ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৬৫তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৬৫.

সারিবদ্ধ এম্বুল্যান্স গুলোর ভীড় জমেছে ঢাকার পান্থপথের রাস্তা জুড়ে। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানব দেহ গুলোকে পালাক্রমে স্ট্রেচারে তুলে ত্রস্ত পায়ে এম্বুল্যান্স গুলোর দিকে ছুটছে একদল হসপিটাল কর্মী। ভীড় জমেছে পুলিশ কর্মকর্তাদের, সেনাবাহিনীর এবং সাংবাদিকদের। হাজার মানুষের ভীড়ের মাঝে নীরব ভঙ্গিতে রাস্তার ধারে বসে আছে সবুজ এবং খাকি রঙের মিশেলের ইউনিফর্ম পরিহিত এক পুরুষ। কিছুক্ষণ আগেই ভাই তূল্য বন্ধুর লাশ নিজে বয়ে এম্বুল্যান্সে তুলে দিয়েছে সে। কি ভারী সেই লাশের ভার!

খুব কাছেই শোনা যাচ্ছে সাংবাদিকদের লাইভ বক্তব্য। সাইফের কানে ভেসে আসছে সেই কথাগুলো,

“ আরো একবার দেশের বুকে বয়ে গেলো একটা রক্তক্ষয়ী হামলা। প্রাণ হারিয়েছে প্রায় শতাধিক মানুষ। জনগণের প্রশ্ন কি করছে সামরিক বাহিনী? কি করছে পুলিশ সমাজ? তাদের উদাসীনতাই কি হামলাকারীদের সাহস বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে? হামলা… “

সাইফ নীরবে শুনে সবটা। মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সত্যিই তো! সামরিক বাহিনী খুব উদাসীন! মুখে আঙুল দিয়ে চুষছে তারা। কোনো দায়িত্ববোধ নেই তাদের। দেশের মানুষ গুলোর তো এটাই ধারণা।

দেশটাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কত-শত সৈন্য প্রতিনিয়ত সীমান্তে নিজেদের জীবন হারাচ্ছে সেই হিসেব কি এই দেশ বাসীর আছে? আজকের হামলায় এতো গুলো নিহত মানুষের ভীড়ে যে একজন সৈন্যও প্রাণ হারালো, সেই দিকে কি কারো হুশ আছে? উঁহু। নেই। সৈন্যরা মানুষ না। তাদের জীবনের মূল্য নেই। একটা কেনো, একশোটা সাদাত সরকার মরলেও এই দেশের মানুষ গুলোর কিছুই আসবে যাবে না।

যায় আসবে কেবল শহীদের পরিবারের। সেই মা'য়ের যে কিনা নিজের ছেলে হারালো, সেই বোনদের যারা নিজেদের মাথার উপরের ছায়া হারালো, সেই বন্ধুদের যারা ভাই তূল্য সহোদর হারালো, সেই প্রেয়সীর যে কিনা গোপন অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু হারালো। এই দেশের মানুষ গুলোর একটা লেফটেন্যান্ট সাদাত সরকার হারানোতে খুব বড়ো কোনো ফারাক পড়বে না।

একজন সৈন্য এগিয়ে এসে সাইফকে নিজের হাতের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলে,

“ লেফটেন্যান্ট, জুলফিকার স্যার কথা বলবেন। “

সাইফ নীরবে ফোনটা কানে ধরে হ্যালো বলতেই জুলফিকার মুজতবা বলে,

“ গেট এ গ্রিপ ইয়াং ম্যান। তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি। কিন্তু নিজেকে সামলে নাও। শহীদকে আগামীকাল নিজের ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হবে। আমি, মেজর দূর্জয় সহ বাকি লেফটেন্যান্টরা সকাল দশটার ভেতর খুলনায় পৌঁছে যাবো। শহীদকে নিজের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটা তোমার রইলো। “

সাইফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

“ রজার দ্যাট স্যার। “

জুলফিকার মুজতবা শক্ত গলায় কথাগুলো বললেও উনি সাইফের অবস্থা কল্পনা করতে পারছেন। বহু বছর আগে তিনিও ভাই সমতুল্য কারো লাশ বহন করেছিলেন। সেই ভারটা বওয়া যে মোটেও সহজ নয় তা তিনি ভালো করেই জানেন। কিন্তু তাদের পেশায় সেই হারানোর আবেগটুকুকে দীর্ঘক্ষণ স্থান দেওয়ার সুযোগ নেই। এই একরোখা কর্মজীবনের বড্ড নিষ্ঠুর এক নিয়ম এটা। তবে সৈন্যদের অভিযোগ করার সুযোগ নেই সেসব নিয়ে। কারণ সৈন্যদের তো এরকম-ই হওয়া চাই। শক্ত পিলারের ন্যায়। যত বড় ভূমিকম্পই আঘাত হানুক না কেনো তাদের ভেঙে পড়া যাবে না। নাহয় ইমারতের ন্যায় এই দেশটাও যে দূর্বল হয়ে পড়বে।

ফোনটা রেখে আরো কিছুক্ষণ বসে রয় সাইফ। পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ সৈন্য বলে উঠে,

“ লেফটেন্যান্ট, গাড়ি অপেক্ষা করছে। হসপিটাল যেতে হবে আমাদের। চলুন। “

সাইফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“ আপনি যান। আমি আসছি। দুই মিনিট সময় দিন। “

সৈন্যটা চলে যেতেই সাইফ এবার নিজের পকেট হতে ফোনটা বের করে। বুকের ব্যথার ভার যতই ভারী হোক না কেনো, নিজের প্রেমিক হওয়ার দায়িত্বটা ভুলে যায় না সে। তার চিন্তায় রাত জেগে বসে থাকা অভুক্ত প্রেয়সীকে কল করতেই ফোনটা রিসিভ হয়। সম্ভবত ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিলো। নিশা অস্থির গলায় বলে,

“ হ্যালো? ঠিক আছেন আপনি? সাদাত ভাইয়া… আমি শুনেছি। আপনার খুব খারাপ লাগছে তাই না? আল্লাহ ভাইয়াকে জান্নাত নসিব করবে। এই… আপনার কান্না পাচ্ছে? কাঁদতে ইচ্ছে করছে? কাঁদুন প্লিজ। মনে জমিয়ে রাখবেন না। আমার কাছে লজ্জা পাবেন না। আমি আপনার কান্নাটুকু না দেখলে কে দেখবে বলুন? “

সাইফ শান্ত ভঙ্গিতে শুনে সবটা। অত:পর শীতল গলায় বলে,

“ ঠিক আছি ইয়াসমিন। অস্থির হবেন না। ঘুমিয়ে পড়ুন আপনি। “

নিশা স্থির হয় না। তার বুকে অদ্ভুৎ যন্ত্রণা হচ্ছে। এই লোকটা পাথর নাকি? কখনো কাঁদে না কেনো? কোন কৃষ্ণ গহ্বরে লুকিয়ে রাখে এতো অপ্রাপ্তি আর হারানোর হিসাব? নিশার খুব কান্না পায়। কান্নাটা সে দমিয়ে রাখতে পারে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। তার নাক টেনে কান্নার শব্দ ফোনের অপর পাশের মানুষটা শুনে। সাইফ ঠোঁট কামড়ে আকাশ পানে চায়। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে আসলেও স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ কিভাবে কাঁদবো ইয়াসমিন? আমার হয়ে আমার দুঃখ গুলোর যন্ত্রণায় কাঁদার জন্য আপনি আছেন। আমি না দেখানো সত্ত্বেও আমার দুঃখ গুলো আপনি দেখতে পাচ্ছেন। কি অদ্ভুৎ! “

__________

দু হাতের বেশ কিছু আঙুলের নখ উপড়ে ফেলার যন্ত্রণা বিন্দু পরিমাণ অনুভব করছে না হিরণ। তার বুকে অদ্ভুৎ প্রশান্তি বয়ে যাচ্ছে। সেই প্রশান্তি এতটাই স্বস্তিদায়ক যে একটু পর পর হিরণ আপন মনে হেসে উঠছে। নির্মল সেই হাসির ভঙ্গি। বাণী আর বহ্নি বেঁচে আছে, এই ছোট সত্যিটাই তাকে মন খুলে হাসতে বাধ্য করছে। যদিও প্রথমে সে সত্যটা বিশ্বাস করতে চায় নি। ভেবেছিলো তার পেট থেকে তথ্য জানার জন্য জুলফিকার মুজতবার সাজানো কোনো ফাঁদ এটা। তবে যখন জুলফিকার মুজতবা একটা নাম্বার ডায়াল করে ফোনটা স্পিকারে দেয়, তখনই ফোনের অপরপাশ হতে বাণীর কণ্ঠ স্বর শুনতেই হিরণের বিশ্বাস হয় বাণী বেঁচে আছে। পেছন হতে বহ্নির গলাও শুনতে পেয়েছিলো হিরণ।

