#যতনে_রাখিব_তারে
#পর্ব_৯
#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী
(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
"ধূর,আরেকটা আম নিয়ে আসা উচিত ছিল।আম ও যে খেতে মিষ্টি হয় এটা কি আর আগে জানতাম!তাহলে বাকি দুটো আম ও নিয়ে আসতাম ওই মেয়ের থেকে।আরে যাহ শালা!আমটাও খাওয়া শেষ।"
সায়ান আমের জন্য হা-হুতাশ করতে করতে ঠিক ওই আম গাছের নিচে এসেই দাড়ালো।সায়ান এক সাইটে এসে দাড়ালো চুপটি করে।কারণ কয়েকজন লোক সেই রাস্তা দিয়ে আসছে।লোকগুলো তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলে সে এদিক সেদিক তাকালো।কাওকে না দেখে ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে আম গাছের দিকে ধরলো।হাতের নাগালেই একটা আমের ডাল পেল।সেখানে ঝুলে থাকা আম গুলো তারাহুরো করে পেরে নিয়ে কি মনে করে যেন সায়ান আবারও দিল দৌড়।
আমগুলো এখন সে বাসে বসে খাবে।এবার আর কোথাও না দাড়িয়ে সায়ান তার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
----
মেহরিমা বালিশে দুই হাতের কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
তাহসিন বুকের উপর দুহাত আড়াআড়ি ভাবে গুজে সমান হয়ে শুয়ে আছে মেহরিমার দৃষ্টি উপেক্ষা করে।মেহরিমা তাহসিনকে দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে।তাহসিনের মেহরিমার এমন দৃষ্টি আর সহ্য হলো না।মাথার নিচ থেকে বালিশ তুলে নিজের মুখের উপর রেখে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। মেহরিমার হেলদোল হলো না এতে বিশেষ। তাহসিন বালিশ সাইটে রেখে উঠে বসে মেহরিমাকে বলে,
"কি সমস্যা আপনার? এমন হ্যাবলাদের মতো তাকিয়ে আছেন কেন?আমার কি রুপ বের হয়েছে নাকি?"
মেহরিমা এবার শব্দ করে হাসে।তাহসিনের কপাল আপনা আপনি কুচকে যায়।বোকা মেয়েটা এভাবে হাসে কেন?তাহসিন জিগ্যেস করে মেহরিমাকে,
"এভাবে হাসার মানে কি? কি হয়েছে বলুন দেখি?জ্বিনে ধরেছে নাকি!"
মেহরিমা তার মুখ চেপে ধরে হাসি বন্ধ করে বলে,
"আপনাকে লুঙ্গি পড়ে অন্য রকম দেখাচ্ছে।লাইক মুরব্বিদের মতো।একদম আমার আব্বু আব্বু ভাইব দিচ্ছে।"
"আজব পাবলিক তো আপনি!জীবনে কি আপনার ভাইদের আর আপনার ওই কাজিন এক্স প্রেমিককে লুঙ্গি পড়তে দেখেননি?এখন আবার এটা বলবেন না যে,হ্যা আসলেই কখনো দেখেননি।"
মেহরিমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। সে সর্বক্ষণ নিশাতকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে।তার মুখে থাকা হাসি আপনা আপনি গায়েব হয়ে গেল।কষ্টরা আবার মনে এসে ভীড় জমালো। মেহরিমা তাহসিনের দিকে তাকায়।
তাহসিন হতাস হয়ে বলে,
"একদম এভাবে তাকাবেন না। ঘুমান এখন।কার্টুনের মত কেউ এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি ঘুমাবো কিভাবে আজব!"
"আপনি কি আমার সাথে একটু ভালো করে কথা বলতে পারেন না?আমি তো আপনার বউ এখন।আমার সাথে একটু ভালো করে কথা বলবেন কেমন?তা নাহলে আমার কেন যেন খুব কান্না পায়।আর খুব কষ্টও লাগে কেউ এমন করে কথা বললে। "
তাহসিন বোকা বনে যায় মেহরিমার কথা শুনে।একটা মানুষ কি আদতে এতটা ইনোসেন্ট হয়?মনের কথা না লুকিয়ে কেমন সরাসরি বলে দেয়,এভাবে কথা বলবেন না কষ্ট পাই।
"বোকা মেয়ে!আপনি এখন কোন ক্লাসে?"
মেহরিমার ইতিমধ্যে চোখে নাকে পানি চলে এসেছে।সে শব্দ করে নাক টেনে বলল,
"ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার,কেন?"
"পড়াশোনা করবেন?"
তাহসিনের কথা শুনে মেহরিমার চোখমুখ উজ্জ্বল আভায় ছেয়ে গেল।নাকে চোখে আসা পানি আবারও ভেতরে ঢুকে গেল।সে মাথা নাড়িয়ে বলল,
"হ্যা,আমি পড়াশোনা করবো তো!আপনি পড়াবেন আমাকে?কলেজে ভর্তি করাবেন?নাহ,এখন তো আর ভর্তি হওয়ার সময় নেই. রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে,তাহলে?"
তাহসিন তার পাতানো বিছানায় আবারও বালিশ নিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়লো।মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"গাজীপুর গিয়ে দিয়ে আসবেন পরীক্ষা, তাহলেই তো হলো।আমি নিয়ে যাবো আপনাকে।পড়াশোনা ভালো করে স্টার্ট করুন।পরীক্ষার তো বেশি সময় নেই আর।"
"আপনারও তো পড়াশোনার বয়স এখনো শেষ হয়নি।আপনিও শুরু করছেন না কেন আবারও?"
"আমি পড়াশোনা করলে আপনাকে কে পড়াশোনা করাবে? মানে,একমাত্র তো আমিই উপার্জন করি।"
"সেটা তো ভেবে দেখিনি। আচ্ছা আমি নাহয় আপনাকে সাহায্য করবো।"
"কিভাবে সাহায্য করবেন?"
মেহরিমা একটু ভেবে নিয়ে বলল,
"কাজ করতে সাহায্য করবো।আমি রান্না করবো,আপনি খাবেন।খেয়ে কাজে যাবেন এটাই তো।"
তাহসিনের কচু গাছে ফাঁসি নিতে মন চাইলো।এই মেয়ে নাকি রান্না করবে আর সে তা খেয়ে কাজে যাবে।অবশ্য ভালো কথা-ই বলেছে।তাই সে চোখ ছোট ছোট করে বলে,
"আপনি রান্নাও করতে পারেন?"
"হ্যা,পারিতো!কালকে সকালে রান্না করবো।একবার খেলেই আমার রান্নার ফ্যান হয়ে যাবেন।"
"নাহ,দরকার নেই।আমি কারো পাংখা হতে চাই না।আর একটা কথাও না।ঘুমান এখন প্লিজ।আমাকে সকালে কাজে যেতে হবে।"
তাহসিন অপর পাশে ঘুরে চোখ বন্ধ করে নেয়।
মেহরিমা আর কি করবে,তার বকবক করার জন্য একজন মানুষ লাগে।সেই মানুষ টাই তো ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে।মেহরিমা ভালো করে শুয়ে কিছু ভাবতে শুরু করার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে।
----
দূর্ভাগ্যবশত মেহরিমা আজকেও ঘুম থেকে উঠতে পারেনি।রুহানি বেগম এরজন্য অনেকক্ষণ যাবত কথা শুনিয়েছেন।মেহরিমা চুপচাপ তা মাথা নিচু করে শুনেছে।তার মনে হয়েছে দোষটা তারই কারণ সে সকালে উঠতে পারেনি আর কাজ ও করেনি।রুহানি বেগম মেহরিমাকে তাই কাজ ধরিয়ে দিয়েছেন।ঘরদুয়ার, আঙিনা ঝাড়ু দিয়ে থালাবাসন ধুতে বলেছেন।মেহরিমা তার শাশুড়ীর কথায় সায় জানিয়ে সব কাজ করা শুরু করেছে তার আনারি হাতে।আঙিনা টা বেশ বড় হওয়ায় মেহরিমার কোমর বারবার লেগে যাচ্ছিলো।পুরো আঙিনা ঝাড়ু দিয়ে মেহরিমা সুস্থির একটা নিঃশ্বাস ফেলে।ভলোই রোদ উঠেছে তাই মেহরিমার মাথাটাও কেমন চক্কর দিয়ে উঠলো।সে বারান্দায় এসে বসলো।
তার চোখ পানিতে টলমল করছে। সে মনে মনে বলে,
"আমি একদিন করেই হাঁপিয়ে উঠেছি।আর মা তো সারাজীবন এগুলো করে আসছে।উনারও নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয় এগুলো করতে।এরপর থেকে তারাতাড়ি ঘুম থেকে উঠে আমিই সবকিছু করবো।এতদিন উনি কষ্ট করেছেন এখন নাহয় আমি আমার কর্তব্য পালন করি।"
মেহরিমার সরল মনটা রুহানির জন্য কেঁদে উঠলো।মেহরিমা চোখ মুছে থালাবাসন গুলো নিয়ে কলপাড়ে যায়।সেগুলো ভালো করে বেশ অনেকটা সময় লাগিয়ে মেহরিমা ধুয়ে নিল।তার খুব খিদে পেয়েছে। তাই রুহানি বেগমের ঘরের সামনে দাঁড়ায় সে। ঘরের দরজাটা আলতো হাতে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে তাকায়।তার আত্মা কেঁপে ওঠে ভেতরের দৃশ্য দেখে। রুহানি বেগম সমানে কেশেই যাচ্ছেন আর তার সাথে গল গল করে মুখ থেকে খাবলা ধরে রক্তের দলার মত বের হচ্ছে।মেহরিমা দৌড়ে তার কাছে যায়।আতংকিত স্বরে সে বলল,
"মা!কি হয়েছে আপনার?এমন হচ্ছে কেন?আপনার মুখ থেকে তো রক্ত বের হচ্ছে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে আপনাকে ইমিডিয়েটলি। চলুন আমি আপনাকে নিয়ে যাবো এখনি।"
রুহানি বেগম একটা কাপড় দিয়ে কোনোমতে তার মুখটা মুছে নিলেন।মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত মোছার শক্তি আর তার মধ্যে নেই।বিছানায় বসে সে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে কেমন করে যেন হাসলো।হাত দিয়ে ইশারা করে মেহরিমাকে তার পাশে বসতে বলল।মেহরিমা চুপচাপ সেখানে বসে।তার বুক ধরফর করছে।রুহানি বেগম মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
"খুব খিদে পেয়েছে।একটু খাইয়ে দিবে মেহরিমা?তাহসিন ছাড়া একযুগ হলো কেউ খাইয়ে দেয়নি। আমার এই কথাটা রাখবে একটু?তাহসিন ছাড়া আমার কথা রাখার মতো আর কেউ নেই যে।আমার আবদারটা রাখবে কি?"
রুহানি বেগমের এই আবদার টা কেমন করুন শোনালো মেহরিমার নিকট।
মেহরিমা আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না।তার কোমল মন কারও কষ্ট দেখতে পারে না যে।সে ওরনা দিয়ে তার মুখ চেপে ধরলো।চোখ দিয়ে বাধাহীন ভাবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।মেহরিমা রুহানি বেগমের কথায় সায় জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বাহির থেকে প্রথমে একটা বালতিতে পানি আর কাপড় এনে মেঝে থেকে রক্ত পরিষ্কার করে নিল।তার একটুও খারাপ লাগলো না তা পরিষ্কার করতে।মেহরিমা ভালো করে হাত পা ধুয়ে চটজলদি একটা প্লেটে খাবার বেড়ে নিল।আজকে মাছ রান্না করা হয়েছে।মেহরিমা এক পিস মাছ তুলে নিয়ে সামান্য সবজি তরকারি নেয় আর একটা গ্লাসে পানি নেয়।তারপর দ্রুত রুহানি বেগমের কাছে যায়।রুহানি বেগম একই ভাবে বসে আছে।হয়তো মেহরিমার জন্য অপেক্ষা করছিলো।মেহরিমার পেটে থাকা খিদে এতক্ষণে মরে গিয়েছে।তার আর নিজের খিদের কথা মনেই নেই।
সে রুহানি বেগমের পাশে বসে তাকে তার দিকে ঘুরে বসতে বলে।ভাত মাখিয়ে নিয়ে একটু মাছ বেছে তা সহ রুহানি বেগমের মুখের সামনে লেকমা ধরে। রুহানি বেগম কেমন করে যেন একটু হাসলেন অতঃপর হা করলে মেহরিমা তার মুখে ভাতের লোকমা তুলে দেয়।খাওয়ার মাঝেই মেহরিমাকে রুহানি বেগম বললেন,
"জানো তো মেহরিমা!আমিও না তোমার মতো মাছ খেতে পারতাম না।আমার শাশুড়ী যখন এটা জেনেছিলেন তখন নিয়মিত মাছ রান্না করতেন।একসময় আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেলাম মাছ খাওয়াতে।"
মেহরিমার খারাপ লাগলো রুহানি বেগমের কথা শুনে।
রুহানি বেগমের কথার উত্তরে বলল,
"কিন্তু আমার তো মাছে এলার্জি মা।তাই খাওয়া হয়না।তা নাহলে আমার খেতে অসুবিধা ছিল না।"
"তুমি অনেক সহজ সরল মেহরিমা।একটু চালাক হও!তা নাহলে দুনিয়াতে টিকে থাকা মুশকিল যে।এখানকার সব মানুষ শুধু নিজের স্বার্থ বোঝে।কেউ কারো মন বোঝে না।"
"আপনার ছেলে আসলে আগে আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।উনি আসলেই আমি আপনার অসুস্থতার কথা বলবো।এভাবে থাকলে আপনারই ক্ষতি হবে।"
রুহানি বেগম আঁতকে উঠে বললেন,
"না,না মেহরিমা! তুমি তাহসিনকে কিছু বলবে না।ছেলেটা তাহলে আমার উপর আরও অভিমান করবে।এমনিতেই ওর উপর আমি অনেক বড় জুলুম করেছি।"
"কি জুলুম করেছেন আপনি মা?"
রুহানি বপগম আর কোনো কথা বললেন না।চুপচাপ খেয়ে নিলেন বাকি খাবার টুকু। খাবার খাইয়ে দেওয়া শেষে মেহরিমা যত্ন করে শাশুড়ীর মুখটা মুছিয়ে দিল তার ওরনা দিয়ে।মেহরিমা ঘর থেকে বের হয়ে গেলে রুহানি বেগম বিরবির করে তার মুখে আওরায়,
"ধন্যবাদ মেহরিমা।ধন্যবাদ! আমার অনেক দিনের ইচ্ছে আজ পূরণ হলো।মায়ের হাতে খাওয়ার ইচ্ছে কখনোই পূরণ হলো না এ জীবনে।তবে মেয়ের হাতে খাবার খাওয়াতেও যে তৃপ্তি পাওয়া যায় তা আজ বুঝলাম।"
চলবে,,,,,