#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ২১
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
মিরপুর রোডের সেই রক্তাক্ত ও রোমহর্ষক ঘটনার পর পুরো ঢাকা শহর যেন এক তীব্র ভূকম্পনে কেঁপে উঠল। ল্যান্ড ক্রুজারের সেই মুখোমুখি ধাক্কা, ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীর নিখুঁত পিস্তলের নিশানা এবং কুখ্যাত কালা জাহাঙ্গীরের হাত উড়ে যাওয়ার খবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত এক চরম আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জেরা রুমে মাত্র তিন ঘণ্টার থার্ড-ডিগ্রি টর্চারের সামনে টিকে থাকতে পারেনি কালা জাহাঙ্গীর। সে কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করেছে যে, এই হামলার নেপথ্যে স্বয়ং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাহেবের কোটি টাকার ফান্ডিং আর সরাসরি নির্দেশ ছিল।
পরদিন সকাল দশটা।
সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনের কনফারেন্স রুমে এক জরুরি ক্যাবিনেট মিটিং চলছিল। কিন্তু সেখানে আজ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাহেবের জন্য কোনো আসন বরাদ্দ ছিল না। ওনার নাম অলরেডি ক্যাবিনেট লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআর ওনার সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর স্থাবর সম্পত্তি ফ্রিজ করার অফিশিয়াল অর্ডার জারি করেছে। ওনার এই চূড়ান্ত পতনের পেছনে যে ব্যক্তিটি এক ইস্পাতকঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। তাওহীদ ওনার সেই ব্ল্যাক লেদার ফাইলের সমস্ত অকাট্য প্রমাণ, ব্যাংক ট্রান্সফারের স্টেটমেন্ট আর কালা জাহাঙ্গীরের ভিডিও জবানবন্দি সরাসরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলে পেশ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়েছেন।
বিকেল চারটে। চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুম।
বাইরের এই বিশাল আইনি ও রাজনৈতিক যুদ্ধ শেষ করে তাওহীদ যখন বাড়ি ফিরল, তখন ওনার চেহারায় এক অন্যরকম ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখ দুটোতে ছিল এক পরম বিজয়ের তৃপ্তি। সে সোফায় এসে বসতেই সিদরা এক কাপ গরম আদা-লেবুর চা আর হালকা কিছু নাস্তা নিয়ে ওনার সামনে এসে দাঁড়াল। সিদরা আজ পরেছে এক হালকা বেগুনী রঙের সুতির থ্রি-পিস, মাথায় ওড়নাটা সুন্দর করে জড়ানো।
সিদরা চায়ের কাপটা তাওহীদের সামনে টেবিলের ওপর রেখে ওনার পাশে এসে বসল। সে তাওহীদের সেই ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের নরম হাতটি আলতো করে ওনার কপালে রাখল। ওনার এই স্পর্শে তাওহীদের সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল।
সিদরা অত্যন্ত মৃদু, লাজুক অথচ গভীর ভালোবাসাপূর্ণ গলায় আপনি করে বলল,
❝আপনার এই চোখ দুটো আজ অনেক কথা বলছে, ব্যারিস্টার সাহেব। সচিবালয় থেকে আসার পর থেকেই আপনাকে কেমন যেন একটু বেশি শান্ত দেখাচ্ছে। সব ঠিক আছে তো?❠
তাওহীদ পত্রিকার ফাইলটা একপাশে সরিয়ে সিদরার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম মায়ায় তুমি করে বলল,
❝সব ঠিক আছে, সিদরা। আসাদুজ্জামান সাহেবের মন্ত্রিত্ব আজ দুপুরের পর অফিশিয়ালি বাতিল করা হয়েছে। ওনার নামে অলরেডি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। জাবেদ আলীর পর ওনার এই পতনটা খুবই দরকার ছিল। আজ থেকে তুমি আর তোহফা এই দেশে সম্পূর্ণ স্বাধীন আর নিরাপদ।❠
সিদরা তাওহীদের সেই চওড়া ও উষ্ণ হাতের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো আজ আবার এক অসীম শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। সে তাওহীদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে পরম আকুলতায় বলল—
❝আমি জানি, এই সবকিছুর জন্য আপনাকে কতটা লড়াই করতে হয়েছে, ব্যারিস্টার সাহেব। নিজের ক্যারিয়ার, নিজের জীবন বাজি রেখে আপনি প্রতিটা মুহূর্তে আমার আর তোহফার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এই দুনিয়ার সব মানুষ একদিকে আর আমার এই ব্যারিস্টার সাহেব একদিকে। আপনার এই ঋণের বোঝা আমি কীভাবে বইব, তা আমি জানি না।❠
তাওহীদ একটু হাসল, তার ঠোঁটের সেই পরিচিত মিষ্টি হাসির রেখা সিদরার হৃদয়ে এক নতুন অনুরাগের কাঁপন তুলল। সে সিদরাকে একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে ওনার কপালে এক দীর্ঘ ও গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে বলল—
❝তোমাকে কতবার বলেছি সিদরা, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে কোনো ঋণের কথা আসে না? তুমি হলে আমার এই রুক্ষ ও পাথুরে জীবনের একমাত্র মিষ্টি বসন্ত। তোমাকে ও তোহফাকে আগলে রাখাটা আমার কোনো দায়িত্ব নয়, ওটা আমার অধিকার, আমার ভালোবাসা। তুমি শুধু এভাবে সারাজীবন আমার পাশে থেকো, তাহলেই আমার এই পুরো জীবন সার্থক।❠
সিদরা লজ্জায় নিজের মুখটা তাওহীদের চওড়া বুকের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। সে তাওহীদের শার্টের কলারটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
❝আমি সারাজীবন এভাবেই আপনার বুকে নিজের আশ্রয় খুঁজে নেব, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনি ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।❠
ঠিক তখনই, ড্রয়িংরুমের পেছনের বাগানের দিক থেকে তোহফার খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। সে হোম-মেড খালার সাথে লুডু খেলছিল। তোহফাকে এভাবে হাসতে দেখে তাওহীদ ও সিদরের মনটা এক পরম শান্তিতে ভরে উঠল।
তবে ওদের এই অন্দরের আনন্দের ঠিক ওপারেই, ঢাকা শহরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক জীর্ণ ও গোপন আস্তানায় বসে তৈরি হচ্ছিল এক শেষ ও মরণঘাতী ষড়যন্ত্র।
মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাহেব এখন আর মন্ত্রী নন; তিনি এখন একজন ফেরারী আসামী, যার পেছনে পুরো দেশের পুলিশ ও ডিবি হন্যে হয়ে খুঁজছে। ওনার সমস্ত ক্ষমতা, টাকা আর দম্ভ আজ ধুলোয় মিশে গেছে। ওনার এই অবস্থার জন্য ওনার ভেতরের হিংস্রতা আজ এক জ্যান্ত পশুর রূপ নিয়েছে।
সে ওনার সামনে বসা সেই কুখ্যাত গডফাদার জুলফিকারের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে বললেন,
❝জুলফিকার! আমার সব শেষ হয়ে গেছে! ওই তাওহীদ চৌধুরী আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে! আমি জেলে যাওয়ার আগে ওই ব্যারিস্টারের কলিজা ছিঁড়ে ফেলতে চাই! কালা জাহাঙ্গীর ব্যর্থ হয়েছে তো কি হয়েছে, তোমার কাছে তো আরও লোক আছে! এমন কিছু করো যাতে ওই তাওহীদ চৌধুরী নিজের সারাজীবন শুধু কেঁদে কেঁদে কাটায়!❠
জুলফিকার তার হাতের সেই চকচকে ছুড়িটা টেবিলের ওপর গেঁথে দিয়ে এক ভয়ঙ্কর ও ক্রূর হাসি হাসল। সে বলল,
❝মন্ত্রী মহোদয়, শান্ত হোন। কালা জাহাঙ্গীর সরাসরি অ্যাটাক করতে গিয়ে ভুল করেছিল। কিন্তু জুলফিকার কোনো ভুল করে না। আমি অলরেডি ব্যারিস্টারের বাড়ির পুরো উইক পয়েন্ট বের করে ফেলেছি। ওনারা ভাবছেন আসাদুজ্জামান ব্যাকফুটে চলে গেছে মানে ঝড় শেষ। কিন্তু আসল ঝড় তো এবার আসবে।❠
জুলফিকার একটা ম্যাপ টেবিলের ওপর মেলে ধরে বলল,
❝আগামীকাল তোহফার স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস ডে। সেখানে ব্যারিস্টার আর ওনার বোরকা পরিহিতা স্ত্রী তোহফাকে নিয়ে প্রজেক্টে ব্যস্ত থাকবেন। আর ঠিক সেই ভিড়ের মাঝখান থেকেই আমরা তোহফাকে এমনভাবে ভ্যানিশ করব, যা ওই সুপ্রিম কোর্টের বাঘা ব্যারিস্টার নিজের সমস্ত আইনের ধারা দিয়েও খুঁজে পাবেন না। সন্তানকে হারানোর এই কষ্ট ওই তাওহীদ চৌধুরীকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে দেবে।❠
আসাদুজ্জামান সাহেব এক পৈশাচিক হাসি হেসে উঠলেন,
❝পারফেক্ট! ওর অহংকার এবার মাটির সাথে মিশে যাবে!❠
চৌধুরী ভিলার ওপর যখন বিকেলের সোনালী আলো ম্লান হয়ে এক অন্ধকার রাত নেমে আসছিল, তখন ওনারা কেউই জানতেন না যে ওনাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন, ওনাদের ছোট্ট তোহফাকে কেন্দ্র করে এক ভয়ঙ্কর কালো মেঘ ওনাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
ধানমন্ডি এলাকার সেই নামী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মাঠ জুড়ে আজ উৎসবের আমেজ। তোহফার স্কুলের ‘অ্যানুয়াল স্পোর্টস ডে’ উপলক্ষে চারপাশটা রঙিন বেলুন, ফেস্টুন আর সাউন্ড সিস্টেমের গানে মুখরিত। শত শত অভিভাবক ও শিশুরা মাঠে জমায়েত হয়েছেন। তোহফা আজ লাল রঙের স্পোর্টস ট্র্যাক স্যুট পরেছে, তার মাথায় দুটো ছোট ঝুঁটি। সে যখন দৌড় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়ে মেডেলটা জিতল, তখন তার সেই আনন্দিত মুখ দেখে তাওহীদ আর সিদরার বুকটা এক পরম শান্তিতে ভরে উঠেছিল।
ভিড়ের এক কোণায় দাঁড়িয়ে সিদরা আজ তার আবায়ার আড়াল থেকেই মেয়ের জন্য জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাওহীদ সিদরার এই চোখভরা আনন্দ দেখে আলতো করে ওনার কাঁধে হাত রাখল।
সে সিদরার চোখের দিকে তাকিয়ে পরম মায়ায় তুমি করে বলল,
❝দেখলে সিদরা? আমাদের তোহফা আজ মেডেল জিতেছে। তোমার এই মাতৃত্বের ছায়া ওকে কত দ্রুত বদলে দিয়েছে। আঠারো বছরের মরুভূমি পেরিয়ে আজ আমরা সত্যিই একটা পূর্ণাঙ্গ পরিবার।❠
সিদরা তাওহীদের সেই গভীর ও ভালোবাসাপূর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের কোণার জলটুকু নেকাবের আড়ালে মুছে নিল। সে অত্যন্ত নরম ও আকুল গলায় আপনি করে বলল,
❝এই সবকিছুই আপনার জন্য সম্ভব হয়েছে, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনি যদি সেদিন আমাদের হাত না ধরতেন, তবে হয়তো আজ তোহফা কোনো অন্ধকার এতিমখানার কোণায় একলা পড়ে থাকত। আপনি আমাদের শুধু জীবন দেননি, এক পরম আত্মসম্মান দিয়েছেন।❠
তাওহীদ মৃদু হেসে সিদরার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিতে যাবে, ঠিক তখনই ওনার পার্সোনাল বডিগার্ড রফিক হন্তদন্ত হয়ে ওনার পাশে এসে দাঁড়াল। ওনার মুখে এক তীব্র আতঙ্কের ছাপ।
❝স্যার! একটা ইমার্জেন্সি!❠
রফিক ফিসফিস করে বলল,
❝আমাদের সোর্সের খবর, আসাদুজ্জামানের সেই শেষ লোক ‘জুলফিকার’ আজ সকালেই ওনার মিরপুরের সেফহাউস থেকে মুভ করেছে। আর ওনার লাস্ট ফোনের লোকেশন এই স্কুলের আশেপাশেই ট্র্যাক করা গেছে। স্যার, ওনারা আজ তোহফাকে টার্গেট করেছে!❠
বডিগার্ডের এই একটা কথা যেন তাওহীদের মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। তার আইনজীবী মস্তিস্ক ও সুরক্ষাবোধ এক সেকেন্ডে সজাগ হয়ে উঠল। সে চট করে চারদিকে তাকাল, কিন্তু ভিড়ের মাঝে তোহফাকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না।
❝তোহফা কোথায়, সিদরা?❠
তাওহীদের কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তে গম্ভীর ও ভয়ার্ত হয়ে উঠল।
সিদরা চমকে উঠে চারপাশে তাকাল। এই তো একটু আগেও তোহফা ওনাদের ঠিক সামনেই জুস খাচ্ছিল। সিদরা মাঠের দিকে চোখ বোলাতেই দেখল, ওয়াশরুমের পেছনের শান্ত করিডোরের দিকে একটা লোক তোহফাকে চকোলেট দেখিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটার চোখে কালো সানগ্লাস, আর করিডোরের ঠিক ওপারেই একটা কালো নোয়া মাইক্রোবাস ব্যাক-গিয়ারে ব্যাক করছে।
❝ব্যারিস্টার সাহেব! ওই যে তোহফা! ওরা তোহফাকে নিয়ে যাচ্ছে!❠
সিদরা এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল।
তাওহীদ এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে নিজের কোমর থেকে সেই নাইন-এমএম পিস্তলটা বের করে সেদিকে ছুটতে চাইল। কিন্তু জুলফিকার অত্যন্ত চতুর ছিল; সে অলরেডি মাঠের মাঝখানে ওনার আরও দুজন লোককে সেট করে রেখেছিল। তাওহীদ করিডোরের দিকে এগোতেই সেই দুজন লোক সাধারণ অভিভাবকের মতো ভং ধরে তাওহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওনাদের একজনের হাতে ছিল ক্লোরোফর্মের রুমাল।
তাওহীদ এক ঝটকায় ওনাদের একজনকে লাথি মেরে সরিয়ে পিস্তলটা তাক করতে গেল, কিন্তু অন্যজন ওনাকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। মাঠের মাঝখানে এক তীব্র ধস্তাধস্তি আর হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। সাধারণ মানুষজন ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। তাওহীদ যখন ওনাদের দুজনকে নিজের নিখুঁত পাঞ্চ আর কনুইয়ের আঘাতে নকআউট করে উঠে দাঁড়াল, ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
করিডোরের মুখে তখন সেই ক্যাডারটা তোহফাকে কোলপাঁজা করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে। তোহফা চিৎকার করে কাঁদছিল,
❝আম্মু! আব্বু! আমাকে বাঁচাও!❠
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল এক অভাবনীয় ও বাস্তবসম্মত ঘটনা। কোনোরকম আইনি নোটিশ, কোনো পিস্তলের জোর ছাড়াই—সেখানে গর্জে উঠল এক মায়ের আদিম ও তীব্র প্রবৃত্তি। সিদরা আর এক সেকেন্ডও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল না। তার পরনে থাকা সেই ভারী আবায়া বা ওড়না আজ ওনার গতির পথে বাধা হতে পারল না। সে নিজের সমস্ত শক্তি এক করে বাতাসের গতিতে সেই করিডোরের দিকে ছুটে গেল।
ক্যাডারটা যখন তোহফাকে গাড়ির ভেতরে ছুঁড়ে দিয়ে নিজে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই সিদরা পেছন থেকে গিয়ে ক্যাডারের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তার ভেতরের সেই ভীতু, শান্ত মেয়েটা আজ পুরোপুরি উধাও। আজ সে এক বাঘিনীর মতো নিজের সন্তানকে বাঁচাতে মরিয়া।
❝আমার মেয়েকে ছাড়ো!❠
সিদরা এক তীব্র চিৎকার করে ক্যাডারের মুখে নিজের হাতের সেই ভারী হিরের আংটি পরা আঙুল দিয়ে আঁচড়ে দিল।
❝আহ!❠
ক্যাডারটা চোখ চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল। সে রাগের মাথায় নিজের পকেট থেকে একটা ধারালো ছোরা বের করে সিদরার ডান হাতের বাহুতে এক গভীর পোঁচ দিল।
ছিঁড়ে গেল আবায়ার কাপড়, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এলো সিদরার ফর্সা হাত বেয়ে। কিন্তু সিদরা সেই তীব্র যন্ত্রণা অনুভবই করল না। রক্তের সেই লাল দাগ ওনার আবায়াকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু ওনার হাত তোহফার জামা থেকে আলগা হলো না। সে রক্তাক্ত হাত দিয়েই তোহফাকে গাড়ি থেকে এক হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল এবং নিজের শরীর দিয়ে তোহফাকে পুরোপুরি কভার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ঠিক একই সময়ে তাওহীদ ল্যান্ড ক্রুজারের গতিতে সেখানে এসে পৌঁছাল। তার চোখ দুটো রাগে ও আতঙ্কে লাল হয়ে উঠেছিল। সে গাড়ি লক্ষ্য করে প্রথম ফায়ারটা করল—ঠাং! বুলেটের আঘাতে মাইক্রোবাসের পেছনের চাকাটা পাংচার হয়ে গেল।
ক্যাডাররা যখন দেখল তাওহীদ নিজে
এসে গেছে এবং ওনার নিশানা মারাত্মক, তখন তারা ল্যাজেগোবরে হয়ে উল্টোপথে গাড়ি ঘুরিয়ে স্পীডে পালিয়ে গেল।
মাঠের সেই ধুলাবালি আর রক্তের মাঝখানে সিদরা তখনো তোহফাকে নিজের বুকের সাথে পাথরের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপছিল। তার ডান হাত থেকে অনবরত রক্ত ঝরে মাটির ঘাসগুলোকে লাল করে দিচ্ছিল। তোহফা সিদরার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল,
❝আম্মু... তোমার হাত থেকে রক্ত পড়ছে! তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?❠
তাওহীদ নিজের হাতের পিস্তলটা মাটিতে ফেলে দিয়ে এক ঝটকায় সিদরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। একজন ঝানু, কঠোর ব্যারিস্টারের সেই অপরাজেয় দম্ভ আজ এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। সিদরার হাতের সেই রক্ত আর ওনার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ দেখে তাওহীদের চোখের পাতা বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ওনার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল।
সে সিদরাকে নিজের দুই বাহুর বন্ধনে অত্যন্ত আকুল, ভয়ার্ত এবং এক চরম ইমোশনাল কন্ঠে তুমি করে বলল—
❝সিদরা! ওহ গড, সিদরা! তোমার হাত দিয়ে এত রক্ত পড়ছে কেন? তুমি কেন ওভাবে ছুরির সামনে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে? যদি আজ তোমার কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যেত... যদি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলতাম, তবে আমি তো জ্যান্ত লাশ হয়ে যেতাম, সিদরা! আমি এই আইনের ডিগ্রি, এই ক্ষমতা নিয়ে কী করতাম?❠
তাওহীদ নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সিদরার রক্তাক্ত ক্ষতস্থানটা বেঁধে দিচ্ছিল, আর ওনার চোখের জল সিদরার হাতের ওপর গিয়ে পড়ছিল। ওনার এই তীব্র পুরুষালী কান্না আর আতঙ্ক সিদরার হৃদয়ের গভীরতম কোণকে নাড়া দিল।
✤✣ᚔᚔ✤✣
—চলবে—
✤✣ᚔᚔ✤✣