও, তোর আগে এসেছি দুনিয়াতে। গণে গণে আটচল্লিশ ঘন্টা, দু-হাজার আটশত আশি মিনিট, এক লক্ষ বাহাত্তর হাজার আটশত সেকেন্ড আগে দুনিয়ায় পর্দাপণ করেছি আমি, এটাই আমার দম্ভ। হুহ....!
আরশ নির্বিকার চিত্তে বলে ওঠল,
"তো কী হয়েছে?
"হয়েছে তো অনেক কিছু, পেন্সিল দিয়ে লিখে রাখ আমি বড়..!
আরশ সামনের দিকে ফিরে তাকাল। মুখটা গম্ভীর রেখে বলে ওঠল,"ইরেজার দিয়ে মিটিয়ে ফেলেছি তা..!
মাহাদি কটমট করে তাকাল। রাগে নাকের পাটা ফুলিয়ে, ধারালো চোয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে আওড়াল," খাটাশ..!
সামনে স্থির দৃষ্টি রেখে আরশ ধমকে উঠল। পুরু পুরুষালি ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে বলে ওঠল,"শাট-আপ..!
______________________________________________
ছালিমা বেগম ফিক করে হেসে ফেললেন। সুর টেনে সামান্য হাসি তামাশা করতে বলে ওঠলেন,"নাত জামাইয়ের লুঙ্গির গিট্টু ঢিলা, নাতনীর কপাল খোলা।
কথা শেষে হেসে ফেললেন। জায়িন ঝুঁকে লুঙ্গি চেপে ধরে ছালিমা বেগমের পানে নেত্র নিবিষ্ট করল। বলে ওঠল,"দেখেছেন? আমি লুঙ্গি পরতে চাইছিলাম না এজন্য..! আজ আপনার কথা শুনে যদি শুধু লুঙ্গি পরতাম আমার মান সম্মান যেত কোথায়?
ছালিমা বেগম হেসে ফেললেন। জায়িনের সাথে দুষ্টুমি করে বললেন,"মান-সম্মানের কোনো কিছুই হতো না, দেখলে তো আমরাই দেখতাম।
চোখ টিপে বললেন,
"আমরাই-আমরাই..!
জায়িন ঠোঁটের কাছে আসা হাসি গিলে নিল। এতক্ষণে তার কাছে আসা ছালিমা বেগমের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে কানে কানে জিজ্ঞেস করল," এজন্য বুঝি লুঙ্গি পরিয়েছিলেন?
ছালিমা বেগম হেসে ফেললেন। সহমত পোষণ করে বললেন,"হ্যাঁ! ভাবলাম নাত জামাইয়ের লুঙ্গি খুলে পরে যাবে আর আমরা সব দেখে নিব। তুমি তো আর এই বুড়ির সুখ দেখতে পারলে না, তাই তো লুঙ্গির নিচে প্যান্ট পরে আসছো, তাই আর দেখা হলো না।
ছালিমা বেগম শেষের কথা দুঃখি সুরে বললেন। চোখ দুটোতে তখনো হাসি খেলা করেছে। জায়িন ছালিমা বেগমের দিকে চেয়ে কানে কানে বলল,"একান্ত আসবেন আমার সাথে দেখা করতে।
ছালিমা বেগম হৈ হৈ করে উঠলেন। গলার আওয়াজ উঁচু করে বললেন,"আরে নাত জামাই কয় কী, ওর সাথে নাকি একান্তে দেখা করতে যাব! না বাবা না...! ওসব হবে না।
জায়িন ছালিমা বেগমের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলল৷ তারপর এক হাতে লুঙ্গি পেটের কাছে চেপে হাঁটা ধরল বাড়ির উদ্দেশ্যে। নুসরাত ইরহামের মাথায় ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে ধমকে উঠল,"শালার শালা, একটু তো চোখ নামিয়ে নিচের দিকে দেখবি কী হচ্ছে না হচ্ছে।
ইরহাম ও সমানতালে নুসরাতের মাথায় একটা বসাল। কটমটিয়ে উঠে শুধাল,"তুই দেখলি না কেন?
দু-জনে দু-জনের দিকে ক্ষেপা ষাঁড়ের দিকে কিৎকাল চেয়ে রইল। তারপর একসাথে পাশে দাঁড়ানো আহানের মাথায় থাপ্পড় মেরে বলল,"দেখবি না তুই?
বেচারা আহান বোকা বনে চেয়ে রইল তাদের দিকে। নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে গোল গোল করে ভাই বোনের দিকে চেয়ে মিনমিনিয়ে শুধাল,"আমি কী করেছি?
______________________________________________
আরশের অবস্থা আগের মতোই রয়েছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় জায়িন এসে উপস্থিত হলো তার সামনে। আরশ ভ্রু উচাল, জায়িন ও উচাল৷ দু-জনে দু-জনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। মাহাদি চুপচাপ দেখছে দু-জনের কান্ড কাউচে বসে। জায়িন গুরু গম্ভীর কন্ঠে বলল,”তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা, নাহলে তোর জন্য আমার বিয়ে আটকে যাবে।
আরশ থমকানো দৃষ্টিতে ভাইয়ের পানে চেয়ে রইল। ঠোঁট উচিয়ে ঈষৎ তাচ্ছিল্য করে বলল,”নিজের ভাইয়ের কথা চিন্তা করছ না, বাহ্ বা্হ…! এত অসুস্থ একজন মানুষ, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে তাকে বলছ সুস্থ হয়ে যেতে তুমি বিয়ে করবে, দেটস নট ফেয়ার ব্রো, বুকে এসে লাগল কথাটা!
জায়িন এগিয়ে এসে আরশের ঘাড় চেপে ধরল। কপাল কুঞ্চন করে শুধাল,”নাটক শেষ?
আরশ মাথা নাড়াল। জায়িন জিজ্ঞেস করল,
“আগামীকালের ভেতর সুস্থ হয়ে যাবি?
আরশ উত্তর না দিয়ে, জায়িনকে উপহাস করল,
“ বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছ দেখছি ব্রো..!
______________________________________________
২১ আগস্ট,
সন্ধ্যা ছয়টা ত্রিশ মিনিট.....
ক্যামেরা হাতে এসে হেলাল সাহবের সামনে দাঁড়াল আহান। হেলাল সাহেব জায়নামাজ রেখেপেছনে ফিরতেই প্রথমে চমকে গেলেন, পরপর আবার হেসে ফেললেন আহানকে দেখে। নতুন পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়েছেন। গোসল সেড়েছেন মাগরিবের আজানের সময়। চুলগুলো এখনো ভিজে। মাথা থেকে টুপি নামিয়ে আহানকে শুধালেন,"কী চাই?
আহান কোনো দেনামোনা ছাড়াই বলল,
"আজ আপনার অনুভূতি কী, তা বলুন..! এবং কী কী মনে উপলব্ধি হচ্ছে সব শেয়ার করুন! ভবিষ্যৎ আপনার জন্য কোনো কথা থাকলে সেটা ও বলুন। যখন বিয়ের অনেক বছর কেটে যাবে তখন আমরা এই ভিডিওটা চালু করব, আর পুরনো স্মৃতিগুলো আবারো স্মৃতিচারণ করব। তখন আপনার বয়স ও অনেক হয়ে যাবে আর আমাদেরও। কোনো এক বিকেলে এই ভিডিওটা লনে বসে দেখতে দেখতে সবাই হাসব সামান্য।
হেলাল সাহেব শ্বাস ফেললেন। বললেন,
" শুরু কর..!
আহান ভিডিও শুরু করতেই হেলাল সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। বলে ওঠলেন,"আজকের দিনটা সুন্দর। এতদিনের গরমের প্রভাব কিছুটা মিইয়ে পড়েছে আজকের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে। হৃদয়ে চলাচল করা সকল চিন্তা আজ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে কোনো একটা কারণে। কারণটা কী হতে পারে? আমি সারাদিন ভর ভাবলাম, উত্তর মিলল না। মাত্র নামাজ শেষে যখন সালাম ফিরালাম তখন আমার এই আঁখিদ্বয়ে ভেসে উঠল নাছিরের বড় মেয়ের হাসি হাসি মুখটা। কী স্নিগ্ধ সেই মুখটা। আজ হয়তো তার পা এই বাড়ির মেঝে স্পর্শ করবে বলে প্রকৃতি আজ এত শান্ত, নির্মল। ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসছে বলেই হয়তো আজকে মনে কোনো অশান্তি হচ্ছে না।
হেলাল সাহেব সামান্য হেঁটে গিয়ে বাহিরের মৃদু আলোয় বারান্দায় বসলেন। থামলেন দশ সেকেন্ডের মতো। ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে ওঠলেন,"কয়েক বছর পর একদিন হয়তো আমি বসব তখন হয়তো ভিডিওটা চলবে ল্যাপটপে। আশা রাখছি ততদিনের ভেতর দাদা হয়ে যাব। তখন ছোট ছোট পা দুটো হাঁটবে, গল্প করবে, তাদের হাসিতে, কলরবে রমরমে হবে। কোলে থাকবে চার-পাঁচ বছরের জায়িনের ছেলে বা মেয়ে, তখন হয়তো আমার চোখের পাওয়ার আরো কমে যাবে, এই চশমটা ছাড়িয়ে নিয়ে আরো বেশি পাওয়ারী চশমা ব্যবহার করব। নাতনী বা নাতিকে কোলে নিয়ে দেখব এইদিনের ভিডিওটা। দেখতে দেখতে হয়তো সামান্য হাসি ফুটবে ঠোঁটের কোণে। আল্লাহ যেন ততদিন বাঁচিয়ে রাখে আমায়। আজকের দিনটা কেমন তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না, শুধু এইটুকু বলব দারুণ উপভোগ্য দিন। অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার মতো না।
হেলাল সাহেব কথা শেষ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। আহান হেলাল সাহেবকে থামজআপ দেখিয়ে বলল,"দারুণ হয়েছে।
এরপর লিপি বেগমের সামনে ক্যামেরা ধরল। লিপি বেগম নিজের মাথায় হিজাব বাঁধতে বাঁধতে বললেন,"এই ভিডিওটা যখন চলছে হয়তো আমি বেঁচে নেই, আবার হয়তো ভিডিওটা আমি নিজেই দেখছি বলতে পারছি না ভবিষ্যতের কথা। আজকের দিনটা আমার জন্য স্পেশাল, কারণ মেয়ের শখ ছিল আমার অনেক। আল্লাহ আমায় মেয়ে দেয়নি তাই মেঝো এর মেয়েগুলোকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। সাময়িক সময়ের জন্য সে এখান থেকে চলে গিয়েছিল কিন্তু আজ আবার তাকে তার নিজের বাড়িতে সারাজীবনের জন্য নিয়ে আসতে যাচ্ছি। আল্লাহ যেন তাদের বিবাহের সম্পর্কে বরকত দান করেন। আমিন..! ভবিষ্যৎ লিপির জন্য একটাই কথা, আমি জানি তুমি একজন গ্রেট শাশুড়ী হবে।
নাছির মঞ্জিল,
সময় ছয়টা পঞ্চাশ মিনিট,
নাছির সাহবে নিজেও কালা পাঞ্জাবি পরিধান করেছেন। চারভাই এক ধরণের আজকে পাঞ্জাবি পরবেন৷ ছেলেরাও বাপ চাচার সাথে মিলিয়ে কালো রঙের পাঞ্জাবি পরছে, আর মেয়েরা কী পরবে তার ধারণা এখনো কারোর নেই। কাউকে জানায়নি তাদের থিম কেমন!
নাছির সাহেব চোখের চশমা ঠিক করে নিয়ে নিজের উরুর উপর পা তুলে বসলেন। ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললেন,"মনে কিছুটা দোলাচাল চলছে, এতবছর যাকে বড় করলাম আজ সে নিজের বাড়ি চলে যাবে। হয়তো চলাচল থাকবে আগের মতো কিন্তু.....
কথাটা শেষ করার আগেই নাছির সাহেবের চোখ পানি জমা হলো। টিস্যু বের করে চোখ মুছলেন তিনি। আহান নিজেও হাতের মধ্যে চোখ ঘষল। নাছির সাহেব বললেন,"মনে হয় এই সেদিন জন্ম হয়েছিল তার, ঠুকঠুক করে বড় হলো কখন এত বড় হয়ে গেল যে আজ স্বামীর বাড়িও চলে যাবে সে। সম্পর্ক বদলাবে, সম্পর্ক বাড়বে, দায়িত্ব এসে পড়বে কাঁধের উপর, হয়তো দায়িত্বের বোঝা সামলাতে সামলাতে দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে যাবে, আমাদের জন্য সময় থাকবে না.... আল্লাহ যেন আমার মেয়েকে সকল পরীক্ষায় উর্ত্তীণ করেন। যে পথে পা বাড়িয়েছেন সেই পথে চলাচল করা সহজ নয়, সম্পর্ক গড়া যতটা কঠিন ততটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া সহজ। উনার জীবনের এই বিশেষ সময়টা যেন সুন্দর, সহজ, নির্মল হয়, বাবা হিসেবে এই দোয়া শুধু করব। আল্লাহ উনার ভাগ্যে যেন সুখ রাখেন, কোনো দুঃখ যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে ।
আহান জানতে চাইল,
“ভবিষ্যৎ আপনার জন্য কোনো কথা?
নাছির সাহেব হাসি মুখে বললেন,
“ নাছির তুমি যদি এই ভিডিও দেখে থাকো তাহলে আমি তোমাকেই বলছি তুমি একজন ভালো নানা হবে।
নাজমিনে বেগম ক্যাটক্যাট করছিলেন নুসরাতের সাথে। আহানকে ক্যামেরা নিয়ে এসে দাঁড়াতে দেখে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। জানতে চাইলেন,"কী চাই?
আহান আবারো বিস্তারিত বলল। নাজমিন বেগম কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বসলেন সোফার উপর গিয়ে। কোমল কন্ঠে বললেন,"সারাটাদিন আমার কেটেছে ওই বেয়াদব এর পেছনে৷ একদিকে আমি বাড়ি গুছিয়ে রাখছি অন্যদিকে ও ছড়িয়ে রাখছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ আমার দ্বারা কী সব একা সামলানো সম্ভব! আচ্ছা যাক গে... আজকের দিনটা বিশেষ। কারণ প্রায় আঠারো বছর পর এমন রমরমে ভাবে বিয়ে হচ্ছে এই বাড়িতে। চারিদিকে এই দু-দিনে যতটা বাড়িটা উৎফুল্ল হয়েছে এই বিয়ে শেষে হয়তো ততটা নীরব হয়ে যাবে। তখন হয়তো আমি বসে বসে এই ভিডিওটা দেখব আর মুচকি মুচকি হাসব। সবসময় ইসরাতের জন্য আমার দোয়া ছিল আর আজও দোয়া দোয়া রইল। এইটুকু বলব ইসরাত যার হাত ধরেছে সে যেন তার হাত সবসময় এমন করে ধরে রাখে, আর আমি এটা ও বিশ্বাস করি, ইসরাত কখনো জায়িনের হাত ছেড়ে দিতে চাইলে জায়িন কখনো ইসরাতের হাত ছাড়বে না, যতদিন বেঁচে আছে সেই হাত মুঠো বন্দী করে রাখবে নিজের সাথে।
সৈয়দ বাড়ি,
সাতটা পনেরো মিনিট, ড্রয়িং রুম,
এরপর শোহেব সাহেবের পালা আসলো। তিনি আহানের পানে চেয়ে বারবার হেসে ফেললেন। বললেন,"তোকে কাঠবিড়ালির মতো দেখাচ্ছে।
আহান নিজেও হেসে বলল,
"তাড়াতাড়ি বলো, এখনো বাড়ির অনেকে রয়েছে।
শোহেব সাহেব চুল পেছনে ঠেলে দিলেন। কালো পাঞ্জাবি পরিহিত শরীরটা একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে নিয়ে বসলেন সোফায়। গম্ভীর কন্ঠে আওড়ালেন," কোনো এক বিষন্ন দুপুরে কোলে নাতনী নিয়ে বসে আছি হয়তো! প্রশ্ন জাগছে নাতনী কে তাই না..! আরে আমার জায়িনের মেয়ে..! আমি চাই জায়িনের একটা মেয়ে হোক সর্বপ্রথম। যে সারাদিন আমাদের জ্বালাবে। যার সকালের কান্নায় আমাদের ঘুম ভাঙবে, রাতের যার কান্নায় আমরা ঘুমাতে পারব না, কোলে নিয়ে যাকে বিকেলে হাঁটতে যাব। যে হ্যান্ডসাম দাদা দাদা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। দু-হাজার বারো সালে, শ্রদ্ধেয় মেঝ ভাই উরফে মীরজাফর নাছির উদ্দিন আমাদের মেয়েকে দূরে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই মেয়েকে আজ আনতে যাচ্ছি, তাও চাচা শ্বশুর হিসেবে। একদম নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়ে আসব, যাতে আর নিয়ে যেতে না পারেন উনি। আরো কিছুদিন পর ওই মেয়েকেও ছিনিয়ে নিয়ে আসব আপনার কাছ থেকে, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আজ এসব কথা ভেবে ভেবে নাচতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু নাচা যাবে না চাচা শ্বশুর হয়ে যাচ্ছি আমি। আর কয়েক বছর দাদা শ্বশুরও হয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ..!
সিনেমার ভিলেনের মতো ঠোঁট উচিয়ে হাসলেন শোহেব সাহেব।
সৈয়দ বাড়ি,
সময় সাতটা পঁচিশ।
ঝর্ণা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে ভাবলেন, তারপর বললেন,"অনুভূতিটা ভিন্ন, কারণ আজ চাচি শাশুড়ী হয়ে যাব। হয়তো ভালো চাচি শাশুড়ী হবো, আবার হয়তো খারাপ বলতে পারছি না। সবাই তো আদর, যত্ন করবে, আমি নাহয় একটু আকটু শাসন করব, ভুল গুলো শক্ত কন্ঠে কুটনি শাশুড়ীদের মতো ধরিয়ে দিব। কখনো ভুল হলে লাঠি দিয়ে দুটো পিঠে বারি দিব। অতঃপর বলব, মা কিছু শিখিয়ে পাঠায়নি।!তখন বড় আপা, আর ছোট এসে ওকে নিজেদের কাছে আগলে নিবে। এমন করে চলবে আমাদের সংসার। ভাবতেই তো লাফাতে ইচ্ছে হচ্ছে, আমি কুটনী শাশুড়ী হবো, আর ইসরাত আমার শিকার হবে৷ বাংলা সিনেমার মতো অনেক সময় ওর হাত চেপে ধরে আগুনের কাছে নিয়ে তাপ দিব, তখন হাতে লালচে দাগ পড়বে। জায়িন রেগেমেগে আসবে, যখন জিজ্ঞেস করবে, এমন ব্যবহার কেন! আমি দেয়ালে মাথা ঠুকে বলব, বউ পেয়ে মাকে ভুলে গেলি, কতরাত না ঘুমিয়ে, না খেয়ে তোকে বড় করেছি, আর আজ বউয়ের জন্য তুই আমাকে অগ্রাহ্য করলি। পরপর দেয়ালে গিয়ে ঠুসঠাস করে মাথা বারি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলব৷ আইডিয়াটা ভালো না..সবাই ভালো শাশুড়ী হবে আর আমি হবো খারাপ শাশুড়ী..!
আহান ক্যামেরা নিয়ে এবার ধরল রুহিনী বেগম আর সোহেদ সাহবের দিকে। দু-জনেই হাসি হাসি মুখে বললেন,"একটাই কথা বলব, বাড়ির মেয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতে যাচ্ছি..!
নাছির মঞ্জিল,
সময় সাতটা পঞ্চান্ন মিনিট...।
"আজকের দিনটা আজব। কেমন অনুভূতি হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। আপনারা জানলে অবাক হবেন আমি নুসরাত নাছির আজকের দিন নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ভুগছি। কারণ কী..! উত্তর নেই আমার কাছে। সবাই বলছে তারা অনেক বছর পর এই ভিডিও দেখবে তখন নাকি অনুভূতি গুলোও নতুন হবে। আমার কাছে ওসব মনে হয় না, আর যদিও আমি এই ভিডিও দেখি তাহলে নুসরাত নাছির তোমাকেই বলছি কী ঠেকা মাথায় এসে পড়েছে এই ভিডিওটা তুমি দেখছ, যাও নিজের কাজে যাও... নিজের সময় এসব ফালতু জিনিস ওয়েস্ট করো না। আমি জানি তুমি এখনো যেমন হাসি খুশি আছো সামনেও হাসি খুশি থাকবে। তুমি নিশ্চয়ই এই নুসরাত নাছিরের উপর বিরক্ত হচ্ছো, ঠিক! কারণ এখন তো তুমি সৈয়দ চয়েসের সিও। যতদিনে এই ভিডিওটা তুমি দেখবে হয়তো ততদিনে তুমি সৈয়দ চয়েসের সিও হিসেবে জয়েন করে ফেলেছ অফিসিয়ালি। তাহলে বসে এখনো কেন এই ভিডিও দেখছ? আমি জানি তুমি আগের থেকেও দ্বিগুণ সুন্দর হয়েছ, তোমার কাপড় চুস করার চয়েস এখনো আগের মতো ক্লাসি আছে তাই না! আমি জানি এখনো আছে, কারণ পৃথিবী চেঞ্জ হতে পারে কিন্তু নুসরাত নাছির না..! অহো এখনো বসে বসে এটা দেখছ, যাও, তোমার ডিলগুলো সামলাও, তোমার ক্লায়েন্ট এসে বসে আছে নুসরাত নাছির তাদের সময় দাও, প্লিজ গো..! এভাবে নিজের বিজনেস জলে যেতে দিও না..! আমি জানি তুমি উঠে দাঁড়িয়েছ, আর এখন হাঁটার প্ল্যান করছ, তাহলে অপেক্ষা করছ কীসের..! প্লিজ রান নুসরাত নাছির রান..! আই নো ইউ আর হেলথি এন্ড ওয়েলথি..! কতটাকার মালিক এখন তুমি? মিলিয়ন, বিলিয়ন, নাকি ট্রিলিয়ন? কোনো ক্লাবে নিজের নাম লিখিয়েছ? লিখিয়ে থাকলে কোন ক্লাবে? আমি জানি তুমি এখন ট্রিলিয়ন ক্লাবে নাম লেখানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছো..! এই বোরিং নুসরাতের কথা এখনো দাঁড়িয়ে শুনছো, যাচ্ছো না কেন! প্লিজ যাও…! তোমার ক্লায়েন্ট চলে যাচ্ছে!
