ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৬১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৬১.

হিম বাতাসে ঘরের পর্দা গুলো উড়ছে। বাণীর মুখোমুখি বসে আছে দূর্জয়। ভেতরের বেডরুম হতে গেমস খেলার শব্দ ভেসে আসছে। বহ্নিকে নিজের ফোন দিয়ে রুমে বসিয়ে রেখে এসেছে বাণী। তার কারণ হলো এই সকাল বেলা দূর্জয় এসেছে তার সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলতে। সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ঠিক কি তা আন্দাজ করতে পারছে না বাণী।

দূর্জয়ের চোখ জোড়ায় গতকাল রাতের ক্লান্তি ভাবটা আর নেই। ছয় ঘন্টার ঘুমে চোখ মুখে আবার তীক্ষ্ণ গম্ভীর ভাবটা ফুটে উঠেছে। সে সরাসরি বাণীর চোখে চোখ রেখে বলে উঠে,

“ আমাদের মাঝে যেই সম্পর্কের সূচনা হতে যাচ্ছে সেই সম্পর্ক শুরুর প্রথম শর্ত হচ্ছে সম্পর্কটাতে কোনো ধরনের লুকোচুরি থাকবে না। তাই সাফ সাফ প্রশ্ন করছি বাণী, সিথী নামক মহিলা তোমার নামে আজেবাজে কথা রটানোর পিছনে কারণ কি? “

বাণী অবাক হতে গিয়েও আর হয় না। আজকাল বুঝতে পারছে তার জীবনের ছোট বড় সকল ঘটনা দূর্জয়ের নিকট পৌঁছে দেওয়াটাও কারো চাকরি। কি যেনো নাম লোকটার? মাসুদ! হ্যাঁ, ওই লোকটাই হয়তো এই তথ্য দূর্জয়ের নিকট পৌঁছে দিয়েছে।

দূর্জয় ফের বলে উঠে,

“ সত্যটা পর্যন্ত চাইলে আমি নিজেই পৌঁছাতে পারি বাণী। কিন্তু আমি তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছি। ইউ নিড টু ওপেন আপ ইউরসেল্ফ টু মি হোয়েনেভার ইউ আর ফেসিং সামথিং টেরিবাল। “

বাণী লুকায় না আর কিছু। চোখ নত করে হাতের নখ খুটতে খুটতে জবাব দেয়,

“ পরশু সন্ধ্যায় আমি যখন ছাদ থেকে কাপড় আনতে যাই তখন সিথী আপুর হাজবেন্ড রিহাব নামক লোকটা আমাকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দেয়। আমি এই ব্যাপারে আপুকে জানাতে গেলে আপু আমাকে বিশ্বাস করে না। উনার মতে সমস্যাটা আমার চরিত্রে। “

দূর্জয় নীরবে শুনে সবটা। অত:পর শান্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে,

“ সিথী আপুকে জানানো গেলো, কিন্তু আমাকে জানানো গেলো না? ভয় পাচ্ছিলে আমি জাজ করবো? এতটুকু বিশ্বাস হয় নি এখনো আমার প্রতি? “

বাণী উত্তর দেয় না। বলতে পারে না যে সে দূর্জয়কে বিশ্বাস করে। কিন্তু নিজের সমস্যার কথা কাউকে যেচে জানাতে তার মধ্যে অস্বস্তি কাজ করে। দূর্জয় বলে,

“ ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। “

বাণী চমকে প্রশ্ন করে,

“ কোথায় যাবো? “

“ ডোন্ট টেল মি এই ইন্সিডেন্টের পরও তুমি এই বাসায় থাকতে চাচ্ছো। “

“ না, বাসা ছেড়ে দিবো আমি। কিন্তু এই মুহুর্তে কোথায় যাবো? “

দূর্জয় বলে,

“ বিয়ের আগ পর্যন্ত যেখানে তুমি আর বহ্নি সেফ থাকবে। “

বিয়ের আগ পর্যন্ত কথাটা শুনতেই বাণীর অদ্ভুৎ অনুভূতি হয়। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে উঠে চলে যায়। জামাকাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের পরিমাণ অধিক না হওয়ায় চল্লিশ মিনিটের মধ্যে তার ব্যাগ গুছানো শেষ হয়ে যায়। দূর্জয় দায়িত্ববান পুরুষের মতো লাগেজ দুটো নিজের দুই হাতে তুলে নেয়। বাণী প্রশ্ন করে,

“ ফার্নিচার? “

“ এগুলোর প্রয়োজন নেই আর। সব সেল করার ব্যবস্থা করে ফেলবো। কিছু প্রয়োজন হলে নিজের বাসায় তোমার মন মতো করে তা সাজিয়ে নিও। “

কথাটুকু কানে বাজতেই বাণী চোখ নামিয়ে নেয়। ঠিক লজ্জায় না, বরং অদ্ভুৎ অনুভূতিতে। এধরণের কথায় ঠিক অভ্যস্ত নয় সে। তাই বোধহয়। বহ্নি কাছে এসে হাত ধরে ঝাঁকাতেই বাণী অনুভূতির বৃত্তান্ত হতে বেরিয়ে আসে। একহাতে মেয়ের হাত ধরে এবং অন্য হাতে বাসার তালা চাবি নিয়ে দূর্জয়ের পিছু পিছু বেরিয়ে আসে।

__________

পরিচিত বাড়ির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাণী অস্বস্তি অনুভব করে। মিনমিনে গলায় দূর্জয়কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ এখানে কেন দূর্জয়? আমি আর বহ্নি না হয় ক'টা দিন হোটেলে থাকি? শুধু শুধু ঝামেলা… “

বাণীর কথা সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পূর্বেই ভেতর থেকে দরজা খুলে হাস্যজ্বল মুখে বেরিয়ে আসে জুলফিকার। আজ তার পড়নে কোনো ইউনিফর্ম নেই বরং রয়েছে ঘরের টি শার্ট এবং ট্রাউজার। জুলফিকার প্রফুল্ল গলায় বলে,

“ ওয়েলকাম ব্যাক আম্মু। “

বাণী ইতস্তত গলায় বলে,

“ আসসালামু আলাইকুম আংকেল। “

বহ্নিও উৎফুল্ল গলায় বলে,

“ হ্যালো! “

বাণী নরম গলায় শাসিয়ে বলে,

“ সালাম দিতে হয় মা। “

বহ্নি সঙ্গে সঙ্গে সালাম দেয়। দূর্জয় ব্যাগ দুটো নিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। জুলফিকার মুজতবাও বহ্নিকে নিজের কোলে নিয়ে খোশমেজাজে ভেতরে চলে যায়। বাণী কিছুক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেও ভেতরে প্রবেশ করে।

নিশা রুম থেকে বেরিয়েই বাণীকে দেখে সরল হাসি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। অত:পর বহ্নির সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে যায়। জুলফিকার চোখের ইশারায় কিছু একটা বলতেই নিশা বহ্নিকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। জুলফিকার মুজতবা দূর্জয় এবং বাণীকে বলে,

“ তোমরা বসো। আমি দুই মিনিট আসছি। “

বাণী এবং দূর্জয় আলাদা আলাদা দুটো সোফায় বসে জুলফিকারের অপেক্ষা করতে থাকে। বাণীর খুব লজ্জা লাগছে। এভাবে সম্পর্কহীন একটা মানুষের বাসায় এভাবে মুখ উঠিয়ে এসে পড়া কতটা ঠিক তা নিয়ে সে দ্বিধায় আছে। তার ঠিক পাশের সোফাটাতেই বসা দূর্জয় হয়তো তার মুখশ্রী দেখে তার সেই অস্বস্তি বুঝতে পারে। তাইতো নিজেই বলে উঠে,

“ স্যারের সঙ্গে আমারও রক্তের সম্পর্ক নেই। তবুও আমি উনাকে নিজের অভিভাবক মানি, সম্মান এবং শ্রদ্ধা করি। সব সম্পর্ক রক্তের হতে হবে এরকম কোনো লিখিত আইন নেই। “

বাণী চোখ তুলে তাকায়। ফের চোখ নামিয়ে নেয়। জুলফিকার মুজতবা তিন মগ কফির ট্রে হাতে এসে উপস্থিত হয়। বাণী অবাক হয় না। আগে যখন সে এই বাসায় ছিলো তখন প্রায়ই দেখতো জুলফিকার আংকেল ফ্রি টাইমে এটা সেটা বানাচ্ছে।

জুলফিকার বসে ধীরে সুস্থে বলে,

“ দূর্জয় আমাকে জানিয়েছে যে তোমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছো। কংগ্রেচুলেশন। আই এম হ্যাপি ফোর বোথ অফ ইউ। “

দূর্জয় মৃদু হাসলেও বাণী লজ্জায় আরো নত হয়ে যায়। নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে সে। যতবারই নিজেকে দূর্জয়ের পাশে কল্পনা করছে ততবারই সেই হীনমন্যতা তাকে জেঁকে ধরছে। জুলফিকার এবার নরম গলায় বলে,

“ তোমার আপত্তি না থাকলে আমি আর নিশা কনে পক্ষের সদস্য হতে চাই। তোমার আপত্তি আছে আম্মু? “

বাণীর চোখ এবার টলমল করে উঠে। এ কথা সত্য যে টিনেজ বয়সে সে একবার পাশের সোফায় বসে থাকা মানুষটাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়ে মেনিফেস্ট করেছিলো। তবে আর দশটা মেয়ের মতো আলাদা করে কখনো বিয়ের স্বপ্ন দেখে নি সে। যদি তার জীবনটা আজ স্বাভাবিক হতো তাহলে তার পরিবারকে নিশ্চয়ই কনে পক্ষ বলা হতো? কে জানে!

জুলফিকার এবং দূর্জয় পরিস্থিতি আন্দাজ করতে পারে। জুলফিকার নড়ে চড়ে বসে নরম গলায় বলে,

“ মন থেকে বলছি আম্মু। “

বাণী মাথা নেড়ে বলে,

“ আমার আপত্তি নেই। “

দূর্জয় একবার হাত ঘড়ি দেখে বলে উঠে,

“ আমার মামণিকে রিসিভ করতে যেতে হবে। আপাতত বহ্নিকে এই ব্যাপারে কেউ কিছু বলবেন না। আমি সন্ধ্যায় এসে ওর সঙ্গে কথা বলবো। “

জুলফিকার দূর্জয়কে এগিয়ে দিতে দরজা পর্যন্ত যায়। দূর্জয় দরজার ওপারে গিয়ে জুলফিকারের পানে ফিরে তাকায়। জড়তা হীন স্বরে বলে,

“ মাই উড বি ফ্যামিলি ইজ নাও আন্ডার ইউর কাস্টাডি স্যার। শীঘ্রই আসবো। অধিকার সমেত নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবো। “

জুলফিকার কেবল হাসে। দূর্জয় গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফোন বের করে কাউকে কল করে। কঠিন স্বরে কঠিন একটা অর্ডার বুঝিয়ে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে সে।

__________

সুহালার শুভ্র মুখটা মূর্তির মতো স্থির। নিষ্পলক দেখছে তার সামনে বসে থাকা ছেলেকে। দূর্জয়ের মুখভঙ্গি অত্যন্ত স্বাভাবিক। সুহালা কণ্ঠে বিস্ময় নিয়ে বলে,

“ তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছো, তা-ও এমন একটা মেয়েকে যার অলরেডি একটা বাচ্চা আছে? “

দূর্জয় শান্ত গলায় বলে,

“ আমি জানি বাচ্চাটা এখন একান্তই ওর। বিয়ের পরে আমাদের বাচ্চা হবে ও। আমি এতে কোনো সমস্যা দেখছি না। “

সুহালা বেগম কিছু বলতে পারে না জবাবে। তার ছেলে যে কঠিন ভাবে এই বিয়ের জন্য মনস্থির করে রেখেছে তা তিনি স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছেন। দূর্জয় এবার নিজের মা'য়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছুটা কোমল স্বরে বলে,

“ আমি তোমার থেকে কিছু লুকাই নি মামণি। কারণ তুমি আর দশটা মানুষের মতো জাজমেন্টাল আচরণ করবে না সেই ভরসা আমার আছে। আর আমার যেকোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানার অধিকারও তোমার আছে। “

সুহালা বেগম একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। চট্টগ্রামে এসেই এরকম একটা কথা শোনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলো না। তার উপর মেয়েটার অতীত কি ভয়ংকর! একটা মাত্র ছেলে তার। মেয়েটাকে নিজে কাছ থেকে না জেনে তিনি হ্যাঁ ও বলে দিতে পারছে না। সুহালা বেগম প্রশ্ন করেন,

“ বিয়েটা কি তুমি দয়ার বশে করতে চাচ্ছো? “

“ মোটেও না। বিয়েটা আমি সম্পূর্ণ মন থেকে করতে চাচ্ছি। আই হ্যাভ ফিলিংস ফর বাণী। “

সুহালা বেগম উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

“ হুট করে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমাকে ওদের সঙ্গে পরিচয় করাও। কাছ থেকে জানতে চাইছি। তারপর বাকিটা দেখা যাবে। আপাতত ক্লান্ত আমি। একটু ঘুমাবো। “

__________

শান্ত শীতল বিকেল বেলার নীরবতা ভাঙে এক মহিলার চিৎকারে। বাড়ির রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়িটার দিকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক হ্যান্ডকাফ পড়া পুরুষকে। তার পিছু পিছু দৌড়িয়ে আসছে তার স্ত্রী যিনি জোর গলায় দাবী করছেন,

“ আমার স্বামী নিরপরাধ। “

একজন কনস্টেবল বিদ্রুপের সুরে বলে উঠে,

“ সমস্যা নাই আপা। জেলে যাওয়ার পর অপরাধ বের হয়ে আসবে। “

আশেপাশের উৎসুক জনতা তখন নিজেরা ফিসফিস করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে হয়তো চাচার মৃত্যুর পর চাচাতো বোনদের সম্পত্তির হক মেরে দালান বানানোর অপরাধে লোকটা গ্রেফতার হলো, কেউ বা বলছে দু'দিন আগে এই লোকের স্ত্রীর কাছে প্রাইভেট পড়ুয়া মেয়েটাকে মোলেসটের দায়ে লোকটাকে পুলিশে ধরেছে।

সিথী বুঝতে পারছে না কিসের দায়ে তার স্বামীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রিহাব তখন চিল্লিয়ে বলে,

“ হা করে উজবুকের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে গিয়ে উকিল খুঁজে বের করো গর্দভ মহিলা। আমার জামিনের ব্যবস্থা করো দ্রুত। “

মহল্লার উৎসুক মানুষজন তখন চারিদিকে ভীড় জমিয়েছিল। এতগুলো মানুষের সামনে গর্দভ মহিলা বলে ডাকায় বেশ অপমানিত বোধ করে সিথী। যার সকল অপরাধ সে পর্দা দিয়ে আড়াল করে সে-ই লোকই কিনা তার সঙ্গে এমন আচরণ করে? মুহুর্তেই মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় তিনি। এই লোকের কোনো জামিন করাবে না তিনি। জেলে পচে মরুক। দুটো দালানের বাড়ি ভাড়া এবং স্কুলের বেতন দিয়ে নিজের সন্তান নিয়ে বেশ শান্তিতেই দিন কাটাতে পারবে সিথী। এই পুরুষের কোনো প্রয়োজন নেই তার।

রিহাবকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা নীরবে দেখে রাস্তার মোড়ে গাড়ির ভেতর বসে থাকা এক ঈগল দৃষ্টি। রাগে স্টিয়ারিংটা শক্ত হাতে চেপে ধরে বসে আছে সে। সমাজ থেকে যদি এই আবর্জনা গুলোকে উপড়ে ফেলা যেতো সম্পূর্ণ!

__________

গোধূলি লগ্ন তখন। ফোনে পরিচিত নাম্বার হতে আগত কলটা দেখেই বাণী তা রিসিভ করে। অপর পাশের মানুষটা কিছু একটা বলতেই সে অস্বস্তি অনুভব করে। ফোনটা রেখে ধীর পায়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়। লিভিং রুমে বসে ফোনালাপে ব্যস্ত জুলফিকারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। জুলফিকার কলটা এক মুহুর্তের জন্য হোল্ড করে প্রশ্ন করে,

“ কিছু বলবে আম্মু? “

বাণী ইতস্তত করে বলে,

“ আংকেল, দূর্জয় এসেছে। আমাকে আর বহ্নিকে রেডি হয়ে বের হতে বলছে। আমরা যাবো? “

জুলফিকার মুজতবার মনটা ভালো হয়ে যায় মুহুর্তে। মেয়েটার ভদ্র ব্যবহার এবং আচরণে তিনি বরাবরই মুগ্ধ। স্বভাবের দিক দিয়ে একদমই নিশার মতো শান্তশিষ্ট। এ কারণেই বোধহয় মেয়েটার প্রতি পিতৃস্নেহ জাতীয় মায়া কাজ করে তার মধ্যে। জুলফিকার হেসে বলে,

“ অবশ্যই। যাও ঘুরে আসো। “

বাণী ফের বলে,

“ নিশাও তো কোচিং-এ গিয়েছে। ফিরতে দেরি হবে। আমি সন্ধ্যার নাস্তা বানিয়ে দিয়ে যাই আপনার জন্য? “

জুলফিকার মুজতবা বলে,

“ আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না বোকা মেয়ে। তোমরা গিয়ে রেডি হও তাড়াতাড়ি। দূর্জয়কে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিও না। ডিফেন্স ম্যানরা কিন্তু সময় নিয়ে খুব পাঙচুয়াল হয়। “

বাণী আর কথা বাড়াতে পারে না। চুপচাপ ভেতরে চলে যায় রেডি হতে।

__________

গাড়ির সামনে টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ফোন চালাতে ব্যস্ত দূর্জয় কারো আগমন টের পেতে মাথা তুলে তাকায়। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার পরিপাটি রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে বাণী এবং বহ্নি। বহ্নি রাগে গাল ফুলিয়ে রেখেছে। সে নিজের সুন্দর লাল রণফের ফ্রকটার উপর কোনো সুয়েটার পড়তে চাচ্ছিলো না। বাণী একপ্রকার তাকে ধমকে কালো উলের সুয়েটারটা পড়িয়েছে।

বাণী বেখেয়ালি দৃষ্টি মেলে তাকাতেই সামনে দূর্জয়কে দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ নামিয়ে নেয়। কি অদ্ভুৎ! সবসময় কালো রঙ পড়া দূর্জয় আজ সাদা শার্ট কেনো পড়লো? বাণীর খুব অস্বস্তি লাগছে। সে-ও আজ সাদা সালোয়ার কামিজ পড়েছে। রাস্তা ঘাটে যে কেউ দেখলে ভাববে তারা হয়তো টুইনিং করে জামা পড়েছে। অথচ ব্যাপারটা কাকতালীয়।

বাণী এবং বহ্নি দূর্জয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই দূর্জয় নীরবে দু'জনকে পরখ করে। পরপর বহ্নির সামনে বসে প্রশ্ন করে,

“ মুখ লটকে রেখেছেন কেনো? “

বহ্নি প্রশ্রয় পেতেই অভিযোগের সুরে বলে,

“ মাম্মা আমাকে জোর করে সুয়েটার পড়িয়েছে। তুমি বলো মেজর, আমার ড্রেসটার সাথে এই সুয়েটার ম্যাচ করছে? মাম্মার কোনো ফ্যাশন সেন্স নেই। “

দূর্জয় একবার আড়চোখে বাণীকে দেখে বহ্নিকে বুঝিয়ে বলে,

“ ইট ইজ নট এবাউট ফ্যাশন সেন্স। ইট ইজ এবাউট কেয়ার সেন্স। মাম্মা আপনার কেয়ার করে তাই আপনাকে সুয়েটার পড়িয়েছে। নাহয় আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে। আর ঠান্ডা লেগে যাওয়াটা খুব ভয়ংকর একটা ব্যাপার। “

বহ্নি কিছুক্ষণ দূর্জয়ের বলা কথাটা ভাবে। ভুল বলে নি মেজর। দূর্জয় উঠে দাঁড়িয়ে সামনের পেসেঞ্জার সিটের পাশের দরজাটা খুলে দাঁড়ায়। বাণী নীরবে তা দেখে বহ্নির হাত ধরে এগুতে নিলেই বহ্নি বলে,

“ তুমি সামনে বসো মাম্মা। আমি পিছনে বসবো। “

বাণী অগ্যতা একাই গিয়ে সামনে বসে। বাণী উঠে বসতেই দূর্জয় গিয়ে বহ্নিকে পিছনে বসিয়ে দেয়। অত:পর নিজে সামনে গিয়ে বসে। পুরো রাস্তা জুড়ে বহ্নি এবং দূর্জয় গল্প করে কাটিয়েছে। আর বাণী নীরবে তাদের কথপোকথন অবলোকন করে কাটিয়েছে। হুটহাট তার মনে হচ্ছিলো সবটা স্বপ্ন। যে-ই জীবন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তা নিছকই কোনো স্বপ্ন মাত্র।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন