ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ব্যারিস্টার সাহেব

১৪তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ১৪

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

দরজাটা সামান্য খোলাই ছিল। তাওহীদ দেখল, সিদরা খাটের ওপর বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তোহফার একটা ফ্রকের নিচে ছিঁড়ে যাওয়া সুতোর অংশটা সুই-সুতো দিয়ে সেলাই করছে। তার মুখে কোনো ক্লান্তি নেই, বরং একটা পরম শান্তির গুনগুন গান। সেলাই করার সময় তার সেই ফর্সা কপাল আর কপালে থাকা সেই ছোট তিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—ঠিক চেম্বারে দেখা সেই ১৮ বছর আগের ছবির বাচ্চার মতো।

তাওহীদ ঘরের ভেতর পা রাখতেই সিদরা চমকে উঠে দাঁড়াল। সে দ্রুত হাতের সুই-সুতো পাশে রেখে মাথার ওড়নাটা একটু টেনে বলল,

❝ব্যারিস্টার সাহেব? আপনি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন যে? কোর্টে কি কোনো প্রবলেম হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে আপনার?❠

সিদরার এই অকৃত্রিম উদ্বেগ দেখে তাওহীদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে ব্রিফকেসটা টেবিলের ওপর রেখে সিদরার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটোতে আজ কোনো পেশাদারিত্বের কঠোরতা ছিল না, ছিল এক অসীম মায়া।

সে সিদরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল, যা তাদের দাম্পত্য জীবনে বেশ বিরল। সে সিদরার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর এবং গভীর গলায় বলল,

❝সিদরা... আমি যদি তোমাকে তোমার অতীত নিয়ে, তোমার ছোটবেলার কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করি—তুমি কি আমাকে একদম সত্যি উত্তর দেবে?❠

তাওহীদের এই হঠাৎ গম্ভীর এবং অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে সিদরা কিছুটা অবাক হলো। সে হাতের ফ্রকটা বিছানায় রেখে চোখ নিচু করে বলল, ❝আমি তো আপনাকে কখনো কোনো মিথ্যা বলিনি ব্যারিস্টার সাহেব। কিন্তু আমার ছোটবেলার কথা তো আমি নিজেই বেশি কিছু জানি না। চার বছর বয়স থেকে আমি ওই এতিমখানার চার দেয়ালের ভেতরেই বড় হয়েছি। আমার শুধু আবছা মনে পড়ে, ছোটবেলায় একজন বৃদ্ধ মানুষ আমাকে খুব আদর করতেন, আমাকে কোল থেকে নামাতেন না। আর একটা বড় গাড়ি ছিল আমাদের। এর বাইরে আমার পরিবার বা আমার বাবা-মা কেমন ছিলেন, তা আমার স্মৃতিতে এক্কেবারে ধূসর।❠

সিদরার এই সরল উত্তর শুনে তাওহীদ একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, সিদরা সত্যিই সম্পূর্ণ নিষ্পাপ এবং এই নোংরা পৃথিবীর জালিয়াতি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবগত নয়। তাওহীদ টেবিল থেকে ব্রিফকেসটা খুলে সেই হলদেটে ফাইলটা বের করল।

সে ফাইলটা সিদরার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

❝সিদরা, তুমি আজ সুপ্রিম কোর্টের একজন ব্যারিস্টারের স্ত্রী। আর একজন আইনজীবী হিসেবে আমি আজ তোমাকে তোমার সেই ধূসর স্মৃতির আসল দলিল দেখাতে এসেছি। এই ফাইলটা ভালো করে দেখো।❠

সিদরা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ফাইলটা হাতে নিল। সে প্রথম পাতাটা ওল্টাতেই সেই পুরনো ছবিটার ওপর তার নজর পড়ল। ছবিটার দিকে তাকাতেই সিদরার বুকের ভেতরটা যেন এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল। এই ছোট বাচ্চাটা... এর কপালে যে ঠিক তার মতোই একটা তিল আছে! সিদরা নিজের অজান্তেই বাম হাত দিয়ে নিজের কপালের তিলটা স্পর্শ করল।

সে কাঁপানো আঙুলে ফাইলের পরবর্তী কাগজগুলো ওল্টাতে লাগল। যেখানে বড় বড় অক্ষরে তার বাবা সাজ্জাদ আলী এবং দাদা আশরাফ আলীর নাম লেখা ছিল। ১৮ বছর ধরে যে মেয়েটি নিজেকে একাকী, পরিবারহীন ভেবে রাতে চোখের জল ফেলেছে, সে আজ নিজের চোখের সামনে নিজের আসল বংশপরিচয় দেখতে পাচ্ছে!