আহান হেসে ফেলল। নুসরাত নিজের কথা শেষে নিজেও হেসে ফেলল। এবার ইরহামের পালা আসলো। সে ক্যামেরার দিকে চেয়ে রইল অদ্ভুত ভঙ্গিমায়। নিজের মুখে লাগানো ব্ল্যাক ফেইস মাস্ক নিয়েই নুসরাতের পাশাপাশি বসল। ক্যামেরার দিকে আঙুল তাক করে বলল," হেই ইউ সৈয়দ ইরহাম শোহেব, তুমি কী এই ভিডিওটা দেখছ! তোমাকে এখন দেখতে কেমন..! পেট উঁচু, চোখে চশমা, চামড়া খসখসে, হবেই তো, ঠিকমতো স্কিন কেয়ার করোনি আমি সিওর। দেখছ আমাকে কতটা হ্যান্ডসাম আমি, যখন আমি তোমাকে ল্যাপটপের সামনে বসে দেখব তখন যেন তুমি আরো বেশি হ্যান্ডসাম হয়ে যাও..! আর আরেকটা কথা পেট উঁচু যেন না থাকে..!
আহান ক্যামেরা হস্তান্তর করল ইরহামের কাছে। নিজে ভাবসাব নিয়ে বসে দাঁত মেলিয়ে একটা হাসি দিল। সাথে নুসরাতকেও যোগ করল। ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল,"জানি তুমি সাইন্টিস্ট হতে পারোনি তাই বলে কী নুসরাত নাছিরের ব্যাগ ধরে হাঁটছ? দয়া করে এটা করো না, যদি করেও থাকো তাহলেও কোনো সমস্যা নেই।
পরপর দু-জনে গলা মিলিয়ে একসাথে বলে ওঠল,
“নুসরাত নাছির যাও নিজের কাজে যাও আর আহান নাওফিল তুমি এখনো বসে কেন, তোমার বস চলে যাচ্ছে, নিজের চাকরি বাঁচাতে চাইলে বসের ব্যাগ নিজের হাতে নাও...!
সৈয়দ বাড়ি,
আটটা দশ মিনিট।
“আমি ভবিষ্যৎ আরশ হেলালকে বলছি তুমি এই ভিডিওটা দেখছ? তাহলে দেখছ কেন? তোমার কাজ নেই, প্লিজ গো ব্যাক ইউ্যের ওয়ার্ক। আমি জানি তুমি আগের মতো এখনো স্বাস্থ্যসম্মত আছো। তুমি কী ওই জেদি মহিলাকে নিজের আয়ত্ত্বে এনেছ নাকি এখনো এমন ঘুরছ। যদি এনে থাকো তোমার বাচ্চা কয়টা। বারোটা নাকি চৌদ্দটা। আই থিংক দশটা তো হবে। তোমার প্রথম বাচ্চাটা কী ছেলে নাকি মেয়ে! আমি আশা করি মেয়ে হবে, আমি ফাস্ট বাচ্চা মেয়ে চাই..!তোমার স্ত্রী কী এখন তোমের কথা শুনে নাকি আগের মতো জিদ্দি রয়েছে। আরশ তুমি কী তাকে ভালোবাসো, আগেই বলে দিচ্ছি আমি তাকে ভালো টালো বাসি না। সে শুধু আমার দায়িত্ব..! তুমি কী ভালোবাসো..!
____________________________________
আহানকে চেপে ধরেছেন সুফি খাতুন। আহান সুফি খাতুনের পানে চোখ উল্টে চেয়ে জানতে চাইল,"কী হয়েছে?
আহানের মুখের উপর বিরক্তির চাপা ছাপ। ভদ্রমহিলা তার নানি হলেও সে মোটেও পছন্দ করে না তাকে। ইসরাত আপির নানিও তো কত্ত ভালো, তার নানি এমন খারাপ কেন সে বুঝে পায় না..! তার মা টা ও তো কতো ভদ্র তাহলে এই খারাপ মহিলা তার নানি হলো কেন! সুফি খাতুনের কর্কশ কন্ঠ কানে যেতেই চিন্তায়করণে আঘাত পড়ল আহানের। তার নানি বলছেন,"কী করছিস ওই ক্যামেরা দিয়ে?
আহান বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ বের করল। সামান্য লাফ মেরে উঠে বলল,"ভিডিও করছি..!
আহান দ্রুত পায়ে পালাতে যাবে সুফি খাতুন তার বাহু চেপে ধরলেন। ভ্রু একপেশে করে তুলে বললেন,"আমার ভিডিও করলি না কেন?
আহান অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি কী পরিবারের মানুষ?
" অবশ্যই আমি। যা ভিডিও কর গিয়ে..!
আহান ক্যামেরা নানির মুখের পানে নিবিষ্ট করল। বিরক্তির শেষ পরিশেষে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,"তোমার অনুভূতি কী?
"আমার অনুভূতি সম্পর্কে কী বলব,আমি তো স্পষ্ট ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি, ছেলেটার সুন্দর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর তা নষ্ট করতে যাচ্ছে ওই কালনাগিনী..! নাগিন হয়ে এসে প্রবেশ করছে এই বাড়ি সদর দরজা দিয়ে, সকলের ভেতর এবার বিষ গুলে দিবে।
আহান ঠুস করে ক্যামেরা বন্ধ করে নিল। সুফি খাতুন প্রশ্নাতীত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিতেই বলল," আমার ক্যামেরার চার্জ শেষ, ইমিডিয়েটলি চার্জে দিতে হবে, না হলে বোম ব্লাস্ট হওয়ার সম্ভবনা আছে।
সুফি খাতুন চোখদুটো বড় বড় করে বলে ওঠল,
"যা যা এক্ষুণি চার্জে দেয়, নাহলে অঘটন ঘটে যাবে।
___________________________________
জায়িন নিজের গায়ে আইভরি কালারের, গোল্ডেন শ্যাম্পেইন এর কারুকার্য করা শেরওয়ানি জড়াল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে আতর হাতে তুলে নিতেই ক্যামেরা হাতে এসে দাঁড়াল আহান আর ইরহাম। জায়িন হাতে আতর দিতে দিতে ভ্রু উচাল। তখনই আহান বলে ওঠল,"আপনার অনুভূতিটা কী আজ?
জায়িন গায়ে আতর ডলতে ডলতে ইশারা করল ক্যামেরা চালু করার জন্য। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নিল। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে অধিপত্য বিস্তারকারী রাশভারী কন্ঠে বলে ওঠল," জীবনে অনেক এক্সামের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি, অনেক ইভেন্ট জয়েন করেছি কিন্তু আজকের ইভেন্টটা ভিন্ন। ইভেন্ট বললে ভুল হবে, আজ একটা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। আর আশা রাখছি এই পরীক্ষা উর্ত্তীণ করব আমি। আজকের জন্য অনুভূতিটা কিছুটা মিশ্র হচ্ছে। কখনো ঘেমে যাচ্ছি, কখনো নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি, আবার কখনো আজব আজব খেয়াল আসছে..! আমি ভীষণ নার্ভাস।
ইরহাম এবার আরেকটা কথা জানতে চাইল,
"ভবিষ্যৎ জায়িনের জন্য কোনো কথা বলবেন বড় ভাইয়া?
জায়িন ক্যামেরার দিকে কোমল চোখে চেয়ে, মোলায়েম সুরে বলে ওঠল," আমি জানি তুমি এখনো ইসরাতকে ভালোবাসো। ইসরাত তোমার সাথে আছে নিশ্চয়ই। এতদিন ইসরাতের যত্নআত্মি কেমন করেছ! ওকে কষ্ট দিয়েছ তুমি, যদি কষ্ট দিয়ে থাকো তাহলে জায়িন হেলাল তোমাকেই বলছি যাও আগে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে নাও! আমি তোমার থেকেও বেশি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি। ও এ বাড়ির চৌকাঠ যেন কখনো রাগ নিয়ে না মাড়ায়। চৌকাঠ মাড়ানোর আগেই ওকে মানিয়ে নিও জায়িন, নাহলে তোমাকে আমি নিঃশেষ করে ফেলব।
আটটা ত্রিশ মিনিট,
সিলেট টিলাগড় পয়েন্ট..!
নুসরাত ক্যামেরা ইসরাতের অর্ধশেষ হওয়া মুখের দিকে তাক করল। শুধাল,"হেই ইসরাত নাছির, আজকের অনুভূতি কী?
ইসরাত হাসি মুখে ফিরে চাইল নুসরাতের পানে। ঠোঁটে হাসির অস্তিত্ব রেখেই বলল,"আমার লাইফের আজ বিশেষ একটা দিন। সবকিছু কেমন ধোয়াশা মনে হচ্ছে..! আমি সবসময় চাইতাম আমার বিয়েটা মসজিদ হোক কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না, তাই একটু মন খারাপ। সকাল সকাল উঠে কত পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়েছি, আজকের প্রিপারেশনটা ভিন্ন। ক্যান ইউ রিয়েলি ইমেজিন আজ তোমার বিয়ে! অহ মাই গস..! আমার অনুভূতিটা আমার কাছে কেমন ঠেকছে আমি জানিন না, বাট আ'ম সো হ্যাপি। এট লাস্ট আমি আমার দাদু বাড়িতে ফিরছি। যেখানে আমি নিজের বাড়ি থেকেও বেশি কম্ফোর্টনেস ফিল করি।
নুসরাত আবার বলল,
"ভবিষ্যৎ ইসরাতের জন্য কী বলবি তুই..!
ইসরাত চোখ টিপ দিয়ে ভ্রু নাচাল সামান্য। কপালের মধ্যিখানি তীক্ষ্ণ ভাঁজ ফেলে বলল," ইসরাত নাছির, তোমার এখন কয়টা বাচ্চা? দুটো নাকি তিনটে, এটলিস্ট তো পাঁচটে বাচ্চা হবে। কেমন চলছে তোমার সাংসারিক জীবন..! আই থিংক তোমার সাংসারিক জীবন খুব ভালো চলছে। জায়িন কী তোমায় এখনো আগের মতো ভালোবাসে নাকি তার তুলনায় বেশি..! যদি কম ভালোবাসে তাহলে ওর ঘাড়টা মাথা হতে আলাদা করে দাও, কারণ কম ভালোবাসে এমন স্বামীর প্রয়োজন তোমার নেই। আমি জানি ইসরাত নাছির জায়িন তোমাকে ভালোবাসে আগের মতোই, মজা করে শুধু বললাম। আরো সতেরো বছর পর যখন তোমাকে দেখব তখন যেন এমন হাসি তোমার ঠোঁটে থাকে, ততদিন পর্যন্ত সুস্থ থাকো, পরিবার নিয়ে সুখী থাকো, দুই বাচ্চার মা হয়ে যাও, বায় বায়, উম্মাহ..!
____________________________________
ঘড়ির কাটায় টিকটিক করে নয়টায় পৌঁছেছে। নুসরাত দু-হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে দোয়া করছে,”ইয়া আল্লাহ, বৃষ্টি যেন না হয়, নাহলে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।
নুসরাতের দোয়া হয়তো কবুল হয়ে গেল, মেঘের গর্জন কিছুক্ষণ চলার পর তা থেমে গেল। গগনে আজ মেঘ জমেছে। মেঘের ঘনঘটা আসমানটুকুও কালো হয়ে আছে। যেদিক দিয়ে চোখ যায় সেদিক দিয়ে শুধু মেঘের আনাগোনা। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে নিতেই একজন আর্টিস্ট এসে নুসরাতকে জানাল,”ব্রাইডের মেক-আপ ডান..!
নুসরাত সামান্য হাসল। হেসে বলল,
“প্লিজ ব্রাইডকে গাড়িতে বসিয়ে দিন আমরা উনার ফুল লুক একসাথে দেখব।
ইসরাতকে গাড়িতে নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হলো নুসরাতের অনুরোধে। নুসরাতের গায়েও কালো রঙের গ্রাউন। মেয়েরা প্যাস্টেল মিন্ট গ্রিন কালার এর শাড়ি পরলেও নুসরাতকে পরানো সম্ভব হয়নি। পারলে সে কালো কালারের স্যুট কোট পরে ফেলে, তাই তার জিদের কাছে হেরে কালো রঙের কাপড় তাকে পরতে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কোনো কাজ নেই তার কাপড়ে। হাতে, গ্রাউনের নিচের দিকে আর গলার কাছে কাজ। তাও খুবই সামান্য ডায়মন্ড পাথরের কারচুপির কাজ। পায়ে স্লিপার পরা। চার ঘন্টা পূর্বে ইসরাত যেমন রেখে এসেছিল এখনো পর্যন্ত সে সেরকম। এখান থেকে তারা সোজা যাবে নিজেদের ডেস্টিনেশন এ..! কনভেনশন হলের বাহিরে সাজানো হয়েছে প্রথমে সেখানে আকদ হবে তারপর ভেতরে ফটোসেশন হবে। গাড়ি ড্রাইভিং করতে করতে নুসরাত আজ উঁকি দিল না ইসরাতকে দেখার জন্য। চুপচাপ সামনে দৃষ্টি নিবিষ্ট করে গাড়ি চালাল। সময় অতিবাহিত হলো, আধঘন্টা পর তারা তাদের ডেস্টিনেশন এ পৌঁছে গেল। নুসরাত প্রথমে গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজা খুলে দিল। ইসরাতের দিকে তাকাল না, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইসরাত গাড়ি থেকে বের হতেই তার ভারী লেহেঙ্গার পেছন
চেপে ধরে হাঁটা ধরল নুসরাত। ইসরাত সামনে হেঁটে গেল পেছন পেছন সে। রেস্ট রুমে যেতেই ইসরাতের উদ্দেশ্যে বলল,”সবাই প্রায় চলে আসছে, আমিও আসছি।
নুসরাত দৌড় দিল দ্রুত। নিজেকে পরিপাটি করল সামান্য। নাকের রিংটা খুলে ফেলল কেন জানি..! গলা খালি রাখল, গালে ব্লাশঅন, ঠোঁটে সামান্য নুড কালার লিপিস্টিক ইউজ করল, চোখে মাস্কারা। সামনে দু-গাছি চুল এনে পনিটেল করে নিল। নিজের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করল,”ইউ আর পারফেক্ট নুসরাত নাছির..!
____________________________________
জায়িন এখনো পৌঁছায়নি কনভেনশন হলে। শোহেব সাহেব, রুহিনী পাত্র পক্ষ, আর সোহেদ সাহেব ঝর্ণা পাত্রী পক্ষ। এদিকে মেয়েদের পক্ষে মমো, ইরহাম, আহান। নুসরাতের মামা বাড়ির ও কিছু কাজিন এসেছে বিয়েতে। ওরা গেইটে কত টাকা নিবে তার প্ল্যান করছে। ঝর্ণা বেগম ,নাজমিন বেগম, নুসরাত, নাছির সাহেব, মমো, সৌরভি দাঁড়াল পেছন ঘুরে। একজন সার্ভেন্ট এসে বলে গিয়েছে ব্রাইড আসছে। ইসরাত রেস্ট রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলো। উল্টো মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের সবাইকে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের জানান দিল। সবাই ফিরে তাকাতেই ইসরাত হাসল। নুসরাত বিস্ময়ে দু-হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে,, ঠোঁট দিয়ে উচ্চারিত হয়,”ইসরাত ইউ লুক এবসোলুটলি স্টানিং।
নাছির সাহেব দু-হাত মেলে দিতেই ইসরাত এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। তারপর নাজমিন বেগম তাকে জড়িয়ে ধরলেন নিজের সাথে। নুসরাত ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে ইসরাতের দিকে। ইসরাত নিজে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। কানে আসলো গ্রুম আসছে গ্রুম। নুসরাত ইসরাতকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়াল গেটের দিকে। পেছন পেছন আসলো মমো সৌরভি। গেটের কাছে এসেই দাঁড়াতে পরপর বিশটা গাড়ি এসে থেমেছে পার্কিং লটের সামনে৷ সবার গাড়ি থেকে বরযাত্রী নেমে দাঁড়াতেই হৈ হুল্লোড় পড়ে গেল সবদিকে। ক্যামেরা ম্যানেরা ভিডিও করছে সবাই। জায়িন এসে গেটের সামনে দাঁড়াতেই নুসরাত কপালে ভাঁজ ফেলল। জায়িন ও ভাঁজ ফেলল। শুধাল,”কী চাই?
নুসরাত নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলল,
“গেট ধরার টাকা।
জায়িন ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,
“কতটাকা চাই?
নুসরাত, আহান, ইরহাম আর মমো একসাথে বলল,
“উমম দশ লাখ..!
জায়িন বলল,
“ টাকা কী গাছে ধরে, বিশ লাখ দিব। বিশ লাখের মতো চেহারা তোমাদের?
নুসরাত ঝাঁঝিয়ে উঠল, তেতো কন্ঠে কিছু বলতে নিবে ইরহাম বলল,”ভাই আমরা অনেকজন, আর আপনার ব্রাইডকেও দেখতে হবে। আকাশের চাঁদ নিয়ে যাবেন আর কিছু খরচ করবেন না তা কী করে হয়..!
জায়িন সরাসরি বলল,
“এমন হলে এক টাকাও দিব না।
লিপি বেগম এসে দাঁড়ালেন তার পাশে। তীক্ষ্ণ সুরে জানতে চাইলেন,” কী বলছে ওরা?
জায়িন নম্র কন্ঠে বলল,
“দশ চাচ্ছে..!
লিপি বেগম গলায় জোর ঢেলে বললেন,
“ওরা দশ চাচ্ছে, তুই বিশ দিয়ে দেয়। তোর টাকার কী অভাব..! মেয়েও তো দেখতে হবে আমাদের।
লিপি বেগমের কথায় উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল সবাই। নুসরাত চোখ উল্টিয়ে চেয়ে আছে জায়িনের দিকে। জায়িন বলে ওঠল,”বাড়িতে গিয়ে চেক দিয়ে দিব।
সবাই জিদ্দি সুরে বলল,
“আমাদের এখনই চাই!
সবার জিদের কাছে হেরে হেলাল সাহেব আর শোহেব সাহবে মিলে নিজেরা কিছু টাকা দিলেন। পরে টাকা দিবেন বলে আশ্বাস দিয়ে রাখলেন।
কনভেনশন হলের ভেতর প্রথমে জায়িনদের এন্ট্রি হলো এরপর ব্রাইডের। ব্রাইডের সময় আলোটা সামান্য কমিয়ে দেওয়া হলো। শব্দ করে খুলে গেল দরজা। সেখান থেকে থুতনি পর্যন্ত ঘোমটা টানা ইসরাত বের হয়ে আসলো। এসে দাঁড়াল সুন্দর করে সাজানো জায়গায়। যেখান দিয়ে তার এন্ট্রি হবে সেখানে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে oonchi oonchi deewarein. ইসরাতের হাত চেপে ধরে রেখেছে নুসরাত, তার পেছনের কাপড় সামলাচ্ছে ইরহাম, মমো, সৌরভি। কিছুদূর হেঁটে যেতেই এসে বাপ চাচা সবাই তার পাশে দাঁড়াল। নুসরাত ইসরাতের হাতের ভার হস্তান্তর করল নাছির সাহেবের হাতে। পুরো পরিবারের পুরুষেরা সবাই বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। আরশ জায়িনের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় থেকে বলে ওঠল,”মনে হচ্ছে, পলিটিক্স করতে যাচ্ছেন উনারা। এমনভাবে দাঁড়ানো মানে কী..!
জায়িন নিজেও অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে সবার দিকে। তাদের কথা বলার ভেতর আবার আলো নিভে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল পুরো কনভেনশন হল৷ এর মধ্যে মৌলভী সাহেব এসে হাজির হলেন সেখানে।
বাহিরে ঘুরি ঘুরি বৃষ্টি হওয়ায় ঠিক করা হলো কনভেনশন হলের ভেতর আকদ করানো হবে। স্টেজের চারিপাশে থাকা ক্লাসি চেয়ারে বসে আছেন আত্মীয় স্বজন। ইসরাতকে এনে জায়িনের পাশে বসানো হলো না৷ জায়িনের বিপরীত পাশে বসেনো হলো৷ মাঝখানে ফুল দিয়ে সাজানো ছিল এপাশে জায়িন ওপাশে ইসরাত। জায়িনের কাছে অদ্ভুত ঠেকল ইসরাতকে। ফুলের আড়ালে থেকে দেখে মনে হলো একটু বেশি মোটা আজ ইসরাতকে দেখাচ্ছে। ইসরাত তো এত স্বাস্থ্যবান না। পরপর মনে হলো হতে পারে মোটা কাপড় পরায় এমন দেখাচ্ছে, কিন্তু..! নিজের চিন্তা একপাশে ফেলে সে বসল নড়েচড়ে। মৌলভী সাহেবের হাতে মাইক। জায়িনের পাশে মাইক হাতে আরশ দাঁড়িয়ে আর ইসরাতের পাশে মমো। আহান, ইরহাম, নুসরাত তিনটাই উধাও। আশেপাশে কোথাও তারা নেই। এটা দেখেও জায়িনের কাছে সন্দেহজনক লাগল। ইসরাতকে রেখে তিন মাথা উধাও হওয়ার মতো না, তাহলে এরা উধাও হলো কেন..! মৌলভী সাহেব একে একে সব জিজ্ঞেস করা শেষে বলে ওঠলেন,”এই বিয়েতে রাজী থাকলে বলো মা কবুল..!
ইসরাত নিজের মুখের সামনে মাইক নিয়ে ধরতেই, শব্দ হলো,”কবুল,কবুল, কবুল..!
জায়িনকে বলতেই সে ত্যাড়া চোখে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠল,”কবুল..!
পরপর উঠে দাঁড়াল নিজের জায়গা থেকে। সন্দেহজনক দৃষ্টি সামনের দিকে স্থির রেখে সামনে থাকা ফুলের আবরণ গুলো সরাল। সবাই যখন আলহামদুলিল্লাহ বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন সামনে থেকে জায়িনের বিকট শব্দের চিৎকার ভেসে আসলো ,”আমার বউ কোথায়?
আলহামদুলিল্লাহ বলতে ভুলে গিয়ে সবাই জায়িনের পানে চাইলেন। দেখলেন জায়িনের সাথে গুলুমুলু দেখতে একটা মেয়ে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অস্বস্তিজনক হাসি। সবাই বিস্মিত, বিমূর্ত নয়নে চেয়ে থেকে একই সুরে বললেন,”আমার বউ কই? আর এ বা কে?
কনভেনশন হল জুড়ে রবো পড়ে গেল বউ কোথায়, বউ কোথায়, কিন্তু বউকে কেউ কোথাও খুঁজে পেল না।
চলবে….
#প্রিয়_প্রণয়িনী২
#জান্নাত_নুসরাত
(৩৭) শেষ অংশ
এতক্ষণের শান্ত পরিবেশ ভেদ করে কনভেনশন হলের চারিদিকে হট্টগোল বেঁধে গেছে। বাহিরে বৃষ্টির ঝাপটা ভেতরে মানুষের সমাগমে হুরোহুরি চলছে প্রায়। চারিদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খুঁজছে সবাই বিয়ের কনেকে,কিন্তু সে কোথায়! নেই কোথাও নেই..! জায়িন হতবাক, স্তব্ধ, হয়ে নিজের জায়গায় অটল দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের আগায় তাচ্ছিল্য ভর করেছে। ভেতরে ভেতরে ক্রোধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। হাতের কাছে যাকে পাবে তাকেই খুন করে ফেলবে তার অবস্থা দেখে এমন সম্ভবনা আছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। কনে রুপে সেজে আসা মেয়েটা কাচুমাচু ভঙ্গিতে চুপসে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। ভয় ডর মুখে তেমন একটা নেই কিন্তু চোখে শঙ্কা স্পষ্ট। জায়িন ঘাড় বাঁকিয়ে দু-দিকে মটমট করে শব্দ করল। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে এক পা এক পা করে আগাল সামনের মেয়েটার দিকে। হিসহিসিয়ে জানতে চাইল,”কোন সাহসে এখানে বসেছ?
মেয়েটা নিজেও পিছিয়ে গেল জায়িনের সাথে। মুখে এতক্ষণের শঙ্কা উবে গিয়ে ভর করল ভয়। নিষ্পাপ মুখটা খুলে কিছু বলতে যাবে জায়িনের হাতের থাবা পড়ল তার বুকের কাছের কাপড়ে। তখন কারোর দৃষ্টি তাদের দিকে নেই। একহাতে ঘাড়ের চুলগুলো খিঁচে চেপে ধরতেই মেয়েটার সব চুল খুলে হাতে চলে আসলো জায়িনের। জায়িন একবার দেখল মেয়টাকে একবার দেখল হাতের চুলকে। বিস্ময়ে, রাগে, মাথা দপদপ করে উঠল। মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে কঠোর কন্ঠে জানতে চাইল,”এসব কার আইডিয়া আহান?
আহান কাঁদো কাঁদো মুখ বানাল।মিনমিনে সুরে বলল,
“ছোট আপু আর ছোট ভাইয়ার, আমি কিছু জানি না।
কথা শেষে ভ্যা করে কেঁদে দিল সে। দূর হতে আরশের গলার স্বর ভেসে আসলো,” সবাই যান গিয়ে বসুন, আমি দেখতেছি। প্লিজ ভাইয়া এদিকে আসো..!
সবাই চিন্তিত মুখে ফিরে আসলো নিজ নিজ স্থানে। আরশ দ্রুত ভঙ্গিতে ইসরাতের এন্ট্রি যে পথ দিয়ে হয়েছিল তা ক্রস করে চলে গেল করিডোরের দিকে। আকস্মিক কী মনে হলো নিজের জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার কাছে ঠেকল ভেজানো দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মেয়েটাকে সে চিনে, যে এই মুহুর্তে দু-হাত উপরে তুলে নাচছে, কোমর দোলাচ্ছে, এমনকি মুক্ত জড়া হাসি হাসছে। বারংবার নাচের তালে খিলখিল করা হাসি ঠোঁট চেপে ঢাকার বৃথা প্রচেষ্টা করছে। তার হৃদয়ে ঝড় উঠল। নিজের কাছে মনে হলো একবার ফিরে যাওয়া উচিত, দেখা উচিত ওই ভেজানো দরজার আড়ালে কে, আর হাসছেই বা কে, একবার ফিরে যা আরশ, শুধুমাত্র একবার দরজার ওপাশে কে সেটা দেখ, এরপর নাহয় চলে যাবি যাকে খুঁজছিস তাকে খুঁজতে। নিজের মনের দোলাচালে নিপীড়িত হয়ে আরশ পা বাড়াল৷ তড়িৎ গতিতে নয়, ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে৷ আস্তে ধীরে যখন পা বাড়িয়ে গিয়ে থামল চরণ দু-খানা দরজার নিকট তখন চোখদুটো সেখানেই স্তব্ধ রইল। বুকের কাছের নরম মাংসপেশি ধুকপুক করে উঠল। কালো গ্রাউন পরা নৃত্যরত মেয়েটা নিশ্চুপ। সাউন্ড সিস্টেমে খুব হালকা সুরে গান বাজছে Tere liye~ jhumu diwana banke tere liye
Vaada hai mera main hoon tere liye
Hona kabhi tu judaa ....। কানে হেডফোন লাগানো সবার, পনিটেল করা চুলগুলোও নাচছে নিজের মালিকের সাথে তাল মিলিয়ে। কপালে, কানে, হাতে ছোট্ট সাদা পাথরের অর্নামেন্ট গুলো চকচক করছে। হাতের মধ্যে ধরে রাখা ওড়নাটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে সেদিকে বিশের কৌটায় পা দেওয়া মেয়েটার কোনো ধ্যান নেই। আরশের হাফসাফ লাগল। বুক ধড়ফড় করল, জ্বালা হলো, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল, এটা সত্যি কী তার বউ, উত্তর আসলো ভেতর থেকে হ্যাঁ..! এটা তার বউ, আরশের বউ, একান্ত, শুধুমাত্র তার বউ। এতটা গোছাল নুসরাত নাছিরকে আরশ কখনো দেখেনি। তার বুকে আবারো সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা উঠল, স্বস্থি মিলছে না। গলার কাছ পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা বোতাম টেনে টুনে খুলল, দু-পাশে মাথা ঝাঁড়ল মাতালের মতো করে। নাক টেনে শ্বাস নিল, হাফসাফ করল শ্বাসকষ্টের রোগীর মতো। শ্বাস ফেলে চোখ তুলে তাকাতেই আবারো বুকে ব্যথা উঠল। আরশ দু-পাশে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মাথা নাড়াল। ইচ্ছে করল হাত চেপে ধরে নিয়ে যেতে সবার সামনে। চিৎকার করে পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে নুসরাত নাছির তার স্ত্রী, তার সহধর্মিনী, তার একান্ত ব্যাক্তিগত মালিকানা শুধু এই মেয়েটার উপর, আর কারোর নেই। কিন্তু তার মুখ ফুটে একটা শব্দ বের হলো না, এমনকি অনুভূতির ছাপগুলো ভেসে উঠল না মুখের উপর, কারণ আরশের ভীষণ অস্বস্তি নিজের অনুভূতি মানুষের সামনে তুলে ধরা, মানুষকে বলে বেড়ানো মোটেও তার ধাঁচে নেই। তাই তো নুসরাতের সাথে তার ঝগড়া বেধে যায় কথায় কথায়। ভেজানো দরজা সামান্য খুলে নিজের সুঠাম দেহি শরীরটা জায়গা করে নিল। আড়াআড়ি দু-হাত বুকে বেঁধে দেখতে লাগল হিন্দি গানের তালে নাচে রপ্ত থাকা মেয়েটাকে। চোখ সরে গেল না একবারের জন্য অন্যপাশে।
____________________________________
আহানকে কিছু বলতে হলো না জায়িন নিজেই হলওয়ে থাকা মাইকের লাইন চিহ্নিত করে এগোলো সামনের পথে। কালো রঙের মাইক্রোফোনের লাইনটা চলে গেল সরাসরি রেস্ট রুমের দিকে। সে যখন পৌঁছাল নির্দিষ্ট স্থানে,তখন দেখল তার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে আরশ দাঁড়িয়ে আছে। বিরক্তিতে মুখ দিয়ে কিছু শব্দ বের করতে যাবে তখন চোখ পড়ল সামনের দিকে। ইরহাম এক হাত ইসরাতের কোমরে রেখেছে অন্য হাত নিজের হাতে নিয়ে ঘোরে ঘোরে নাচ করছে। পরপর আবারো আঙুল চেপে ধরে গোল গোল ঘোরাচ্ছে। দু-জনের কানে হেডফোন। জায়িন নিজেও বুকের কাছে হাত বেঁধে নিজের জায়গায় দাঁড়াল নৃত্য শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। আরশের তখনো কোনো নড়চড় নেই। সাউন্ড সিস্টেমে তখনো গান বাজছে। নুসরাত দু-হাত দিয়ে কান থেকে হেডফোন খুলে নিয়ে কিছু বলতে যাবে কানে ভেসে আসলো হাতের তালির শব্দ। সেই শব্দের সাথে জায়িনের গলা ভেসে আসলো,”আমাদের চিন্তার উপর রেখে এদিকে ভালোই নাচা হচ্ছে, আই লাভ দেট, প্লিজ ক্লেপ..! নাইস..!
সবাই বুঝল জায়িন তাদের উপহাস করে কথাগুলো বলেছে৷ মুখ খুলে নুসরাত কিছু বলতে যাবে জায়িন তর্জনী আঙুল তুলে নিজের ঠোঁটের উপর রাখল। হিসহিসিয়ে বলে ওঠল,”আপনি কিছু না বললেই আমি বেশি খুশি হবো। যা দেখিয়েছেন তাতেই চোখ ঝাঁঝিয়ে উঠেছে, এর থেকে বেশি কিছু দেখতে গেল না চোখ গলে যায়।
নুসরাত ঘাড় বাঁকাল। জিভ দিয়ে গাল ঠেলে হাসল সামান্য। জায়িন নিজের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,”নৃত্য করবেন আপনি? চলুন আজ রাতে আপনাকে নাচানো হবে, যত ইচ্ছে নাচবেন, আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার রুমে, আর আমি বসে বসে দেখব তা।
ইসরাত কিছু বলতে নিবে জায়িন শক্ত হাতে তাকে কোলে টেনে নিল, পা বাড়াল এন্ট্রেন্স এর দিকে, তখন ইরহাম বলল,”ভাইয়া প্লিজ এক মিনিট, আমরা আবারো সুন্দর করে আপুকে নিয়ে এন্ট্রি নিয়।।
জায়িন ইসরাতকে কোলে রেখে ঘাড় বাঁকিয়ে, স্পষ্ট, রগরগে কন্ঠে বলল,”কোনো প্রয়োজন নেই।
জায়িন আবারো হাঁটা ধরতেই দরজার ওপাশ থেকে হেলাল সাহেবের গলা ভেসে আসলো। তিনি হাপিয়ে ওঠা কণ্ঠে গলা ফাটিয়ে জিজ্ঞেস করছেন,”ইসরাতকে পাওয়া গিয়েছে?
ইসরাত সামনের দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকাল। আরশকে দরজার সামনে নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাফসাফ করে উঠল। জায়িনের পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে বলে ওঠল,”প্লিজ ছেড়ে দিন, নাহলে সবার সামনে লজ্জা পেতে হবে।
জায়িন ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। মেনে নিল ইসরাতের কথা তার পানে চেয়ে। ক্রোধপূর্ণ কন্ঠে বলল,”এখন ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু রাতে কোনো ছাড়াছাড়ি হবে না।
বলেই জায়িন ইসরাতকে মেঝেতে নামিয়ে দিল। ধুপধাপ পায়ে বের হয়ে চলে গেল বাহিরে। জায়িন চলে যেতেই নাজমিন বেগম, রুহিনী বেগম এসে প্রবেশ করলেন ভেতরে। নাজমিন বেগম নিজে খেঁকিয়ে উঠে বললেন,”বিয়ের দিনও তোমাদের এসব মজা করতে হবে? আজ বাড়ি চলো, জুতো দিয়ে পিটিয়ে যদি পিঠের ছাল তিনজনের না তুলি তাহলে আমার নাম নাজমিন বেগম নয়।
নুসরাত ভুল সময়ে মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে ফেলল,
“সত্যি?
নাজমিন বেগম নুসরাতের দিকে তেড়ে আসলেন। চিৎকার চেপে নিয়ে হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,” দেখবি তুই?
আরশ তখন পেছন থেকে এসে টেনে ধরল নাজমিন বেগমকে। মাথা গরম হয়ে থাকা নাজমিন বেগমকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল আরশ। রুহিনী বেগম সবাই চলে যেতেই এসে পায়ের হাই হিল এর শক্ত খোঁড়া দিয়ে নুসরাত আর ইরহামের পিঠে দুটো বসালেন। কটমটিয়ে উঠে ভৎসনা করলেন,”বেবাকুফের দল।,বাড়িতে যাওয়ার পর আজ হবে তোমাদের।
চোখ রাঙিয়ে দু-জনকে দেখে রুহিনী বেগম বেরিয়ে গেলেন। নুসরাত শ্বাস ফেলতে যাবে আবারো দরজা খুলে কেউ একজন ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরের শ্বাস ভেতরে চেপে যেতেই আহানকে কেউ ধাক্কা মেরে ভেতরে প্রায় ফেলে দিয়ে গেল। নুসরাত ভ্রু উচাতেই আহান ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠে বলল,”আম্মু আমায় উনার খাটাশ জুতো দিয়ে পিটিয়েছে সবার সামনে।
নুসরাত ঠোঁট চোখা করে এগিয়ে গেল। তার নিজেরও জুতোর বারি খেয়ে পিঠে জ্বালা হচ্ছে৷ আহানকে নিজের বাহুডোরে আগলে নিতে নিতে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল,”ওলে আমার বাবুটা, ওলে লে..!
দু-মিনিট পর তাদের দুঃখের অন্তিম হলো। আহান নিজের কাপড় চেঞ্জ করার জন্য ওয়াশরুমে চলে যেতেই ইসরাত ধীরে সুস্থে জিজ্ঞেস করল,”সেম কাপড় কোথায় পেলি তুই?
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ইসরাত প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে দু-নমুনার দিকে চেয়ে রইল।
কিছুক্ষণ আগের কথা.....
সে তখন ব্রাইড এন্ট্রির এর জন্য তৈরি হচ্ছিল হঠাৎ আগমন ঘটে নুসরাত, আহান, ইরহামের। আহানের গায়ে তখন সেম তার কাপড়ের মতো কাপড়। অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াতেই নুসরাত হইচই বাঁধিয়ে দিল। ইসরাতকে বাহবা দিয়ে বলল,”তোকে বলার আগেই দেখি তুই দাঁড়িয়ে পড়েছিস।
ইসরাতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে এনে দাঁড় করাল আহানের সান্নিধ্যে। ইসরাতকে মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে নিজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোলাল দু-জনের উপর নিচ। ইরহামের পানে নিজের নেত্র নিবিষ্ট করে ঠোঁট তর্জনী আঙুল স্থির করল। মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে বলে ওঠল,”উচ্চতা ঠিকই আছে দু-জনের। দেখতেও একই রকম ফর্সা। আহান সামান্য একটু, স্যরি টু সে কিন্তু একটু বেশিই মটু আর ইসরাত এভারেইজ।
ইরহাম নিজেও সহমত পোষণ করে ইসরাতের উদ্দেশ্যে বলল,”আপু তোমার হাত সামনে নিয়ে আসো।
মেয়েলি হাত দুটো কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সামনে চলে আসলো। ইরহাম আহানকে বলতেই সে নিজেও হাত এগিয়ে আনলো দু-জনের নেত্রের সামনে। নুসরাত দুঃখি সুরে বলে ওঠল,”এই আহাইন্নার তো হাতের আঙুল থেকে শুরু করে নখ পর্যন্ত ইসরাতের মতো। এরা ভাই বোন না হয়ে আমি আর ও বোন-বোন হলাম কেন?
ততক্ষণে আহানের মাথায় নকল চুল লাগিয়ে মাথায় বড়সড় ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানা হয়ে গিয়েছে। সৌরভি আর মমোর গলার আওয়াজ বাহির হতে পেতেই নুসরাত ইসরাতকে ওয়াশরুমের ভেতর ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। ওদের প্রবেশ করতে দেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওদের সামনে নুসরাত ইরহাম দাঁত কেলিয়ে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু দু-জনের একজনের কাছে লাগল না স্বাভাবিক হাসি। সন্দেহ জনক কিছু আশেপাশে না দেখে পেছনে গিয়ে চেপে ধরল তারা কনে রুপী আহানকে। নুসরাত আহানের হাত চেপে ধরে হাঁটা ধরল। তার নিজের কাছেই ঠেকল তার হাতের থেকে আহানের হাত মোলায়েম। ভালোই হয়েছে কেউ আহানকে সন্দেহ করবে না। কিন্তু নুসরাত সবাইকে বোকা বানাতে পারলেও জায়িনকে বোকা বানাতে পারল না। সে প্রথম থেকেই সন্দেহ করতে লাগল, শেষ মুহুর্তে একবার কবুল বলেই এসে চেপে ধরল আহানকে। আহান তো ভয়ে প্রথমে ওখানে যেতেই চাইছিল না কিন্তু নুসরাতের ভরসায় সে ওখানে গিয়েছে। সবার চোখে ধুলো দিয়ে ইরহাম মাইকের লাইন টেনে এনেছিল রেস্ট রুমে। যখন কবুল বলার সময় আসবে তখন যেন ইসরাতই মাইকে কবুল বলে। আহানের হাতে এমনি লাইন বিশিষ্ট মাইক্রোফোন তারা ধরিয়ে দিয়েছিল যাতে কোনো সন্দেহ না হয়। আর সন্দেহ হবে কেন? গত পনেরোদিন যাবত এই প্ল্যান করেছে তারা দু-জন মিলে। শেষ মুহুর্তে মেয়ে হিসেবে এড করেছে আহানকে। আর ইসরাতকে এসব কান্ড ঘটানোর আগেই মাত্র জানিয়েছে। ইসরাত অনেকবার না করতে গিয়ে থেমে গিয়েছে কারণ এই দু-জনের প্রতি সে অনেক দূর্বল। মার্বেলের মতো নিষ্পাপ দুটো চোখ দিয়ে তাকে যে এরা ম্যানোপুলেট করেছে তা বেচারি বুঝলই না। কোনোভাবে প্ল্যান ভেস্তে গেলে তারা বিপরীত প্ল্যান এ, বি, চি, ডি, রেডি রেখেছিল, শুধুমাত্র জায়িনের জন্য পুরো প্ল্যান বিগড়ে গেল। তবুও যতটুকু মজা পেয়েছে অতটুকুই অনেক বেশি। কিন্তু এবার যা পিঠে পড়বে তাও দারুণ মজার হবে।
ইসরাত কবুল বলার পর মাইক অফ করা হয়নি তাই বাহিরে কী হচ্ছে তা সব ধ্বনিত হয়ে ফিরে এসেছে এই রুমে। আতঙ্কিত চোখ-মুখ নিয়ে ওদের পানে ফিরে চাইতেই দুটো তার কানে হেডফোন লাগিয়ে দিল। বলল,’”নো টেনশন, জাস্ট চিল ব্রো..!
ইসরাত কিছু বলতে নিবে ইরহাম তার কোমর টেনে ধরে নিজের সাথে হেলেদুলে পা মিলাতে বাধ্য করল। এমনকি নুসরাত ইরহামের কানে হাই ভলিউম ব্যবহার করে গান বাজিয়ে দিল। কানের কাছে বাহিরের হইচইপূর্ণ পরিবেশ আঘাত হানতে পারল না। নুসরাত নিজেও কানে হেডফোন লাগিয়ে রেপারদের মত মাথা নিচের দিকে নামিয়ে, কোমর দুলিয়ে, নাচতে ব্যস্ত
হলো।
ইসরাতের গভীর চিন্তাকরণে ব্যাঘাত ঘটল ইরহাম আর নুসরাতের হাসিতে। দু-জনে হাইফাইভ করল। হাতের তালুর ঘর্ষণে শব্দ হলো। তা রুমের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে আবারো ফিরে আসলো। নুসরাত বলল,“অনেক কষ্ট জোগাড় করেছি। পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু প্ল্যান তো সফল হয়েছে ওইটাই মেইন কথা।
ইসরাত না চাইতেও সামান্য হাসল। আবারো দরজায় কড়াঘাতে তাদের কান সজাগ হলো। অক্ষিকোটর ঘুরিয়ে পেছন ঘাড় বাঁকাতেই সৌরভি আর মমো ফুসিয়ে ফুসিয়ে এসে প্রবেশ করল। মমো নিজের দু-হাতের লম্বা লম্বা নখগুলো উঁচু করে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ইরহাম আর নুসরাতের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে চিৎকার করল,”আজ ও তোদের খবিশিগিরি করতে হবে। বেয়াকুফ..!
ইরহাম মমোর কথায় কর্ণপাত করল না। তার দু-নয়ন তো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সামনের সৌন্দর্য্যে। পেস্টেল গ্রিন কালার শাড়ি পরিহিত সৌরভির পানে। কপালে ছোটোখাটো সাধারন একটা টিকলি। হাতে ব্রেসলেট, তা ও আবার সৈয়দ চয়েসের মোস্ট এক্সপেন্সিভ। হয়তো নুসরাত দিয়েছে। এটা মনে হতেই আনমনে হেসে উঠল ইরহাম। নুসরাতের মতো কিপ্টামি করা মেয়েও সৌরভিকে এটা দিয়েছে ভাবতে গেলেই ইরহামের কী রকম একটা অনুভূতি হয়। শুভ্র মুখে কৃত্রিম মেকআপ এর ছড়াছড়ি। টানা টানা চোখদুটো আজ আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে৷ কারণ কী! সৌরভি আজ চোখে আইল্যাশ লাগিয়েছে। ইরহাম আরেকটু পরখ করল। মেয়েটা কাজল দিয়েছে চোখে। শুভ্র বর্ণের মুখে, চোখে পরিহিত কাজলটা যেন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ইরহাম কখনো নুসরাত বা ইসরাতকে কাজল দিতে দেখেনি। সে দেখল মেয়েটাকে, আর শুধুই দেখল। কারণ কী সে নিজেও জানে না..! এটা শুধু জানে ভালো লাগে দেখতে মেয়েটাকে তার। পরে এই ভালোলাগা কতদূর গড়াবে তা সে জানে না, কিন্তু এখন শুধু মেয়েটার প্রতি ভালোলাগা কাজ করে।
নুসরাত গলা খাঁকারি দিতেই ইরহাম চমকে উঠল। ভ্রু উচিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে যাবে নুসরাত বলল,”ইসরাতের ওড়না..!
বাকিটুকু আর বলতে হলো না কারণ ইরহাম বুঝে নিল। এগিয়ে গিয়ে তা তুলে নিল একপাশ থেকে। মমো নিজেও ইরহামের সামনে এসে দৈর্ঘ্যে বিশ ফিট লম্বা ওড়নাটাকে মুঠো বন্ধি করে নিল। অন্যপাশ থেকে আহান আর সৌরভি তুলে নিল নিজেদের হাতের তালুতে। এন্ট্রেন্স এর দরজা শব্দ করে খুলে যেতেই আবারো আলো নিভে গেল। পাতলা ওড়নার আবরণে ঢাকা স্নিগ্ধ মুখখানা সামান্য রশ্নির আলোয় চকচক করে উঠল। ফর্সা গায়ে অফ হোয়াইট কালার কাপড়ে আইভরি কালার শ্যাম্পেইন এর কাজ, স্কিন টোন অনুযায়ী মুখে খুবই সামান্য মেকআপে তাকে রুপসী করে তোলেছে। ইসরাত ধীর পায়ে যত এগিয়ে গেল তত তার চারিদিক হয়ে বাপ চাচারা এসে আবার প্রথম বারের মতো ঘিরে ধরল। তাদের বাড়ির একটা রীতি আছে। এটা তাদের দাদার নিজের তৈরি। বাড়ির কোনো মেয়ের বিয়ে হলে সকল পুরুষ এসে চারদিক হতে তার পাশে দাঁড়াবে যেন বরপক্ষ বুঝতে পারে তাদের মেয়ে কোনো অবলা, লাচার নয়, তাদের মেয়ে শক্তিশালী। মাথার উপর দিয়ে সাজানো ভিন্ন ভিন্ন আলোর উপর দিয়ে শব্দ করে ড্রোন উড়ছে৷ মমোর হাতে ওড়নার দায়বার ছেড়ে দিয়ে ইরহাম, আহান, চলে গেল সামনে। আরশ সহ বাড়ির সকল পুরুষ দাঁড়াল ইসরাতের পাশে। কালো পাঞ্জাবি আর শার্টের ভাঁজে মেয়েলি অফ হোয়াইট কালার পরিহিত লেহেঙ্গাটা জ্বলমল করে উঠল। ক্যামেরা ম্যান নিজের ভঙ্গিতে সবার সামনে দাঁড়িয়ে, ক্যামেরার লেন্সে নিজের এক চোখ স্থির রেখে নুসরাতকে বলল,”আপনি ও এসে দাঁড়িয়ে যান আপু।
নুসরাত কোনো শব্দ ছাড়াই লেহেঙ্গার পেছনের অংশ ছেড়ে দিয়ে সামনে চলে আসলো। আরশের পাশে দাঁড়াতেই সে শোহেব সাহেবের কাছ হতে নিজের জায়গা থেকে সরে এসে নুসরাতকে বুঝিয়ে দিল ওখানে যেতে, তখনো সে একদম নীরব। কালবৈশাখী ঝড় আসার আগে যেমন পরিবেশ বাতাসের ঠান্ডবে প্রথমে নিস্তব্ধ হয় কিছু মিনিটের জন্য তেমনি এই মুহুর্তে সে হয়ে আছে। মুখের ভাবভঙ্গি শক্ত, ক্লিনসেভ ধারালো চোয়ালে অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে সামান্য দাড়ির। হয়তো কয়েকদিন যাবত ছাটাই করেনি তাই এমন অবস্থা..! নুসরাত আনমনে স্বীকার করল ভালোই লাগছে বলে। ক্যামেরা ম্যান যখন বলল,ফোকাস করুন এদিকে তখন ধ্যান ভাঙল৷ ক্ষীণ হাসি রেখে সামনে ফিরে চাইতেই অনুভব হলো একটা হাত তার পিঠ স্পর্শ করছে। পরপর তা টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে নিজের বুকের কাছে। পুরুষালি বুকের কাছে মাথা ঠেকতেই নিজের কোমরে একহাতের অস্তিত্ব বুঝল। ক্যামেরা ম্যান আরশের পানে চেয়ে সামান্য চোখ টিপে বলে ওঠল,”পারফেক্ট শট স্যার..!
এরপরের সময়গুলো কেটে গেল হুরহুরিয়ে। নুসরাত বোনের হাত চেপে ধরে তা তুলে দিল সামনে সঠান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জায়িনের সৌষ্ঠব হাতে। জায়িন মেয়েলি হাতখানা নিজের খড়খড়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে বসাল ফুলের ওপারের সোফায়। মৌলভী সাহেব তখনো খাতা হাতে স্তব্ধ বসে আছেন। অদ্ভুত এক বিয়েতে এসেছেন ভদ্রলোক যেখানে ছেলেকে মেয়ে সাজিয়ে বসিয়ে দিয়েছে এরা। জায়িন নিজেও গিয়ে সামনের সোফায় জায়গা দখল করে নিল। মৌলভী সাহেব আবার মাইক হাতে নিয়ে জোরে জোরে বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন, ততক্ষণে নিস্তব্ধ পুরো কনভেনশন হল। শোনা গেল শুধু মৌলভী সাহবের গলার মিষ্টি স্বর,”সৈয়দ হেলাল আহমেদ এর প্রথম পুত্র, সৈয়দ জায়িন হেলালকে সাঁইত্রিশ লক্ষ দেনমোহর দার্য করিয়া, কোনোপ্রকার চাপের সম্মুখীন না হয়ে এই বিয়েতে রাজী থাকলে বলো মা আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
ইসরাত তখন যতোটা ফটাফট কবুল বলতে পারল, এখানে বসে ততোটা তাড়াতাড়ি উচ্চারণ করতে পারল না শব্দগুলা। ওড়নার আড়ালে ঢাকা মুখটায় হাজারো অস্বস্তির সঞ্চার হলো, আশেপাশের মানুষের জন্য। এত মানুষের ভীড়ে কবুল বলতে তখনোর মতো নিরুদ্বেগ থাকতে পারল না। ইসরাতের অস্বাভাবিক, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে মমো তার হাত দিয়ে চেপে ধরল বোনের বরফ শীতল হাতখানা । তবুও না চাইতে ইসরাতের চোখের কোণে পানি জমা হলো, বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথার উদ্বেগ হলো। চোখের কোণ বেয়ে ঝড়ে পড়া এক ফোটা জল আঙুলের সাহায্যে মুছে নিতেই কানে ভেসে আসলো জায়িনের কন্ঠ। সেই কন্ঠে হাজারো আকুতি মিনতি। রাশভারী পুরিষালি পুরু কন্ঠে জায়িন বলে ওঠল,”আপনি টেনশন করবেন না, ঘরের সকল কাজ আমি করে দিব। আপনার পা টিপে দেওয়া থেকে শুরু করে কাপড় ধোঁয়া পর্যন্ত আমি করব, তবুও দয়া করে তাড়াতাড়ি কবুল বলুন ইসরাত।
জায়িনের কথা শুনে একটু দূরে দাঁড়ানো নুসরাত, ইরহাম, আহান খিটখিট করে হেসে উঠল। পারলে একজন আরেকজনের উপর গড়াগড়ি খায়। ইসরাত ভেতরে নিজের অধম হাসি চেপে রেখে হাতের মাইক মুখের সামনে তুলে ধরে বলে ওঠল,”আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
মৌলভী সাহেব আবার বললেন,
“এই বিয়েতে রাজী থাকলে বলো মা আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
ইসরাত একই সুরে আবারো আওড়াল,
“ আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
পরপর তিনবার কবুল বলা শেষে জায়িনের পালা আসলো। ইসরাত চোখের কোণে আবারো জমা হওয়া পানি হাত দিয়ে মুছে নিতেই উপলব্ধি হলো মাথায় পরম স্নেহের ভরসাযোগ্য হাতটা স্পর্শ করছে। মুখ উচিয়ে চাইতেই বাবা নামক লোকটা চোখ দিয়ে ভরসা দিলেন সাথে আছেন বলে। ইসরাত সামান্য হাসতেই মৌলভী সাহেবের গলা কানে ভেসে আসলো। তিনি বললেন,"সৈয়দ নাছির উদ্দিনের প্রথম মেয়ে সৈয়দা ইসরাত নাছিরকে নগদ সাঁইত্রিশ লক্ষ দেনমোহর দার্য করিয়া, কোনোপ্রকার চাপের সম্মুখীন না হয়ে এই বিয়েতে রাজী থাকলে বলো বাবা আলহামদুলিল্লাহ....
পরেরটুকু শেষ করার আগেই সে বিনা দ্বিধায় নিজের গম্ভীর পুরুষালি সুরে বলে ওঠল,”আলহামদুলিল্লাহ, কবুল, কবুল, কবুল।
মৌলভী সাহেব হাতের মাইকে বলে ওঠলেন,
“আমাদের বর বিয়ের জন্য মনে হচ্ছে একটু বেশিই অধৈর্য্য, উনাকে একবার বলতে বলা হলোই না কবুল বলার জন্য আর উনি তিন তিনবারই বলে ফেললেন।
মৌলভীর কথায় সবাই ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। নাছির সাহেব রেজিস্ট্রি পেপার এগিয়ে দিতেই সেখানে জায়িন সিগনেচার করল তড়িৎ গতিতে। পরপর তা হস্তান্তর করা হলো ফুলের অপাশে বসে থাকা ইসরাতের নিকট। সে কাঁপা হাতে নিজের নাম লিখতেই উকিল নিজের হাতে রেজিস্ট্রি পেপার নিয়ে ঘোষণা করলেন,"আজ থেকে আইনত সম্পূর্ণভাবে সরকারের দৃষ্টিতে এই বিয়ে বৈধ্য।
উকিলের কথা শেষ হতেই জায়িন উঠে দাঁড়াল নিজের জায়গা থেকে, ধীর পা এগোলো সামনে বসে থাকা দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে করে নেওয়া মেয়েটার কাছে। ফুলের পাতলা আবরণ দু-হাতে সরিয়ে দিয়ে সুঠাম দেহি শরীর নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সহধর্মিণী সম্মুখে। আলতো হাতে ইসরাতের বাহু চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে মুখের উপর ওড়না দ্বারা ঢাকা স্তর সরিয়ে দিল। দেখল লজ্জায় চোখদুটো নিচের দিকে স্থির করে রেখেছে মেয়েটা। জায়িন একহাতে পিঠ চেপে শক্ত করে নিজের বাহুডোরে প্রথমে আটকে নিল, জড়িয়ে ধরল আষ্টেপৃষ্টে। নিস্তব্ধ কাটল দুয়েক মিনিট, অতঃপর বাহুবন্ধনী হতে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের সামনে নিশ্চুপ ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ইসরাতের মুখে নিজের দৃষ্টি স্থাপন করল। তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের সাহায্যে থুতনি উপরের দিকে উচিয়ে কপালে চুমু খেল খুবই সূক্ষ্মভাবে। বাড়ির বড়রা ততক্ষণে বুফের দিকে চলে যেতে অগ্রসর হলেন, যাতে পর্যাপ্ত স্পেস মিলে তাদের। নুসরাত, ইরহাম, আহান তখনো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে জায়িনের দিকে। জায়িনকে তাদের দিকে ফিরে তাকাতেই নুসরাত তড়িঘড়ি করে হোস্টের মতো হাতে মাইক নিয়ে বলে ওঠল,”খাবার দেওয়া হয়েছে, আপনারা যে যার মতো বুফে হতে খাবার নিয়ে খেতে শুরু করুন।
নুসরাতকে হোস্টের মতো মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইরহাম গলা খাঁকারি দিল। নুসরাতের দিকে জায়িনের স্থির আগ্রাসী দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল নিজের দিকে। বলল,“আপুকে নিয়ে ওই টেবিলে চলুন ভাইয়া।
ইসরাত নিজের মুখের উপর দেওয়া বড় ঘোমটা প্রথমে সরিয়ে ফেলল। তা হস্তান্তর করল মমোর কাছে। মমো সুন্দর করে নিজের কাছে সামলে নিল ওড়নাটা। বলল,”সবাই যান আমি গাড়িতে এটা রেখে আসছি।
মমো চলে গেল বাহিরে হাতের বিশ মিটার লম্বা দৈর্ঘ্যে ওড়নাটা রাখতে। ইসরাত সামনে হাঁটা ধরতেই জায়িন তার লেহেঙ্গার পেছন নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। খাবার এড়িয়ায় যেতে যেতে যার যার সাথে দেখা হলো কুশল বিনিময় করল, ততক্ষণ পর্যন্ত তার লেহেঙ্গার দায়বার পুরোটা সামলালো জায়িন।
ইসরাত সামনে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে যেতেই জায়িন তার লেহেঙ্গা সুন্দর করে গুছিয়ে নিজেও চেয়ার টেনে বসল। ততক্ষণে সৌরভি, ইরহাম, আহান প্লেট সাজিয়ে এনে রাখল সবার সামনে। শাড়ি নিয়ে হাঁটতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে সৌরভির, সেটা কতক্ষণ যাবত লক্ষ করল ইরহাম। এবার টেবিলে খাবার রেখে ফিরে যেতে নিবে, শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে ইরহাম চেয়ার টেনে বের করল। কোমলতা মিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠল,”তুমি বসো, আমি আর আহান আনতে পারব।
সৌরভি দ্বিধা নিয়ে না করতে যাবে ইরহাম তার পূর্বেই আদেশ দিয়ে বলে ওঠল,”বসো..! আমরা পারব!
ধমক মিশ্রিত কন্ঠ ইরহামের। সৌরভি আর কোনো দেনামোনা করল না। ইরহামের অস্বাভাবিক দৃষ্টি নিজের ওপর ঘূর্ণনমান দেখে বসাই শ্রেয় মনে হলো তার নিকট। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও তো এই দৃষ্টির হাত থেকে সে মুক্তি পাবে। সৌরভি চেয়ারে বসতেই ইরহাম চেয়ারের হাতল হতে হাত সরিয়ে নিল। ইন করে পরিহিত শার্টের অন্য হাতের হাতা গুটিয়ে নিয়ে বুফের দিকে হাঁটা ধরল।
____________________________________
মৃন্ময় নিজের বাবা নিহাল মির্জা সাথে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। তাদের কানে পৌঁছায়নি এখনো খাবারে কথা।বিয়ে বাড়িতে এসে কনের জায়গায় নকল চুল পরিহিত ওই ছেলে রুপী মেয়েকে দেখে মৃন্ময় আর তার বাবা দু-জনেই স্তব্ধ, নির্বাক। হঠাৎ তাদের সম্মুখীন হলেন হেলাল সাহেব। প্রথমে তিনি খেয়াল করলেন না মৃন্ময়কে। পরম কাছের বন্ধু নিহাল মির্জাকে দেখে দু-হাতে জড়িয়ে নিলেন বুকের কাছে। এরপর খেয়াল হলো মৃন্ময়কে। ভ্রু কুটি করে কিৎকাল তিনি চেয়ে রইলেন পুলিশ অফিসারের দিকে৷ নিহালের পানে নেত্র নিবিষ্ট করতেই তিনি হ্যাঁ ভঙ্গিতে স্বীকারক্তি দিলেন মৃন্ময় তারই ছেলে। হেলাল সাহেব চশমার আড়ালে ঢাকা ছোট ছোট চোখে পরিলক্ষণ করলেন ছেলেটাকে। পরপর দু-হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন মৃন্ময়কে নিজের বুকের মধ্যে। বলে ওঠলেন,”এই জন্যেই বলি চেনা চেনা কেন মনে হয় এই ছেলেকে। গতকাল সকালে এই ছেলেকে দেখে তোমার কথা মনে হয়েছিল, পরে মনে হলো মনের ভুল। এমন মাথামোটা, গোবরঠাসা ছেলে আমার বন্ধুর পুত্র হতেই পারে না।
অপমানে মৃন্ময়ের মুখ থমথমে হয়ে গেল। নিহাল মির্জা বন্ধুর স্বভাব ভালোই জানেন। যে তার কাজে ঠ্যাং ঢোকায় তাকে দু-চোখে দেখতে পারেন না তিনি৷ আর এটা বুঝতে বাকি রইল না তার একমাত্র গুণোধর ছেলেকে বন্ধুর মোটেও পছন্দ হয়নি। বন্ধুর কথায় সামান্য হেসে নিলেন। নিজেও ভাবলেন এই সুযোগে তার ক্যাটক্যাট করা ছেলেকে একটু আকটু অপমান করা যায়। যে ছেলে তার একটা কথা মাটিতে ফেলতে দেয় না সে ছেলে আজ মুখে বুজে আছে, জবাব দিচ্ছে না,নীরবে হজম করে যাচ্ছে হেলালের কথা। তাই তিনিও সহমত পোষণ করে বললেন,”ঠিক ঠিক..!
হেলাল সাহেব এবার বন্ধুর পানে চাইলেন। বন্ধুর উৎসাহী মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে বললেন,”তুই তো আরো বড় গাধা, মৃন্ময়ের মাকে বিস্কুটের প্যাকেট দিয়ে যে প্রেম নিবেদন করেছিস তা বলেছিস ওকে..
নিজের ছেলের সামনে বন্ধুর পার্সোনাল অ্যাটাকে হাস্যরস মুখ একদম চুপসে গেল। মৃন্ময় বাবার মুখের পানে চেয়ে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে জানতে চাইল, “আর কী কী কান্ড করেছেন বাবা?
হেলাল সাহেব গল্পের ঝুড়ি খুলে বসলেন। তার উৎসাহ দেখে কে! বন্ধুর সকল রহস্য ফাঁস করে দিতে গিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলেন। বললেন,”তোমার বাবার তো অনেকগুলো প্রেমিকা ছিল। তো, সে কী করেছ জানো, ওই প্রেমিকা গুলোকে কবিতা লিখে দিত চিঠির মাধ্যমে। আর তার সাপ্লাইয়ার হতাম আমি..!
মৃন্ময় নিজেও হিহি করে সৌজন্যতার ভঙ্গিতে দাঁত কেলাল। বাবার দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,”তাই নাকি? আম্মু তো জানে ওসব, তাই না?
নিহাল মির্জা দু-পাশে মাথা নাড়ালেন না ভঙ্গিতে, আবারো হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন। ছেলের মুখ বন্ধ করাতে কিছু বলতে যাবেন তার পূর্বেই আরেকটা বোমা ফাটালেন হেলাল সাহেব। বললেন,”আরে তোমার মা জানবে কী করে? আপা তো একটু বোকাসোকা টাইপ ছিলেন, তাই তোমার বাবা বিবাহের
পরেও দুটো প্রেমিকা পেলে রেখেছিল।
উত্তেজনায় উঠে বন্ধুকে সব বলে দিতে দেখে একহাতে বন্ধুর সুঠাম দেহি হাত চেপে ধরে দ্রুত পদক্ষেপে টেনে নিয়ে গেলেন নিহাল মির্জা। বাবা চলে যেতেই মৃন্ময় ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। আশপাশে নজর বুলিয়ে নিজের হাসি সংযত করে নিবে তার পূর্বেই গলার আওয়াজ ভেসে আসলো নুসরাতের।
“আরে আপনি, বিনা দাওয়াতে চলে আসছেন?
মৃন্ময়ের মাথা ঝাঁঝিয়ে উঠল। একজন চলে যেতেই আরেকজনের আগমন। ভ্রু উচিয়ে কিছু বলতে নিবে, নুসরাত তার মুখে সূক্ষ্ম চোখ বুলিয়ে নিয়ে শুধাল,”আরে বাহ্ আপনি হাসতেও জানেন? আমি তো মনে করেছিলাম আপনি শক্ত চামড়ার জেদি একজন মানুষ, যে হাসতেও জানে না।
মৃন্ময় কপালে তীক্ষ্ণ পরিধির ভাঁজ ফেলে বলে ওঠল,
“আপনার থেকে সামান্য কম জেদি..!
নুসরাত স্বীকার করে নিল সে জেদি। বলে ওঠল,
“ আমি জেদি বলেই আমি নুসরাত নাছির, জেদি নাহলে অন্য কিছু হতাম।
মৃন্ময় বলে ওঠল,
“আপনাদের সবার মুখ কেঁচির মতো চলে..!
“শুকরিয়া। খাবার দেওয়া হয়েছে, যান খেয়ে ফেলুন।
মৃন্ময় কথা না বাড়িয়ে চলে যেতে নিল, নুসরাত ফির ডেকে উঠল। নাম ধরেই ডাকল,”এই যে মৃন্ময়, এদিকে…!
মৃন্ময় ঘাড় বাঁকিয়ে ফিরে চাইতেই নুসরাত হাসল। ডার্ক রেড কালার পরিহিত শার্টের দিকে ইশারা করে বলল,”আই হেট রেড, বাট ইউ্যের আউটফিট…
তর্জনী আঙুল আর বুড়ো আঙুল একত্রিত করে দেখাল গর্জিয়াস। মৃন্ময় চোখে মুখে অবাকতা ফুটিয়ে তুলে ঠাট্টা করে বলল,”মিসেস নুসরাত নাছির দেখছি প্রশংসা করতে জানেন!
নুসরাত নির্দ্বিধায় বলে ওঠল,
“আমি কখনো ভালোকে ভালো বলতে কার্পণ্য করিনা।
চলবে….