ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

৩য় পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿

#দ্বিতীয়_খণ্ড

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

পর্বঃ- ০৩

🌿🌿🌿

কয়েক দিন কেটে গেছে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর। কলেজের রুটিনটা আগের মতোই চলছে,

কিন্তু মাহাদ আর কিয়ারা দুজনেই প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে একে অপরকে খুঁজে পেতে শুরু করেছে।

আজও কলেজ থেকে বেরোবার সময় লোকটার গাড়ি এসে দাঁড়ালো।

কিয়ারা দরজা খুলতেই চমকে যায়। লোকটার দৃষ্টি যেন তার সবকিছুই দেখে ফেলছে।

কিন্তু আজকাল ভিন্নতা ছাত্রছাত্রীরা, সহপাঠীরা ধীরে ধীরে লক্ষ্য করতে শুরু করছে তাদের সংযোগ।

লোকটা কেবল কিয়ারার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে,

কোনো শব্দ ছাড়াই শুধু চোখের ভাষায় বোঝাচ্ছে—“আমি এখানে আছি, তুমি নিরাপদে আছো।”

কিয়ারা লজ্জা নিয়ে হালকা মাথা নেড়ে গাড়িতে চড়ে বসে।

কিন্তু পাশের সহপাঠীরা আড়াল থেকে চেয়ে আছে,

—“এরা দুজন একে অপরের দিকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি মন দিচ্ছে।”

“ওদের মধ্যে কিছু চলছে… ওর সাথে এতো হ্যান্ডসাম সুপুরুষ টাকে ঠিক মানাচ্ছে না”।

এমন আরও গুঞ্জন চললো ওদের আড়ালে আবডালে।

গাড়ি ধীরে ধীরে কলেজের বাইরে আসে,

মাহাদ জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে হালকা স্পর্শ করে কিয়ারার কাঁধে—

একটা ছোট্ট চুম্বনের মতো, নিঃশব্দে।

কিছু বন্ধু এটা দেখেছে, কিন্তু কেউ আওয়াজ তুলেনি—

সবকিছু এখনো গোপন, কিন্তু স্পষ্ট সন্দেহভাজন।

কিয়ারা মনে মনে হাসছে—“আসলে সত্যি টা আমরা দুজনই জানি, শুধু অন্যরা এখনো বুঝছে না।”

লোকটার চোখে ভরা আসক্তি‌ আর তীব্রতা তাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দিচ্ছে।

এভাবে ধীরে ধীরে তারা নজরে আসতে শুরু করে।

কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু চোখে চোখ রেখে বোঝা যাচ্ছে—

কলেজে ছোট্ট গুঞ্জন, কৌতুহলি হাসি, অদ্ভুত দৃষ্টি, আর ধীরে ধীরে কিয়ারা-মাহাদের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ছে।

— — —

সকালের হালকা রোদ ফেলে দিচ্ছিল শহরের রাস্তায় একটা নরম সোনালি আভা। লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল, আর কিয়ারা পাশে বসে, হালকা বাতাসে তার চুলের লকগুলো নরমভাবে নাচছে। ও আজকে কলেজ ফাঁকি দিয়ে লোকটার সাথে সময় কাটাতে এসেছে। গাড়িটা ধীরে ধীরে মেইন রোডে উঠে আসলো।

কিয়ারা হাসতে হাসতে তার দিকে তাকাল, আর তারপর বলল…

ঃ- আজ আমরা কোথায় যাচ্ছি??!...

তিনি শুধু হালকা হেসে কিয়ারার দিকে চোখ রাখল। হাতটা হঠাৎ নিঃশব্দে কিয়ারার হাতে ছুঁয়ে গেল।

কিন্তু রাস্তাঘাটে তো শুধু তারা দুজন নয়। পাশের দোকানদার, দুটো গাড়ি পার্ক করা ছাত্র—সবার নজর ছোট ছোট ইঙ্গিতগুলোর দিকে।

লোকটা কিয়ারার দিকে ঝুঁকে এসে কণ্ঠে শুধু ফিসফিস করে বলল….

ঃ- কিছু বলো না, শুধু এই মুহূর্তটা অনুভব কর। আমি যেখানে নিয়ে যাবো, সেখানেই যাবে তুমি।

কিয়ারা শুধু মাথা নেড়ে, হাসি ধরে রাখল। মাহাদের হাত নিঃশব্দে তার হাতের সঙ্গে জোড় হল।

একটা গাড়ি পার্ক করা ছেলেটি হঠাৎ মনে করল,

ঃ- আরে এটা তো কিয়ান ভাইয়ার বোন, কিন্তু সাথে ওই লোকটা কি করছে??..

আর পাশের দোকানদারও চুপচাপ তাকিয়ে গেল, যেন দেখছে এক প্রেমের নিঃশব্দ খেলা।

তিনি চুপচাপ কিয়ারার মাথায় চুলের লক সরিয়ে দিল, আর কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল….

ঃ- যতবার তোমাকে কাছে পাই, মনে হয় সময় থেমে গেছে।

কিয়ারা লাজুকভাবে হাত দুলিয়ে দিল, আর পাশের ছোট্ট দৃষ্টি, ওরা অচেনা চোখে ধরা পড়েছে,কিন্তু লোকটা তা টের পায় না, সে শুধু এই নিঃশব্দ সংযোগে হারিয়ে যায়।

এরই মধ্যে দূরের গাছের ডালগুলোর মধ্যে পাখি উড়ে গেল, আর বাতাসে হালকা গন্ধের লহর—সব মিলিয়ে একটা প্রাণবন্ত নিঃশব্দ মুহূর্ত তৈরি করল।

কিয়ারা হঠাৎ বলে,

ঃ- আপনি জানেন… কেউ দেখতে পেলে কি হবে?...

লোকটা চোখ ভরা মুগ্ধতা নিয়ে বলল..

ঃ- যদি কেউ দেখে, দেখুক। আর কতদিন ধরে লুকিয়ে রাখবে??... কিন্তু আমি চাই না এই মুহূর্তটা ভাঙুক।

দু’জনেই হেসে ফেলল—মৃদু, নিঃশব্দ, কিন্তু হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার হাসি।

এভাবে ধীরে ধীরে তাদের ছোট্ট নিঃশব্দ প্রেম রাস্তাঘাটে চোখে পড়তে লাগল। ওরা জানতে পারলো না, এটাই হবে ভবিষ্যতে পরিবারের মধ্যে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া।

লোকটা কিয়ারাকে আরেকবার হাত ধরে ধীরে গাড়িতে বসাল। গাড়ি ধীরে ধীরে কলেজের দিকে রওনা হলো, আর কিয়ারা জানল—আজকের এই নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো চিরকাল মনে থাকবে।

গাড়ি কলেজের বাইরে ধীরে ধীরে থেমে গেল। লোকটা কিয়ারার হাত ধরেছিল, যেন পুরো পৃথিবী শুধু তাদেরই। কিয়ারা হালকা লাজুক, কিন্তু চোখে আগুন—অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা, যা তার নজর কেড়ে নিল।

ঃ- আজকের দিনটাও খুব সুন্দর ছিল। মনে হচ্ছিল কোনো স্বপ্নের দুয়ারে ভ্রমণ করিয়ে নিয়ে এসেছেন।

কিয়ারা ফিসফিস করে বলল।

লোকটা শুধু হেসে মাথা নাড়ল, আর হাত শক্ত করে ধরে রাখল।

কিছুটা দূরে কলেজের ছাত্রছাত্রীরা হাঁটছিল, কেউ সরাসরি নজর রাখছে না, কিন্তু চোখটা লুকানোও যায় না। কেউ ফিসফিস করে বলল,

“ওরা আবার একসাথে?”

আরেকজন হেসে মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো…গভীর কিছু আছে।

কিয়ারা কিছুই খেয়াল করেনি , কিন্তু লোকটা জানত—এখনই কেউ সরাসরি কিছু বলবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে, ছোট ছোট নিঃশব্দ ইঙ্গিতগুলো পৌঁছে যাচ্ছে পরিবারের কাছে।

লোকটা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কিয়ারাকে আঙ্গুলে আঙ্গুল মেলানোর মতো করে হাত ধরল। কিয়ারা চোখে চোখ রেখে হালকা হেসে দিল।

ঃ- আমি চাই না কেউ বুঝুক… এখনও সঠিক সময় আসেনি।

লোকটা মৃদু কন্ঠে ফিসফিস করে বলল।

কিয়ারা শুধু হেসে সম্মতি জানাল, যেন এই মুহূর্তটা চুরি করে নিজের হৃদয়ে লুকিয়ে রাখছে।

দূরে গাছের পাতায় হাওয়া দুলছে, এবং তাদের নিঃশব্দ হাসি পুরো দৃশ্যটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে। গাড়ি ধীরে ধীরে কলেজের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর রাস্তার কাদা-মাটি, দূরের শব্দ সব মিলিয়ে যেন এক মৃদু সুর তৈরি করছে।

কিছুক্ষণ পর, মাহাদ কিয়ারাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। দু’জনই জানত—এবারও পরিবারের কারো চোখে পড়েনি, কিন্তু চোখের কোণায়, কানের ফিসফিসে, এক ধরনের অদৃশ্য বার্তা পৌঁছেছে।

যে বার্তা বলে—“এই দুজন একসাথে, এবং ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক স্পষ্ট হতে চলেছে।”

কিয়ারা গাড়ি থেকে নামল, হাতের হাত শক্ত করে ধরে রেখে। লোকটা শুধু হালকা হেসে তাকাল, যেন বোঝাচ্ছে—আজকের এই নিঃশব্দ সংযোগগুলো তাদের হৃদয়ে চিরকাল থাকবে।

গাড়ি ধীরে চলে গেল, আর কিয়ারা জানল—পরবর্তী দিনগুলো হবে আরও জটিল, আরও আবেগপ্রবণ। ধীরে ধীরে, পরিবারের নজরও পড়তে শুরু করবে। ছোট ছোট নিঃশব্দ ইঙ্গিতগুলো হবে সেই প্রথম ঝড়ের হাওয়া, যা অদৃশ্য হলেও চূড়ান্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

— — —

কলেজের সেই ব্যস্ত দুপুর,

বাতাসে কেবল ছাত্রছাত্রীদের হট্টগোল আর ক্লাসের ঘণ্টার শব্দ। কিয়ারা যখন বের হচ্ছিল, লোকটার নীল চোখও যেন অদৃশ্য হয়ে ঠিক ওর পিছনে লেগে আছে। ভিড়ের মাঝে দু’জনের চোখ মিলল—হঠাৎই এমন এক মুহূর্ত, যা কেবল তাদের জন্য।

ক্লাসের বান্ধুবীরা খেয়াল না করলেও, কেউবা মনে করতে পারল, কিয়ারা একটু অস্বাভাবিকভাবে হাসছে। লোকটাও তার গাড়ি নিয়ে কলেজের গেটের কাছে অপেক্ষা করছে, যেন কোনো ঝুঁকি না ঘটে।

কিয়ারা ধীরে ধীরে গেটের দিকে হাঁটছে, আর লোকটার আর্কষনীয় স্বচ্ছ নীল চোখে শুধু ওর প্রতি নজর। ছোট্ট নিঃশব্দের ইঙ্গিত, হালকা হাতের ইশারা—সবকিছুই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের সম্পর্কটা শুধু চোখে চোখেই প্রকাশিত।

ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে কিয়ারা বাকিদের রেখেই আগে আগে এগিয়ে আসে।

কিরণ ওকে এভাবে ছুটে যেতে দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া এসেছে কিনা।

কিয়ারা লাজুক হয়ে মাথা হেলায়, আর মনে মনে ভাবছে—এখন পর্যন্ত কেউ কিছু জানল না, কিন্তু এই মুহূর্তেই যেন নতুন উদ্দীপনা আসে।

কিয়ারা গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর কন্ঠে যথেষ্ট কোমলতা এনে নরমভাবে বলল…

ঃ- আজ তোমায় খুব সুন্দর লাগছো। কিছুটা অন্যরকম লাগছে।

কিয়ারা লাজুক হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে। গাড়ি ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট পেছনে ফেলে তাদের নিঃশব্দ জগতের দিকে এগোতে থাকে।

যেখানে দু’জন একসাথে, কেউ তাদের বোঝে না, আর একটা অদ্ভুত শান্তি মিশে আছে—ছোট্ট চোখের খোলসের মধ্যে একটা বড় অনুভূতি, যা শুধু তাদের।

কিয়ারা গাড়িতে উঠে বসে, শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট পেছনে ফেলে। মাহাদ পাশে বসে আছে, চোখে অদ্ভুত উষ্ণতা, আর মুখে হালকা হাসি।

ঃ- আজ তোমাকে পিক করতে এলাম, তুমি ভেবেছিলে আসবো?...

মাহাদ ফিসফিস করে বলল, কণ্ঠে নরম তীব্রতা।

কিয়ারা লাজুক হেসে মাথা নেড়ে দেয়।

ঃ- আমি তো ভাবতেও পারিনি আপনি আজকেও আসবেন।

লোকটা ধীরে তার হাত কিয়ারার হাতের আঙুলের সাথে মিলিয়ে রাখে। নিঃশব্দে সেই স্পর্শে যেন পুরো শহরের শব্দগুলো থেমে যায়। কিয়ারা হালকা শ্বাস ফেলে, আর মনে মনে ভাবছে—এই শান্তি, এই অদ্ভুত নিরাপত্তা, শুধুই এই লোকটার সাথেই অনুভব হয়।

গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। লোকটার চোখ কিয়ারার দিকে, যেন চোখের ভাষাতেই সব বোঝানো হচ্ছে।

ঃ- তুমি জানো… যখন তুমি আমার পাশে থাকো, আমার দিনটা পুরো রঙিন হয়ে যায়।

লোকটা মৃদু হেসে বলে, গলায় একরাশ কোমলতা।

কিয়ারা লাজুকভাবে তাকিয়ে থাকে, ঠোঁটে হালকা হাসি।

ঃ- আমিও… আপনার সাথে থাকলে, সব ভয় আর চিন্তা যেন দূরে চলে যায়।

গাড়ির বাইরে, শহরের কোলাহল ক্রমে মিলিয়ে যায়; ভেতরে শুধু দু’জনের নিঃশব্দ সংলাপ, হাতের স্পর্শ, আর চোখের একরাশ ভালোবাসা।

লোকটা আস্তে কিয়ারার কানের কাছে ফিসফিস করে..

ঃ- তুমি জানো… আমি শুধু তোমাকে চাই, রায়া।

কিয়ারা চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, হাত শক্ত করে ধরে রাখে মাহাদের। সেই মুহূর্তে সময় যেন থেমে গেছে।

শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাটের মাঝে, এই ছোট্ট গাড়ির মধ্যে দু’জন মানুষের নিঃশব্দ আলাপনে

যেন একটি শান্ত, মিষ্টি, অথচ গভীর ভালোবাসার অনুভূতি।

কিয়ারা এতক্ষনে খেয়াল করলো যে, গাড়িটা ওর বাসার দিকে যাচ্ছে না। বরং তার উল্টো দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিয়ারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল…

ঃ- একি কোথায় যাচ্ছেন??... এটা তো আমার বাসায় যাওয়ার রাস্তা নয়। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?..

লোকটা শুধু একবার পাশ ফিরে ওর দিকে তাকালো। তারপর ড্রাইভিং করতে করতেই বলে উঠলো…

ঃ- তুমি এখন বাসায় যাচ্ছো না।

আমার সাথে ফ্ল্যাটে যাচ্ছো।

ঃ- কিন্তু…

কিয়ারা মিনমিনে গলায় বলে উঠলো। কিন্তু লোকটা ওর কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো…

ঃ- আবার কিন্তু কিসের.?.. আবার আমানত আমি যখন চাইবো যেখানে খুশি নিয়ে যাবো। তাঁতে আমার কারো সম্মতির প্রয়োজন নেই। তাই চুপচাপ বসে থাকো।

এরপর আর কেউ কোনো কথাবার্তা বলেনি। লোকটাও কিছু না বলে চুপচাপ সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল।

একটু পর গাড়ি থামল সেই পরিচিত অ্যাপার্টমেন্টের সামনে—যেখানে আগেও এসেছে কিয়ারা, তবুও আজ যেন নতুন মনে হচ্ছে সব।

সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে এলো দুজনে চুপচাপ। মাঝে মাঝে চোখে চোখ পড়ছে, কিন্তু কেউ কথা বলছে না।

দরজা খুলতেই পরিচিত সেই গন্ধ—স্যান্ডালউড আর কফির মিশ্রণ।

ফ্ল্যাটটা আগের মতোই সাজানো, কিন্তু কোথায় যেন একটু উষ্ণতা বেড়ে গেছে আজ।

ঃ- বেশি কিছু ভেবো না, তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

লোকটা কন্ঠে একরাশ কোমলতা নিয়ে বলে উঠল। নিজের রুমের দিকে ইশারা করে।

কিয়ারাও আর কোনো বাড়তি কথা না বলে রুমে ঢুকে গেল। চারপাশে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল…

ঃ- সবকিছু আগের মতোই আছে, কিছুই বদলায় নি! সব কিছু একই রকম।

এরমধ্যেই লোকটা দুটো কফির মগ নিয়ে রুমে ঢুকলো। লোকটা যেন হাসল,

ঃ- সব কিছু বদলাতে হয় না, কিছু জিনিস ঠিক একই থাকলেই সুন্দর লাগে।

ওদের চোখাচোখি হলো, এক পলক—কিন্তু সেই পলকেই যেন পুরো কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

কিয়ারা সামনে এগিয়ে দেওয়া কফির কাপ হাতে নিল, কিন্তু হাত সামান্য কেঁপে গেল। মাহাদ সেটা টের পেয়ে আস্তে কাপটা নিজের হাতে ধরে রাখল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল…

ঃ- ধরো না, গরম। এতো ছটফট করতে হবে কেন?.. তোমার জন্য এটা নয়।

তার কণ্ঠে ছিল একরাশ যত্ন, অথচ ভেতরে একটা বেপরোয়া আকর্ষণ কাজ করছিল।

কিয়ারা হালকা কাঁপা গলায় বলল…

ঃ- কোথায় ছটফট করলাম!.. আর আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন??...

ঃ- কারণ আমি চেয়ে থাকলেই তোমাকে হারানোর ভয়টা কমে যায়। আর সবসময় তো আর তোমাকে চোখের সামনে দেখতে পাইনা!..

কিয়ারা চুপ। চোখ নামিয়ে ফেলে। ঘরে তখন শুধু ঘড়ির টিকটিক আর কফির গন্ধ।

মাহাদ এগিয়ে এসে থাই গ্লাস টা খুলে দিল—বাইরে সূর্যের শেষ আলো ঢুকল ভেতরে।

ওর দিকে ফিরে বলে,

“চলো, তোমাকে কিছু দেখাই।”

ওরা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে শহরটা ঝলমল করছে, বাতাসে গোধূলির ছোঁয়া।

কিয়ারা হেসে বলে উঠলো…

ঃ- আপনি জানেন, এই জায়গাটা আমারও প্রিয় হয়ে গেছে।

ঃ- তাই নাকি !.. ভালোই তো তাহলে।

লোকটা ওর গালে একটা টোকা দিয়ে মৃদু স্বরে বলল….

ঃ- এখানে তোমার উপস্থিতি ছাড়া কিছুই পরিপূর্ণ লাগে না।

ওরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, নীরবতা আর অনুভূতির মাঝখানে, যেখানে শব্দের দরকার নেই—শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসই যথেষ্ট।

— — —

বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু জানালার কাঁচে এখনো ছোট ছোট জলের বিন্দু ঝুলে আছে। ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ভেজা মাটির গন্ধ। কিয়ারা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল—চুলের ডগাগুলো এখনো ভেজা, আর তার মুখে একরকম ক্লান্তি-মেশানো সতেজতা।

হালকা নীল রঙের একটা থ

থ্রিপিস পড়নে রয়েছে। সাধারণ পোশাকেও ও যেন আলাদা আলো ছড়াচ্ছে।

লোকটা তখন রান্নাঘরে ছিল।

উনার পরনে কালো টি-শার্ট, আর হাত গোটানো। টেবিলের পাশে কিছু খাবার সাজাচ্ছিল সাধারণ ভাত, ডাল, চিকেন, আর ছোট্ট একটা সালাদ বাটি।

সব কিছুতেই ছিল একধরনের যত্ন, যেন সে জানে তার রায়া কী খেতে ভালোবাসে।

ঃ- আপনি রান্না করেছেন?... কিয়ারা অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

লোকটা হালকা হাসল, তারপর ওর‌ কপালে একটা উষ্ণ চুমু খেয়ে বললো..

ঃ- হ্যাঁ। ভাবলাম, অনেকদিন পরে তুমি এসেছো... বাইরে থেকে কিছু অর্ডার দিলে তোমার মন ভরবে না। তাই নিজেই এই ছোট্ট আয়োজন করলাম, শুধুমাত্র তোমার জন্য..!...

কিয়ারা টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বলল,

ঃ- আপনি নিজেও নিশ্চয়ই ক্লান্ত ছিলেন। তাই এতো কষ্ট করার দরকার ছিল না। বাহিরে থেকে অর্ডার করলেই হতো।

ঃ- তোমার জন্য কিছু করতে আমার কখনোই ক্লান্তি অনুভব করিনা।

লোকটার চোখের দৃষ্টিতে সেই পুরনো কোমলতা।

এক মুহূর্তে ঘরটা যেন ভারী নীরব হয়ে গেল। শুধু দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা নড়াচড়া করার আওয়াজ।

তিনি চেয়ার টেনে নিয়ে বলল…

ঃ- বসো তাড়াতাড়ি। নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে!... তাড়াতাড়ি খেয়ে বলো তো কেমন হয়েছে। যদিও নিজের রান্নার উপর আমার বেশ কনফিডেন্ট আছে।

ওরা দুজনে পাশাপাশি বসল।

কিয়ারা প্রথমে প্লেটে ভাত তুলে নিয়ে খেতে গিয়ে থেমে গেল, তারপর মুচকি হেসে বলল,

ঃ- আপনার হাতের রান্না এখনো ঠিক তেমনই। মনে আছে, আগেও আপনি বলেছিলেন খাবারে যতটা লবণ দিই, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা মেশাই।

লোকটা একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল…

ঃ- তুমি এখনো সেই কথাটা মনে রেখেছো!.. সবই মনে রাখো দেখছি।

ঃ- ভুলতে শিখিনি এখনো। কিয়ারা নরম স্বরে বলল, চোখ নামিয়ে।

বাইরে সূর্য একটু উঁকি দিলো। ঘরের ভেতর হালকা আলো পড়লো তাদের মুখে।

খাওয়ার মাঝেই কিয়ারা চুপচাপ বলল,

ঃ- আচ্ছা এখানে কী আপনি একাই থাকেন?.. কেউ আসে না এখানে?..

ঃ- না। যখন কাজের চাপে খাঁন ম্যানশনে ফেরার সময় পাইনা। তখন এখানেই থেকে যাই। তবে মাঝে মাঝে অয়ন , নাঈম ওরা আসে বেশি দরকার হলে।

লোকটা উত্তর দিলো নিঃশব্দে। তারপর একটু চুপ করে আবার বলল…

ঃ- আর তুমি আসার পর আর কেউ আসেনি এখানে। কারণ আমি চাইনা কেউ এখানে তোমাকে অনুভব করুক।

কিয়ারা চোখ তুলে তাকাল।

ওর চোখে একটু ঝাপসা জল, কিন্তু ঠোঁটে একটা নিঃশব্দ প্রাপ্তির হাসি।

ঃ- আপনি এখনো আগের মতোই পাগল হয়ে আছেন। উন্মাদ লোক!...

ঃ- হুঁ তুমিই আগের মতোই আমার পাগলামির কারণ।

লোকটা ফিসফিস করে বলল, আর দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠল।

দুপুরের নরম আলোয় সেই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে।

বাইরে আবার বৃষ্টি নামল, ভেতরে নিঃশব্দে দুজনের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে এল—খাবারের গন্ধে, কথার ফাঁকে, আর একে অপরের চোখে লুকিয়ে থাকা সেই পুরনো সম্পর্কের উষ্ণতায়।

---চলবে---

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন