#প্রিয়_প্রণয়িনী২
#জান্নাত_নুসরাত
(৫৩) ১ম অংশ
গালে হাত দিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে নুসরাত। পা দুটো তুলে রাখা সামনের ডিসপ্লে এর উপর। ক্যাস কাউন্টারে বিল করছে তিন জন কালো কাপড় পরিহিত মেয়ে স্টাফ।
তিন তলা বিশিষ্ট সৈয়দ চয়েসে লোকজনের সংখ্যা কম নয়, ত্রিশ এর অধিক। সিলেটে মোট তিনটি শো-রুম তাদের। আজ নাছির সাহেব এর নিজস্ব শো-রুমে এসেছে নুসরাত। ভদ্রলোক তাকে সবকিছু দেখতে বলে কারখানায় যাচ্ছেন বলে হেলেদুলে চলে গেছেন। ঘন্টা খানেকের ভেতর কয়েকজন ভি-আই-পি কাস্টমার ও এসেছে। বসে বসে মাছি মারা ছাড়া নুসরাতের তেমন কোনো কাজ নেই। আসার পর থেকে ক্লথ কর্ণার, ব্রান্ড কর্ণার, আর এক্সোসারিজ কর্ণার থেকে কয়েক ধরণের জিনিস আত্মসাৎ করে ফেলেছে। বেশির ভাগ জিনিস সেলিনের নিয়েছে। সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না তাই। নিজের হাতের ব্যাগটা একটু চেক করে নিল নুসরাত। সেলিনের পারফিউমটা বের করে একটু আশপাশে এয়ার ফ্রেশনারের মতো স্প্রে করে জায়িনকে কল লাগাল।। কাউকে জ্বালানোর জন্য খুঁজে না পাওয়ায় জায়িনকেই এই মুহুর্তে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটা মনে হলো নুসরাতের নিকট। অডিও কল দেয়নি ভিডিও কল দিয়েছে। ঘড়ির কাটায় সময় দেখে নিল। ৫:০০ বাজছে। একবার চোখ ও পড়ল তারিখের দিকে। এক সেপ্টেম্বর এর ঘরে আটকে।
“আসসালামু আলাইকুম..!
নুসরাতের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল জায়িনের সালামে। গম্ভীর স্বরটা গমগম করে ভাসল আশপাশে। নুসরাত নিজেও সালামের উত্তর দিল,”ওয়ালাইকুমুস সালাম..!
কেমন আছেন?
জায়িন ক্যামেরা থেকে দূরে দাঁড়ানো। বলল,”আলহামদুল্লিলাহ ভালো..! আমাকে কল দেওয়ার কারণ কী?
নুসরাত বিগলিত হাসল। কপালে ম্যাসাজ করতে করতে বলল,”আমি কিছু একটা ভাবছিলাম।
কথা বলে থামল। জায়িন আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। নুসরাত বলতে শুরু করল,’”ভাবছিলাম, আপনার লাইফের ফাস্ট লাভ কে?
জায়িন হাসল। ফিসফিস করে উত্তর দিল,”আপনার বোন..!
নুসরাত দু-হাত দু-দিকে নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। উত্তরটা যেন গণাই ধরল না। ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে একই প্রশ্ন করল,”ভাবুন ইসরাত আপনার জীবনে নেই, ইসরাতকে ভুলে যান৷ জায়িন ভাই… এবার বলুন আপনার লাইফের ফাস্ট লাভ কে?
জায়িন দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে না করল। নুসরাতকে বলল,”তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর-ই আমি দিতে পারব না।
নুসরাত জোর দিল তার কথায়,
“প্লিজ জায়িন ভাই, প্লিজ, উত্তর দিন.! ইসরাতকে ভুলে যান, আর ফাস্ট লাভ কে বলুন!
জায়িন উত্তর দিতে সময় নিল। মোবাইলের দিকে ঝুঁকে এসে ভারী গলায় বলে ওঠল,”এই দেহে প্রাণ থাকতে আপনার বোনকে ভুলা আমার দ্বারা সম্ভব না। আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালোবাসা আমার স্ত্রী, আমার সহধর্মিণী, ইসরাত! ও না থাকলে আমি ও থাকব না এই পৃথিবীতে। বাছ, কথা শেষ..!
নুসরাত জায়িনের এসব সাহিত্যিক কথা শোনে ভীষণ বিরক্ত হলো। নাক ও কুঁচকাল। সামান্য হিংসের গন্ধ তার পাশে ছড়াতে লাগল। এমন কথা তো আজ পর্যন্ত তাকে কেউ বলেনি, তাহলে ইসরাতকে কেন বলবে এই ব্যাটা! তাই খেঁকিয়ে উঠে বলল,”কী মিয়া, তখন থেকে বোন, বোন লাগিয়ে আছেন কেন? বোন ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসেননি? চোখ তুলে তাকাননি? জন্মের পর থেকে বিদেশ থাকছেন, তারপরও ইসরাত কীভাবে আপনার ফাস্ট লাভ হয়? সত্যি করে বলুন জায়িন ভাই, আমাদের সাথে মজা নিচ্ছেন না তো? আপনার এত ভালো মানুষি আমি মেনে নিতে পারছি না?
জায়িন নুসরাতের কথার বিপরীতে শান্ত থাকল। উত্তর দিল,”আমি খারাপ হলে আপনার বাবা আমার সাথে ইসরাতের বিয়ে দিত?
নুসরাত মাথা দোলাল। তারপর আবারো খ্যাক খ্যাক করে ওঠে,’”তাহলে তো আপনি পিওর ইনটেক মাল?
জায়িন ভ্রু কুঁচকাল। অদ্ভুত মুখে কিছুক্ষণ নুসরাতের আগাগোড়া পরখ করে নিয়ে জানতে চাইল,”হোয়াট ইউ মিন বায় পিওর ইনটেক মাল? আমাকে কী মাল মনে হয় আপনার? কোন দিক থেকে?
নুসরাত মুখ বাঁকাল বিতৃষ্ণা নিয়ে। এই জায়িন ভাই যে পিওর মাল তা আগেই বুঝেছিল, তবুও একটু ঘটাতে বাজাচ্ছিল। জায়িন ফোন রাখার জন্য তাড়া দিয়ে বলে ওঠল,”তাহলে ফোন রাখি? ভালো থাকুন..!
নুসরাত থামাল জায়িনকে হাত দিয়ে। মুখ দিয়ে বিরক্তির সাথে বলল,“আরে দাঁড়ান মিয়া..কথা শেষ হয় নাই।
জায়িন গম্ভীর আদলে দেখল নুসরাতকে। ভ্রু উচাল। জানতে চাইল,”শেষ কথা কী?
জায়িনকে জ্বালানোর জন্য শেষ একটা কথা বলে ঝটপট ফোন রেখে দিবে ভাবল। তাই আগে অনুমতি নিতে বলল,”শুনুন জায়িন ভাই, অনেকদিন ধরে আপনাকে বলব বলব বলে বলা হয়নি।
জায়িন আগ্রহ নিয়ে শোনার জন্য বসে আছে যেন। নুসরাত সময় নিল কতক্ষণ কথা বলার জন্য। অতঃপর বলল,”পুরুষ মানুষকে চাপদাড়ি আর শ্যামলা রঙে বেশি মানায়।এমন সুন্দর মানায় না এটাই বলার জন্যই কল দিয়েছিলাম আপনাকে। হুদাই এতক্ষণ হাঁসের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং বলে গল্প করছিলাম সঠিক সময় আসার জন্য।
গা জ্বালিয়ে দেওয়া কথাশেষে ফোন রাখতে চাইল তাড়াহুড়ো করে নুসরাত, জায়িন রাখতে দিল না। বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে সে ও কথার বিপরীতে একই টোনে বলে ওঠল,”মেয়ে মানুষকে শ্যামলা হতে নেই, তার উপর আপনার জবান চলে কেঁচির মতো ক্যাচক্যাচ করে। কেউ তো বিয়ে করবে না কার গলায় ঝুলবেন?
নুসরাত কথাটা মাটিতে পড়তে দিল না। একদম ধড়াম করে তুলে জায়িনের গায়ে ছুঁড়ে মারল যেন,”যে বিয়ে করার সে তো করেই নিয়েছে বহু পূর্বে..! তাছাড়া কাউকে না পেলে আপনার হাদারাম, বলদ ভাইয়ের গলায় ফুলের মালা হয়ে ঝুলে পড়ব।
কথা শেষে গট করে ফোন কেটে দিল সে। অতঃপর হু হু করে হাসল।
এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আলমগীর সাহেবের সাথে বর্তমান বাজারের সেলস মার্কেট নিয়ে কথা বলছিল। গতবছরের তুলনায় এ বছর লাভ কতটুকু হয়েছে। গত মাসে কী সেলের তুলনায় এ-মাসের সেলস কতটুকু বেশি, এসব জানতে চাইল..! সবশেষে কোন কোন ব্রান্ডের স্টোক আনতে হবে শো-রুমে, কী কী চেঞ্জ করতে হবে তা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হলো। দু-জনের ভেতর আলাপ জমে উঠল কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। আলমগীর সাহেবের কাছ থেকে হাতের মাসিক রিপোর্ট এনে দেখছিল মনোযোগ সহকারে নুসরাত। সহযোগী ম্যানেজার আবির বারবার এসে তাদের কথা বলার মধ্যে হাত ঢোকানোর প্রচেষ্টা করছিল। নুসরাত বেশ কতক্ষণ খেয়াল করল তা। বিরক্ত হলো! কথার মধ্যে ঢোকে পড়ার চেষ্টা করায় মনোযোগ বিনষ্ট হচ্ছে তার৷ তবুও মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করল। সহকারী ম্যানেজার আলমগীর বলছিলেন,”একজন ভি-আই-পি কাস্টমার আজ ক্যালির ব্যাগ খোঁজ করছিল, আমাদের শো-রুমে ক্যালির ব্যাগের কোনো স্টোক পাওয়া যায়নি।
নুসরাত ঠোঁট টিপল। বলল,”ক্যালির ব্যাগ পাওয়া মুশকিল বটে আলমগীর সাহেব, আমার নিজের কাছেই মাত্র দুটো আছে। ভি-আই-পি কার্ড লাগে এর জন্য। অনেক কষ্টে আমি নিজেও কালেক্ট করেছি ওগুলা।
ভদ্রলোক নিজেও নুসরাতের কথা বোঝে মাথা দোলালেন। বললেন,”লুই ভিটন এর শিপমেন্ট আনাতে চাচ্ছিলেন না আপনারা, ওটা আসবে কবে ম্যাম?
নুসরাত নিজের ল্যাপটপ ব্যাগ বের করল। ডিসপ্লে এর উপর সেটা রেখে মেইল চেক করল। বলল,”শিপ-মেন্ট আসতে সময় লাগবে। ছয় মাসের ও অধিক..! তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে না।
নুসরাতের কথা কেটে দিতে চাইল আবির, নুসরাত কোনো সুযোগ দিল না। জিজ্ঞেস করল সে,”সৈয়দ চয়েসের নতুন কাপড় কবে বাজারে লঞ্চ হবে?
আবির সুযোগ পেয়ে ঝটপট বলে ওঠল,”এখনো তারিখ ঠিক হয়নি ম্যাম..!
আনোয়ার সাহেব ধমক দিলেন খাদে নামানো কন্ঠে। বললেন,”তুমি বেশি জানো আবির?
অতঃপর নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,”আগামী মাসের আঠারো তারিখে লঞ্চ হবে ম্যাম..!
নুসরাত একবার গা শিহরানো দৃষ্টিতে আবিরকে দেখে নিল উপর নিচ। আনোয়ার সাহেবকে বর্তমান বাজার মার্কেট সম্পর্কে ধারণা দিতে লাগলেন। তার কথার মধ্যে আবার আবির বাঁ-হাত ঢোকাল। নুসরাত শুধু চোখ গরম করে দেখল তাকে। একসময় নিজের ধৈর্য খুইয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠতে নিয়ে গিয়েও দাঁত চেপে মুখ আটকাল। মেকি হাসার চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত পিষল। আশপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে অশরীরীদের মতো হিসহিসিয়ে উঠে অতর্কিত গলায় গালি দিয়ে বসল,”মা*দা”রচু’দের বাচ্চা, আরেকবার যদি আমার কথার ভেতর তোর ল্যাড়ের বাঁ-হাত ঢোকানোর চেষ্টা করিস তাহলে পশ্চাৎদেশে লাত্থি দিয়ে, সৈয়দ চয়েসের বাহিরে ফেলে আসব। মোটেও হুমকি ধামকি দিচ্ছি না তোমাকে আমি, লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। নেক্সট টাইম কথা বলব না, উপড়ে ফেলব। গট ইট?
_____
নাছির মঞ্জিলের ড্রয়িং রুমে ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ঝুলিয়ে বসে আছে নাহিয়ান।৷ সাদা পাঞ্জাবী বলিষ্ট দেহের ভাঁজে ভাঁজে সেটে আছে। নিয়মিত যে শারীরিক ব্যায়াম করা হয়, এই দেহ কাঠামো পেতে ভীষণ কসরত করতে হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রুষ্ট পোষ্ট দেহের নাহিয়ান ড্রয়িং রুমের সাদার মধ্যে গোল্ডেন কারুকার্য খচিত সোফায় রাজকীয় ভঙ্গিমায় বসে আছে। হাতে কফির কাপ। মেপে মেপে কাপে চুমুক বসাচ্ছে। একটু ও এদিক সেদিক হচ্ছে না তার দৃষ্টি। ভীষণ মনোযোগ সহকারে কাপের কফিটুকু পান করছে। নিজের দিকে নাছির সাহেবের জহুরে নজর অনুভব করতে পেরে চোখ তোলে তাকাল সম্মুখে। তার দিকে সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসল ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে। ভদ্র ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,”কেমন আছেন আঙ্কেল? শরীর ভালো আছে আপনার?
নাহিয়ানের সেই ক্ষীণ আওয়াজ ড্রয়িং রুমে ঝংকার তুলল যেন। থেকে, থেকে, কাঁপল গমগম আওয়াজের ভারে। নাছির সাহেব খেয়াল করলেন ছেলেটার কথায় অতিরিক্ত চোরামি, জোচ্চুরি নেই। সাধারণ ভাবেই কথা বলছে। চোখে চোখ রাখছে মেপে মেপে। নিজের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমা প্রকাশ করতে চাইছে না, তবুও না চাইতেও ফুটে উঠছে চোখের আকার আকৃতির পরিবর্তনে। নাছির সাহেব দেখলেন ছেলেটাকে সময় নিয়ে। ভদ্রতা খাতিরে প্রশ্নের উত্তর দিলেন,”আলহামদুলিল্লাহ ভালো..! আপনি কেমন আছেন?
নাহিয়ানের চোখের পাতা কিছুটা কাঁপল কী? হয়তো কাঁপল! সময় নিল উত্তর দিতে। নাছির সাহেব তাড়া দিলেন না উত্তর দেওয়ার জন্য। নাহিয়ানের এক একটা শ্বাস প্রশ্বাসের গতি যেন তিনি দূরে বসেই গুণে ফেলছেন। সে নিজেকে সামলে উত্তর দিল ভীষণ শান্ত স্বরে,”আলহামদুলিল্লাহ..!
সরাসরি কথা পারলেন নাছির সাহেব,
“কী কারণে এই গরীবের ঘরে আপনার পায়ের ধূলো পড়েছে তা কী আমি জানতে পারি?
নাহিয়ান আশপাশ দেখল। খুঁজল কাউকে হয়তো। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার তাড়া দেখা গেল না। নাছির সাহেব তার তাঁক ঝাঁক দেখে বললেন,”আপনি যাকে খুঁজছেন, সে আজ বাড়িতে নেই।
তড়াক করে না চাইতে প্রশ্ন করে বসল নাহিয়ান,”কেন?
সহজ কন্ঠে ভদ্রলোক স্বীকারক্তি দিলেন,”আপনি আসছেন শুনে রেখে এসেছি বাহিরে। তা বললেন না আমার বাড়িতে আপনার মতো বড়লোকের পা পড়ল কীভাবে?
নাহিয়ান হাসল ঠোঁট এলিয়ে। বলল,”আপনি জানেন আঙ্কেল, তা কেন বা কোন কারণে?
নাছির সাহেব দু-কাঁধ ঝাঁকালেন। বললেন,”না, আমি জানি না। আপনি বলুন কেন এসেছেন? না বললে জানব কীভাবে?
ততক্ষণে কিচেন থেকে এসে নাজমিন বেগম মাথায় আঁচল টেনে বসেছেন নাহিয়ানের মুখোমুখি। তীর্যক চোখে দেখলেন ছেলেটাকে। মুখের ভাব ভঙ্গি মেকি কঠোরতায় আবৃষ্ট। এবার নাহিয়ানের শান্ত ভঙ্গিমায় একটু ফাঁপার দেখা মিলল। সে নিজের জায়গায় অটল থাকতে চাইল, পাড়ল না। চেহারার ভাব গতি বদলাল। নাজমিন বেগমকে এখানে মোটেও আশা করেনি সে। ভদ্রমহিলা স্বামীর পাশে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন। গায়ে শাড়ি! পায়ে জারার স্যন্ডেল..!
“দেখা শেষ, নাহিয়ান আপনার?
নাজমিন বেগমের কথায় হতচকিত হয়ে আবারো দেখল উনাকে সে। সামাজিকতা রক্ষার্থে ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝোলালেন নাজমিন৷ বেগম। ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নেয় সে। মুখের ঘাম হাতের তালু দিয়ে মুছে নিয়ে বলে ওঠল,”জ্বিই..
কথা আটকে গেল মাঝখানে। এতক্ষণ ঝরঝরে কথা বললেও এখন তার কথার মধ্যে তীব্র সংকোচের আবহ পেলেন নাজমিন বেগম। তাই সামনের সেন্টার টেবিল থেকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললেন,”পানি নিন… আব্বা!
নাহিয়ানের পানি নেওয়ার জন্য বাড়ানো হাত থমকাল। বজ্রপাতের মতো তার হৃদয় চমকাল! থমকাল দু-জোড়া নয়ন। তখনো গ্লাস বাড়িয়ে রেখেছেন নাজমিন বেগম৷ ইশারায় নিতে বলছেন। নাহিয়ান পানিটুকু নিয়ে এক চুমুকে খেতে নিয়ে বড়সড় বিষম খেল। তা দেখে নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে পিঠে চাপড় বসালেন ভদ্রমহিলা। স্বামীর চোখ রাঙানি অবজ্ঞা করে বললেন,”তাড়াহুড়ো করছেন কেন আপনি? আস্তে ধীরে পানি খান..!
স্ত্রীর এমন অন্যের ছেলের জন্য দরদ উতলে পড়তে দেখে বিরক্ত হলে নাছির সাহেব। কঠোর কন্ঠে আদেশ দিলেন,“নাজমিন ওর থেকে দূরে সরে আসো।
স্বামীর কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। একবার নাহিয়ানের চেহারা দেখলেন। অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে গিয়ে মুখ এইটুকুনি হয়ে গেছে। নাজমিন বেগম ভেবে পেলেন না, তাকে দেখে এত অস্থির হওয়ার কারণ কী? কারণের রহস্য উদ্মঘাটনে নামলে না, পরে ভাববেন ভেবে নাছির সাহেবের আদেশ মান্য করে আবার তার পাশে গিয়ে বসলেন। নাহিয়ান পানিতে চুমুক বসাতেই নাছির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,”খ্রিষ্টান থেকে আপনারা মুসলিম হলেন কবে নাগাদ?
আরেকটা অতর্কিত প্রশ্ন। নাহিয়ান নিজের পানিটুকু খেতে পারল না আরাম করে। এই পরিবারের মানুষকে যতটা সহজ ভেবেছিল সে, ততটা না, তাই কুহ কুহ করে কাশতে কাশতে বলল,”জ্বি কী বললেন বুঝিনি..!
কথাটা কাটানোর জন্য না বোঝার ভান করল। নাছির সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন,”খ্রিষ্টান ছিলেন না তোমার বাবা, দাদা, কবে নাগাদ মুসলিম হলেন জিজ্ঞেস করলাম?
নাহিয়ান ঢোক গিলল। এত ভেতরের খবর জানলেন কী করে ভদ্রলোক, ভেবে পেল না সে। অতঃপর সময় নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিল,”বছর খানেক পূর্বে।
নাছির সাহেব প্রশ্নের ভান ছুঁড়ে দিলেন,
“যখন নুসরাতের সাথে আপনার প্রথম দেখা হয়েছিল?
নাহিয়ান মাথা দোলাল। অবাক কন্ঠে জানতে চাইল,
“ আপনি কীভাবে সেটা জানলেন? নুসরাত…
নাছির সাহেব দাড়ি টেনে দিলেন নাহিয়ানের কথায়। বললেন,”আমি আমার মেয়ের ব্যাপারে আপনার থেকে অধিক জানি, নাহিয়ান। আমি ওর বাবা, আপনি নন।
বিমর্ষ চেহারায় নাহিয়ান বসে রইল। নাছির সাহেব আবার বললেন,”আমরা মেইন পয়েন্ট রেখে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি, মেইন পয়েন্টে আসি। কেন এসেছেন এখানে? কারণটা স্পষ্ট করে বললে সুবিধা হয়।
নাহিয়ান শান্ত ভঙ্গিমায় বলে ওঠল,
“আমি বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
“পরিবারের সাথে কেউ নেই?
“জ্বি না..!
“পরিবার ছাড়া আসা পাত্রের কাছে আমি মেয়ে দিব কী করে?
নাহিয়ান ভারী গলায় বলে ওঠল,”যেভাবে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
সামান্য ভড়কালেন নাছির সাহেব। তবুও তা চেহারায় দৃশ্যমান হলো না। আবারো শুধালেন,”আপনার পরিবারের কেউ না থাকলে আমি কার ভরসায় আমার মেয়ে আপনাকে দিব?
নাহিয়ানের ভরাট স্বর বারি খেল চারিপাশে,”আমার ভরসায়। যেহেতু, বিয়েটা আমি করব আপনার মেয়েকে, সেহেতু আমার ভরসায় বিয়ে দিবেন, আমার পরিবারের নয়।
নাছির সাহেব মাথা দোলালেন। কন্ঠ কঠোর করলেন, নমনীয়তার ছিটে ফোটা নেই,”আপনি যদি কখনো তাকে ছেড়ে দেন?
“তাহলে আপনি আমার এই জবান কেটে নিবেন, যে জবান দিয়ে আমি আপনার কাছে আপনার মেয়ে চাইতে এসেছি।
নাছির সাহেব হাসলেন সামান্য। সহসা ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইলেন,”আমি মত দিয়ে দিলেও, যাকে বিয়ে করতে আসছেন, সে কী মত দিবে?
নাহিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল। বলল,”তার দায়িত্ব আপনি আমার উপর ছেড়ে দেন, আমি উনাকে বুঝিয়ে ফেলব।
“বোঝাতে পারলেই ভালো।
নাছির সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। নিশ্চুপতা চেপে ধরল ড্রয়িং রুমে। নাজমিন বেগম এবার প্রশ্ন ছুঁড়লেন নাহিয়ানের উদ্দেশ্যে,”আমাদের ব্যাপারে সব জেনে এসেছেন আপনি?
নাহিয়ান ছোট করে উত্তর দিল,“জ্বি!
নাজমিন বেগম আবারো একই প্রশ্ন করলেন,”সব তো? একদম অতীত থেকে বর্তমান?
নাহিয়ান সরাসরি বলে ওঠল,”মিস নুসরাতের ছোট বেলার বিয়েটা নিয়ে কী আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?
“হ্যাঁ..!
অতঃপর ঠোঁট টিপে আশ্চর্যাজনিত কন্ঠে বলে ওঠলেন,”তাহলে আপনি জানেন?
নাহিয়ান মাথা দোলাল। বলল,”ভালো করেই খোঁজ নেওয়ায় বের হয়েছিল। অতোটা ভেতরের খবর কেউ জানে না।
নাছির সাহেব ভ্রু-জোড়ার মাঝখানে ভাঁজ ফেলে তাকে প্রশ্ন করলেন,“তাহলে আপনি জানলেন কেমন করে?
নাহিয়ান মুখ ফসকে বলে ফেলল,
“ যে ইমাম বিয়ে পড়িয়েছিল তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে কথা আদায় করেছি।
বলা শেষে বুঝল কী ভুলটাই না করেছে। নাছির সাহেব তাকে কঠিন দৃষ্টিতে দেখছেন। আকস্মিক ধমকে উঠলেন,”তাহলে আপনি-ই সেদিন অপহরণ করেছিলেন মসজিদের ইমামকে! অসভ্য..!
ভদ্রলোকের বকা দেওয়া যেন নাহিয়ান গোণায় ধরল না, মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিল।নাজমিন বেগম স্বামীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শুধালেন,”কপালে কী হয়েছে তোমার বাবা?
নাহিয়ান হাত দিয়ে স্পর্শ করল ব্যান্ডেজ করা জায়গাটা। তখনই ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ তুলে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল কেউ। মাথা ঘুরিয়ে নাহিয়ান তাকাল। অতঃপর হাসল। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,”পারফেক্ট টাইমিং আপনার, মিস্টার আরশ!
নাছির সাহেবের পাশ ঘেঁষে বসল আরশ। ভ্রু উচিয়ে তাকিয়ে আছে এদিকেই। নাহিয়ান তা খেয়াল করে নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলে ওঠল,”একটা পাগলা কুত্তা তেড়ে এসেছিল।
বলে থামল। নাজমিন বেগম চোখ গোল গোল করে জানতে চাইলেন,”তারপর কী হলো?
নাহিয়ান হেসে আরশের পানে আড়চোখে তাকাল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল,”পাগল কুত্তার কামড়ের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড় দিলাম, পিছু এমন ভাবে নিল, হঠাৎ উষ্টা খেয়ে রাস্তায় পড়লাম। ততক্ষণে মাথা ফেটে গেছে। উঠে বসে নিজেকে ঠিক করার আগেই খেয়াল করলাম, উষ্টা খেয়ে এমনি পড়িনি, পাগল কুত্তার আরেকটা পাগল বন্ধু আমায় ল্যাং মেরে ফেলেছে।
নাজমিন বেগমের যেন গল্পটায় আরো আগ্রহ বাড়ল। উৎসাহী কন্ঠে বললেন,”তারপর কী হলো?
নাহিয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলল। বলল,”তারপর..!
কথা শেষ না করে শব্দ করে আবারো শ্বাস ফেলল যেন ভীষণ দুঃখিত সে,”নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও কালো রঙের পাগল কুত্তাটা লাল লাল চোখ মুখ করে এসে আমায় কামড়ে দিল, সাথে তো তার বন্ধুটা আছেই।
ভীষণ শোকাহত হলেন নাজমিন বেগম। জিজ্ঞেস করলেন,”ইনজেকশন পোশ করেছ? নাহলে তো ব্রেইনে কুকুরের বাচ্চা জন্ম নিয়ে নিবে।
“জ্বি, গণে গণে চৌদ্দটা মারতে হয়েছে। পাগল কুত্তা তো বুঝতেই পারছেন।
নাজমিন বেগম চিন্তিত স্বরে নাহিয়ানের কাছে জানতে চাইলেন,”এই মৌসুমে পাগল কুত্তা আসলো কীভাবে?
নাহিয়ান ভীষণ অবাক ভঙ্গিমায় বলে ওঠল,
“বিদেশ থেকে! ওমা, আপনি জানেন না আন্টি?
অবাকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল সে। ঠোঁটে হাত রেখে রসিয়ে রসিয়ে কুকুরের আলাপ জুড়ল,”মাস খানেক আগেই বিলেত থেকে বিলেতি কুত্তাগুলো দেশে এসেছে। সময় মতো ইনজেকশন পোশ না করায়, রাস্তায় যাকে পাচ্ছে তাকেই কামড়ে দিচ্ছে। সামনেই আবার ইলেকশন, আমার মতো একজন কর্মী ব্যস্ত মানুষকে পাগলা কুত্তাটা কামড়ে না দিলে এতদিনে জনগণের উন্নয়নে অনেক কাজ করে ফেলতাম। আসলে বুঝতেই তো পারছেন, কুত্তা তো আর মানুষের ভাষা, কাজ, আর মানুষিকতা বুঝবে না।
নাজমিন বেগম দেখলেন না তার পাশে বসে থাকা আরশ রাগের প্রকোপে দপদপ করে জ্বলে উঠা। হাত দিয়ে সোফার বালিশ চেপে ধরে রাখায় তা প্রায় মুষড়ে যাওয়া। তিনি যে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাগল কুকুরের বর্ণনা শুনছেন, সেই কুকুরটা আসলে আরশ। নাহিয়ান আরো বলল,”পারশিয়ান কুত্তা যেগুলা হয় আন্টি সেগুলা কিছুটা মানুষের আকৃতির, দুটো পা, দুটো হাত, একটা খাড়া নাক, দুটো চোখ, দুটো কান, আর মুখ ও থাকে, আশ্চর্য জনক বিষয় ঠোঁটও থাকে। আপনি দেখেছেন কখনো এমন কুত্তা?
