ফন্ট সাইজ:
থিম:
যতনে রাখিব তারে

২৬তম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া জান্নাত সুমী

#যতনে_রাখিব_তারে

#পর্ব_২৬

#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী

(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

একটুখানি অতীতের স্মৃতি..........................

চৌধুরী বাড়ির মেজো ছেলেটা আজ মারামারি করে এসেছে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে। বাড়িতে এসে মাথায় পানি ঢেলেও রাগ কমার নাম নিচ্ছে না বরং তরতর করে তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মন চাচ্ছে আরও দু ঘা দিয়ে আসলে শান্তি লাগতো। ব্যাটা তাকে চেনেনি এখনো। সে যে চৌধুরী বাড়ির ছেলে এটা মনে হয় ওই ব্যাটা এখনো জানে না। তা নাহলে তার সাথে কি করে পাঙ্গা নিতে আসে। কত বড় সাহস! তার গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করে। তার গায়ে হাত উঠানোর মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে আর সে ছেড়ে দেবে এটা ভাবাও অনুচিত। যে হাত তার উপর উঠাতে চেয়েছে সেই হাত জাহিদ ভেঙে দিয়ে এসেছে। তার উপর হাত তুলতে চায়! জাহিদ ফ্যান চালু করে বিছানায় পড়ে থাকে কিছুক্ষণ। ছেলেটার হাত ভেঙে দেওয়ার জন্য তার বাবা আনোয়ার চৌধুরীর থেকে থাপ্পড় ও খেতে হয়েছে। যার দরুন রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোনোভাবেই সে নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। উগ্র, বদমেজাজি জাহিদ নিজেকে শান্ত করতে অপারগ। রাগ শান্ত করার জন্য প্রকৃতির নির্মল বাতাস গায়ে লাগানো জরুরি মনে করল সে। এক লাফে বিছানা ছেড়ে শব্দ করে দরজা খুলে বেলকনির রেলিং ধরে চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির হাওয়া গায়ে মাখাতে ব্যস্ত হলো জাহিদ। ধীরে ধীরে রাগটা বুঝি একটু শান্ত হলো। বন্ধ চোখের পাতা খুলে সামনে তাকালো জাহিদ। তাকিয়েই থাকলো। কয়েক মুহুর্ত হৃদপিণ্ড টা স্তব্ধ থেকে ধুকপুক করতে শুরু করলো। সহসাই তার একটা হাত বুকের বা পাশে থাকা হৃদপিণ্ডের উপর চলে গেল। ইশ! এখন কি হৃদয় টা বের হয়ে আসবে নাকি?

ঊনিশ বছরের তরুণ মনটা এইতো দোলা দিয়ে উঠলো। এই প্রথম! হ্যা, এই প্রথম তার মন দোলা দিয়ে উঠলো। তাও কিনা পাশের একতলা বিল্ডিং এর ছাদে বড় আকৃতির একটা উড়ন্ত প্রজাপতি ধরতে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকা এক চঞ্চল মেয়ের জন্য। কে এই মেয়ে? আগে তো কখনো দেখা হয়নি। এত স্নিগ্ধতা কেন তার মুখ জুরে? শ্যামলা বর্ণের একটা মেয়ে যে এত স্নিগ্ধতা নিজের মধ্যে রাখতে পারে এটা জাহিদ আজকে জানলো। স্বচক্ষে দেখাও হলো। তার মনটাও ওই স্নিগ্ধ রমণীর মতো স্নিগ্ধতায় ছেয়ে গেল।

পূর্বে থাকা রাগের ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই।

মুখ জুরে এখন তার শুধু এক ছটাক হাসির ফোয়ারা বইছে।

এত ব্যস্ততা কেন মেয়েটার? ওই বোবা প্রানী টাকে ছোঁয়ার জন্য এত কেন তারাহুরো? মেয়েটাকে জানার জন্য জাহিদের মন আকুপাকু করতে শুরু করলো। আজ প্রথম ওই মুখখানা দর্শন করা হলো। এরপর যদি আর দেখা না হয়? এই আশংকা থেকে মুক্ত হতে জাহিদ ব্যতিব্যস্ত হয়ে তার ঘর ছেড়ে বের হলো। এক দৌড়ে বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে পাশের বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো। নিজেকে শান্ত করে জাহিদ বুকে তিনবার ফু দিল অযথাই।

প্যান্টের পকেটে হাত গুজে নিজের মধ্যে ভাব আনতে চাইলো। পরক্ষণেই মাথা ঝাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে এক হাত বের করে গেটে ধাক্কা দিলে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ তুলে তা খুলে যায়। বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে জাহিদ ভেতরে ঢোকে। একটু হেঁটেই বাড়িটার দরজার সামনে এসে ধাক্কা দেয় সে। দরজায় শব্দ করে ধাক্কা দিয়ে সে ডাকে,

"ও মিনু আন্টি! দরজাটা খোলেন একটু।"

বাড়ির ভেতর থেকে একজন চোখমুখ কুচকে কাঠের দরজাটা খুলে দেয়। মিনু আন্টিকে চোখমুখ কুচকে দরজা খুলতে দেখে জাহিদ ঘাবড়ে যায়। পরক্ষণেই ভাবলো সে কেন ঘাবড়াবে! কাউকে ভয় পায় না এই জাহিদ। এই ভেবে টানটান হয়ে দাঁড়ালো সে। মিনু তার চোখমুখের ভাবভঙ্গি আগের মত রেখেই বলল,

"কি হয়েছে? এভাবে ষাঁড়ের মত দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন?"

