ফন্ট সাইজ:
থিম:
যতনে রাখিব তারে

৪০তম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া জান্নাত সুমী

#যতনে_রাখিব_তারে

#পর্ব_৪০

#লেখনিতে_সুরাইয়া_জান্নাত_সুমী

পাঁচ বছর পরে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

"পাপা! পাপা! তুমি এভাবে তাকাচ্ছো কেন? মনে হচ্ছে তুমি শার্ক, আমাকে ঢিশ মারবা।"

মেয়ের মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে তাহসিনের ভ্রু কুচকে আসে। সে বসে বই পড়ছিলো। বারণ করা স্বত্তেও মৃদুলা বারবার তার আশেপাশে ঘুরঘুর করছিলো আর নিজের সাথে নিজেই বকবক করছিল, ছড়া বলছিলো। তাহসিন চোখ গরম তাকালে মৃদুলা উক্ত কথাগুলো বলে। তাহসিন তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে কুঁচকানো ভ্রু জোরা শিথিল করে নিল।

মেহরিমা মেয়ের কথা শুনে শব্দ করে হেসে বলল,

"তোমার পাপা শার্ক নয় মাম্মা। সে আস্ত এক ডায়নোসর। আমাদের গিলে খাওয়ার জন্য ওভাবে তাকায়। তুমি আমার কাছে এসো।"

মেহরিমার দিকে তাকিয়ে তাহসিন গম্ভীর স্বরে বলল,

"মেহরিমা! মেয়ের সামনে এগুলো বলবে না। তুমিও দিনদিন বাচ্চা হয়ে যাচ্ছো।"

মেহরিমা তার জায়গা থেকে উঠে তাহসিনের পায়ের কাছে এসে বসে। তার দিকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে মায়া ভরা কন্ঠে বলে উঠল,

"আপনি এতটা মনভুলো কবে হলেন?"

"কি ভুললাম আবার?"

"আমি তো আপনার বাচ্চা বউ-ই। আপনার থেকে গুনে গুনে পাঁচ বছরের ছোট।"

তাহসিন তার বউয়ের কথা শুনে মুচকি হাসলো। মৃদুলা মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে থেকে তার বাবা মার কান্ড দেখছে।

সে তার মায়ের কাছে এসে তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাবুক স্বরে বলল,

"মাম্মা! ডাইনোসর তো খুব ছোট। আমাদের গিলতে পারবে না। তাহলে তুমি কেন বললে, পাপা ডাইনোসর আমাদের গিলে ফেলবে?"

মেহরিমা মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। বলে,

"ডাইনোসর ছোট তোমাকে কে বলল? ডাইনোসর তো অনেক বড়।"

"উহু, ওগুলা মিথ্যা কথা। দাঁড়াও আমি তোমাকে ডাইনোসর দেখাচ্ছি।"

মৃদুলা মায়ের কোল থেকে নেমে বিছানার নিচ থেকে একটা বোতল বের করে নিয়ে আসে। বোতলে থাকা প্রাণীটাকে দেখে মেহরিমা আঁতকে উঠে বলে,

"মাম্মা তুমি টিকটিকি বোতলে ভরে রেখেছো কেন?"

মৃদুলা তার কথার উত্তর না দিয়ে বোতল থেকে টিকটিকি টাকে বের করে হাতে আলতো চেপে ধরে। টিকটিকির জান যায় যায় অবস্থা। মৃদুলাকে টিকটিকি হাতে নিজের দিকে আসতে দেখে মেহরিমা লাফ দিয়ে সেখান থেকে উঠে বিছানার এক কোনায় চলে যায়। মৃদুলা মা কে ভয় পেতে দেখে অবাক হয়। সে আর মেহরিমার কাছে না গিয়ে তাহসিনের সামনে গিয়ে তাকে টিকটিকি টা দেখিয়ে বলে,

"এই দেখো বাবা ডাইনোসর। কত্তো ছোট তাই না? মাম্মা দেখছি কিছুই জানে না।"

তাহসিন হা করে বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে কপালে হাত ঠেকায়। তার মেয়ে টিকটিকি ধরে বোতলে ঢুকিয়ে রেখেছে। এখন কি গর্বে গর্বিত হওয়া উচিত তার? মা যেখানে তেলাপোকা দেখে না পারে দৌড়ে পালাতে সেখানে মেয়েটা তার সবকিছু হাত দিয়ে ধরে দেখায়। আর বলে, দেখো পাপা এটা কত্তো সুন্দর।

তাহসিন মেয়ের হাত থেকে টিকটিকি টাকে ফেলে দিতে চায়। মৃদুলা চিৎকার করে বলে,

"আমার টিক্কা খানকে নিয়ো না পাপা। ও কান্না করবে আমার থেকে ওকে দূরে সরালে।"

তাহসিন মেয়ের হাতের মুঠো থেকে টিকটিকি টাকে ছাড়াতে নিয়েছিল। মেয়ের এমন কথা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। বলে,

"টিক্কা খান? ওরে আল্লাহ! আমি এদের নিয়ে কোথায় যাবো! টিকটিকির নাম রেখে দিয়েছে টিক্কা খান। এগুলা এভাবে ধরতে হয় না আম্মু। ফেলে দাও।"

কে শোনে কার কথা! বাবা তরা টিক্কা খানকে ফেলে দিবে ভেবে মৃদুলা আরও জোরে চেপে ধরে টিকটিকি টাকে। ওমনি মৃদুলার টিক্কা খান ভর্তা হয়ে যায় তার হাতের মুঠোতেই। হাতের মুঠোতে ভেজা ভাব অনুভব করে মৃদুলা হাতের মুঠো খুললে দেখতে পায়, তার টিক্কা খান অক্কা পেয়েছে। মৃদুলা চোখের কোনায় খানিক অশ্রু জমে। সে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে সেটা দেখাতে তার মায়ের কাছে যেতে শুরু করে। মৃদুলার হাতে অর্ধেক ভর্তা হয়ে যাওয়া টিকটিকি দেখে ঘৃণায় মেহরিমার গা গুলিয়ে ওঠে। সে বিছানা থেকে নেমে তাহসিনের পেছনে গিয়ে জায়গা নেয়।

মাকে পালাতে দেখে মৃদুলা এবার তার বাবাকে কান্না মিশ্রিত গলায় বলে,

"পাপা? আমার টিক্কা খান তো ভর্তা হয়ে মরে গেল!"

মৃদুলা চিৎকার করে কান্না করতে শুরু করল। তাহসিন উঠে টিস্যু নিয়ে মৃদুলার হাত থেকে টিকটিকি টা নিয়ে নিল। সেটাকে ফেলে দিতে যাবে ওমনি মৃদুলা তার পিছু পিছু এসে কান্না করতে করতে বলল,

"আমার টিক্কা খানকে কবর দিতে হবে পাপা। জানাযা করে কবর দিতে হবে।"

তাহসিন এবারে সত্যি সত্যি মাথা চাপরালো হাত মুঠো করে। তার তো মন চাচ্ছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে। এবার যদি সে টিকটিকির জানাযা না করে ফেলে দেয় তো তার মেয়ে কান্না কান্না করতে করতে আর চিৎকার করে তাকে স্টোক করতে বাধ্য করবে। তারপর টিকটিকির বদলে তার জানাযায় মানুষ অংশগ্রহণ করবে। সে অসহায় গলায় মেহরিমাকে বলল,

"চলো বউ, টিক্কা খানের জানাযায় সামিল হবে।"

"ইয়াক! ওটাকে ফেলে দিন জলদি। কি বিশ্রী অবস্থা ওটার।"

মৃদুলা মায়ের কথা শুনে চিৎকার করে বলে,

"একদম ফেলবে না পাপা। আমরা জানাযা পড়ে কবর দিবো টিক্কা খানকে।"

মেহরিমা এবার ধৈর্য্য হারায়। মৃদুলাকে জোর করে কোলে করে নিয়ে যায় ওয়াশরুমে। ভালো করে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ডলে ডলে হাত ধুঁয়ে দেয়। মৃদুলা অনবরত শব্দ করে কান্না বহমান রেখেছে এখনো। মৃদুলাকে নিয়ে মেহরিমা বের হয়ে দেখে মরা টিকটিকি টা নিয়ে তাহসিন এখনো দাঁড়িয়ে আছে। মৃদুলা তার মায়ের কোল থেকে নেমে বাবার কাছে গিয়ে হাত পেতে দেয় কোলে নেওয়ার জন্য। তাহসিন মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। মৃদুলা আবারও বলে,

"চলো পাপা চলো, আমরা এখন টিক্কা খানকে কবর দিবো।"

তাহসিন মাথা নাড়িয়ে মেয়েকে নিয়ে বেলকনিতে চলে যায়।ফুলের টবের সামনে বাবা মেয়ে দু'জনে বসে। তাহসিন মেহরিমাকে একটা কিছু নিয়ে আসতে বলল। মেহরিমা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে একটা ছুরি নিয়ে এসে তাহসিনের হাতে ধরিয়ে দিল। সে বাবা মেয়ের মাঝে থাকল না। নাকমুখ কুঁচকে সে সেখান থেকে প্রস্থান করল।

তাহসিন ফুলের টব থেকে খানিক মাটি তুলে গর্ত করে সেখানে টিকটিকি টাকে রেখে দেয়। মৃদুলা নিজের মাটি তুলে টিকটিক টা কবর দিল মাটিচাপা দিয়ে। তারপর দু'হাত তুলে মোনাজাতের ভঙ্গিমা করে কি যেন ফিসফিস করল। তারপর মুখে হাত ছুইয়ে বলল,

"আমিন, আমিন।"

তাহসিন হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না।

মৃদুলা এবার খুশিমনে বাবাকে বলল,

"পাপা, পাপা! এরপর আমি আরো একটা টিক্কা খান ধরবো কেমন?"

তাহসিন মৃদুলাকে কোলে তুলে নিল। তাকে বোঝাতে বোঝাতে রুমে নিয়ে আসল। এসব প্রাণী হাত দিয়ে সে যেন আর না ধরে। মৃদুলা এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে তা বের করে দিল। সে এমনিতেই প্রচুর দুঃখ পেয়েছে। তার শখের টিক্কা খান অক্কা পেয়েছে কিনা!

তাহসিন মেয়ের চোখমুখ মুছে দিল। মাথার কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে থাকতে দেখে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে সুন্দর করে দুই ঝুঁটি করে দিল। মৃদুলা এখন ঘুমে টলছে। টিক্কা খানকে নিয়ে কাহিনি করতে করতে এখন সে ক্লান্ত। সে ঘুমু ঘুমু চোখে বাবার দিকে তাকালো। তাহসিন মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থকলে মৃদুলা বাবার কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। কিছু খাওয়ার মতো চুকচুক শব্দ করে সে বিরবির করে বলল,

"মৃদুলা লাভস ইউ সো মাচ, পাপা।"

মৃদুলা পুরোপুরি ঘুমে কাতর হয়ে গেলে তাহসিন তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। মেহরিমা দেয়ালে হেলান দিয়ে বাবা মেয়েকে চোখ ভরে দেখছে। এইতো তার সুখের সংসার।

তাহসিন হাত দিয়ে ইশারা করে মেহরিমাকে ডাকল। মেহরিমা ছুটে এসে তাহসিনের পিছনে এসে শুয়ে পড়ল। তাহসিনকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"মৃদুলা'স মাম্মা অলসো লাভস ইউ সো মাচ।"

তাহসিন মেয়েকে ছেড়ে মেহরিমার দিকে কাত হয়ে শোয়। স্ত্রীর ললাটে অধর ছুঁইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম যত্নে। সে নিজেও বলল,

"মৃদুলা'স পাপা অলসো লাভস হার মাম্মা সো মাচ।"

মেহরিমা তাহসিনের বুকে নাক ডলে বলল,

"আপনি তো এখন আমাকে চোখেই দেখেন না। সারাক্ষণ শুধু পড়াশোনা আর মেয়েকে নিয়ে পড়ে থাকেন। আমিই সবসময় আপনার পিছুপিছু ঘুরি। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বুঝি বখাটে কোনো মেয়ে বারবার আপনার মতো ইনোসেন্ট একটা ছেলেকে ইভটিজিং করি।"

তাহসিন এবারে শব্দ করে হেসে দেয়। মেহরিমার নাকে আর থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে বলে,

"এমন ইভটিজিং সারাজীবন করবে কেমন? এত সুন্দরী একটা মেয়ে আমাকে ইভটিজিং করছে এটা ভাবলেও গর্ব বোধ হবে আমার।"

মেহরিমা তাহসিনকে জড়িয়ে ধরে। তাহসিনের শরীরের আতরের ঘ্রাণটা কেমন মাতোয়ারা করে তোলে তাকে।

তাহসিন মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ায় মেহরিমা সহজেই ঘুমিয়ে যায়। তাহসিন উল্টো পাশ ঘুরে মেয়ের হাত পা ঠিক করে দেয়। মেয়েটার ঘুম একদম ভালো নয়। শুধু গড়াগড়ি করবে বিছানা জুড়ে। মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে তাকে মাঝখানে নিয়ে আসে। মেহরিমা আরেকটু কাছে এসে এবার মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। তাহসিন তা দেখে মুচকি হাসে। উঠে এসে মেহরিমাকে মাঝখানে দিয়ে তার অপরপাশে নিজে শুয়ে পড়ে। দুপুর বেলায় একটু না ঘুমালেই নয়। তারউপর আবার আজকে শুক্রবার। অফিস ছুটির দিন।

নিজেদের গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে তাহসিন আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে শোয় মেহরিমার সাথে।

তাহসিন বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ল ফার্মে এডভোকেট হিসেবে কর্মরত। মেহরিমা এখনও কোথাও যোগ দেয়নি। মেয়েটা একটু বড় হলে সেও কোনো ল ফার্মে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করবে।

চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন