🌸 আমার ভাগ্য
লেখিকা : জান্নাতুল মেহেরাজ
পর্ব ১ — চোখের ভাষা
মেহেরাজ কখনো ভাবেনি, কাউকে ভালো লাগার গল্পটা এতটা অদ্ভুতভাবে শুরু হতে পারে।
নকিবকে সে প্রথমদিকে একদমই পছন্দ করত না। বরং ছেলেটা যখন হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত, মেহেরাজের শুধু কেমন যেন অস্বস্তি লাগত।
কিন্তু মানুষ কখন যে নিজের অজান্তে বদলে যায়, তা কেউ বুঝতে পারে না।
একদিন নকিবের তাকানো মেহেরাজের মনে দাগ কাটল।
তারপর আরেকদিন।
তারপর আরও একদিন।
দিন গড়াল, মাস গড়াল।
আর মেহেরাজ বুঝতে পারল—নকিবকে সে পছন্দ করে ফেলেছে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মনে থেকেই গেল—
নকিব কি সত্যিই তাকে পছন্দ করে?
নাকি সবকিছুই মেহেরাজের ভুল বোঝাবুঝি?
একদিন মেহেরাজ একটা ডেয়ার পূরণ করার জন্য আনোয়ারের দিকে তাকিয়েছিল। কাজটা শেষ করে যখন সে পেছনে তাকাল, তখনই দেখতে পেল নকিব তার দিকে তাকিয়ে আছে।
চোখ দুটো যেন অদ্ভুতভাবে শক্ত।
মেহেরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
তার মনে হলো—
“ও কি রাগ করেছে?”
নাকি তার চেয়েও অন্য কোনো কারণ ছিল?
সেদিনের সেই দৃষ্টি মেহেরাজের মনে অনেকক্ষণ রয়ে গেল।
আরেকদিন সাইফুল স্যার নকিবকে শাসন করেছিলেন। ঘটনাটা দেখে মেহেরাজের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ নকিব তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে এবার কোনো হাসি ছিল না।
ছিল কেমন একটা নরম, করুণ চাহনি।
মেহেরাজের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে বুঝতে পারল না, কেন নকিব তার দিকে এমনভাবে তাকাল।
আরেকদিন নাজিম মজা করে নকিবের টুপিটা খুলে দিল।
মেহেরাজ ঘটনাটা দেখে হেসে ফেলল।
নকিবও তখন মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল।
দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
তবুও সেই ছোট্ট মুহূর্তটা মেহেরাজের মনে অনেক বড় হয়ে রইল।
কারণ কিছু কিছু কথা মুখে বলা হয় না।
শুধু চোখের ভাষায় থেকে যায়।
কিন্তু একদিন সেই না-বলা কথাগুলোই মেহেরাজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
নকিব তার বোন মাইশাকে মেহেরাজের কথা বলেছিল।
মাইশা মেহেরাজকে জানাল—
নকিব নাকি বলেছে,
“মেয়েটা শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।”
এরপর মাইশা তাকে বলল,
“তুই আমার ভাইয়ের দিকে তাকাস না।”
মেহেরাজের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে যেন কিছুক্ষণের জন্য কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।
যে মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে সে এতদিন নিজের অজান্তে হাসত, সেই মানুষই কি এখন তার নামে অভিযোগ করছে?
মেহেরাজের চোখে পানি চলে এসেছিল।
লোপা দূর থেকে সবটা দেখছিল।
মেহেরাজের মুখ দেখে সে বুঝতে পারছিল—কথাটা মেয়েটাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছে।
সেদিন মেহেরাজের মনে হয়েছিল, সত্যিই কি সে একা এতকিছু ভেবে নিয়েছিল?
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
বৃহস্পতিবার মাদ্রাসায় জলসা ছিল।
পুরো মাদ্রাসার সামনে মেহেরাজ বক্তব্য দিচ্ছিল।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সে নিজের কথাগুলো বলছিল, কিন্তু হঠাৎ তার চোখ দর্শকদের দিকে চলে গেল।
নকিব সেখানে বসে আছে।
আর সে—
মেহেরাজের দিকেই তাকিয়ে আছে।
মেহেরাজ কথা বলতে বলতে বিষয়টা খেয়াল করল।
নকিব মুখে হাত দিয়ে মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শুনছিল।
সাবরিনা তখন মাইশাকে বলল,
“দেখ, তোর ভাই মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে!”