জাহিদ থমথমে মুখে গুরুজনদের মত করে বলল,

"আমার জরুরি কথা আছে তোমার সাথে আন্টি। তাই এসেছি। ভেতরে ঢুকতে দিবে তো নাকি!"

মিনু দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। জাহিদ ভেতরে ঢুকে এদিকওদিক চোখ বুলায়। মিনুকে আমতা আমতা করে বলে,

"তোমাদের বাড়িতে নতুন কেও কি এসেছে? ছাদে দেখলাম একটা মেয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে।"

মিনু হতাস গলায় বলল,

"আমার আগের ঘরের মেয়ে। এতদিন আমার মায়ের কাছে ছিল। মা মারা যাওয়ায় পরশু নিয়ে আসতে হয়েছে বাধ্য হয়ে।"

জাহিদ কপাল কুচকে নেয়। নিজের মেয়েকে বাধ্য হয়ে নিয়ে এসেছেন মানে! কোনো মা নিজের মেয়েকে বাধ্য হয়ে কাছে নিয়ে এসে রাখে? সে তো এমনটা আগে জানতো না। তবে কি পৃথিবীতে মায়েদের ধরণ ও আলাদা আলাদা?

মিনু তার কথা তো বলে ফেলল। তবে জাহিদ তার মেয়ের কথা জানতে চাইছে কেন? তার মাথায় কথাটা আসতেই সে বলল,

"তোমার এসব জেনে কাজ নেই। যাও বাপু বাড়ি যাও এখন।"

জাহিদ কথা চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেলল,

"বাধ্য হয়ে কেন আন্টি? আপনার নিজের মেয়ে তো। তাহলে আপনার কাছে রাখতে সমস্যা কি ছিল?"

"অন্যের মেয়েকে আমার স্বামী কেন রাখবে তার বাড়িতে?"

জাহিদ এবার বুঝতে পারে ব্যাপারটা। মিনুর এ ঘরেও দুটো সন্তান আছে।

তখন সিড়ি বেয়ে ছাদ থেকে চিৎকার করে অদ্ভুত স্বরে কান্না করতে করতে মিনুর মেয়েটা তার কাছে আসে।

মেয়েটার গলার স্বর, শরীর আর হাতের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে জাহিদ কিছু বুঝলো না। মেয়েটা এমন আচরণ কেন করছে?

মেয়েটা মিনুর আঁচল টেনে ধরে চিৎকার করে অস্পষ্ট স্বরে বলতে শুরু করল,

"প্রজাপতি উড়ে গেছে। উড়ে গেছে। উড়ে কেন গেল মা? কেন গেল? নানু যাবো আমি। নানুর কাছে যাবো। নানু প্রজাপতি ধরে দেবে। নানু কোথায় আমার? আমি নানুর কাছে যাবো। প্রজাপতি ধরবো। প্রজাপতি! প্রজাপতি!"

কথাগুলো বলতে বলতে হেঁড়ে গলায় কান্না শুরু করল মেয়েটা। মিনু মেয়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,

"চুপ কর নিষ্পাপ। নানু আসবে তো। ঘুরতে গেছে নানু। কয়েকদিন পরেই চলে আসবে।"

জাহিদ বুঝল মেয়েটার নাম নিষ্পাপ। নিষ্পাপ তার মায়ের কথা বুঝল না। সে একইভাবে ছোট বাচ্চাদের মতো বায়না করতে শুরু করল। তার নানুকে চাই মানে চাই। সে নানুর কাছে। থাকবে না সে এখানে। তার নানু যেখানে গেছে সেও সেখানে যেতে চায়। মিনু কোনোভাবেই বোঝাতে পারে না নিষ্পাপকে। নিষ্পাপের চোখ এবার জাহিদের দিকে পড়ে। অচেনা একজনকে দেখে নিষ্পাপ আরো জোড়ে চিল্লিয়ে ওঠে। অদ্ভুত ভাবে তার হাতে কাঁপন শুরু হলো। চিল্লিয়ে সে বলতে শুরু করলো,

"আমাকে ধরে নিয়ে যাবে পঁচা লোক। আমাকে লুকিয়ে নাও মা। আমাকে লুকিয়ে নাও। পঁচা লোককে যেতে বলো। আমাকে মারবে। আমাকে লুকিয়ে রাখো।"

নিষ্পাপ তার মায়ের আঁচল টেনে নিজেকে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করল। মিনু অতিষ্ট হয়ে পড়ে নিষ্পাপকে নিয়ে।

