#সঙ্গীন_প্রণয়াকাঙ্ক্ষা
#নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_২
নূরায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বর যতটা শান্ত, তার ভেতরের আশঙ্কাটা ঠিক ততটাই তীব্র। আরহামের প্রতিটি শব্দে এক প্রকার চূড়ান্ত অধিকারবোধ ও শীতল হুমকি মিশে থাকে, যা উপেক্ষা করা অসম্ভব।
"কী চান আপনি আমার কাছে আরহাম ভাই ?" নূরায়ার কণ্ঠস্বরে সুস্পষ্ট ভয়।
ওপাশ থেকে মৃদু হাসি শোনা গেল, যেন শিকারকে জালে ফেলার পর শিকারির তৃপ্তির হাসি।
"আমার কি চায় সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস "সানরোজ"।
" সানরোজ"? লোকটা আমাকে এই নামে ডাকল কেনো...! না আমি আর ভাবতে পারছি না। উনি আসলে কি চান আমার কাছে, এমন কেনো করছে আর এসব নামেই বা ডাকছেন কেনো...?কিছু বুঝতে পারছি না আমি। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ আরহাম ভাইয়া বললেন,
আপাতত তুই তোর ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আয় গাঁধা । দরজা খোল, প্লিজ। বাইরে বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়াটা কোনো কার্ডিওলজিস্টের জন্য সুখকর নয়।
ডাক্তার হিসেবে আরহাম তার নিজের স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন খুব।
"এখন না। কাল সকালে আসবেন। প্লিজ আরহাম ভাই, চলে যান। " নূরায়া প্রায় কেঁদে ফেললো।
আমি নিচে দাঁড়িয়ে আছি, আর তুই ঘরে আরামে শুয়ে থাকবি? "অসম্ভব "।
দরজা খোল সানরোজ । নাহলে তোর সাথে আমি কী করবো তুই ভাবতে পারছিস না। কণ্ঠস্বর এবার এক ধাপ শীতল এবং দৃঢ়।
নূরায়া শেষে বাধ্য হলো। সে জানে আরহাম ভাইয়ের জেদ কেমন। একবার সে যখন বলেছে বাড়িতে ঢুকবে তখন সে তার কার্য সম্পূর্ণ করবেই। আমি যতসময় না দরজা খুলবো ততক্ষণ আরহাম ভাই অপেক্ষা করবে, তবে সে ফিরে যাবে না যতক্ষণ না সে তার উদ্দেশ্য হাসিল করবে । আর ডোরবেল বাজানো মানে পুরো বাড়িতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। নূরায়া কোনো ঝামেলা চায় না।
ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল নূরায়া। হাত কাঁপছে, তবুও নিজেকে শক্ত করলো। এই উন্মাদ মানুষটার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
দরজা খোলার সাথে সাথেই আরহাম ভেতরে ঢুকে পড়লো। তার পরনে সাদা এপ্রোন । বৃষ্টির পানিতে তার চুল কপালের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। যা তার এরোগেটেড চেহারায় এক ভিন্ন সৌন্দর্য তৈরি করেছে।
আরহাম দরজার কাছে দাঁড়ানো নূরায়াকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিলো। নূরায়ার পরনে তখন টিশার্ট সাথে প্লাজু পড়া।
_ এরপর থেকে এভাবে আমার সামনে আসবি না সানরোজ। তুই জানিস না এই রূপে তোকে দেখে আমার মধ্যে কতটা উন্মাদনা কাজ করে।
নূরায়া গোল গোল চোখে আরহামের দিকে তাকিয়ে আছে যেন বোঝার চেষ্টা করছে আসলে আরহাম ভাই তাকে কি বললো, পরক্ষণে নূরায়া নিজের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো সে এতসময় আরহাম ভাইয়ের সামনে উড়নাবিহীন ছিল। ইয়া মাবুদ, মাটি একটু দুফাঁক করে দাও তাতে টুপ করে ঢুকে যায়।
আরহাম দেখলো তার সানরোজের চেহারায় স্পষ্ট ভয় ও লজ্জার আভাস। আরহাম ঠোঁট কামড়ে একটু বাঁকা হাসলো,
আরহাম এক পা এগিয়ে এসে নূরায়ার চিবুক আলতো করে ধরলো। তবে তার ছোঁয়া মোটেও আলতো ছিল না। সেটা ছিল কর্তৃত্বপূর্ণ।
"কী হয়েছে? আমাকে দেখে এত ভয় পাস কেনো জান ? ইন ফিউচার আমি-ই তো দেখবো তোর সব। আরহামের কণ্ঠে তখন নরম সুর। "আমি তোকে কি বলেছিলাম, ভুলে গেছিস? " তুই শুধু আমার " আমার জান তুই। ভুলে গেছিস?
নূরায়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। "ছাড়ুন! আপনি কেন এসেছেন এত রাতে? সবাই দেখলে কী ভাববে?"
আরহাম এবার এক ধীর হাসি হাসলো। কে কি ভাবলো, কে কি বললো তাতে আমার কোনো যায় আসে না। ভয় পায় না আমি কাউকে, তুই সেটা খুব ভালো করেই জানিস নূরা।
আরহাম এবার নূরায়ার পাশ কাটিয়ে নূরার রুমে গেল। হাতে তার একটা ফাইল। টেবিলের ওপর সেটা রেখে আরহাম স্থির দৃষ্টিতে নূরায়ার দিকে তাকালো।
"তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে," আরহামের কণ্ঠে এবার খেলার মেজাজ।
নূরায়া কৌতুহলী হলো। "কী?"
"ডাক্তার হিসেবে আমি তোর বাপের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করি, এটা তো জানিস। সে অসুস্থ, তাই ভাবলাম একটু দেখে যায়।
নূরায়া বিভ্রান্ত। "তাই বলে আপনি এত রাতে আসবেন? বাবা তো এখন ঘুমাচ্ছেন।"
আরহাম এগিয়ে এসে নূরায়ার কাঁধে হাত রাখলো। তার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। দৃষ্টিতে সেই পরিচিত শীতলতা।
"না নূরা । তোর বাবার সব দায়িত্ব আমি নিজের হাতে নিয়েছি। আর তুইও.." আরহামের আঙুল নূরায়ার নরম গালে আলতো করে স্পর্শ করলো। আর আমাকে সাহায্য করবি তুই!
নূরায়া হতভম্ব! "আমি! কিন্তু কেন? আমি তো ডাক্তার নই!"
"তাতে কী? তুই আমার পেশেন্টদের দেখভাল করবি, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো ঠিক রাখবি, আর আমার ব্যক্তিগত সব প্রয়োজন মেটাবি। এবং মনে রাখবি, খুব শীঘ্রই তুই আমার বউ হতে চলেছিস। তাই সবসময় আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করা তোর দায়িত্ব।" আরহামের কথাগুলো যেন বুলেট।
"এটা অসম্ভব! আমি আপনার কোনো কাজ করবো না! আর... বিয়ে? আমি আপনাকে নিয়ে কখনো এসব কিছু ভাবিনি। তাই দয়া করে আপনি এসব কথা আর বলবেন না !"
আরহামের ঠোঁটে ফুটে উপলো বাঁকা হাসি। এরোগেটেড ভঙ্গিতে সে টেবিল থেকে ফাইলটি তুলে নিলো।
"ভাবতে হবে না। আমি ভেবে নিয়েছি। আর কাজ... না করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। এই দেখ..." বলে সে ফাইলটি নূরায়ার দিকে এগিয়ে দিল।
নূরায়া দেখলো, ফাইলটিতে তার বাবার নাম এবং তাদের ফ্যামিলি বিজনেসের কিছু কাগজপত্র। এবং নিচে একটি শর্ত, যেখানে লেখা আছে— আরহাম চৌধুরী এখন থেকে তাদের ব্যবসার সমস্ত সিদ্ধান্তের অংশীদার এবং নূরায়া তার ব্যক্তিগত পি.এ হিসেবে নিযুক্ত।
নূরায়ার মাথায় রক্ত উঠে গেল। "এসব কী! আপনি বাবাকে দিয়ে এসব সই করিয়েছন?"
আরহাম কাঁধ ঝাঁকালো। "অসুস্থ মানুষ। হয়তো সবটা না বুঝেই সই করেছে। তবে তাতে কী? সই তো করেছে। এখন তুই আমার হাতে বাঁধা। তুই আমার ভালোবাসা, কোনো মূল্যে আমি তোকে ছাড়তে পারবো না । আর খুব তাড়াতাড়ি... আমার বউ হবি তুই ।"
বৃষ্টির শব্দ আরও জোরালো হলো। নূরায়া যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নূরায়ার মনে হচ্ছে এই উন্মাদ পাগল লোকটার থেকে তার মুক্তি নেই।
হঠাৎ আরহামের দৃষ্টি গেল নূরায়ার টেবিলের ওপর রাখা একটা ডায়েরির দিকে। আরহাম সেদিকে এগিয়ে গেল।
নূরায়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো, "ওটা ধরবেন না!"
আরহাম মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর সেই ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। নূরায়া প্রাণপণ চেষ্টা করেও থামাতে পারলো না।
"তোর এত ভয় কিসের, নূরা? ডায়েরিতে কী আছে... আমি কি তা জানতে পারি না?"
ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় একটা স্কেচ আঁকা। কোনো একটা ছেলের ।
আরহামের চোখে মুহূর্তে আগুন জ্বলে উঠল। সে শক্ত হাতে ডায়েরিটা মুষ্টিবদ্ধ করলো। তার শান্ত চোখ দু'টোতে যেন এক ভয়ানক কালো মেঘ জমে উঠলো।
"কে এটা?" আরহামের কণ্ঠস্বর এবার রাগে, ক্ষোভে কেঁপে উঠল।
নূরায়া স্তব্ধ। সে বুঝতে পারছে, এক নতুন বিপদ ঘনিয়ে আসছে।
#চলবে
( লেখা ছিলো তাই দিয়ে দিলাম। আপনারা পড়ুন, পড়া শেষে কিন্তু নিজের মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না। ভুলত্রুটি হলে শুধরে দিবেন।)