ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ব্যারিস্টার সাহেব

৩২তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓

#লেখিকা_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ৩২ (শেষ পর্ব)

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

বঙ্গভবনের বিশালাকার সম্মেলন কক্ষ আজ দেশ-বিদেশের মান্যগণ্য ব্যক্তিবর্গ, আইনজ্ঞ, মন্ত্রী আর আন্তর্জাতিক সমাজসেবকদের উপস্থিতিতে গমগম করছে। চারপাশের চমৎকার ঝাড়বাতির সোনালী আলো আর হাজারো ক্যামেরার আলোর ঝলকানি পুরো হলরুমকে যেন এক রাজকীয় রূপ দিয়েছে।

আজ বছরের সেরা সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ‘জাতীয় মানবতা ও সমাজসেবা সম্মাননা-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠান।

মঞ্চের সামনের সারিতে পাশাপাশি বসেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী আর ওনার পাশে ওনার সহধর্মিণী, আশরাফ আলী ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সিদরাতুল মুনতাহা চৌধুরী। সিদরার কোলে শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছিল চার মাসের ফুটফুটে রাজপুত্র তাহসীন, আর তাওহীদের এক হাত শক্ত করে ধরে ওর পাশে বসা বড় মেয়ে তোহফা।

সিদরা আজ সেজেছে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ ও মার্জিত সাজে। ওনার পরনে গাঢ় নীল রঙের একটি ভারী মসলিন আবায়া, যার হাতায় আর আঁচলে সুক্ষ্ম রুপালী সুতার কাজ। মাথায় খুব সুন্দর ও সুসংযতভাবে জড়ানো নেভি ব্লু হিজাব। সিদরার ফর্সা মুখশ্রীতে আজ কোনো ভয় বা দ্বিধা নেই; আছে কেবল এক আত্মবিশ্বাসী ও মাতৃত্বের শান্ত দ্যুতি।

পাশে বসা তাওহীদের পরনে ধবধবে সাদা শার্টের ওপর গাঢ় ছাই রঙের থ্রি-পিস স্যুট, গলায় নীল রেশমি টাই। সে বারবার আড়চোখে সিদরার দিকে তাকাচ্ছিল। ওনার চোখ দুটোতে আজ কোনো আইনি কঠোরতা বা গম্ভীরতা ছিল না—সেখানে ছিল কেবল নিজের স্ত্রীর জন্য এক বুকভরা অহংকার আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

তাওহীদ সিদরার টেবিলের নিচে রাখা খালি হাতটি নিজের শক্তিশালী হাতের তালুর ভেতর তুলে নিয়ে একটু চাপ দিল। সে সিদরার দিকে ঝুঁকে এসে তুমি করে পরম মায়ায় ফিসফিস করে বলল—

❝নার্ভাস লাগছে, আমার রানী?❠

সিদরা তাওহীদের দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো আনন্দে টলমল করছিল। সে তাওহীদের হাতটি পরম অনুরাগে আঁকড়ে ধরে অত্যন্ত নরম ও মিষ্টি গলায় বলল—

❝আপনার পাশে থাকলে আমার এই পুরো দুনিয়াটাকেও আর ভয় লাগে না, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনি আমার জীবনের এমন এক শক্ত পাহাড়, যার ছায়ায় দাঁড়ালে যেকোনো পথ সহজ মনে হয়।❠

তাওহীদ সিদরার এই ভালোবাসাময় কথা শুনে একটু হাসল। সে সিদরার হাতের পিঠে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,

❝আজ রাষ্ট্র তোমাকে সম্মান জানাচ্ছে সিদরা, কিন্তু আমার হৃদয়ের আদালতে তোমাকে আমি বহু আগেই আমার জীবনের একমাত্র রাণি হিসেবে আসন দিয়েছি।❠

ঠিক সেই মুহূর্তেই অ্যানাউন্সার মাইকে ঘোষণা করলেন—

❝সুধীবৃন্দ, এবার আমরা প্রদান করতে যাচ্ছি এ বছরের শ্রেষ্ঠ সামাজিক সংস্থা পুরস্কার। 'মুনতাহা মহিলা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র ও হাসপাতাল'-এর মাধ্যমে হাজার হাজার অসহায় নারী ও এতিম শিশুদের পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা সুনিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রপতির হাত থেকে এ বছরের জাতীয় পদক গ্রহণ করছেন—বেগম সিদরাতুল মুনতাহা চৌধুরী এবং ওনার স্বামী ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী!❠

পুরো বঙ্গভবনের হলরুম এক মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের উল্লাস আর তুমুল করতালি ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল! সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো একাধারে জ্বলতে লাগল।

তাওহীদ ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে তোহফাকে নিজের কোলে তুলে নিল, আর অত্যন্ত যত্নে সিদরার হাত ধরে ওনাকে মঞ্চের দিকে নিয়ে গেল।

মঞ্চে উঠে সিদরা আর তাওহীদ যৌথভাবে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সেই চকচকে স্বর্ণপদক ও সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করলেন।

মাইক্রোফোন যখন সিদরার সামনে এগিয়ে দেওয়া হলো, সিদরা এক মুহূর্তের জন্য সামনে বসা হাজারো অতিথির দিকে তাকাল। তারপর সে ডান পাশে দাঁড়ানো তাওহীদ আর ওনার কোলে থাকা তোহফা ও তাহসীনের দিকে তাকাল।

সিদরা অত্যন্ত স্পষ্ট, সুমিষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করল—

❝আজ এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার পর আমার কেবল একটা কথাই মনে পড়ছে... একটা সময় ছিল যখন আমার নিজের কোনো পরিচয় ছিল না, কোনো ঘর ছিল না। আশ্রয়হীন এক অনাথ মেয়ে হিসেবে আমি ভেবেছিলাম আমার জীবন হয়তো ওই অন্ধকারের চার দেয়ালেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পরম করুণাময় আমার জীবনে এমন একজন মানুষকে পাঠিয়েছিলেন, যিনি আমাকে শুধু আইনি ঢাল হয়ে রক্ষাই করেননি, উনি আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হয়।❠

সিদরা থামল। ওনার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে তাওহীদের দিকে তাকিয়ে পরম আকুলতায় বলে উঠল—

❝আমার এই পদক, আমার এই সম্মান—সবকিছুই আমার স্বামী ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীর আদর্শে উৎসর্গীকৃত। উনি না থাকলে আজ এই সিদরাতুন্নাহারের কোনো অস্তিত্বই থাকত না।❠

পুরো মিলনায়তনে আবার করতালির ঝড় উঠল। বহু জজ, আইনজীবী আর কূটনীতিকেরা দাঁড়িয়ে সিদরা ও তাওহীদের এই অপূর্ব বন্ধনকে সম্মান জানালেন।

তাওহীদ আবেগ সামলাতে না পেরে সিদরার কাছে এগিয়ে এলো। হাজারো মানুষ আর মিডিয়ার ক্যামেরার সামনেই সে সিদরার কপালে পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।

রাত দশটা। চৌধুরী ভিলার নিজস্ব দোতলার ছাদ।

আজকের বড় অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর রাতে চৌধুরী ভিলায় কেবল পরম এক নিস্তব্ধতা ও স্বস্তি। ছোট তাহসীন খালার কাছে আরামে ঘুমোচ্ছে, আর তোহফা দাদুর ঘরে নতুন ছবি আঁকতে ব্যস্ত।

রাতের পরিষ্কার আকাশে আজ পূর্ণিমার এক বিশাল চাঁদ উঠেছে। জোৎস্নার রূপালী আলোয় পুরো ছাদটা যেন এক স্বপ্নপুরীতে রূপ নিয়েছে। হালকা হিমেল বাতাস বইছিল চারপাশে।

সিদরা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের শান্ত শহরের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওনার পরনে হালকা বাসন্তী রঙের সুতির একটি আরামদায়ক শাড়ি, চুলে আলতো করে ধরা গোলাপী ওড়না।

তাওহীদ পেছন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে নিজের ব্লেজারটা খুলে সিদরার দু কাঁধের ওপর আলতো করে জড়িয়ে দিল। তারপর পেছন থেকে সিদরার দু কোমর নিজের শক্ত বাহুতে আগলে ধরে তাকে নিজের চওড়া বুকের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিল।

তাওহীদ সিদরার ঘাড়ে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে পরম মায়ায় ফিসফিস করে বলল,

❝ঠান্ডা লাগছে, সিদরা?❠

সিদরা পেছনে একটু হেলান দিয়ে তাওহীদের বুকে নিজের মাথাটা রাখল। সে ওনার হাতের ওপর নিজের দুটো ছোট হাত রেখে এক পরম তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বলল—

❝আপনার বুকের এই ওম থাকতে আমার জীবনে আর কখনোই কোনো শীতল ঝড় ছুঁতে পারবে না, ব্যারিস্টার সাহেব।❠

তাওহীদ ধীর পায়ে সিদদাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। জোৎস্নার আলো এসে পড়ছিল সিদরার সেই কাঁচা গোলাপের মতো স্নিগ্ধ ও রূপবতী মুখশ্রীর ওপর।

তাওহীদ সিদরার দুটি গাল নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। ওনার চোখ দুটো আজ গভীর অনুরাগে আচ্ছন্ন। সে সিদরার চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত নিচু ও রোমান্টিক কণ্ঠে তুমি করে বলল—

❝তুমি জানো সিদরা, সুপ্রিম কোর্টের শত শত কঠিন মামলায় জয় পাওয়াটা আমার কাছে অনেক সহজ ছিল। কিন্তু তোমার এই মিষ্টি চোখের মায়ায় আর তোমার এই অকৃত্রিম ভালোবাসার আদালতে বন্দি হওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম পরাজয়।❠

সিদরা তাওহীদের স্যুটের ল্যাপেলটা নিজের আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে লাজুক হেসে বলল,

❝আর আমি? আমি তো আপনার এই সুপ্রসিদ্ধ ব্যারিস্টারি হৃদয়ের এক আজীবন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী, ব্যারিস্টার সাহেব! এই জেলখানা থেকে আমি কোনোদিন মুক্তি চাই না।❠

তাওহীদ এক চতুর ও অনুরাগী হাসি হেসে সিদরার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সিদরার স্নিগ্ধ, নমনীয় ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

জোৎস্নার রূপালী আলোর নিচে, রাতের সেই নিঝুম বাতাসে দুটি হৃদয় এক নিবিড়, গভীর ও পরম ভালোবাসার চুম্বনে একাকার হয়ে গেল।

জীবন নদীর বহু চড়াই-উৎরাই, অন্ধকার চক্রান্ত আর অতীত রহস্যের মেঘ কেটে আজ ওনাদের আকাশে ফুটে উঠেছে এক নতুন, অপরাজিত ও শাশ্বত রূপকথার ভোর।

ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ

জাতীয় সম্মাননার সেই ঐতিহাসিক আর স্মরণীয় রাতের পর দেখতে দেখতে দুটো বছর কেটে গেল।

সময়ের ডানা মেলে চৌধুরী ভিলার দিনগুলো যেন এক পরম শান্তির আবহে বইছে। এখন আর সেই আগের নীরব চৌধুরী ভিলা নেই; সেখানে এখন দুই শিশুর চপল পদচারণা, তোহফা আর ছোট তাহসীনের মিষ্টি খুনসুটি আর হাসির কলরবে মেতে থাকে প্রতিটা দিন।

আজ মিষ্টি এক রোদেলা সকাল।

সকাল সাড়ে আটটা।

চৌধুরী ভিলার দোতলার মাস্টার বেডরুম থেকে ভেসে আসছে এক পুঁচকে বাচ্চার দুষ্টুমিভরা হাসির শব্দ। আড়াই বছরের তাহসীন এখন বেশ গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে আর আধো-আধো বোলে কথা বলতে শিখে গেছে। ওনার পরনে ছোট সুতির লাল টি-শার্ট আর নীল শর্টস, মাথায় রেশমি কোঁকড়ানো চুল।

তাহসীন বিছানার ওপর দু হাত-পা ছুড়ে তার আব্বুর গায়ের ওপর উঠে বসে আছে। আর প্রখ্যাত ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী? সে তখনো ঘুমে চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে, কিন্তু ওনার চওড়া বুকের ওপর উঠে বসে তাহসীন নিজের ছোট দুটো হাত দিয়ে তাওহীদের নাক চেপে ধরে বলছে—

❝আব্বু! ওঠো! তাহসীন খেলা করবে! ওঠো না!❠

তাওহীদ আধো-মেলা চোখে এক চতুর হাসি হেসে এক ঝটকায় পুঁচকে তাহসীনকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বিছানায় উল্টে দিল! তাহসীন অমনি খিলখিল করে হেসে উঠল!

❝আম্মু! দেখো! আব্বু আমাকে ধরে ফেলেছে!❠

তাহসীন দূর থেকে ডাকতে লাগল।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা মাথায় সুসংযতভাবে জড়াচ্ছিল সিদরা। ওনার পরনে একটি হালকা বাসন্তী রঙের চমৎকার সুতির শাড়ি। মাতৃত্ব আর ভালোবাসার পূর্ণতায় সিদরার মুখশ্রী আজ আরও বেশি উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ ও অপরূপ দেখাচ্ছে।

সিদরা আয়না থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাওহীদ আর তাহসীনের দিকে তাকাল। সে হাতের চুড়িগুলো একটু ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি ও ভান করা কড়া গলায় আপনি করে বলল—

❝ব্যারিস্টার সাহেব... আপনার ছেলেকে একটু সামলান তো! কাল রাতে আপনি ওনাকে আইসক্রিম খাইয়েছেন বলে সারা রাত ও আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। আর এখন আবার সকাল সকাল বাপ-বেটার খেলা শুরু হয়ে গেছে?❠

তাওহীদ বিছানায় কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠল। ওনার চুলগুলো এলোমেলো, চোখে ঘুম ঘুম আভা। সে সিদরার দিকে এক অদ্ভুত মায়াবী, চতুর ও অনুরাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে তুমি করে বলল—

❝আমার বরফশীতল বউকে সকালে ঘুম থেকে তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো তো কোনো ওয়েদার হতে পারে না, সিদরা। আর তাছাড়া, আমার পুঁচকে ব্যারিস্টার তো তার আম্মুর মতোই জেদী হয়েছে, আইসক্রিম চাইলে কি আমি না করতে পারি?❠

সিদরা তাওহীদের এই পটু কথার কাছে বরাবরের মতোই হেরে গেল। সে সিদরা ধীর পায়ে হেঁটে বিছানার পাশে এলো। তাহসীনকে কোল থেকে কোলে তুলে নিয়ে ওর নরম থুতনিতে আদর করে চুমু খেল।

❝আমার তাহসীন সোনা একদম লক্ষ্মী ছেলে, তাই না? ওনার আব্বুর মতো একদম দুষ্টু নয়।❠

সিদরা তাহসীনের মুখে গাল ঠেকিয়ে বলল।

ঠিক তখনই দরজায় সজোরে টোকা দিয়ে তোহফা ঘরে ঢুকল। তোহফা এখন বেশ বড় হয়ে উঠেছে, স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওনার পরনে সুন্দর নীল-সাদা স্কুলের ইউনিফর্ম, পিঠে রঙিন ব্যাগ।

❝আম্মু! আব্বু! নিচে চলো না! দাদু নাস্তার টেবিলে তোমাদের জন্য ওয়েট করছে! আর তাহসীন, তুই আবার আমার ড্রয়িং খাতায় পেন্সিল দিয়ে দাগিয়েছিস কেন?!❠

তোহফা তোয়ালে দিয়ে ভাইয়ার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল।

তাহসীন সিদরার গলায় মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

❝আব্বু... বুনু রাগ করছে!❠

তাওহীদ বিছানা ছেড়ে উঠে তোহফাকে নিজের এক বাহুতে তুলে নিয়ে পরম স্নেহে ওনার গালে চুমু খেল,

❝আমার সোনা মা রাগ করে না। আজ ছুটির দিনে তোহফাকে আমি নিজে হাতে বড় ড্রয়িং বোর্ড কিনে এনে দেব, ওকে?❠

❝ইয়েই! থ্যাঙ্ক ইউ আব্বু!❠

তোহফা এক নিমেষে আব্বুর গলা জড়িয়ে ধরল।

সিদরা ওদের এই মিষ্টি দাম্পত্য ও পারিবারিক মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ, পরম তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল।

দুপুর আড়াইটা। সাভারের 'মুনতাহা পুনর্বাসন কেন্দ্র'।

আজ সপ্তাহের বিশেষ দিন। প্রতি সপ্তাহে এই দিনে সিদরা নিজে সাভারে এসে পুনর্বাসন কেন্দ্রের নারী ও শিশুদের খোঁজখবর নেন, ডক্টরদের সাথে মিটিং করেন।

সিদরা আজ চেয়ারম্যান লাউঞ্জে বসে কিছু নতুন অনাথ বাচ্চাদের স্কলারশিপের ফাইলে সই করছিলেন। ওনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রাস্টের নতুন প্রজেক্ট ডিরেক্টর রফিক।

ঠিক তখনই ঘরের দরজায় নক করে ভেতরে প্রবেশ করল এক সুপুরুষ ব্যক্তিত্ব। ওনার গায়ে কালো থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সানগ্লাস।

সুপ্রিম কোর্টের হাফ-ডে শেষ করে সোজা সাভারে চলে এসেছেন ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী!

রফিক সালাম জানিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

সিদরা ফাইল থেকে চোখ তুলে তাওহীদের দিকে তাকাল। সে একটু অবাক হয়ে বলল,

❝ব্যারিস্টার সাহেব? আপনি এত সকালে কোর্ট শেষ করে সাভারে চলে এলেন? কোনো জরুরি কাজ ছিল নাকি?❠

তাওহীদ সানগ্লাসটা পকেটে রেখে সোজা সিদরার চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়াল। সে কোনো কথা না বলে সিদরার দু কাঁধে নিজের হাত দুটো রেখে একটু ভর দিয়ে ঝুঁকিয়ে এলো। ওনার সুগন্ধি পারফিউমের সুবাসে সিদরার চারপাশ ভরে গেল।

তাওহীদ সিদরার কানের লতির কাছে মুখ নিয়ে পরম মায়ায় ফিসফিস করে বলল,

❝আমার সবচেয়ে জরুরি কাজ তো তুমি, সিদরা। সকাল থেকে কোর্টে চারটে কেসের হিয়ারিং ছিল, কিন্তু আমার মনটা পড়েছিল সাভারের এই চেয়ারম্যান লাউঞ্জে। আমার এই মিষ্টি স্ত্রীকে এক নজর না দেখলে যে আমার কোনো কাজই পূর্ণ হয় না।❠

সিদরার গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাওহীদের টাই-এর নটটা পরম স্নেহে একটু টেনে সোজা করে দিল।

সে তাওহীদের গভীর ও অনুরাগী চোখের দিকে তাকিয়ে পরম আস্থায় আপনি করে বলল—

❝আপনি যে দিনে দিনে একদম বাচ্চাদের মতো হয়ে যাচ্ছেন, ব্যারিস্টার সাহেব! সুপ্রিম কোর্টের বিচারক আর ল-ইয়াররা যদি জানত যে ওনাদের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী ওনার স্ত্রীর পেছনে পেছনে এভাবে ঘুরে বেড়ায়, তবে উনি কী বলতেন বলুন তো?❠

তাওহীদ এক চতুর ও বিজয়ের হাসি হেসে সিদরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিল।

❝ওরা যা ইচ্ছে বলুক সিদরা! পুরো দুনিয়া আমাকে এক কঠিন, কঠোর আর পরাক্রমশালী ব্যারিস্টার হিসেবে চেনে। কিন্তু এই একটা মানুষ—আমার সিদরাতুল মুনতাহা চৌধুরী, যার সামনে এলে আমার সমস্ত অহংকার, সমস্ত কঠিনতা মোমের মতো গলে যায়। তোমাকে ভালোবাসতে পারাটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।❠

সিদরা তাওহীদের বুকের সাথে নিজের মুখটা আলতো করে ঠেকালো। তাওহীদের হৃদস্পন্দনের সেই সুপরিচিত ধুকপুকানি যেন সিদরাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা ও শান্তির স্বর্গে নিয়ে গেল।

সন্ধ্যা সাতটা। চৌধুরী ভিলার বিশাল বাগান।

বিকেলের হালকা বৃষ্টির পর সন্ধ্যার ঠান্ডা হাওয়া বইছিল বাগানের কৃষ্ণচূড়া আর মেহগনি গাছের পাতার ফাঁকে।

রাশেদ চৌধুরী বাগানের বেঞ্চে বসে তোহফাকে নিজের ছোটবেলার গল্প শোনাচ্ছিলেন, আর তাহসীন একটু দূরে ঘাসের ওপর ছোট প্লাস্টিকের ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিল।

বাগানের এক কোণে কাঠের দোলনায় পাশাপাশি বসেছিলেন তাওহীদ আর সিদরা।

তাওহীদ নিজের এক হাত সিদরার কাঁধের ওপর জড়িয়ে রেখেছিল, আর সিদরা তাওহীদের চওড়া বুকে পরম শান্তিতে নিজের মাথাটি নামিয়ে রেখেছিল। ওনার দু হাতের আঙুল তাওহীদের হাতের আঙুলের সাথে শক্ত করে পেঁচানো।

সিদরা দূরের আকাশে উঠে আসা রূপালী চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

❝ব্যারিস্টার সাহেব...❠

❝বলো সিদরা❠

তাওহীদ ওর মাথায় নিজের গাল ঠেকিয়ে বলল।

❝মাঝে মাঝে পেছনের দিনগুলোর কথা ভাবলে নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না। ইশরাতের সেই ষড়যন্ত্র, কামাল কাকার বিশ্বাসঘাতকতা, আমার সেই পরিচয়হীন অসহায় জীবন... সবকিছু যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।❠

তাওহীদ সিদরার চিবুকটা নিজের এক আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে ধরল। ওনার চোখ দুটো আজ এক পরম অনুরাগে টলমল করছিল। সে সিদরার ফর্সা কপালে নিজের ঠোঁটের এক দীর্ঘ, উষ্ম ও সুগভীর পরশ এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বলল—

❝সেসব অন্ধকার অতীত আর কোনোদিন আমাদের ছুঁতে পারবে না, সিদরা। অন্ধকারের পর যে আলো আসে, তা চিরন্তন। তুমি আমার জীবনের সেই আলো, যা আমাকে এক খাঁটি মানুষ বানিয়েছে, আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।❠

সিদরা তাওহীদের দিকে তাকিয়ে এক অপার্থিব, মিষ্টি হাসি হাসল। সে তাওহীদের গলা জড়িয়ে ধরে ওনার বুকের মাঝে নিজের মুখটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলল।

বাইরে কৃষ্ণচূড়ার সুবাস আর বিকেলের হিমেল হাওয়া ছড়াচ্ছিল, আর অন্দরে দুই হৃদয়ের চিরন্তন রূপকথা আজ এক অপরাজিত, অটুট ও পরম পূর্ণতায় চিরদিনের জন্য ডানা মেলল।

✤✣ᚔᚔ✤✣

—সমাপ্ত—

✤✣ᚔᚔ✤✣

🌸 — —🌸

লেখিকার কলমে:

প্রিয় পাঠক, সিদরা ও ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীর এই সুদীর্ঘ, রোমাঞ্চকর, আবেগপূর্ণ ও মিষ্টি ভালোবাসার মহাকাব্যিক সফরটি আজ এখানেই পূর্ণতা পেল। ওদের ভালোবাসার এই রূপকথা আপনার হৃদয়ে চিরকাল এক চিলতে মিষ্টি অনুভূতি হয়ে থাকুক। সাথে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ!...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন