#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ২৩
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
উত্তরের করপোরেট অফিসের এসি রুমে বসে তাওহীদ সেই বেনামী চিঠিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতরের শীতল আবহাওয়াও ওনার ভেতরের উত্তাপকে কমাতে পারছিল না। ওনার ক্ষুরধার মস্তিস্ক এক সেকেন্ডে আঠারো বছর আগের সমস্ত ঘটনা, সুপ্রিম কোর্টের নথিপত্র আর আশরাফ আলী সাহেবের শেষ দিনগুলোর কথা অ্যানালাইসিস করতে শুরু করল। দাদু যদি ২০০৬ সালে লন্ডনে কোনো গোপন উইল করে থাকেন, তবে জাবেদ আলী এতদিন সেটা নিয়ে চুপ ছিল কেন? নাকি জাবেদ আলীর ওপরেও এমন কেউ আছে, যে এতদিন পর্দার আড়ালে থেকে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিল?
তাওহীদ ধীর পায়ে জানালার কাঁচের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে এক নতুন যুদ্ধের ছক আঁকতে লাগল। সে তার সেক্রেটারিকে ডেকে পাঠাল।
❝রফিক, এই কুরিয়ারটা কোন ব্রাঞ্চ থেকে এসেছে তার রুট ট্র্যাক করো। আর শোনো, আমাদের লন্ডনের ল ফার্ম 'লিংকনস ইন'-এর ব্যারিস্টার রবার্টকে এখনই একটা মেইল করো। ওনাকে বলো ২০০৬ সালের আশরাফ আলী ট্রাস্টের নামে হ্যারো কোর্টে কোনো উইল বা প্রোপার্টি ডিড রেজিস্ট্রি করা আছে কি না, তা আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে বের করতে।❠
তাওহীদের গলা থেকে যেন বরফ ঝরছিল।
❝ইয়েস স্যার, আমি এখনই দেখছি।❠
রফিক ফাইলটা নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যা সাতটা। চৌধুরী ভিলা।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আজ সিদরের জন্য কড়া নিয়মের ব্যবস্থা করেছে তাওহীদ। সে নিজে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে সিদরার ঘরে ঢুকল। সিদরা তখন বিছানায় হেলান দিয়ে তোহফাকে একটা রূপকথার গল্প শোনাচ্ছিল। ওনার ডান হাতের সাদা ব্যান্ডেজটা আবায়ার হাতা গলে কিছুটা দেখা যাচ্ছিল।
তাওহীদ ঘরে ঢুকতেই তোহফা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ওনার পা জড়িয়ে ধরল,
❝আব্বু! দেখো আম্মু আমাকে কত সুন্দর গল্প শোনাচ্ছে। কিন্তু আম্মু আজ নিজ হাতে ভাত খেতে পারছে না, তুমি আম্মুকে খাইয়ে দাও না!❠
তোহফার এই সরল ও মিষ্টি আবদারে সিদরা লজ্জায় একেবারে রাঙা হয়ে উঠল। সে তাওহীদের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করল তোহফাকে থামানোর জন্য। কিন্তু তাওহীদ আজ কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করল না। সে ব্লেজারটা সোফায় রেখে ধীর পায়ে সিদরার পাশে এসে বসল।
সে তোহফার মাথায় হাত বুলিয়ে তুমি করে বলল,
❝তোহফা মামণি, তুমি নিচে যাও, হোম-মেড খালা তোমার জন্য দুধ আর নুডলস বানিয়েছে। আম্মুর খেয়াল আজ আব্বু রাখবে।❠
❝ইয়েই!❠
তোহফা হাসতে হাসতে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
ঘরটা এক মুহূর্তে নিঝুম হয়ে গেল। সিদরা তাওহীদের সেই গভীর ও মায়াবী চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। সে একটু সরে বসতে যেতেই তাওহীদ ওনার বাম হাতটা টেনে নিজের বুকের ওপর রাখল। ওনার শার্টের ভেতর থেকে ওনার হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন সিদরা নিজের হাতের তালুতে অনুভব করতে পারছিল।
তাওহীদ সিদরার খুব কাছে এগিয়ে এসে, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত নরম ও তীব্র অনুরাগের কন্ঠে বলল,
❝কোথায় সরে যাচ্ছ, সিদরা? তোহফা তো ভুল কিছু বলেনি। আজ থেকে যতদিন তোমার এই হাতের ক্ষত পুরোপুরি না শুকোচ্ছে, তোমার এই পার্সোনাল কেয়ারটেকার তোমাকে নিজ হাতে সবকিছু করিয়ে দেবে।❠
সিদরা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার ফর্সা ঘাড় আর গাল দুটো অনুরাগের আভায় লাল হয়ে উঠল। সে অত্যন্ত কাঁপানো গলায় বলল,
❝ব্যারিস্টার সাহেব... আপনি সবসময় এমন করেন। বাড়িতে আব্বু আছেন, খালা আছেন। ওনারা দেখলে কী ভাববেন?❠
❝ওনারা জানেন যে আমি আমার স্ত্রীকে কতটা ভালোবাসি।❠
তাওহীদ আলতো করে সিদরার নেকাবের ওপরেই ওনার কপালে নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া দিল। সে পাশে রাখা স্যুপের বাটিটা হাতে নিয়ে এক চামচ সিদরার ঠোঁটের সামনে ধরল,
❝নাও, লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও। সারাদিন কিচ্ছু খাওনি।❠
সিদরা আর না করতে পারল না। তাওহীদের হাত থেকে পরম তৃপ্তিতে স্যুপ খেতে খেতে ওনার চোখে এক অদ্ভুত সুখের জল চলে এলো। আঠারো বছর ধরে যে মেয়েটা এক ফোঁটা স্নেহের জন্য কেঁদেছে, আজ সে ভালোবাসার এক অতল সাগরে ভাসছে। খাওয়া শেষ হলে তাওহীদ বাটিটা রেখে সিদরের সেই ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের হাতের ওপর নিল। ওনার চোখ দুটো আবার গম্ভীর হয়ে উঠল।
সিদরা তাওহীদের এই আকস্মিক গম্ভীরতা লক্ষ্য করে ওনার হাতটা একটু চাপ দিয়ে বলল,
❝কী হয়েছে, ব্যারিস্টার সাহেব? আপনাকে বিকেল থেকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে। কোর্টে বা ট্রাস্টে নতুন কোনো সমস্যা হয়েছে?❠
তাওহীদ সিদরার দিকে তাকাল। সে চাইল না এই ক্ষত আর যন্ত্রণার মাঝে সিদদাকে লন্ডনের ওই বেনামী চিঠির কথা বলে আবার আতঙ্কে ফেলতে। সে সিদরার গালটা আলতো করে ছুঁয়ে মৃদু হেসে বলল,
❝না রে পাগলী, কোনো সমস্যা হয়নি। আমি জাস্ট ভাবছিলাম, জাবেদ আলী আর আসাদুজ্জামান তো শেষ। এবার ট্রাস্টের আন্ডারে থাকা ওই এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য একটা বড় ফান্ড রিলিজ করব। তুমি সুস্থ হলেই আমরা দুজনে মিলে ওখানে যাব।❠
সিদরা স্বস্তির হাসি হাসল,
❝আমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাব, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনার এই ভালোবাসার ওষুধে যে কোনো ক্ষত এক দিনেই সেরে যায়।❠
তাওহীদ সিদরাকে নিজের বুকের সাথে পরম মায়ায় জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ওনার মনের কোণায় তখনো সেই চিঠির প্রতিটি অক্ষর কাঁটার মতো বিঁধছিল।
রাত একটা। চৌধুরী ভিলার সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন।
তাওহীদ তার স্টাডি রুমে বসে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই ওনার ফোনে লন্ডনের একটা ইন্টারন্যাশনাল নম্বর থেকে কল এলো। তাওহীদ দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে কানে দিল।
❝হ্যালো, রবার্ট? এনি আপডেট?❠
তাওহীদের গলা থমথমে।
ওপার থেকে ব্যারিস্টার রবার্টের গম্ভীর ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
❝ইয়েস তাওহীদ। তুমি যা সন্দেহ করেছিলে, তা আংশিক সত্যি। ২০০৬ সালের মে মাসে আশরাফ আলী সাহেব যখন চিকিৎসার জন্য লন্ডনে এসেছিলেন, তখন হ্যারো কোর্টের একটা ল ফার্মের মাধ্যমে ওনার একটা প্রোপার্টি উইলের অ্যামেন্ডমেন্ট করা হয়েছিল। কিন্তু সারপ্রাইজিং ফ্যাক্ট হলো—সেই উইলটা জাবেদ আলীর নামে নয়। ওটা আশরাফ আলী সাহেবের আপন ছোট ভাই, ‘আমজাদ আলী চৌধুরীর’ নামে রেজিস্ট্রি করা!❠
আমজাদ আলী চৌধুরী! এই নামটা শোনামাত্রই তাওহীদের হাত থেকে কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।
আমজাদ আলী চৌধুরী—যাকে আজ থেকে বিশ বছর আগে আশরাফ আলী সাহেব জালিয়াতি আর পারিবারিক বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে চৌধুরী বংশ ও এই দেশ থেকে ত্যাজ্য পুত্র করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন! সবাই জানত সে লন্ডনে গিয়ে এক এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তার মানে সে মরেনি! সে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়া নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়ে এতদিন ধরে জাবেদ আলীকে সামনে রেখে দাবার চাল চালছিল! আর এখন জাবেদ আলী শেষ হতেই সে নিজে অন্ধকার থেকে আলোয় চলে এসেছে সিদরাকে নিঃস্ব করতে!
❝তাওহীদ, আর একটা ব্যাড নিউজ আছে।❠
রবার্ট ওপার থেকে বলল,
❝আমজাদ আলী অলরেডি লন্ডনের হাই কোর্ট থেকে ওই উইলের একটা সার্টিফাইড কপি তুলে ওটার লিগ্যাল এনফোর্সমেন্টের জন্য বাংলাদেশের ব্রিটিশ হাইকমিশনে পাঠিয়েছে। ও আগামী সপ্তাহে সশরীরে ঢাকায় আসছে আশরাফ আলী ট্রাস্টের শত কোটি টাকার মালিকানা দাবি করতে।❠
তাওহীদ ফোনের ওপারেই নিজের দাঁত কিড়মিড় করল। তার চোখ দুটো হিংস্র বাঘের মতো জ্বলতে লাগল। সে অত্যন্ত দৃঢ় ও বরফশীতল গলায় বলল,
❝আসতে দাও ওকে, রবার্ট। জাবেদ আলীকে আমি সুপ্রিম কোর্টের ডক-এ দাঁড় করিয়েছি, আর এই আমজাদ আলীকে আমি সোজা সেন্ট্রাল জেলে পাঠাব। সিদরার আমানতে হাত দেওয়ার চড়া মূল্য ওনাকে দিতে হবে।❠
ফোনটা রেখে তাওহীদ জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এক ভয়ঙ্কর আন্তর্জাতিক আইনি ঝড় ও মাফিয়া ড্রামা চৌধুরী ভিলার দরজায় কড়া নাড়ছে। এবার তাওহীদকে কেবল ঢাকার এজলাসে নয়, লড়াই করতে হবে লন্ডনের আন্তর্জাতিক আইনের ধারার সাথে।
ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ
পরদিন সকাল দশটা।
চৌধুরী ভিলার সামনে হঠাৎ করেই পাঁচটা কালো রঙের দামি এসইউভি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল একঝাঁক স্যুটেড-ব্যুটেড বডিগার্ড আর ওনাদের মাঝখান থেকে হেঁটে এলেন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। পরনে দামী ব্রিটিশ স্যুট, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা আর মুখে এক অহংকারী হাসি। ইনিই আমজাদ আলী চৌধুরী—আশরাফ আলী ট্রাস্টের ওপর চোখ রাখা সেই সুদূর লন্ডনের মূল চক্রান্তকারী।
আমজাদ আলী সোজা বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঢুকে সোফায় পা তুলে বসলেন। রাশেদ চৌধুরী ও সিদরা নিচে নেমে আসতেই আমজাদ আলী এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
❝কী রে রাশেদ? ত্যাজ্য ভাই ভেবে ভেবে এত বছর খুব শান্তিতে ছিলি, তাই না? আর এই যে আমাদের এতিমখানা থেকে আসা নতুন চেয়ারম্যান সিদরাতুল মুনতাহা! তা দাদুর প্রোপার্টি ভোগ করা কি শেষ হলো?❠
সিদরা শান্ত কিন্তু গম্ভীর দৃষ্টিতে আমজাদ আলীর দিকে তাকাল। তার হাতে এখনো কালকের সেই ব্যান্ডেজ।
রাশেদ চৌধুরী গর্জে উঠলেন,
❝আমজাদ! আঠারো বছর আগে আব্বা তোকে এই বাড়ি আর প্রোপার্টি থেকে বের করে দিয়েছিলেন! তোর লজ্জা করে না আবার এই চৌকাঠে পা দিতে?❠
❝মুখ সামলে কথা বল, রাশেদ!❠
আমজাদ আলী পকেট থেকে একটি সিলগালা করা নীল রঙের ফাইল বের করে টেবিলে আছড়ে ফেললেন।
❝লন্ডনের হ্যারো কোর্টের ২০০৬ সালের অরিজিনাল উইল। আশরাফ আলী তার পুরো প্রোপার্টি আর ট্রাস্টের ৮০% শেয়ার আমার নামে দিয়ে গেছেন। তোদের এই চৌধুরী ভিলাও এখন আমার! আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তোরা এই বাড়ি খালি করবি, নয়তো ব্রিটিশ হাই কমিশনের ফোর্সেস এসে তোদের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলবে!❠
আমজাদ আলীর এই হুংকারে সিদরার বুকটা এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠলেও সে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এলো ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। তার হাতে ধরা একটা সাধারণ চায়ের কাপ, আর মুখে এক পরম উদাসীন কিন্তু সুতীক্ষ্ণ হাসি।
❝চব্বিশ ঘণ্টা অনেক বেশি সময় হয়ে গেল না, আমজাদ আলী সাহেব?❠
তাওহীদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আমজাদ আলীর ঠিক মুখোমুখি দাঁড়াল।
আমজাদ আলী তাওহীদের দিকে তাকিয়ে একটু অহংকার দেখিয়ে বললেন,
❝ওহ! তুমিই তবে সেই নামজাদা ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী? ভাবছ তোমার বাংলাদেশের কোর্টের আইন দিয়ে আমাকে আটকাবে? এটা লন্ডনের হ্যারো কোর্টের লিগ্যাল উইল!❠
তাওহীদ ধীর পায়ে টেবিলের কাছে গিয়ে সেই নীল ফাইলটা এক আঙুল দিয়ে একটু সরাল। তারপর সে আমজাদ আলীর চোখে চোখ রেখে তুমি করে সিদদাকে বলল,
❝সিদরা, তোহফাকে নিয়ে ওপরে যাও তো। এখানে কিছু আবর্জনা জমেছে, পরিষ্কার করতে একটু ধুলো উড়বে।❠
সিদরা তাওহীদের সেই আত্মবিশ্বাসী চোখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে তোহফাকে নিয়ে ওপরে চলে গেল। সিদরা জানে, তার এই ব্যারিস্টার যখন এভাবে শান্ত হয়ে হাসে, তখন প্রতিপক্ষের ধ্বংস অনিবার্য।
তাওহীদ সিদরা যেতেই এক নিমেষে নিজের হাসি থামিয়ে দিল। তার চোখ দুটো যেন বরফের মতো শীতল হয়ে গেল। সে আমজাদ আলীর দিকে ঝুঁকে অত্যন্ত থমথমে গলায় বলল—
❝আমজাদ আলী সাহেব, আপনি লন্ডনে বিশ বছর থেকে ভেবেছেন আপনি খুব চালাক হয়ে গেছেন, তাই না? আপনি ২০০৬ সালের মে মাসের যে উইলের পেপার দেখাচ্ছেন, আপনি কি জানেন ওই মে মাসেই আপনার বড় ভাই আশরাফ আলী সাহেব লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালে কোমা অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন?❠
আমজাদ আলীর মুখের রঙ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওনার হাতের চশমাটা একটু কেঁপে উঠল।
তাওহীদ নিজের পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর ছুড়ে মেরে বলল—
❝এই পেনড্রাইভে সেন্ট মেরি হাসপাতালের ২০০৬ সালের মে মাসের মেডিকেল রিপোর্ট, ডক্টর ক্লাইভের সাইন করা ডেথ-রিস্ক ফর্ম আর হ্যারো কোর্টের রেজিস্ট্রার ব্যারিস্টার উইলিয়ামসের স্বীকারোক্তি আছে। আশরাফ আলী যখন অবচেতন অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছিলেন, তখন আপনি ওনার জাল আঙুলের ছাপ আর ভুয়া সই বানিয়ে এই জালিয়াতির কাগজ তৈরি করেছিলেন! আর এই কাজে আপনাকে সাহায্য করেছিল আপনার ওই পুরনো চামচা জাবেদ আলী!❠
আমজাদ আলী তোতলামো গলায় বলে উঠলেন,
❝এ-এসব ভুয়া প্রুফ! হ্যারো কোর্ট আমার উইল একসেপ্ট করেছে!❠
❝হ্যারো কোর্ট একসেপ্ট করেছিল কারণ ওনারা সত্য জানতেন না।❠
তাওহীদ এক পা সামনে এগিয়ে আমজাদ আলীর কলারের কাছে নিজের মুখ নিয়ে বলল,
❝কিন্তু আজ সকাল ৯টায় সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ আর লন্ডনের হাইকোর্টে আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল যৌথভাবে আপনার এই উইলের ওপর স্টে-অর্ডার জারি করেছে। শুধু তাই নয়, জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং আর ব্রিটিশ সরকারের চোখ ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে আপনার নামে 'ইন্টারপোল' (Interpol) রেড নোটিশ জারি করতে যাচ্ছে।❠
কথাটা শেষ হতেই চৌধুরী ভিলার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকল র্যাব আর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশাল এক টিম! ওনাদের পেছনেই ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন লিগ্যাল অফিসার।
ডিবি অফিসার সামনে এগিয়ে এসে আমজাদ আলীর হাতে সজোরে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দিয়ে বললেন,
❝আমজাদ আলী চৌধুরী! জালিয়াতি আর ইন্টারপোলের ধারায় আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।❠
আমজাদ আলী বিস্ফোরিত চোখে তাওহীদের দিকে তাকালেন। সে ভাবতেও পারেনি যে লোকটা মাত্র বারো ঘণ্টার মধ্যে সুদূর লন্ডনের পেপারস বের করে ওনার বিশ বছরের এই বিশাল চাল এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেবে!
❝তুমি... তুমি আমাকে এভাবে ধ্বংস করতে পারো না ব্যারিস্টার!❠
আমজাদ আলী চিৎকার করতে করতে পুলিশ গাড়ির দিকে যেতে লাগলেন।
তাওহীদ শুধু ওনার দিকে তাকিয়ে নিজের কোটের হাতাটা ঠিক করে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
❝আমার বাবার ভিটায় চোখ দেওয়ার শাস্তি এটাই হয়, আমজাদ সাহেব।❠
দুপুর একটা।
বাড়ির সমস্ত ঝামেলা এক মুহূর্তে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। রাশেদ চৌধুরী পরম স্বস্তির এক নিশ্বাস ফেলে তাওহীদের কাঁধে হাত রাখলেন,
❝আজ তুই না থাকলে আমাদের চৌধুরী বংশের শেষ চিহ্নটুকুও শেষ হয়ে যেত, তাওহীদ।❠
তাওহীদ মৃদু হেসে বলল,
❝আব্বু, চৌধুরী বংশের আসল শক্তি তো ওপরে বসে আছে।❠
তাওহীদ দোতলায় সিদরার রুমে গেল। সিদরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে নিচে পুলিশের সাইরেন আর আমজাদ আলীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সব দেখেছে। সে জানত তাওহীদ পারবে, কিন্তু এত দ্রুত আর এত নিখুঁতভাবে সব শেষ হয়ে যাবে, তা সে ভাবতেও পারেনি।
তাওহীদ সিদরার পেছনে এসে দাঁড়াল। সে পরম মায়ায় সিদরার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের মুখটা ওনার ঘাড়ের কাছে রেখে তুমি করে বলল,
❝কী হলো চেয়ারম্যান সাহেবা? আপনার মুখের ওপর থেকে মেঘ কাটল তো? আমজাদ আলী আর ওনার ওই জালিয়াতির ফাইল কিন্তু সোজা ডাস্টবিনে চলে গেছে।❠
সিদরা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাওহীদের বুকটার ওপর নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা আলতো করে রাখল। সে ওনার সেই গভীর ও প্রেমময় চোখের দিকে তাকিয়ে অসীম শ্রদ্ধায় আপনি করে বলল—
❝আপনার এই ক্ষমতার সীমানা কোথায়, ব্যারিস্টার সাহেব? আপনি এক রাতে কীভাবে এত বড় জালিয়াতি ধরে ফেললেন? আজ সত্যিই আমার দাদুর এই ট্রাস্ট আর আমাদের এই বাড়ি পুরোপুরি স্বাধীন হলো।❠
তাওহীদ সিদরার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ওনার ঠোঁটের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
❝আমার ক্ষমতার সীমানা তোমার এই দুটো চোখের মাঝে, সিদরা। তুমি শান্তিতে হাসলেই আমার সব লড়াই সার্থক। তবে শোনো... ট্রাস্টের আর এই প্রোপার্টির সমস্ত লিগ্যাল পেপারস আমি কাল সকালেই রেজিস্ট্রি কোর্টে পাঠাচ্ছি। কালকের মধ্যে এই প্রোপার্টির কেস চিরতরে ক্লোজড!❠
সিদরা লাজুক হেসে তাওহীদের বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল, ❝কালকের পর থেকে তবে এই প্রোপার্টির কথা আর কোনোদিন আমাদের মধ্যে আসবে না তো?❠
❝একদম না❠
তাওহীদ সিদরার চুলে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
❝কালকের পর থেকে আমাদের গল্পে থাকবে শুধু তুমি, আমি আর আমাদের তোহফা।❠
✤✣ᚔᚔ✤✣
—চলবে—
✤✣ᚔᚔ✤✣