নাজমিন বেগম দেখেননি বলে মাথা নাড়ালেন দু-পাশে। নাছির সাহেব কুকুরের গল্পে আগ্রহ না পেয়ে চলে গেলেন রুমে। নাহিয়ান কুটিল হেসে তাকাল আরশের দিকে। বলল,”একটু বাড়ির বাহিরে পা বাড়ালেই দেখতে পারবেন, উৎ পেতে বসে থাকে সবসময়, আপনাদের বাসার সামনে। কিছুটা নারী লোভী কুত্তাটা, মেয়েদের দেখলে মাথার ঠিক থাকে না।
আরশ দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে শুধাল,”আপনার মতো, তাই না মিস্টার আবরার?
নাহিয়ান ভুলে মাথা দোলাল উপর নিচ। বলে বসল,
“হু.!
অতঃপর বুঝল ভুল বলে ফেলেছে আবারো। কুটিল হাসির তোড়ে বাঁকানো ঠোঁট আর তীর্যক নয়ন দুটো আরশের দিকে তুলে ধরতেই দুটো ঈগলের মতো দৃষ্টি এসে বিঁধল তার পানে। তীরের ফলা ছু্ড়ে দেওয়ার মতো করে তাকিয়ে আছে সামনের লোকটা। পারলে এক্ষুণি হাতের দলা পাঁকানো বালিশের মতো তাকে ছিঁড়ে ফেলত। নাহিয়ান শ্লেষ মিশ্রিত হাসল। কপালে এসে একগাছি চুল জায়গা করে নিয়েছে বহুক্ষণ পূর্বে৷ তা হাত দিয়ে সরিয়ে নিতে নিতে আলগোছে বুড়ো আঙুল দেখাল। বোঝাল,”কোনো কাচকলা করতে পারবি না তুই আমার।
আরশ জিভ দিয়ে গাল ঠেলে হাসল। ভীষণ মনকাড়া দৃশ্য যেন দেখছে। মিডিল ফিঙ্গার বের করে চুলের ভাঁজে হাত চালাল। তীক্ষ্ণ হাসির তোড়ে বেঁকে গেল ঠোঁট। তীরের ফলার ন্যায় ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করল যেন,”তুই এখানে কী করছিস?
নাহিয়ান গায়ে মাখল না এমন ভঙ্গিতে গা ঝাড়ল। ওই রকম করে ইশারায় বুঝিয়ে দিল,” তোর বউ খপ করে আমার হাতের মুঠোয় নিতে এসেছি। পাখি এবার খাঁচা ছেড়ে উড়াল দিবে।
তাচ্ছিল্যের সহিত আরশ যেন বলল,“তুই নিয়ে উড়াল দিবি?
নাহিয়ান ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমায় মাথা দোলাল। বলল,’”হ্যাঁ..!
আরশ শ্লেষ মিশ্রিত স্বর নাহিয়ানের কানে অভাবেই যেন ভাসল। কটাক্ষের সাথে যেন গম্ভীরমুখোটা জিজ্ঞেস করছে ,”চিনিস কত দিন তুই ওকে?
নাহিয়ান হাত মাথায় হাত চালিয়ে আঙুলের ইশারায় দেখাল দুই। ঠোঁট নাড়িয়ে বলল ও,”দুই..!
“আর আমি, আমি ওকে তেরো বছর ধরে চিনি। আমাদের দু-জনের চেনা জানা কতটুকু পুরোনো তুই জানিস..!
“তাতে আমার কী যায় আসে? তুই চিনলেই বা কী? এবার তোর পাখি আমার খাঁচায় আটকা পড়বে।
নাজমিন বেগম উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,”দু-জন কথা বলো, আমি যাই, রাতের রান্না করতে হবে।
নাজমিন বেগম যেতেই খাদে নামানো কন্ঠস্বরে আরশ খেঁকিয়ে উঠল,”তোর চোখ তুলে ফেলব আমি নাহিয়ান, কলিজা ছিঁড়ে ফেলব তোর, কোনদিকে চোখ দিচ্ছিস তুই, বুঝেশুনে দিবি।
নাহিয়ান হাসল হো হো করে। আরশের কথা উড়িয়ে দিল হাওয়ায়। বলল,”আমি তো তোর জান নিয়ে ফেলব, আরশ। তুই কিছুই করতে পারবি না, ইউ কান্ট ডু এনিথিং! বসে বসে শুধু দেখবি। আমার চোখ কী, চুল ও একটা বাঁকাতে পারবি না।
রাগে চ্যাঁচিয়ে উঠে চোখের আকারে শাসাল যেন আরশ,“হাউ ডিড ইউ ফাকিং থিংক আই উড জাস্ট সিট এন্ড ওয়াচ?
নাহিয়ান চোখের পাতা ঝাপ্টাল। প্রফুল্লতা নিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল,”তাহলে তুই ও কিছু করবি? বসে বসে দেখবি না? নাইস ভেরি নাইস!
থামল সেকেন্ড কয়েক। আবার বলল,”কিন্তু তুই কিছু করার আগেই আমি ওকে বিয়ে করে নিব। খালাছ.. হয়ে যাবে সবকিছু।
আরশ ধৈর্য হারাল এতক্ষণের। ছুঁড়ে ফেলল হাতের কুশনটা। তেড়ে এসে চেপে ধরল নাহিয়ানের পাঞ্জাবীর কলারটা। দিক বিদিক ভুলে মুষ্টি করে বসাল দু-ঘা ঘুষি। নিচের ঠোঁট একপেশে করে শ্বাস ফেলল। দাঁতের কপাটি চেপে, হিসহিসাল সাপের মতো। নাহিয়ান হাসল। আরশের রাগ দেখে ভীষণ আনন্দ লাগল তার। কটাক্ষ করে বলে ওঠল,”এত প্রেম? বাহ্…
কথা শেষ করার আগেই নাহিয়ানের গলদেশ চেপে ধরল আরশ। নাক দিয়ে মিটিমিটি রক্ত উঁকি দিচ্ছে তার। এমনকি নাহিয়ানের ও!
নাহিয়ান আরশকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে না নিজের থেকে। ক্রুর হেসে বলে ওঠে,”তোকে একটাও মারলাম না আর তুই দেখি এখনই প্যানিক অ্যাটাক করে বসেছিস, চ্যাহ..!
ঠোঁট বাঁকাল সে। আরশের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বিচ্ছিরি, বিশ্রী হেসে বলল,” নুসরাতকে কখনো পাবি না তুই! বুঝেছিস আরশ, কখনো পাবি না।
আরশের দৃষ্টি ছুরির ফলার ন্যায় শীতল হলো। নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করে হেসে ওঠল আকস্মিক। নাহিয়ান ভ্রু কুঁচকাল। পাগলের মতো করে হাসছে কেন তা দেখল হতবাক নয়নে। আরশ গলা ছেড়ে দিয়েছে নাহিয়ানের। মেঝেতে হাসতে হাসতে হাঁটু দিয়ে বসে পড়ল। নিচের দিকে ঝুঁকে গিয়ে হাসল নিষ্পাপওতার সহিত। মাথা ঝুঁকিয়ে নিল নিচের দিকে, হলরুম কাঁপল আরশের বিকট হাসির প্রতিধ্বনিতে।
নাহিয়ান চেয়ে চেয়ে ভাবল, বউ বিয়ে করার শোকে পাগল হয়ে গেল নাকি? তার চিন্তাভাবনার ভেতরেই গলদেশ চেপে ধরল আবার দ্বিগুণ চাপে, পূর্ব কোনো সতর্ককীরণ ছাড়া। হাসি বিলীন হয়েছে ততক্ষণে মুখ, ঠোঁট থেকে। গম্ভীর মুখখানা রাখল একদম নাহিয়ানের বরাবর। রাশভারি গলায়, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে ওঠল,”এটা তো আমি ও জানি, নুসরাতকে আমি কখনো পাব না, কিন্তু ও যদি আমার না হয়, আল্লাহর কসম, আমি ওকে তোর ও হতে দিব না, এমনকি কারোর হতে দিব না। নো ম্যাটার হোয়াট..! প্রয়োজনে আমি তোকে খুন করতেও পিছ পা হবো না।
চলবে…
#প্রিয়_প্রণয়িনী২
#জান্নাত_নুসরাত
(৫৩) ২য় অংশ
সেপ্টেম্বর দুই -দু হাজার পঁচিশ! প্রতুষের নরম আলো হাতছানি দিয়ে এসে নাছির মঞ্জিলের বারান্দায় পড়ছে৷ রোদের পরিমাণটা আজ মিহি। ধারণা করা যাচ্ছে সময় বাড়ার সাথে তীব্রতা আরো বাড়বে। গাছের ঢালে ঢালে পাখিরা ডাকাডাকি করছে।। সবুজ দূর্বা ঘাসগুলোতে কুয়াশার ছিটা পড়ে ভিজে আছে মোটামুটি। সতেজ ঘাসগুলো পায়ে মাড়িয়ে ছুটে চলেছে উড়ন্ত এক কিশোরী। তার হাসির সুর চারিদিকে ঝংকার তুলছে। প্রতুষের আলো ধীরে ধীরে আরো বাড়তে লাগল৷ নিঝুম রাস্তায় কয়েক মিনিট হেঁটে বেড়াল নুসরাত। আশপাশে মানুষ কী একটা কুকুরের ও দেখা নেই। তার হাঁটার সঙ্গী হয়েছে বন্দুকজি। ভারী পেট নিয়ে নড়তে পারছে না। আশা করা যাচ্ছে কয়েকদিনের ভেতর বাচ্চা জন্ম দিবে। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ায় উঠেই নামাজ পড়েছে সে। ছোটবেলা থেকেই তাদের শিখানো হয়েছে যাই ইচ্ছে করো সারাদিন, কিন্তু ওয়াক্তের নামাজ ওয়াক্তে যাতে শেষ করতে পারো সেদিকে ধ্যান রাখবে। নুসরাত মেনে চলে সেসব! রেগে গেলে যত গালিগালাজ করুক, নামাজ পড়া ছাড় দেয় না সে। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায়, তবুও চেষ্টা করে আল্লাহর ইবাদতগুলো আদায় করার। সৈয়দ বাড়ির সবাই কম বেশি নামাজ পড়ে। জন্মের পর থেকেই দাদা, বাবা, চাচাকে দেখেছে সবাই-ই নামাজ পড়ে! সেই থেকে এই শিক্ষা তাদের নেওয়া। সে বিশ্বাস করে নামাজ কবুল করার মালিক আল্লাহ, তার নামাজ ও কবুল করবেন আল্লাহ!
নুসরাতের ধারণাটুকু সত্যি! আল্লাহ এই নিয়ে অনেক আশা, ইচ্ছে তার পূরণ করেছেন, হোক সেগুলা দেরীতে। মানুষ যখন হাই হুতাশ করে মরে যায়, দোয়া কবুল হচ্ছে না বলে, আল্লাহর উপর থেকে বিশ্বাস উঠিয়ে নেয়, সেসব দেখলে ভীষণ হাসি পায় তার। একটু ধৈর্য রাখলেই আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করবে কিন্তু নির্বোধ মানবজাতী তা বুঝে না। নুসরাত অস্বীকার করতে পারবে না, এমনকি অস্বীকার করবে না কখনো, আজ পর্যন্ত সে যে কয়টা দোয়া করেছে, আল্লাহ কবুল করেছেন তার দোয়া।
কথাটা ভাবতে নিয়েই খুশিতে গা সামান্য দুলে উঠল তার। হাঁটাহাঁটি করল সময় নিয়ে। আজকের দিনটা আশা করল খুব ভালো কাটবে যেহেতু সকালটা ভালোই কেটেছে! সেই আশা মনে চেপে হেলেদুলে বাড়িতে প্রবেশ করল।
আহান আজ এখানেই আছে। বসে আছে লনে। নুসরাতকে দেখে ঠোঁট উল্টাল। মিনমিনিয়ে বলল,”আমি ফিজিক্স এ ফেইল আপুউউউ..!
নুসরাত বাহ্ বা দিল,”বাহ্ দারুণ ব্যাপার তো!
“তুমি খুশি হচ্ছো?
নুসরাত উৎসাহী কন্ঠে বলে ওঠল“ অবশ্যই খুশি হবো না কেন? পাশ তো সবাই করতে পারে, কিন্তু ফেইল কতজন করতে পারে? তুই সেটা করতে পেরেছিস, সেটা দেখেই তো গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে।
আহান ভীষণ আপ্লুত হলো। ঠোঁট উল্টে ডাকল,”আপুউউ..!
নুসরাত পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বসল চেয়ারের উপর। পা দুটো তুলে রাখা সামনের টেবিলে। আরো উৎসাহ দিয়ে বলল,”শোন, নিউটন পরীক্ষায় ফেইল করে বিজ্ঞানী হয়েছে, এমনকি আইনস্টাইন, রবার্ট, রসায়নের জনক কেডা যেন ওইটা ও ফেল করে করে এ পর্যন্ত এসেছে। আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও নিয়মিত ফেল করতেন। আর বিশ্ব কবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কথা বলিস না, উনি তিনবার ম্যাট্রিক ফেল করে বিশ্ব কবি হয়ে গেছেন। এরপর উদাহরণ স্বরুপ তুই দেখ, কাউয়া কাদের, ব্যাটা তো টাল্টু, তবুও মন্ত্রী ছিল একসময়। খালেদা জিয়া ম্যাট্রিক ফেইল, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একসময়। শেষ উদাহরণ হিসেবে আমাকে দেখ, আমি এইচ এস সি ফেল, ভবিষ্যতে সৈয়দ চয়েস আমার হুকুমে চলবে। মানু্ষের জীবন সামান্য পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারে না। এই আমি সামান্য পড়ে একসময় কোথায় থাকব তুই বুঝতে পারছিস, এমনকি তুই নিজেও থাকতে পারিস আমার থেকে উপরের পদে। প্রয়োজন শুধু স্কিল ডেভেলপমেন্ট। তাই বলে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে হবে না, পড়াশোনার প্রয়োজন! একজন জ্ঞানী, আদর্শ মানুষ হাওয়ার জন্য পড়াশোনার ভীষণ প্রয়োজন।
সকালে রোদের দেখা পেলে সময় কাটার সাথে সাথে তা মিলিয়ে গেল কোথাও। মিইয়ে গেল প্রকৃতি৷ বাতাস হলো! ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। অতঃপর সন্ধ্যার দিকে আকাশে রক্তলাল আভার দেখা মিলল। নুসরাত দেখল প্রকৃতির এমন অদলবদল। বুঝে উঠতে পারল না এমন অদ্ভুত রঙে রঙ্গিন হচ্ছে কেন ধরণী!
নুসরাতের প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা আর হলো না। নাছির সাহেবের আদেশে না চাইতেও নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে যেতে হলো৷ তাদের দেখা করানোর জন্য লোকেশন ঠিক করা হলো, ক্লাউড আই রেস্টুরেন্ট।
নাছির সাহেব পৌঁছে দেওয়ার কথা বললে নুসরাত বলল,”আমি নিজে যেতে পারব আব্বা, আপনার যাওয়া লাগবে না।
নুসরাত নিজের কথা মতোই বের হলো সন্ধ্যা ছয়টা আটচল্লিশ মিনিট নাগাদ। কালো রঙের ট্যাংক টপ, তার উপর সাদা রঙের শার্ট, যার সবগুলো বোতাম লাগানো, আর ঢিলেঢালা ব্যগি প্যান্ট। যা ঠাখনুর নিচ স্পর্শ করে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। কানে সবসময়কার পরিহিত একটা পার্লের রিং। নাকে নোজ রিং, যা জ্বল জ্বল করছে স্বাভাবিকভাবে। ঠোঁটে চকলেট কালার লিপ অয়েল দেওয়া। পায়ে একজোড়া লুই ভিটন এর হিল বুট। বাঁ -হাতের অনামিকা আঙুলে আজমল আলীর দেওয়া একটা সোনার রিং, যার উল্টোদিকে খুবই সূক্ষ্মভাবে খোদাই করে লিখা আরশ, উপরে ডায়মন্ড পাথরের কারুকার্য। হাতে ক্যালির একটা ব্যাগ।
হাতের আঙুলে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো সে। হাসি মুখে গলা ছেড়ে দুয়েকটা গানের দু-লাইন গাইল। অতঃপর গাড়িতে উঠে বসে টান মেরে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাল।
নাহিয়ান প্রথম থেকেই অপেক্ষায় বসে ছিল। নুসরাতকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল। চেয়ার টেনে দিল তার বসার জন্য। সৌজন্যতার খাতিরে নুসরাত হাসল সামান্য নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে। হাতের ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে বসল নাহিয়ানের মুখোমুখি। রেস্টুরেন্টে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস হওয়ায় বাহিরে রাস্তা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। নুসরাত বসতেই পানি এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইল,”কেমন আছেন আপনি, নুসরাত?
নুসরাত এক ঢোক পানি খেল। রেখে দিল গ্লাসটা টেবিলে। পায়ের উপর পা তুলে বসতে বসতে বলল,”যেমন দেখছেন। তা আপনি কেমন আছেন নাহিয়ান আবরার পশ্চিম?
“এতক্ষণ মোটামুটি ভালো ছিলাম, এখন আপনাকে দেখে আরো বেশি ভালো হয়ে গেছি।
নুসরাত হাসল। বলল,”মেইন পয়েন্টে আসি পূর্ব, এত ফর্মালিটি করার প্রয়োজন নেই!
কথা শেষে দু-হাত সামনে এনে বসল সে। নিমেষেই হাসি মিটিয়ে নিয়ে, ফর্মাল হয়ে গেল সে। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,”আপনি আমার বাবাকে বিয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন?
“হ্যাঁ..!
নুসরাত সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,” আপনাকে না করা সত্ত্বেও কেন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন?
নাহিয়ান নিজস্ব ভঙ্গিমায় বলে ওঠল,”আপনাকে আমার পছন্দ, তাই!
নুসরাত চোখ মুখ কঠিন করে তড়িৎ প্রশ্ন শুধাল,”সত্ত্যিই?
নাহিয়ান ভড়কাল কী একটু? হ্যাঁ ভড়কাল। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে সহজ হওয়ার চেষ্টা করল, হলো না। নুসরাত টের পেল তা। হাত বাড়িয়ে পানি ঠেলে দিল নাহিয়ানের দিকে। বলে ওঠল,’”আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, আমি জানি পূর্ব!
নাহিয়ানের কানে কি সে কথা গেল! না গেল না! সে শ্যামলা, খাড়া নাক, ওভাল মুখের গম্ভীর চেহারার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল হা করে। যখন যখন পূর্ব বলে ডাকে, নাহিয়ানের হৃদয়ে ঝংকার উঠে। নিষ্পৃহ হয়ে যায় তার দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গ..!
“এইই পূর্ব.. শুনছেন?
নাহিয়ান কেঁপে উঠল। চোখের পাপড়ি নড়ল একটু এদিক সেদিক। নুসরাত আবারো প্রশ্ন ছুঁড়ল,”আপনি নাকি আমার মাকে দেখে অদ্ভুত ব্যবহার করেছেন সেদিন?
নাহিয়ান কিছু বলতে নিবে নুসরাত থামিয়ে দিল। বলল,”এর কারণ আমি জানি পূর্ব, আপনাকে বলতে হবে না। আপনাদের পরিবারে নারীদের সম্মান পুরুষদের পায়ের তলায়। কতৃত্ব, রাজ বিরাজ করে পুরুষেরা। আপনারা মনে করেন নারীরা ঘরের কীটপতঙ্গ, নিচ জাতের, দাসী তাই না? একটা কথা বলি মাইন্ড করতে চাইলে করিয়েন, আপনারা মুসলিম হয়ে গেলেও, আগের হিপোক্রেসি খ্রিষ্টানের এখনো যায়নি। ইসলামে নারীর সম্মান সবার আগে, কিন্তু আপনারা তা করেন না। এবার ভাবছেন আমি এগুলা কী করে জানি! আপনি আমার ব্যাপারে এতকিছু জানেন আর আমি জানব না তা কী করে হয়! আমি ও টুকটাক আপনার ব্যাপারে জানি। ঘরের বউদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখুন। তাদের দাসী নয়, রানী বানিয়ে রাখুন। যাই হোক, আপনাদের পরিবারের ম্যাটার আমার না বলাই ব্যাটার হবে। তো যা বলছিলাম, আপনি আমায় পছন্দ করেন না, এটা আপনার জেদ আমাকে নিয়ে।
নাহিয়ান অবাক হলো। চোখ মুখে ফুটে উঠল তা। বেঘোরে আওড়াল,”জেদ?
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,’”হ্যাঁ জেদ..! আমি এই আপনাকে কী বললাম! আপনাদের পরিবার স্বাধীন চেতা নারীদের দেখতে পারে না৷ যেমন আমার মতো নারীদের, যারা একটু উগ্র মেজাজি, বদ হয়। আপনি আমাকে যেদিন দেখেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেদিন আমাদের চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের জন্য। এই চোখাচোখিতে প্রেম হয় না পূর্ব। আপনি আমাকে পাওয়ার একটা জেদ নিজের মনে টেনে রেখেছেন। যে মেয়ে আপনাকে পুরো রেস্টুরেন্টের সামনে বালের নেতা বলে গালি দিয়েছে, সেই মেয়ের প্রতি একজন পুরুষের কখনো ভালোবাসা, পছন্দতা আসতে পারে না, আসবেও না কখনো, কিন্তু আপনার তা এসেছে! আমি কী করে বিশ্বাস করি তা ভালোবাসা! আর মোটকথা হলো আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী নই। মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, আপনি জেদের বশ্ববর্তী হয়ে এসব করছেন। এবং এখনো বিয়ের করার ইচ্ছেটা সেই জেদের কারণ। আরশ আপনাকে মেরেছে আমার জন্য। আপনাকে হসপিটালে থাকতে হয়েছে, সেটা থেকে একটা জেদের তৈরি হয়েছে যে আপনার আমাকে নিজের বানাতে হবে, ওই আরশকে শিক্ষা দিতে হলেও আমাকে আপনার বানাতে হবে। বিয়ে শেষ হলেই আপনার আমার প্রতি এই আগ্রহটা ফুরিয়ে যাবে। এবং আমি এই যে এতগুলো কথা বললাম, আমার কথায় আপনি কোনো ভুল দেখাতে পারবেন না।
নুসরাত স্যরি বলতে গিয়ে থেমে গেল। নাহিয়ান হা করে তার কথা গিলছে। এখনো পর্যন্ত টু শব্দটি করেনি। নুসরাত বলল,”আবারো আপনার পরিবারের প্রসঙ্গে যাচ্ছি। আমি উগ্র, অভদ্র, শয়তান, বদ, গালিবাজ, এটা আমি নিজেও জানি। আমি নিঃসন্দেহে একজন খারাপ মানুষ। সাধারণ বাঙালির মতো আমার চিন্তাধারণা নেই। আমি কলেজে থাকতে যখন নারী শিক্ষা নিয়ে রাস্তা বের হতাম অনেকে আমায় সে সময় শাহবাগী বলত। কারণ আমি কেন নারী শিক্ষার পক্ষে কথা বলছি? কেন ঘরে বসে নেই? কেন আমার পরিবার আমার উগ্রতা মেনে নিচ্ছে? তাই বলে আমি পুরুষদের নিচু করছি না। আমাদের সমাজে মাথা উঁচু করে চলার জন্য পুরুষের সাপোর্ট ভীষণ প্রয়োজন, কিন্তু আমি ওই সব নারী কখনো হতে চাইনি যাদের ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষা গলা টিপে মেরে ফেলা হয়। আমি উড়তে চেয়েছি, এবং আমি উড়তে পেরেছি, আমাকে একটা গন্ডীর ভেতরে আটকে রাখা হয়নি, সব করতে দেওয়া হয়েছে। কখনো বেশি কথা বললে বলা হয়নি তুমি চুপ থাকো, কথা কম বলো, এত সত্য কথা বলতে হয় না, বেয়াদবী করো না। আমাদের সমাজে একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেয়াদবি। যদি কেউ জোর গলায় কথা বলে সেটা বেয়াদবি, কেউ কথার প্রতিবাদ করে সে বেয়াদব। আমি কখনো ভালো হয়ে বেঁচে থাকতে চাইনি। মানুষের কাছে ভালো হয়ে বেঁচে থেকে আত্মগ্লানি নিয়ে মরব কেন! আল্লাহ আমায় একটা জীবন দিয়েছে এই জীবন আমি বদমায়িশি, শয়তানি, খবিসি, বেয়াদবি করে কাটাব। প্রয়োজন পড়লে আমার মতো কালো মেয়েদের জন্য আওয়াজ উঠাব। আমি নিজেকে নিয়ে কখনো হতাশায় ভুগিনি। আমার মতো অনেক নারী আছে যারা কথা বলতে পারে না, নিজেদের বেয়াদব তকমা থেকে বাঁচাতে, কিন্তু আমি সাচ্ছন্দ্যে তা গ্রহণ করেছি। যে যাই বলুক, আমি নিজের কাছে নিজে অনেক কিছু। আমি নিজেকে ভালোবাসি ভীষণ। আপনার সাথে ওইদিন আমার দেখা হওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না, কিন্তু তকদীর হয়তো আমাদের দেখা হওয়া লিখে রেখেছিল, ডেসটেনিটি চাইছিল বলেই আমাদের এমন আকস্মিক দেখা। আপনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, সে পরিবেশে নারীদের ময়লার কীট মনে হয়, কোনো কীটপতঙ্গ যেমন, তেমন মনে করে, কিন্তু যেদিন আমার সাথে আপনার দেখা হলো সেদিন আপনার ধারণা ভেঙে চূরমার হল। আমার এমন বেহায়াপানা, বেয়াদবি আপনার এক মন মেনে নিতে পারছিল না, অন্য মন আগ্রহী হচ্ছিল আমার প্রতি। অতঃপর আগ্রহের বশেই আপনি আমার পিছু নিয়েছেন, এবং এখন সেই আগ্রহ গড়াতে গড়াতে জেদে চলে গিয়েছে।
নুসরাত দীর্ঘ কথা শেষে বিরতি নিল। জিজ্ঞেস করল,”আমি কী কোনো কিছু ভুল বলেছি, এম আই রাইট অর এম আই রং, পূর্ব?
পূর্ব কথা বলল না। কেমন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইল নুসরাতের পানে। নিজেকে সামলে ওঠে বলে উঠল,’”খাবার অর্ডার দেই, কী খাবেন, বলুন?
নুসরাত নাহিয়ানের কথা কাটানোর প্রয়াস দেখল নির্জীব চোখ মুখে। ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের ওপাড়ে খোলা আকাশ। রাতের অন্ধকারে তা ঢেকে আছে। সেদিকে তাকিয়েই প্রশ্ন জাগল তার মনে, আজ কী অমাবস্যা! এত অন্ধকার কেন? কিছুক্ষণ পর তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে মেঘ গর্যে উঠল। গুরুম গুরুম শব্দ হলো। বিদুৎ চমকাল আকাশে আঁকাবাকা হয়ে। নাহিয়ান প্রশ্ন করল,”আপনি বজ্রপাত, বিদ্যুৎ চমকানো ভয় পান?
নুসরাত নিজের চশমা ব্যাগ থেকে বের করে টিস্যু দিয়ে মুছে নিল। চোখে এটে নিয়ে বলল,”কখনো সময় হয়নি বিদ্যুতের চমকে ভয় পাওয়ার। যতদিনে বোঝলাম ভয় পাওয়া উচিত, ততদিনে পাড় করে এসেছি সেসব।
নাহিয়ান ঠোঁট ভিজিয়ে নিল জিভ দিয়ে,”কিন্তু আপনার বয়সী মেয়েরা বৃষ্টির শব্দে চমাকায়, ভড়কায়..!
নুসরাত বিগলিত হাসল। বলল,”সেই সুযোগ আমাদের কাউকে দেওয়া হয়নি। ছোটবেলা থেকেই শিখানো হয়েছে কোনো কিছুই ভয় পাওয়া যাবে না, এবং আমরা ও ভয় পাইনি।
“আমি বিমোহিত হয়ে যাচ্ছি আপনার উপর, নুসরাত।
“থ্যাংকস আ লট আমার উপর বিমোহিত হওয়ার জন্য। এবার বলুন, তখনকার প্রশ্নের উত্তর।
নাহিয়ান ভ্রু চুলকাল তর্জনী আঙুলের সাহায্যে। ফর্সা মুখটায় খেলে গেল হাসি। বলল,”আপনি একদম ঠিক বলেছেন, আমি জেদ থেকেই আপনার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে এসব?
নুসরাত নিজের চেহারার দিকে ইশারা করে জানতে চাইল,”আমার চেহারা দেখে কী আপনার আমাকে বোকাচোদা মনে হয়?
নাহিয়ান হো হো করে হাসল। বলল,”আপনি যা দেখান আপনি আসলে তা না নুসরাত, আপনি বুদ্ধিমতি। উপরে উপরে বোকা, মেন্টাল, পাগল ছাগলের রুপ ধরে ঘুরলে ভেতরে ভেতরে আপনি সব জানেন, সব বুঝেন।
নাহিয়ানের এত কথা নুসরাত নিতে পারল না। অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে বলল,”আর প্রশংসা করতে হবে না এইটুকু যতেষ্ট আজকের জন্য। যেহেতু আমাদের কথা শেষ তাহলে আজ আমি উঠি?
নাহিয়ান থামিয়ে দিল। নুসরাতের ব্যাগ চেপে ধরা হাত টেনে ধরল। নুসরাত একবার তা দেখল, একবার নাহিয়ানের মুখ। হাতে অগ্নি স্ফূলিঙ্গ লেগেছে এমনভাবে ছিটকে সরে গেল, ঝাড়া দিয়ে উঠল তারা সারা শরীর। চোখ রাঙিয়ে, শক্ত কন্ঠে নিষেধাজ্ঞা জারী করল,”আমাকে স্পর্শ করবেন না পূর্ব। আমার পছন্দ নয় কেউ আমার অনুমতি ছাড়া আমার একটা চুল স্পর্শ করছে।
নাহিয়ানের মুখ গম্ভীর হলো। দাম্ভিক স্বরে জিজ্ঞেস করে বসল,”আরশ যখন স্পর্শ করে সময়ে অসময়ে তখন তো কিছু হয় না?
নুসরাত নিজের জায়গায় অটল। আগের মতো শক্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল,’”আপনি আরশ নন৷ আরশ হতেও পারবেন না।
নাহিয়ান আহত হলো। বুকে সূক্ষ্ম ব্যথার উপলব্ধি টের পেল, তবুও টেনে নুসরাতকে বসিয়ে দিল, ছাড় দিল না একবিন্দু। ভীষণ বিরক্তি বোধ করল নুসরাত। পাবলিক প্লেস হওয়ায় চুপচাপ দাঁত কামড়ে বসে রইল। নাহিয়ান বলতে শুরু করল,”আপনার প্রতি আমার অনুভুতি কী তা না বলে আমি আপনাকে আজ যেতে দেব না, নুসরাত। হ্যাঁ আমি মানছি প্রথমে আপনার প্রতি আমি জেদ থেকে পিছু নিয়েছিলাম কিন্তু সেই জেদ এখন আর জেদে আটকে নেই, তা পেরিয়ে বহুদূর চলে গেছে। আমি আপনাকে পছন্দ করি নুসরাত। আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আমাকে বিয়ে করতে আপনার সমস্যা কি সেটা বলুন?
নাহিয়ানের বলার ধরণ দেখে নুসরাত হেসে ফেলল। এত এত কথার বিপরীতে একটু হেসে উত্তর দিল,”আমি বিবাহিত, নাহিয়ান। সম্ভব না!
“তো কী হয়েছে? আপনাদের এই বিয়ের কথা কেউ জানে না? আর এসব ছোটবেলার বিয়ে ধরে বসে থাকে না কেউ, আপনি কেন বসে থাকবেন কেন? আপনি কী কোনভাবে আপনার হাজবেন্ডকে ভালোবাসেন?
নুসরাত উত্তর দিল না প্রশ্নের। নাহিয়ান উত্তরের আশায় বহুক্ষণ প্রতীক্ষায় বসে রইল। অতঃপর বলে ওঠল,”নীরবতা সম্মতির লক্ষণ বলে সবাই মানে৷ আমি তাহলে ধরে নিচ্ছি আপনি ভালোবাসেন আরশকে।
নুসরাত নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ওঠল,”যা ইচ্ছে ভাবতে পারেন। আমি কিছু বলব না এ বিষয়ে।
নাহিয়ান হাসল। মুখোমুখি বসা নুসরাত বিরক্ত হবে জেনেও হাত চেপে ধরল নিজের হাতের মুঠোয়। কন্ঠে হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”আমাকে ভালোবাসলেন না কেন, নুসরাত? আমি কী এতটাই- খারাপ যাকে ভালোবাসা যায় না!
তাকিয়ে রইল নুসরাত। চুপচাপ! নির্লিপ্ত দৃষ্টি। হাত ছাড়ানোর প্রয়াস করল না। নাহিয়ান আবারো বলল,”কেন ভালোবাসলেন না আমায়? একটু তো টাই দিতে পারতেন?
শক্ত গলায় নাহিয়ানের নাম ধরে ডাকল,”নাহিয়ান! আপনি নিজের লিমিট ক্রস করছেন।
“লিমিট অনেক আগেই ক্রস করেছি নুসরাত। লিমিটের ভেতর থাকলে আপনার প্রতি আমার অনুভূতি এত প্রখর হতো না।
নুসরাত উঠে দাঁড়াল। হাত ছাড়িয়ে নিল নাহিয়ানের হাত থেকে। ব্যাগ চেপে ধরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হবে ভাব তার মধ্যে বিরাজমান, এর মধ্যে তার টাখনুর কাছটা চেপে ধরল উঁচু পাহাড় সমান লোকটা। আঁতকে উঠল সে। ছিটকে দূরে সরতে চাইল, হলো না। নির্জীব, নিষ্পৃহ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল পায়ের দিকে। রোবটিক কন্ঠে বলে ওঠল,”ফলিং ইন লাভ ইজ নট লাভ নাহিয়ান, দিজ ইজ জাস্ট এট্রাকশন.!এবং আপনার আমার প্রতি এই অনুভূতি এট্রাকশন।
তার কথা শেষ হতেই নাহিয়ান ভঙুর কন্ঠে বলে ওঠল,”আপনাকে না দেখলে যদি আমার শ্বাস আটকে আসে, দিনে আপনাকে মনে পড়ে হাজার বার, হৃদয়ের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, আমি যতটা নিঃশ্বাস প্রতিদিন নিই, সেই নিঃশ্বাস নেওয়ার সাথে আপনাকে আমার মনে পড়ে, তাহলে সেটা কী? আপনি এখনো বলবেন শুধু এট্রাকশন নাকি জেদ? আপনার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ বা জেদ নেই, আমি আপনাকে ভালোবাসি নুসরাত, ভীষণ ভালোবাসি। আপনাকে না পেলে আমি বাঁচব না। খোদার কসম করে বলছি আপনাকে আমি ভীষণ করে চাই..!
নুসরাত নাহিয়ানের এত কথার বিপরীতে টু শব্দটি করল। নিজের পা ছাড়ানোর জন্য ঝুঁকে যেতেই নাহিয়ান চোখ তুলে তাকাল। চোখচোখি হলো দু-জনের সেকেন্ড দু-য়েকের জন্য৷ আজ নুসরাত চোখ সরাল না নাহিয়ান সরিয়ে নিল। মনে প্রশ্ন উদয় জাগল কেঁদেছে কী লোকটা? অমন চোখের ভেতর পানির ঢেউ খেলছিল কেন? তাকে না পাওয়ার বিরহে কাঁদছে লোকটা? বুকে সূক্ষ্ম কষ্টের এক দানা এসে উঁকি দিল নুসরাতের। তবুও অবিচল রইল সে। টানটান হয়ে রইল অভাবে উঁচু শিরা উপশিরা নিয়ে৷ ভাবাবেগ দেখা গেল না। নাহিয়ান বিড়বিড় করল,“আপনি ভীষণ পাষাণ নুসরাত! আপনি পাষাণ, আপনার হৃদয় পাথরের থেকে ও বেশি শক্ত!পাথরের মতো নারী আপনি! পাথরের মতো আপনার ব্যবহার, পাথরের মতো চোখ, হৃদয় পাথরের, মুখ দিয়ে যা বলেন তা তা পাথরের। পাষাণ, পাষাণ, পাষাণ..!
নুসরাত শুনলই না সেসব, পা টেনে ছাড়িয়ে নিল। পাষাণের মতো করে। ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে যেতেই নাহিয়ান পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল,”যার জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আমাকে গ্রহণ করলেন না, সে কী আপনাকে ভালোবাসে?
নুসরাতের চলতে থাকা পা থামল। থমকানো চেহারায় পিছু ফিরে চাইল। কঠোর কন্ঠে বলে ওঠল,”ভালোবাসা! আমি জানি না ভালোবাসার মানে কি! আমার কাছে ভালোবাসা মানে এই নয় যে সারাদিন একজন আরেকজনকে ভালোবাসি, ভালোবাসি বলা, চুমু খাওয়া, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা, একজন আরেকজনের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকা। আমার কাছে ভালোবাসার মানে হলো, যখন পৃথিবীর মানুষ একদিকে আর আমি একদিকে তখন পৃথিবীর একদিকের মানুষ ছেড়ে শুধু আমাকে সমর্থন করবে সে। খারাপ অবস্থায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার বদলে, সে আমার পাশে দাঁড়াবে। আমাকে রক্ষা করবে। তো হ্যাঁ, আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে। অনেক বেশি বাসে..! আমার চিন্তাভাবনার থেকে বেশি।
তাচ্ছিল্য নিয়ে জানতে চাইল,“এত বিশ্বাস?
নুসরাত উত্তর করল না। নাহিয়ান বলল,”আপনার এই বিশ্বাস ভাঙবে নুসরাত, খুব খারাপ ভাবে ভাঙবে।
নাহিয়ানের কথা কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করল না। রুঢ় মুখ চোখ করে পা চালিয়ে এগোল সম্মুখে। পেছন থেকে আওয়াজ আসছে কারোর কথার। হয়তো তৌফ এটা..! জিজ্ঞেস করছে,”আপনি ওর ভেতর কী এমন দেখেছেন ভাই, যে এতটা ভালোবেসে ফেলেছেন?
নুসরাত থেমে দাঁড়াল। ঘাড় ঘোরাল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে রইল উত্তরের আশায়। নুসরাতের অপেক্ষার অন্তিম ঘটিয়ে নাহিয়ান ভঙ্গুর কন্ঠে উত্তর দিল,”যখন ওর নির্মল চেহারাটা দেখেছি এরপর আর কিছু দেখিনি, দেখার প্রয়োজন পড়েনি।
***
আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। বাতাস হচ্ছে চারিদিকে। বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব..! আকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বৃষ্টি তখন। গুরুম গুরুম শব্দে মুখরিত আশপাশ। রেস্টুরেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে গিয়ে হাতের ঘড়িটা দেখে নিল সে। বাজছে এখন সাতটা আটচল্লিশ! নাহিয়ানের কথা ঘুরে ফিরে কানের কাছে বাজছে। না চাইতেও খারাপ লাগা কাজ করছে। কেমন করে তাকিয়ে ছিল লোকটা, তারদিকে শেষ আশা নিয়ে। নুসরাত শক্ত কন্ঠে বলতে পারে তার আর আরশের আগে বিয়ে না হলে নিশ্চয়ই নাহিয়ানের মায়ায় পড়ে যেত। বুকে কষ্টের দানা আবারো বাঁধল। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পার্কিং করে রাখা গাড়ির দিকে অগ্রসর হতেই বাহু চেপে ধরল কেউ। নুসরাত ভাবল নাহিয়ান। তাই চ্যাঁচিয়ে উঠল,”আপনাকে না করেছি না, আমার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করবেন না আমায়?
বাহুর চাপে শরীর ব্যথায় ঝাঁঝিয়ে উঠল। চশমা পরে থাকায় স্পষ্ট দেখতে পেল আরশের রাগে ক্ষোভে তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট, নাক! নুসরাত অবাক হলো! আরশ এখানে আসল কীভাবে ভেবে? অত্যাশ্চর্য কন্ঠে কিছু বলতে নিবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। ব্যথায় গায়ের অন্ধি সন্ধি ছুটে যাওয়ার মতো মনে হলো তার। আরশ তার বাহু দ্বিগুণ চাপে চেপে ধরল। শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে মাথা দোলাতে দোলাতে বলে উঠল,”ওহ, হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম, আমি চেপে ধরলেই সমস্যা হয় তোর, নাহিয়ানের সাথে ঘষাঘষি করতে সমস্যা হয় না, তাই না?
নুসরাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিরক্তিতে খ্যাঁকাল,”ভালো লাগছে না, আরশ ভাই। হাত ছাড়ুন..!
আরশ হাত ছাড়ল না বৈ আরো চেপে ধরল শক্ত করে। রাগ মিশ্রিত স্বরে জানতে চাইল,”এখানে এসেছিস কেন?
নুসরাতের দ্বিধাহীন কন্ঠস্বর ভাসল বাতাসে”নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে।
“তুই কেন নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে আসবি? ভালোবাসা ভাটা হচ্ছে?
“আশ্চর্য, ভালোবাসা ভাটব কেন?
নুসরাত থামল। ক্লান্ত স্বরে বলে উঠল,” আমি ক্লান্ত, আমার রেস্ট প্রয়োজন। বাড়ি যাব, হাত ছাড়ুন.!
আরশ হাত ছাড়ল না। নুসরাতকে টেনে এনে নিজের কাছে দাঁড় করাল। একদম নিকটে। উত্তাল বাতাসে উড়ল নুসরাতের মাথার চুল, ঢিলেঢালা শার্টটা।
“ছাড়ব না হাত, আগে উত্তর দেয় আমার প্রশ্নের, নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছিস কেন?
“আরশ ভাই আপনি এবার অভার রিয়েক্ট করছেন।
আরশ খ্যাক করে উঠল। চ্যাঁচাল,”আমি অভার রিয়েক্ট করেছি, আমি?
গা ঝাড়া দিয়ে নিজের শরীর ছুটিয়ে নিল আরশের কাছ থেকে নুসরাত। দূরে দাঁড়িয়ে বলল,”হ্যাঁ আপনি করছেন অভার রিয়েক্ট। একটা সামান্য বিষয়কে বাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখছেন।
“তাহলে তুই বলছিস বাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখব না? বাড়িয়ে দেখা আমার জন্য পাপ?
নুসরাত বিন্দুমাত্র আগ্রহ পেল না এই বিষয়ে কথা বাড়ানোর। আরশের টানা হিঁচড়ায় মেঝেতে ব্যাগ পড়েছিল তা ঝুঁকে নিতে যাবে এক একটা বাক্য তীরের ফলার ন্যায় এসে বুকে বিদ্ধ হলো তার৷ নির্জীব দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মিনিট অইভাবে। ব্যাগটা তুলল না, অবহেলা নিয়ে পড়ে রইল কংক্রিটের লনে। আরশের কথাটুকু শ্রবণ হলো না ঠিকঠাক যেন। কানের ভুল ভেবে আবারো শোনার জন্য মুখিয়ে উঠল তার সমগ্র ইন্দ্রিয়। নুসরাত যে কথাটা নিজের কানের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে চাইল, সেই কথা আরশ আবারো সেই দাম্ভিক স্বরে বলল,”তুই একটা চরিত্রহীন..!
থমকানো চেহারায় তাকিয়ে রইল আরশের দিকে নুসরাত। চোখ মুখের অবস্থা হতবিহ্বল। নির্বাক অবস্থা যে তার৷ কিছু বলার ভাষা হারিয়েছে। বৃষ্টির ফোটা ততক্ষণে পড়তে শুরু করেছে ধরণীতে। টিপটপ করে ভিজিয়ে দিল তাদের৷ নুসরাত তাকিয়ে রইল, নির্মিশেষ। বিশ্বাস ভাঙার আওয়াজ হলো কোথাও! মটমট করে ভাঙল হৃদয়ের অন্তঃস্থল। নাহিয়ানের কাছে বড় গলায় বলে আসা কথাটা মনে হলো বারবার। চোখের সামনে সমগ্র পৃথিবী দুলল।
আকাশ হয়তো বুঝল চারদিক কাঁপিয়ে এই মুহুর্তে বৃষ্টি নামা প্রয়োজন, তাই ঝমঝম করে নামল। ভিজিয়ে দিল গেল নুসরাতের সমগ্র শরীর। সাদা রঙের শার্টটা গায়ের সাথে লেগে গেল। কথা বলতে গিয়ে বুঝল গলা কাঁপছে। নড়বড়ে হচ্ছে তার দেহ। জিভ কাঁপছে! শরীরটা বেইমানি করে সেটা ও কাঁপল। নিজের দেহের এই অভিসন্ধি নুসরাত টের পেল খুব করে। নিজেকে সামলানোর কোনো চেষ্টাই করল না। চ্যাঁচিয়ে উঠল দ্বিগুণ স্বরে,”কোন সাহসে আমাকে আপনি চরিত্রহীন বলেছেন? এই অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
আরশ নিজের কথায় অটল রইল। পাগলের মতো একভাবে চ্যাঁচাল,”তুই চরিত্রহীন, তুই চরিত্রহীন!
“আমি চরিত্রহীন? আমি?
নুসরাত থামল। শরীর কাঁপল সাথে দ্বিগুণ তেজে। শরীরের সব শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে এসে দাঁড়াল আরশের মুখোমুখি। হাত ঘুরিয়ে এনে ঠাস ঠাস করে বাজিয়ে দুটো থাপ্পড় বসাল আরশের দু-গালে। ক্ষোভে, রাগে নাকের পাটাতন কাঁপল। জবান চালাল কঠোর থেকে কঠোর স্বরে,”কোন সাহসে আপনি আমাকে চরিত্রহীন বলেছেন? কোন অধিকারে আমাকে আপনি এটা বলেছেন? কোনো অধিকার আছে আপনার আমার উপর? তেরো বছর পূর্বের ওই বিয়ের জের ধরে যদি আপনি আমার উপর কতৃত্ব চালাতে আসেন, তাহলে শুনুন, ওই বিয়েটা আমি মানি না। ওই বিয়েটা নিছক নামমাত্র, অস্তিত্বহীন, মূল্যহীন! কোনো সম্মান নেই আমার কাছে। শুনেছেন, আপনি আমার কথা? কোনো.. মূল্য নেই..!
আরশ কটাক্ষ করে হাসল। নির্বিকার চিত্তে চেয়ে রইল নুসরাতের পানে।অসাড়তা ঝেঁকে ধরল তার সমগ্রতা। ঠোঁট নাড়িয়ে জানতে চাইল,”মূল্য নেই বিয়েটার, তোর কাছে?
গর্জাল সে দাম্ভিক স্বরে । টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর করল,“না, একফোটা ও নেই।
কথা শেষে ঢোক গিলল! ঠোঁট কাঁপল থরথরিয়ে। নিজের চোখের চশমা খুলে মুছে নিল ভেজা কাপড় দিয়ে৷ ঝাপসা হলো আরো! চোখের পর্দা ঝাপসা হলো তার থেকে দ্বিগুণ । চোখে কিছু একটা পড়েছে হয়তো। বৃষ্টির পানির ছাটের সাথে তাল মিলিয়ে চোখ বেয়ে জল পড়ল টপটপ করে এক ফোটা,দু ফোটা, তিন ফোটা, এমন করে শতটা। রাতের অন্ধকারে তা বোঝা গেল না৷ বৃষ্টির কারণে ধারণা করা গেল না সে কাঁদছে। নিজের জায়গায় কঠোর থাকল। যে বিশ্বাস করে না তার কাছে আবার কীসের আশ্বাস চাইবে? নুসরাত ঝুঁকবে না। যার যা ভাবার ভাবুক। ভাবতেই থাকুক! সে দায় নেয়নি মানুষের ভাবনা বদলানোর৷ অনেক কষ্টে সিদ্ধান্ত নিল সে একটা। আরশের থেকে দু-হাত দূরে ছিল সে। অনবরত বৃষ্টিতে ভিজে শরীর চিপচিপে হয়ে আছে দু-জনের। আরশ শক্ত অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে।কঠোর চেহারা তার! কোনো নমনীয়তা নেই সেখানে! এক পা দু-পা করে এগিয়ে আসলো আরশের নিকটে নুসরাত। নিজেদের ভেতরের দূরত্ব মিটিয়ে নিল। কন্ঠ নিষ্পৃহতা আবহ বিরাজমান,তবুও নিজস্ব গম্ভীরতা বজায় রাখে সে। মেয়েলি কন্ঠ ঝংকার তুলে ওই বৃষ্টির সাথে ”এই সম্পর্কের ভার বয়ে চলা আমার দ্বারা আর সম্ভব না, আরশ ভাই, লেট’স গেট ডিভোর্স.!
চলবে…