সিদরার চোখ দুটো এক মুহূর্তে অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে গেল। তার হাত থেকে ফাইলটা বিছানার ওপর পড়ে গেল। সে খাটের কোণায় ধপ করে বসে পড়ল। তার পুরো শরীর কাঁপছিল। সে তাওহীদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত রুদ্ধ কন্ঠে বলল,

❝এসব... এসব কী ব্যারিস্টার সাহেব? এই বাচ্চাটা কি আমি? আমার দাদু... আমার দাদু আমাকে ফেলে দেননি? তাহলে আমি এতিমখানায় গেলাম কীভাবে?❠

তাওহীদ সিদরার পাশে বিছানায় বসল। সে সিদরার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। এই প্রথম তাওহীদ নিজে থেকে সিদরার হাত স্পর্শ করল, শুধু একজন স্বামী হিসেবে তাকে সান্ত্বনা দিতে।

সে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,

❝তোমাকে কেউ ফেলে দেয়নি সিদরা। তোমার দাদু তোমাকে এই শহরের সবচেয়ে বড় সম্পত্তির মালকিন করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তোমার আপন চাচা, তোমার দাদুর ছোট ভাই লোভের বশে তোমার সাথে এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তোমাকে এতিম বানিয়ে তারা আজ কোটি কোটি টাকার মালিক সেজে বসে আছে।❠

তাওহীদের এই কথা শুনে সিদরার চোখের জল আর বাধা মানল না। সে নিজের মুখটা দুইহাতে ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তবে এই কান্না নিজের পরিচয় পাওয়ার আনন্দে নয়, এই কান্না আপন মানুষের এই ভয়ঙ্কর রূপ আর দীর্ঘ ১৮ বছরের একাকীত্বের তীব্র কষ্টে।

তাওহীদ সিদরাকে নিজের বুকের কাছাকাছি টেনে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু এক ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় বলল,

❝সিদরা, তুমি কাঁদবে না। ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী বেঁচে থাকতে আপনার এই চোখের জলের প্রতিটা ফোঁটার হিসাব ওই অপরাধীদের দিতে হবে। ১৮ বছর আগে তারা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়েছিল, কিন্তু আজ তারা সুপ্রিম কোর্টের কাঠগড়া থেকে রেহাই পাবে না। আমি নিজে তোমার এই কেস লড়ব এবং তোমার হৃত গৌরব, তোমার দাদুর সেই ট্রাস্ট তোমাকে ফিরিয়ে দেবো।❠

❝কিন্তু আমাকে এটা বলো, তোমার এখন যেই বাবা মা, যাদের সাহায্যে আমাদের বিয়ে হয়েছে। তারা কি তোমার আসল বাবা মা নয়?.❠

তাওহীদ ভাবুক হয়ে সিদরাকে জিজ্ঞেস করল।

❝না ব্যারিস্টার সাহেব, তারা তো আমাকে এতিমখানা থেকে চিনেছেন। ছোট থেকেই আমাকে অনেক আদর করতেন। তাদের কোন সন্তান ছিল না। তারপর অনেক বছর পর মাইশা হয়েছে। তারা আমাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন, আর আমিও তাদের মা বাবাই ভেবেছি। তবে তারা আমাকে জন্ম দেননি।❠

সিদরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠলো। তাওহীদ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল…

❝আর কেঁদো না সিদরা, এখন তোমার আমি আছি, তোহফা আছে। আর কোন ভয় নেই।❠

সিদরা তাওহীদের এই তীব্র প্রটেক্টিভ এবং ভালোবাসাপূর্ণ রূপ দেখে নিজের কান্না থামাল। সে চোখের জল মুছে তাওহীদের দিকে তাকাল। অন্দরের এই শান্ত মেঘ এবার এক নতুন আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিতে চলেছে।

ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ

উত্তরায় আমজাদ আলীর সুপরিসর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট অফিসের চারতলায় তখন এক থমথমে পরিস্থিতি। এসি-র ঠান্ডা বাতাসও ঘরের ভেতরের উত্তেজনাকে প্রশমিত করতে পারছিল না। বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর পড়ে আছে সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল প্যাডে লেখা একটি চার পাতার আইনি নোটিশ। নোটিশের নিচে স্পষ্ট ও চেনা অক্ষরে সই করা—ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী।

আমজাদ আলীর বড় ছেলে, জাবেদ আলী হাতের জ্বলন্ত চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে নোটিশটা আবার হাতে নিল। জাবেদের বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়, চোখে-মুখে এক ধরণের ধূর্ত ও অপরাধী ছাপ। সে নোটিশের লাইনগুলো জোরে জোরে পড়তে লাগল,

❝দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) এবং ৪৬৭ (মূল্যবান দলিল জালিয়াতি) ধারা অনুযায়ী... আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাস্টের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব ও কাস্টোডি প্রকৃত উত্তরাধিকারী সিদরাতুল মুনতাহা আলীর নিকট হস্তান্তর না করা হইলে...❠

❝হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস!❠

জাবেদ টেবিলের ওপর জোরে থাপ্পড় মারল।

সোফায় বসে থাকা বৃদ্ধ আমজাদ আলী, যার চুল-দাড়ি এখন প্রায় সম্পূর্ণ সাদা এবং কোমরে ব্যথার কারণে সোজা হয়ে বসতে পারেন না, তিনি কাঁপানো গলায় বললেন,

❝আমি তোকে আঠারো বছর আগে বলেছিলাম না জাবেদ? পাপ কখনো চাপা থাকে না। মেয়েটা বেঁচে আছে! আর সে এখন কার ঘরে জানিস? ঢাকার সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল লয়ার ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীর স্ত্রী! রাশেদ চৌধুরীর পুত্রবধূ! ওই পরিবারকে আইনের মারপ্যাঁচে হারানো অসম্ভব।❠

জাবেদ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এক কুৎসিত হাসি দিল,

❝আরে রাখো তো বাবা তোমার এই পাপ-পুণ্যের গল্প! আঠারো বছর ধরে এই সম্পত্তির কোটি কোটি টাকা ভোগ করার সময় তো পাপের কথা মনে পড়েনি? এখন একটা নোটিশ আসতেই ভয় পেয়ে গেলে? ওই সিদরা একটা এতিমখানায় বড় হওয়া মেয়ে, ও আইনের কী বোঝে? তাওহীদ চৌধুরী টাকার জোরে বা অন্য কোনো কারণে এই পুরনো কেস খুঁড়ে বের করেছে। কিন্তু ও জানে না, জাবেদ আলী নিজের হাতের লক্ষ্মী এত সহজে ছাড়বে না। যদি নোটিশের জবাব সোজা আঙুলে না হয়, তবে আঙুল বাঁকা করতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না।❠

আমজাদ আলী ছেলের এই উগ্র রূপ দেখে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, আঠারো বছর আগের সেই অন্যায় আজ তাদের পুরো পরিবারকে এক এক করে গ্রাস করতে আসছে।

এদিকে চৌধুরী ভিলার পরিবেশটা আজ একটু অন্যরকম। দুপুরের লাঞ্চের পর রাশেদ চৌধুরীকে সাথে নিয়ে তাওহীদ ও সিদরা ড্রয়িংরুমে বসেছিল। টেবিলের ওপর সেই পুরনো হলদেটে ফাইলটা খোলা।

রাশেদ চৌধুরী পুরো ঘটনাটা তাওহীদের মুখে শোনার পর চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। উনার চোখ দুটো ক্ষোভে ও বেদনায় ভিজে উঠেছে। তিনি সিদরার দিকে তাকালেন, সিদরা আজ একটি হালকা ধূসর রঙের আবায়া পরে সোফায় শান্ত হয়ে বসে আছে, মুখে তার সাধারণ নেকাবটা টানা।

❝মা সিদরা❠

রাশেদ চৌধুরী অত্যন্ত স্নেহমাখা ও ভারী গলায় বললেন,

❝আমি এই শহরে আঠারো বছর ধরে ওকালতি আর জাজমেন্টের কাজ করেছি। কিন্তু নিজের ঘরের মেয়ের সাথে আপন চাচা এতটা বড় অধর্ম করেছে, তা আমি ভাবতেও পারছি না। তুমি কোনো চিন্তা করো না মা। এই চৌধুরী বাড়ি যেমন তোমাকে সম্মান দিয়েছে, ঠিক তেমনি তোমার হৃত সম্মান আর তোমার দাদুর আমানত ফিরিয়ে আনাও এখন এই বাড়ির দায়িত্ব। তাওহীদ, কেসের গ্রাউন্ডসগুলো কতটা স্ট্রং?❠

তাওহীদ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

❝আব্বু, জালিয়াতির পেপারসগুলো একদম স্পষ্ট। আমজাদ আলী ট্রাস্টের যে ডিড সাবমিট করেছিল ২০০৮ সালে, সেখানে আমার শ্যালক সাজ্জাদ আলী সাহেবের (সিদরার বাবা) যে সই দেখানো হয়েছে, তা ওনার মৃত্যুর তিন মাস পরের তারিখের! অর্থাৎ, একজন মৃত মানুষের সই জাল করা হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে এটা এক মিনিটে প্রমাণ হয়ে যাবে। আমি আজ সকালেই অফিশিয়ালি নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছি।❠

সিদরা এতক্ষণ চুপচাপ ওনাদের কথা শুনছিল। তার মনের ভেতর কোনো লোভ বা কোটি টাকার সম্পত্তির প্রতি মোহ ছিল না। তার শুধু মনে পড়ছিল তার সেই স্বর্গীয় বাবা-মার কথা, আর সেই বৃদ্ধ দাদুর কথা যিনি তাকে শেষ বয়সে আগলে রেখেছিলেন।

সে অত্যন্ত ধীর ও শান্ত গলায় বলল,

❝আব্বু, আমি ওই টাকা বা শপিং মল দিয়ে কী করব? আল্লাহ আমাকে এই ঘরে যে সম্মান আর ভালোবাসা দিয়েছেন, তাতেই আমার মন ভরে গেছে। আমার শুধু একটাই চাওয়া—আমার দাদুভাই যে পবিত্র নিয়তে ওই ট্রাস্টটা তৈরি করেছিলেন এতিম আর অসহায় মানুষের কল্যাণের জন্য, সেই ট্রাস্টের টাকা যেন ওই অপরাধীদের পকেটে না যায়। ওটা যেন আমার দাদুর আত্মার শান্তির জন্য সঠিক জায়গায় ব্যবহার হয়।❠

সিদরার এই নিঃস্বার্থ ও পবিত্র মানসিকতা দেখে তাওহীদের মনের ভেতর তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। সে সিদরার দিকে তাকিয়ে বলল,

❝তোমার দাদুর সেই স্বপ্নই পূরণ হবে সিদরা। ট্রাস্টের প্রতিটি টাকা আবার জনকল্যাণেই ফিরবে। তবে এই লড়াইটা মোটেও সহজ হবে না। আমজাদ আলীর ছেলেরা এখন শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ওনারা আন্ডারগ্রাউন্ডের নানা লোকজনের সাথে ওঠাবসা করেন। ওনারা আইনি নোটিশ সহজে মেনে নেবেন না, কোনো না কোনো নোংরা চাল চালার চেষ্টা করবেন। তাই তোমাকে এখন থেকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।❠

সিদরা নেকাবের আড়াল থেকে তাওহীদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক অটল বিশ্বাস। সে বলল,

❝আমার সাথে যখন আমার আল্লাহ আছেন, আর আমার পাশে যখন সুপ্রিম কোর্টের একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যারিস্টার স্বামী আছেন, তখন আমার কোনো ভয় নেই। আপনি যেভাবে বলবেন, আমি সেভাবেই এই আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।❠

ঠিক এই সময়েই স্কুল থেকে তোহফা ফিরে এলো। হোম-মেড খালা ওর ব্যাগটা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তোহফা ড্রয়িংরুমে ঢুকেই আব্বু আর আম্মুর মাঝখানের গম্ভীর পরিবেশটা দেখে এক লাফে সিদরার কোলে গিয়ে বসল।

❝আম্মুউ! তোমরা আবার কোনো কঠিন কথা বলছ? আজকে স্কুলে মিস মালিহা আমাকে একটা কিউট গোল্ডেন স্টার দিয়েছে, দেখো!❠

তোহফা তার ছোট হাতের তালুটা মেলে ধরল, যেখানে একটা লাল কালির স্টার আঁকা।

সিদরা তোহফাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে একটা চুমু খেল। এই বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালেই সিদরার সব কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়। সে বলল,

❝বাহ! আমার মা তো অনেক বড় স্টার পেয়েছে। চলো, এখন ঝটপট হাত-মুখ ধুয়ে দুপুরের নাস্তাটা খেয়ে নেবে।❠

তোহফাকে নিয়ে সিদরা ওপরে চলে যাওয়ার পর, তাওহীদ তার ফোনের স্ক্রিনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসতে দেখল। সে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিতেই ওপাশ থেকে এক ভারী, অহংকারী ও হুমকিমিশ্রিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

❝ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী সাহেব? আসসালামু আলাইকুম।❠

ওপাশ থেকে জাবেদ আলী কথা বলছিল,

❝আজ সকালে আপনার পাঠানো সুন্দর চিঠিটা আমি পেয়েছি। তা, অন্যের ঘরের পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে নিজের সুন্দর সংসারটায় আগুন লাগানোর কী দরকার, বলুন তো? আপনার স্ত্রী সিদরা আঠারো বছর ধরে যেখানে ছিল, সেখানেই তো ভালো ছিল। হুট করে এই বড় বাজারে এসে ও যদি হারিয়ে যায়, তবে কিন্তু খোঁজার মানুষ পাবেন না।❠

তাওহীদের চোখের মণি দুটো রাগে এক সেকেন্ডে আগুনের মতো লাল হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এক বীভৎস রূপ ধারণ করল, কিন্তু সে একজন ঝানু আইনজীবীর মতো নিজের কণ্ঠস্বরকে একদম শান্ত ও বরফের মতো শীতল রাখল।

সে অত্যন্ত ধীর শব্দে বলল,

❝মিস্টার জাবেদ আলী, আপনি হয়তো ভুলে গেছেন যে আপনি কার সাথে কথা বলছেন। সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীকে এভাবে সস্তা হুমকি দেওয়ার সাহস এর আগে যারা দেখিয়েছে, তারা আজ সবাই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের অন্ধকার সেলে বসে ঘানি টানছে। আপনার জালিয়াতির সব প্রমাণ আমার ল্যাপটপের এই ফাইলে লক করা আছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি আপনি কোর্টে এসে সারেন্ডার না করেন, তবে আপনাকে ওই জেলের কয়েদীর পোশাক পরাতে আমার এক সপ্তাহও সময় লাগবে না। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।❠

তাওহীদ এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল। ড্রয়িংরুমের এসি-র বাতাসেও তখন তাওহীদের ভেতরের রাগটা স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। অন্দরের এই শান্ত মেঘ এবার এক ভয়ঙ্কর এবং বাস্তবিক আইনি ঝড়ে রূপ নিতে চলেছে, যেখানে একদিকে থাকবে জাবেদ আলীর নোংরা ষড়যন্ত্র আর অন্যদিকে তাওহীদের ইস্পাতকঠিন আইনি দেওয়াল।

✤✣ᚔᚔ✤✣

—চলবে—

✤✣ᚔᚔ✤✣

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন