#উল্টাপাল্টা_সংসার
~আরিয়ানা আরিফা
১৫.
অরি বুঝলো রাফি তাকে প্রপোজ করছে।সে বারকয়েক চোখ ঝাপটে এক দৌঁড়ে রুমে চলে এলো।কতক্ষণ গালে হাত দিয়ে ফুরুৎ করে ভাবনার দেশে পাড়ি মারলো।তার হঠাৎ সাল্লু স্যারের কথা মনে পড়ছে।সে যখন ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে তখনকার কথা,সেদিন ছিলো ভীষণ বৃষ্টি।অরির কাছে ছাতা ছিল না বলে সে কলেজে আটকা পড়েছে।বাইরে ধুপধাপ বাজ পড়ছে।অরি বাজে ভয় টয় পায় না।সে অনেক আগ্রহ নিয়ে বাজ পড়া দেখছে।আচমকা সাল্লু স্যারের গলা শোনা গেল।তিনি অরিকে একটা ছাতা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
-কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবেন।ধরুন এটা নিয়ে যান।কাল আবার ফেরত দিয়ে দিয়েন।
অরির মনে তখন লাড্ডু ফুটছে।তখন তিন মাস হয় সে সাল্লু স্যারের প্রেমে পড়েছে।অরি ছাতাখানা নিয়ে লজ্জা লজ্জা মুখে বলল,
-শুনছেন?একটা কথা বলি?
সালমান স্যার অরির "শুনছেন" শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।অরি সেই কুঁচকানো ভ্রু মানবের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমি না আপনাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।আমার সারাক্ষণ আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে,আপনার পিছু পিছু ঘুরতে ইচ্ছে করে,আপনার..
আর কিছু বলার আগেই অরির নরম সরম গালে কাঠকাঠ হাতের এক দাবাং চড় পড়লো।সেই দাবাং চড় খেয়েই অরির মাথা ঘুরে গেল।বুঝলো,স্যার জাতি এত সুবিধার জাতি না।আজ অনেকদিন বাদে সেই বাক্যটা অরি ফের আওড়ালো।বলল,
-স্যার জাতি অতো সুবিধের না।
কিন্তু অরি কিছুতেই নিজেকে বুঝতে পারছে না।তার মনে হচ্ছে,সে সাল্লু স্যারকে যেরকম পছন্দ করেছে রাফি স্যারকেও সেরকম পছন্দ করে ফেলেছে।সে বারকয়েক পায়চারি করে আয়নার সামনে গেল।আয়নার সামনে নিজের দিকে আঙুল তুলে প্রচন্ড খেঁকিয়ে বলল,
-অরিইই,তুই একটা ফোর টুয়েন্টি!
________
অকুর আজকাল দিনগুলো সব মরা মরা যাচ্ছে।তার মাদা কে সে এত্ত মিস করছে!পাপ্পার কোলও এখন তার ভালো লাগছে না।মাম্মার আদরও না।এই যে বিগত এক ঘন্টা যাবত তার নানা-দাদা ঝগড়া করছে,এই ঝগড়াটাও তার মন টানছে না।অন্যসময় হলে দুইজনকেই দুইটা কামড় দিয়ে মাম্মার আঁচলের পিছনে চুপটি করে লুকিয়ে থাকতো।অকু বড়দের মত হতাশার শ্বাস ফেলল।মাম্মাকে ধরে বলল,
-মাম্মা,ঘুততে যাব।
মালিহারও ভীষণ মন খারাপ। সে ছেলেকে কোলে নিয়ে বলল,
-চলো।কোথায় যাওয়া যায় বলোতো?
-মাদার কাচে।
-ওর শ্বশুর বাড়ি তো চিনি না আমি।দাঁড়াও আব্বাকে নিয়ে যেতে বলি।
মালিহা জালাল সাহেবকে গিয়ে বলতেই তিনি এমন একটা ভাব দেখালেন, যেন মায়িদার কথা উনি ভুলেই গিয়েছেন।মালিহা বলায় উনার মনে পড়েছে।তিনি বললেন,
-রেডি হয়ে আয় যাহ,আর অকুকে এদিকে পাঠা।
অকু সবসময়'ই সুন্দর করে বাবু সেজে থাকে।মালিহা আর অকুকে আলাদা জামা টামা না পড়িয়ে তার দাদার কাছে পাঠিয়ে বলল,
-দাদার সাথে দাঁড়াও।আমি রেডি হয়ে আসছি।
মালিহা রেডি হতে গেলেই জালাল সাহেব অকুকে নিয়ে পগারপার হয়ে গেলেন।কিছুতেই মালিহাকে নেয়া যাবে না।তিনি ঠিক করলেন, আজ মায়িদাকে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদবেন।মালিহাকে নিলে সেই কান্নাটা হবে না।এক মেয়ের সামনে আরেক মেয়েকে ধরে আব্বারা কাঁদতে পারে না।
_________
মায়িদার দিনকাল সব আগের মতই যাচ্ছে।একটা পরিবর্তন হচ্ছে আগে আব্বা-জেঠুর শার্ট প্যান্ট পড়তো, এখন নোভানের পড়ছে।নোভান মায়িদার দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
-আপনার ড্রেস নাই?আমার গুলা কেন পড়ছেন?
-কেন নভু?তোমার গুলা পড়া যাবে না?
-অবশ্যই নাহ!আমার এসব পছন্দ নাহ।
-পছন্দ না হলে পছন্দ করার চেষ্টা করো নভু।তোমাকে এবার থেকে এসবই পছন্দ করতে হবে।এক পিস বউ পাইছো বুঝলা নভু?
নোভান বুঝতে পারছে না এই মেয়েকে সে সহ্য করবে কীভাবে?তার হঠাৎ করে আগের যুগের রাজা বাদশা হতে ইচ্ছে করছে।তাদের মত হুকুম করে মায়িদা নামক মেয়েটাকে বনবাসে পাঠাতে মন চাইছে।নোভান একটু জোরালো কন্ঠে বলল,
-আমায় নভু বলবেন না।
-উখে নোভাইন্না।
-নোভাইন্নাও বলবেন না।
মায়িদা এবার অকুর মত নোভানের দুই গাল টেনে বলল,
-উখে বরসাহেব।
নোভান বিরক্ত কন্ঠে বলল,
-বরসাহেবও বলবেন না।
মায়িদা একটু সংসার করার চেষ্টা করছে।কিন্তু এই নিরামিষের সাথে সংসার একদমই জমছে না।এই ছেলে মায়িদার প্রতিটা কথায়'ই বিরক্ত হচ্ছে।এমন ভাবে তাকাচ্ছে,যেন মায়িদা তার আগের জন্মের রীনা খালা ছিল!
-তাহলে কী বলে ডাকবো?
নোভান এবার নিজেই ভাবনায় পড়ে গেল।তার মা তো তার বাপকে 'নোভানের আব্বু' বলে ডাকে।নোভান দুনিয়াতে আসার আগে কী বলে ডাকতো জিজ্ঞেস করতে হবে।
মায়িদার কথার উত্তর না দিয়ে সে চট করে মায়ের কাছে গেল।মা তার বরের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছেন।নোভানের আব্বু বিদেশ গিয়েছে যে এক বছর হলো।ছেলেকে দেখে মিসেস নুড়ি কল কাটলেন।হেসে বললেন,
-অফিসে যাসনি এখনো?
নোভান মায়ের পাশে বসে বলল,
-উহু!যাব এখন।
-কিছু বলবি?
নোভান ইনিয়েবিনিয়ে বলল,
-তুমি আব্বাকে কী বলে ডাকতে?
মিসেস নুড়ি ছেলের চুল ঠিক করতে করতে বললেন,
-মানে?
-মানে, আমি দুনিয়াতে ল্যান্ড করার আগে আব্বাকে কী বলে সম্বোধন করতে?
নুড়ি হাসলেন।কাহিনী বুঝে বললেন,
-আমি তো মাওলানা সাহাব ডাকতাম।
নোভান মাথা চাপড়ালো।মায়িদা তো ওকে মাওলানা সাহাব ডাকতে পারবে না।কারণ সে আর যায় হোক একদমই মাওলানা নাহ!
ও ঘর থেকে মায়িদার আওয়াজ আসছে।সে জোরে জোরে ডাকছে,
-এই নভু,এই নোভাইন্না,এই বর...
________
মালিহা রাগে কিড়মিড় করছে।তার আব্বা যে এরকম মীরজাফরের মতন বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা সে ইহজগৎ এ ও ভাবতে পারে নি।কোথায় ভাবলো,বোনটাকে আজ একটু দেখে আসবে।দুই বোন ফুসুরফাসুর করে গল্প করবে।একটার মাথায় একটা সুন্দর করে তেল মেখে চুবচুবা করে ফেলবে।এসব কিছুই হলো না।কার জন্য হলো না?তার মীরজাফর রূপি আব্বার জন্য হলো না!
মালিহা প্রচন্ড রাগ নিয়ে অরির রুমে গেল।অরিকে দেখে তার রাগ আরেক ধাপ বেড়ে গেল।এই মেয়ে কী সুন্দর আরামসে বসে বসে রামেন গিলছে।মালিহা অরির থেকে রামেনের বাটি নিয়ে খাওয়া শুরু করলো।তার এখন সবাইকে রাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে অরির ভালোবাসার রামেন কেড়ে নেওয়া স্বত্ত্বেও সে রাগছে না।বরং ফ্যালফ্যাল করে মালিহার দিকে তাকিয়ে আছে।মালিহার হঠাৎ খেয়াল হলো তার গলা জ্বলছে।মুখ জ্বলছে।সে চিক্কর মেরে বলল,
-অরির বাচ্চা,তুই আমারে কী খাওয়াইলি?
-আমি কখন খাওয়াইলাম।তুই নিজেই তো খাওয়া শুরু করলি।
মালিহার ঝালে প্রচন্ড রকমের এলার্জি আছে।সেই এলার্জির কারণে মালিহার মুখ পুরো লাল টমেটো হয়ে গেল।ইতিমধ্যে তার মাথা ব্যাথাও শুরু হয়ে গেল।অরি তাকে চট করে খাটে শুইয়ে দিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলো।সে কিছুই করেনি।তবুও আজ তার দিন ভালো যাবে না,তা হাড়ে হাড়ে টের পেল।তার ঘরশত্রু বিভীষণ ভাই তাকে এসে ধরবে।বলবে,
-আবার ঝাল কেন খাইয়েছিস ওকে?তোকে তো...
অরি মাথা দুলিয়ে না না করলো।আরো জোরে জোরে বাতাস করতে লাগলো।যদিও বাতাসে কোনো কাজ টাজ হবে না।সে জানে মালিহার এক্ষুনি জ্বর এসে পড়বে।অরি ঠাস করে নিজের গালে নিজে চড় মারলো।মালিহাকে ধমকে বলল,
-ওরে বুদ্ধু,তুই জানোস না আমি ঝাল খাই।ঝাল ছাড়া আমার চলে না।কোন বুদ্ধিতে তুই আমার খাবার খাইতে যাস?খবিশের খবিশ!
_________
মালিহার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।এইটা কী ধরনের এলার্জি সে বুঝে না।যেদিন ঝাল খাবে সেদিনই গা কাঁপিয়ে জ্বর চলে আসবে।অয়ন অফিস থেকে এসে মালিহাকে এভাবে দেখে প্রথমে অরির কাছে গেল।চেঁচিয়ে বলল,
-আবার ঝাল খাইয়েছিস ওকে?
অরি আগে থেকেই কথা সাজিয়ে রেখেছে।সে বলল,
-তোমার বউ নিজেই আমার রামেন নিয়ে খাওয়া শুরু করেছে।আমি ওকে একবারও বলি নি, 'মালু, নে এটা খা।' তুমি পারলে ওকে জিজ্ঞেস করো।একদম অযথা আমার সাথে চিল্লাপাল্লা করবা না।
অয়ন আরো বেশি চিল্লাপাল্লা করলো।বলল,
-কানে ধর।
অরি ক্যাবলার মত বলল,
-কী?
-শুনিস না?কানে ধরতে বলছি।কুইক!
অরিও এবার রেগে গেল।খেঁকিয়ে বলল,
-ধরব না।
-ধরবি না?
-না না না।
অয়ন টেবিলের নিচে বইয়ের স্তুপের ভিতর থেকে একটা ডাইরি বের করে চিল্লিয়ে বলল,
-আব্বায়ায়ায়া...
অরি লাফিয়ে উঠল।সে প্রায় কেঁদে দিবার মত করে বলল,
-ধরছি।
সে কানে কানে ধরতেই অয়ন ফের বলল,
-১২০ বার উঠবস করবি।করতে করতে বলবি,
'আমি জীব্বনেও ঝাল খাব না,ভাইয়ের আদরের বউকেও ঝাল খাওয়াবো নাহ।'
~চলবে....