জাহিদ একটু দূরে সরে কোমল স্বরে বলল,

"আমি তোমাকে মারব না নিষ্পাপ। তুমি ভয় পেয়ো না। আমি ভালো লোক। তোমাকে মারব না। তুমি চুপ করলে তোমাকে নানুর কাছে নিয়ে যাবো।"

নানুর কাছে নিয়ে যাবে শুনে নিষ্পাপ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। সে চুপ হলেও তার দৈহিক আচরণ থমকে থাকলো না।

হাতের অস্বাভাবিক আচরণ আর মুখভঙ্গি আগের মতোই রইলো। মেয়েকে চুপ করতে দেখে মিনু শান্তি পায়।

নিষ্পাপ আঁচল থেকে মুখ বের করে তার মাকে বলে,

"নানুর কাছে নিয়ে যাবে বলেছে মা। আমি যাই তাহলে? নানুকে নিয়ে চলে আসব কেমন?"

মেয়ের মুখে এমন সরল কথা শুনে মিনুর চোখ টলমল করে ওঠে। এখন যদি সে যেতে না করে তো চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। তার স্বামী নিষ্পাপের এমন আচরণ পছন্দ করেন না। এসে যদি নিষ্পাপকে এমন করতে দেখে তাহলে অনেক কথা শুনতে হবে তাকে।

জাহিদ মিনুর অবস্থা বুঝতে পেরে বলে,

"আমি বুঝিয়ে শান্ত করে দিয়ে যাবো। তুমি চিন্তা করো না। কয়েকটা চকলেট কিনে দিলেই দেখবে একদম শান্ত। নানির কথা আর মুখেও আনবে না।"

মিনু কপাল কুচকে নেয়। নিষ্পাপ পুনরায় চেচিয়ে বলে,

"আমাকে নিয়ে যাচ্ছে না কেন মা? নানুর কাছে নিয়ে যেতে বলো তারাতাড়ি।"

মিনু কিছু বলার আগেই নিষ্পাপ তার মায়ের আঁচল গা থেকে সরিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে জাহিদের হাত ধরে বলে,

"চলো তো ভালো লোক। জলদি চলো। নানু আমার জন্য কান্না করছে। নানু আসলে আমরা প্রজাপতি ধরবো।"

মিনু সাবধান করে জাহিদকে বলে,

"এতক্ষণে তো বুঝেই গেছো আমার মেয়েটা মানসিক প্রতিবন্ধী। বয়স ১৭ হলেও মনটা একদম বাচ্চাদের মতোই রয়ে গেছে। তারাতাড়ি নিয়ে এসো ওকে।"

জাহিদ সায় জানায়। তার এগিয়ে যাওয়া লাগে না। নিষ্পাপ ইতিমধ্যে হাত টেনে তাকে দরজার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটার মানসিক অবস্থা ঠিক থাকলে কি এভাবে অচেনা একজনের হাত ধরার সাহস পেত? নিষ্পাপের নাম টাও বোধয় তার এই নিষ্পাপ মনের জন্যই রাখা হয়েছে।

দেখলে মনে হয় বয়স পনেরো, ষোলো এমন। জাহিদের ঠোঁটের কিনারায় তার অজান্তেই হাসির দেখা মিললো।

নিষ্পাপ তার হাত টেনে নিয়ে যেতে ব্যস্ত। জাহিদ এবার নিষ্পাপের সাথে পা মিলিয়ে হাটতে শুরু করে।

নিষ্পাপকে নিয়ে জাহিদ প্রাইমারি স্কুলের পাশে থাকা খোলামেলা একটা মাঠে নিয়ে আসে। বিকেল বেলায় অনেক মানুষ এখানে এসে বসে। বড় বড় গাছ ও রয়েছে মনাুষকে ছায়া দেওয়ার জন্য। নিষ্পাপ মাঠের চারিপাশে চোখ বুলায়। সে তার নানুকে খুজতে ব্যস্ত।কোথায় তার নানু। এই লোকটা তাকে কোথায় নিয়ে আসলো। এখানে তো তার নানু নেই। নিষ্পাপ জাহিদের হাত ঝাকিয়ে বলে,

"আমার নানু কোথায়? কোথায় আমার নানু? আমাকে কোথয় নিয়ে এসেছো? এখানে আমার নানু নেই। পঁচা লোক মিথ্যা বলেছো তুমি আমায়। আমার নানু নেই তো এখানে! তুমি পঁচা লোক।"

জাহিদ নিষ্পাপের হাত নিজের হাত থেকে ছাড়াতে নিলে নিষ্পাপ আঁতকে উঠে বলে,

"হাত ছেড়ো না! হাত ছেড়ো না! আমি হারিয়ে যাবো। নানু বাহিরে আসলে আমার হাত ছাড়ে না। আমি হারিয়ে যাবো। তুমি আমায় ছেড়ো না।"

জাহিদের মায়া লাগলো খুব। মরে যাওয়া মানুষকে সে কোথায় পাবে এখন! জাহিদ নিষ্পাপকে একটা বেঞ্চ এ বসিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল জোর করে। নিষ্পাপ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলো হাত ছাড়িয়ে নেওয়ায়।

জাহিদ তাকে বোঝাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

"আমি থাকতে তুমি হারিয়ে যাবে কিভাবে বলো তো? আমি থাকতে তুমি কখনো হারাবেই না। আমি হাত না ধরলেও তোমার আশেপাশে আছি তো নাকি?"

নিষ্পাপ মাথা ঝাকালো। বোঝালো সে যে বুঝেছে।

জাহিদ এবার নিষ্পাপকে বলল,

"আসলে কি হয়েছে বলো তো। তুমি যখন ঘুমিয়েছিলে রাতে তখন তোমার ঘরে অনেক অন্ধকার ছিল। তখন তোমার নানু ভাবলো তুমি যদি ঘুম থেকে উঠে ঘরে অন্ধকার দেখো তাহলে তো ভীষণ ভয় পাবে। তুমি অন্ধকারে ভয় পাও তো বলো?"

নিষ্পাপ পুনরায় এক পাশে মাথা হেলিয়ে বলল,

"আমি ভয় পাই। খুব ভয় পাই অন্ধকার।"

জাহিদ মুচকি হেসে এবার বলল,

"তুমি ভয় পাও এটা তো তোমার নানু জানে তাই না?"

"জানে, জানে নানু। ভয় পাই। তুমি এসব বলছো কেন?"

"আমার কথা মন দিয়ে শোনো। তোমার নানু যখন দেখলো তুমি ঘুম থেকে উঠলে ঘর অন্ধকার দেখে ভয় পাবে। তখন তোমার নানু ম্যাজিক করে আকাশের তারা হয়ে গেল।

যখন তোমার নানুর কথা মনে পড়বে তখন তুমি আকাশে থাকা তারাগুলো দেখবে। আর ভাববে তোমার নানু তোমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিতে আকাশের তারা হয়ে গেছে। তোমার নানু সুপার ওমেন বুঝলে?"

নিষ্পাপ কান্না করে দিল। পুনরায় তার হাত কাঁপতে শুরু করল। সে কান্না করতে করতে বলল,

"তারা তো শুধু রাতে ওঠে। আমার নানুকে সবসময় চাই। সবসময় মানে সবসময়। শুধু রাতে কেন দেখবো নানুকে। আমার নানুকে এনে দাও। তুমি মিথ্যা বলেছো। আমার নানুর কাছে নিয়ে যাচ্ছো না কেন? আমিও আকাশে যাবো। আমাকে আকাশে পাঠিয়ে দাও।"

জাহিদ তব্দা খেল নিষ্পাপের কথা শুনে। এখন সে কিভাবে নিষ্পাপকে আকাশে পাঠাবে। এ কোন যন্ত্রণা।

জাহিদ তড়িঘড়ি করে বলল,

"তোমার নানু আমাকে চুপিচুপি আরও একটা কথা বলেছে। তুমি কান্না বন্ধ করলে তোমাকে বলবো।"

নিষ্পাপ অবুঝ নয়নে জাহিদের দিকে তাকালো। তার কান্না বন্ধ হয়েছে কিন্তু চোখ থেকে ঠিকই অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

জাহিদ এবার নিষ্পাপের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে তার পাশে বেঞ্চ এ বসল। নিষ্পাপ জাহিদকে তার নানু চুপিচুপি কি বলেছে শোনার আশায় চেয়ে থাকে। জাহিদ মুচকি হেসে নিষ্পাপকে বলে,

"তোমার নানু আমাকে বলেছে, রাতের আঁধারে তুমি যখন আকাশপানে চেয়ে থাকো তখন তোমাকে যাতে আরও বেশি বেশি সুন্দর দেখায় তাই তিনি শুধু রাতেই তোমাকে দেখা দিবেন। যদি তুমি তার জন্য কান্না করো তাহলে তিনি আর রাতেও আসবেন না তোমাকে আলোর দেখা দিতে।"

নিষ্পাপের মন আতংকে ছেয়ে গেল। সে আর কান্না করবে না। তার নানুকে প্রতিদিন রাতে সে দেখতে চায়। প্রতিদিন অপেক্ষা করবে সে তার নানুর জন্য।

জাহিদ নিষ্পাপকে নিয়ে দোকান থেকে কিছু চকলেট কিনে দেয়। ইতিমধ্যে অনেকেই আড়চোখে নিষ্পাপের দৈহিক আচরণ দেখে পাগল ও বলে ফেলেছে। কেউ বা কপাল কুচকে নিয়েছে। এত ভিড়ের মাঝে জাহিদ বোধহয় সেই মানুষটা যার কপাল কুঁচকালো না। আর না তো মুখ দিয়ে বেফাঁস কোনো কথা বের হলো নিষ্পাপের প্রতি।

বরং তার মুখ জুরে রয়েছে হাসির ফোয়ারা। যেন কি নিষ্পাপের সাথে ঘুরে সেও বেশ আনন্দিত।

নিষ্পাপ চারপাশে চোখ বুলিয়ে জাহিদের হাত আঁকড়ে ধরে। হয়তো সেও বুঝে গেছে জাহিদ তার জন্য একটা নিরাপদ জায়গার নাম।

জাহিদ নিষ্পাপকে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।

নিষ্পাপ তার চোখদুটো ছোট ছোট করে বারবার পিছু ফিরে জাহিদকে দেখছিলো। সে কথা মনে পড়তেই জাহিদ হেসে দিল। নিজের রুমে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। তার আজকে এত কেন ভালো লাগছে।

এমন অনুভূতি তো কখনো হয়নি। অবশেষে কি সে সত্যিই প্রেমে পড়ে গেল? নিষ্পাপ নামের একটা নিষ্পাপ মেয়ের প্রেমে? এত সুখানুভূতি তো এর আগে হয়নি।

কপলাে এত সুখ সইবে তো! নিষ্পাপ বড় হবে না?

সে কি এমন বাচ্চাদের মতোই থেকে যাবে? সে যাই হোক সে সব সামলে নিবে। নিষ্পাপকে সে ভালোবেসে ফেলেছে প্রথম দেখাতেই। বিছানায় কয়েকবার গড়াগড়ি খায় জাহিদ।

এই মেয়েটা এত কেন নিষ্পাপ! তার হৃদয় হরণ করে এখন এই মেয়ে বাচ্চা বের হলো। সমস্যা নেই। সে এমন পাগলামি সহ্য করতে পারবে। শুনেছে ভালোবাসলে নাকি ভালোবাসার মানুষটাকে অনেক কাঠখড় পুরিয়ে আগলে রাখতে হয়। সেও নাহয় আগলে রাখলো। হ্যা! সে ভালোবেসে ফেলেছে। স্নিগ্ধ দেখতে একটা নিষ্পাপ মেয়েকে সে ভালোবেসে ফেলেছে।

জাহিদ সিলিং এর দিকে তাকায়। মাথার উপরে থাকা ফ্যানটা পুরো দমে ঘুরছে। সাথে পাল্লা দিয়ে তার হৃদয়ের ধুকপুক শব্দটা পুরো দমে বেড়েই চলেছে।

নিষ্পাপ নামটার মতোই নিষ্পাপের ভাবনায় সে কাটিয়ে দিল কয়েক প্রহর।

হঠাৎ কান টেনে ধরে কেউ একজন। জাহিদ চিৎকার করে বলে,

"মা লাগছে ছাড়ো। সবসময় আমার এই সুন্দর কান টাই তুমি টেনে ধরো কেন বলো তো?"

রোকসানা বেগম হাতের চাপ বৃদ্ধি করে। জাহিদ ব্যাথাতুর শব্দ করে মায়ের হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।

রোকসানা কান ছেড়ে ধুপধাপ কয়েকটা পিঠে বসিয়ে দিয়ে বলে,

"এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি? একটু পরপর স্বপ্নের দেশে পারি না জমালে খুশি হবো। রাত কয়টা বাজে দেখেছো? কতবার ডাকলাম তোমাকে। সেই আওয়াজ কি তোমার কানে আসেনি? আমি হাঁপিয়ে উঠেছি তোমাকে নিয়ে। তোমার উগ্রপনা কখন ভালো হবে বলো তো?"

জাহিদ তার মাকে আলতো জড়িয়ে ধরে বলে,

"তোমার ছেলে সবসময় এমনি উগ্র থাকবে দেখে নিয়ো। সবাই ভালো হলে খারাপের কাতারে কে থাকবে তাহলে? আমি নাহয় খারাপের কাতারটা শূন্য হওয়া থেকে রক্ষা করলাম। তোমার ছেলে আমি। আমাকে নিয়ে গর্ব করবে বেশি বেশি করে।"

"হ্যা, তুমি খুব গর্বের কাজ করে বেড়াচ্ছো যে তাই তোমাকে নিয়ে গর্ব করব বেশি বেশি করে।"

জাহিদ সুর টেনে বলল,

"মা!"

"বেশি কথা বলবে না জাহিদ। খাবার বেড়ে রেখেছি। যাও গিয়ে খেয়ে নাও।"

জাহিদ হঠাৎ বলল,

"আচ্ছা মা! ঊনিশ বছর বয়সে কি ছেলেরা বিয়ে করে না?"

রোকসানার কপালে ভাজ পড়ে ছেলের কথা শুনে।

সে থমথমে গলায় বলে,

"কেন? তোমার কি বিয়ে করার শখ জেগেছে এই বয়সে?"

জাহিদ মুচকি হেসে লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলল,

"তুমি রাজি থাকলে আমিও শুভ কাজটা সেড়ে আসতাম। বিয়ে তো আজকে নাহয় কালকে করতেই হবে। আমি নাহয় আগেভাগে করলাম।"

"এইসব চিন্তা মাথা থেকে বের করো। শেষে দেখবে তোমার আর বিয়েই হলো না। তোমার মতো উগ্র ছেলেকে কোন মেয়ে পাত্তা দিবে?"

জাহিদ ভাব নিয়ে তার মায়ের সামনে এসে নিজের মুখে হাত তাক করে বলল,

"তোমার ছেলে এত সুন্দর যে সব মেয়েই পাগল হবে। আমি তোমার ভদ্র ছেলে না হলে এতদিনে বিশ ত্রিশটা গার্লফ্রেন্ড আমার পকেটে থাকতো।"

রোকসানা হেসে দিয়ে বললেন,

"আসছে আমার নায়ক পুত্র। আমি গেলাম। তুমি তারাতাড়ি খেয়ে নিয়ো।"

জাহিদ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ালো।

রোকসানা বেগম জাহিদের ঘর থেকে চলে যান। জাহিদ বেলকনিতে গিয়ে দাড়ায়। শহরটাকেও আজ তার বেশ লাগছে। গাড়ির শব্দও আজ আর তেমন কানে আসছে না।

হেঁড়ে গলার কান্নার আওয়াজটা বারবার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মেয়েটা কি মিষ্টি। এমন মিষ্টি মেয়ে সে দ্বিতীয় বার দেখলো তার মায়ের পরে।

------------------------------

"আজকে আমরা কোথায় যাবো বলোতো?"

জাহিদের কথায় নিষ্পাপ উত্তর করল না। এক পাশে হেলিয়ে রাখা মাথা অল্প ঝুঁকছে তার। এক হাত দিয়ে অপর হাতের আঙুলে ঘর্ষণ করে চলেছে একমনে।

জাহিদ অভ্যস্ত নিষ্পাপের এমন আচরণের সাথে।

সে পুনরায় বলল,

"আমরা আজকে এই রাস্তায় অনেকদূর পর্যন্ত হাঁটব। আর অনেক গল্প করবো কেমন?"

"নাহ! ঘুরবো নাহ। সবাই বকে আমাকে। আমি কথা বলব না কারো সাথে।"

অবুঝ নিষ্পাপের কথার বিপরীতে জাহিদ বলল,

"আমি বকা দেই তোমাকে? আমি তো বকা দেই না। কারো সাথে কথা বলার দরকার নেই। শুধু আমার সাথে কথা বলো কেমন?"

নিষ্পাপ মাথা দুদিকে কাত করে বলল,

"আমি তোমার সাথেও কথা বলব না। সবাই পঁচা।"

নিষ্পাপ মুখ গোমড়া করে রইলো। সে কখনো মাথা উঁচু করে কথা বলে না। সবসময় তার দৃষ্টি মাটিতে থাকে।

"চোখ তুলে তাকিয়ে দেখো নিষ্পাপ। আমি পঁচা লোক নই। তোমাকে কখনো বকেছি আমি?"

নিষ্পাপ এবারে চোখ তুলে জাহিদের দিকে তাকায় একঝলক। জাহিদের হৃদয় স্তব্ধ হলো সেই ডাগর চোখের দৃষ্টিতে। পুনরায় চোখ নামিয়ে নিয়ে এবারে নিষ্পাপ কান্না করতে করতে তার অস্বাভাবিক আচরণের সাথে হেঁড়ে গলায় বলল,

"আমাকে কেও ভালোবাসে না।"

জাহিদ মুচকি হাসলো। নিষ্পাপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

"আমি তোমাকে ভালোবাসিই আমার প্রিয়তমা।"

নিষ্পাপের কান্না থেমে গেল। সে অবুঝ স্বরে বলল,

"তুমি আমাকে ভালোবাসো?"

"হ্যা! বাসি তো।"

"প্রিয়তমা কি?"

"প্রিয়তমা হচ্ছে নিষ্পাপ। নিষ্পাপ মানেই প্রিয়তমা আর প্রিয়তমা মানেই নিষ্পাপ।"

নিষ্পাপ মাথা নাড়িয়ে বলল,"আচ্ছাহ।"

নিষ্পাপের সাথে কি কথা বলবে তা বুঝতে পারল না জাহিদ। সে যাই বলুক। নিষ্পাপ কিছুই বুঝবে না।

তারা হাটাহাটি করল কতক্ষণ। নিষ্পাপকে নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে এসে জাহিদ বলল,

"বাড়িতে যাও নিষ্পাপ। আর কান্নাকাটি চিৎকার করবে না কেমন?"

নিষ্পাপ আগের মতোই কোনো কথা না বলে মাথা ঝাকায়।

জাহিদ গেট ধাক্কা দিয়ে খুলে দেয়।

নিষ্পাপ যায় না। সে মাথা নিচু করে রেখেই জিগ্যেস করে,

"আমি কি পাগল?"

জাহিদ কপাল কুচকে নেয় নিষ্পাপের কথা শুনে। কে পাগল বলেছে তার প্রিয়তমাকে? কার এত সাহস?

সে নিষ্পাপকে কোমল সুরে বলে,

"নাহ তুমি হলে স্নিগ্ধ কোমল নিষ্পাপ। যারা বলে পাগল, আসলে তারা নিজেরাই পাগল। নিজেদের তো আর পাগল বলে স্বীকার করবে না। তাই তোমাকে বলেছে।"

নিষ্পাপ শব্দ করে হাসলো এবারে মুখ তুলে। তার হাসির ঝংকার জাহিদের কানে শ্রুতিমধুর শোনালো।

নিষ্পাপ হাসতে হাসতে তার বাড়িতে চলে গেল দৌড়ে। জাহিদ কিছুক্ষণ সেখানেই দাড়িয়ে থাকলো।

ইদানীং তার মুখ থেকে হাসি সরছেই না। দিনগুলো খুব ভালো যাচ্ছে। সে আর দাড়ায় না সেখানে। তার বাড়িতে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই ধরণী আঁধারে ছেয়ে যাবে।

নিষ্পাপ দৌড়ে তার জন্য বরাদ্দ করা রুমে চলে আসে। সে অপেক্ষা করে আধার নেমে আকাশে তারাদের মেলা দেখার। বসে থাকলো সে জানালার কাছ ঘেঁষে।

আকাশ আঁধারে ছেয়ে গেল। কিন্তু তারাদের মেলা বসল না। আজ আকাশে তারা রা মেলা বসায়নি। নিষ্পাপ ঠোঁট উল্টায়। চোখ টলমল করে ওঠে।

তার নানু কেন এখনো দেখা দিচ্ছে না। সে কি জানে না ধরণীর বুকে আধার নেমেছে? নিষ্পাপ অপেক্ষা করছে যে! তার নানু ছাড়া আর কেও যে বোঝে না তাকে। আর না তো কেও ভালোবেসে বুকে আগলে নেয়। এই বাড়িতে আরও দুজন মেয়ে আছে। তারা সবসময় তাকে পাগল বলে।

নিষ্পাপের চোখ তখন অশ্রুতে ভরে ওঠে।

চিৎকার করে সে তখন কান্না করে। এতে করে তারা আরও রাগারাগি করে। সৎ বাবা নামক লোকটা তাকে একদিন থাপ্পড় ও মেরেছে তার হাতের অস্বাভাবিক কাঁপনের জন্য। মাথা সবসময় কেন এক পাশে হেলে থাকে এটা বলেই লোকটা তার মাথা চেপে ধরে সোজা করার চেষ্টা করেছে। অনেক ব্যথা পেয়েছে নিষ্পাপ।

নিষ্পাপ কান্না করেছে খুব। কেও তাকে ভালোবাসে না। তার নানু তাকে ভালোবেসে আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে। সেও ওই দূর আকাশের তারা হতে চায়।

তার নানুর পাশাপাশি থেকে ধরণীতে থাকা অন্য কোনো নিষ্পাপকে আলো দিতে চায়।

বোকা নিষ্পাপ ভাবে রাতার আঁধারকে একটু আলো দিতেই তারাদের আকাশে আগমন ঘটে।

জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বসে নিষ্পাপ।

কাঁপা কাঁপা হাতে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে নেয়।

মিনু ঘরে এসে নিষ্পাপকে খেতে নিয়ে যায়। বাড়ির সকলের খাওয়া দাওয়া শেষ। নিষ্পাপ বাকি রয়েছে।

মেয়েটা তেমন খেতে চায় না।

নিষ্পাপকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে মিনু খাবারের প্লেট এগিয়ে দেয় নিষ্পাপের দিকে। নিষ্পাপ প্লেটের দিকে একপলক তাকিয়ে তার মাকে বলে,

"ডিম খাব না মা। ডিম খাব না। সড়াও এটা।"

মিনু কপাল কুচকে নেয়। গম্ভীর কন্ঠে সে নিষ্পাপকে বলে,

"চুপচাপ খেয়ে নাও নিষ্পাপ। বাহানা করবে না একদম।"

নিষ্পাপ তার কম্পন কৃত হাত দিয়ে ভাতের প্লেট দূরে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। সে খাবে না। সে যে ডিম খায় না এটা কি তার মা জানে না? তবুও কেন যে খেতে বলছে এটা নিষ্পাপ বুঝল না। সে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে।

মিনু নিষ্পাপের হাত টেনে ধরে বলে,

"এখানে বসো জলদি নিষ্পাপ। দিনদিন তুমি বেয়াদব হচ্ছো। কথা শুনবে আমার।"

নিষ্পাপ এবারে চিৎকার করে উঠলো। তার দৈহিক আচরণে অস্বাভাবিকতা বৃদ্ধি পেল। সে তার অপর হাত দিয়ে মিনুর হাত ছাড়াতে চাইল।

চিৎকার করে বলল,

"পঁচা মা ছাড়ো বলছি। হাতে ব্যাথা পাই। খাবো না আমি। কথাও বলব না তোমাদের সাথে। নানুর কাছে যাবো।"

নিষ্পাপ করুণ সুরে ডাকলো,

"নানু!"

তার চিৎকার শুনে ঘর থেকে মিনুর স্বামী আজিজ বের হয়ে আসে। সে চিৎকার করে বলে,

"নাটক শুরু হয়েছে বাড়িটায়। এত চিৎকার কেন করছিস? আমার কানে যেন আর একটা শব্দ না আসে।"

আজিজের চিৎকার শুনে নিষ্পাপ ভয় পেয়ে কান্না শুরু করে। আজিজের মেজাজ বিগড়ে যায় নিষ্পাপের কান্নার শব্দ শুনে। সে মিনুর হাত থেকে নিষ্পাপকে ছাড়িয়ে থাপ্পড় মেরে বসে নিষ্পাপের কোমল গালটায়।

নিষ্পাপ আতংকে আর গালের ব্যাথায় চিৎকার করে কান্না শুরু করে। কি করুণ তার সেই কান্নার আওয়াজ পাষাণ আজিজের মন গলাতে সক্ষম হলো না।

নিষ্পাপকে কান্না করতে দেখে সে পুনরায় থাপ্পড় মারতে গেলে মিনু তার হাত ধরে আটকায়। মিনুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় আজিজ। নিষ্পাপের প্রতি তার রাগ তরতর করে বৃদ্ধি পায়। নিষ্পাপ আরও বেশি ভয় পায়।

তার পুরো শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে শুরু করে। তার হাতের অস্বাভাবিক আচরণ আর মাথা ঝুঁকানো বৃদ্ধি পায়। নিষ্পাপ চিৎকার করে বলে,

"তোমরা পঁচা। ব্যাথা পাই। ব্যাথা পাই আমি। তোমরা পঁচা। আমাকে ব্যাথা দাও। ভালোবাসো না আমায়। থাকবো না আমি তোমাদের সাথে। কথাও বলবো না। নানুর কাছে যাবো। পঁচা মা। পঁচা বাবা।"

নিষ্পাপের মুখে আজিজের জন্য পঁচা বললেও বাবা ডাক শুনে সে শান্ত হলো। নিষ্পাপ থামলো না।

তার অবুঝ মন এখন একটা জিনিসই বুঝতে পারছে। এই বাড়িতে থাকা কেও ভালো না। কেও তাকে ভালোবাসে না। সে থাকবে না কারোও সাথে। কারো সাথে কথা বলবে না সে। কেও ডাকলেও সে আর সাড়া দিবে না।

নিষ্পাপ দৌড় দিল। তাকে দৌড়ে ছাদের দিকে যেতে দেখে আজিজ আর মিনু ভড়কে গেল।

নিষ্পাপ বড় বড় পা ফেলে দৌড়ে ছাদে যায়। সে টিভিতে দেখেছে। ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লে কেও ডাকলেও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া ব্যক্তির থেকে আর কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। সেও আর কথা বলবে না। কেও ডাকলেও শুনবে না, সাড়া দিবে না।

সবাই তাকে ব্যাথা দেয়। তাকে কষ্ট দেয়। যারা তাকে ভালোবাসে না সে তাদের সাথে থাকবে না। দূরে চলে যাবে সে। অনেক দূরে।

নিষ্পাপ ছাদের কিনারায় চলে আসে।

জাহিদ বেলকনিতে দাড়িয়ে ছিল। নিষ্পাপকে ছাদে দেখে সে ডাক দেয়। নিষ্পাপের কানে তার ডাক গেল না।

আকাশ ফেড়ে বৃষ্টি শুরু হলো। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা নিষ্পাপকে ভিজিয়ে দিল নিমিষেই। চোখের পলকে জাহিদ দেখতে পেল নিষ্পাপ ঝাপিয়ে পড়েছে ছাদ থেকে।

তার হৃদয় থমকে গেল। ভয়ে আতংকে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।

যখন বুঝতে পারলো কি হয়েছে তার সামনে।

সে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো। বৃষ্টির ফোটা তার অঙ্গ ভিজিয়ে দিল।

ভাগ্যিস বাড়ির গেট এখনো লাগাইনি।

জাহিদ প্রাণপণে ছুটে নিষ্পাপের ঝাপিয়ে পড়া জায়গায় এসে থমকে গেল। তার পা জোড়া আসার হয়ে আসলো।

আর আগানোর মতো ক্ষমতা তার পা জোড়ায় নেই।

মিনু মেয়ের মাথা কোলে তুলে নিয়ে ডাকে। উহু! আর কোনো সাড়াশব্দ আসে না। নিচে সাজিয়ে রাখা ইটের উপর এসে পড়েছিল মাথাটা। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে নিমিষেই।

নিষ্পাপের দেহে তখনও প্রাণ আছে। জাহিদের দিকে তার মুখটা ছিল। সে অস্ফুটস্বরে বলল,

"পঁচা! সবাই পঁচা। কেও ভালোবাসে না।"

জাহিদের কানে গেল সে কথা। সে ডুকরে কেঁদে উঠে চিৎকার করে বলল,

"আমি তোমাকে সবসময় ভালোবেসেছি আমার প্রিয়তমা।"

চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,,,

দুঃখিত, এডিট করতে দেরি হয়ে গেল। যারা পড়েন তারা দয়া করে একটু রেসপন্স করবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন