পিকনিক থেকে ফেরার পথে মাঝরাস্তায় চার বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে কুঁড়িয়ে পেয়েছে ৪ জন বন্ধুর স্কুল পড়ুয়া একটি দল! বাচ্চা মেয়েটির তথ্যমতে তার আপন চাচ্চু আর একটা আন্টি তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তার জন্য চকলেট আনতে যাবে বলে গিয়েও আর ফিরে আসে নি। অনেকক্ষন অপেক্ষা করার পরেও তাদের না আসতে দেখে সে এমন মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে কান্না করছিলো।
‘আমার কি মনে হচ্ছে জানিস? বাচ্চাটাকে ওরা ইচ্ছে করে ফেলে রেখে গিয়েছে’।
সৌম্য ড্রাইভ করতে করতে পিছনে থাকা বাকি বন্ধুদের উদ্দ্যেশ্য করে বললো। সৌম্যের কথায় আনায়া মুখে একটা ললিপপ গুজে দিয়ে ভ্রু-কুঁচকে সন্দিহান স্বরে শুধালো,
‘তুই এতো সিউর কিভাবে? হতেও তো পারে তারা কোনো বিপদে পড়েছে তাই আসতে পারে নি’
সৌম্য প্রতুত্তরে কিছু বলার আগে তার পাশের সিট থেকে বর্ণ বিজ্ঞের মতো বললো,
‘সৌম্যের কথাটাও ফেলে দেওয়ার মতো নয় আনায়া। প্রথমত, এমন মাঝরাস্তার সাথের জঙ্গলে একটা বাচ্চা মেয়েকে তার পরিবারের লোক কেনো আনবে? জঙ্গলে তো দেখার কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, আশে -পাশে তাকিয়ে দেখ, কোনো দোকান আছে? তাহলে ওরা চকলেট কোথা থেকে কিনবে? এছাড়াও, চকলেট কিনতে কি বাচ্চা মেয়েটাকে একা রেখে দুজনকেই যেতে হবে কেনো? একজনও তো যেতে পারতো। কিন্তু তারা সেটা করে নি, তার মানে..কি দাঁড়ায়?’
সৌম্য বর্ণের মুখ থেকে কথা ছিনিয়ে নিয়ে বললো,
‘তার মানে দাঁড়ায়! বাচ্চাটাকে এখানে ফেলে রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্যই নিয়ে আসা হয়েছিলো।’
আনায়া মাথা নাড়লো। বুঝতে পেরেছে। মুখে বললো,
‘বুঝলাম। তবে এটা না হওয়ারও চান্স রয়েছে। কারন আমার কেউই আসল কথা জানি না।’
পরপর একদম পিছনের সিটের দিকে তাকাল। সেখানে তাদের সমবয়সীই আরেকটা ছেলে কোলে ল্যাপটপ রেখে অনবরত কি-বোর্ডে হাত চালাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে না, তাদের কথোপকথন কিছু শুনেছে। কানে একটা হেডফোন গুজে চুপচাপ গম্ভীর মুখে এক নাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছে। হয়তো ফাইবারে আবার কোনো নতুন অর্ডার এসেছে। সেটা নিয়েই ব্যাস্ত সময় পার করছে। আনায়া সেদিকে তাকিয়ে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। ছেলেটার এই বয়সেই নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রতি এতো নেশা! বাবা বড়োলোক থাকার পরেও নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে কেনো? কই সে তো এসব চিন্তা করে না। তার বাবা তো বড়লোকই! অবশ্য সে কেনো! তাদের চারজনের এই ছন্নছাড়া গ্রুপের সবার পরিবারই টাকা দিয়ে বড়োলোক তবে মনের দিকে দিয়ে না।
‘তোর কি মত রেভান?’
আনায়ার প্রশ্নে রেভানের কোনো নড়চড় হলো না। সে এখনোও এক নাগাড়ে হাত চালাচ্ছে। আনায়া সেদিকেই তাকিয়ে থাকলো। ঠিক গুনে গুনে তিন মিনিট পর ছেলেটা মাথা তুলে তাকালো। আর তাকাতেই যেন তার চোখের নীলচে রঙের মনির তীক্ষ্ণতা সবার দৃষ্টিগোচর হলো। টানটান, শক্ত-পোক্ত মুখ আর নীলাভ চোখের মনি যেন ছেলেটির ব্যাক্তিত্বকে জাহির করছে। এতো কম বয়সেই বলিষ্ঠ শরীরের গড়ন একেবারে চোখে লাগার মতো। তাকে দেখতে একদম সবার বড়ো লাগলেও সত্যিটা হলো এখানের সবার ছোট রেভান। এমনকি আনায়ারও!
‘কোন বিষয়ে?’
গমগমে এক মোটা আর রুক্ষ পুরুষালি কন্ঠে পুরো গাড়িতে বেজে উঠলো। সৌম্য ড্রাইভিং সিট থেকেই মশকরার সহিত শুধালো,
‘এতক্ষনে তোর সময় হলো?’
রেভান প্রতুত্তর করলো না। বর্ণ রেভানের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিজের কোলে থাকা ঘুমন্ত বাচ্চারটার দিকে তাকালো। গাড়িতে উঠানোর পরই বাচ্চাটা শুধু তার হারানোর বিষয়টা কোনো মতে বলে ঘুমিয়ে গিয়েছে। হয়তো রাস্তায় এতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো। অবশ্য এটা অস্বাভাবিক কিছু না। দেখে তো তাদের মতোই বড়োলোকের দুলালি মনে হচ্ছে। প্রিন্সেস গাউন পড়া, গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে। যেনো একটা টোকা দিলেই রক্তিম বর্ণ গাল থেকে গলগলিয়ে র’ক্ত পরা শুরু করবে। এরা তো আদরে আদরে থাকে। সেখানে এমন ধঁকল বাচ্চাটার শরীর নিতে পারে নি। বর্ন বাচ্চাটার মুখে আলতো করে হাত ছুঁয়ালো। এরপর চোখের ইশারা দিয়ে ওকে দেখিয়ে শুধালো,
‘এই বাচ্চাটার বিষয়ে?’
রেভানের নির্বিকার গাঁ ছাড়া জবাব,
‘এখানে আমার কি মত থাকবে? এই ঝামেলা তোরা যেচে গিয়ে কাঁধে নিয়েছিস। বাকিটা তোরাই বুঝে নে'
‘তুই এতো নিষ্ঠুর কেনো রে রেভান? তোর কোনো হৃদয় নেই নাকি? বাচ্চাটাকে ফেলে আসতাম কিভাবে? মাশাআল্লাহ! পরীর মতো ফুটফুটে একা বাচ্চা, দেখলেই তো মায়া লাগে। সেখানে ওকে তুই ঝামেলা বলছিস?’
রেভান সৌম্যের কথায় পাত্তা দিলো না। নির্বিকারে রোবটিক কন্ঠে আওড়ালো,
‘বলছি’
এসব তার কাছে ঝামেলা বই আর কিছু না। এমর ছন্নছাড়া জীবনের সাথে আরেকটা জীবন জড়ানোর কোনো মানে আছে? সে ফের কানে হেডফোন গুজলো। এরপর সিটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে রইলো। রেভানকে চোখ বুজতে দেখে কেউ আর কথা বাড়ালো না। এখন শত ডাকলেও যে সে চোখ খুলবে না তা সবার জানা আছে।
•
সময়টা এখন ভোর ভোর হবে হবে এমনভাব। এবার তাদের ছন্নছাড়া চারবন্ধুর দল সিলেট ভ্রমনে গিয়েছিলো। সচরাচর তাদের বয়সী ছেলে-পেলেদের একপ্রকার একা চলা ফেরা করাই মানা থাকে। অন্যান্য এমন ১৬-১৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে মা-বাবারা অবশ্যই তাদের কখনো এমন একা ছাড়তো না। কিন্তু তারা চারজন ব্যাতিক্রম। ওদের মা-বাবাদের তাদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। ওনারা নিজেদের নাম, ফেমাস, চাকচিক্য আর ঐশ্বর্য নিয়ে ব্যাস্ত। উনাদের নিজ ছেলে-মেয়েদের দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় আছে নাকি?
তখন সৌম্য ড্রাইভ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় রেভান ওকে সরিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং এ এসেছিলো৷ এখনও সে-ই ড্রাইভ করছে। বর্ণ, রেভান, আনায়া আর সৌম্য চারজনই ড্রাইভিং এ বেশ দক্ষ। তন্মধ্যে রেভান যেন একটু বেশি-ই! রেভানের এক কানে আপাতত এয়ার-পডস গুজা। সে ইংরেজি ‘Believer’ গানটা শুনছে। মাঝে মাঝে ঠোট নেড়ে তাল মেলাচ্ছে। চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গাড়ির কাঁচ পেরিয়ে রাস্তাতে নিবদ্ধ। অপরদিকে দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করছে। তন্মধ্যেই ছোট ছোট স্বরে কারও কান্নার আওয়াজ শুনে তার মস্তিষ্ক সজাগ হলো। এক কান খাড়া করে শব্দটার উৎসের দিক অনুধাবন করে সে সোজাসুজি তার বাম পাশের সিটে তাকালো। বর্ণের কোলে থাকা গোলাপী প্রিন্সেস গাউন পড়া বাচ্চা মেয়েটা শব্দ করছে।
বর্ণ গাড়ির সিটে মাথা হেলিয়ে ঘুমোচ্ছে। ঘুমের মাঝেও একহাত দিয়ে বাচ্চাটার একপাশ ধরে রেখেছে, যেন পরে না যায়। রেভান সব তীক্ষ্ণ চোখে দেখলো। বাচ্চাটার শব্দ আরও বাড়তেই তার কপালে বিরক্তির ভাজ পড়লো। একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে গাড়িটা রাস্তার সাইডে দাঁড় করালো। গাড়িটা থামতেই বাচ্চাটা রেভানের দিকে ঠোট উল্টে মায়াবী চোখে তাকালো। যেন রেভান তার কতদিনের চেনা মানুষ। এরপর দুহাত বাড়িয়ে দিলো। মানে রেভানকে তাকে কোলে নেওয়ার জন্য বলছে।
এদিকে রেভান বড়ো বড়ো চোখ করে বাচ্চাটার দিকে তাকালো। বাচ্চাটা এভাবে হাত বাড়িয়েছে কেনো? সে কোলে নিবে? তাও এই মেয়েকে? সিরিয়াসলি? রেভান কোনো নড়চড় করলো না। বরং সেখানে বসে থেকেই না পাড়তে একপ্রকার গম্ভীর মুখে শুধালো,
‘কি হয়েছে?’
বাচ্চাটা কোনো কথা বললো না। সেভাবেই রেভানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরপর আবার হাত বাড়িয়ে দিয়ে চোখ কচলে ঘুমো ঘুমো স্বরে বললো,
‘কোলে…’
যেন এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। রেভান ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বর্ণকে ডাকলো। কিন্তু বর্ণের কোনো সাড়াশব্দ নেই। যেন ম'রার ঘুম দিয়েছে। এদিকে বাচ্চাটা এখন ক্ষণে ক্ষণে অদ্ভুট শব্দ করছে। আরও দু'বার ডাকার পরও যখন বর্ণের ঘুম ভাঙলো না তখন রেভান চোখ মুখ শক্ত করে বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালো। তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কি এক উটকো ঝামেলা! বিরক্তিকর! এবার সে ধমকে উঠলো,
‘এই হাফফুট সমস্যা কি?’
রেভানের ধমকে বাচ্চা মেয়েটা কেঁপে উঠলো। এরপর এক মিনিট রেভানের দিকে বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই বিরাট জোড়ে এক চিৎকার দিয়ে চোখ-মুখ খিচে কান্না শুরু করলো। এদিকে ওর এহেন কান্ডে গাড়িতে থাকা প্রতিটা মানুষ হকচকিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। রেভান নিজেও খানিকটা হকচকিয়ে গিয়েছে। বাচ্চাটা এমনভাবে চিৎকার করে বসবে এটা সে বুঝে নি। সৌম্য তো কোনোকিছু না দেখেই মাথা নাড়িয়ে অস্থির কন্ঠে বলতে লাগলো,
‘এহ! কি হয়েছে? কি হয়েছে? এ্যাই চোর! না না ডাকাত। কে আছো? কে আছো? হেল্প…বাঁচা……’
বাকিটা বলার আগেই পাশ থেকে আনায়া ওর মুখ চেপে ধরলো। বিড়বিড়িয়ে একটা গালি দিয়ে দাঁত চিবিয়ে বললো,
‘এমন ম'রার চিৎকার করছিস কেনো বা*ল? চোর, ডাকাত কোথা থেকে আসলো?’
সৌম্য নিরীহ চোখে আনায়ার দিকে তাকালো। এরপর ইশারা দিয়ে ওর মুখ থেকে হাত সরাতে বললো। এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন তার প্রাণটা-ই কিছুক্ষণের মধ্যে বেড়িয়ে যাবে। আনায়া সরালো। সৌম্য জোড়ে একটা শ্বাস ফেলে শুধালো,
‘তাহলে কাঁদছে কে এভাবে?’
আনায়া বিরক্তির স্বরে আওড়ালো,
‘ওই বাচ্চাটা’
‘কেন কাঁদছে?’
‘জিজ্ঞেস কর!’
সৌম্য মাথা নেড়ে সামনের দিকে তাকালো। ইতোমধ্যে তাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। রেভান-ই স্টার্ট করেছে। একটু আগেই যে সে বিরাট এক ধমক দিয়ে একটা বাচ্চাটা কাঁদিয়েছে সেটা যেন বুঝাই যাচ্ছে না। অপরদিকে বর্ণ বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দোল দিতে দিতে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।
‘কিরে কাঁদছে কেন এমন?’
বর্ণ অসহায় চোখে সৌম্যের দিকে তাকালো। আওড়ালো,
‘বুঝতে পারছি না রে৷ কান্না তো থামছেই না মেয়ের। কেন কাঁদছে সেটাও তো বলছে না।’
সৌম্য কিছুক্ষণ কি যেন ভেবে হুট করেই নিজের পকেট থেকে একটা ছোট পুতুল বের করলো। সাইজে ছোট কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর ও দামী। এটা সে তার ছয় নাম্বার গার্লফ্রেন্ড টিয়ার জন্য কিনেছিলো। কিন্তু আপাতত এটা এখানে কাজে লাগাতে হবে। এরপর পুতুলটা বাচ্চাটার সামনে বাড়িয়ে দিতেই তার কান্না থেমে গেলো। বাচ্চাটা হাত বাড়িয়ে দিলো পুতুলটা নেওয়ার উদ্দেশ্যে। এদিকে ওর কান্না থামতেই সৌম্য একটা বিজয়ী হাসি দিলো। এরপর পুতুলটা নাড়াতে নাড়াতে ভ্রু নাচিয়ে বললো,
‘দিবো। আগে বলো তোমার নাম কি বেবি?’
বাচ্চাটা কতক্ষন সৌম্যের দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে কি যেন দেখলো। এরপর ছোট ছোট স্বরে বললো,
‘লোজা'
ওর প্রতুত্তর শুনতেই সৌম্যের কপাল কুঁচকে গেলো। লোজা? লোজা আবার কারও নাম হয় নাকি! সে সন্দিহান স্বরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
‘কিহ? লোজা?’
বাচ্চাটা ডানে-বামে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। ফের প্রতুত্তর করলো,
‘না, লোজা'
‘তো আমিও তো সেটাই বলেছি, লোজা?’
বাচ্চাটার কপালে এবার বিরক্তির ভাজ পড়লো। যেন সৌম্যের ওপর বিরক্ত হয়েছে। মুখটাকে একটু কুঁচকে ভেঙে ভেঙে বললো,
‘তুমি কি বুঝো না? লো…জা। মানে লোজা'
সৌম্য হতাশার শ্বাস ফেললো। ওপাশ থেকে এবার বর্ণ শব্দ করে হেসে বললো,
‘আরে পাগল রোজা। রোজা ওর নাম। তাই না কিউটি?’
রোজা এবার খুশি হলো। মাথা ওপর নিচ নেড়ে বোঝালো ঠিক বলেছে। সৌম্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলে শুধালো,
‘ওহ! রোজা? তা আমি কিভাবে বুঝবো রোজা যে ‘র’ কে ‘ল’ বলে?’
বর্ণ কিছু বললো না। সৌম্য নিজেও আর কিছু না বলে নিজের হাতে থাকা পুতুলটা রোজার দিকে এগিয়ে দিলো। রোজা খুশি মনে পুতুলটা হাতে নিয়ে আবার শান্ত হয়ে বর্ণের কোলে বসে খেলতে লাগলো। বর্ণ এবার রোজাকে শান্ত হতে দেখে আদুরে গলায় শুধালো,
‘তখন কাঁদছিলে কেনো কিউটি?’
রোজা মাথা তুলে তাকালো বর্ণের দিকে। পরপরই আবার মাথা ঘুড়িয়ে পাশের ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা রেভানের দিকে তাকালো। রেভানও একই সময়ে রোজার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। রোজা রেভানের তাকানো দেখে বর্ণের কোলে কিছুটা গুটিয়ে গেলো। এরপর নিজের ছোট ছোট হাত তুলে রেভানের দিকে ইশারা করে বললো,
‘ওই পতা আল দুষ্টু বয়টা আমাকে বকেছে'
রোজার এমন সম্বোধনে যেন গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটলো। সবাই একযোগে বড়ো বড়ো চোখে রোজার দিকে তাকালো। আবার রেভানের দিকে তাকালো। রেভান নিজেও আকস্মিক রোজার এমন কথায় হুট করে ব্রেক কষলো। এ্যাই বাচ্চাটা তাকে পচা বললো? দুষ্টু বললো? তারপর দেখো কিভাবে আঙুল তুলে তুলে নালিশ জানাচ্ছে!
‘রেভান? রোজা কি বলছে এসব? তুই ওকে বকেছিস?’
রেভান চোখ পাকিয়ে বর্ণের জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকালো। এরপর দাঁতে দাঁত চিবিয়ে প্রতুত্তর করলো,
‘আমি ওকে বকতে যাবো কেনো?’
সৌম্য মাঝখান দিয়ে আগ বাড়িয়ে শুধালো,
‘তাহলে লোজা..সরি সরি রোজা কি মিথ্যা বলছে নাকি?’
রেভান ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। এই বাচ্চাটা আসতে না আসতেই তার বন্ধুদের হাত করে নিয়েছে। এখন এর জন্য তাকে কৈফিয়ত পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। যেটা সে তার নিজের বাবাকেও কখনো দেয়না। সিরিয়াসলি? আরভিদ রেভান মির্জা নাকি এক বাচ্চার জন্য এখন কৈফিয়ত দিবে? রেভান দু'দিকে একটু মাথা নাড়লো। এরপর ভ্রু কুঁচকে চোখ উঠিয়ে ঠিক রোজার ছোট ছোট চোখের দিকে তাকালো। এরকম মায়াবী চোখ আর মায়া মায়া চেহারা দেখেও তার মনে কিঞ্চিৎ ভালো লাগা দোল খেলো না। কথায় আছে যারা বাচ্চা পছন্দ করে তারা কখনো নিষ্ঠুর হতে পারে না৷ কিন্তু রেভান তো বাচ্চা পছন্দ করে না। এমনকি সামনে বসে থাকা পরির মতো বাচ্চাটাকেও তার বিরক্ত লাগছে। তাহলে কি সে নিষ্ঠুর? হবে হয়তো। সে সেদিকে তাকিয়ে থেকেই শক্ত কন্ঠে আওড়ালো,
‘ওই হাফফুট টা বিরক্ত করছিলো আমায়। তাই ধমক দিয়েছি'
ওর কথা শুনতেই বর্ণ রোজাকে নিজের সাথে আরেকটু আগলে নিলো। খানিকটা হতাশার কন্ঠেই বললো,
‘তাই বলে তুই এমনভাবে ধমক দিবি? বাচ্চা মানুষ! সে কি আর এত কিছু জানে?’
এবার পিছন থেকে শুনা গেলো আনায়ার বিরক্তিকর স্বর,
‘আল্লার রস্তে এবার থাম তোরা। রেভান নাহয় একটু ধমক-ই দিয়েছে। তাই বলে এভাবে পাড়া জাগানো চিৎকার দিতে হবে কেনো এই ক্যাসেটটাকে? তাছাড়া এখন এসব চিন্তা বাদ দিয়ে ভাব কি করবি! এই ক্যাসেটকে রাখবি কই?’
আনায়ার প্রশ্নের বিপরীতে সৌম্য মাথাটা গাড়ির সিটে হেলিয়ে দিলো। এরপর নির্বিকারে বললো,
‘কেনো? আমাদের সাথে!’
বর্ণও মাধা নাড়লো। বললো,
‘হুম, আমাদের সাথেই রাখি আপাতত। এরপর ঢাকায় গিয়ে থানায় যোগাযোগ করবো। আশা করি তখন ওর পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যাবে।’
বর্ণের কথায় সৌম্য আর আনায়া দুজনেই মাথা নাড়লো। রেভান আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। এখন এসবে তার কোনো মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না।
*
এখন তাদের গাড়িটা ঠিক ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলছে। ওরা প্রায় ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। সৌম্য জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে সাইনবোর্ড দেখলো। জায়গাটা নরসিংদী। তারমানে ঢাকা গিয়ে পৌছুতে আর ঘন্টা দুয়েকের মতো সময় লাগবে। কিন্তু কথা হচ্ছে তার তো ক্ষিধে পেয়েছে। এমন সময়েই হুট করে বর্ণের কোলে থাকা রোজা হাতের পুতুলটা ফেলে দিয়ে আবার চিৎকার শুরু করলো। গাড়ির সবাই হকচকিয়ে উঠলো। রেভান একপলক সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করলো শুধু,
‘ডিজগাস্টিং হাফফুট'
এদিকে বর্ণের অবস্থা তো নাজেহাল। আবার কি হলো? সে একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়ে রোজার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
‘আবার কি হয়েছে কিউটি? এখন তো কেউ তোমাকে ধমকায় নি'
রোজা ছলছল নয়নে বর্ণের দিকে তাকালো। এরপর ঠোট উল্টে আবদার জানালো,
‘মাম্মা যাবো'
হুট করেই রোজার এহেন আবদারে সবাই যেন খেই হারালো। এতক্ষণ তো ঠিকই ছিলো। এখন আবার মাম্মার কথা মনে পড়লো কেনো? এবার সামলাবে কিভাবে?’
বর্ণ মাথা নেড়ে বললো,
‘আচ্ছা, যাবো তো'
রোজা মানলো না। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ-মুখ একদম লাল হয়ে গিয়েছে। যেন একদম লিটল একটা চেরি। সৌম্য বললো,
‘আচ্ছা, চেরি থামো। কান্না থামাও। আমরা যাবো তো তোমার মাম্মার কাছে।’
রোজা ঠোট উল্টে মায়াবী স্বরে শুধালো,
‘কখন?’
সৌম্য এমন মায়া মায়া কন্ঠে বশ হয়ে গেলো। একটু হেসে প্রতুত্তর করলো,
‘এইতো এক্ষুনি যাবো। একটু অপেক্ষা করো কেমন? কান্না থামাও এবার। তোমাকে একটা বিগ চকলেট দিবো’
রোজা কেন যেন মেনে নিলো এবার সৌম্যের কথা। অবশ্য মানতো না তবে চকলেটের লোভ দেখানোতে থেমেছে। ওর কান্না থামতেই বর্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এরপর আবার রোজার হাতে পুতুলটা দিয়ে খেলতে বললো। তবে রোজা হাতে পুতুলটা নিলেও খেললো না। বরং সৌম্যের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আদেশ করার মতো বললো,
‘দাও'
সৌম্য ভ্রু কুঁচকালো। শুধালো,
‘কি দিবো?’
রোজা ভেঙে ভেঙে বললো,
‘তকনেট'
সৌম্য প্রথমে বুঝলো না তকনেট কি। কিন্তু পরক্ষণেই মাথায় আসতে, পেছন থেকে নিজের ব্যাগটা খুঁজে খুঁজে একটা কিটকেট বের করলো। তার কাছে এসব টুকটাক স্নেকস সব সময়ই থাকে। কিটকেটটা রোজার দিকে এগিয়ে দিতেই রোজা মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। সৌম্য কপালে ভাজ ফেলে শুধালো,
‘কি নিবে না? একটু আগেই তো চকলেটের জন্য হাত বাড়িয়েছো।’
সৌম্যের কথায় রোজা উপর নিচ মাথা নেড়ে বোঝালো নিবে। সৌম্য ফের শুধালো,
‘তাহলে? নাও'
রোজা হাতে ইশারা করে চকলেট টা দেখিয়ে বললো,
‘ছিলে দাও'
সৌম্য ভ্রু উঁচিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললো,
‘আরে বাবা ছিড়েও দিতে হবে?’
রোজা মাথা নাড়লো। মানে দিতে হবে। বর্ণ হেঁসে ফেললো শব্দ করে। বললো,
‘ছিঁড়ে দে। আমাদের রোজা এটা ছিঁড়তে পারে না।’
পরপর একটু থেমে বললো,
‘প্রিন্সেসের একদম প্রিন্সেস প্রিন্সেস ভাব। আল্লাহ-ই জানে এই কিউটি কার কপালে আছে। সেই ব্যাটার তো ওর আবদার পূরণ করতে করতেই অবস্থা নাজেহাল হয়ে যাবে'
বর্ণের কথাটা শুনেই রেভান আড়চোখে একবার রোজার দিকে তাকালো৷ এরপর চোখ উল্টে বিরক্তিভাব দেখিয়ে বিড়বিড় করলো,
‘রিডিকিউলাস!’
সৌম্যও বর্ণের কথায় মাথা নাড়লো। প্যাকেটটা ছিড়তে ছিড়তে নিজেও বর্ণের কথায় সায় জানিয়ে বললো,
‘তা অবশ্য ঠিক-ই বলেছিস'
এরপর চকলেটটা বের করে ওটা রোজার দিকে এগিয়ে দিলো। রোজা হাতে নিয়ে খেতে লাগলো। তন্মধ্যে বর্ণ রোজার মুখটা গাড়িতে থাকা পানি দিয়ে হালকা-পাতলা ধুয়িয়ে দিলো। বর্ণ এসবে অভ্যস্ত। তার বোন আছে। সে অবশ্য রোজার মতো ছোট না তবে তার বোনকে ছোটবেলা থেকে তাকেই লালন-পালন করতে হয়েছে। তাই বাচ্চাদের মনোভাব ও কাজ তার জানাই আছে।
রোজা চকলেটটা খুব মন দিয়ে খাচ্ছে। অর্ধেক শেষ করা মাত্রই হুট করে কি মনে হওয়ায় যেন মাথা তুলে একে একে গাড়িতে থাকা সবার দিকে তাকালো। এরপর কি যেন ভেবে বর্ণকে ডাকতে গেলো। পরক্ষণেই মনে হলো সে কি বলে ডাকবে? সে তো নাম জানে না কারো। তাই বর্ণের হাত ধরে নাড়াতে লাগলো। বর্ণ তখন একটা উপন্যাস পড়ছিলো। রোজাকে এমন হাত নাড়াতে দেখে মুখের সামনে থেকে বই সরালো। এরপর ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
‘কি? আবার কিছু হয়েছে?’
রোজা দু'পাশে মাথা নাড়লো। এরপর ছোট ছোট মায়াবী গলায় শুধালো,
‘তোমাল নাম কি?’
বর্ণ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো,
‘বর্ণ’
রোজা যেন কঠিন নামটা উচ্চারণ করতে পারলো না। মাথা নাড়িয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে শুধালো,
‘ব..বন্য?’
‘না। বলো বর্ণ’
রোজা ফের আগের মতো বললো,
‘বন্য?’
বর্ণ আর কিছু বললো না। মাথা নেড়ে সায় দিলো। ছোট মানুষ তার কঠিন নাম উচ্চারণ করতে পারবে না। এটা অস্বাভাবিক কিছুনা। এদিকে বর্ণের নামের এহেন দশা দেখে সৌম্য পুরো গাড়ি কাঁপিয়ে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বললো,
‘আরে লিটল চেরি শুধু বন্য না তো, বলো বন্য শেয়াল। ওর নাম হচ্ছে বন্য শেয়াল। যে বনেবাদাড়ে থাকে, আর হুক্কা হুয়া ডাকে!’
রোজা গোল গোল চোখে বর্ণের দিকে তাকালো। যেন সত্যতা জানতে চাচ্ছে। বর্ণ সৌম্যকে চোখ রাঙিয়ে রোজার দিকে তাকালো। বললো,
‘আমার নাম বন্য-ই কিউটি। তুমি এটা বলেই ডেকো।’
রোজা মাথা নাড়লো। এরপর গেলো সৌম্যের কাছে। আঙুল তুলে শুধালো,
‘তোমাল নাম কি?’
সৌম্য এবার রোজাকে নিজের নাম শুধাতে দেখে কলারটা ঝাঁকিয়ে ভাব নিলো। এরপর সুন্দর করে প্রতুত্তর করলো,
‘সৌম্য! সৌম্য তালুকদার'
রোজা বুঝলো এমনভাবে মাথা নাড়লো। এরপর বললো,
‘সুমু তাকদার’
সৌম্যের নামের এমন বেহাল দশা দেখ আনায়া সহ বর্ণ হু হু করে হেসে উঠলো। আনায়া তো সৌম্যের পিঠে থাপড়াতে থাপড়াতে হাসছে। এদিকে সৌম্য মুখটাকে প্যাচার মতো করে রেখেছে। তার এতো সুন্দর নামের এহেন দশা করে দিলো? অপরদিকে রেভান এদের হাসাহাসিতে বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে এয়ার পডস বের করে ফের কানে গুজলো। কোথাকার কোন মেয়ে নিয়ে এতো মাতামাতি তার ভালো লাগছে না।
রোজা ঘুড়ে এবার আনায়ার দিকে তাকালো। আনায়া রোজাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে রোজার কিছু জিজ্ঞেস করার আগে নিজে থেকেই বললো,
‘আনায়া'
রোজা এটাতে কোনো ঝামেলায় পড়লো না। নির্ধিদ্বায় উচ্চারণ করলো,
‘আ..নায়া?’
আনায়া সায় দিলো। বললো,
‘এইতো একদম ঠিক বলেছো’
রোজা আর কথা বাড়ালো না। এরপর সর্বশেষ সে রেভানের দিকে তাকালো। যে কিনা এখন তার সব মনোযোগ রাস্তায় দিয়ে ড্রাইভিং করে যাচ্ছে। রোজা আঙুল তুলে রেভানের দিকে ইশারা করলো। এরপর বর্ণের দিকে তাকিয়ে শুধালো,
‘ওই পতা ছেলেটাল নাম কি?’
বর্ণ কিছু বলবে তার আগেই সৌম্য লাফ মেরে বলে উঠলো,
‘এই লিটল চেরি এটা কিন্তু ঠিক না। সবাইকে যেমন তুমি নিজে নাম জিজ্ঞেস করলে, তেমনি ওকেও করো।’
রোজা কাঁদো কাঁদো স্বরে ঠোট উল্টে বললো,
‘যদি বকে দেয়?’
সৌম্য আশ্বাস দিয়ে বললো,
‘আরে বকবে না। যাও জিজ্ঞেস করো'
সৌম্যের আশ্বাস পেয়ে রোজা একটু এগুলো। যেহেতু বর্ণ আর সে ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসে আছে তাই রেভান আর তার অবস্থান বেশি দূরত্বে না। সে এগিয়ে গিয়ে রেভানের শার্টের নিচের দিকটা ধরে টেনে আদুরে গলায় শুধালো,
‘এই পতা ছেলে তোমাল নাম কি?’
(সূচনা পর্ব)
#মাই_রোজমেরি
#ইযারা_হক
চলবে……….??
নতুন গল্প। অবশ্যই আপনাদের রেসপন্স চাই। আশা করি ভালো লাগবে গল্পটা।