মাইশা সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
নকিব মাইশাকে দেখতে পেয়েই চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর আবার তাকাল।
মেহেরাজ দূর থেকে ঘটনাটা দেখল।
তার মনে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটা ফিরে এল—
“তাহলে সেদিনের সব তাকানো কি সত্যিই শুধু আমার কল্পনা?”
কিন্তু মাইশা যখন নকিবকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, নকিব সব অস্বীকার করল।
সে বলল,
“আমি তার দিকে তাকাইনি।”
কথাটা শুনে মেহেরাজের ভেতরে রাগ জমে গেল।
কারণ আনিকা নাকি ঘটনাটা দেখেছিল।
মেহেরাজ মনে মনে বলল,
“তাহলে এতদিনের সেই চোখাচোখিগুলো কী ছিল?”
উত্তর কেউ দিল না।
এরপর থেকে মেহেরাজ নকিবের প্রতিটি আচরণ আরও বেশি খেয়াল করতে শুরু করল।
একদিন দুপুরে খুশি আর সাইফার সঙ্গে মাদ্রাসার সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল সে।
হঠাৎ সাইফা বলল,
“ওই দেখ, নকিব!”
মেহেরাজ তাকিয়ে দেখল, দূরে নকিব দাঁড়িয়ে আছে।
চোখে চোখ পড়তেই মেহেরাজ সরে যেতে চাইল।
কিন্তু খুশি বলল,
“এখন গেলে ওরা ভাববে তুই ইচ্ছে করে পালাচ্ছিস!”
মেহেরাজ ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু সাইফা দুষ্টুমি করে তাকে বারবার নকিবের সামনে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
মেহেরাজ বারবার বলছিল,
“এসব ভালো না!”
শেষবার সাইফা এমন জোরে ধাক্কা দিল যে মেহেরাজ অল্পের জন্য নকিবের সামনে গিয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল।
সে আর দাঁড়াল না।
দৌড়ে মাদ্রাসায় ফিরে গেল।
তারপর মাইশা, লোপা, আনিকা, মিম, নুসরাত—সবাইকে ঘটনাটা বলল।
সময়ের সঙ্গে পরীক্ষাও চলে এল।
নকিব পড়াশোনায় খুব মনোযোগী হয়ে গেল।
মেহেরাজ একদিন সামনে বসেছিল।
সে খেয়াল করল, নকিব প্রায় একদম নড়াচড়া করছে না।
কিন্তু মেহেরাজ যখন পেছনে গিয়ে সাইফার কাছে বসল, তখন নকিবও পেছনে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
মেহেরাজ মাইশাকে বলল,
“আমি তো ওর দিকে একবারই তাকিয়েছি!”
মাইশা কিছু বলল না।
শুধু মুচকি হাসল।
পরীক্ষার দিন সকালে মেহেরাজ নকিবকে দেখতে পেল না।
অনেক পরে নকিব মাদ্রাসায় এল।
পরীক্ষা শুরু হলো।
মেহেরাজের পরীক্ষা ছিল তৃতীয় তলায়, আর নকিবের দ্বিতীয় তলায়।
মেহেরাজের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সে দ্বিতীয় তলায় গেল।
দেখল, নকিব তখনও মনোযোগ দিয়ে লিখছে।
কিছুক্ষণ পর নকিবের পরীক্ষা শেষ হলো।
সে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না।
খাতা জমা দিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
মেহেরাজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
নকিব অজু করতে গেল।
তারপর মসজিদের দিকে চলে গেল।
মেহেরাজ তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ নকিব মসজিদ থেকে বের হয়ে উপরের দিকে তাকাল।
মেহেরাজ একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ড যেন মেহেরাজের কাছে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল।
কেউ কিছু বলল না।
নকিবও না।
মেহেরাজও না।
শুধু চোখের ভাষায় যেন আবার একটা অজানা প্রশ্ন থেকে গেল—
“যদি কিছুই না থাকে, তাহলে এত চোখাচোখি কেন?”
মেহেরাজ জানত না।
নকিবও হয়তো জানত না।
কিন্তু তাদের গল্প তখনও শেষ হয়নি।
বরং—
সেটা কেবল শুরু হয়েছিল।
— চলবে — 🌙