#যতনে_রাখিব_তারে
#পর্ব_৩১
#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী
(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
তাহসিনের অবস্থা পাগলপ্রায়। সে উদ্ভ্রান্তের মতো পুরো ক্যাম্পাস তল্লাশি করেও মেহরিমাকে খুঁজে পায়নি। কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তারা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেও মেহরিমার কোনো হদিস পায়নি। এমনকি সে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিল, তারও কোনো প্রমাণ ফুটেজে পাওয়া যায়নি। উপায়ান্তর না দেখে তারা দ্রুত পুলিশকে জানাতে বলেন। তাহসিনের হাত পা জমে আসে। হৃদয়ে কম্পন শুরু হয় ভয়ে। দেহে যেন আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই চলার। কোথায় গেল তার মেহরিমা। ইতিমধ্যে চৌধুরী বাড়ির সকলে সে খবর জেনে গেছে তার মাধ্যমে।
তারা কেও জানে না মেহরিমার খবর। সাজিদ চৌধুরী ইতিমধ্যে বড় ভাই নাহিদ চৌধুরীকে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। চিন্তায় তাদের প্রেশার হাই হওয়ার যোগার।
তাহসিন নিজেও আর সময় নষ্ট না করে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বের হয়। শার্টের হাতা দিয়ে অতি সন্তর্পণে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে নেয়।
মেহরিমা ঠিকই বলে, সে যে একটা ছিচকাঁদুনে আজকে নিজেও সেটা সে টের পাচ্ছে। চোখ থেকে অশ্রু পড়ছে তো পড়ছেই। পুনরায় চোখ মুছে তাহসিন রাস্তায় এসে দাড়ায়।
তখন তার কাঁধে হাত রেখে একজন বলে,
"তাহসিন না? রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিস কেন ব্রো? সত্যি সত্যি বউ চলে গেল নাকি? এখন আবার বলিস না কথাখানি মোর সত্যি।"
ক্লাসমেট তৈমুরকে এসময় দেখে তাহসিন কিছুটা অবাক হয়।
এই ছেলে দেখলো কীভাবে সে যে কেঁদেছে।
তার কপালের চামড়া কুচকে আসে। তৈমুরের সাথে তার ভালো সম্পর্ক না বললেই চলে। সাপে নেউলে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাদের। অকারণেই বনাবনি হয় না। এই ছেলের কোন বোন যেন তাকে পছন্দ করে। সেই কথা আগেপিছে ঘুরেঘুরে তাহসিনকে বলত। তাহসিন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল সে যে বিবাহিত। এই ছেলের সাথে এই বিষয়ে তার ঝগড়াও হয়েছে। তৈমুর তাকে অভিশাপ দিয়ে বলেছে তার বউ থাকবে না। এ কথা মাথাতে আসতেই তাহসিনের রাগ তরতর করে বাড়লো। সে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে তৈমুরের শার্টের কলার চেপে ধরে বলল,
"তুই অভিশাপ দিয়েছিলি তাই না? আমার বউ চলে যাবে আমার থেকে এই অভিশাপই তো দিয়েছিলি। কেন এমন অভিশাপ দিয়েছিলি বল? তোর কোনো ক্ষতি করেছিলাম? আমাদের শান্তি কেন তোদের সহ্য হয় না? দেখ আজকে সত্যি আমার বউ হাড়িয়ে গেছে। আমি খুজে পাচ্ছি না তাকে।"
তৈমুর তাহসিনের হাত সড়িয়ে দেয় তার শার্টের কলার থেকে। তাহসিন কি বলছে তার আগামাথা না বুঝতে পেরে তারও রাগ হয় বেশ। চিল্লাপাল্লা করা তার ধাতে নেই। তাই সে শান্ত ভবেই বলে,
"কি বলছিস তুই? পাগল হয়ে গেছিস? আমি ওসব মজা করে বলেছিলাম। আমি অকারণে তোকে কেন অভিশাপ দিতে যাবো? দেখ ব্রো! তুই বয়সে বড় জন্য তোর কলার ধরলাম নাহ। কি হয়েছে সেটা তো বল? পাগলের মতো রাস্তায় কান্না করছিস কেন? মানুষ দেখবে তো!"
তাহসিন শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে। খুব বেশি লাভ হলো না। তার চোখের অশ্রু বাঁধ মানছে না।
তৈমুর তাহসিনের কাঁধে হাত রাখলে তাহসিন আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বলে,
"আমার বউকে দেখেছিস? খুজে পাচ্ছি না তাকে। দয়া করে তাকে এনে দে। তার কিছু হলে মরণ হবে আমার।
তোর অভিশাপেই এমনটা হয়েছে রে।"
তৈমুর কি বলবে বুঝতে পারল না। তার মুখের জবান সত্যি হবে জানলে তখন কি এই জবান মুখ দিয়ে বের হতো? উহু! কখনোই না। সে এতটাও খারাপ নয় যে কোনো মানুষকে ইচ্ছাকৃত অভিশাপ দিবে জেনেশুনে।
তাহসিন তার কাঁধ থেকে তৈমুরের হাত সরিয়ে দিয়ে গাড়ি খুজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সময় নেই। থানায় যেতে হবে জলদি। তৈমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের বাইকটা নিয়ে তাহসিনের সামনে এসে বলে,
"তারাতাড়ি ওঠে বোস ব্রো। কোথায় যাবি বল? বিদ্যুতের গতিতে নিয়ে যাবো সেখানে।"
তাহসিন মাথা নাড়িয়ে বলে,
"প্রয়োজন নেই। তোর রাস্তায় তুই যা।"
"ওমা! এখনি না বললি আমার জন্য এমনটা হয়েছে? তো আমার দায়িত্ব আছে তো নাকি? চল তোর বউ আর আমার ভাবিকে একসাথে চিরুনি তল্লাশি করে খুজে বের করি।"
তাহসিন তবুও তার কথায় অনড় থাকলে তৈমুর বলে,
"ছোট ভাই মনে করে আয়। বিশ্বাস করতে পারিস। যতটা খারাপ ভাবিস ততটাও নই।"
তাহসিন তবুও ভরসা পেল না। সে তো তৈমুরকে ভালোভাবে চেনেও না। তার মন টানলো না তৈমুরের সাহায্য নিতে। তবুও ছেলেটা এমন করে বলায় আর নাও করতে পারল না।
তৈমুরের পিছনে উঠে বসলে তৈমুর মুচকি হেসে বলে,
"কোথায় যাবি বল? যেথায় বলবি সেথায় তোকে আলাদীনের জিনের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাবো। নো চিন্তা ব্রো।"
"থানায় নিয়ে চল জলদি। জিটি করতে হবে।"
তৈমুর আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষায় না থেকে ঝড়ের গতিতে বাইক স্টার্ট দিল। যেটাকে তার ভাষায় বলে,
আমি জিন হয়ে তোকে জাদুর চাদরে উড়িয়ে নিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌছালাম।
তাহসিন ভয় পেয়ে যায় এভাবে উচ্চ গতিতে বাইক চালানোয়। তৈমুর তার পকেট থেকে সেন্টারফ্রুট বের করে তাহসিনের দিকে এগিয়ে দিলে তাহসিন নেয় না।
তাহসিনের মন চাইলো তৈমুরকে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মারতে। সে আছে দুঃশ্চিন্তায়। আর তৈমুর তাকে সেন্টারফ্রুট অফার করছে।
কপাল কুচকে তাহসিন বসে থাকে ঝিম মেরে। এখন কান্না পাওয়ার বদলে তার রাগ হচ্ছে। মেহরিমাকে পেলে সে এবার সত্যি একটা থাপ্পড় মারবে কষিয়ে। যা সে জীবনে করেনি। তার হাত নিশপিশ করছে। চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার যোগাড়। মেহরিমা তো কখনো এমন করে না। কোনো বিপদ না হলে এমনটা করার কথাও না। শতবার কল দিলেও মেহরিমার ফোন বন্ধ। সে মুহুর্তে ফোন যে বন্ধ এ কথা যে নারী কন্ঠের মালিক বলছিলো, মন চাচ্ছিলো তাকেই তুলে আছাড় মারতে। তাহলে মনটা বড্ড শান্তি পেত। ধুপ করে তার মাথায় কিলবিল করে কিছু কথার আগমন ঘটলো। সঙ্গে সঙ্গে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো। সঙ্গে ভয় টা আরও বেশি করে দানা বেঁধে হামলা করলো মস্তিষ্কে। তাহসিন দোয়া করতে থাকলো। তার বোকা বউটাকে আল্লাহ যেন যে কোনো কিছুর বিনিময়ে রক্ষা করে। সরল মেহরিমাকে আল্লাহ যেন সব বিপদের মোকাবিলা করার ক্ষমতা দান করে। তাহসিন ফোন বের করে রুহির নাম্বার চেক করলো আছে কিনা। নাম্বার সেভ করা আছে দেখে মনটা একটু শান্ত হলো। রুহির নাম্বারে কল দিলে রুহি কিছুক্ষণের মাঝে কল রিসিভ করে।
তাহসিন তার সাথে কথা বলে আরও বিস্তারিত জানতে পারে। রুহি আজকে ভার্সিটিতে যায়নি। সেও বেশ ফ্যাসাদেই ছিল এতদিন। প্রতিদিন নাওয়াফের হয়ে রাইদ আর ইহসান মেহরিমার খবরাখবর জানার জন্য তাকে প্রচন্ড বিরক্ত করতো। রুহি বিরক্ত হয়েই আজকে ভার্সিটিতে যায়নি। মেহরিমা যে আজকে ভার্সিটিতে যাবে তাও সে জানতো না। মেহরিমাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে সেও বেশ চিন্তিত হলো। যা যা ঘটেছে আর যা কিছু সে জানে সেইসব কথা তাহসিনের কাছে উগলে দিল।
তাহসিনের মেজাজ এখন প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। নাওয়াফ যদি তার সামনে থাকতো তাহলে সে নির্ঘাত তাকে খু*ন করে বসতো।
ততক্ষণে তৈমুর পুলিশ স্টেশনে চলে এসেছে।
বাইক থামতেই তাহসিন নেমে পড়ে। সামনেই সাজিদ আর নাহিদ চৌধুরী তার অপেক্ষাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সাজিদ চৌধুরী তাহসিনকে দেখতেই তার কাছে এসে কোনো কিছু বোঝার আগেই তাহসিনকে থাপ্পড় মেরে বসে।
তাহসিন হতবাক হয়ে যায়। সাজিদ চৌধুরী রক্তাভ চোখে তাহসিনকে বলে,
"তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমার মেয়েটাকে। আর এই তোমার দায়িত্বের নমুনা তাহসিন? ঠিকমতো আমার মেয়েটার খেয়াল পর্যন্ত রাখতে পারলে না?"
তাহসিনকে থাপ্পড় মারতে দেখে তৈমুরের কপালে ভাজ পড়ে। পারিবারিক ঝামেলায় সে যদিও কথা বলতে চায় না। তবে সে যেহেতু একবার বলেছে সে তাহসিনের ছোট ভাইয়ের মতো। তাই তার মনে হলো বড় ভাইয়ের হয়ে কিছু তো বলা যায়ই। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
"এই যে আঙ্কেল? বিপদ বলে কয়ে আসে না ওকে? ব্রো আপনার মেয়েকে নুনের মতো ভালোবাসে। তাই তার দায়িত্ব নিয়ে ছোট করে কথা বলবেন না।"
সাজিদ চৌধুরী কিছু বলবেন তার আগে নাহিদ চৌধুরী তাদের নাটক করতে নিষেধ করে তাহসিনকে সঙ্গে করে থানার ভেতরে ঢুকলেন। তৈমুর ভেংচি কেটে নিজেও তাদের পিছু নেয়। সাজিদ চৌধুরী হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে।
একবার শুধু তিনি তার মেয়েকে পেয়ে যাক। মেয়েটাকে নিজের কাছে রেখে তাহসিনকে হয়রানি করে ছাড়বেন মেয়েকে না দিয়ে।
তৈমুর তাহসিনের কাছে এগিয়ে এসে তাকে ফিসফিস করে
বলল,
"ব্রো মন খারাপ করিস না। তোর শ্বশুরটা মনে হয় পাবনা ফেরত রোগী। একবার শুধু ভাবিকে পেয়ে যা। তারপর তোর শ্বশুরকে তার মেয়ের সাথে দেখা করতে দিবি না। তখন বুঝবে কেমন লাগে।"
তাহসিন কটমট দৃষ্টি ফেলে বলল,
"পাগলের প্রলাপ পারিস না আমার সামনে। চুপচাপ থাক আর নাহয় ভাগ।"
তাহসিন চাইলেই সাজিদ চৌধুরীকে কিছু বলতে পারতো। তবে তারও মনে হানা দিল একই কথা। সে আসলেই মেহরিমার খেয়াল রাখতে পারেনি।
চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,,,,,,,,,,,,