#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }
#পর্ব_১১
#Writer_Nuraya_Mehnaz
আদালতের সেই কোলাহলের মাঝে হায়াত যখন জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়, তখন ওমরের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এইমাত্র সে কারামুক্ত হয়েছে, জীবনের অন্ধকার অধ্যায়টি শেষ করে আলোর মুখ দেখেছে; আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার জীবনের ধ্রুবতারাটি নিস্পন্দ হয়ে তার হাতের ওপর ঢলে পড়ল! ওমরের বাবা চৌধুরী সাহেব এবং আমিনা আপু দ্রুত এগিয়ে এলেন। ওমর হায়াতকে কোলে তুলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটল।
"হে আল্লাহ, তুমি আমাকে মুক্তি দিয়েছ এখন আমার এই ক্ষুদ্র প্রাণটিকেও রক্ষা করো।”
হাসপাতালের কেবিনের বাইরে পায়চারি করছিল ওমর। তার পরনে এখনো জেলখানার সেই ধূসর পোশাকটি পরা। ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে হাসিমুখে ওমরের দিকে তাকালেন,
"অভিনন্দন ওমর সাহেব! আপনার স্ত্রী এখন সুস্থ আছেন। আসলে অতিরিক্ত ধকল, মানসিক চাপ আর দুর্বলতার কারনে তিনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তবে তার চেয়ে বড় সুখবর হলো—আপনি বাবা হতে চলেছেন। হায়াত সন্তানসম্ভবা।”
ওমর কথাটি শোনা মাত্রই সেখানেই হাসপাতালের মেঝেতে সিজদায় পড়ে গেল। তার দুচোখের আনন্দধারা হাসপাতালের শীতল মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। যে সমাজ হায়াতকে কলঙ্কিত বলে গালি দিয়েছিল, আজ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা সেই হায়াতের কোল আলো করে পাঠাচ্ছেন এক পবিত্র উত্তরাধিকার। ওমরের বাবা চৌধুরী সাহেব ওমরের কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর চোখও আজ সিক্ত। তিনি গদগদ কণ্ঠে বললেন,
"ওমর, আমি কি সত্যিই দাদামশাই হতে চলেছি? আমার নাতি বা নাতনি আসবে? আল্লাহ সত্যিই দয়ালু! তিনি আমাদের সব অন্ধকার মুছে দিয়ে আজ নূরের বাতি পাঠাচ্ছেন।”
কেবিনের ভেতর হায়াত তখন চোখ মেলেছে। ওমর ভেতরে ঢুকে হায়াতের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হায়াত মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
"ওমর, আমার হঠাৎ কি হয়েছিল?”
ওমর হাসল, এক স্বর্গীয় হাসি।
"তেমন কিছু হয়নি বিবিজান। আপনি আমাদের জীবনে এক নতুন প্রাণ নিয়ে আসছেন। আল্লাহ আমাদের ঘর আলো করে তাঁর এক বিশেষ নেয়ামত পাঠাচ্ছেন। আপনি মা হতে চলেছেন আর আমি আব্বু!"
হায়াতের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে পেটের ওপর হাত রাখল। যে হায়াত একসময় নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অভিশপ্ত মেয়ে ভাবত, আজ সে অনুভব করল আল্লাহর রহমত কতটা বিশাল। সে মনে মনে পাঠ করল—
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি মাতৃগর্ভে তোমাদের যেমন ইচ্ছে গঠন করেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:০৬)
আমিনা আপু ফল আর কিছু কিতাব নিয়ে হায়াতকে দেখতে এলেন। তিনি হায়াতের কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
"হায়াত,এই সময়টি তোমার জন্য এক বিশাল ইবাদতের কাল। তোমার গর্ভের সন্তানটি তোমার আমলনামার অংশ হবে। তুমি এই সময়ে যত বেশি কুরআন তিলাওয়াত করবে, যত বেশি জিকির করবে, সেই নূর তোমার সন্তানের রূহে প্রতিফলিত হবে।"
হায়াত জিজ্ঞেস করল, "আপু, আমি তো অনেক পাপ করেছি জীবনে। আমার সেই অতীত কি আমার সন্তানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে?”
আমিনা আপু মুচকি হেসে বললেন,
"বোন আমার, তওবা তো অতীতকে মুছে দেয়। তুমি যখন তওবা করেছ, তখন তুমি সেই দিনের মতো পবিত্র হয়েছ যেদিন তুমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলে। তোমার এই সন্তান হবে তোমার তওবার সার্থকতা। তুমি মারিয়াম (আ.)-এর কথা ভাবো, আসিয়া (আ.)-এর কথা ভাবো। আল্লাহ নেককার মায়েদের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে দ্বীনের মশাল জ্বালিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’ (সুনান নাসায়ী, হাদিস নং ৩১০৪)।
এই জান্নাত তোমাকে আজ থেকেই অর্জন করতে হবে তোমার ধৈর্যের মাধ্যমে।”
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর চৌধুরী সাহেব ওমরকে তাঁর গাড়িতে উঠতে বললেন। তিনি চাইলেন ওমর আর হায়াত তাদের আসল বাড়িতে ফিরে আসুক।
"ওমর, অনেক হয়েছে। এখন তোদের এই জরাজীর্ণ বস্তিতে থাকা চলবে না। আমার নাতি বা নাতনি এই প্রাসাদে বড় হবে।”
ওমর শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"বাবা, আপনার এত বড় অট্টালিকায় আমরা অবশ্যই যাব, কিন্তু তা হবে আপনার সাথে দেখা করতে। আমরা আমাদের সেই ছোট ঘরেই ফিরে যাব। কারণ ঐ ঘরটা আমাদের ধৈর্যের প্রতীক। আমি চাই আমার সন্তান বিলাসের চেয়ে ঈমানি পরিবেশে বড় হোক। আমি আমার মেধা দিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে চাই।”
চৌধুরী সাহেব এবার আর রাগ করলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, ওমরের এই জেদ অহংকারের নয়, বরং আত্মমর্যাদার। তিনি বললেন,
"ঠিক আছে বাবা, তোর যেটা ভালো মনে হয়। তবে আমার কোম্পানির সব ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের হেড হিসেবে তোকে আমি নিয়োগ দিচ্ছি। এটা কোনো করুণা নয়, এটা তোর যোগ্যতার প্রাপ্য।”
ওমর আলহামদুলিল্লাহ বলে বাবার প্রস্তাব গ্রহণ করল। তবে সে মনে মনে সংকল্প করল, তার উপার্জনের একটি বড় অংশ সে ‘নূরের ছায়া’ ফাউন্ডেশনে দান করবে, যাতে অসহায় মেয়েরা আলোর পথ পায়।
———————————————
আদালত রোহানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও, ধূর্ত রোহান পুলিশের হাত ফসকে পালিয়ে গেছে। এখন সে আত্মগোপন করে আছে আন্ডারগ্রাউন্ডের ক্ষমতাধর এক নেতার আশ্রয়ে। সেখানে বসে সে দিন-রাত শুধু ওমরের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ছক কষছে। এরই মধ্যে রোহানের কানে একটি বিশেষ খবর পৌঁছেছে—সে জানতে পেরেছে যে, ওমর বাবা হতে চলেছে। এই খবরটা রোহানের মনের ভেতরের হিংসার আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে এখন ওমরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করার সুযোগ খুঁজছে। ওমরের জীবনের এই সবচেয়ে বড় খুশির মুহূর্তটাকেই সে বিষিয়ে দিতে চায়। আড়ালে বসে সে শুধু সময়ের অপেক্ষা করছে, কখন ওমরের সাজানো সংসারে এক মরণ কামড় বসানো যায়।
শহরের এক গোপন ডেরায় বসে রোহান তার সহযোগীদের দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুর এক হাসি দিয়ে বলল,
"ওমর কী ভাবছে? ও জিতে গেছে? ও কি মনে করছে ওর সাজানো সংসারটা খুব সুখে শান্তিতে কাটবে? ও জানে না যে ও একটা বিষধর সাপের লেজে পা দিয়েছে!”
একটু থেমে দাঁতে দাঁত চেপে সে আবার বলল,
"আমি হায়াতের ওই কোল আলো করে আসা অনাগত আনন্দের দিনটাকে চিরদিনের জন্য বিষাদে পরিণত না করা পর্যন্ত থামব না। ওর খুশির পৃথিবীটা আমি নিজের হাতে তছনছ করে দেব।”
রোহানের গলার স্বরে এমন এক পৈশাচিক জিদ ছিল যে, তার পাশে বসে থাকা সকলে শিউরে উঠল।
—————————
রাতে হায়াত ক্লান্তিতে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তখন ওমর এক বাটি গরম দুধ নিয়ে তার শিয়রে এসে বসল। ওমরের চোখে হায়াতের জন্য এক গভীর মায়া আর যত্ন মিশে আছে। সে পরম মমতায় নিজ হাতে হায়াতকে দুধ খাইয়ে দিতে থাকে।
হায়াত ওমরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবল—একটা সময় তারা কত নামী-দামী রেস্টুরেন্টে খেয়েছে, কত রাজকীয় খাবার তাদের সামনে সাজানো থাকত। কিন্তু আজ ওমরের হাত থেকে খাওয়া এই সাধারণ দুধের বাটিটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার মনে হচ্ছে। কারণ, এই দুধের প্রতিটি চুমুকে মিশে আছে ওমরের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আগলে রাখার এক অদ্ভুত শান্তি।
ওমর বলল, "বিবিজান, আজ থেকে আপনি আর একা নন। আমাদের এই ছোট্ট আমানতটি যেন একজন দ্বীনদার মানুষ হিসেবে বড় হয়, সেই প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। আর সেটার প্রথম ধাপ হবেন আপনি৷ মা সন্তানের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।"
হায়াত ওমরের হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
"ওমর , আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার প্রতিদান আমি দিতে পারব না। আপনি আমাকে শুধু সমাজ থেকে নয়, জাহান্নামের আগুন থেকেও বাঁচাতে লড়েছেন।"
ওমর হাসল। "বিবিজান, আমরা একে অপরের পোশাক।”
ওমরের মুখে এমন গভীর কথা শুনে হায়াত অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ওমর মৃদু হেসে হায়াতের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওমর খুব নরম সুরে বলল,
"বিবিজান, জানেন তো, আল্লাহ কুরআনে কত সুন্দর একটা কথা বলেছেন? তিনি বলেছেন—
‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭)।”
হায়াত মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ওমর বুঝিয়ে বলতে লাগল,
"পোশাক যেমন আমাদের শরীরকে আগলে রাখে, বাইরের রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচায় আর আমাদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়—ঠিক তেমনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও হওয়া উচিত পোশাকের মতো। আমরা একে অপরের দোষ-ত্রুটি আর পেছনের সব ভুলগুলোকে ভালোবাসা দিয়ে ঢেকে রাখব। বাইরের কেউ যেন আমাদের চির ধরতে না পারে, সেই দেওয়াল হয়ে থাকব আমরা।”
ওমর হায়াতের কপালে আলতো করে হাত রেখে আবার বলল,
"আমাদের অতীত যেমনই হোক, আজ থেকে আমরা একে অপরের সম্মান আর শক্তি। পোশাক যেমন শরীরকে আরাম দেয়, আমি চাই আমার সান্নিধ্য আপনার জীবনে সেই আরাম আর শান্তি বয়ে আনুক।”
ওমরের এই কথাগুলো হায়াতের হৃদয়ে এক গভীর প্রশান্তি এনে দিল। তার মনে হলো, ওমরের ভালোবাসার এই চাদর তাকে দুনিয়ার সব ঝড়-ঝাপটা থেকে সারা জীবন এভাবেই নিরাপদ রাখবে।
হায়াত তার প্রিয় স্বামী ওমরের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বলল,
"আজ আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের রাত। আমার ভেতর এক নতুন স্পন্দন অনুভব করছি। হে আমার অনাগত সন্তান, আমি তোমাকে এমন এক পৃথিবীতে স্বাগতম জানাব যেখানে মানুষের পরিচয় তার রূপে নয়, বরং তার রবের সাথে তার সম্পর্কের গভীরতায় থাকবে। তোমার আব্বু তোমাকে শিখিয়ে দেবে কীভাবে পাহাড়ের মতো অবিচল থাকতে হয়, আর আমি তোমাকে শেখাব কীভাবে বৃষ্টির মতো বিনয়ী হতে হয়।”
#চলবে_ইনশাআল্লাহ