মানুষ দুটোকে বর্বরদের হেনস্থার শিকার হওয়া থেকে বাঁচাতে সে বাধ্য হয়ে ওই মুহুর্তে সত্যটা জুলফিকারকে জানায়। বাণী আর বহ্নির জীবনের থেকে বেশি ওই হামলাটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। মনটা বেশ ফুরফুরে হওয়ায় হিরণের হঠাৎ করে মনে পড়ে অতীতের সামান্য এক ঝলক।

বাণীকে নিজের বাসায় আনার তিন মাস পরের ঘটনা। দিনের বেলা ইচ্ছাকৃতভাবেই বাণীর খুব একটা মুখোমুখি হতো না হিরণ। তাকে দেখলেই বাণী ক্ষেপে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যেতো। সারাদিন অদ্ভুৎ এক আতংক নিয়ে জেগে থাকতো মেয়েটা। রাতেও আতংকের কারণে ঠিকঠাক ঘুমোতে পারতো না। ভয় পেতো এই বুঝি হিরণ তার কাছে এলো।

হিরণ এসব দেখতো, বুঝতো, তবে কিছু বলতো না। তবে মাত্রারিক্ত ঘুমের ঘাটতির ফলে বাণী অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে ভেবে সে গোপনে এক ডাক্তারের পরামর্শে বাণীর জন্য ঘুমের ওষুধের পথ বেছে নেয়। সরাসরি অফার করলে বাণী কখনোই ওষুধ খেতে রাজি হতো না বলে, সে ঘরের রাধুনিকে বলে রেখেছিলো যেনো প্রতি রাতে বাণীর খাবারের সাথে ওষুধ গুড়ো করে মিশিয়ে দেয়। এই পন্থাটা কার্যকরী ছিলো। স্লিপিং পিলের সুবাদে রাতের সময়টুকু বাণী একটু ঘুমের দেখা পেতো। এতে অবশ্য হিরণেরও সুবিধা হতো। ঘুমের ঘোরে বাণীর রুমে গেলেও কখনো বাণী তা টের পেতো না। হিরণ মাঝেমধ্যে যখন বাণীকে ছুঁয়ে দিতো তখনো বাণীর হদিস থাকতো না। বাণীকে কাছ থেকে দেখার অফুরন্ত সময় পেতো তখন সে। ঠিক প্রথমদিন হসপিটালে সেই মুখ দর্শনের ন্যায়।

এরকমই একদিন রাতে বাণী ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার পর হিরণ রুমে প্রবেশ করে। রুমের লাইট জ্বেলে দিয়ে সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে বাণীর পাশে বসে। বেশ অনেকক্ষণ নীরবে সেই মুখশ্রী পরখ করে উঠে যেতে নিয়েই হঠাৎ খেয়াল করে যে বাণীর ঘাড়টা বেকায়দায় বাকা হয়ে আছে। কি ভেবে যেনো হিরণ এগিয়ে গিয়েছিলো ঘাড়টা ধরে মাথাটা সামান্য সোজা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু যে-ই মুহুর্তে সে বাণীর ঘাড় ছোঁয় সঙ্গে সঙ্গে বাণী চোখ মেলে তাকায়। আকস্মিক ঘটনায় হিরণ যতটা না হতবিহ্বল হয় তার থেকেও বেশি অবাক হয় যখন পেটের বাম পাশের খানিকটা উপর দিকে শার্ট চিরে শরীরের ভেতর ধারালো কিছুর প্রবেশ টের পায়।

হিরণ বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে বাণীর দিকে তাকায়। বাণী এবার নিজের হাতের চাকুটা আরেকটু মোচড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে হিরণ চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। বাণী এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে চাকুটা হিরণের পেট থেকে বের করে এক লাফে উঠে বসে। হিরণকে ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে মেঝেতে ফেলে চাকু হাতে লাফিয়ে নিজেও বিছানা ছেড়ে নামে। দ্রুত পায়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।

হিরণ একহাতে পেটের পাশটা চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়। পেট থেকে তার তখন গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। তবুও দম খিচে রুম থেকে বেরিয়ে হিংস্র এবং উচ্চ স্বরে ডাকে বাণীর নাম ধরে। বাণী তখন বাড়ি ছেড়ে কেবল বাহিরে পা রেখেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে একঝাঁক গার্ডের সম্মুখীন হয়। বাণী আর এগোতে পারে না। পিছন হতে সেই হিংস্র স্বর শুনে টের পায় হিরণও আসছে। হিরণ যখন পোর্চের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক সেই মুহুর্তে বাণী ধারালো চাকুটা নিজের গলার কাছে চেপে ধরে। রাগ, ক্ষোভ এবং উত্তেজনায় সে দিকদিশা শূন্য হয়ে মৃদু কাঁপছিলো। চেঁচিয়ে বলে উঠে,

“ কাছে আসার চেষ্টা করবে না কেউ। আমি এই চাকু চালানোর আগে একবারও ভাববো না। দূরে থাকো। কেউ আমার কাছে আসবে না। “

মানসিক ভাবে সেই মুহুর্তে বাণী শক্ত থাকার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হচ্ছিলো না। বারবার এলোমেলো হয়ে পড়ছিলো। নিঃশ্বাসের গতিও ছিলো বেগতিক। সে নিজ চোখে সে রাতে রাধুনিকে তার খাবারে কিছু একটা ওষুধ গুড়ো করে মেশাতে দেখেছে। ওষুধটা কিসের তা বাণীর অজানা ছিলো। তবে সে নিজে হিসেব করে দেখে গত বেশ ক'দিন ধরে সে চাইতেও রাতে জেগে থাকতে পারছে না। কেমন চোরাবালির ন্যায় ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে। তার মানে ওষুধটা খুব সম্ভবত ঘুমের ছিলো। বাণীর মাথায় বারবার শুধু একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো যে তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়ার পিছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? ঘুমন্ত অবস্থায় কি ওই লোকটা তার কাছে আসতো? এসব ভাবতেই বাণীর কান্না পায়। সে আরেকটু জোরে নিজের গলার কাছে চাকুটা চেপে ধরে।

হিরণের শুভ্র রঙা শার্টটা তখন রক্তের কারণে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সে সেই ব্যথা উপেক্ষা করে ধমকের সুরে বলে,

“ চাকুটা ফেলো বাণী। ধার আছে খুব। একটা অঘটন ঘটে যাবে। “

“ একশো বার অঘটন ঘটাবো। আপনি খুব ভালো সাজার নাটক করেন না আমার সামনে? বুঝাতে চান আমার অনুমতি ব্যতীত কাছেও ঘেঁষবেন না। অথচ ঠিকই প্রতিরাতে আমার খাবারে ঘুমের ওষুধ মেশান। তারপর কি করেন আপনি? আমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আপনি আমার কাছে আসেন তাই না? আপনি একটা… “

বাকি কথাগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে বলে বাণী। হাতের চাপটা একটু জোরে লাগতেই চাকুর ধারে তার গলার কাছে খানিকটা চামড়া কেটে যায়। সেখান থেকে টুপটুপ করে রক্ত পড়তে শুরু হয়। হিরণ অস্থির হয়ে উঠে। ঠিক সেই মুহুর্তে অতি সাবধানে পিছন থেকে একজন গার্ড এসে বাণীর হাত থেকে চাকুটা ছুড়ে ফেলে তার দুই হাত চেপে ধরে। বাণী তখন হাত পা ছোড়াছুড়ি করছিলো। সেই গার্ডদের উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করছিলো। বেগতিক অবস্থা সামাল দিতে আরেকজন গার্ড কথা থেকে জেনো একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ হাতে এগিয়ে এসে তা বাণীর হাতের বাহুর কাছে পুশ করে। সঙ্গে সঙ্গে বাণী চিৎকার করে বলে,

“ চরিত্রহীন লম্পট আপনি। আমাকে অজ্ঞান করে, আমার সুযোগ নিতে চান। শেষ করে দিবো। সব শেষ করে দিবো। আপনাকে শেষ করতে না পারলে নিজেকে শেষ করে দিবো, তবুও কখনো এসব মেনে নিবো না। আমি… “

বাকি কথা আর শেষ করতে পারে না বাণী। তার আগেই অসাড় দেহ নিয়ে ঢুলে পড়ে। গার্ডরা বাণীকে সামলাতে নিলেও হিরণ সেই সুযোগ দেয় না। দৌড়ে এগিয়ে এসে নিজেই বাণীকে ধরে। চিল্লিয়ে বলে,

“ দাঁড়িয়ে মুখ না দেখে একটা ডাক্তার তুলে আনো এই মুহুর্তে। গলা থেকে রক্ত ঝরছে ওর। বি ফাস্ট। “

সবাই হিরণের আদেশ মানলেও একজন কিশোর কেবল এগিয়ে আসে হিরণের চিন্তায়। বলে,

“ স্যার, আপনার পেট থেকেও রক্ত ঝরছে। “

হিরণ কিশোর ইবাতের কথায় বেশি একটা গুরুত্ব না দিয়ে বাণীকে পাজাকোলে তুলে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে তার পেটের পাশটা আরো ব্যথা করে উঠে। সে দাঁত খিচে বলে,

“ ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আসো ইবাত। “

অতীত থেকে ফিরে আসতেই হিরণের মন আচমকা খারাপ হয়ে যায়। বাণীর ঘৃণার তীব্রতা এতটাই বেশি যে এতগুলো বছর সে স্বেচ্ছায় মরতেও রাজি ছিলো, তবুও এক মুহুর্তের জন্য হিরণকে মেনে নিতে রাজি হয় নি। হিরণের মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি মৃত্যুর থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক? কে জানে! আগে কখনো এসব নিয়ে তেমন একটা ভাবা হয় নি হিরণের। অবশ্য সেই ফুরসতও মিলতো না তার। কিন্তু এখন এই চার দেয়ালের ভেতর বন্দী অবস্থায় তার কাছে অফুরন্ত সময় আছে এসব ব্যাপার নিয়ে ভাবার।

হিরণ পেটের কাছ দিয়ে কাপড়টা সামান্য তুলে সাত বছর পুরনো ক্ষতে সেলাইয়ের দাগটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয়। অত:পর আবার মলিন মুখ নিয়ে বসে রয়।

__________

রাজশাহী শহরে চলমান ডুমস ডে অপারেশন সফল হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বোম ডিফিউজ করার মাধ্যমে। সেকারণে সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শূন্য বললেই চলে। চট্টগ্রাম শহরের অপারেশনটাও মেজর শাহরিয়ার দূর্জয়ের পরিচালনায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও বিস্ফোরণ চট্টগ্রামের বুকেও ঘটেছে। তবে সেই বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য শাহরিয়ার দূর্জয় যথাসময়ে পুলিশের সহায়তায় কাদিরগঞ্জ মোড়ের সকল প্রবেশ পথ বন্ধ করানোর পদক্ষেপ নেয়। সেই সঙ্গে আশংকাজনক জায়গাটাও সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য করে তুলে দ্রুততার সহিত। এতে করে বিস্ফোরণে কোনো মানুষের শারীরিক ভাবে সামান্যতম ক্ষতিটুকুও হয় নি।

রাত তখন ক'টা বাজে কে জানে! বাড়ির আঙিনায় এসে থামলো কালো রঙা জিপটা। দূর্জয় গাড়ি ছেড়ে নামতে নামতেই দেখলো বাড়ির দরজা খুলে পোর্চে এসে দাঁড়িয়েছেন সুহালা বেগম। মা ছেলে দু'জনের মুখভঙ্গিই স্বাভাবিক। দূর্জয় এগিয়ে এসে বলে,

“ আমি বাচ্চা নই মামণি। ঘুমিয়ে পড়লেই পারতে। সারাদিন কম ধকল যায় নি তোমার উপর দিয়ে। “

সুহালা বেগম কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আলতো করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। মনে মনে আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া জানায় তার ছেলেকে আরো একবার অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। পরপর এই মুহুর্তে সাদাতের মা'র কি অবস্থা হতে পারে সেটা ভেবেই বিষণ্ণ মন নিয়ে নরম স্বরে বলে,

“ আল্লাহ জান্নাত নসিব করুক ছেলেটাকে। “

দূর্জয় স্বাভাবিক গলায় আমিন শব্দটা উচ্চারণ করে। চোখের সামনে তার এখনো ভাসছে সাদাতের মুখ। আজকে সন্ধ্যায়ই তো ছেলেটাকে জীবিত অবস্থায় দেখেছিলো দূর্জয়। এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কর্মোঠ ছেলেটা আর নেই ভাবতেই সূক্ষ্ণ শূন্যতা তার মনকে ব্যথিত করে তুলছে।

সুহালা বেগম ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে ভেতরে আসার সুযোগ দেয়। দূর্জয় সোফায় এসে বসে জুতো খুলতে খুলতে প্রশ্ন করে,

“ বাণী বহ্নি ঘুমিয়েছে? “

“ হ্যাঁ। বাণী তোমার অপেক্ষা করে জেগেছিলো অনেকক্ষণ। ক্লান্ত শরীর কতক্ষণ আর সায় দেয়? ভাগ্যিস একটু ঘুমিয়েছে। “

“ খাওয়া দাওয়া করেছে? “

“ না। জোর করেছি। মুখে তুলে নি। “

দূর্জয় ভ্রু কুচকে তাকায়। এই ভয়ংকর লো প্রেশার নিয়ে না খেয়ে থাকার মানে কি? বাণী কি ভেবেছে স্বামীর অপেক্ষায় না খেয়ে থাকাটা স্ত্রী গত দায়িত্ব? দূর্জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার ওয়াইফকে গ্রুমিং করতে হবে। পাকাপোক্ত স্ত্রী হওয়ার ট্রেনিং দেওয়ার প্রয়োজন।

“ খাবার গরম বসাই? “

সুহালা বেগমের কথার পিঠে দূর্জয় বলে,

“ না। খেতে ইচ্ছে করছে না। সকাল সকাল রওনা দিতে হবে। খুলনা যাবো। সাদাতের বাড়িতে। “

সুহালা বেগম আর ছেলেকে জোর করেন না। দূর্জয় জুতো জোড়া খুলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। নীরবে রুমে প্রবেশ করতেই দূর্জয়ের চোখ যায় সর্বপ্রথম বিছানার দিকে। বিছানার ডান পাশটায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে বাণী। গায়ে বিয়ের পোশাকটা বদলে তার পরিবর্তে এখন একটা সাদা রঙের সুতির কামিজ। তার ঠিক পাশেই বিছানার মাঝখানের জায়গাটা দখল করে ঘুমোচ্ছে বহ্নি। দূর্জয় দেয়ালের একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে দৃশ্যটা। অত:পর আলমারির কাছে গিয়ে যতটা নিঃশব্দে সম্ভব নিজের ঘরে পরিধেয় পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। লম্বা একটা গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিছানার বাম পাশটায় থাকা খালি জায়গায় গিয়ে নীরব বসে।

সম্পূর্ণ রুমটা তখন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মৃদু আলোকিত। দূর্জয় বুঝে উঠতে পারে না তার কি আলোটা নিভিয়ে দেওয়া উচিত হবে? কিঞ্চিৎ পরিমাণ আলোর ভেতর দূর্জয়ের চোখে কখনো ঘুম নামে না। কিন্তু বাণী আর বহ্নি যদি ভয় পায়? এই ভেবে আর আলোটা নেভায় না সে। সামান্য এগিয়ে গিয়ে কম্বলটা আরেকটু টেনে মানুষ দুটোর গা ঢেকে দেয়। পরপর নিজের গায়েও কম্বলের একাংশ টেনে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। বাণী বহ্নির দিকে ফিরে ঘুমোচ্ছিলো। তার এক হাত ছিলো কম্বলের উপর দিয়ে বহ্নির বুকে রাখা। দূর্জয়ও পাশ ফিরে বাণীর মুখোমুখি হয়। অত:পর নিজের একটা হাত বাড়িয়ে বাণীর হাতের উপর রাখে। মনে মনে ভাবে ভাগ্যের খেলা কি অদ্ভুৎ! তেরো বছর আগের দূর্জয় কস্মিনকালেও কখনো কল্পনা করে নি যে ভবিষ্যতে এসে এই নারীই একদিন তার স্ত্রী হবে।

__________

সকাল এগারোটার দিকে বাড়ির দরজায় কারো করাঘাতের শব্দ হতেই সাওদা সবার আগে দৌড়ে যায় দরজা খুলতে। চোখমুখের তার থমথমে অবস্থা। গত রাত থেকে মা আর সায়রাকে এই বলে বুঝ দিয়ে আসছে সে যে তার মারাত্মক মাথা ব্যথা। ওই দুটো মানুষের এখনো বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে কি হয়েছে।

দরজাটা খুলতেই দ্বারপ্রান্তে একজন সিনিয়র অফিসারকে দেখতে পেয়ে সাওদার পা জোড়া টলে উঠে। সে দাঁতে ঠোঁট চেপে পিছনে তাকায়। আরো বেশ কিছু সংখ্যক ইউনিফর্ম পরিহিত সৈন্যকে দেখতে পায় সে। ইতিমধ্যে তাদের উঠোনে এলাকার উৎসুক মানুষজন ভীড় জমাতে শুরু করে দিয়েছে। উঠোন পেরিয়ে বাহিরে চোখ পড়তেই সাওদা দেখতে পায় বেশ কিছু গাড়ির ভীড়ে লাশবাহী গাড়িটা।

ঠিক সেই মুহুর্তে শাহানা বেগম ভেতরের রুম থেকে বলতে বলতে বের হয়,

“ কে রে সাওদা? “

দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই শাহানা বেগম বিস্মিত হয়। অস্ফুটে বলে,

“ স্যার আপনি! “

জুলফিকার মুজতবা নিজের মাথার টুপিটা নামিয়ে শান্ত স্বরে বলে,

“ আল্লাহ আপনাদের ধৈর্য্য দিক। “

শাহানা বেগম অবাক হয়ে সবাইকে দেখে একবার। হঠাৎ তার চোখ পড়ে সেই লাশবাহী গাড়িটার দিকে। তার অবচেতন মন বুঝতে পারে সম্পূর্ণ ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সেই লাশবাহী গাড়িটার দিকে ছুটে যায়।

“ আমার বাপজান, আমার বাপজান। “

বলে বাতাসটা ভারী করে তুলে। সায়রা তখন নিজের রুমে ঘুমোচ্ছিলো। মায়ের চিৎকার চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙে যায়। সে চোখ ডলতে ডলতে বাসার দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই বিস্মিত হয়। হতভম্ব স্বরে দরজার ধারে মেঝেতে বসে থাকা বোনকে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে আপু? মা কান্না করছে কেনো? “

সাওদা জবাব দেয় না। কেমন নিষ্প্রাণের মতো পড়ে রয়। সায়রা জবাবের অপেক্ষা না করে খালি পায়ে দৌড়ে উঠোন পেরিয়ে গিয়ে মা'কে জাপ্টে ধরে। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় প্রশ্ন করে,

“ তুমি ভাইয়ার নাম ধরে ডাকছো কেন? আমার ভাইয়া এই গাড়ির ভেতর নেই। তুমি এই গাড়ির দরজা থেকে সরে আসো। “

এলাকার কিছু মহিলা ইতিমধ্যে এসে শাহানা বেগম এবং সায়রাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মা মেয়ে যেনো প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কে কত বেশি ক্ষত-বিক্ষত হতে পারে আজ। কেবল নীরব রয় সাওদা। কাঁদতে পারে না সে। গতরাত সবাইকে আড়াল করে এক সমুদ্র কেঁদেছে সে। এই মুহুর্তে ভাই হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারলেও কান্নাটা আর আসছে না। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে কেমন!

সকল লেফটেন্যান্টদের মাথা তখন নত। তাদের সাহস হয় না এই দৃশ্যটুকুর সাক্ষী হতে। বেশিক্ষণ সাওদা নিজেকে সামলাতে পারে না। এই ভারী পরিবেশে তার নিঃশ্বাস আটকে আসে। সে এলোমেলো ভঙ্গিতে উঠে সোজা বাড়ির পিছনের উঠোনের দিকটায় চলে যায়। এক জোড়া চোখ অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে দেখে সেই দৃশ্য। পর মুহুর্তেই চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে বন্ধুর মা এবং ছোট বোনের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে। মনে মনে ভাবে দেশটাকে দেখার জন্য তো সৈন্যের অভাব হবে না, কিন্তু যেই পরিবারটা নিজেদের একমাত্র ছেলেকে হারালো তাদের দেখভাল কে করবে?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন